Friday, December 3, 2010

মোনায়েম খানের রক্ষীরা আতশবাজির মতো গুলি ফুটিয়েছিল : মোজাম্মেল হক, বীরপ্রতীক


মোনায়েমের রক্ষীরা আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ করেছিল :মোজাম্মেল হক
মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১-এর ১৩ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক। কর্মচারীদের সহায়তায় বনানীর বাড়িতে ঢুকে গুলি করেছিলেন গভর্নরকে। এই অপারেশনে মৃত্যু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকের অন্যতম সমর্থক মোনায়েম খানের। অপারেশনের পর তার নিরাপত্তারক্ষী বেলুচ রেজিমেন্টের সদস্যরা আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ করেছিল। সেদিনের সেই বীরত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছেন মোজাম্মেল হক। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সেই অভিযান, ঢাকার অভ্যন্তরে গেরিলা তৎপরতা ও বিজয়ের কথা জানিয়েছেন তিনি।
..................................................................................
মোজাম্মেল হক, বীরপ্রতীক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের নিকটবর্তী ভাটারায়। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন স্টাফ ওয়েলফেয়ার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। কম বয়স সত্ত্বেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করেছেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে। 'ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ' নামে একটি গেরিলা গ্রুপের সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকায় পরিচালিত বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। ১৩ অক্টোবর এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা-পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সে অভিযান, গেরিলা যুদ্ধ ও ডিসেম্বরের ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ

সমকাল :মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সফল অপারেশনের কারণে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন আপনি। ১৩ অক্টোবর এসে এমন একটি দুঃসাহসী পদক্ষেপ কেন নিয়েছিলেন?
মোজাম্মেল : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে অপারেশনটি পরিচালিত হয়েছিল অক্টোবর মাসে। শুধু সম্মুখ সমরে নয়, মনস্তাত্তি্বক যুদ্ধেও যে পাক হায়েনারা পরাজিত হয়েছে_ এটি সারা পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এ অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল। আমার আক্রমণে মোনায়েম খানের মৃত্যুর পর সারা পৃথিবীর কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তানিদের পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা 'ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ' পাকিস্তানি মিলিটারির অ্যামবুশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যখন আবার মেলাঘরে ফেরত যাই তখন আমাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হায়দার সামরিক কায়দায় আমাদের বললেন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ যেহেতু অ্যামবুশে পড়েছে, সেহেতু তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। তাই তাদের দ্বারা গেরিলা অপারেশন অথবা সম্মুুখসমর সম্ভব নয়। তাদের দিয়ে আর্মস-অ্যামুনেশন বহন করা ছাড়া আর কোনো কাজ করানো যাবে না। এ রকম একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে দারুণ হতাশার সৃষ্টি করে। আমরা মনে খুব কষ্ট পাই। ট্রেনিং শেষে প্রায় প্রতিদিন আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতাম ওনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। একদিন উনি ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, প্রত্যেক দিন তোমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? বললাম, স্যার আমাদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠান। তিনি বললেন, তোদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠিয়ে কী হবে? তোরা তো মানসিকভাবে পরাস্ত। আমরা বললাম, না স্যার আমরা মানসিকভাবে পরাস্ত হইনি। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বল কাকে মারতে পারবি? নানা কথার পর আমি বললাম, স্যার আপনিই বলেন কাকে মারব? তিনি বললেন, মোনায়েম খানকে মারতে পারবি? তিনি তার প্রশ্ন শেষ করার আগেই আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মোনায়েম খানকে মারতে পারলে কী দেবেন? তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, ঠিক আছে তাহলে আমি আজই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপকে পাঠিয়ে দেব। বনানী কবরস্থানে মোনায়েম খানের স্ত্রীর কবর অবস্থিত। সেখানেই গরু চরানোর সময় তার গরুর রাখাল শাহজাহানের ও কেয়ারটেকার মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিকল্পনা হয়। তার সাহায্যেই আমরা মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করি।
সমকাল : কখন অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন?
মোজাম্মেল হক : সন্ধ্যার সময়। সন্ধ্যায় যখন শাহজাহান গরু নিয়ে বাসায় ফেরে তখন আমরা তার সঙ্গে মোনায়েম খানের বাড়িতে ঢুকে কলাবাগানে লুকিয়ে থাকি। বাড়ির ভেতর ঢুকে সে মোনায়েম খানের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। তখন মোখলেছ এবং শাহজাহানকে আমরা সরে যেতে বলি। ওরা সরে গেলে আমরা অপারেশন পরিচালনার জন্য সামনের দিকে মার্চ করি। মোনায়েম খান তখন ড্রইংরুমে ছিল। ড্রইংরুম খোলা ছিল। রুমের ভেতর পশ্চিম দিকে মুখ করে সোফায় বসা ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন এবং তার জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল আর মাঝখানে মোনায়েম খান। সে সময় ইন্ডিয়ান স্টেনগানে আমরা ফায়ার ওপেন করি। তখন অস্ত্র আমাদের সঙ্গে বিট্রে করে। এসএমজি থেকে একটা বুলেট বের হওয়ার পর ফেঁসে যায়। চেম্বারে গিয়ে দ্বিতীয় বুলেট আটকে যায়, বুলেট আর বের হয়নি। পরে জানতে পারি, সেই একটি গুলিতেই মোনায়েম খান প্রাণ হারান। তারপর আমরা ৩৬ হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করি। সেটিও বার্স্ট হয়নি। আমরা দৌড়ে তার বাড়ির দেয়াল টপকে বনানী কবরস্থানে চলে যাই। সেখানে দেয়াল টপকানোর সময় আমার পকেটে থাকা হ্যান্ড গ্রেনেডটা পড়ে যায়। আমরা বনানী লেকের দিকে চলে যাই। মোনায়েম খানের বাড়িতে বেলুচ রেজিমেন্টের যে এক প্লাটুন পুলিশ ছিল, তারা সবাই চোখ বুজে শুয়ে ওপরের দিকে আড়াল দিয়ে সিগারেট টানছিল। আমরা চলে যাওয়ার পর তারা আকাশের দিকে ফায়ারিং শুরু করে অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে। তাদের ফায়ারিংয়ে নিউ ইয়ার উৎসবের আতশবাজির মতো আলোকিত হয়ে গিয়েছিল ঢাকার আকাশ। চারদিকে যেমন ছিল গুলির শব্দ, তেমনি আকাশে ছিল আলোর ঝলকানি। রেললাইনে, মোনায়েম খানের বাড়ির পশ্চিম পাশের ময়মনসিংহ রোডে এবং গুলশানেও গুলির শব্দ শোনা গেছে।
সমকাল : অপারেশনের পর কোথায় গেলেন?
মোজাম্মেল হক : অপারেশন শেষ করে আসার সময় আমার ভাতিজা ইস্রাফিল খন্দকারের (এখন উপ-সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ) দোকানের পাশে এসে দরজা নক করে আমি পানি পান করতে চাইলে তিনি আমাকে পানি পান করতে দেন। এরপর এয়ার ফোর্সের সার্জেন্ট আমার জ্যাঠাতো ভাইয়ের কাছে স্টেন দেওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম মোনায়েম খানের সেই দু'জন কর্মচারী মোখলেছুর ও শাহজাহান, আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীক, আমার বাবা, মা সবাই আমার চারপাশে বসা। তারা আমাকে রূপগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বললেও আমি যেতে রাজি হলাম না। আমি বাড়িতেই থাকতে চাইলাম। বাংলা ঘরে আমি শুয়ে ছিলাম। সকালবেলা আমার দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কে? আমার জ্যাঠা মালেক মাস্টারের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, রাতে আকাম করে এসে এখনও ঘরে শুয়ে আছ? আমি বললাম, কেন কী হয়েছে? তিনি বললেন, মোনায়েম খান মারা গেছে। মিলিটারি এসে এখন আমাদের বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দেবে। মোনায়েম খানের মৃত্যুর কথা আমি জ্যাঠার কাছ থেকেই প্রথম শুনতে পাই।
সমকাল : তখন আপনিই যে অপারেশনের মূল নায়ক, সেটি জানাজানি হয়েছিল?
মোজাম্মেল হক : তখন এটা বাইরের কেউ জানত না। যুদ্ধের পর পুরানা পল্টনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গড়ে ওঠে। সেখানে মেজর হায়দার আমাদের একশ' টাকা সম্মানী হিসেবে দেন। সে অনুষ্ঠানে বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়। তিনি আমাকে জানান, পুরস্কারের তালিকায় আমার নাম আছে। পরে পত্রিকায় দেখলাম বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকায় আমার নাম আছে। এরপর বিষয়টি মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তখন থেকেই মানুষ ঘটনাটি জানতে পায়।
সমকাল : ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছিল কখন?
মোজাম্মেল হক : প্রত্যেকটা সেক্টরেই এরিয়াভিত্তিক একেকটি গেরিলা গ্রুপ অপারেশনে পাঠানো হতো। আমাদের পাঠানো হয়েছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ নাম দিয়ে। গ্রুপের সদস্যরা ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা। আমাদের গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৩ জন। আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন এমএ লতিফ। আমাদের অপারেশন করতে হতো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, বনানী ও গুলশানে। মেজর হায়দারের নেতৃত্বে ২ নং সেক্টরের আমাদেরটি ছিল ৭ নং গ্রুপ। জুন-জুলাইয়ের দিকে গ্রুপটি গঠন করা হয়।
সমকাল : ঢাকার কাছাকাছি প্রথম আপনারা আসেন কবে?
মোজাম্মেল হক : জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমরা প্রথম ঢাকায় ঢুকি। আমাদের ট্রেনিং হয়েছিল ভারতে। জুনে আমি ঢাকায় আসি। সরাসরি অস্ত্র ট্রেনিংয়ের আগে ইঞ্জিনিয়ার সিরাজের নেতৃত্বে ঢাকায় একটি গ্রেনেড অপারেশনের গ্রুপ পাঠানো হয়েছিল। সেই অপারেশনে আমি গুলশান অ্যাম্বাসিতে গ্রেনেড চার্জ করি। গ্রেনেড চার্জ করার পর আমাকে প্রশিক্ষণ শিবির মেলাঘরে নিয়ে যায়।
সমকাল : জুনে আপনারা রূপগঞ্জে এলেন। তখন ঢাকায় অপারেশনগুলো কীভাবে করতেন?
মোজাম্মেল হক : প্রতিনিয়তই আমরা ঢাকায় আসা-যাওয়া করতাম। এর মধ্যেই আমাদের অপারেশনগুলো হতো। আমাদের নিজস্ব নৌকা ছিল। বর্ষার সময় আমরা নৌকায় আসা-যাওয়া করতাম। রূপগঞ্জ তখন অনেকটাই মুক্ত এলাকা। সেখানে আমরা অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতাম। রূপগঞ্জ থেকে আমরা শহর এড়িয়ে আমাদের গ্রাম ভাটারা আসতাম, সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্ট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢুকে রেকি করতাম বা অপারেশনগুলো পরিচালনা করতাম।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবর যখন আপনি শুনলেন তখন আপনি কোথায়?
মোজাম্মেল হক : ১৫ তারিখ রাতে আমি ঘোড়াশাল কালীগঞ্জে ছিলাম। কালীগঞ্জে মামার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি রূপগঞ্জ থেকে হেঁটে আসি। ১৫ তারিখ রাতেই শোনা যাচ্ছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। ১৬ তারিখ বিকেলবেলা শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে মামার সঙ্গে আমি গল্প করছিলাম। এমন সময়ই আমি পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পাই।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবরটা আপনারা পেলেন কীভাবে?
মোজাম্মেল হক : হেলিকপ্টারে ছাড়া লিফলেটের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর জানতে পারি। সেই সন্ধ্যা রাতেই মামাদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে আমি ঢাকার দিকে রওনা হই। ১৭ তারিখ সকাল ৭-৮টার দিকে আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করি।
সমকাল : ঢাকায় আসার পথে মানুষের কী প্রতিক্রিয়া দেখেছিলেন?
মোজাম্মেল হক : আসার সময় দেখলাম সব মানুষ আনন্দে আত্মহারা। আনন্দ উদযাপন করতে গিয়েই অনেক মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইনে আহত হয়েছে।
সমকাল : ১৭ তারিখ সকালে ক্যান্টনমেন্টে এসে আপনি কী দেখলেন?
মোজাম্মেল হক : আমি ক্যান্টনমেন্টে এসে দেখি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অস্ত্র পড়ে আছে। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করি। চার-পাঁচটি গরুর গাড়ি ভর্তি অস্ত্র আমি আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। পরবর্তী সময়ে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমাদানের দিন দুই ট্রাক অস্ত্র আমি জমা দেই।
সমকাল : ঢাকা শহরে ঢুকে প্রথম আপনি কী দেখলেন?
মোজাম্মেল হক : শহরের সব মানুষের চোখ-মুখে ছিল মুক্তির আনন্দ। মানুষের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে।

No comments:

Post a Comment