Thursday, April 8, 2010

লাল শার্ট


থাইল্যান্ডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থকদের লাল শার্ট আন্দোলন সবাইকে একটু হলেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। থাকসিন সমর্থকদের প্রতিবাদ নতুন ব্যাপার নয়, মাঝে মাঝেই থাইল্যান্ডের রাস্তায় তাদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটে না। হতোদ্যম হয়ে আবারও ঘরে ফিরে যায় আন্দোলনকারীরা। এবারের ঘটনা একটু আলাদা, আন্দোলনকারীদের লাল শার্ট বেশ মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। মজার ব্যাপার হলো, লাল শার্ট পরা থাকসিন সমর্থকরা এর আগেও প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছেন। কিন্তু এবার যেন তাদের শার্টের রঙ একটু বেশি চোখে লাগছে সবার। বিক্ষোভের মাত্রা বেশি হচ্ছে বলে নাকি সমর্থকদের গলার জোর বেশি বলে কে জানে। নাকি এবার শার্টের রঙ একটু বেশি লাল। কারণ যাই হোক, সবাই একটু ভাবতে বসেছেন, লাল শার্ট তবে কী মানে বহন করছে? লাল রাজনীতিতে পরিচিত রঙ। বামপন্থিদের রঙ লাল। বামপন্থি লড়াকুদের লালফৌজ বলা হয় অনেক দেশে। আবার কোথাও তারা লাল পতাকা বাহিনী। কিন্তু লাল শার্ট কিছুটা অপরিচিত ধারণা। কিন্তু ইতিহাস বলছে, যতটা অপরিচিত মনে করা হচ্ছে ততটা অপরিচিত নয় লাল শার্ট। উপমহাদেশে লাল শার্ট আন্দোলন হয়েছিল সেই ব্রিটিশ দখলদারিত্বের সময়ে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নেতা খান আবদুল গাফফার খান পাঠানদের নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সমর্থনে খোদায়ী খিদমতগার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। আর এই আন্দোলনের কর্মীরা লাল শার্ট পরতেন। খান আবদুল গাফফার খানের অনুসারীদের মধ্যে মার্কসবাদের প্রভাব পড়া বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু থাকসিন সমর্থকদের মধ্যে মার্কসবাদ ভর করা একটু অবাক করার ব্যাপার বটে। আন্দোলন ও বিক্ষোভের অনেক রঙ আছে। দেশে দেশে কত রঙিন বিক্ষোভ হচ্ছে। কোথাও কমলা বিপ্লব, কোথাও বা সবুজ বিপ্লব। এই তো বছরখানেক আগে মিয়ানমারে হয়ে গেল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জাফরান আন্দোলন। ভিক্ষুরা মাঠে নেমেছিলেন তাদের চিরপরিচিত জাফরান রঙের পোশাক পরে। সামরিক জান্তা কঠোর হাতে সে বিক্ষোভ দমন করেছিল। কিন্তু মিয়ানমারের মানুষ ও প্রতিবেশীরা ভিক্ষুদের সেই জাফরান মার্চের কথা মনে রেখেছেন। এবার মিয়ানমারের কাছের দেশ থাইল্যান্ডে লাল শার্ট আন্দোলন চলছে। শুধু লাল শার্ট নয়, রক্তাক্ত আন্দোলন হচ্ছে রীতিমতো। প্রাণীরক্ত সংগ্রহ করে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় ঢেলে দিচ্ছেন। এ রক্তস্রোত নিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রী অভিজিতের বাসভবন পর্যন্ত গিয়েছেন। রক্ত দিয়ে প্রতিবাদলিপি তৈরি করেছেন, কবিতাও লেখা হয়েছে রক্তাক্ত অক্ষরে। থাকসিন সমর্থকদের প্রতিবাদের ফল কী হবে তা বলা যাচ্ছে না এখনই। বোঝা যাচ্ছে না, তিনি এ প্রতিবাদের পর দেশে ফিরতে পারবেন কি-না। কিন্তু আপাতত আমাদের মনোযোগ শার্টের রঙের দিকে। সিনাওয়াত্রার দল থাই রাক থাই নিষিদ্ধ এখন। গ্রামীণ ও শহুরে গরিবদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও ইতিপূর্বে দলটির সঙ্গে বামপন্থার সংযোগ মেলেনি। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে সিনাওয়াত্রা ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসায়ীদের নিয়ে সংগঠন করেছিলেন। তার দলটি ক্ষমতায় এসে এশিয়ান অর্থনৈতিক সংকট থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্ত করেছিল। সুফল পেয়েছিল কৃষকরাও। এর ফল হিসেবে কৃষকদের সমর্থন পাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর সিনাওয়াত্রা সমর্থকরা লাল শার্ট পরে বিপ্লবী বনে যাবেন, এ মনে হয় একটু বাড়তি ভাবনা। বিশ্বের উৎসাহী লোকেরা ব্যাংককের লাল শার্টের বিপ্লবীদের দেখছেন। বোঝার চেষ্টা করছেন, এ লাল কেমন লাল। রঙ একটা ব্যাপার বটে। কিন্তু সব সময় রঙের মানে এক হয় না। তাতে অবশ্য ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই কিছু। কাজ হলেই হলো। এক রঙের শার্ট পরে যদি প্রতিবাদকারীরা শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, যদি তাদের ভড়কে দিতে পারে, যদি শাসকরা আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেয় তবে ক্ষতি কী? কিন্তু শার্টের লাল যদি সমর্থকদের মনকেও লাল করে দেয় তবে ভাবনার কারণ আছে। থাইল্যান্ডের লাল শার্টের লাল কতটা গাঢ় শেষ পর্যন্ত তা বুঝতে আরও কিছু সময় লাগবে, সন্দেহ নেই।

No comments:

Post a Comment