২২ ফেব্রুয়ারির টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, ভারতের 'সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনে'র কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক অফিসগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা যেন সিনেমার আইটেম সঙগুলোকে 'এ' ক্যাটাগরিভুক্ত করেন। 'এ' ক্যাটাগরিভুক্ত হলে আইটেম সঙগুলো অ্যাডাল্ট উপাদান হিসেবে গণ্য হবে। ফলে আইটেম গান আছে এমন চলচ্চিত্র শুধু প্রাপ্ত বয়স্করাই দেখতে পারবেন। তবে আইটেম গানের 'এ' প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে টিভিতে। টিভি যেহেতু সবাই দেখে, সেহেতু সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের সিদ্ধান্ত অনুসারে টিভিতে আইটেম সঙ প্রচার বন্ধ হয়ে যাবে। আইটেম সঙ ও মুভি নির্মাতাদের জন্য এটি দুঃসংবাদ নিঃসন্দেহে। কেননা আইটেম সঙের জনপ্রিয়তা টিভিই তৈরি করে। টিভিতে গান দেখেই দর্শকরা হলে যান সিনেমা দেখতে। টিভিতে প্রচার বন্ধ হলে যে এর প্রভাব হলেও পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য সেন্সরের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের করারই-বা কী আছে? সাম্প্রতিক সময়ে আইটেম সঙগুলো এতটাই দুষ্ট হয়ে উঠছিল যে, এগুলো নিয়ন্ত্রণের একটা উপায় বের করা খুব দরকারি হয়ে পড়েছিল। মুম্বাইয়ের সিনেমার দর্শকমাত্রই জানেন আইটেম সঙ কী বস্তু। সিনেমার কাহিনীর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই সাধারণত থাকে না। রসাল গান, ইঙ্গিতপূর্ণ লিরিক বিখ্যাত কোনো নায়িকাকে দিয়ে রসাল ভঙ্গিতে পরিবেশন করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ভালো-মন্দ নির্বিশেষে মুম্বাইয়ের সিনেমায় আইটেম গানের একটা বিশেষ জায়গা তৈরি হয়েছে। উইলিয়াম শেকসপিয়রের ওথেলো অবলম্বনে তৈরি ওমকারার মতো বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমায় যেমন আইটেম সঙ আছে, তেমনি এমনও সিনেমা আছে যাতে একটা হিট আইটেম সঙ ছাড়া বিশেষ আর কিছুই থাকে না। সে গানের জোরেই সিনেমা হিট এমনকি সুপারহিট হয়ে যায়। সাধারণত যেসব হিন্দি গান সচরাচর চারদিকে বাজতে শোনা যায় সেগুলো আইটেম গানই। এগুলোকে আইটেম নম্বরও বলা হয়। বিনোদনপিয়াসী দর্শকরা মুভিতে কয়টি আইটেম নম্বর আছে সে হিসাব জেনে নিয়েই হলে ঢোকেন। যে নায়িকারা আইটেম গানে অংশ নেন তারা আইটেম গার্ল। আইটেম গার্লদের পারিশ্রমিক বেশি। একটা আইটেম গানে অংশ নিয়েই তারা বড় সম্মানী পান। আইটেম গানের বাজার মূল্যের কারণে মুভি নির্মাতারা একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলছিলেন। আর তাই লাগামটা টানা হলো। এখন নিশ্চয়ই মুভি নির্মাতারা সতর্ক হবেন। বোম্বে সিনেমার হুম্মা হুম্মা, দিল সের ছাইয়া ছাইয়া, বান্টি আউর বাবলির কাজরা রের মতো গান যদি আর তৈরি না হয় তবে দর্শকদের জন্য তা দুঃখের ঘটনাই হবে। আইটেম সঙের এই আকস্মিক অন্তর্ধান নিয়ে কভার স্টোরি প্রকাশ করেছে আউটলুক পত্রিকা। আইটেম গানের পূর্বাপর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন তারা। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কেন আইটেম সঙ নিয়ন্ত্রণের জন্য সার্টিফিকেশন বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছে, তা জানা গেল আউটলুক থেকেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করে, নারী নির্যাতন বাড়িয়ে দিচ্ছে আইটেম সঙ। বলিউডের ডিরেক্টর দিবাকর ব্যানার্জির মতে, সমাজের আরও বড় বড় সমস্যার দিকে না তাকিয়ে আইটেম সঙকে দোষারোপ করে এর সমাধান হবে না। পিতৃতন্ত্র, সামন্ততন্ত্রসহ নানা সমস্যাই তো আছে। সেগুলোর সেন্সর কে করবে? অন্যদিকে রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা মনে করেন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটাই নেওয়া হয়েছে। আইটেম সঙ সিনেমার জন্য নেতিবাচক। মুম্বাইতে একটি মত প্রবল হয়ে উঠছে যে, বহু বছরের চর্চায় এখানকার সিনেমা-সংস্কৃতি যথেষ্ট পরিপকস্ফ। কিন্তু গানসহ কিছু মেলোড্রামাটিক উপাদান মুম্বাইয়ের সিনেমার অগ্রযাত্রার পথে বাধা। একটা বাঁধা ছকের বাইরে সিনেমাকে বের করে নিয়ে আসার জন্য বাজার মাত করার সনাতন পদ্ধতিগুলো থেকে বের হয়ে আসা উচিত। আইটেম সঙ বন্ধ হলে, সে পথ যে খুলে যাবে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দর্শকরা কী করবেন। বিনোদন যাদের মূল লক্ষ্য তারা 'এ' পাওয়া সিনেমাগুলো দেখবেন হয়তো। কিন্তু যে সিনেমা শুধু আইটেম গানের জন্য 'এ' পেল সে সিনেমা পরে সর্বার্থে এ পাওয়ার চেষ্টা করবে না তো?
Thursday, February 28, 2013
Friday, February 22, 2013
ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং
বিখ্যাত এক লেখক স্মৃতিকথায় জানিয়েছিলেন, আজ ভ্যালেন্টাইন বলতে যেমন আয়োজন বোঝায়, তেমনটা তারা কৈশোরে সরস্বতী পূজায় পেতেন। পড়াশোনার চাপের চেয়ে বেশি ছিল অভিভাবকদের চাপ। তাই পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে দেখা হওয়া দূরের কথা, ভালোমতো চোখাচোখিই হতে পারত না। সরস্বতী পূজার দিনে একটা স্বাধীনতা পাওয়া যেত। আর সেই অবকাশে মন দেওয়া-নেওয়া হয়ে যেত। এখন অবশ্য সেকালের মতো অত চাপ নেই। এখন ভালোবাসার জন্য বছরভর অপেক্ষার বালাই নেই। ফেসবুকে বা সেলফোনে স্রেফ মনের কথা জানালেই হলো। যুগ বদলেছে। বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দিবসও তৈরি হয়েছে। যেমন, পহেলা ফাল্গুন ও ভ্যালেন্টাইনস ডে। বৈশাখের প্রথম দিনের মতো বসন্তের প্রথম দিনটি বেশ ঘটা করেই পালিত হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। বাংলাদেশে বাংলা সনের যে ক্যালেন্ডার, তাতে বসন্তের দ্বিতীয় দিনেই ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস। এবার তৃতীয় দিনে পড়েছে সরস্বতী পূজা। পরপর তিন দিনের উৎসব। অবশ্য ঢাকায় এখন অন্য বসন্ত। অনেকে একে বাংলা বসন্ত বলে ডাকছেন আরব বসন্তের অনুকরণে। শাহবাগের প্রতিবাদে পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস সব ম্লান হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের চোখও এখন শাহবাগে। তরুণরাও সেখানে। ফলে, আলাদা করে পালন করার অবকাশ না রেখে প্রতিবাদের মেলবন্ধনেই সব পালিত হচ্ছে। এবার অবশ্য ভ্যালেন্টাইস ডে একটু ভিন্নমাত্রায় পালিত হওয়ার কথা ছিল। ১৫ তারিখের বিদেশি সব পত্রপত্রিকা জুড়ে ওয়ান বিলিয়ন রাইজিংয়ের সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। পাশের দেশ ভারত-শ্রীলংকাতেও ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং পালিত হলো দারুণ উৎসাহে। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জমজমাট আয়োজনের তেমন ছবি চোখে পড়ল না। যা হলো তাকে রুটিন কর্মসূচির বাইরে কিছু বলা যায় কি-না, সে প্রশ্নও থাকল। অথচ এ আন্দোলনের উদ্যোক্তা ঈভ এন্সলার ক্যাম্পেইন নিয়ে ঢাকা ঘুরে গেছেন গত মাসেই। ঈভ ও তার সহকর্মীরা দাবি তুলেছিলেন, এবারের ভ্যালেন্টাইন ডে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হোক। শুধু ফুল, ক্যান্ডি আর উপহার নয়। বিশ্বব্যাপী নারীর ওপর যে নির্যাতন চলছে , তার বিরুদ্ধে পথে নামুক এক বিলিয়ন মানুষ। ভালোবাসা জানানোর সঙ্গে পুরুষরা কথা দিক_ নারীর পাশে থাকবে। নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। প্রস্তাবটা দারুণ। আমাদের নারী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এ প্রস্তাব নিয়ে শাহবাগে গেলে সাড়া নিশ্চয়ই পড়ত। কিন্তু তেমন হলো না। অবাক হয়ে দেখছিলাম, বিশ্বব্যাপী ওয়ান বিলিয়ন রাইজিংয়ের কর্মসূচি। বিপুল উৎসাহে নেচে-গেয়ে সমবেত হয়ে নারীরা পালন করছেন ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং। নারীদের সঙ্গে মিলে পুরুষরাও একত্র হয়েছেন। এমন ভালোবাসা দিবসই তো দরকার। এমনিতেই ভালোবাসা দিবস যার যার কাছে তার তার মতো। কারওটা কারও সঙ্গে মেলে না। কেউ হয়তো ভালোবাসা বলতে বোঝেন নর-নারীর সম্পর্ককে। কেউ সেটিকে পারিবারিক, সামাজিক এমনকি দেশের প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত করেন। ফলে, একেক বছর যদি একেকভাবে দিবস পালনের প্রস্তাব আসে, মন্দ হয় না। অন্তত, গতানুগতিকতার বাইরে অন্য তাৎপর্য তৈরি হয় তাতে। গতানুগতিকতা কী? যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক ম্যাগাজিন যে তথ্য দিয়েছে, তা শিউরে ওঠার মতো। তারা জানাচ্ছে, এ বছর ভ্যালেন্টাইন ডেতে শুধু আমেরিকাতেই খরচা হয়েছে কুড়ি বিলিয়ন ডলার। এ খরচার বড় অংশ গেছে বাইরে খেতে গিয়ে। প্রায় সাড়ে নয় বিলিয়ন ডলার। বাকি খরচ গেছে কার্ড, ক্যান্ডি, ফুল, পোশাক, অলঙ্কার ইত্যাদি খাতে। খরচাটা দিন দিন বাড়তির দিকে গড়াচ্ছে। আমাদের দেশে কী হচ্ছে, সে হিসাব আপাতত নেই। কখনও হবে_ এমন আশাও নেই। তবে, আমেরিকার হিসাব দেখে কিছু অনুমান করে নেওয়া চলে। কিন্তু অনুমানে কি পুরো তুষ্টি আসবে? অনুমান না পোষালে অবশ্য আমরা একটা হাজারো, লাখো বা কোটি শব্দ জুড়ে দিতে পারি। আপত্তি নেই তাতে কারও। সঠিক পরিসংখ্যান যখন
নেই, তখন তো অনুমানেই কাজ চালাতে হয়।
নেই, তখন তো অনুমানেই কাজ চালাতে হয়।
Saturday, January 12, 2013
ঐতিহাসিক শীত
ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, 'শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?' কবির ইচ্ছা_
শীতকাল এলে তিনি তিন মাস ঘুমিয়ে থাকবেন। শীতনিদ্রা যাপন করবেন, আলস্য যাপন
করবেন ব্যাঙের মতো। আমাদের দেশ শীতপ্রধান নয়, বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাসের
শীতেই এখানে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসে। রাস্তাঘাটে ভিড় কমে যায়, সকাল ও
সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে চলাচল কমে যায়। শীত এখানে মূলত আলস্যপ্রধান ঋতু।
শীতপ্রধান দেশগুলোর থেকে চিত্রটা একেবারেই আলাদা। যেখানে বছরভর শীত সেখানে
লোকের আলাদা করে শীতের প্রস্তুতির দরকার পড়ে না। শীত উপলক্ষে জনজীবনে বিশেষ
স্থবিরতাও নেমে আসে না। তুষারপাত, তুষারঝড়ে কিছু সমস্যা হয়। তাপমাত্র
মাইনাসে নামতে নামতে এমন পর্যায়ে পেঁৗছায় যে বাধ্য হয়ে বাইরের কাজ বন্ধ করে
দিতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশের মতো অল্প শীতে তারা কাতর হয় না। অবশ্য শীতে
কাতর না হওয়ার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। শীতপ্রধান দেশগুলো শীতের হাত
থেকে স্থায়ীভাবে বাঁচতে নানা ব্যবস্থা তৈরি করে নিয়েছে। তাদের অফিস, আদালত,
বিপণি বিতান, বাড়িঘর, যানবাহন_ সবই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সেন্ট্রাল হিটিং
সিস্টেমের বাইরে খুব কম সময়ই তাদের থাকতে হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার
সঙ্গে আমাদের বিশেষ পরিচয় আছে কি? আতপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে।
শীতকালে কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধই থাকে। অর্থাৎ শীত
নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তার জানা নেই। সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেমের কোনো উদাহরণ
পাওয়া যায় না। ফলে স্বল্পকালীন শীত কোনোরকমে শীতের কাপড়ে পার করে দেওয়াই
এখানে রেওয়াজ। শীত নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা এখানে বাস্তবসম্মতও হয়তো
নয়। এ বছর শীত পড়েছে বেশ, কিন্তু গত কয়েক বছরে শীত ততটা পড়েনি।
উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বছরের কিছু সময় তীব্র শীত পড়ে। জনজীবন বিপর্যস্ত
হয় তাতে, শীতার্ত মানুষের মৃত্যুও ঘটে। কিন্তু অনেক স্থানে শীত এসেই বলে
যাই। শীতের কাপড় নামাতে নামাতেই তুলে ফেলতে হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। তখন
অনেকেই শীতে কবির মতোই উচ্চারণ করেছেন, শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা? এবার শীত
একটু বেশিই পড়েছে। পত্রিকা বলছে এমন শীত গত চলি্লশ বছরে পড়েনি। সেদিক থেকে এ
শীত ঐতিহাসিকও বটে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। লোকে শীতে কাতর
হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। শীতের সময় শীতার্ত মানুষের কাছে
শুধু শীতের কাপড় নয়, প্রয়োজনীয় খাবার পেঁৗছানোও জরুরি। কেননা, প্রবল শীতে
শরীর দ্রুত তাপ হারাতে থাকে, প্রয়োজনীয় ক্যালরি তৈরি না হলে শরীর দুর্বল
হতে হতে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। শীতের এই তীব্রতায় অনেকের মনেই প্রশ্ন
উঠেছে, এবার এমন শীত পড়ল কেন? কেউ কেউ বরফ পড়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করছেন। বলা
হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় শীতের তীব্রতা। বিগত
বছরগুলোতে শীত কম পড়ার পর প্রশ্ন উঠেছিল, কেন এমন হলো। তখনও বলা হয়েছিল,
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এসব ঘটছে। দুই ক্ষেত্রেই নিশ্চয়ই জলবায়ু
পরিবর্তনই দায়ী। কিন্তু এমন শীত তো আমাদের দেশে নজিরবিহীন নয়, অতীতে যখন
এমন শীত পড়েছে তখন এবার পড়তে দোষ কী? আমাদের সমুদ্র আছে, সমুদ্র থাকলেই
জলোচ্ছ্বাস, ঝড়-তুফান থাকবে। একে মেনে নিয়েই দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে।
আমাদের শিয়রের কাছে হিমালয় পর্বতমালাও আছে। হিমালয়ের পাদদেশের সব দেশেই তো
বরফ পড়ে। আমরা একটু দূরে বলে বরফের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছি। তাই বলে শীত
মেনে নিতে পারব না? শীত আমাদের জলবায়ুতে সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নাকি এ নিয়ে
দুশ্চিন্তা শুরু করা দরকার, তা নিয়ে নিশ্চয় আবহাওয়াবিদরা কোনো নির্দেশনা
দেবেন। আপাতত, নগদে আমরা শীতকেই পাচ্ছি। আসুন, আমরা শীত মেনে নেই। সাবধান
থেকে একে উপভোগ করি। যারা কষ্টে আছেন খাবার ও বস্ত্র নিয়ে তাদের কাছে যাই।
Friday, January 4, 2013
অতিথি সৎকার
বাঙালি সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত তার মধ্যে একটি হলো বাঙালির মতো
অতিথিবৎসল জাতি খুঁজে পাওয়া ভার। বাঙালি কতটা অতিথিপ্রিয় তা নিয়ে নানা
রসিকতাও প্রচলিত। বিশেষত কলকাতার বাঙালিদের অতিথিবাৎসল্য নিয়ে বাংলাদেশের
বাঙালিরা প্রায়ই রঙ্গরস করেন। এই রঙ্গরস দেখে মনে হয় বিপুলসংখ্যক বাঙালি
হয়তো ততটা অতিথিবৎসল নাও হতে পারেন। তবু অতিথিবৎসল বলে বাঙালির খ্যাতি।
বাঙালির ভাষা অবশ্য তার অতিথিবাৎসল্যের পক্ষে যুক্তি দেয় না। ইংরেজি ভাষায়
অতিথির প্রতিশব্দ গেস্ট, আর যিনি আতিথ্য দান করেন তার প্রতিশব্দ হোস্ট।
মজার ব্যাপার, বাঙালির অভিধানে হোস্ট শব্দটির প্রতিশব্দ নেই। যিনি আতিথ্য
দান করেন বললে ঘুরিয়ে বলা হয়। অনেকে আপ্যায়ক বলতে চান। কিন্তু হোস্ট
শব্দটির সমার্থক কোনো একক বাংলা শব্দের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। তাহলে
বাঙালির অতিথিবাৎসল্যের ভাষাগত প্রমাণ কী? একথা ঠিক, বাংলায় অনেক বিদেশি
শব্দ ঢুকেছে। মজার ব্যাপার, গেস্ট শব্দটি যতটা সহজে ব্যবহৃত হয় তত সহজে
হোস্ট শব্দটির ব্যবহার হতে দেখা যায় না। ফারসি থেকে বাংলায় এসেছে মেহমান।
বাংলাভাষাভাষী মানুষরা মেহমান শব্দটিও বেশ ব্যবহার করেন। কিন্তু মেজবান
অর্থাৎ হোস্ট শব্দটির ব্যবহার এ দেশে নেই। বাংলাদেশের অল্প কিছু অঞ্চলে
মেজবান শব্দটির ব্যবহার আছে। কিন্তু ব্যাপক অর্থে মেজবান শব্দটি প্রচলিত
হয়নি। তবে কি বাঙালি নিজেকে অতিথি হিসেবে দেখতেই পছন্দ করে, আতিথ্যদানকারী
হিসেবে নয়? আর সে জন্যই কি ভাষায় এক কথায় প্রকাশযোগ্য কোনো শব্দই তারা তৈরি
করেনি? এ নিয়ে নিশ্চয় সমাজতাত্তি্বক ও ভাষাতাত্তি্বকরা কিছু বলতে পারবেন।
আপাতত অতিথি সেবা নিয়ে বাঙালির সংস্কৃতিই আমাদের আলোচ্য। অতিথি সেবায়
বাঙালির কুকীর্তির তালিকা দীর্ঘ। যেসব মাইগ্রেটরি বার্ড শীতপ্রধান দেশ থেকে
বাংলাদেশে আসে তাদের আদর করে বাঙালি অতিথি পাখি বলে ডাকে। মুসাফির
পাখিগুলোকে অতিথি পাখি বলা হচ্ছে তা নিশ্চয় ভালো। কিন্তু আতিথ্য তো দিতে
হবে। কিন্তু আতিথ্যের দিকে তেমন মন নেই বাঙালির। তারা অতিথি নিধনে ওস্তাদ।
সম্প্রতি অতিথি নিধন ও সৎকারের নানা খবর দেখে মনে হয়, আতিথ্য ব্যাপারটাই এ
দেশে দুর্লক্ষ্য। বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক অভিধানে সৎকার শব্দটির যেসব
অর্থ দেওয়া আছে সেগুলো হলো সম্মান, সমাদর, খাতির সেবা। সৎকারের আরেক অর্থ
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, মৃতদেহের শেষকৃত্য। বাঙালি সম্মান বা সমাদর অর্থে পাখির
সৎকার করছে বলে মনে হয় না। তারা শেষকৃত্য অর্থেই সৎকার চালাচ্ছে। এমন ঘটলে
যে অতিথি আসবে না তা বলাই বাহুল্য। ফলে বাঙালিকে আতিথ্যদানের রীতিটা রপ্ত
করতে হবে। পাখিদের দিয়ে শুরু হোক, পরে মানুষের কথা ভাবা যাবে।
Friday, December 21, 2012
গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্র :: মাহবুব মোর্শেদ
তেল ও জল যে কারণে
মিশ খায় না,
ঠিক একই কারণে গণতন্ত্রের
সঙ্গে রাজতন্ত্রের মেলবন্ধন ঘটার কথা নয়। শাসন-রীতি হিসেবে দুটি পরস্পরবিরোধী। রাজা বা রানী থাকলে গণতন্ত্র থাকার কথা নয়। আবার গণতন্ত্র থাকলে রাজা-রানী থাকার কথা নয়। কিন্তু পৃথিবীর নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে এও এক বৈচিত্র্য যে, একই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্রও মিলেমিশে পারস্পারিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই টিকে থাকতে পারে। এমন বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্রিটেন বোধ হয় শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহুল প্রশংসিত। বিশ্বব্যাপী একে আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা হয়। আর রাজতন্ত্রের বেলাতেও ব্রিটেন আদর্শ। এমন আড়ম্বড়পূর্ণ, বহুল আলোচিত রাজতন্ত্রও
বোধ হয় পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া ভার। ব্রিটিশরা বহু পূর্বে
তেল ও জল আলাদা পাত্রে রাখার ব্যবস্থা করেছে। রাজারটা রাজাকে, গণতন্ত্রেরটা
মন্ত্রিসভাকে বিলি-ব্যবস্থা করে দিয়েছে। শাসন,
প্রশাসন ও পরিচালনার
সঙ্গে রাজা-রানীর সম্পর্ক নেই। সেসব কাজ করেন নির্বাচিত
জনপ্রতিনিধিরাই। রাজতন্ত্রের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও, আনুষ্ঠানিকতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। রাজতন্ত্র ব্রিটিশদের কাছে চলমান রূপকথা। গণতন্ত্রের সুখ ও স্থিতিকে
রূপকথার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে তারা। রানীর সিংহাসনে আরোহণের
ষাট বছর পূর্তি তারা এমনভাবে পালন করে যে, দুনিয়া পুরনো সাম্রাজ্যের স্মৃতি মনে করতে বাধ্য হয়। আবার রাজপরিবারের ছেলেমেয়ের বিয়ে এমন ঘটা করে পালন করে যে, দুনিয়া রুদ্ধশ্বাসে তা দেখতে বাধ্য হয়। প্রিন্স আর প্রিন্সেসদের নিয়ে মিডিয়া সবসময়ই সরগরম। প্রিন্সেস কেট সন্তানসম্ভবা হয়ে কিছুদিন আগেই মিডিয়াকে একদফা নাড়া দিয়েছেন। বিষয় দেখে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের যেমন হলিউডের রূপকথার জগৎ, যুক্তরাজ্যের তেমনি রাজতন্ত্র। রাজপরিবার একদা সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করত, এখন সে পরিবারের অনেক সদস্য জনগণের হৃদয়-সম্রাট হওয়ার সাধনায়
রত। প্রিন্সেস ডায়ানার কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ
করা যায়। তবে, হৃদয়-সম্রাট হয়েও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাদের কখনও লিপ্ত হতে দেখা যায় না। কেননা,
আনুষ্ঠানিক রাজতন্ত্রের
আনুষ্ঠানিকতায় ক্ষমতা কম নয়। ব্রিটেনে রানীর ভূমিকা
আনুষ্ঠানিক। রানী এলিজাবেথ কাগজে-কলমে রাজ্যের সাংবিধানিক
প্রধান। শুধু ব্রিটেন নয়, সার্বভৌম ১৬টি রাজ্যের প্রধান তিনি। ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ সংঘেরও প্রধান তিনি। আর রানীই চার্চ অব
ইংল্যান্ডের সুপ্রিম গভর্নর, বিশ্বাসের রক্ষক। বলতে গেলে ধর্মীয় দিক থেকেও তিনি প্রধান ব্যক্তি। এমন একজন ব্যক্তি আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে থাকলেও শাসনকার্যে নাক
গলাবেন না-
তা কি হয়? আমাদের দেশে হয়তো হয় না, কিন্তু ব্রিটেনে হয়। হয় বলেই,
গণতন্ত্রের সঙ্গে রাজতন্ত্রের মৌতাত চলছে প্রশুহীনভাবে। রীতি অনুসারে রানী কখনোই মন্ত্রিসভার বৈঠকে যান না। এবার একটু ব্যতিত্রক্রম ঘটল। ১৭৮১ সালের পর প্রথম কোনো রাজা বা রানী মন্ত্রিসভার বৈঠকে গেলেন। ব্রিটেনে রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে একটা বৈপরীত্য আছে। রাজতন্ত্র যেখানে আড়ম্বর আর আনুষ্ঠানিকতায়
ভরা, গণতন্ত্র সেখানে ততটাই অনানুষ্ঠানিক আর সাধারণ। রানী মন্ত্রিসভায় গেলে কী ঘটে- সে দৃশ্যটা দেখার জন্যই টেলিগ্রাফ পত্রিকার
অ্যালবাম দেখছিলাম। ১০ নম্বর ড্রাউনিং স্ট্রিটে কোনো সাজ সাজ
রব নেই। রানী এলিজাবেথ আসবেন, না হরিপদ কেরানী আসবেন, তা ১০ নম্বরের সাদামাটা দরজাটি দেখে বোঝার
উপায় নেই। একান্তই রানী আসবেন, তাই খুঁজে পেতে একটা লালগালিচা বিছানো হয়েছে। নীল পোশাকে সজ্জিত রানীকে ১০ নম্বরের গোড়ায় মাথা নুইয়ে স্বাগত
জানালেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ভেতরে নিয়ে মন্ত্রীদের
সঙ্গে পরিচয় করালেন। তারপর সোজা মন্ত্রিসভার বৈঠক। সেখানে রানীর জন্য নেই কোনো সিংহাসন; চেয়ারে নেই আলাদা কোনো আড়ম্বর। সবার চেয়ার সমান। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারও আর সবার মতো। আর সে চেয়ার একদিকে আলাদা করে বসানোও নয়। অল্প আলাপ-আলোচনার পর মন্ত্রীরা তাকে উপহার দিলেন, একসঙ্গে বসে ছবি তুললেন। ব্যস। পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম
হেগ এবার রানীকে বিদায় জানাতে বেরুলেন ১০ নম্বর থেকে। এত বছর পর রানী এলেন মন্ত্রিসভায়, কিন্তু কোনো আড়ম্বর ছাড়াই সব শেষ হয়ে গেল। তারপরও গণমাধ্যম বলছে, রানীকে উষষ্ণ আতিথেয়তা দিয়েছে মন্ত্রিসভা। উষষ্ণতা কি তাহলে তাদের হৃদয়ে ছিল? হতে পারে। আমাদের দেশে এমন সাদামাটা দৃশ্যই রূপকথার মতো শোনায়। সিংহাসন,
আড়ম্বর, আনুষ্ঠানিকতা, হায়ারার্কি, প্রটোকলের এমন বাড়বাড়ন্ত এখানে যে, মনে হতে পারে রাজতন্ত্র আমাদের নেই বটে কিন্তু প্রকৃত রাজতন্ত্র দেখতে হলে ব্রিটেন নয়, আমাদের দেশেই আসতে হবে।
Tuesday, December 18, 2012
হলুদ
পশ্চিমে হলুদ রঙকে কিছুটা নেতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়। হলুদ সেখানে বিবর্ণতার
প্রতীক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রঙ বলেও বিবেচিত। ইয়েলো জার্নালিজম
কথাটির উদ্ভব পশ্চিমে। কেন খারাপ সাংবাদিকতাকে ইয়েলো জার্নালিজম বলা হয়?
উত্তরে একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক বলেছিলেন, ইয়েলো জার্নালিজম ইয়েলো বলেই
ইয়েলো। বোঝা যায়, এ রঙটার প্রতিই এক ধরনের বিরাগ আছে। পশ্চিমে কেউ হলুদ
জামা পরে বেরোলে তাকে দর্শকদের কাছে ম্লান বলে মনে হতে পারে। রঙের যেমন
দেশকাল আছে, তেমনি রাজনীতিও আছে। সংস্কৃতিভেদে রঙের প্রতি মানুষের সাড়া
দেওয়ার ক্ষেত্রেও পার্থক্য আছে। আমাদের দেশে অপরাধী বা খারাপ লোকের কালো
হাত ভেঙে দেওয়ার স্লোগান ওঠে সচরাচর। কালো অমঙ্গলের প্রতীক এখানে? কালো
কীভাবে অমঙ্গলের প্রতীক হয়ে উঠল? এর পেছনে কোনো বর্ণবাদী ইতিহাস নেই তো?
সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ব্র্যান্ড কালার লাল। লাল বিপ্লবের রঙ, তাই এসব
দেশের পতাকায় লাল থাকবেই। যে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে লাল রঙের ব্যবহার
অবশ্যম্ভাবী। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও লালের দেখাদেখি ইসলামী বিপ্লবের দেখাও
মিলেছে নানা দেশে। সেসব দেশে সবুজের ছড়াছড়ি। সবুজ হয়ে উঠেছে ইসলামী
বিপ্লবের প্রতীক। ভারতীয় উপমহাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই রঙিন ভূখণ্ড। এখানকার
প্রকৃতিতে হাজারো রঙের খেলা। ধারণা করা যায়, অতীতে এ দেশে কালো রঙ নেতিবাচক
বলে বিবেচিত হতো না। সাদা, হলুদ, সবুজও নয়। যে হলুদ পাশ্চাত্যে নেতিবাচক
রঙ বলে বিবেচিত, এ দেশে তা রীতিমতো উৎসবের প্রতীক। আমাদের দেশে বিয়ের আগে
গায়ে হলুদ দেওয়ার রেওয়াজ। হলুদ এখানে জীবন ও উর্বরতারও প্রতীক। বিয়ে বা
জন্মসংক্রান্ত নানা আচারে হলুদের ব্যবহার সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। শুধু
বিয়েতেই নয়, নানা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে হলুদ রঙের ছড়াছড়ি পড়ে যায়।
ফাল্গুনের প্রথম দিন মেয়েরা হলুদ শাড়ি পরে বের হয়। ছেলেরাও কম যায় না। কেউ
হলুদ পোশাক পরে বেরোলে খুব উজ্জ্বল ও আনন্দিত মনে হয় তাকে। ফলে হলুদ এখানে
ইতিবাচক সংকেতই দেয়। কিন্তু আমাদের প্রকৃতিতে হলুদ কোথায়? দিগন্তজোড়া সবুজ
আমাদের আছে। ধানক্ষেত যখন পরিপকস্ফ হয়ে ওঠে, তখন হলুদাভ রঙ ধারণ করে বটে
কিন্তু সে তো ধানগাছের জীবনের অন্তিম অবস্থাকেই নির্দেশ করে। বসন্তে গাছের
পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যায়। নতুন কচি পাতা জাগে। হলুদ ফুলও তো ফোটে কত গাছে।
কিন্তু দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ কোথায় আমাদের দেশে? দিগন্ত বিস্তৃত
শর্ষেক্ষেতের মাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে কি এ প্রশ্ন করা সম্ভব? শীতকাল এলে
কি হলুদ রঙ না দেখে থাকা সম্ভব এই বাংলায়? শর্ষেক্ষেতে এখন ফুল ফোটার সময়।
ফুল মানেই শুধু বর্ণ নয়, গন্ধেরও মৌতাত। মৌমাছি শর্ষে ফুল থেকে মধু নিয়ে
মৌচাক ভরে ফেলে। আর বসন্তে সে মধুই হয়ে ওঠে মিষ্টি। মৌমাছি মধু নেয়,
কিন্তু মানুষ কী নেয়? হলুদ শর্ষে ফুল উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে। আর ক'দিন
পরেই যে উৎসবে উৎসবে মেতে উঠবে সবাই সে কথাই হয়তো এ রঙ বলে যায়। অবশ্য
শহরের জীবনে হলুদ কেন কোনো রঙই নেই। শহরে বসে বড়জোর চোখে শর্ষে ফুল দেখা
সম্ভব। চোখে শর্ষে ফুল দেখলে কি বিভ্রম হয়? যদি না-ই হবে তবে এমন কথা কেন
তৈরি হলো?
Wednesday, December 12, 2012
১২ ১২ ১২
কবি বলেছেন, নামে কী আসে যায়। গোলাপকে যে নামেই ডাকো, সে গোলাপই। সংখ্যার ব্যাপারেও হয়তো কবি বলতেন, সংখ্যাতেই বা কী আসে যায়। প্রতিটি দিনই সমান। প্রতিটি দিন সমান বললে তবু মন ভরছে না। কেননা, বিপুলা পৃথিবীর রহস্য অনন্ত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত গবেষণা যেমন এসব রহস্য ভেদ করতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তেমনি রহস্যাবৃত নানা পন্থাতেও লোকে রহস্যভেদের চেষ্টা করে চলেছে। গ্রহ-নক্ষত্র বিচার, রাশিফলের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা চলছে সমানে। গ্রহ-নক্ষত্র, রাশির মতো সংখ্যাতত্ত্ব নিয়েও মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। সংখ্যাতত্ত্বের প্রতি মানুষের অদম্য আকর্ষণের একটা চেহারা দেখা যাচ্ছে ১২-১২-১২ নিয়ে উন্মাদনায়। ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখটা সাজিয়ে ১২-১২-১২ লিখলে আকর্ষণীয় দেখায়। বিশেষ কোনো তারিখ মনে হতেই পারে। হিসাব অনুসারে এমন দিন এসেছিল ১৯১২ সালে। একশ বছর পর ২১১২ সালেও ফিরে আসবে এমন আরেকটি দিন। স্বাভাবিক নিয়মে এখন যারা বেঁচে আছেন, তারা ২১১২ সাল দেখে যেতে পারবেন না, যেমনভাবে ১৯১২ সালে বেঁচে থাকা কাউকে এখন খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। ১২-১২-১২ কি বিশেষ তারিখ? কী হয়েছিল ১৯১২ সালের ১২ ডিসেম্বর। ইন্টারনেট ঘেঁটে খুব আগ্রহী হওয়ার মতো ঘটনা জানা যাচ্ছে না। ১৯১২ সালের পৃথিবী আজকের মতো এতটা কাছাকাছি ছিল না। তথ্যপ্রযুক্তি না থাকার কারণে পৃথিবীতে কোথায় কী ঘটেছে, তা নিয়েও খুব বেশি তথ্য নেই। তবে এ দিনের বড় কোনো ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই। আজ বড় কিছু ঘটবে কি? পৃথিবীব্যাপী অনেক জুটি
আজ বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হবে। ১২-১২-১২কে স্মরণীয় করে রাখবে ভালোবাসার বন্ধন। চিকিৎসকরা সন্তান প্রসব করানোর অনুরোধ পাচ্ছেন। সংখ্যা নিয়ে মানুষের মাতামাতিতে সংখ্যাতাত্তি্বকদের দ্বারস্থ
হওয়া ভালো। সন্তান জন্মদান নিয়ে সংখ্যাতাত্তি্বকদের মত হলো, ১২-১২-১২ খুব সৌভাগ্যের দিন। এ দিনে জন্ম নেওয়া শিশুদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এমনকি এ দিনটি নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্যও শুভ। একটি জরিপ অনুসারে, ৭৫ হাজার জুটি আজ বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। এমনকি বিয়ে করা দম্পতিরাও এ দিনে নতুন করে বিয়ে করতে যাচ্ছেন। আমাদের দেশে শীতকাল এমনিতেই বিয়ের জন্য উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়। ১২-১২-১২ ম্যাজিকে বিয়ের সংখ্যাটা বেড়ে যাবে, সন্দেহ নেই। এরই মধ্যে দু'জন তারকার বিয়ে নিয়ে মিডিয়া সরগরম। একজন ক্রিকেটের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। আরেকজন জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী মোনালিসা। বিশেষ দিনে এই দুই বিয়েতে সবার শুভকামনা থাকবে। বিখ্যাত ভারতীয় সংখ্যাতাত্তি্বক ড. বিবেক চোপড়ার মতে, '১২-১২-১২ খুব তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১২-১২-১২ বা ১২-১২-২০১২ যোগ করলে ৫ ও ৯_ এ দুটি সংখ্যা পাওয়া যায়। এ দুটো সংখ্যা মঙ্গল ও চাঁদের প্রতীক। আমরা যদি ১ ও ২কে যোগ করি, তাহলে ফল মিলবে ৩। এটি বৃহস্পতির প্রতীক। ৫, ৯, ৩_ তিনটি সংখ্যাই সৌহার্দ্যপূর্ণ ও শান্তিময় বিশ্বজগতের পক্ষে যুক্তি নির্দেশ করে।' মায়া ক্যালেন্ডার অনুসারে, ২০১২ সময়ের শেষ বিন্দু। এ বছরই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। ধ্বংসের দিনক্ষণ একটি হিসাবমতে ২১ ডিসেম্বর। সে দিক থেকে ১২-১২-১২ অশুভ সংখ্যা বলে অনেকের মত।
এ দিন নিয়ে দুঃসংবাদের ভবিষ্যদ্বাণী আরও আছে। অস্ট্রেলিয়ার জ্যোতিষী জেসিকা অ্যাডামস সংবাদ মাধ্যমকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন, ১২ ডিসেম্বর ইন্টারনেট ব্যবহার বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে। মিডিয়াতেও ঘটতে পারে অশুভ কোনো ঘটনা। তিনি অনলাইন ডাটার নিরাপদ ব্যাক-আপ তৈরির জন্যও পরামর্শ দিয়েছেন।
এসব বিষয়ে বিবেক চোপড়ার মত হলো, 'এই তারিখে পৃথিবী ধ্বংস হবে না। আমরা আনন্দিত চিত্তে ও নিরাপদে ২০১৩কে বরণ করে নিতে পারব।' কিন্তু কেন এ তারিখটির প্রতি মানুষের অসীম আগ্রহ? বিবেক চোপড়ার মতো অনেকের মতে, লোকে আসলে অনেক দিনের ভিড়ে মনে রাখার মতো একটা দিন চায়। স্মরণীয় একটা দিনের সঙ্গে নিজের জীবনের ঘটনাবলিকে মেলাতে চায়। ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সঙ্গে মানুষ জড়াতে পারে ভাগ্যচক্রে। ক্যালেন্ডারের বিশেষ একটি দিনের সঙ্গে জড়াতে ভাগ্যযোগ লাগে না। স্রেফ পরিকল্পনা থাকলেই চলে। সে কারণেই ১২-১২-১২ নিয়ে এমন উন্মাদনা। এ দিনটি বিশেষ কি-না, তা দিন ফুরালেই বোঝা যাবে। কিন্তু দিন ফুরাবার আগেই গণমাধ্যমের কল্যাণে দিনটি বিশেষ হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ দিনটিকে ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়ে ফেলেছে। ১২-১২-১২ নিয়ে মানুষের উন্মাদনা ও আগ্রহ স্পর্শ করেছে বিখ্যাত গায়কদেরও। তারা নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে একটি কনসার্টের আয়োজন করেছেন। গাইবেন বনজোভি, ডেভ গ্রোল, বিলি জোয়েল, এলিসিয়া কি'স, ক্রিস মার্টিন, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, এডি ভেডার, রজার ওয়াটার্স, কেনি ওয়েস্ট, পল ম্যাককার্টনি। বিশাল আয়োজন নিঃসন্দেহে। এ আয়োজন থেকে পাওয়া অর্থ ব্যয় করা হবে হারিকেন স্যান্ডি-বিধ্বস্তদের সেবায়। মানুষের কল্যাণে মানুষের জন্য একটা উৎসব তৈরি হলো_ এও কি কম পাওয়া?
Subscribe to:
Posts (Atom)





