Sunday, July 22, 2012

ঊন-সাফল্য

কথাটি আন্ডারঅ্যাচিভার। বাংলা হতে পারে, ঊন-সফল। বলতে গেলে সাম্প্রতিক এক গণ্ডগোলের সূত্র এ শব্দটিই। ১৬ জুলাই টাইম ম্যাগাজিনের এশিয়া সংস্করণটির প্রচ্ছদে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। আন্ডারঅ্যাচিভার শব্দটির উপলক্ষ তিনিই। এই অভিধাটির নিচে লেখা হয়েছিল, 'ভারতের এখন দরকার একটা কেঁচে গণ্ডূষ (রিবুট)। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কি সে কাজের যোগ্য ব্যক্তি?' অনেকেরই মনে পড়বে, টাইম ম্যাগাজিনের এশিয়া সংস্করণগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কার্টুন কাণ্ড নিয়ে মিডিয়ার তোপের মুখে তখন ম্যাগাজিনটি বিশ্বের ক্ষমতাধর শীর্ষ একশ'জনের তালিকায় মমতার নাম প্রকাশ করেছিল। সম্প্রতি তারা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কভার করেছে; বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারকে নিয়েও। নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রে টাইমের দৃষ্টিভঙ্গি উদার। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তিনি কতটা উদার এবং কাজের সেটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত উত্থানের স্টোরি ছাপিয়ে তাকে গ্গ্নোরিফাইও করার চেষ্টা করা হয়েছে প্রকারান্তরে। আর নীতিশ কুমারের উন্নয়ন কার্যক্রম, সফলতা ও পরিবর্তনের স্টোরিও যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। টাইমের এই ইন্ডিয়াপ্রীতিকে অবশ্য খুব সমাদর করেনি ভারতীয় মিডিয়া। কিছু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকলেও মিডিয়া সমানে ধুয়ে দিয়েছে টাইম ম্যাগাজিনকে। টাইম প্রকারান্তরে বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কে যাচ্ছে কি-না সে প্রশ্নও উঠেছে। ভারতের যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তাতে টাইম ম্যাগাজিন মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে কভার করলে কারও বাগড়া দেওয়ার নেই। সমালোচনা তো চলছেই, তাতেও বাগড়া দেওয়ার কেউ নেই। ফলে টাইমের উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে কথাবার্তা খোলাখুলি হচ্ছে। টাইম লিখেছিল, মোদি মিনস বিজনেস। পরিহাস করে বলা হচ্ছে, আসলে টাইম মিনস বিজনেস। নিউইয়র্কভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন মার্কিন মেইনস্ট্রিম বিজনেস পলিসির বড় সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক। বিশ্বের বহু প্রসঙ্গই তাদের নখদর্পণে। মোটামুটি প্রতি সংখ্যার চারটি সংস্করণের মাধ্যমে তারা পুরো বিশ্বের ইস্যুগুলোকে তুলে ধরে। কখনও কখনও সংস্করণের সংখ্যা বেড়েও যায়। এমন আন্তর্জাতিক একটি মিডিয়ার এশিয়া এডিশন এশিয়ার এত ঘটনা রেখে হঠাৎ করে ভারতের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে উৎসাহী কেন সে প্রশ্ন উঠবেই। উত্তর একটাই, ক্রমবর্ধমান বাজার হিসাবে ভারতের সম্ভাবনা। দ্বিতীয় কারণ, ভারতের রাজনীতি এবং অর্থনীতিও এখন কেন্দ্রীয় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। ছোট ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো কেন্দ্রকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে চলেছে। আর এটি তো সত্য যে, সামনের নির্বাচনে মমতা, মোদি, নীতিশ কুমাররা বড় নির্ধারকের ভূমিকায় থাকবেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীদের তোষণ করে খোদ দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে দুয়ো দেওয়া হবে_ এ কেমন কথা? মনমোহন সিং কি বিজনেস বোঝেন না? বলা হয়ে থাকে, নরসিমা রাওয়ের আমলে ভারতে যে উদারীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন মনমোহন সিং। প্রথম দফার প্রধানমন্ত্রিত্বে তিনি প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় এসে খানিকটা হতচকিত অর্থনীতি। রাজনৈতিক ক্ষমতা টলোমলো, দুর্নীতির নানা অভিযোগ, বৈশ্বিক মন্দা, নানামুখী চাপে অর্থনীতির অবস্থা বেসামাল। প্রবৃদ্ধিও নিম্নগামী। তিনি তো প্রত্যাশিত মাত্রায় সফলতা পাননি। সাম্প্রতিক সময়ে বহু সরকারপ্রধানই সফলতা পাননি। আমেরিকাকে পরিবর্তনের মিছিলে এনে খোদ বারাক ওবামাই কি সফল হতে পেরেছেন? সংস্কারের 'স'ও করতে পারেননি তিনি। চাকরি-বাকরির অবস্থা শোচনীয়। অর্থনীতি ঋণের চাপে কেরোসিন। তাহলে তো তাকেও আন্ডারঅ্যাচিভার বলা যায়।


এ কাজটিই করল ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিন। আউটলুক উদারপন্থি পত্রিকা, সাহসী সব লেখা প্রকাশ করার জন্য প্রশংসিত। এই পত্রিকাটি টাইমের প্রচ্ছদের জবাব দিল তাদের ৩০ জুলাই সংখ্যায়। বারাক ওবামার ছবিতে আন্ডারঅ্যাচিভার ট্যাগ লাগিয়ে পত্রিকাটি যুক্তরাষ্ট্রে রিবুটের প্রসঙ্গ তুলেছে। অনেকে বলছেন টিট ফর ট্যাট। কেউ বলছেন সাবাস। নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর মানরক্ষার জন্য নিশ্চয়ই আউটলুক মাঠে নামেনি। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা তারাও ছেপে থাকে নিয়মিত। আউটলুক যেটি করল তার মানে একটাই। আমরা সমানে সমান। তোমরা ওপর থেকে একতরফাভাবে কে ভালে,া কে মন্দ লিখবে_ সেটি আর হবে না। মূল্যায়নের ক্ষমতা আমাদেরও আছে। এটাই স্বাধীন গণমাধ্যমের কব্জির জোর।

Wednesday, July 18, 2012

রাস্তার তিন অবস্থা

কথায় আছে, সস্তার তিন অবস্থা। কথায় থাকলেও আমরা ঠিক জানি না তিন অবস্থা কী কী? অনুমান করি, সস্তা জিনিস গুণে-মানে এমনকি পরিমাণেও কমতি থাকবে। তবে বাজারে গিয়ে সস্তা জিনিসের কথা মনে হওয়ার জো নেই। কারণ এখন সবই দুর্মূল্য। মানহীন, ভেজাল, রাসায়নিক মিশ্রিত সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। তাই বাজারের প্রসঙ্গে সস্তা শব্দটি ইতিমধ্যেই তামাদি হয়ে উঠেছে। বরং রাস্তার প্রসঙ্গে এখন তিন অবস্থার প্রস্তাব করা যেতে পারে। ঢাকার বাইরের রাস্তা তো বটেই, ঢাকার রাস্তাঘাটের অবস্থাও এখন বেহাল। তাই বলা যায়, রাস্তার তিন অবস্থা। কিছুদিন আগে ঢাকার মূল সড়কগুলোর পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় ছিল। কিন্তু নানামুখী বৃহৎ ও ক্ষুদ্র উন্নয়ন কার্যক্রমে রাস্তার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কোথাও ফ্লাইওভারের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, কোথাও স্যুয়ারেজ পাইপ বসানোর খোঁড়াখুঁড়ি, কোথাও তার বসানোর খোঁড়াখুঁড়ি। সবই উন্নয়ন কার্যক্রম। উন্নয়নের জন্য খনন খুব দরকারি। কিন্তু খোঁড়া রাস্তাকে আগের মতো চলাচলযোগ্য করার কেউ নেই। ফলে বর্ষায় সেগুলো রীতিমতো রুক্ষ ও কর্কশ হয়ে উঠেছে। রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে বেরোলে এই কর্কশ বাস্তবতার মুখে পড়তে হবে। মূল সড়ক থেকে গলিতে ঢুকলে অন্য বাস্তবতা। গলি বা ছোট রাস্তার দায়িত্ব কার, কে জানে! অনেকগুলোই ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় একেবারে। আর অধিকাংশই এখন ভেঙেচুরে শেষ। ছোটখাটো গর্ত নয়, রাস্তার ভাঙন বড় বড় গর্ত সৃষ্টি করেছে। ভয়াবহতায় এগুলো ম্যানহোলের চেয়ে কম নয়, বরং একটু বেশিই। কোনো কোনো বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাতেও অবশ্য এখন এমন গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ছোট-বড় রাস্তার এসব গর্তে ট্রাক থেকে রিকশা সবই হেলে পড়ছে। হেলে পড়লেও রক্ষা নেই_ বর্ষা বলে নোংরা জল-কাদায় মাখামাখি হতে হচ্ছে পথচারীদের। বস্তুত গাড়িতে চলাফেরা করুন, কি রিকশায়_ প্রত্যেকের প্রতিদিনের চলাফেরার পথে উন্নয়ন কার্যক্রমে একটি-দুটি, আর অনুন্নয়ন কার্যক্রমের একটি-দুটি রাস্তার দেখা মিলবেই। নিত্যকার এ দুর্ঘট দেখে কীভাবে এড়িয়ে যান দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সেটিই প্রশ্ন। বৃষ্টির মৌসুমে পত্রপত্রিকায় রাস্তার তিন অবস্থার নানা ছবি ছাপা হচ্ছে, তবু সাড়া মিলছে না। কেউ কেউ পরিহাস করে বলছেন, কর্তাব্যক্তিরা বড় স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার পথে এগোচ্ছেন। হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা যখন মাথায় থাকে তখন বড় আইডিয়া মাথায় ঘোরে। ছোটখাটো গর্ত তখন চোখে পড়লেও হৃদয়ে পশে না। সত্যিই তো, রাস্তা ঠিক করার দায়িত্ব যাদের তারা তো বড় স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত। ফ্লাইওভার, পাতাল রেল, উড়ালপথ, বড় বড় সেতু, চার লেন মহাসড়ক। জগতের এই আনন্দযজ্ঞে ছোট রাস্তার কথা ভাববার সময় কোথায়? বড় রাস্তার ছোট গর্তের কথাই-বা কে ভাববে! তাই হয়তো নিয়তির মতো মেনে নিয়েছেন সবাই। কোথাও দাবি উঠছে না, মানুষ কষ্ট সয়ে এধার-ওধার করে রাস্তা পেরোচ্ছেন। গর্তে পড়ে জলকাদা মেখে চারপাশে তাকাচ্ছেন, কেউ কি দেখে ফেলল? মানসম্মানের প্রশ্ন। কেউ না দেখলে ঠিকই আছে। গর্ত থাকলে মানুষ. গাড়ি-ঘোড়া সবই পড়তে পারে। রাস্তা সারাবার আইডিয়া আর কারও মাথায় আসছে না। অবশ্য এর জন্য আইডিয়ার বিশেষ প্রয়োজন নেই। কিছু বরাদ্দ দিয়ে কাজ ভাগবাটোয়ারা করে দিলেই হয়। কিন্তু বরাদ্দ কি আছে? বরাদ্দের প্রশ্ন ওঠাতেই হবে। কেননা, গতবার ঈদের সময় বেহাল রাস্তা দিয়ে যখন লোকেরা বাড়ি ফিরতে পারছিলেন না তখন যোগাযোগমন্ত্রী বলেছিলেন বরাদ্দ নেই। সে নিয়ে কত কথা কাটাকাটি হলো! এবার বরাদ্দ আছে কি-না খোঁজ নিয়ে দেখা দরকার। যুক্তি অনুসারে বরাদ্দ থাকার কথা, রাস্তা খোঁড়ার জন্য যদি বরাদ্দ থাকে তবে খোঁড়া জায়গা মেরামতের বরাদ্দ নিশ্চয়ই পরের বছরের বাজেটে থাকবে না। তবে খোঁড়া মেরামতের কিংবা গর্ত মেরামতের বরাদ্দ না-ও থাকতে পারে। থাকবেই যদি তবে বরাদ্দ ব্যয়ের চিন্তা কারও মাথায় আসবে না কেন?

Thursday, July 12, 2012

বিচারক ও পুলিশ

নরসিংদীর ঘটনাবলি সকলের জানা। বিচারক মো. ইমান আলী শেখ আদালত প্রাঙ্গণে ঢুকতে গেলে তাকে বাধা দেন গেটে পাহারারত পুলিশ সদস্যরা। বিচারক তার পরিচয় জানান। তবুও তার পরিচয়পত্র দেখানোর জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন তারা। আবারও পরিচয় দিলে পুলিশ সদস্যরা বিচারককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। মারধর করে আহত করেন তাকে। যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নিই যে, পুলিশ সদস্যরা কর্তব্যে অতিশয় মনোযোগী। কাউকেই তারা পরিচয়পত্র ছাড়া আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা ওই আদালতে কর্মরত বিচারককে চিনবে না_ এটি কী করে মানা যায়? আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন তাদের, তেমনি বিচারকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনও তাদের দায়িত্ব। ধরে নেওয়া গেল, কোনো এক রহস্যময় কারণে বিচারককে তারা চেনেননি। তবে পরিচয় দেওয়ার পর তাকে সম্মান প্রদর্শন করে পথ ছেড়ে দেওয়া হলো না কেন? একাধিকবার পরিচয় দেওয়ার পর যখন পুলিশ সদস্যরা বিচারকের ওপর হামলে পড়লেন তখন তাদের গর্হিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে আর সন্দেহের অবকাশ থাকে না। বস্তুত একজন সম্মানিত বিচারককে তারা এভাবে অপমান করতে পারেন না, এমনকি কোনো সাধারণ নাগরিকের বেলাতেও এমন আচরণ করার অধিকার তাদের নেই। উচ্ছৃঙ্খল জনতা যদি কোনোভাবে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় সেক্ষেত্রে পুলিশের করণীয় থাকে। কিন্তু একা একজন ব্যক্তিকে ঠেকাতে বল প্রয়োগের উদাহরণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। অথচ এমন অন্যায্য বল প্রয়োগের ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে। অবশ্য নরসিংদীর বিচারক মারধরের ঘটনায় মামলা হয়েছে, দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিচারও চলছে। সে ঘটনার রেশ ফুরাতে না ফুরাতেই পুলিশের আরেক কর্মকর্তা হুমকি দিলেন জজকে। বরিশালের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছেন তার স্ত্রী। অপরাধ_ তিনি যৌতুক দাবি করেছেন। গুরুতর অপরাধ সন্দেহ নেই। বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রত্যাশিত কাজ করেছেন বিচারক মো. সাদিকুল ইসলাম তালুকদার। অভিযোগ গঠন করে আবুল কালাম আজাদসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন তিনি। এতে ক্ষেপে গেছেন এএসপি। তিনি বিচারককে বদলি করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বিস্ময়কর ঘটনা সন্দেহ নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন পুলিশ কর্মকর্তা কী করে একজন বিচারককে বদলি করে দেওয়ার হুমকি দিতে পারেন? পুলিশ সদস্যরা যদি আদালত প্রাঙ্গণে একজন বিচারকের ওপর হামলা করতে পারেন তাহলে একজন এএসপি নিশ্চয়ই বিচারককে বদলি করে দেওয়ার মতো ক্ষমতাও রাখতে পারেন। আর এ অবৈধ ক্ষমতা যার থাকে তিনি স্ত্রীর কাছে যৌতুকও দাবি করতে পারেন। স্ত্রী বিচারপ্রার্থী হলে তাকে অপহরণের হুমকিও দিতে পারেন। উদাহরণগুলো ভালো নয়। আমরা নিশ্চয়ই বলব না, পুলিশ সদস্যরা সবাই এভাবে এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে নিজেদের ক্ষমতা দেখাচ্ছেন। নিয়মানুবর্তিতার তোয়াক্কা করছেন না। ঊর্ধ্বতন বলে বিবেচিত সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিও তারা সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। একটি-দুটি ঘটনায় তা বলা যায় না। কিন্তু একের পর এক এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে কিন্তু এক সময় বলতে হবে। সে সময় যাতে না আসে এ জন্য এখনই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সচেতন হতে হবে। অপমান, মারধর ইত্যাদি হয়তো সাধারণ নাগরিকদের গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু বিচারকদের প্রতি অন্তত তারা প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শন করুক। দায়িত্ব পালনের কারণে বিচারককে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হুমকি দিলে আইনের শাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ঝুলিতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে কি?

Saturday, June 23, 2012

লক্ষ্মণ-রেখা

বাল্মীকি রামায়ণে লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ নেই। উত্তর ভারতে বহুল প্রচলিত রামচরিতমানসের অরণ্যকাণ্ডেও লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু রামচরিতমানের লঙ্কাকাণ্ডে রানী মান্দোদরী রাজা রাবণকে এই বলে তিরস্কার করেছেন যে, রাবণের বীরত্বের দাবি সম্পূর্ণ ফাঁপা। কেননা তিনি রামচন্দ্রের ছোট ভাই লক্ষ্মণের আঁকা ছোট একটি রেখা অতিক্রম করার সাহস পাননি। বস্তুত মূল রামায়ণে লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ না থাকলেও পরবর্তীকালের রামায়ণে অরণ্যকাণ্ডে লক্ষ্মণ-রেখার প্রসঙ্গ গুরুত্ব সহকারে উলি্লখিত হয়েছে। লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ পরবর্তীকালে বহুবার বহুভাবে হয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গণমাধ্যমকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আদালতের সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে গণমাধ্যম যেন লক্ষ্মণ-রেখার কথা বিস্মৃত না হয়। বস্তুতপক্ষে, ভারতে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে প্রায়ই লক্ষ্মণ-রেখার কথা উলি্লখিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যম, আদালত, সংসদ, আমলাতন্ত্রসহ সকলেরই নিজ নিজ এলাকা ও এখতিয়ার থাকে। এই চৌহদ্দি কোনো কারণে কেউ লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্রীয় আধুনিক রাষ্ট্রের সমতার নীতিতে ব্যত্যয় ঘটে। রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গ নিজের অতিরিক্ত শক্তি প্রকাশে প্রলুব্ধ হয়ে সফল হলে তাতে রাষ্ট্রের দুর্বলতা প্রকাশিত হয়। ফলে রাষ্ট্রের ব্যাপারে সীমা ও সীমা লঙ্ঘনের কথা মনে করিয়ে দিতে লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ ভারতে হরহামেশা দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের দেশে রামায়ণ কাব্য হিসেবে জনপ্রিয় হলেও এই মহাকাব্যে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ততটা পরিচিত নয়। তাই এখানে প্রাসঙ্গিক হলেও লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ সেভাবে দেখতে পাওয়া যায় না। রামায়ণে রাবণ যখন সীতাকে অপহরণের পরিকল্পনা আঁটেন, তখন তিনি রাক্ষস মারিচের সহায়তা কামনা করেন। মারিচ স্বর্ণমৃগের রূপ ধরেন। স্বর্ণমৃগ সীতার সামনে উপস্থিত হয়ে তাকে প্রলুব্ধ করে। সীতা রামচন্দ্রকে বলেন, তাকে ওই স্বর্ণহরিণ এনে দিতে হবে। রামচন্দ্র বুঝতে পারেন ওটি মায়ামৃগ এবং অশুভ সংকেত। তারপরও সীতার অনুরোধে তাকে ওই মায়ামৃগ অর্থাৎ মারিচের পশ্চাদ্ধাবন করতে হয়। হরিণের পিছু ধাওয়া করে যাওয়ার বহু পরেও যখন রামচন্দ্র ফিরছিলেন না তখন সীতা লক্ষ্মণকে বলেন, তিনি যেন ভাইয়ের খোঁজে বের হন। কিন্তু সীতার নিরাপত্তার দায়িত্ব লক্ষ্মণের। তিনি কীভাবে তাকে অরক্ষিত রেখে ভাইকে খুঁজতে যাবেন? সীতার নিরাপত্তার জন্য লক্ষ্মণ গৃহের চারদিকে একটি রেখা অঙ্কন করলেন। এই রেখা অতিক্রম করার চেষ্টা করলে যে কেউ আগুনে ভস্মীভূত হবে। লক্ষ্মণ-রেখার নিরাপত্তায় সীতাকে রেখে লক্ষ্মণ ভাইয়ের খোঁজে বের হলেন। লক্ষ্মণ চলে যাওয়ার পর ভিখারির বেশে রাক্ষসরাজ রাবণ সেখানে উপস্থিত হলেন এবং সীতার কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন। ভারতীয় ঐতিহ্যে অতিথি দেব ভবাঃ। অর্থাৎ অতিথি ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ফলে তাকে অগ্রাহ্য করা কঠিন। পুরাণকাররা বলেন, সীতা তখন অন্যমনস্ক ও উদ্বিগ্নও ছিলেন। ফলে লক্ষ্মণের নিষেধ বিস্মৃত হয়ে তিনি রেখাটি অতিক্রম করে ফেলেন। সীতা রেখার নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম না করে ভিক্ষা দিতে গেলে রাবণ তাকে বলেন, বেষ্টনীর ভেতরে থেকে ভিক্ষা দিলে দাতা সানন্দে ভিক্ষা দিচ্ছেন কি-না তা স্পষ্ট হয় না। এ কারণেও সীতা লক্ষ্মণ-রেখা অতিক্রম করে তাকে ভিক্ষা দিতে যান। সীতা লক্ষ্মণ-রেখা অতিক্রম করিবামাত্র রাবণ তাকে অপহরণ করেন। পুষ্পকরথে করে লঙ্কা নগরীতে নিয়ে অন্তরীণ করেন। সীতা অপহরণের পর রামচন্দ্রের লঙ্কা অভিযান শুরু হয়।

Thursday, June 14, 2012

আতিশয্য

আমরা কিছু ব্যাপারে বাড়াবাড়ি পছন্দ না করলেও অনেক কিছুতে আতিশয্য বেশ পছন্দ করি। উদাহরণ হিসেবে আসে শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রসঙ্গ। পৃথিবীব্যাপী শ্রদ্ধা নিবেদনের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। শহীদদের স্মরণের জন্য শহীদ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে ফুল বা মোমবাতি দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের রেওয়াজ সর্বত্রই প্রচলিত। নানা দেশের আচার দেখে সে সম্পর্কে কিছু ধারণা করা চলে। টেলিভিশনে দেখি, লোকে একটা ফুল বড়জোর এক গোছা ফুল হাতে করে স্মৃতিস্তম্ভে হাজির হয়। ফুলটুকু রেখে নীরবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে ফিরে আসেন। আমাদের দেশেও শ্রদ্ধা নিবেদনের রীতি আছে। শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধে আমরাও যাই। তবে এই যাওয়ার মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো 'যাত্রা' আছে কি-না সন্দেহ। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই_ হরেদরে আমরা সবাই মিছিল করে দলবল নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাই। একটি-দুটি ফুলে আমাদের প্রাণের নিবেদন সম্পূর্ণ হয় না। পারলে যেন বাগান উপড়ে নিয়ে যাই। বড় একটা ফুলের তোড়ায় সংগঠনের নাম লিখে হুড়োহুড়ি করে সেটি বেদিতে স্থাপন করতে গিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ লেগে যায়। শ্রদ্ধা নিবেদনের চাইতে ছবি তোলাটাই তখন মুখ্য উদ্দেশ্য। টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেখেছি, ফুল দেওয়ার হুড়োহুড়ির মধ্যে নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ বেদিতে ফুল ছুড়ে মারছেন। শুধু যে জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে এমন হয় তা নয়। বিশিষ্ট কেউ মারা গেলে মরদেহ যখন শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন শ্রদ্ধা নিবেদনের ওই একই রীতির অনুবর্তন ঘটে। বাঁধাই করা বড় তোড়া কফিনের ওপর না দিলে ঠিক যেন শ্রদ্ধা নিবেদন সম্পূর্ণ হয় না। একটি-দুটি ফুল কারও হাতে থাকলে হয়তো তাকে দীনহীন মনে করা হয়। অ্যাপলের কর্ণধার স্টিভ জবস মারা যাওয়ার পর দেখেছিলাম ভক্তরা একটি-দুটি ফুল স্টিভ জবসের ছবির সামনে রেখে দিয়েছেন। কেউবা অ্যাপলের কোনো গেজেট রেখে সম্মান দেখিয়েছেন। শ্রদ্ধ নিবেদনের জন্য মরদেহটাই সামনে রাখার খুব দরকার কারও পড়েনি। কিন্তু আমাদের এখানে মরদেহ উপস্থিত থাকবেই। আর তাতে মিছিল করে ফুলের বড় তোড়া দেওয়াটাই রেওয়াজ। এতে করে ফুল ব্যবসায়ীদের লাভ হয় বটে, কিন্তু অন্তরের শ্রদ্ধা কি যথার্থরূপে প্রকাশিত হয়? এ তো গেল ফুলের কথা। ভাষার কথা তুললে আরও নানা আতিশয্য চোখে পড়বে। বিশেষণ ছাড়া আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা ঠিক প্রকাশিত হয় না। তাও একটি-দুটি বিশেষণে কাজ চলে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষণের বন্যা বইয়ে দেওয়াই রেওয়াজ। বড় নেতা-নেত্রীদের ক্ষেত্রে বিশেষণেরও আবার প্রকারভেদ এমনকি দলও আছে। একজনকে এক বিশেষণে অভিহিত করলে অন্যজনকে ভিন্ন বিশেষণে অভিহিত করতে হবে। পাতিনেতাদের ক্ষেত্রেও বিশেষণের কমতি নেই। তাদের অনুসারীরাও বিশেষণ ঠিকই বের করে নেন। বিশেষণের এমনই আবশ্যকতা যে, কেউ যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের আগে কবিগুরু বা বিশ্বকবি না লেখেন তবে ভাবা হতে পারে যে, তাকে অসম্মান করা হলো। অন্য বড় ব্যক্তির বেলাতেও একই অবস্থা। কেউ মারা গেলে, তিনি অবশ্যই বিশিষ্ট। লেখক হলে বিশিষ্ট লেখক, উকিল হলে বিশিষ্ট উকিল। বলা হয়ে থাকে, যার তেমন কোনো পরিচয় স্পষ্ট নয় তার জন্য বরাদ্দ বিশিষ্ট সমাজসেবক। আগে মৃত্যু সংবাদে সম্ভ্রান্ত বংশের কথা হরদম লেখা হতো। ইদানীং বংশের প্রকোপ কিছুটা কমেছে। কিন্তু একদিকে কমলে অন্যদিকে আতিশয্য বাড়তেই থাকে। সংকটটা কোথায় সেটি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। হয়তো পরিমিতি বোধের অভাব আমাদের আছে। অথবা হয়তো কোনো ক্ষেত্রে সেটি রপ্তই হয়নি। নয়তো, এটাই আমাদের সংস্কৃতি। আমরা যখন কাউকে সম্মান করি তখন তাকে বিশিষ্ট বানিয়েই সম্মান করি। আর যখন কাউকে অসম্মান করতে হয় তখন তাকে তার আসন থেকে নামিয়ে গালি না দিয়ে হালকা কথার যুক্তিতে অপমান করতেও পারি না।

Thursday, June 7, 2012

ডায়মন্ড জুবিলি

ব্রিটেনের রানীর সিংহাসনে আরোহণের ষাট বছর পূর্তিতে রীতিমতো এক বিশাল উৎসব হয়ে গেল ব্রিটেনে। একদা যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না, সে সাম্রাজ্যের অংশ ছিল বাংলাদেশও। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সে সাম্রাজ্যের হাত থেকে মুক্তি অর্জন করেছে এ অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বহু চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে এখানে। আমাদের আইন-আদালত, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যেমন; সংস্কৃতি-শিক্ষা-স্থাপত্য-যোগাযোগেও তেমন। যত দূরেই ভাবি না কেন, সাম্রাজ্যের স্মৃতিচিহ্নগুলো ক্ষণে ক্ষণে এসে তাদের অস্তিত্ব জাহির করে। সাম্রাজ্যের তিক্ত স্মৃতি আওড়ে মুখে বিপ্লবী বুলি কপচে আমরা সাম্রাজ্যের সব দাগ দূর করতে চাই বটে, কিন্তু বাস্তবে তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না। তবু কালের ধুলায় অনেক কিছুর মতো সাম্রাজ্যের স্মৃতিতেও ধুলা পড়েছে। যদি এ সবকিছু বাদ দিয়ে আমাদের মানস গঠনের কথা মনে রেখে সাম্রাজ্যের দিকে তাকাই, তবে ব্রিটিশ রাজা-রানীরাই আমাদের দেখা শেষ রাজা-রানী। সে রাজা-রানীদের প্রতি একটি সহজাত বিস্ময়-শ্রদ্ধা-ভয়-ভক্তি থাকাটাই স্বাভাবিক। যদি সেটুকুও না থাকে, তবে একেবারে সর্বসাম্প্রতিক রাজনীতির কথাই তোলা যাক। আন্তর্জাতিক ক্ষমতাবিন্যাসে যুক্তরাজ্যের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পরেই। আমাদের নীতিনির্ধারণে তাদের প্রত্যক্ষ হোক, কি পরোক্ষ_ একটা ভূমিকা আছেই। সে কারণে এসব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের আমরা শ্রদ্ধা-ভক্তি করি। ব্রিটেনের রানী হিসেবে দ্বিতীয় এলিজাবেথ শ্রদ্ধা-ভক্তি পান। বস্তুত তার ক্ষেত্রে পুরনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্মৃতি, কমনওয়েলথ বর্তমানের ব্রিটেন সব মিলেমিশে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। শুধু রানী কেন, পুরো রাজপরিবারের প্রতিই একটা আকর্ষণ চারদিকে খেয়াল করি। এ দেশে ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিদ্রোহী বধূ প্রিন্সেস ডায়ানা কেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তা মনে করা যেতে পারে। এই সেদিন ডায়ানার ছেলে উইলিয়ামের বিয়েতে বাংলাদেশে কেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেও মনে পড়ে। তুলনায় রানী এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের ষাট বছর কিন্তু একটু নীরবেই চলে গেল। ব্রিটেনে বসবাসরত বাঙালিরা ঠিকই ফুর্তি করেছেন; ব্রিটিশদের সঙ্গে আনন্দ-উৎসবে মেতেছেন। ঢাকায়ও উৎসবের ছিটেফোঁটা লাগেনি, তা নয়। কিন্তু টেলিভিশনের সামনে বসে বিয়ে দেখার রুদ্ধশ্বাস আয়োজনের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। উইলিয়াম আর কেটের বিয়ের সময় অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, রূপকথা শুনতে যে কারণে আমরা ভালোবাসি, সে কারণেই ব্রিটিশরা রাজা-রানীর এই ঐতিহ্য সযত্নে টিকিয়ে রেখেছে। শুধু যে টিকিয়ে রেখেছে, তা নয়। এদের নিয়ে রীতিমতো সুখেই আছে তারা। দেশে চলছে দারুণ গণতন্ত্র। আধুনিক জীবনযাপন পদ্ধতি। কিন্তু ঐতিহ্যটাও দিব্যি রেখে দেওয়া হয়েছে। মাথায় তুলে রাখা হয়েছে জীবন্ত জাদুঘর। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধানের পদ তো দরকার। রানীতে খারাপ কী? রানী এখনও 'নাইট' উপাধি দিচ্ছেন। কমনওয়েলথে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এমন অনেক কিছুই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকারের তরফে, কিন্তু নাম ফলছে রানীর। তবে ব্রিটেনে রানীর একটা ধর্মীয় ভূমিকাও আছে। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলো নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখতে বেশ পারদর্শী। কিন্তু তাদের উৎসব আয়োজন খেয়াল করলে বোঝা যায়, ধর্মের একটা সম্মোহন আছে সেখানে। আনুষ্ঠানিক ধর্মে রানীর উচ্চ স্থান আছে। তবে ধর্মীয় কারণেই যে তারা উৎসবে মাতে_ সে দোষ তাদের দেওয়া যাবে না। ভিড়ের অনেক মুখ আছে, যারা স্রেফ উৎসবের জন্যই উৎসবে মেতেছে_ স্পষ্ট বোঝা যায়। আবার অনেকেই সাম্রাজ্যের স্মৃতিলিপ্ত। তাদের চোখেমুখে রানী ও রাজতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসা। আর ইতিহাস তো মানুষকে বিস্মিত করে। ইতিহাস যদি সামনে এসে দাঁড়ায় তবে হতচকিত না হয়ে উপায় কী? তাই ইতিহাসের রাজা-রানী ও রাজকন্যা-রাজপুত্ররা বর্তমান পর্যন্ত টিকে থাকলে তো অসুবিধা কোথায়?

Sunday, June 3, 2012

দৃশ্যপটে বাংলাদেশ কোথায়?

সাকুল্যে যে দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ সীমান্ত তার একটি ভারত অন্যটি মিয়ানমার। যোগাযোগের নানা মাত্রার কারণে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের অস্তিত্ব প্রতিনিয়তই আমরা টের পাই কিন্তু মিয়ানমার যেন সীমান্তে থেকেও বহুদূর। অথচ, ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমার অর্থাৎ বার্মার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক গভীর। বাংলার কবিরা একদা আরাকান রাজসভার সমর্থন নিয়ে সাহিত্যচর্চা করতেন। বহুকাল বাঙালি অভিবাসীরা বার্মাকে বসবাসের জন্য পছন্দ করেছে। সীমান্তে দুই দেশের সম্পর্ক কখনও অম্ল কখনও মধুর। মিয়ানমারের শাসকদের চাপে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখন বাংলাদেশে আশ্রিত। আছে নানা রকমের অনুমোদিত ও অননুমোদিত বাণিজ্য সম্পর্কও। এত নিকটবর্তী যে প্রতিবেশী তার সম্পর্কে খোঁজ পেতে আমাদের নির্ভর করতে হয় পাশ্চাত্যের সংবাদমাধ্যমের ওপর। বলতে গেলে ভৌগোলিক দূরত্ব কম হলেও মানসিক দূরত্ব যেন কয়েক হাজার কিলোমিটার। অবশ্য এর জন্য মিয়ানমার কম দায়ী নয়। দীর্ঘদিন রুদ্ধশ্বাস সামরিক শাসনাধীন মিয়ানমার প্রতিবেশীদের সঙ্গে রহস্যময় সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের সরকারগুলো মিয়ানমারের সামরিক শাসনের প্রতি মোটামুটিভাবে সহানুভূতিশীল ছিল। তবে দুই দেশের জনগণের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্ক কী তা বলা মুশকিল। বাংলাদেশেও বহু মানুষ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ দেশে অং সান সু চির বিপুল জনপ্রিয়তা। অবশ্য এ জনপ্রিয়তা প্রতিবেশী দেশের গণতান্ত্রিক নেত্রীর জন্য নাকি পাশ্চাত্যের পছন্দনীয় আইকনের প্রতি তা বলা মুশকিল। কাছে থেকে দূরের এ দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অতীতে যা-ই থাকুক, ভবিষ্যতে প্রতিবেশী হিসেবে সে দেশ যে এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মিয়ানমার সম্প্রতি তার দেশের দরজা খুলেছে। সে দেশের প্রেসিডেন্ট থান শোয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে নানা দেশে যাচ্ছেন যেমন, তেমনি নানা দেশের রাষ্ট্রনেতারা সে দেশে প্রবেশও করছেন। আগে নানা রকম নিষেধাজ্ঞা ছিল। অং সান সু চির মুক্তির পর ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা উঠতে শুরু করেছে। নানা রকমের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে, বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বস্তুত, মিয়ানমারের দিকে দৃষ্টি এখন সবার। আগে কোনো কোনো দেশ গোপনে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখত। সু চির মুক্তির পর আড়ালের দরকার পড়ছে না। এখন মিয়ানমারকে দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। যতটা খারাপ ভাবা গিয়েছিল ততটা খারাপ নয় মিয়ানমারের অবস্থা। বরং দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় একটি বড় শক্তি হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা দেশটির আছে। থান শোয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। গণতন্ত্রের যাত্রা অব্যাহত থাকলে সু চির নেতৃত্বে দেশটি যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বড় গুরুত্ব পাবে সন্দেহ নেই। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক আগে থেকেই উষ্ণ। সু চি মুক্তির পর প্রথম থাইল্যান্ড গেলেন। থাইল্যান্ডে যাওয়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিশাল বহর নিয়ে গিয়ে একগুচ্ছ চুক্তি করলেন মিয়ানমারের সঙ্গে। সু চিকে আমন্ত্রণ জানালেন। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড বাদ দিলে মিয়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী বাংলাদেশ। মিয়ানমারে যখন পরিবর্তনের হাওয়া, তাকে কেন্দ্র করে যখন নানামুখী তোড়জোড় তখন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কোথায়? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ডিসেম্বরে মিয়ানমার সফর করেছেন। কিন্তু বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও চুক্তি বেশি আগায়নি। অং সান সু চি যদি বাংলাদেশে আসেন, তাকে সাদরে বরণ করে নেবে বাংলাদেশের জনগণ। যাওয়া-আসায় কার্পণ্য চলবে না। মিয়ানমারের সঙ্গে পুরনো, জটিল ও রহস্যময় সম্পর্কের ইতি টানতেই হবে। দুই দেশের বিবাদগুলো মিটিয়ে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগে আমরা যদি পিছিয়ে পড়তেই থাকি তবে সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?