বাল্মীকি রামায়ণে লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ নেই। উত্তর ভারতে বহুল প্রচলিত
রামচরিতমানসের অরণ্যকাণ্ডেও লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু
রামচরিতমানের লঙ্কাকাণ্ডে রানী মান্দোদরী রাজা রাবণকে এই বলে তিরস্কার
করেছেন যে, রাবণের বীরত্বের দাবি সম্পূর্ণ ফাঁপা। কেননা তিনি রামচন্দ্রের
ছোট ভাই লক্ষ্মণের আঁকা ছোট একটি রেখা অতিক্রম করার সাহস পাননি। বস্তুত মূল
রামায়ণে লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ না থাকলেও পরবর্তীকালের রামায়ণে অরণ্যকাণ্ডে
লক্ষ্মণ-রেখার প্রসঙ্গ গুরুত্ব সহকারে উলি্লখিত হয়েছে। লক্ষ্মণ-রেখার
উল্লেখ পরবর্তীকালে বহুবার বহুভাবে হয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রিম
কোর্ট গণমাধ্যমকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আদালতের সংবাদ প্রকাশ করতে
গিয়ে গণমাধ্যম যেন লক্ষ্মণ-রেখার কথা বিস্মৃত না হয়। বস্তুতপক্ষে, ভারতে
রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে প্রায়ই লক্ষ্মণ-রেখার কথা উলি্লখিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রে
সরকার, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যম, আদালত, সংসদ, আমলাতন্ত্রসহ সকলেরই নিজ নিজ
এলাকা ও এখতিয়ার থাকে। এই চৌহদ্দি কোনো কারণে কেউ লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্রীয়
আধুনিক রাষ্ট্রের সমতার নীতিতে ব্যত্যয় ঘটে। রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গ
নিজের অতিরিক্ত শক্তি প্রকাশে প্রলুব্ধ হয়ে সফল হলে তাতে রাষ্ট্রের
দুর্বলতা প্রকাশিত হয়। ফলে রাষ্ট্রের ব্যাপারে সীমা ও সীমা লঙ্ঘনের কথা মনে
করিয়ে দিতে লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ ভারতে হরহামেশা দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের
দেশে রামায়ণ কাব্য হিসেবে জনপ্রিয় হলেও এই মহাকাব্যে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো
ততটা পরিচিত নয়। তাই এখানে প্রাসঙ্গিক হলেও লক্ষ্মণ-রেখার উল্লেখ সেভাবে
দেখতে পাওয়া যায় না। রামায়ণে রাবণ যখন সীতাকে অপহরণের পরিকল্পনা আঁটেন, তখন
তিনি রাক্ষস মারিচের সহায়তা কামনা করেন। মারিচ স্বর্ণমৃগের রূপ ধরেন।
স্বর্ণমৃগ সীতার সামনে উপস্থিত হয়ে তাকে প্রলুব্ধ করে। সীতা রামচন্দ্রকে
বলেন, তাকে ওই স্বর্ণহরিণ এনে দিতে হবে। রামচন্দ্র বুঝতে পারেন ওটি মায়ামৃগ
এবং অশুভ সংকেত। তারপরও সীতার অনুরোধে তাকে ওই মায়ামৃগ অর্থাৎ মারিচের
পশ্চাদ্ধাবন করতে হয়। হরিণের পিছু ধাওয়া করে যাওয়ার বহু পরেও যখন রামচন্দ্র
ফিরছিলেন না তখন সীতা লক্ষ্মণকে বলেন, তিনি যেন ভাইয়ের খোঁজে বের হন।
কিন্তু সীতার নিরাপত্তার দায়িত্ব লক্ষ্মণের। তিনি কীভাবে তাকে অরক্ষিত রেখে
ভাইকে খুঁজতে যাবেন? সীতার নিরাপত্তার জন্য লক্ষ্মণ গৃহের চারদিকে একটি
রেখা অঙ্কন করলেন। এই রেখা অতিক্রম করার চেষ্টা করলে যে কেউ আগুনে ভস্মীভূত
হবে। লক্ষ্মণ-রেখার নিরাপত্তায় সীতাকে রেখে লক্ষ্মণ ভাইয়ের খোঁজে বের
হলেন। লক্ষ্মণ চলে যাওয়ার পর ভিখারির বেশে রাক্ষসরাজ রাবণ সেখানে উপস্থিত
হলেন এবং সীতার কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন। ভারতীয় ঐতিহ্যে অতিথি দেব
ভবাঃ। অর্থাৎ অতিথি ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ফলে তাকে অগ্রাহ্য করা কঠিন।
পুরাণকাররা বলেন, সীতা তখন অন্যমনস্ক ও উদ্বিগ্নও ছিলেন। ফলে লক্ষ্মণের
নিষেধ বিস্মৃত হয়ে তিনি রেখাটি অতিক্রম করে ফেলেন। সীতা রেখার নিরাপত্তা
বেষ্টনী অতিক্রম না করে ভিক্ষা দিতে গেলে রাবণ তাকে বলেন, বেষ্টনীর ভেতরে
থেকে ভিক্ষা দিলে দাতা সানন্দে ভিক্ষা দিচ্ছেন কি-না তা স্পষ্ট হয় না। এ
কারণেও সীতা লক্ষ্মণ-রেখা অতিক্রম করে তাকে ভিক্ষা দিতে যান। সীতা
লক্ষ্মণ-রেখা অতিক্রম করিবামাত্র রাবণ তাকে অপহরণ করেন। পুষ্পকরথে করে
লঙ্কা নগরীতে নিয়ে অন্তরীণ করেন। সীতা অপহরণের পর রামচন্দ্রের লঙ্কা অভিযান
শুরু হয়।
Saturday, June 23, 2012
Thursday, June 14, 2012
আতিশয্য
আমরা কিছু ব্যাপারে বাড়াবাড়ি পছন্দ না করলেও অনেক কিছুতে আতিশয্য বেশ পছন্দ
করি। উদাহরণ হিসেবে আসে শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রসঙ্গ। পৃথিবীব্যাপী শ্রদ্ধা
নিবেদনের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। শহীদদের স্মরণের জন্য শহীদ মিনার বা
স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে ফুল বা মোমবাতি দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের রেওয়াজ সর্বত্রই
প্রচলিত। নানা দেশের আচার দেখে সে সম্পর্কে কিছু ধারণা করা চলে। টেলিভিশনে
দেখি, লোকে একটা ফুল বড়জোর এক গোছা ফুল হাতে করে স্মৃতিস্তম্ভে হাজির হয়।
ফুলটুকু রেখে নীরবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে ফিরে আসেন। আমাদের দেশেও শ্রদ্ধা
নিবেদনের রীতি আছে। শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধে আমরাও যাই। তবে এই যাওয়ার
মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো 'যাত্রা' আছে কি-না সন্দেহ। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে
দোষ দিয়ে লাভ নেই_ হরেদরে আমরা সবাই মিছিল করে দলবল নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন
করতে যাই। একটি-দুটি ফুলে আমাদের প্রাণের নিবেদন সম্পূর্ণ হয় না। পারলে যেন
বাগান উপড়ে নিয়ে যাই। বড় একটা ফুলের তোড়ায় সংগঠনের নাম লিখে হুড়োহুড়ি করে
সেটি বেদিতে স্থাপন করতে গিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ লেগে যায়। শ্রদ্ধা নিবেদনের
চাইতে ছবি তোলাটাই তখন মুখ্য উদ্দেশ্য। টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে
দেখেছি, ফুল দেওয়ার হুড়োহুড়ির মধ্যে নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ বেদিতে ফুল ছুড়ে
মারছেন। শুধু যে জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে এমন হয় তা নয়। বিশিষ্ট কেউ মারা গেলে
মরদেহ যখন শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন শ্রদ্ধা নিবেদনের ওই একই রীতির
অনুবর্তন ঘটে। বাঁধাই করা বড় তোড়া কফিনের ওপর না দিলে ঠিক যেন শ্রদ্ধা
নিবেদন সম্পূর্ণ হয় না। একটি-দুটি ফুল কারও হাতে থাকলে হয়তো তাকে দীনহীন
মনে করা হয়। অ্যাপলের কর্ণধার স্টিভ জবস মারা যাওয়ার পর দেখেছিলাম ভক্তরা
একটি-দুটি ফুল স্টিভ জবসের ছবির সামনে রেখে দিয়েছেন। কেউবা অ্যাপলের কোনো
গেজেট রেখে সম্মান দেখিয়েছেন। শ্রদ্ধ নিবেদনের জন্য মরদেহটাই সামনে রাখার
খুব দরকার কারও পড়েনি। কিন্তু আমাদের এখানে মরদেহ উপস্থিত থাকবেই। আর তাতে
মিছিল করে ফুলের বড় তোড়া দেওয়াটাই রেওয়াজ। এতে করে ফুল ব্যবসায়ীদের লাভ হয়
বটে, কিন্তু অন্তরের শ্রদ্ধা কি যথার্থরূপে প্রকাশিত হয়? এ তো গেল ফুলের
কথা। ভাষার কথা তুললে আরও নানা আতিশয্য চোখে পড়বে। বিশেষণ ছাড়া আমাদের
অন্তরের শ্রদ্ধা ঠিক প্রকাশিত হয় না। তাও একটি-দুটি বিশেষণে কাজ চলে না।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষণের বন্যা বইয়ে দেওয়াই রেওয়াজ। বড় নেতা-নেত্রীদের
ক্ষেত্রে বিশেষণেরও আবার প্রকারভেদ এমনকি দলও আছে। একজনকে এক বিশেষণে
অভিহিত করলে অন্যজনকে ভিন্ন বিশেষণে অভিহিত করতে হবে। পাতিনেতাদের
ক্ষেত্রেও বিশেষণের কমতি নেই। তাদের অনুসারীরাও বিশেষণ ঠিকই বের করে নেন।
বিশেষণের এমনই আবশ্যকতা যে, কেউ যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের আগে কবিগুরু
বা বিশ্বকবি না লেখেন তবে ভাবা হতে পারে যে, তাকে অসম্মান করা হলো। অন্য
বড় ব্যক্তির বেলাতেও একই অবস্থা। কেউ মারা গেলে, তিনি অবশ্যই বিশিষ্ট। লেখক
হলে বিশিষ্ট লেখক, উকিল হলে বিশিষ্ট উকিল। বলা হয়ে থাকে, যার তেমন কোনো
পরিচয় স্পষ্ট নয় তার জন্য বরাদ্দ বিশিষ্ট সমাজসেবক। আগে মৃত্যু সংবাদে
সম্ভ্রান্ত বংশের কথা হরদম লেখা হতো। ইদানীং বংশের প্রকোপ কিছুটা কমেছে।
কিন্তু একদিকে কমলে অন্যদিকে আতিশয্য বাড়তেই থাকে। সংকটটা কোথায় সেটি নিয়ে
ভাবা যেতে পারে। হয়তো পরিমিতি বোধের অভাব আমাদের আছে। অথবা হয়তো কোনো
ক্ষেত্রে সেটি রপ্তই হয়নি। নয়তো, এটাই আমাদের সংস্কৃতি। আমরা যখন কাউকে
সম্মান করি তখন তাকে বিশিষ্ট বানিয়েই সম্মান করি। আর যখন কাউকে অসম্মান
করতে হয় তখন তাকে তার আসন থেকে নামিয়ে গালি না দিয়ে হালকা কথার যুক্তিতে
অপমান করতেও পারি না।
Thursday, June 7, 2012
ডায়মন্ড জুবিলি
ব্রিটেনের রানীর সিংহাসনে আরোহণের ষাট বছর পূর্তিতে রীতিমতো এক বিশাল উৎসব
হয়ে গেল ব্রিটেনে। একদা যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না, সে
সাম্রাজ্যের অংশ ছিল বাংলাদেশও। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সে সাম্রাজ্যের
হাত থেকে মুক্তি অর্জন করেছে এ অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের
বহু চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে এখানে। আমাদের আইন-আদালত, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায়
যেমন; সংস্কৃতি-শিক্ষা-স্থাপত্য-যোগাযোগেও তেমন। যত দূরেই ভাবি না কেন,
সাম্রাজ্যের স্মৃতিচিহ্নগুলো ক্ষণে ক্ষণে এসে তাদের অস্তিত্ব জাহির করে।
সাম্রাজ্যের তিক্ত স্মৃতি আওড়ে মুখে বিপ্লবী বুলি কপচে আমরা সাম্রাজ্যের সব
দাগ দূর করতে চাই বটে, কিন্তু বাস্তবে তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না। তবু কালের
ধুলায় অনেক কিছুর মতো সাম্রাজ্যের স্মৃতিতেও ধুলা পড়েছে। যদি এ সবকিছু বাদ
দিয়ে আমাদের মানস গঠনের কথা মনে রেখে সাম্রাজ্যের দিকে তাকাই, তবে ব্রিটিশ
রাজা-রানীরাই আমাদের দেখা শেষ রাজা-রানী। সে রাজা-রানীদের প্রতি একটি
সহজাত বিস্ময়-শ্রদ্ধা-ভয়-ভক্তি থাকাটাই স্বাভাবিক। যদি সেটুকুও না থাকে,
তবে একেবারে সর্বসাম্প্রতিক রাজনীতির কথাই তোলা যাক। আন্তর্জাতিক
ক্ষমতাবিন্যাসে যুক্তরাজ্যের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পরেই। আমাদের
নীতিনির্ধারণে তাদের প্রত্যক্ষ হোক, কি পরোক্ষ_ একটা ভূমিকা আছেই। সে কারণে
এসব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের আমরা শ্রদ্ধা-ভক্তি করি। ব্রিটেনের
রানী হিসেবে দ্বিতীয় এলিজাবেথ শ্রদ্ধা-ভক্তি পান। বস্তুত তার ক্ষেত্রে
পুরনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্মৃতি, কমনওয়েলথ বর্তমানের ব্রিটেন সব মিলেমিশে
একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। শুধু রানী কেন, পুরো রাজপরিবারের প্রতিই
একটা আকর্ষণ চারদিকে খেয়াল করি। এ দেশে ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিদ্রোহী বধূ
প্রিন্সেস ডায়ানা কেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তা মনে করা যেতে পারে। এই সেদিন
ডায়ানার ছেলে উইলিয়ামের বিয়েতে বাংলাদেশে কেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেও মনে
পড়ে। তুলনায় রানী এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের ষাট বছর কিন্তু একটু নীরবেই
চলে গেল। ব্রিটেনে বসবাসরত বাঙালিরা ঠিকই ফুর্তি করেছেন; ব্রিটিশদের সঙ্গে
আনন্দ-উৎসবে মেতেছেন। ঢাকায়ও উৎসবের ছিটেফোঁটা লাগেনি, তা নয়। কিন্তু
টেলিভিশনের সামনে বসে বিয়ে দেখার রুদ্ধশ্বাস আয়োজনের সঙ্গে এর তুলনা চলে
না। উইলিয়াম আর কেটের বিয়ের সময় অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, রূপকথা শুনতে যে
কারণে আমরা ভালোবাসি, সে কারণেই ব্রিটিশরা রাজা-রানীর এই ঐতিহ্য সযত্নে
টিকিয়ে রেখেছে। শুধু যে টিকিয়ে রেখেছে, তা নয়। এদের নিয়ে রীতিমতো সুখেই আছে
তারা। দেশে চলছে দারুণ গণতন্ত্র। আধুনিক জীবনযাপন পদ্ধতি। কিন্তু
ঐতিহ্যটাও দিব্যি রেখে দেওয়া হয়েছে। মাথায় তুলে রাখা হয়েছে জীবন্ত জাদুঘর।
রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধানের পদ তো দরকার। রানীতে খারাপ কী? রানী এখনও
'নাইট' উপাধি দিচ্ছেন। কমনওয়েলথে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এমন অনেক
কিছুই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকারের তরফে, কিন্তু নাম ফলছে রানীর। তবে
ব্রিটেনে রানীর একটা ধর্মীয় ভূমিকাও আছে। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলো
নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখতে বেশ পারদর্শী। কিন্তু তাদের উৎসব আয়োজন
খেয়াল করলে বোঝা যায়, ধর্মের একটা সম্মোহন আছে সেখানে। আনুষ্ঠানিক ধর্মে
রানীর উচ্চ স্থান আছে। তবে ধর্মীয় কারণেই যে তারা উৎসবে মাতে_ সে দোষ তাদের
দেওয়া যাবে না। ভিড়ের অনেক মুখ আছে, যারা স্রেফ উৎসবের জন্যই উৎসবে
মেতেছে_ স্পষ্ট বোঝা যায়। আবার অনেকেই সাম্রাজ্যের স্মৃতিলিপ্ত। তাদের
চোখেমুখে রানী ও রাজতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসা। আর ইতিহাস তো
মানুষকে বিস্মিত করে। ইতিহাস যদি সামনে এসে দাঁড়ায় তবে হতচকিত না হয়ে উপায়
কী? তাই ইতিহাসের রাজা-রানী ও রাজকন্যা-রাজপুত্ররা বর্তমান পর্যন্ত টিকে
থাকলে তো অসুবিধা কোথায়?
Sunday, June 3, 2012
দৃশ্যপটে বাংলাদেশ কোথায়?
সাকুল্যে যে দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ সীমান্ত তার একটি ভারত
অন্যটি মিয়ানমার। যোগাযোগের নানা মাত্রার কারণে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের
অস্তিত্ব প্রতিনিয়তই আমরা টের পাই কিন্তু মিয়ানমার যেন সীমান্তে থেকেও
বহুদূর। অথচ, ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমার অর্থাৎ বার্মার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক
অনেক গভীর। বাংলার কবিরা একদা আরাকান রাজসভার সমর্থন নিয়ে সাহিত্যচর্চা
করতেন। বহুকাল বাঙালি অভিবাসীরা বার্মাকে বসবাসের জন্য পছন্দ করেছে।
সীমান্তে দুই দেশের সম্পর্ক কখনও অম্ল কখনও মধুর। মিয়ানমারের শাসকদের চাপে
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখন বাংলাদেশে আশ্রিত। আছে নানা রকমের
অনুমোদিত ও অননুমোদিত বাণিজ্য সম্পর্কও। এত নিকটবর্তী যে প্রতিবেশী তার
সম্পর্কে খোঁজ পেতে আমাদের নির্ভর করতে হয় পাশ্চাত্যের সংবাদমাধ্যমের ওপর।
বলতে গেলে ভৌগোলিক দূরত্ব কম হলেও মানসিক দূরত্ব যেন কয়েক হাজার
কিলোমিটার। অবশ্য এর জন্য মিয়ানমার কম দায়ী নয়। দীর্ঘদিন রুদ্ধশ্বাস সামরিক
শাসনাধীন মিয়ানমার প্রতিবেশীদের সঙ্গে রহস্যময় সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল। বলা
হয়ে থাকে, বাংলাদেশের সরকারগুলো মিয়ানমারের সামরিক শাসনের প্রতি
মোটামুটিভাবে সহানুভূতিশীল ছিল। তবে দুই দেশের জনগণের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্ক
কী তা বলা মুশকিল। বাংলাদেশেও বহু মানুষ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ
দেশে অং সান সু চির বিপুল জনপ্রিয়তা। অবশ্য এ জনপ্রিয়তা প্রতিবেশী দেশের
গণতান্ত্রিক নেত্রীর জন্য নাকি পাশ্চাত্যের পছন্দনীয় আইকনের প্রতি তা বলা
মুশকিল। কাছে থেকে দূরের এ দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অতীতে যা-ই থাকুক,
ভবিষ্যতে প্রতিবেশী হিসেবে সে দেশ যে এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে
তা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মিয়ানমার সম্প্রতি তার দেশের দরজা খুলেছে। সে
দেশের প্রেসিডেন্ট থান শোয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে নানা দেশে যাচ্ছেন যেমন,
তেমনি নানা দেশের রাষ্ট্রনেতারা সে দেশে প্রবেশও করছেন। আগে নানা রকম
নিষেধাজ্ঞা ছিল। অং সান সু চির মুক্তির পর ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা উঠতে শুরু
করেছে। নানা রকমের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে, বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা
তৈরি হচ্ছে। বস্তুত, মিয়ানমারের দিকে দৃষ্টি এখন সবার। আগে কোনো কোনো দেশ
গোপনে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখত। সু চির মুক্তির পর আড়ালের দরকার পড়ছে
না। এখন মিয়ানমারকে দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। যতটা খারাপ ভাবা গিয়েছিল
ততটা খারাপ নয় মিয়ানমারের অবস্থা। বরং দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় একটি বড়
শক্তি হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা দেশটির আছে। থান শোয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন
এনেছেন। গণতন্ত্রের যাত্রা অব্যাহত থাকলে সু চির নেতৃত্বে দেশটি যে
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বড় গুরুত্ব পাবে সন্দেহ নেই। চীনের সঙ্গে
মিয়ানমারের সম্পর্ক আগে থেকেই উষ্ণ। সু চি মুক্তির পর প্রথম থাইল্যান্ড
গেলেন। থাইল্যান্ডে যাওয়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিশাল বহর
নিয়ে গিয়ে একগুচ্ছ চুক্তি করলেন মিয়ানমারের সঙ্গে। সু চিকে আমন্ত্রণ
জানালেন। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড বাদ দিলে মিয়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিবেশী বাংলাদেশ। মিয়ানমারে যখন পরিবর্তনের হাওয়া, তাকে কেন্দ্র করে যখন
নানামুখী তোড়জোড় তখন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কোথায়? বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ডিসেম্বরে মিয়ানমার সফর করেছেন। কিন্তু
বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও চুক্তি বেশি
আগায়নি। অং সান সু চি যদি বাংলাদেশে আসেন, তাকে সাদরে বরণ করে নেবে
বাংলাদেশের জনগণ। যাওয়া-আসায় কার্পণ্য চলবে না। মিয়ানমারের সঙ্গে পুরনো,
জটিল ও রহস্যময় সম্পর্কের ইতি টানতেই হবে। দুই দেশের বিবাদগুলো মিটিয়ে ফেলে
সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগে আমরা যদি পিছিয়ে পড়তেই থাকি তবে সম্পর্কটা শেষ
পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
Sunday, May 27, 2012
টেলিভিশনে মৃত মানুষের মুখ
কয়েকদিন ধরে মৃত্যু সংবাদ পড়লাম একের পর এক। ১৮ মে মারা গেলেন মিসরীয়
সঙ্গীতশিল্পী ওয়ারদা আল জাজাইরিয়া। ১৯ মে মারা গেলেন শিল্পী সফিউদ্দীন
আহমেদ। ২০ মে মারা গেলেন লকারবি বোমা হামলায় অভিযুক্ত মেগরাহি। ২১ মে
সঙ্গীতশিল্পী রবিন গিব। ২২ মে মারা গেলেন অর্থনীতিবিদ মোজাফ্ফর আহমদ। এই
তালিকায় লকারবি বোমা হামলায় অভিযুক্ত মেগরাহি ছাড়া দু'জন আন্তর্জাতিক
অঙ্গনে আর দু'জন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বনামধন্য। বিবিসিতে রবিন গিবের
মৃত্যুর সংবাদ দেখছিলাম। রবিন গিবের মৃত্যু সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে দেখানো
হচ্ছিল তার উচ্ছল ও প্রাণচঞ্চল কনসার্টের ছবি, আরও নানা স্মরণীয় ঘটনাবলি।
শুধু রবিন গিবই নন, বিখ্যাত ব্যক্তিরা মারা গেলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত
টিভিগুলোতে মৃত ব্যক্তির লাশের ছবি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। রীতি মেনেই সেটি
দেখানো হয় না। মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এ রীতি সর্বত্র
প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশে একে মান্য করা হয় না। মনে পড়ে, প্রিয় ও বিখ্যাত
এক ব্যক্তির মৃতদেহের ছবি টেলিভিশনের খবরে দেখে শিউরে উঠেছিলাম। আমার
স্মৃতিতে আঁকা ছিল তার প্রাণোচ্ছল একটা ছবি। হতে পারে সেটা গণমাধ্যমে দেখে
বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সূত্রে। কিন্তু এখন তাকে মনে করতে গেলেই সেই মৃত
মলিন মুখটাই মনে পড়ে। এর জন্য টিভিকেই দায়ী করতে হয়। প্রশ্ন হলো, গণমাধ্যমে
মৃত মানুষের মুখ দেখব কি দেখব না এ কি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়?
বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক পছন্দ-অপছন্দের বিষয়ও বটে। সমাজের
শ্রদ্ধেয়, গুণী ও কৃতী একজন মানুষের চলচ্ছবি টেলিভিশনগুলোর কাছে থাকবার
কথা। মৃত্যু সংবাদের সঙ্গে সে ছবি পরিবেশন করাই যুক্তিযুক্ত হওয়ার কথা।
কিন্তু আমাদের টিভিগুলো অকুস্থলে পেঁৗছে মৃত মানুষের মুখটাই প্রথম খোঁজে।
সে মুখটাই দেখানো হয়। মৃত মুখ কি মৃত্যু সংবাদের চেয়ে কিছু জানান দেয়?
বাড়তি কিছুই জানায় না মৃত মানুষের মুখ। বরং জনসমক্ষে এভাবে মৃতের মুখ
দেখানোটা তার প্রতি অসম্মানজনক। মৃতের পরিবারগুলোর এই প্রদর্শনের প্রতি সায়
থাকে না সবসময়। কিন্তু সায় থাকলেই কি দেখানো উচিত? অনেকেরই মনে হবে, এভাবে
দেখানো অসঙ্গত। কিন্তু টিভিগুলোর তেমন দায়িত্বশীলতার নজির কোথায়? অবশ্য
অনেকে বলেন, টিভিগুলো জীবিত অবস্থায় কীর্তিমানদের কাছে যায় না। ফলে প্রচার
করবার মতো ফুটেজ থাকে না। আর তাই নিরুপায় হয়ে মৃতদেহের মাধ্যমেই মুখটা
দেখানো হয়। বিখ্যাত, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের কফিনে ঢাকা মরদেহ দেখিয়েই হয়তো
ক্ষান্ত হচ্ছে টিভিগুলো; কিন্তু বাকিদের বেলায় কী হচ্ছে। সাধারণ মানুষের
স্বাভাবিক মৃত্যুর ছবি দেখানোর প্রশ্নই নেই। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ছবি অহরহ
প্রচারিত হয় ছবিতে। সেগুলোর পরিবেশনা, সরাসরি মৃতদেহ পরিবেশন ইত্যাদি দেখলে
কিন্তু রীতিমতো অশ্রদ্ধা জাগে। এ প্রশ্নও জাগে যে, কী ভেবে এই বীভৎস
ছবিগুলো প্রদর্শন করা হচ্ছে? মৃতদের পরিবারের ওপর এই প্রচার কী প্রতিক্রিয়া
তৈরি করছে? এতে কি বীভৎসতার প্রতি মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে নাকি এই বীভৎসতাই
গা সওয়া, মন সওয়া হয়ে উঠছে? টিভি কি শুধু অপরাধ-খুন-হত্যা পছন্দ করে এমন
মানুষই দেখে? নাকি শিশুরাও দেখে। তারা মৃতদেহ, বীভৎস মৃতদেহ দেখবে কেন? এক
সময় দৈনিক পত্রিকায় বীভৎস ছবি প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। কেউ কেউ বলতেন,
বীভৎস ছবি সার্কুলেশন বাড়ায়। কেউ কেউ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবার যুক্তিও
দেখাতেন। কিন্তু কালে কালে প্রমাণিত হয়েছে, বীভৎস ছবি একদম প্রচার না করলেই
সার্কুলেশন সবচেয়ে বাড়ে। আর বীভৎসতার ছবি দিয়ে বীভৎসতার সমালোচনা করা যায়
না। বরং সৌন্দর্য দিয়েই কদর্যতার মোকাবেলা করাই রীতি। প্রিয় ও পছন্দের
ব্যক্তির মরদেহের ছবি হোক কি অচেনা, অজানা কোনো ব্যক্তির অপঘাতে মৃত্যুর
ছবিই হোক টিভিতে তা প্রচারের আগে কি আমাদের টিভি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটু
ভাববেন?
Thursday, May 24, 2012
নারীর জন্য বাসযোগ্য দেশ
সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১১ বিডি নিউজে প্রকাশিত
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১। ডিএনএইনডিয়া ডট কমের একটি খবরে চোখ আটকে গেল। ডেইলি নিউজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (ডিএনএ) ভারতের একটি অনলাইন সংবাদপত্র। সংবাদপত্রটি একটি জরিপের বরাত দিয়ে লিখেছে, পৃথিবীতে নারীর বসবাসযোগ্য ১৬৫ দেশের তালিকায় ভারতের অবস্থান ১৪১-এ। পৃথিবীর উদীয়মান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময়ে নারীদের জন্য বসবাসযোগ্য দেশের তালিকার শেষ দিকে ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ খবর বটে। কিন্তু, খবরটি ভারতীয় মিডিয়ায় তেমন কল্কে পায়নি। বাংলাদেশেও খুব বেশি মানুষের চোখে পড়েছে বলে মনে হলো না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি সুখবর হতে পারতো। কারণ, ডিএনএ লিখেছে, ভারত যে শুধু ১৪১ নম্বর অবস্থানে আছে তা-ই নয়, এমনকি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, শ্রী লংকা, চীনও ভারতের থেকে এগিয়ে আছে। চীন এগিয়ে আছে একথা কার্পণ্য করে ডিএনএ লিখেছে বটে, কিন্তু তারা যে অনেক এগিয়ে এবং ২৩ নম্বরে সেটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার ছিল। ভারতের প্রতিযোগিতা তো চীনের সঙ্গেই হওয়ার কথা। এ বিষয়ে ডিএনএ কথা বলেছে একজন রাজনীতিকের সঙ্গে। ইউনিভার্সেল সোসাইটি অব হিন্দুইজমের প্রেসিডেন্ট রাজন জেড তাদের বলেছেন, ভারত বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে থাকলেও এই নতুন সক্ষমতা ও সমৃদ্ধিতে অনেকেরই বিশেষ করে নারীদের অধিকার অবারিত নয়।
খবরটি পড়তে পড়তে মনে পড়ছিল গত সপ্তাহেই ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় ’গ্রোথ ইজ নট এনাফ’ শিরোনামের একটি খবরের কথা। তাতে গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধি যে নারীকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারে না, তার একটি ছোট বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীন প্রবৃদ্ধিতে চ্যাম্পিয়ন হতে চললেও অতিরিক্ত নারীমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি চীন ও ভারতেই। হিসাব পুরো দুনিয়ার। তাতে এক নাম্বারে চীন আর দুই নাম্বারে ভারত। প্রশ্ন উঠবে, প্রবৃদ্ধি যদি যথেষ্ট না হয়, তবে কী দরকার? প্রশ্নটা তোলা থাকুক।
নিউজউইক/ডেইলি বেস্টের জরিপ প্রসঙ্গেই ফেরা যাক। প্রথাগত জরিপ ঠিক নয়, একে বলতে হয়- জরিপ ও বিশ্লেষণ। বেস্ট অ্যান্ড ওর্স্ট প্লেসেস ফর উওমেন বা নারীর জন্য ভাল ও খারাপ দেশ- জরিপ ও বিশ্লেষণের বিষয়। উদ্যোগটি নিউজউইক ম্যাগাজিন ও ডেইলি বেস্ট সংবাদপত্রের। নিউজউইকের ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় বিশ্লেষণ ও জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। ডেইলি বেস্টও একই দিন এটি প্রচার করেছে। পত্রিকা দুটির অনুসন্ধানের বিষয় ছিল- কোন দেশ নারীকে সবচেয়ে বেশি অধিকার দিচ্ছে এবং নারীর জীবনমান কোথায় বেশি। প্রথম দশটি দেশ হলো- ১. আইসল্যান্ড ২. সুইডেন ৩. কানাডা ৪. ডেনমার্ক ৫.ফিনল্যান্ড ৬ সুইজারল্যান্ড ৭. নরওয়ে ৮. যুক্তরাষ্ট্র ৯.অস্ট্রেলিয়া ১০. নেদারল্যান্ডস। তালিকার শেষ দশটি দেশ হলো- ১৬৫.চাদ ১৬৪. আফগানিস্তান ১৬৩. ইয়েমেন ১৬২. কঙ্গো ১৬১. মালি ১৬০. সলোমন দীপপুঞ্জ ১৫৯. নাইজার ১৫৮. পাকিস্তান ১৫৭. ইথিওপিয়া ১৫৬. সুদান।
ডেইলি বেস্ট লিখেছে বিশ্লেষণের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান দুটি দেশ অনুসারে নারীর অবস্থা বোঝার জন্য এ আয়োজন করেছে। ন্যায়বিচার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতি- এই ৫টি বিষয়কে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই ৫টি বিষয়ে তারা দেশগুলোতে ০ থেকে ১০০-এর মধ্যে নাম্বার দিয়েছে।
বিচার্য বিষয় ছিল-
ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে
বয়সের আগে বিয়ের হার, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন আছে কি না, বিবাহ বা ঘনিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে শারীরিক ও যৌননির্যাতনের বিচার হয় কি না, নাগরিক অধিকার : নারীরা মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারে কিনা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে কি না। সম্পদ ও জমিতে তাদের অধিকার আছে কি না। উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি গুরুত্ব পায় কি না।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে
বয়ঃসন্ধি কালে প্রসব হার, প্রসবকালীন মৃত্যু হার, জন্মনিরোধক ব্যবস্থা, প্রসবকালীন স্বাস্থ্যসেবা, এইচআইভি সংক্রমণ, অ্যাবরশন বৈধ থাকলে তা কী উদ্দেশে প্রযুক্ত হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে
বয়স্ক নারী শিক্ষার হার, তরুণ নারীদের স্বাক্ষরতার হার, ২৫ বছরের বেশি বয়সের নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীনতার হার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিকে থাকা নারীর হার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে লিঙ্গ বৈষম্য।
অর্থনীতি ক্ষেত্রে
মেয়েরা কারখানায় কাজ করতে পারে কি না
শ্রমিকদের মধ্যে কত শতাংশ নারী
নারীদের পারিশ্রমিক পুরুষদের তুলনায় কেমন
উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের সম্ভাবনা কতটা
রাজনীতিতে
মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা
সংসদে নারীর উপস্থিতি
উচ্চতর পদে নারীর হার
পুরুষের তুলনায় নারী আইন প্রণেতা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ম্যানেজারের হার কত।
নিউজউইক ও ডেইলি বেস্ট যেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে তা ন্যায্য বলেই মনে হয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন জরিপ নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক আমাদের দেশে তৈরি হয় তাতে মেঠো যুক্তিতে জরিপের ফল বাতিলের প্রবণতা থাকে। আবার কিছু ন্যায্য তর্কও ওঠে। যেমন, কখনো কখনো জরিপ ইওরোসেন্ট্রিক ধারণা থেকে করা হয়। ইওরোপ-আমেরিকার মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি তাতে অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতি বিচারের টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন না তুলেই বিভিন্ন দেশের জীবনমানের তুলনা করা হয়েছে এমনও অনেক সময় ঘটেছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত যেসব জরিপ নিয়ে আমাদের দেশে তোলপাড় হয় তার কিছু নির্দিষ্ট ধরন আছে। রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথেও সেগুলোর সংশ্লিষ্টতা থাকে। দুর্নীতি, গণতন্ত্র কখন মিডিয়ায় কত গুরুত্ব পাবে তা নির্ভর করে রাজনীতির হালচালের ওপর। অনেক সময় এদেশে জরিপকারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বিষয়টিকে ফোকাস করেন। জরিপের কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ তা যেমন বলে দেন, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষ মনোযোগী তাও বলে দেন। স্বাভাবিকভাবে করণীয় নির্ধারণের পরামর্শও তারা দিয়ে থাকেন।
কিন্তু কোনো পত্রিকা যখন জরিপ বা তথ্য বিশ্লেষণ করে তখন বোধগম্য কারণেই তাদের প্রতিনিধিরা ঢাকায় প্রেস কনফারেন্স করেন না। পাঠকদের চোখে পড়লে সেটি আলোচিত হয়, কোনো স্থানীয় পত্রিকা মনে করলে সেটি অল্প-বিস্তর প্রচারও পায়। ব্যক্তিগতভাবে এমন জরিপ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতির প্রচারেই পাঠক হিসেবে আমি স্বস্তি বোধ করি।
নিউজউইক/ডেইলি বেস্টের তালিকা দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হয়, এতে পশ্চিমাদের প্রতি পক্ষপাতের ব্যাপার নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নারীর জন্য সন্তোষজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ দরকার। একটি দেশের অথনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে বরাদ্দ জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দেশ এমন বরাদ্দ দিতে পারবে কেন? তালিকার শেষ দিকের অধিকাংশ দেশই অর্থনৈতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে। কিন্তু ১৪৭ নম্বর দেশ সৌদি আরব কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে নেই। তবে কি সমস্যাটা মুসলিম অধ্যুষিত মানুষের দেশেই বেশি? তাহলে ভারতের অবস্থান ১৪১ নম্বরে থাকে কী করে? অর্থনৈতিকভাবে পেছনের সারির দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের মুখে থাকা মুসলিম অধ্যুষিত মালদ্বীপকে তাহলে কী বলা হবে? দেশটি তালিকার ৯২ তম অবস্থানে এসেছে। এমনকি সমস্যাটি গণতন্ত্রেরও মনে হয় না। কেননা, সামরিক শাসনের জন্য দুর্নাম কামানো মায়ানমার আছে ৯১ তম অবস্থানে। গণতন্ত্রের দীর্ঘ ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, মুসলিম অপ্রাধান্য সত্ত্বেও জাপান ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় আসতে পারে নি। তারা ৮৭ নম্বর অবস্থানে। মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়া জাপানের থেকে এগিয়ে ৮১ নম্বরে। পূর্ব ইউরোপের দেশ হলেও, রিপাবলিক অব মলডোভা দেশটির কথা খুব বেশি লোকের জানা নেই, অথচ নারীর বসবাসযোগ্য দেশের তালিকায় তারা পশ্চিম ইওরোপ-উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর খুব কাছাকাছি ১৬ নম্বর অবস্থানে। আবার চীন যেখানে ২৩ নম্বরে জার্মানি কিন্তু সেখানে ৩০-এ। এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো তথ্যগুলোর দিকে সার্বিক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে। সত্যটি হলো- গণতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ভেদে নারীর অবস্থা একই হতে পারে, আবার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাও সবসময় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে না, এমনকি ধর্মীয় নৈতিকতাও সবসময় প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে না। তবে, নারীকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে কী, আর সামনেই বা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোন ব্যাপারগুলো? আমি যতদূর বুঝলাম তাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে সরকারগুলো আন্তরিক হলেই নিউজউইক/ ডেইলি বেস্ট তালিকায় একটি দেশের ভাল অবস্থানে আসা সম্ভব। এর ভেতর আরও কোনো গভীর তত্ত্ব থাকলে তা আমরা ভবিষ্যতে খুঁজতে পারি।
তালিকাটি এশিয়ার জন্য রীতিমতো দুসংবাদ বয়ে এনেছে। নারীর বসবাসযোগ্য সেরা ১০ দেশের তালিকায় এশিয়ার কোনো দেশ নেই। একমাত্র এশীয় দেশ হিসেবে প্রথম ২০ তালিকার ১৭ নম্বরে আছে ফিলিপাইন ১৭ নম্বরে। সেরা ৩০-এ এশিয়ার একমাত্র দেশ চীন। কিন্তু শেষদিকে এশিয়া-আফ্রিকার রমরমা। শেষ ১০-এ এশিয়ার আফগানিস্তান-পাকিস্তান তো আছেই।
তালিকার শেষ দেশ চাদ। দেশটির গড় স্কোর ০.০। দেশটিতে নারীদের প্রায় কোনো আইনি অধিকার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের বয়স ১১-১২ বছর। ন্যায়বিচারে : ২০.৭, স্বাস্থ্যে ০.০, শিক্ষায় ০.০, অর্থনীতিতে ৭০.৯, রাজনীতিতে ২২.২ স্কোর দেশটির। প্রথম অবস্থানে আইসল্যান্ড। দেশটির গড় স্কোর ১০০। ন্যায়বিচারে : ১০০, স্বাস্থ্যে ৯০.৫, শিক্ষায় ৯৬.৭, অর্থনীতিতে ৮৮.০, রাজনীতিতে ৯২.৮।
এবার এশিয়ার কয়েকটি দেশের স্কোর পাশাপাশি রাখা যাক।
আফগানিস্তান
গড় স্কোর : ২.০
ন্যায়বিচার : ৮.৪
স্বাস্থ্য : ২.০
শিক্ষা :৪১.১
অর্থনীতি : ৫৫.৩
রাজনীতি : ১৬.৬
পাকিস্তান
গড় স্কোর : ২১.৪
ন্যায়বিচার : ৪৯.৭
স্বাস্থ্য : ৪৯.৬
শিক্ষা : ৩৪.০
অর্থনীতি : ৫০.৭
রাজনীতি : ১৯.৩
ভারত
গড় স্কোর ৪১.৯
ন্যায়বিচার : ৫৪.০
স্বাস্থ্য : ৬৪.১
শিক্ষা : ৬৪.৯
অর্থনীতি : ৬০.৭
রাজনীতি : ১৪.৮
মায়ানমার
গড় স্কোর ৬৬.৫
ন্যায়বিচার : ৬৭.৯
স্বাস্থ্য : ৪৯.৫
শিক্ষা : ৯৪.০
অর্থনীতি : ৮৭.৯
রাজনীতি : ৭.৫
বাংলাদেশ
গড় স্কোর ৪২.১
ন্যায়বিচার : ৩৫.৫
স্বাস্থ্য : ৪৫.৭
শিক্ষা : ৬৯.২
অর্থনীতি : ৭৫.১
রাজনীতি : ২০.৪
তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯-এ। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ নারীদের জন্য অনেক বেশি বসবাসযোগ্য। ভারতের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। কিন্তু তাতে খুব বেশি খুশী হওয়ার কারণ নেই। যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে তাতে কী কী করতে হবে তা সকলের জানা। কাজগুলো করতে বিপ্লবও করতে হবে না। আমাদের সরকারগুলো আন্তরিক হলেই সম্ভব।
সম্পর্কিত লিংক
মাহবুব মোর্শেদ: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১। ডিএনএইনডিয়া ডট কমের একটি খবরে চোখ আটকে গেল। ডেইলি নিউজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (ডিএনএ) ভারতের একটি অনলাইন সংবাদপত্র। সংবাদপত্রটি একটি জরিপের বরাত দিয়ে লিখেছে, পৃথিবীতে নারীর বসবাসযোগ্য ১৬৫ দেশের তালিকায় ভারতের অবস্থান ১৪১-এ। পৃথিবীর উদীয়মান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময়ে নারীদের জন্য বসবাসযোগ্য দেশের তালিকার শেষ দিকে ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ খবর বটে। কিন্তু, খবরটি ভারতীয় মিডিয়ায় তেমন কল্কে পায়নি। বাংলাদেশেও খুব বেশি মানুষের চোখে পড়েছে বলে মনে হলো না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি সুখবর হতে পারতো। কারণ, ডিএনএ লিখেছে, ভারত যে শুধু ১৪১ নম্বর অবস্থানে আছে তা-ই নয়, এমনকি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, শ্রী লংকা, চীনও ভারতের থেকে এগিয়ে আছে। চীন এগিয়ে আছে একথা কার্পণ্য করে ডিএনএ লিখেছে বটে, কিন্তু তারা যে অনেক এগিয়ে এবং ২৩ নম্বরে সেটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার ছিল। ভারতের প্রতিযোগিতা তো চীনের সঙ্গেই হওয়ার কথা। এ বিষয়ে ডিএনএ কথা বলেছে একজন রাজনীতিকের সঙ্গে। ইউনিভার্সেল সোসাইটি অব হিন্দুইজমের প্রেসিডেন্ট রাজন জেড তাদের বলেছেন, ভারত বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে থাকলেও এই নতুন সক্ষমতা ও সমৃদ্ধিতে অনেকেরই বিশেষ করে নারীদের অধিকার অবারিত নয়।
খবরটি পড়তে পড়তে মনে পড়ছিল গত সপ্তাহেই ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় ’গ্রোথ ইজ নট এনাফ’ শিরোনামের একটি খবরের কথা। তাতে গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধি যে নারীকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারে না, তার একটি ছোট বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীন প্রবৃদ্ধিতে চ্যাম্পিয়ন হতে চললেও অতিরিক্ত নারীমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি চীন ও ভারতেই। হিসাব পুরো দুনিয়ার। তাতে এক নাম্বারে চীন আর দুই নাম্বারে ভারত। প্রশ্ন উঠবে, প্রবৃদ্ধি যদি যথেষ্ট না হয়, তবে কী দরকার? প্রশ্নটা তোলা থাকুক।
নিউজউইক/ডেইলি বেস্টের জরিপ প্রসঙ্গেই ফেরা যাক। প্রথাগত জরিপ ঠিক নয়, একে বলতে হয়- জরিপ ও বিশ্লেষণ। বেস্ট অ্যান্ড ওর্স্ট প্লেসেস ফর উওমেন বা নারীর জন্য ভাল ও খারাপ দেশ- জরিপ ও বিশ্লেষণের বিষয়। উদ্যোগটি নিউজউইক ম্যাগাজিন ও ডেইলি বেস্ট সংবাদপত্রের। নিউজউইকের ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় বিশ্লেষণ ও জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। ডেইলি বেস্টও একই দিন এটি প্রচার করেছে। পত্রিকা দুটির অনুসন্ধানের বিষয় ছিল- কোন দেশ নারীকে সবচেয়ে বেশি অধিকার দিচ্ছে এবং নারীর জীবনমান কোথায় বেশি। প্রথম দশটি দেশ হলো- ১. আইসল্যান্ড ২. সুইডেন ৩. কানাডা ৪. ডেনমার্ক ৫.ফিনল্যান্ড ৬ সুইজারল্যান্ড ৭. নরওয়ে ৮. যুক্তরাষ্ট্র ৯.অস্ট্রেলিয়া ১০. নেদারল্যান্ডস। তালিকার শেষ দশটি দেশ হলো- ১৬৫.চাদ ১৬৪. আফগানিস্তান ১৬৩. ইয়েমেন ১৬২. কঙ্গো ১৬১. মালি ১৬০. সলোমন দীপপুঞ্জ ১৫৯. নাইজার ১৫৮. পাকিস্তান ১৫৭. ইথিওপিয়া ১৫৬. সুদান।
ডেইলি বেস্ট লিখেছে বিশ্লেষণের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান দুটি দেশ অনুসারে নারীর অবস্থা বোঝার জন্য এ আয়োজন করেছে। ন্যায়বিচার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতি- এই ৫টি বিষয়কে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই ৫টি বিষয়ে তারা দেশগুলোতে ০ থেকে ১০০-এর মধ্যে নাম্বার দিয়েছে।
বিচার্য বিষয় ছিল-
ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে
বয়সের আগে বিয়ের হার, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন আছে কি না, বিবাহ বা ঘনিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে শারীরিক ও যৌননির্যাতনের বিচার হয় কি না, নাগরিক অধিকার : নারীরা মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারে কিনা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে কি না। সম্পদ ও জমিতে তাদের অধিকার আছে কি না। উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি গুরুত্ব পায় কি না।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে
বয়ঃসন্ধি কালে প্রসব হার, প্রসবকালীন মৃত্যু হার, জন্মনিরোধক ব্যবস্থা, প্রসবকালীন স্বাস্থ্যসেবা, এইচআইভি সংক্রমণ, অ্যাবরশন বৈধ থাকলে তা কী উদ্দেশে প্রযুক্ত হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে
বয়স্ক নারী শিক্ষার হার, তরুণ নারীদের স্বাক্ষরতার হার, ২৫ বছরের বেশি বয়সের নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীনতার হার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিকে থাকা নারীর হার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে লিঙ্গ বৈষম্য।
অর্থনীতি ক্ষেত্রে
মেয়েরা কারখানায় কাজ করতে পারে কি না
শ্রমিকদের মধ্যে কত শতাংশ নারী
নারীদের পারিশ্রমিক পুরুষদের তুলনায় কেমন
উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের সম্ভাবনা কতটা
রাজনীতিতে
মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা
সংসদে নারীর উপস্থিতি
উচ্চতর পদে নারীর হার
পুরুষের তুলনায় নারী আইন প্রণেতা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ম্যানেজারের হার কত।
নিউজউইক ও ডেইলি বেস্ট যেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে তা ন্যায্য বলেই মনে হয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন জরিপ নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক আমাদের দেশে তৈরি হয় তাতে মেঠো যুক্তিতে জরিপের ফল বাতিলের প্রবণতা থাকে। আবার কিছু ন্যায্য তর্কও ওঠে। যেমন, কখনো কখনো জরিপ ইওরোসেন্ট্রিক ধারণা থেকে করা হয়। ইওরোপ-আমেরিকার মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি তাতে অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতি বিচারের টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন না তুলেই বিভিন্ন দেশের জীবনমানের তুলনা করা হয়েছে এমনও অনেক সময় ঘটেছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত যেসব জরিপ নিয়ে আমাদের দেশে তোলপাড় হয় তার কিছু নির্দিষ্ট ধরন আছে। রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথেও সেগুলোর সংশ্লিষ্টতা থাকে। দুর্নীতি, গণতন্ত্র কখন মিডিয়ায় কত গুরুত্ব পাবে তা নির্ভর করে রাজনীতির হালচালের ওপর। অনেক সময় এদেশে জরিপকারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বিষয়টিকে ফোকাস করেন। জরিপের কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ তা যেমন বলে দেন, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষ মনোযোগী তাও বলে দেন। স্বাভাবিকভাবে করণীয় নির্ধারণের পরামর্শও তারা দিয়ে থাকেন।
কিন্তু কোনো পত্রিকা যখন জরিপ বা তথ্য বিশ্লেষণ করে তখন বোধগম্য কারণেই তাদের প্রতিনিধিরা ঢাকায় প্রেস কনফারেন্স করেন না। পাঠকদের চোখে পড়লে সেটি আলোচিত হয়, কোনো স্থানীয় পত্রিকা মনে করলে সেটি অল্প-বিস্তর প্রচারও পায়। ব্যক্তিগতভাবে এমন জরিপ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতির প্রচারেই পাঠক হিসেবে আমি স্বস্তি বোধ করি।
নিউজউইক/ডেইলি বেস্টের তালিকা দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হয়, এতে পশ্চিমাদের প্রতি পক্ষপাতের ব্যাপার নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নারীর জন্য সন্তোষজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ দরকার। একটি দেশের অথনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে বরাদ্দ জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দেশ এমন বরাদ্দ দিতে পারবে কেন? তালিকার শেষ দিকের অধিকাংশ দেশই অর্থনৈতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে। কিন্তু ১৪৭ নম্বর দেশ সৌদি আরব কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে নেই। তবে কি সমস্যাটা মুসলিম অধ্যুষিত মানুষের দেশেই বেশি? তাহলে ভারতের অবস্থান ১৪১ নম্বরে থাকে কী করে? অর্থনৈতিকভাবে পেছনের সারির দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের মুখে থাকা মুসলিম অধ্যুষিত মালদ্বীপকে তাহলে কী বলা হবে? দেশটি তালিকার ৯২ তম অবস্থানে এসেছে। এমনকি সমস্যাটি গণতন্ত্রেরও মনে হয় না। কেননা, সামরিক শাসনের জন্য দুর্নাম কামানো মায়ানমার আছে ৯১ তম অবস্থানে। গণতন্ত্রের দীর্ঘ ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, মুসলিম অপ্রাধান্য সত্ত্বেও জাপান ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় আসতে পারে নি। তারা ৮৭ নম্বর অবস্থানে। মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়া জাপানের থেকে এগিয়ে ৮১ নম্বরে। পূর্ব ইউরোপের দেশ হলেও, রিপাবলিক অব মলডোভা দেশটির কথা খুব বেশি লোকের জানা নেই, অথচ নারীর বসবাসযোগ্য দেশের তালিকায় তারা পশ্চিম ইওরোপ-উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর খুব কাছাকাছি ১৬ নম্বর অবস্থানে। আবার চীন যেখানে ২৩ নম্বরে জার্মানি কিন্তু সেখানে ৩০-এ। এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো তথ্যগুলোর দিকে সার্বিক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে। সত্যটি হলো- গণতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ভেদে নারীর অবস্থা একই হতে পারে, আবার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাও সবসময় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে না, এমনকি ধর্মীয় নৈতিকতাও সবসময় প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে না। তবে, নারীকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে কী, আর সামনেই বা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোন ব্যাপারগুলো? আমি যতদূর বুঝলাম তাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে সরকারগুলো আন্তরিক হলেই নিউজউইক/ ডেইলি বেস্ট তালিকায় একটি দেশের ভাল অবস্থানে আসা সম্ভব। এর ভেতর আরও কোনো গভীর তত্ত্ব থাকলে তা আমরা ভবিষ্যতে খুঁজতে পারি।
তালিকাটি এশিয়ার জন্য রীতিমতো দুসংবাদ বয়ে এনেছে। নারীর বসবাসযোগ্য সেরা ১০ দেশের তালিকায় এশিয়ার কোনো দেশ নেই। একমাত্র এশীয় দেশ হিসেবে প্রথম ২০ তালিকার ১৭ নম্বরে আছে ফিলিপাইন ১৭ নম্বরে। সেরা ৩০-এ এশিয়ার একমাত্র দেশ চীন। কিন্তু শেষদিকে এশিয়া-আফ্রিকার রমরমা। শেষ ১০-এ এশিয়ার আফগানিস্তান-পাকিস্তান তো আছেই।
তালিকার শেষ দেশ চাদ। দেশটির গড় স্কোর ০.০। দেশটিতে নারীদের প্রায় কোনো আইনি অধিকার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের বয়স ১১-১২ বছর। ন্যায়বিচারে : ২০.৭, স্বাস্থ্যে ০.০, শিক্ষায় ০.০, অর্থনীতিতে ৭০.৯, রাজনীতিতে ২২.২ স্কোর দেশটির। প্রথম অবস্থানে আইসল্যান্ড। দেশটির গড় স্কোর ১০০। ন্যায়বিচারে : ১০০, স্বাস্থ্যে ৯০.৫, শিক্ষায় ৯৬.৭, অর্থনীতিতে ৮৮.০, রাজনীতিতে ৯২.৮।
এবার এশিয়ার কয়েকটি দেশের স্কোর পাশাপাশি রাখা যাক।
আফগানিস্তান
গড় স্কোর : ২.০
ন্যায়বিচার : ৮.৪
স্বাস্থ্য : ২.০
শিক্ষা :৪১.১
অর্থনীতি : ৫৫.৩
রাজনীতি : ১৬.৬
পাকিস্তান
গড় স্কোর : ২১.৪
ন্যায়বিচার : ৪৯.৭
স্বাস্থ্য : ৪৯.৬
শিক্ষা : ৩৪.০
অর্থনীতি : ৫০.৭
রাজনীতি : ১৯.৩
ভারত
গড় স্কোর ৪১.৯
ন্যায়বিচার : ৫৪.০
স্বাস্থ্য : ৬৪.১
শিক্ষা : ৬৪.৯
অর্থনীতি : ৬০.৭
রাজনীতি : ১৪.৮
মায়ানমার
গড় স্কোর ৬৬.৫
ন্যায়বিচার : ৬৭.৯
স্বাস্থ্য : ৪৯.৫
শিক্ষা : ৯৪.০
অর্থনীতি : ৮৭.৯
রাজনীতি : ৭.৫
বাংলাদেশ
গড় স্কোর ৪২.১
ন্যায়বিচার : ৩৫.৫
স্বাস্থ্য : ৪৫.৭
শিক্ষা : ৬৯.২
অর্থনীতি : ৭৫.১
রাজনীতি : ২০.৪
তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯-এ। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ নারীদের জন্য অনেক বেশি বসবাসযোগ্য। ভারতের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। কিন্তু তাতে খুব বেশি খুশী হওয়ার কারণ নেই। যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে তাতে কী কী করতে হবে তা সকলের জানা। কাজগুলো করতে বিপ্লবও করতে হবে না। আমাদের সরকারগুলো আন্তরিক হলেই সম্ভব।
সম্পর্কিত লিংক
মাহবুব মোর্শেদ: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
জুনিয়র হরলিক্স, কিড’স হিন্দি
জুলাই ২৪, ২০১১ বিডিনিউজে প্রকাশিত
বিজ্ঞাপনটি অনেকেরই দেখা। বিজ্ঞাপনের কথাগুলো এমন :
শুধু লম্বা হলেই- আকাশ ছোঁয়া যায় না
শুধু বুদ্ধির জোরে- সাংবাদিকতা হয় না
শুধু শক্তি থাকলেই- সাঁতারু হওয়া যায় না
তাহলে কী দরকার?
খুব জরুরি প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞাপনেই দেওয়া আছে। তবু আমরা নিজেদের মতো করে উত্তর খুঁজবো। উত্তর খোঁজার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিছু আলাপও পেড়ে নেব।
সবার আগে বলে রাখি, হরলিক্সের বিজ্ঞাপন নিয়ে অতীতে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। হরলিক্স কোম্পানিকে সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার পর্যন্ত করতে হয়েছে। এখানে তেমন পুষ্টিগত বিতর্ক তোলার উদ্দেশ্য নেই। যে বিজ্ঞাপনটার কথা বলছি সেটি বরং আমার বিশেষ পছন্দ। সাধারণত যারা টিভি বিজ্ঞাপনের মডেল হন তারা এতে মডেল হননি। পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে কলকাতায় পরিচিত কয়েকজন নারী এতে মডেল হয়েছেন। এদের একজন সাংবাদিক, একজন বৈমানিক, একজন সাঁতারু। কলকাতার বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোতে হরলিক্সের এই বিজ্ঞাপন অনেকবার দেখেছি। চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে নিজেদের পেশায় সফল নারীরা সাধারণত নাম ও পেশাগত পরিচয়সহ বিজ্ঞাপনে হাজির হতে পারেন না। কিন্তু এ বিজ্ঞাপনে সেটা ঘটতে পেরেছে। কিন্তু খটকা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতেও বিজ্ঞাপনটা দেখানোর পর। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে পেশাগত পরিচয় রেখে মডেলদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। কেন এমন করা হলো? বাংলাদেশে এদের পরিচিতি নেই বলে? নাম-পরিচয় রাখলে কেউ কি প্রশ্ন তুলতেন, এরা কোথাকার সাংবাদিক বা বৈমানিক বা সাঁতারু? এমন প্রশ্ন উঠলে উত্তর মেলা কি কঠিন হতো? ভারতে তৈরি অনেক বিজ্ঞাপনই তো অহরহ বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়। হিন্দিভাষায় নির্মিত বিজ্ঞাপন স্রেফ বাংলায় ডাবিং করে প্রচার করার ঐতিহ্যই রীতিমতো গড়ে উঠেছে। সে বিজ্ঞাপনগুলো দেখে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেন না- ঐশ্বরিয়া, প্রিয়াঙ্কা, দীপিকা, শাহরুখ কোথাকার অভিনেতা। প্রশ্ন ওঠে না, কারণ সবাই কমবেশি এদের চেনেন। কিন্তু কলকাতার খানিকটা অপরিচিত সেলিব্রেটিদের নিয়ে খটকা বেধেছে। বাংলাদেশে, এবং সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গেও খুব বেশি মানুষের জানাশোনা নেই এদের সঙ্গে। তবু পশ্চিমবঙ্গে নামপরিচয়সহ কাজ চলেছে, বাংলাদেশে চলছে না। বিজ্ঞাপনটি এখানে প্রচারের আগে কী ভাবা হয়েছিল? মডেলদের নাম-পরিচয়সহ উপস্থাপন করা হলে বাংলাদেশে প্রশ্ন উঠবে? হয়তো দাবিও উঠবে, বাংলাদেশের এমন নারীদের নিয়ে আরেকটা বিজ্ঞাপন তৈরি করা হোক? দাবি উঠলে, সেটি করা কঠিন হতো না।
বাংলাদেশে হরলিক্সের বাজার ছোট নয়- শুধু হরলিক্স কেন কোনো কমোডিটির বাজারই ছোট নয়। তবু বিজ্ঞাপনগুলো আসে পাশের বড়বাজার থেকে তৈরি হয়ে। তাদের নায়ক-নায়িকাদের মুখশ্রী সে বিজ্ঞাপন আলোকিত করে। এসব দেখে কাউকে এমন দাবি তুলতে দেখা যায়নি যে- শাহরুখের বদলে তো শাকিব, ঐশ্বরিয়ার বদলে শাবনুর কিংবা আসিনের বদলে মোনালিসাকে নিয়ে বিজ্ঞাপনটি একান্তই বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের জন্য প্রচার করা হোক।
যে যুক্তিতে ভারতে নির্মিত সব বিজ্ঞাপন সেগুলোর আলোছায়াসঙ্গীত সহকারে শুধু ভাষা পরিবর্তন করে বাংলাদেশে সম্প্রচারিত হতে পারে সেই একই যুক্তিতে ভারতের কোনো মেট্রপলিটন শহরের আইকনদের নামপরিচয়সহ একটি বিজ্ঞাপনও প্রচার করা সম্ভব। সেই যুক্তিটা কী?
অবশ্যই বাজার।
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো যখন দক্ষিণ এশিয়ার ম্যাপ নিয়ে বসে তখন নিশ্চয়ই তারা একে একটি সাংস্কৃতিক একক হিসেবে বিবেচনা করে। এই এলাকার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বার্মা-থাইল্যান্ড-ফিলিপাইন-চীনের মতো নয়, আবার ইরান-ইরাক-সিরিয়ার মতোও নয়। মধ্য এশিয়া বা পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অমিল আছে বলে দক্ষিণ এশিয়া আলাদা একক। দক্ষিণ এশিয়াও সমরূপ কোনো এলাকা নয়। এখানে বহু দেশ, বহুজাতি, বহুভাষা, বহু নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। শুধু ভারতকে বিবেচনায় আনা হলেও বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের প্রশ্ন তুলে রেখে বাজারের প্রশ্নকে সামনে আনা হলে বাজারের কেন্দ্র ভারতই। শুধু কেন্দ্র নয় পরিধির অনেকটা জুড়েও ভারত। ভারতের বাইরে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানেও বাজার তুলনামূলকভাবে ছোট। কিন্তু সেটাও বাজার বটে। তাই মুম্বাই বা দিল্লিতে সাউথ এশিয়া অফিস খুলে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি চেষ্টা করে ভারতের বাইরের পরিধিকেও সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। ভারতের নিজস্ব প্রস্তুতি ও অবকাঠামো এক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। যেমন- বলিউডের সিনেমা, শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাতেও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশে বসে সহজেই বলিউডের সিনেমা উপভোগ করা যায়। ফলে, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন ভারতের শুধু নয়, আমাদেরও আইকন। বাংলাদেশে অনেকেই তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের খবর রাখেন। যেমন বচ্চন পরিবারের পুত্রবধু এখন অন্তঃসত্ত্বা, তার গর্ভে যমজ দুটি মেয়ে বেড়ে উঠছে। মুম্বাইতে বসে ইউনিলিভার যখন হিন্দি ভাষায় লাক্সের একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে এবং তাতে মডেল হন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন তখন মারাঠি, তামিল, তেলেগু, নেপালি, বাংলা, উর্দুসহ যে কোনো দক্ষিণ এশীয় ভাষায় একে ডাবিং করে ভারতসহ যে কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশে প্রচার করা সম্ভব। বাস্তবে তা ঘটেও। এ নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠে না। এক যুগ আগে এমন হতো কি না, হলেও প্রশ্ন উঠতো কি না তেমন তথ্য আপাতত হাতে নেই। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তির বিপুল বিস্ফারের এ যুগে কেউ এমন প্রশ্ন তোলেন না। চ্যানেল ঘোরালেই, ডিভিডি চালালেই যাকে প্রতিনিয়ত দেখি- তাকে দেশের চ্যানেলে দেখলে প্রশ্ন তোলা অসঙ্গত বটে, হিপোক্রেসিও।
দর্শক হিসেবে আমি বলিউডে নির্মিত হিন্দি সিনেমার অনুরক্ত। সেখানকার তরুণতর নির্মাতারা নিত্যনতুন আইডিয়া নিয়ে যেভাবে একের পর এক সিনেমা তৈরি করে চলেছেন তা চমকপ্রদ। শুধু বিনোদন ও জনপ্রিয়তাতেই নয়, শিল্পমানেও সমৃদ্ধ অনেক সিনেমা। বলিউড রীতিমতো একটি ইন্ডাস্ট্রি। তেমন ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে ওঠার বা চমকে-বৈভবে পরিপূর্ণ তেমন সিনেমা তৈরির সম্ভাবনা বাংলাদেশে নেই, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশেও নেই। ফলে, সে সিনেমাকে তার নায়ক-নায়িকা, ফ্যাশন, কমোডিটি, বাজার সম্ভাবনা সহকারে আমরা গ্রহণ করেছি। এতে আমরা অসুখী নই, বরং স্বস্তিতেই আছি বলা যায়। শুধু বলিউডের সিনেমাই নয়, বলিউডের সিনেমা যে ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যে সংস্কৃতি টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নির্মিত ও পুননির্মিত হয়ে চলেছে তারও স্বতঃস্ফূর্ত গ্রাহক আমরা। সত্যি বলতে, দিনের যে কোনো সময় কেউ যদি সিনেমা দেখতে চান, বাচ্চারা যদি কার্টুন দেখতে চায়, কারো যদি গান শোনার ইচ্ছা নয়, কিংবা কেউ যদি সোপ অপেরা দেখতে চান কিংবা কোনো হাসির অনুষ্ঠান যদি কেউ খোঁজ করেন তবে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর দারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমনকি নিউজ কর্পোরেশন, সনি বা ওয়াল্ট ডিজনির মতো মাল্টিন্যাশনাল সম্প্রচারকদের টিভি চ্যানেলগুলোও এখন ভারতীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। ১৯৯২ সালে ভারতে কেবল টেলিভিশন উন্মুক্ত হওয়ার পর বড়বাজারের আকর্ষণে রুপার্ট মারডকের স্টার টিভি নেটওয়ার্ক, এমটিভিসহ অনেক মাল্টিন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারিত করে। স্টার টিভি নেটওয়ার্ক ভারতের বিভিন্ন ভাষার জন্য, বিভিন্ন গোষ্ঠীর দর্শকের জন্য ৩২টি চ্যানেল খুলেছে। সিএনএন, ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকও ভারতে বাজার সৃষ্টির জন্য তৎপর। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে কেবল টেলিভিশন উন্মুক্ত হওয়ার পর দৃশ্যমানভাবে কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এখানে চ্যানেল খোলেনি, আগ্রহ দেখিয়েছে এমন তথ্যও নেই। তার কারণও বাজার- বাজার শুধু দর্শক নয়, বিজ্ঞাপনদাতারাও। আমরা যখন স্টার মুভিজে সিনেমা দেখি তখন সেটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এশিয়াস্যাটের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয় বটে কিন্তু সম্প্রচারের সময় যে বিজ্ঞাপন দেখা যায় তা একান্তই ভারতীয় দর্শকদের জন্য। বিজ্ঞাপনে আমরা এমন অনেক কিছু দেখি যা আমাদের বাজারে পাওয়া যায় না। যেমন- ডিটিএইচ টেকনলজি। টাটা স্কাই বা ডিশ টিভির বিজ্ঞাপন দেখি, কিন্তু এগুলো কী জানি না। সরাসরি ঘরে স্যাটেলাইট সম্প্রচারের প্রযুক্তি আমরা চিনি না, কিন্তু দেখতে দেখতে চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
অবশ্য বিজ্ঞাপনে দেখা অধিকাংশ পণ্যই হাত বাড়ালে স্থানীয় বাজারে মেলে। বিজ্ঞাপন দেখে সেগুলো কিনতে প্ররোচিতও হই আমরা। যখন লাক্স সাবান কিনি তখন স্টার মুভিজ, বাংলাভিশন নাকি জিটিভিতে বিজ্ঞাপন দেখে কিনলাম সেটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে নির্মিত পণ্যের অবস্থান আমাদের কেনাকাটার তালিকায় আছে কি? এখন থাকলেও এই ভিজ্যুয়াল অভ্যাসে আর কতদিন থাকবে?
শুধু কেনাকাটায় নয়, ভেতরে ভেতরে সমাজে-পরিবারে একটা সাংস্কৃতিক রূপান্তরও কি ঘটছে না?
আমার এক বন্ধু তার মেয়েকে নিয়ে রীতিমতো চিন্তিত। ছোটবড় কোনো সমস্যা হলে তার চার বছরের মেয়ে লর্ড গণেশাকে ডাকে। ’মাই ফ্রেন্ড গনেশা, মুঝে বাঁচাও’ বলে গণেশার সাহায্য চায়। মেয়ে যে গণেশাকে ডাকে এতে সমস্যা নেই। কিন্তু মেয়ে গণেশার কাছে আবদার জানায় হিন্দি ভাষায়। ভাষা শিক্ষার জটিল একটি সময়ে বাচ্চা দিনের একটা বড় অংশ হিন্দি চ্যানেল দেখে ব্যয় করে। না, জিটিভি বা সনিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখে না। দেখে বাচ্চাদের চ্যানেলই। কিন্তু ডিজনি, কার্টুন নেটওয়ার্ক, পোগোসহ অনেক চ্যানেলই এখন ভারতের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচারে চলে এসেছে। এগুলো এখন হিন্দিতে সম্প্রচারিত হয়, একটি দুটি তেলেগুতেও সম্প্রচার করে। ডোরেমন-পোকেমন দেখার ফাঁকে ফাঁকে হিন্দি শিখছে মেয়ে। টুকটাক হিন্দি বলতে পারে, বুঝতে পারে প্রায় সবই। মুফতে একটি ভাষা শিখে ফেলছে- এতে অভিভাবকদের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো ব্যাজার হচ্ছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, ইংরেজি তো শিখতেই হয়, বিকল্প নেই। কিন্তু ইংরেজির সঙ্গে বাংলার মৌলিক পার্থক্য আছে, বাচ্চারা বুঝে ফেলে এটি আলাদা ভাষা। কিন্তু হিন্দি তাদের কনফিউশনে ফেলে দেয়। কাছাকাছি ভাষা বলে বাংলা বোলে হিন্দি ঢুকে পড়ছে অনায়াসে। আর সবচেয়ে পছন্দের অনুষ্ঠানগুলো দেখতে দেখতে তারা যে বোল শোনে তা মনেও থাকে, গেঁথে যায়। ফলে, একটি জেনারেশন না চাইতেই তিন ভাষা শিখতে শিখতে বেড়ে উঠছে। এর বাইরে আর কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না তা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ অবশ্য ঘরে হিন্দির বসতি ও বেড়ে ওঠা নিয়ে সচেতন নন। কিন্তু যারা সচেতন তারা কী করবেন? টিভি বন্ধ করে দেবেন? উপায় নেই। বাংলাদেশের চ্যানেল দেখাবেন? বাচ্চারা মজা পাবে না। উপায় হলো, অন্তত বাচ্চাদের চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচার দাবি করা। হিন্দি বন্ধ করে ইংলিশ সম্প্রচারে ফিরে যাওয়ার যুক্তি আপাতত নেই। কিন্তু যেভাবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারি চ্যানেল, পিসটিভি বাংলায় সম্প্রচার শুরু করেছে- সেভাবে বাচ্চাদের চ্যানেলের অনুষ্ঠানগুলো বাংলায় ডাবিং করে বাংলাদেশ অঞ্চলে প্রচার করা যেতে পারে। তাতে বাচ্চারা আরও ভালভাবে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবে। ডাবিং করার দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো নিতে পারে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষগুলোকে তৎপর হতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচারের দাবি জোরেশোরে তুলতে হবে। কিন্তু আমাদের সরকার কি তেমন দাবি তুলতে পারবে? যেখানে আমরা স্বেচ্ছায় সানন্দে বলিউডের সিনেমা দেখছি, ভারতীয় টিভি চ্যানেলের ভক্ত হয়ে আছি, তাদের টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপিত পণ্যের ভোক্তা বনে আছি- সেখানে ভারতে বসে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল কেউ চাইলেও দেখতে পান না। কত বিনিময় হচ্ছে, কত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে- আমাদের টিভি চ্যানেলের দ্বার আর খুলছে না। পরিস্থিতি এখন যেখানে এসে ঠেকেছে তাতে মাল্টিন্যাশনাল ও ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য বরাদ্দ বিজ্ঞাপন ও বাজেট অচিরে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে পাঠিয়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, বিজ্ঞাপনদাতাদের লোকসানও হবে না। কিন্তু আমাদের স্বার্থরক্ষার আলাপ-আলোচনা ও দাবি উত্থাপনে কোথায় যেন দ্বিধা আছে। এই দ্বিধা নিয়ে কি বাংলাদেশের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচার দাবি করা সম্ভব?
বিজ্ঞাপন বলে
‘শুধু লম্বা হলেই- আকাশ ছোঁয়া যায় না….’
কী দরকার?
দরকার আত্মবিশ্বাস, আত্মসচেতনতা আর আত্মপরিচয়ের বোধ। তার চেয়ে বড় কথা আমরা অতো লম্বাও তো হতে পারি নি।
মাহবুব মোর্শেদ : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
বিজ্ঞাপনটি অনেকেরই দেখা। বিজ্ঞাপনের কথাগুলো এমন :
শুধু লম্বা হলেই- আকাশ ছোঁয়া যায় না
শুধু বুদ্ধির জোরে- সাংবাদিকতা হয় না
শুধু শক্তি থাকলেই- সাঁতারু হওয়া যায় না
তাহলে কী দরকার?
খুব জরুরি প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞাপনেই দেওয়া আছে। তবু আমরা নিজেদের মতো করে উত্তর খুঁজবো। উত্তর খোঁজার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিছু আলাপও পেড়ে নেব।
সবার আগে বলে রাখি, হরলিক্সের বিজ্ঞাপন নিয়ে অতীতে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। হরলিক্স কোম্পানিকে সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার পর্যন্ত করতে হয়েছে। এখানে তেমন পুষ্টিগত বিতর্ক তোলার উদ্দেশ্য নেই। যে বিজ্ঞাপনটার কথা বলছি সেটি বরং আমার বিশেষ পছন্দ। সাধারণত যারা টিভি বিজ্ঞাপনের মডেল হন তারা এতে মডেল হননি। পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে কলকাতায় পরিচিত কয়েকজন নারী এতে মডেল হয়েছেন। এদের একজন সাংবাদিক, একজন বৈমানিক, একজন সাঁতারু। কলকাতার বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোতে হরলিক্সের এই বিজ্ঞাপন অনেকবার দেখেছি। চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে নিজেদের পেশায় সফল নারীরা সাধারণত নাম ও পেশাগত পরিচয়সহ বিজ্ঞাপনে হাজির হতে পারেন না। কিন্তু এ বিজ্ঞাপনে সেটা ঘটতে পেরেছে। কিন্তু খটকা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতেও বিজ্ঞাপনটা দেখানোর পর। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে পেশাগত পরিচয় রেখে মডেলদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। কেন এমন করা হলো? বাংলাদেশে এদের পরিচিতি নেই বলে? নাম-পরিচয় রাখলে কেউ কি প্রশ্ন তুলতেন, এরা কোথাকার সাংবাদিক বা বৈমানিক বা সাঁতারু? এমন প্রশ্ন উঠলে উত্তর মেলা কি কঠিন হতো? ভারতে তৈরি অনেক বিজ্ঞাপনই তো অহরহ বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়। হিন্দিভাষায় নির্মিত বিজ্ঞাপন স্রেফ বাংলায় ডাবিং করে প্রচার করার ঐতিহ্যই রীতিমতো গড়ে উঠেছে। সে বিজ্ঞাপনগুলো দেখে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেন না- ঐশ্বরিয়া, প্রিয়াঙ্কা, দীপিকা, শাহরুখ কোথাকার অভিনেতা। প্রশ্ন ওঠে না, কারণ সবাই কমবেশি এদের চেনেন। কিন্তু কলকাতার খানিকটা অপরিচিত সেলিব্রেটিদের নিয়ে খটকা বেধেছে। বাংলাদেশে, এবং সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গেও খুব বেশি মানুষের জানাশোনা নেই এদের সঙ্গে। তবু পশ্চিমবঙ্গে নামপরিচয়সহ কাজ চলেছে, বাংলাদেশে চলছে না। বিজ্ঞাপনটি এখানে প্রচারের আগে কী ভাবা হয়েছিল? মডেলদের নাম-পরিচয়সহ উপস্থাপন করা হলে বাংলাদেশে প্রশ্ন উঠবে? হয়তো দাবিও উঠবে, বাংলাদেশের এমন নারীদের নিয়ে আরেকটা বিজ্ঞাপন তৈরি করা হোক? দাবি উঠলে, সেটি করা কঠিন হতো না।
বাংলাদেশে হরলিক্সের বাজার ছোট নয়- শুধু হরলিক্স কেন কোনো কমোডিটির বাজারই ছোট নয়। তবু বিজ্ঞাপনগুলো আসে পাশের বড়বাজার থেকে তৈরি হয়ে। তাদের নায়ক-নায়িকাদের মুখশ্রী সে বিজ্ঞাপন আলোকিত করে। এসব দেখে কাউকে এমন দাবি তুলতে দেখা যায়নি যে- শাহরুখের বদলে তো শাকিব, ঐশ্বরিয়ার বদলে শাবনুর কিংবা আসিনের বদলে মোনালিসাকে নিয়ে বিজ্ঞাপনটি একান্তই বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের জন্য প্রচার করা হোক।
যে যুক্তিতে ভারতে নির্মিত সব বিজ্ঞাপন সেগুলোর আলোছায়াসঙ্গীত সহকারে শুধু ভাষা পরিবর্তন করে বাংলাদেশে সম্প্রচারিত হতে পারে সেই একই যুক্তিতে ভারতের কোনো মেট্রপলিটন শহরের আইকনদের নামপরিচয়সহ একটি বিজ্ঞাপনও প্রচার করা সম্ভব। সেই যুক্তিটা কী?
অবশ্যই বাজার।
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো যখন দক্ষিণ এশিয়ার ম্যাপ নিয়ে বসে তখন নিশ্চয়ই তারা একে একটি সাংস্কৃতিক একক হিসেবে বিবেচনা করে। এই এলাকার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বার্মা-থাইল্যান্ড-ফিলিপাইন-চীনের মতো নয়, আবার ইরান-ইরাক-সিরিয়ার মতোও নয়। মধ্য এশিয়া বা পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অমিল আছে বলে দক্ষিণ এশিয়া আলাদা একক। দক্ষিণ এশিয়াও সমরূপ কোনো এলাকা নয়। এখানে বহু দেশ, বহুজাতি, বহুভাষা, বহু নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। শুধু ভারতকে বিবেচনায় আনা হলেও বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের প্রশ্ন তুলে রেখে বাজারের প্রশ্নকে সামনে আনা হলে বাজারের কেন্দ্র ভারতই। শুধু কেন্দ্র নয় পরিধির অনেকটা জুড়েও ভারত। ভারতের বাইরে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানেও বাজার তুলনামূলকভাবে ছোট। কিন্তু সেটাও বাজার বটে। তাই মুম্বাই বা দিল্লিতে সাউথ এশিয়া অফিস খুলে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি চেষ্টা করে ভারতের বাইরের পরিধিকেও সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। ভারতের নিজস্ব প্রস্তুতি ও অবকাঠামো এক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। যেমন- বলিউডের সিনেমা, শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাতেও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশে বসে সহজেই বলিউডের সিনেমা উপভোগ করা যায়। ফলে, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন ভারতের শুধু নয়, আমাদেরও আইকন। বাংলাদেশে অনেকেই তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের খবর রাখেন। যেমন বচ্চন পরিবারের পুত্রবধু এখন অন্তঃসত্ত্বা, তার গর্ভে যমজ দুটি মেয়ে বেড়ে উঠছে। মুম্বাইতে বসে ইউনিলিভার যখন হিন্দি ভাষায় লাক্সের একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে এবং তাতে মডেল হন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন তখন মারাঠি, তামিল, তেলেগু, নেপালি, বাংলা, উর্দুসহ যে কোনো দক্ষিণ এশীয় ভাষায় একে ডাবিং করে ভারতসহ যে কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশে প্রচার করা সম্ভব। বাস্তবে তা ঘটেও। এ নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠে না। এক যুগ আগে এমন হতো কি না, হলেও প্রশ্ন উঠতো কি না তেমন তথ্য আপাতত হাতে নেই। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তির বিপুল বিস্ফারের এ যুগে কেউ এমন প্রশ্ন তোলেন না। চ্যানেল ঘোরালেই, ডিভিডি চালালেই যাকে প্রতিনিয়ত দেখি- তাকে দেশের চ্যানেলে দেখলে প্রশ্ন তোলা অসঙ্গত বটে, হিপোক্রেসিও।
দর্শক হিসেবে আমি বলিউডে নির্মিত হিন্দি সিনেমার অনুরক্ত। সেখানকার তরুণতর নির্মাতারা নিত্যনতুন আইডিয়া নিয়ে যেভাবে একের পর এক সিনেমা তৈরি করে চলেছেন তা চমকপ্রদ। শুধু বিনোদন ও জনপ্রিয়তাতেই নয়, শিল্পমানেও সমৃদ্ধ অনেক সিনেমা। বলিউড রীতিমতো একটি ইন্ডাস্ট্রি। তেমন ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে ওঠার বা চমকে-বৈভবে পরিপূর্ণ তেমন সিনেমা তৈরির সম্ভাবনা বাংলাদেশে নেই, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশেও নেই। ফলে, সে সিনেমাকে তার নায়ক-নায়িকা, ফ্যাশন, কমোডিটি, বাজার সম্ভাবনা সহকারে আমরা গ্রহণ করেছি। এতে আমরা অসুখী নই, বরং স্বস্তিতেই আছি বলা যায়। শুধু বলিউডের সিনেমাই নয়, বলিউডের সিনেমা যে ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যে সংস্কৃতি টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নির্মিত ও পুননির্মিত হয়ে চলেছে তারও স্বতঃস্ফূর্ত গ্রাহক আমরা। সত্যি বলতে, দিনের যে কোনো সময় কেউ যদি সিনেমা দেখতে চান, বাচ্চারা যদি কার্টুন দেখতে চায়, কারো যদি গান শোনার ইচ্ছা নয়, কিংবা কেউ যদি সোপ অপেরা দেখতে চান কিংবা কোনো হাসির অনুষ্ঠান যদি কেউ খোঁজ করেন তবে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর দারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমনকি নিউজ কর্পোরেশন, সনি বা ওয়াল্ট ডিজনির মতো মাল্টিন্যাশনাল সম্প্রচারকদের টিভি চ্যানেলগুলোও এখন ভারতীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। ১৯৯২ সালে ভারতে কেবল টেলিভিশন উন্মুক্ত হওয়ার পর বড়বাজারের আকর্ষণে রুপার্ট মারডকের স্টার টিভি নেটওয়ার্ক, এমটিভিসহ অনেক মাল্টিন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারিত করে। স্টার টিভি নেটওয়ার্ক ভারতের বিভিন্ন ভাষার জন্য, বিভিন্ন গোষ্ঠীর দর্শকের জন্য ৩২টি চ্যানেল খুলেছে। সিএনএন, ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকও ভারতে বাজার সৃষ্টির জন্য তৎপর। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে কেবল টেলিভিশন উন্মুক্ত হওয়ার পর দৃশ্যমানভাবে কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এখানে চ্যানেল খোলেনি, আগ্রহ দেখিয়েছে এমন তথ্যও নেই। তার কারণও বাজার- বাজার শুধু দর্শক নয়, বিজ্ঞাপনদাতারাও। আমরা যখন স্টার মুভিজে সিনেমা দেখি তখন সেটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এশিয়াস্যাটের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয় বটে কিন্তু সম্প্রচারের সময় যে বিজ্ঞাপন দেখা যায় তা একান্তই ভারতীয় দর্শকদের জন্য। বিজ্ঞাপনে আমরা এমন অনেক কিছু দেখি যা আমাদের বাজারে পাওয়া যায় না। যেমন- ডিটিএইচ টেকনলজি। টাটা স্কাই বা ডিশ টিভির বিজ্ঞাপন দেখি, কিন্তু এগুলো কী জানি না। সরাসরি ঘরে স্যাটেলাইট সম্প্রচারের প্রযুক্তি আমরা চিনি না, কিন্তু দেখতে দেখতে চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
অবশ্য বিজ্ঞাপনে দেখা অধিকাংশ পণ্যই হাত বাড়ালে স্থানীয় বাজারে মেলে। বিজ্ঞাপন দেখে সেগুলো কিনতে প্ররোচিতও হই আমরা। যখন লাক্স সাবান কিনি তখন স্টার মুভিজ, বাংলাভিশন নাকি জিটিভিতে বিজ্ঞাপন দেখে কিনলাম সেটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে নির্মিত পণ্যের অবস্থান আমাদের কেনাকাটার তালিকায় আছে কি? এখন থাকলেও এই ভিজ্যুয়াল অভ্যাসে আর কতদিন থাকবে?
শুধু কেনাকাটায় নয়, ভেতরে ভেতরে সমাজে-পরিবারে একটা সাংস্কৃতিক রূপান্তরও কি ঘটছে না?
আমার এক বন্ধু তার মেয়েকে নিয়ে রীতিমতো চিন্তিত। ছোটবড় কোনো সমস্যা হলে তার চার বছরের মেয়ে লর্ড গণেশাকে ডাকে। ’মাই ফ্রেন্ড গনেশা, মুঝে বাঁচাও’ বলে গণেশার সাহায্য চায়। মেয়ে যে গণেশাকে ডাকে এতে সমস্যা নেই। কিন্তু মেয়ে গণেশার কাছে আবদার জানায় হিন্দি ভাষায়। ভাষা শিক্ষার জটিল একটি সময়ে বাচ্চা দিনের একটা বড় অংশ হিন্দি চ্যানেল দেখে ব্যয় করে। না, জিটিভি বা সনিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখে না। দেখে বাচ্চাদের চ্যানেলই। কিন্তু ডিজনি, কার্টুন নেটওয়ার্ক, পোগোসহ অনেক চ্যানেলই এখন ভারতের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচারে চলে এসেছে। এগুলো এখন হিন্দিতে সম্প্রচারিত হয়, একটি দুটি তেলেগুতেও সম্প্রচার করে। ডোরেমন-পোকেমন দেখার ফাঁকে ফাঁকে হিন্দি শিখছে মেয়ে। টুকটাক হিন্দি বলতে পারে, বুঝতে পারে প্রায় সবই। মুফতে একটি ভাষা শিখে ফেলছে- এতে অভিভাবকদের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো ব্যাজার হচ্ছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, ইংরেজি তো শিখতেই হয়, বিকল্প নেই। কিন্তু ইংরেজির সঙ্গে বাংলার মৌলিক পার্থক্য আছে, বাচ্চারা বুঝে ফেলে এটি আলাদা ভাষা। কিন্তু হিন্দি তাদের কনফিউশনে ফেলে দেয়। কাছাকাছি ভাষা বলে বাংলা বোলে হিন্দি ঢুকে পড়ছে অনায়াসে। আর সবচেয়ে পছন্দের অনুষ্ঠানগুলো দেখতে দেখতে তারা যে বোল শোনে তা মনেও থাকে, গেঁথে যায়। ফলে, একটি জেনারেশন না চাইতেই তিন ভাষা শিখতে শিখতে বেড়ে উঠছে। এর বাইরে আর কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না তা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ অবশ্য ঘরে হিন্দির বসতি ও বেড়ে ওঠা নিয়ে সচেতন নন। কিন্তু যারা সচেতন তারা কী করবেন? টিভি বন্ধ করে দেবেন? উপায় নেই। বাংলাদেশের চ্যানেল দেখাবেন? বাচ্চারা মজা পাবে না। উপায় হলো, অন্তত বাচ্চাদের চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচার দাবি করা। হিন্দি বন্ধ করে ইংলিশ সম্প্রচারে ফিরে যাওয়ার যুক্তি আপাতত নেই। কিন্তু যেভাবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারি চ্যানেল, পিসটিভি বাংলায় সম্প্রচার শুরু করেছে- সেভাবে বাচ্চাদের চ্যানেলের অনুষ্ঠানগুলো বাংলায় ডাবিং করে বাংলাদেশ অঞ্চলে প্রচার করা যেতে পারে। তাতে বাচ্চারা আরও ভালভাবে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবে। ডাবিং করার দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো নিতে পারে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষগুলোকে তৎপর হতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচারের দাবি জোরেশোরে তুলতে হবে। কিন্তু আমাদের সরকার কি তেমন দাবি তুলতে পারবে? যেখানে আমরা স্বেচ্ছায় সানন্দে বলিউডের সিনেমা দেখছি, ভারতীয় টিভি চ্যানেলের ভক্ত হয়ে আছি, তাদের টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপিত পণ্যের ভোক্তা বনে আছি- সেখানে ভারতে বসে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল কেউ চাইলেও দেখতে পান না। কত বিনিময় হচ্ছে, কত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে- আমাদের টিভি চ্যানেলের দ্বার আর খুলছে না। পরিস্থিতি এখন যেখানে এসে ঠেকেছে তাতে মাল্টিন্যাশনাল ও ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য বরাদ্দ বিজ্ঞাপন ও বাজেট অচিরে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে পাঠিয়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, বিজ্ঞাপনদাতাদের লোকসানও হবে না। কিন্তু আমাদের স্বার্থরক্ষার আলাপ-আলোচনা ও দাবি উত্থাপনে কোথায় যেন দ্বিধা আছে। এই দ্বিধা নিয়ে কি বাংলাদেশের জন্য বিশেষায়িত সম্প্রচার দাবি করা সম্ভব?
বিজ্ঞাপন বলে
‘শুধু লম্বা হলেই- আকাশ ছোঁয়া যায় না….’
কী দরকার?
দরকার আত্মবিশ্বাস, আত্মসচেতনতা আর আত্মপরিচয়ের বোধ। তার চেয়ে বড় কথা আমরা অতো লম্বাও তো হতে পারি নি।
মাহবুব মোর্শেদ : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
Subscribe to:
Posts (Atom)



