Monday, December 6, 2010

তান্দুয়ায় চলছিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি : হাসানুল হক ইনু


হাসানুল হক ইনুর জন্ম ১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বুয়েটের ছাত্রনেতা হাসানুল হক ইনু ঢাকার আশপাশের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে চলে যান সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায়। সেখান থেকে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে। প্রশিক্ষণের পর তাকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার ভার দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল ভারতের দেরাদুনের অদূরে ছোট শহর তান্দুয়ায়। সেখানে চলছিল রাজনৈতিক কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণের কাজ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ১৪ ব্যাচে ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তান্দুয়ায়। যুদ্ধকালে তান্দুয়া প্রশিক্ষণ শিবিরের অভিজ্ঞতা, মুজিব বাহিনী, মুক্তিবাহিনী বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠন ও রাজনৈতিক কর্মীদের সামরিক তৎপরতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
মাহবুব মোর্শেদ

সমকাল : ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আপনি কোথায় ছিলেন?
হাসানুল হক ইনু : ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আমি ভারতের দেরাদুনের অদূরে তান্দুয়া নামক এক পাহাড়ি শহরের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে ছিলাম। সমতল থেকে প্রশিক্ষণ শিবিরের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭ হাজার ফুট। মুজিব বাহিনীর সবচেয়ে বড় গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল তান্দুয়ায়। আমি সেই গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান ছিলাম। প্রশিক্ষকও ছিলাম।
সমকাল : কী ধরনের প্রশিক্ষণ আপনারা দিতেন?
হাসানুল হক ইনু : আমি সেখানে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষকের দায়িত্বে ছিলাম। বুয়েটে থাকার সময়ই আমরা গ্রেনেড তৈরি থেকে শুরু করে, অস্ত্র চালনাসহ নানা সামরিক অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম। সে অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল। ভারতে যাওয়ার পর শুরুতে আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সমকাল : বিএলএফের কাজ শুরু হয় কখন?
হাসানুল হক ইনু : এপ্রিল থেকে প্রস্তুতি শুরু করলেও মে মাসের প্রথম থেকেই মুজিব বাহিনীর কাজ শুরু হয়। মিত্রবাহিনী যখন ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে তখন একটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষ করে আমরা আরেকটি ব্যাচের প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই সময় পর্যন্ত আমরা ১৪টি ব্যাচ পাঠিয়েছি। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সকে সহযোগিতা করার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল উবানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চার অধিনায়কের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের কলাকৌশল ঠিক করতেন।
সমকাল : প্রশিক্ষণ কি তান্দুয়াতেই শুরু হয়?
হাসানুল হক ইনু : দুটি ট্রেনিং সেন্টার দিয়ে বিএলএফের কাজ শুরু হয়। একটি ছিল মেঘালয়ের হাফলংয়ে। কিন্তু এক ব্যাচের প্রশিক্ষণের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি তান্দুয়াতে ছিল। এখান থেকে গেরিলাদের প্রায় ১৪টি ব্যাচ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মোট হিসাব করলে তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার।
সমকাল : কারা সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন?
হাসানুল হক ইনু : তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠনগুলোর তরুণ নেতা, যারা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন_ তারা তান্দুয়ায় প্রশিক্ষণ নিতেন। তাদের অনেকেই ছিলেন থানা পর্যায়ের নেতা। সেই তরুণ যুবকদের আমরা গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতাম। যুদ্ধের কলাকৌশল এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করতে হয় সেই প্রশিক্ষণও আমরা তাদের দিতাম। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধটি ছিল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ। রাজনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদেরও রাজনৈতিক জ্ঞান থাকা উচিত, রাজনৈতিক আদর্শ থাকা উচিত। সেই হিসেবে ১৯৬৫ সালের পর থেকে যারা জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন সংগ্রামে সামনের কাতারে এসেছেন সেসব যুব এবং ছাত্র নেতাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেই বাছাই করা রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আমরা চেয়েছিলাম যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি থানার রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ পায়। প্রতিটি জেলায় যেন প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক কর্মীরা ছড়িয়ে যেতে পারেন।
সমকাল : কত মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো?
হাসানুল হক ইনু : নূ্যনতম এক মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এত ভালো ট্রেনিং যুদ্ধের সময় আর কেউ পায়নি। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ হতো ৭-১০ দিন। কিন্তু আমরা যে প্রশিক্ষণ প্রদান করতাম তাতে তারা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত হতো। এভাবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমরা প্রশিক্ষিত ১০ হাজার নেতা তৈরি করেছি। তারা অস্ত্র বিদ্যা শিখত, গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শিখত, যুদ্ধবিদ্যা শিখত এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল শিখত। তান্দুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আমি ৫২ জন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করি। এই ৫২ জন প্রশিক্ষকের নেতৃত্বে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দান করি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সহযোগিতা করত।
সমকাল : কোন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠন করা হয়?
হাসানুল হক ইনু : মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের পরিকল্পনায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনে এবং তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরাসরি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের অধীনে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স কাজ করতে শুরু করে।
এর কৌশল ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক। যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ইচ্ছা করলেই প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য এখানে আসতে পারতেন না। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি থানা এবং জেলা থেকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করে নিয়ে আসা হতো। যারা ছাত্র ও যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সে রকম ব্যক্তিকে এখানে প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা হতো। সুতরাং এই কেন্দ্র থেকে যে ১০ হাজার গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন তারা বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী যুব নেতা, ছাত্র নেতা অথবা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের তরুণ নেতা। তারাই এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছেন। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক যু্দ্ধ তাই রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন নেতাদের সামরিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যাতে করে তারা ভেতর থেকে যুদ্ধ করতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক কর্মীরা যুদ্ধ করেনি_ এ ধরনের যে কথাটি প্রচলিত আছে তা ঠিক নয়। বরং বিএলএফের মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায়ের ছাত্র এবং যুব নেতারা এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধও করেছেন।
সমকাল : বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন কারা?
হাসানুল হক ইনু : বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চার জন অধিনায়ক ছিলেন। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ এবং আবদুর রাজ্জাক। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তখন চারটি সেক্টরে ভাগ হয়ে কাজ করত। উত্তরবঙ্গ সেক্টর_ শিলিগুড়ির জলপাইগুড়ির পাঙ্গা নামক স্থানে এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল। এই সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। সহ-অধিনায়ক ছিলেন মনিরুল ইসলাম ওরফে মার্শাল মনিরুল ইসলাম। পশ্চিম অঞ্চলের সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল ভারতের ব্যারাকপুরে। এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমদ। সহ-অধিনায়ক ছিলেন জাসদ নেতা নূর আলম জিকু। প্রয়াত কাজী আরেফ আহমেদ তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। আরেকটি সেক্টর ছিল ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের ভেতরে তুরা নামক স্থানে। ওই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক এবং সহ-অধিনায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ আহমেদ। চতুর্থ সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল আগরতলায়। সেখানকার অধিনায়ক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি এবং তার সহযোগী চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান। তার সঙ্গে সহযোগিতা করতেন আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ। জেনারেল এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীরই একটি বাহিনী ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চারজন অধিনায়ক থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন তিনিই। সাধারণ যে কনভেনশনাল আর্মি সেটা গড়ে উঠেছে অন্যভাবে। আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য ছিল এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে তারা নিজ নিজ থানায় চলে যাবেন। আগে থেকেই বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স সেখানে আশ্রয়স্থল ঠিক করে দেয়। সেখানে কিছু দিন টিকে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। সীমান্ত থেকে সেখানে নিরাপদে পেঁৗছানোর ব্যবস্থা করে দেবে। একবার ভেতরে ঢুকলে জরুরি কাজ ছাড়া তারা আর ভারতে আসবেন না। তারা প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করবেন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। যুদ্ধের রসদও তাদের কাছে সেভাবে দিয়ে দেওয়া হতো। সুতরাং একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়েই কাজটা শুরু করা হয়েছিল।
সমকাল : ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কী হলো?
হাসানুল হক ইনু : তখন প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ব্যাচ আসা বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম দেশে ফেরত এসে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি এবং আমার ৫২ জন প্রশিক্ষক ওখান থেকে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ফেরত আসার জন্য আমি সামরিক সিগনাল চাচ্ছিলাম। কিন্তু আমরা আসলে আসতে পারিনি। আমাদের আসার মতো যানবাহন ছিল না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষও আমাদের আসার মতো কোনো যানবাহন দেয়নি। তাই আমরা ভেতরের যু্েদ্ধ অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
সমকাল : ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের খবর আপনারা পেলেন কীভাবে?
হাসানুল হক ইনু : ওখানে সামরিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমরা আত্মসমর্পণের খবর পেয়েছি। সুতরাং আত্মসমর্পণের ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছে সেটা আমি স্বচক্ষে দেখতে পারিনি।
সমকাল : ওখান থেকে কীভাবে আপনারা ফেরত এলেন?
হাসানুল হক ইনু : ওখান থেকে ট্রেনে করে কলকাতায় আসতে আমাদের ৩-৪ দিন সময় লেগেছে। কলকাতায় এসে একদিন থেকে আমরা দেশের ভেতরে চলে আসি। দেশের ভেতর আসার পর নিজ নিজ এলাকায় আমরা ফিরে যাই।
সমকাল : দেশে ফিরলেন কবে?
হাসানুল হক ইনু : তারিখটা এখন ঠিক মনে নেই। তবে সেটা ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যুদ্ধোত্তর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেরও একটা ব্যাপার ছিল। তাই তারা খুব তাড়াতাড়ি এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়েছিল।
সমকাল : ঢাকা শহরে এসে আপনি কী দেখলেন?
হাসানুল হক ইনু : তখন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, যেমন আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আবদুুল কুদ্দুস মাখন তারা সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ঘাঁটি গেড়ে ঢাকা শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন।
সমকাল : বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের সদস্যদের সঙ্গে এরপর কি আপনাদের যোগাযোগ হতো?
হাসানুল হক ইনু : আমাদের মধ্যে আমরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছি। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর জানুয়ারি মাসের শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে আমরা তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি। আমাদের বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চার অধিনায়ক বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে অস্ত্র রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে।
সমকাল : সারাদেশে বিএলএফ কত জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
হাসানুল হক ইনু : বিএলএফ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় এক লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। অর্থাৎ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন গড়ে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
সমকাল : যুদ্ধক্ষেত্রে মুজিব বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়েছিল_ এ ধরনের একটি বিতর্ক প্রচলিত আছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
হাসানুল হক ইনু : যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক, আদর্শগত, সামরিক কোনো ধরনেরই বিরোধ ছিল না, এরা ছিল পরস্পরের সহযোগী শক্তি। দু'একটি ক্ষেত্রে বিরোধ হতে পারে, কিন্তু প্রধানত কোনো বিরোধ ছিল না। এমন ছোটখাটো বিরোধ যুদ্ধাবস্থায় হতেই পারে। যে বিতর্কগুলো তৈরি হয়েছে তা পরবর্তীকালের প্রতিক্রিয়াশীল, ক্ষমতা দখলে ইচ্ছুক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়ানো হয়েছিল।

ঢাকার অসংখ্য বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবারিত : মফিদুল হক


মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর ঢাকা ছেড়ে গিয়ে ১৪ এপ্রিল ফিরে আসেন লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সংগঠক মফিদুল হক। উদ্দেশ্য, ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা তৎপরতায় সহযোগিতা করা। এ কাজ করতে গিয়েই দেখেছেন এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের ঢাকা। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন ডিসেম্বরের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আগে-পরের কিছু বিরল অভিজ্ঞতার কথা।
............................
মফিদুল হকের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে, নোয়াখালীতে। ১৯৭১ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এপ্রিলে যখন সবাই ঢাকা ছাড়ছিল তখন পার্টির সিদ্ধান্তে ঢাকায় ফিরে আসেন মফিদুল হক ও তার কয়েকজন সহকর্মী। উদ্দেশ্য, যুদ্ধাবস্থায় পার্টির তৎপরতা বজায় রাখা। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়, বিশেষত ডিসেম্বরে ঢাকা শহরের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ


সমকাল : কোন প্রেক্ষাপটে আপনি ১৯৭১-এ ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন?
মফিদুল হক : আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মার্চে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমি ঢাকা ছেড়ে চলে যাই। সীমান্তে তখন আমাদের একটা সভা হয়েছিল নিলখিয়াতে। তাতে ঠিক হয়, ১৪ এপ্রিল আমরা ঢাকায় ফিরে আসব। সেদিনের কথা বেশ মনে আছে। পহেলা বৈশাখ ছিল সেদিন। ঢাকা থেকে অসংখ্য মানুষ চলে যাচ্ছিল আর আমরা কয়েকজন মাত্র ফিরছিলাম। আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকায় আটকেপড়া নেতাকর্মী-শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। আমার সঙ্গে ছিলেন নিজাম উদ্দিন আজাদ (পরে তিনি সীমান্তে চলে যান গেরিলা ট্রেনিং নিতে। বেতিয়ারা যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। আজাদের মৃত্যুর সংবাদটি আমাদের জন্য খুব কষ্টকর ছিল), নূহ-উল-আলম লেনিন এবং আরও অনেকে। আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকায় একটি নেটওয়ার্ক গঠন করা। এরপর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা সময়টাই আমরা ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকায় ছিলাম। আমাদের কাজগুলো করতে হতো খুব গোপনে। প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করা থাকত। প্রত্যেকেই তার এলাকায় গোপনীয়তা রক্ষা করে কাজ করত। দায়িত্বের মধ্যে ছিল মূলত যোগাযোগ রক্ষা করা, আশ্রয়ের জায়গা ঠিক করা, মুক্তাঞ্চল থেকে আমাদের উদ্যোগে বের হওয়া 'মুক্তিযুদ্ধ' পত্রিকাটি বিতরণ করা। যাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করতাম তাদের মধ্যে ছিলেন কবি শামসুর রাহমান, কাইয়ুম চৌধুরী, নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকী প্রমুখ। তারাও দায়িত্ব পালনে আমাদের নানাভাবে সাহায্য করতেন। ঢাকার গেরিলা তৎপরতায় এখানকার অনেক বাড়ির বিশেষ অবদান ছিল। অসংখ্য বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবারিত। এটা না থাকলে যুদ্ধ চালানো অনেক কঠিন হতো। ঢাকার আশপাশের গ্রামের মানুষও অভূতপূর্ব সহযোগিতা করেছিল।
সমকাল : যুদ্ধের শেষ দিকে ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল?
মফিদুল হক : নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সংঘাত বাড়তে থাকে। তখন শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নিয়ে একটা আশঙ্কা ছিল সবার মধ্যে। কারণ, বোঝা যাচ্ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের শেষ কীভাবে হবে তা উপলব্ধি করা তখন খুব কঠিন ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ছিল একটি সংগঠিত সশস্ত্র বাহিনী। তাদের কাবু করাটাও খুব কঠিন ছিল। নভেম্বরের শেষ দিকে সীমান্তে অনেক অঞ্চল যখন মুক্ত হতে শুরু করল তখন বোঝা গেল যে, যুদ্ধটা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। ভারতীয় বাহিনীও অনেক জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করে। এরপর ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হলো। শুরু হলো সর্বাত্মক যুদ্ধ।
সমকাল : ঢাকায় আপনারা সেটা টের পেলেন কখন?
মফিদুল হক : ঢাকায় আমরা সেটা টের পেলাম ভোরের দিকে। রেডিওর মাধ্যমে আমাদের কাছে খবর পেঁৗছত। বিশেষ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী ও বিবিসি খবরের বড় উৎস ছিল। ইন্দিরা গান্ধী ৩ তারিখ কলকাতার জনসভা শেষ করে দিলি্ল ফিরে গেলেন। রাতে পার্লামেন্টে ভাষণ দিলেন। ভাষণ শেষ হতে না হতেই ঢাকার আকাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পাকিস্তানি বাহিনী লেসার বুলেট আকাশের দিকে ছোড়া শুরু করল। একটু পরেই বোঝা গেল, ভারতীয় বিমান ঢাকার আকাশে ঢুকে পড়েছে। রাডারের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বিমানের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের প্রতিহত করার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করেছিল।
সমকাল : তখন আপনি ঢাকায়?
মফিদুল হক : হ্যাঁ, তখন আমি ঢাকায়। ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে থাকতাম আমরা। ভারতীয় বাহিনী তখন টার্গেট করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোম্বিং করেছিল। বিশেষ করে তারা বোম্বিং করেছিল ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। সে ঘটনাটাই মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঢাকা শহরে তখন মানুষ ছিল খুব কম। কারফিউ জারি করা হয়েছিল। জীবনযাত্রা ছিল অস্বাভাবিক। তবে রাস্তাঘাটে বের হলে মানুষের চোখের ভাষায়ও একটা পালাবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। মিত্রবাহিনীও তখন আস্তে আস্তে ঢাকার দিকে এগোতে লাগল। এ খবরগুলো এখানকার পত্রপত্রিকাগুলোতে বিকৃতভাবে ছাপা হলেও মানুষের মধ্যে তার প্রভাব পড়ত না।
সমকাল : যুদ্ধ চলাকালীন খবরগুলো আপনারা পেতেন কীভাবে?
মফিদুল হক : যুদ্ধ চলাকালে আমরা খবরগুলো পেতাম মূলত বেতারের মাধ্যমে। এগুলোই ছিল আমাদের খবরের মূল উৎস। তবে মানুষ কোনো না কোনোভাবে সব খবরই পেয়ে যেত। ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখ থেকে যে পরিস্থিতি দাঁড়াল তাতে মূল যে প্রশ্নটি উঠল তা হলো, যুদ্ধটা শেষ হবে কীভাবে। আর একটা আশঙ্কা তখন ছিল_ ঢাকায় চূড়ান্ত লড়াই হবে কি-না। এই আশঙ্কা থেকেই চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য যে যার মতো প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তবে সেটা শেষ পর্যন্ত ঘটেনি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকার বাইরেই পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। যদি 'ঢাকা ওয়ার' বলে কিছু হতো তবে ঢাকার অবস্থা খুব ভয়ঙ্কর হতো। কারণ চোখে পড়ার মতো না হলেও যে পরিমাণ বেসামরিক মানুষ ঢাকায় ছিল তার সংখ্যাও ছিল অনেক।
আর পাকিস্তানি বাহিনী কী করতে পারে ৩০ নভেম্বর থেকেই সেটা বোঝা গিয়েছিল। ওষুধ ছিটানোর জন্য ব্যবহৃত ছোট্ট বিমানে করে বোমা নিয়ে এসে তারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ফেলত। প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা এটা করত। এর কোনো সামরিক গুরুত্ব ছিল না। বোমা ফেলার আরেকটি কারণ ছিল। তাদের ধারণা ছিল, এ ধরনের বোমা ফেললে লোকজন মনে করবে ভারতীয় বাহিনী এটা ফেলেছে এবং এর একটি প্রতিক্রিয়া হবে। কিন্তু বিমানের আওয়াজ এবং প্রকৃতি তখন মানুষের জানা হয়ে গিয়েছিল। মানুষ বুঝতে পারত কোনটা পাকিস্তানি এবং কোনটা ভারতীয় বিমান। এর মধ্যে যে বড় ঘটনাটি পাকিস্তানি বাহিনী ঘটাল তা হলো বুদ্ধিজীবী হত্যা।
সমকাল : বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনাটি আপনারা জানতে পারলেন কখন?
মফিদুল হক : বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের একটি। ১৭ ডিসেম্বরের আগে আমরা এটা জানতে পারিনি। ১৭ ডিসেম্বরের সকালে কেউ কেউ জানতে পারলেও বিষয়টি সবাই জানতে পারে ১৮ ডিসেম্বর। এ রকম অনেক নৃশংস ঘটনাই পাকিস্তানি বাহিনী ঘটিয়েছে। তেজগাঁও বিমানবন্দরে একটি এতিমখানার ওপর তারা বোমা ফেলেছিল। তাতে অনেক শিশু মারা গিয়েছিল।
সমকাল : ১৬ ডিসেম্বরে ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল?
মফিদুল হক : ১৬ তারিখে ঢাকায় একটা টেনশন বিরাজ করছিল। ভারতীয় বাহিনীর দুটি দল ঢাকায় ঢুকেছিল। তাদের একটি গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের দিকে এবং অপরটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (এখনকার শেরাটন হোটেল) দিকে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল তখন রেডক্রসের আন্ডারে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা তখন দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছিল ক্যান্টনমেন্টের দিকে। বাইরে ঢাকার দিকে আসার সময়ও পাকিস্তানি বাহিনী গোলাগুলি করেছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে হঠাৎ করে একটা সংঘর্ষ বেধে গিয়েছিল। তখন ভারতীয় বাহিনীও তাদের অবস্থান নিল। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে কিছু পাকিস্তানি সৈন্যের মৃত্যু ঘটে।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবর জানলেন কীভাবে?
মফিদুল হক : আত্মসমর্পণ যে হতে যাচ্ছে এটা ১৬ তারিখ সকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। কারণ, যুদ্ধের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বোঝা যাচ্ছিল একটা যুদ্ধবিরতি ঘটেছে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও মানুষ মুক্তির স্বাদ পেল ১৭ ডিসেম্বর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে চলে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশের পর সেখানে আরেকটি সামরিক সারেন্ডার অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার বাইরে থেকে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারাও ১৭ তারিখে ঢাকায় আসতে শুরু করে। ১৭ তারিখ বিকেলেই বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে শহীদ মিনারে জমায়েত হয়। যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা তো আর ছিল না। অনেকেই সেখানে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। ১৭ তারিখ থেকে মানুষ মুক্তির স্বাদ পেলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতাও কাজ করছিল। বিজয়ের আগে ছিল শঙ্কা। আর বিজয় হওয়ার পর তৈরি হলো বিষণ্নতা।
সমকাল : ১৬ তারিখে আপনি কোথায় ছিলেন?
মফিদুল হক : ১৬ তারিখে আমি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ১৬ তারিখ সকালে আমি ডেমরার দিকে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় এলাম গভর্নর হাউস হয়ে (এখনকার বঙ্গভবন)। ইন্ডিয়ান আর্মি সেখানে বোম্বিং করেছিল। দরবার হলে গিয়ে আমি দেখলাম বোমার আঘাতে ছাদে বিশাল একটা গর্ত তৈরি হয়েছে। মূলত গভর্নর হাউসে এই আক্রমণের ফলেই গভর্নর মালিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সমকাল : কেউ বাধা দিল না?
মফিদুল হক : না, কোনো বাধা ছাড়াই আমি দরবার হলে প্রবেশ করতে সক্ষম হই।
সমকাল : এটা কোন সময়ে?
মফিদুল হক : এটা বিকেলের দিকে কোনো এক সময়ে। তখন অবশ্য আত্মসমর্পণ হয়ে গেছে। এরপর আমি চলে এলাম তেজগাঁও বিমানবন্দরে। জেনারেল অরোরা এবং অন্য ভারতীয় সামরিক অফিসাররা তখন দেশে ফিরে যাচ্ছিলেন। আমি এসে দেখলাম তাদের বিদায়ের দৃশ্য। সেখানে বাঙালি সামরিক অফিসাররাও ছিলেন। মেজর হায়দার ছিলেন। একটা মিলনমেলা হলো সেখানে। আমরা যারা কাজ করতাম তাদের সবার সঙ্গে তো আর দেখা হতো না। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় সেদিন সেটা ঘটে গেল।
সমকাল : নয় মাসে একটি শক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন কীভাবে?
মফিদুল হক : এটা আমরা কেউ পুরোপুরি জানতাম না। উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা জানতেন। আমরা শুধু আদেশ পালন করতাম। নিতুন কুণ্ডু যখন চলে গেলেন, তার গাড়িটা আমাদের দিয়ে গেলেন। আমরা তার গাড়িটা ব্যবহার করতাম। ওই গাড়িটা আমাদের বড় একটা অবলম্বন হয়েছিল। ওই গাড়িটা নিয়েই আমরা বিভিন্ন জায়গায় যেতাম এবং যোগাযোগ রক্ষা করতাম। আমাদের বলা হতো, এখান থেকে ওষুধ নিয়ে ওখানে যাও। এ জিনিসটা ওখানে পেঁৗছে দাও।
সমকাল : আপনাদের নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করতেন কে?
মফিদুল হক : আমাদের নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করতেন কাজী আজিজুল হক, ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম। আগে থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির গোপন তৎপরতা থাকায় আমাদের পক্ষে একটি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়েছিল। নতুন করে নেটওয়ার্ক গঠন করার জন্য তেমন কোনো প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি। এটি ছিল খুব ভালো একটি দিক।
সমকাল : দুই নম্বর সেক্টর বা ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ হতো না?
মফিদুল হক : ফরমাল যোগাযোগের দরকার পড়ত না। ওরা নিজেদের মতো করে কাজ করত। আমরাও। তবে দেখা-সাক্ষাৎ কিছু কিছু হতো। সবাই জানত আমরা যার যার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। যদি ঢাকায় একটা বড় রকমের লড়াইয়ের দরকার হতো তখন হয়তো পারস্পরিক যোগাযোগের দরকার পড়ত।
সমকাল : এমন প্রস্তুতি ছিল?
মফিদুল হক : যদি তেমন ঘটত তবে প্রস্তুতিটা হয়ে যেত। কারণ ঢাকার আশপাশে গেরিলাদের একটা বড় বেল্ট দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বাঙালি প্রস্তুত ছিল।
সমকাল : যুদ্ধের সময় ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের মনোভাব কেমন ছিল?
মফিদুল হক : তারা ছিলেন খুবই স্বতঃস্ফূর্ত। আমাদের সঙ্গে একটা বড় যোগাযোগ ছিল শামসুর রাহমানের। তিনি আমাদের সহযোগিতা করতেন। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। আজাদ ২৫ মার্চের পর শহীদ মধুদার বাড়িতে গিয়ে বুলেটের অনেক খোসা কুড়িয়ে এনেছিল। সে খোসাগুলো নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম শামসুর রাহমানের বাড়িতে। তিনি মধুদাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার কিছু কবিতা আমরা কপি করে পাঠিয়েছিলাম। অবশ্য শাহাদৎ চৌধুরীর পাঠানো কবিতাগুলোই আগে পেঁৗছে গিয়েছিল। কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। ঠাণ্ডা চলে এলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শীতের কাপড়ের প্রয়োজন হয়েছিল। তিনি গায়ের কোটটাও খুলে দিয়েছিলেন। ইমদাদ হোসেনের বাসা ছিল আমাদের একটা বড় কেন্দ্র।
সমকাল : মুনির চৌধুরী বা শহীদুল্লা কায়সার?
মফিদুল হক : মুনির চৌধুরীর সঙ্গে অন্যদের যোগাযোগ ছিল। শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে মাঝে মধ্যে দেখা হতো। তিনি আমাদের পাড়ায় থাকতেন।
সমকাল : ১৬ তারিখের পরের বিশেষ কোনো ঘটনার কথা আপনার মনে পড়ে?
মফিদুল হক : ১৭ তারিখে জেলখানা খুলে দেওয়া হলো। জেলের বন্দিরা দলে দলে বেরিয়ে এসেছিলেন। সরদার ফজলুল করিমও জেলে বন্দি ছিলেন। তিনি জেল থেকে বেরিয়ে আসার পথে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি তখন বাংলা একাডেমীতে কাজ করতেন। পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। রিকশায় একটা ট্রাঙ্ক নিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৭ ডিসেম্বরে শহীদ মিনারের সেই সভার কথাই বেশি মনে পড়ে। বিকেলে অনুষ্ঠান ছিল। সুফিয়া কামাল এলেন। সবার চোখে পানি। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হলো। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। ১৭ তারিখের পর একটা খাতা খোলা হলো থানায়, অনেক মানুষ পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। থানায় গিয়ে তারা ডায়েরি করলেন। খাতা মুহূর্তে ভরে উঠেছিল। সে খাতা এখন কোথায় হারিয়েছে কে জানে!

Saturday, December 4, 2010

ট্রেন ছিল জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত :হারুন হাবীব


হারুন হাবীবের তোলা ছবি, ১১ সেক্টরে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কর্নেল তাহের
মাহবুব মোর্শেদ
৯ মাসে অনেক চেষ্টার পরও মুক্তিযোদ্ধারা কাবু করতে পারেননি কামালপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। অবশেষে ৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ তৎপরতায় মুক্ত হয় কামালপুর। দ্রুততম সময়ে শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর ট্রেনে ঢাকা আসেন হারুন হাবীব। ঢাকা ফেরার সেই ট্রেন ছিল 'জয় বাংলা' স্লোগানে মুখরিত। পথে পথে পুঁতে রাখা মাইনের ভয়ে ট্রেন চলেছে ধীরে ধীরে। ট্রেনে ঢাকা আসতে লেগেছে ৪-৫ ঘণ্টা। বিজয়ের আনন্দে মুখরিত হলেও সে সময় ঢাকাকে মনে হচ্ছিল আতঙ্কিত এক শহর। এ সময়ের মধ্যে মুজিবনগর সরকার কলকাতা থেকে ধীরে ধীরে ঢাকায় চলে আসছে। কামালপুর বিজয় ও মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বের নানা ঘটনার কথা জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবাদদাতা ও ফটোগ্রাফার হারুন হাবীব।
..............................................
লেখক ও সাংবাদিক হারুন হাবীবের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একজন গেরিলা হিসেবে যোগ দেন ১১ নম্বর সেক্টরে। কাজ করেন যুদ্ধকালীন সংবাদপত্র 'জয়বাংলা' ও 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে'র যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের বিরল অনেক মুহূর্তের ছবি তুলেছেন তিনি। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বরের কামালপুর জয়ের কথা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের আখ্যান। তার সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব মোর্শেদ


সমকাল : ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আপনি কোথায় ছিলেন?
হারুন হাবীব : আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ১১ নম্বর সেক্টর টাঙ্গাইলসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা (বর্তমানে শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ) এবং গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের একটা বড় অংশ নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আমি ওই সেক্টরের প্রধান সদর দফতর মহেন্দ্রগঞ্জে ছিলাম।
সমকাল : ডিসেম্বরের প্রথমদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যুদ্ধকৌশলে কী কী পরিবর্তন এলো?
হারুন হাবীব : ২৫ মার্চ থেকে যুদ্ধ শুরু হলেও ডিসেম্বরের প্রথম থেকে যুদ্ধের কৌশলে তাৎপর্যমণ্ডিত একটি পরিবর্তন আসে। এর একটি মূল কারণ হলো, পাকিস্তান যখন পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতকে আক্রমণ করে বসে তখন ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ৩ ডিসেম্বর এ যুদ্ধ শুরু হয়। সেদিন থেকেই ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। যৌথ সামরিক কমান্ড গঠিত হওয়ার পর লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা এই বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন যুদ্ধের কৌশলে প্রকৃতিগত একটি পরিবর্তন আসে। গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেই সময় আমি সীমান্ত অঞ্চলে ছিলাম। তখন আমি দেখেছি, শত শত ভারতীয় সৈন্য সীমান্ত পার হয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত পাকিস্তানি স্থাপনাগুলো বিনষ্ট করতে শুরু করে। আমরা দ্রুতগতিতে লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকি।
সমকাল : আপনাদের সেক্টর কবে যৌথ কমান্ডের অধীনে আসে?
হারুন হাবীব : শুধু আমাদের সেক্টরই নয়, যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী একই কমান্ডের অধীনে আসে। কাজেই বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কমান্ডের সুযোগ তখন ছিল না। পুরো বাংলাদেশের সব কমান্ডারই যে যেখানে ছিল, যৌথ বাহিনী গঠিত হওয়ার পর সবাই যৌথ বাহিনীর কমান্ডের অধীনে আসে। আর সব কমান্ডারের প্রধান ছিলেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।
সমকাল : ৩ ডিসেম্বরের পর আপনারা কোনদিকে অগ্রসর হতে থাকলেন?
হারুন হাবীব : অন্যান্য এলাকার কথা আমি অতটা বলতে পারব না। আমি আমাদের সেক্টরের কথা বলতে পারি। কামালপুর রণাঙ্গন (বর্তমানে এটি জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত) ছিল মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল। এ রণাঙ্গনে শত শত মুক্তিবাহিনী, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছে। নয় মাসের পুরো সময়ই এ রণাঙ্গনে যুদ্ধ হয়েছে। ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল তাহের পা হারিয়েছিলেন এ কামালপুর রণাঙ্গনে। দিনটি ছিল ১৪ নভেম্বর। আমরা কখনও পাকিস্তানের দুর্ভেদ্য এ ঘাঁটি দখল করতে পারিনি। কিন্তু যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এলো তখন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে গেল। আমাদের মধ্যেও নতুন আশার আলো ফুটে উঠল। কারণ গেরিলা যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে পেরেছি ঠিকই কিন্তু সম্মুখ সমরে সব জায়গায় তাদের পর্যুদস্ত করতে পারিনি। তাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র ছিল আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। ভারতীয় বাহিনী আসার ফলে তারা পিছিয়ে গেল। কর্নেল তাহের আহত হওয়ার পর আমাদের সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন ক্যাপ্টেন আজিজ। ৪ ডিসেম্বর সকালে ঠিক করা হলো যেভাবেই হোক আজ কামালপুর আক্রমণ এবং দখল নেওয়া হবে। সেদিন ব্রাহ্মণপাড়ায় শত শত মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনীর সদস্য এসে জমা হয়েছিল। ভারতীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হলো কে সারেন্ডার লেটার নিয়ে কামালপুরে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে যাবে? আমাদের এলাকার একটি ছেলে বসির আহমদ (পরে সে বিডিআরে যোগ দেয় এবং বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করে) রাজি হলো। রাজি হওয়াটা ওই সময় কিন্তু সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কারণ রাজি হওয়ার অর্থই হচ্ছে মৃত্যুকে অবধারিতভাবে মেনে নেওয়া। যাত্রাপথে চারদিকে পেতে রাখা মাইনে কিংবা পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে যে কোনো মুহূর্তেই তার মৃত্যু ঘটতে পারে। মৃত্যুকে অবধারিতভাবে মেনে নিয়েই বসির সারেন্ডার লেটার নিয়ে গেল। তখন আমাদের খুব খারাপ লাগছিল। আমাদের ক্যাম্পটা ছিল ভারতীয় সীমান্তের সনি্নকটে। ফলে সব কিছু দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। আমরা ভাবছিলাম, একটু পরেই বসির হয়তো মৃত্যুবরণ করবে। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে যায় কিন্তু বসির আর ফিরে আসে না। তারপর আনিসুল হক সঞ্জু নামে একটি ছেলে একইভাবে আরেকটি সারেন্ডার লেটার নিয়ে গেল। ভারতীয় এক কর্নেলের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তোমরা আত্মসমর্পণ না করলে আমরা এয়ার স্ট্রাইক করব। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে তারা আত্মসমর্পণ করল না। তখন দেখা গেল মিত্রবাহিনীর অনেক বিমান এসে কামালপুরের ওপর বোমাবর্ষণ করে চলে গেল। এতে করে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে গেল। এরপর আনিসুল হক সঞ্জু আরেকটি সারেন্ডার লেটার নিয়ে গেল। তার বেশ কিছুক্ষণ পর (সম্ভবত) ক্যাপ্টেন আসলামের নেতৃত্বে পাকিস্তান নিয়মিত বাহিনীর সৈন্য এবং রাজাকারসহ মোট ১৭০ জন সারিবদ্ধ হয়ে হাত উঁচু করে বেরিয়ে এলো। তাদের আত্মসমর্পণের দৃশ্যটি আমার স্মৃতিতে এখন ভাস্বর হয়ে রয়েছে।
সমকাল : কামালপুর মুক্ত হওয়ার পর কী দেখলেন?
হারুন হাবীব : পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের পর তাদের দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ ছুটে এলো। আমরা কামালপুর গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাম। দেখি ডজন ডজন মেয়েকে তারা ঘরের মধ্যে ধরে রেখেছে। বহু বাঙালিকেও তারা বেঁধে রেখেছে ঘরের মধ্যে। আমরা তাদের সবাইকে ছেড়ে দিলাম। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো আমরা উদ্ধার করলাম। তারপর মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী মিলে বকশীগঞ্জের দিকে এলাম। বকশীগঞ্জে এসে দেখি চারদিকে পোড়া বাড়িঘর। মানুষজন ভীত-সন্ত্রস্ত। তারপরও মানুষ জয় বাংলা বলে চিৎকার করছে। তাদের মধ্যে ফুটে উঠেছে আশার আলো। ৬ তারিখ আমরা চলে এলাম শেরপুরে। শেরপুর তখন ছিল হিন্দুপ্রধান অঞ্চল। সেখানে এসে দেখি হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তা অবর্ণনীয়। এ অত্যাচার করেছিল মূলত রাজাকার-আলবদররাই। আমরা চারদিকে মার্চ করে পুরো শহর দখল করে ফেললাম। এরপর অগ্রসর হলাম জামালপুরের দিকে। কারণ জামালপুরে পাকিস্তানি সৈন্যরা তখনও রয়ে গিয়েছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের একপাশে শেরপুর এবং অপর পাশে জামালপুর শহর। নদীর ওপার থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের ওপর শেলিং করছিল। শেলিং করতে করতে তারা চুপি চুপি পালিয়ে যাচ্ছিল ঢাকার দিকে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল তাদের পক্ষে আর সেখানে থাকা সম্ভব নয়। ৬-১০ তারিখ পর্যন্ত আমরা ব্রহ্মপুত্রের চরেই থাকলাম। ১০ তারিখ আমরা ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা এবং শেরপুর মুক্ত করলাম।
সমকাল : ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করলেন কখন?
হারুন হাবীব : আমি ঢাকায় ১৬ ডিসেম্বর কিংবা তার আগে আসতে পারিনি। ঢাকায় আসি ১৬ ডিসেম্বরের পর। কারণ ময়মনসিংহে বড় একটা অ্যাকসিডেন্টের শিকার হই। মোটরসাইকেলসহ ট্রাকের নিচে পড়ে যাই। আমার সঙ্গে ছিল সঞ্জু। দুর্ঘটনায় সে এবং আমি গুরুতর আহত হই। ২০ তারিখ পর্যন্ত আমি ময়মনসিংহ হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই রেডিওতে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমপর্ণের খবর শুনেছিলাম।
সমকাল : আপনি ঢাকায় ফিরলেন কবে?
হারুন হাবীব : আমি ঢাকায় ফিরেছি ডিসেম্বরের ২১/২২ তারিখে। ট্রেনযোগে। ট্রেন চলছিল খুব আস্তে আস্তে। কারণ পুঁতে রাখা মাইনের ভয় ছিল তখন। ট্রেনে ঢাকায় আসতে তখন ৪-৫ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ট্রেনে আসার দৃশ্যটাও ছিল অভূতপূর্ব। টিকিট করার কোনো ব্যাপার কিংবা সুযোগ তখন ছিল না। ট্রেনে ছিল মুক্তিযোদ্ধা, ভারতীয় সৈন্য এবং বাস্তুহারা লোকজন। মুক্তিযোদ্ধারা যে যেখানে পারছে ট্রেনে উঠছে, আবার নামছে। জয় বাংলা স্লোগানে গোটা ট্রেন ছিল মুখরিত।
সমকাল : ঢাকায় এসে কী দেখলেন?
হারুন হাবীব : ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখার সুযোগ আমার হয়নি। যুদ্ধে যাওয়ার আগে আমি থাকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ১০৭ নং কক্ষে। গিয়ে দেখি কেউ নেই। সব রুম তালাবদ্ধ। পুরান ঢাকায় নীলাম্বর সাহা রোডে আমার দূরসম্পর্কের এক চাচাতো বোনের বাড়ি ছিল। সেখানে গেলাম। অন্য আত্মীয়-স্বজনদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে আমার বন্ধুবান্ধবদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। ১৬ তারিখ আত্মসমর্পণের পর ঢাকা শহর আনন্দে মুখরিত হলেও সেই সময় ঢাকা শহরকে মনে হচ্ছিল আতঙ্কিত একটা শহর। এ সময়ের মধ্যে মুজিবনগর সরকার কলকাতা থেকে আস্তে আস্তে ঢাকায় চলে আসছে।
সমকাল : দূরে যুদ্ধরত সেক্টরগুলোর ঢাকা শহরের ফেরার ব্যাপারটা কেমন ছিল? ১১ নম্বর সেক্টর ঢাকা শহরে কি আদৌ ফিরেছিল নাকি ময়মনসিংহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল?
হারুন হাবীব : ১১ নম্বর সেক্টর টাঙ্গাইল পর্যন্ত এসেছিল। যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পর পুরো যুদ্ধের কৌশলগত দায়িত্ব ছিল ভারতীয়দের ওপর। ১১ নম্বর সেক্টর ছিল মূলত একটি গেরিলা সেক্টর। প্রায় ২০-২২ হাজার লোক ছিল এ সেক্টরের সদস্য। তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রাম-গঞ্জের মানুষ। ইপিআর সদস্যরাও সংখ্যায় ছিল অনেক বেশি। অন্য সেক্টরগুলোর অবস্থা এ রকম ছিল না। ঢাকায় প্রবেশ করেছিল ৩ নম্বর সেক্টর_ 'এস' ফোর্স। এটা ছিল একটি রেগুলার ফোর্স। মুক্তিযুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি হচ্ছে_ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈনিক যারা বিদ্রোহ করে চলে এসেছিল তাদের সংখ্যা সব মিলিয়ে ৮-৯ হাজারের বেশি নয়। মুক্তিযুদ্ধের মূল ফাইটিং ফোর্স ছিল সাধারণ জনগণ। তারা মূলত ছাত্র, গ্রামের কৃষক এবং তরুণ। তবে আমাদের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। কারণ তাদের নেতৃত্বেই তো সবাই সংগঠিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষকে ট্রেনিং দিয়েছিল তারাই। আর ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তারা মূল ব্যাপারটা কিন্তু ধারণ করেছিল। এ প্রশংসা তাদের দিতেই হবে। কারণ অস্ত্র প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তারা যাবতীয় সহযোগিতা করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ১৭ থেকে ১৮ হাজার সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছে। ভাবতে ভালো লাগে মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর ত্রিপুরায় মুক্তিযুদ্ধের মনুমেন্ট হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য গর্বের ব্যাপার। ত্রিপুরার লোকসংখ্যা তখন ছিল ১৫ লাখ। আর তখন ত্রিপুরায় আমাদের শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে মনুমেন্ট নির্মিত হলো ত্রিপুরায়। অথচ ভারতের ১৭-১৮ হাজার সৈন্য আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দান করলেও আমরা তাদের জন্য আজও কোনো মনুমেন্ট তৈরি করতে পারলাম না।

Friday, December 3, 2010

মোনায়েম খানের রক্ষীরা আতশবাজির মতো গুলি ফুটিয়েছিল : মোজাম্মেল হক, বীরপ্রতীক


মোনায়েমের রক্ষীরা আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ করেছিল :মোজাম্মেল হক
মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১-এর ১৩ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক। কর্মচারীদের সহায়তায় বনানীর বাড়িতে ঢুকে গুলি করেছিলেন গভর্নরকে। এই অপারেশনে মৃত্যু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকের অন্যতম সমর্থক মোনায়েম খানের। অপারেশনের পর তার নিরাপত্তারক্ষী বেলুচ রেজিমেন্টের সদস্যরা আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ করেছিল। সেদিনের সেই বীরত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছেন মোজাম্মেল হক। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সেই অভিযান, ঢাকার অভ্যন্তরে গেরিলা তৎপরতা ও বিজয়ের কথা জানিয়েছেন তিনি।
..................................................................................
মোজাম্মেল হক, বীরপ্রতীক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের নিকটবর্তী ভাটারায়। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন স্টাফ ওয়েলফেয়ার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। কম বয়স সত্ত্বেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করেছেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে। 'ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ' নামে একটি গেরিলা গ্রুপের সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকায় পরিচালিত বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। ১৩ অক্টোবর এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা-পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সে অভিযান, গেরিলা যুদ্ধ ও ডিসেম্বরের ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ

সমকাল :মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সফল অপারেশনের কারণে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন আপনি। ১৩ অক্টোবর এসে এমন একটি দুঃসাহসী পদক্ষেপ কেন নিয়েছিলেন?
মোজাম্মেল : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে অপারেশনটি পরিচালিত হয়েছিল অক্টোবর মাসে। শুধু সম্মুখ সমরে নয়, মনস্তাত্তি্বক যুদ্ধেও যে পাক হায়েনারা পরাজিত হয়েছে_ এটি সারা পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এ অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল। আমার আক্রমণে মোনায়েম খানের মৃত্যুর পর সারা পৃথিবীর কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তানিদের পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা 'ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ' পাকিস্তানি মিলিটারির অ্যামবুশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যখন আবার মেলাঘরে ফেরত যাই তখন আমাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হায়দার সামরিক কায়দায় আমাদের বললেন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ যেহেতু অ্যামবুশে পড়েছে, সেহেতু তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। তাই তাদের দ্বারা গেরিলা অপারেশন অথবা সম্মুুখসমর সম্ভব নয়। তাদের দিয়ে আর্মস-অ্যামুনেশন বহন করা ছাড়া আর কোনো কাজ করানো যাবে না। এ রকম একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে দারুণ হতাশার সৃষ্টি করে। আমরা মনে খুব কষ্ট পাই। ট্রেনিং শেষে প্রায় প্রতিদিন আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতাম ওনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। একদিন উনি ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, প্রত্যেক দিন তোমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? বললাম, স্যার আমাদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠান। তিনি বললেন, তোদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠিয়ে কী হবে? তোরা তো মানসিকভাবে পরাস্ত। আমরা বললাম, না স্যার আমরা মানসিকভাবে পরাস্ত হইনি। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বল কাকে মারতে পারবি? নানা কথার পর আমি বললাম, স্যার আপনিই বলেন কাকে মারব? তিনি বললেন, মোনায়েম খানকে মারতে পারবি? তিনি তার প্রশ্ন শেষ করার আগেই আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মোনায়েম খানকে মারতে পারলে কী দেবেন? তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, ঠিক আছে তাহলে আমি আজই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপকে পাঠিয়ে দেব। বনানী কবরস্থানে মোনায়েম খানের স্ত্রীর কবর অবস্থিত। সেখানেই গরু চরানোর সময় তার গরুর রাখাল শাহজাহানের ও কেয়ারটেকার মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিকল্পনা হয়। তার সাহায্যেই আমরা মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করি।
সমকাল : কখন অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন?
মোজাম্মেল হক : সন্ধ্যার সময়। সন্ধ্যায় যখন শাহজাহান গরু নিয়ে বাসায় ফেরে তখন আমরা তার সঙ্গে মোনায়েম খানের বাড়িতে ঢুকে কলাবাগানে লুকিয়ে থাকি। বাড়ির ভেতর ঢুকে সে মোনায়েম খানের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। তখন মোখলেছ এবং শাহজাহানকে আমরা সরে যেতে বলি। ওরা সরে গেলে আমরা অপারেশন পরিচালনার জন্য সামনের দিকে মার্চ করি। মোনায়েম খান তখন ড্রইংরুমে ছিল। ড্রইংরুম খোলা ছিল। রুমের ভেতর পশ্চিম দিকে মুখ করে সোফায় বসা ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন এবং তার জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল আর মাঝখানে মোনায়েম খান। সে সময় ইন্ডিয়ান স্টেনগানে আমরা ফায়ার ওপেন করি। তখন অস্ত্র আমাদের সঙ্গে বিট্রে করে। এসএমজি থেকে একটা বুলেট বের হওয়ার পর ফেঁসে যায়। চেম্বারে গিয়ে দ্বিতীয় বুলেট আটকে যায়, বুলেট আর বের হয়নি। পরে জানতে পারি, সেই একটি গুলিতেই মোনায়েম খান প্রাণ হারান। তারপর আমরা ৩৬ হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করি। সেটিও বার্স্ট হয়নি। আমরা দৌড়ে তার বাড়ির দেয়াল টপকে বনানী কবরস্থানে চলে যাই। সেখানে দেয়াল টপকানোর সময় আমার পকেটে থাকা হ্যান্ড গ্রেনেডটা পড়ে যায়। আমরা বনানী লেকের দিকে চলে যাই। মোনায়েম খানের বাড়িতে বেলুচ রেজিমেন্টের যে এক প্লাটুন পুলিশ ছিল, তারা সবাই চোখ বুজে শুয়ে ওপরের দিকে আড়াল দিয়ে সিগারেট টানছিল। আমরা চলে যাওয়ার পর তারা আকাশের দিকে ফায়ারিং শুরু করে অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে। তাদের ফায়ারিংয়ে নিউ ইয়ার উৎসবের আতশবাজির মতো আলোকিত হয়ে গিয়েছিল ঢাকার আকাশ। চারদিকে যেমন ছিল গুলির শব্দ, তেমনি আকাশে ছিল আলোর ঝলকানি। রেললাইনে, মোনায়েম খানের বাড়ির পশ্চিম পাশের ময়মনসিংহ রোডে এবং গুলশানেও গুলির শব্দ শোনা গেছে।
সমকাল : অপারেশনের পর কোথায় গেলেন?
মোজাম্মেল হক : অপারেশন শেষ করে আসার সময় আমার ভাতিজা ইস্রাফিল খন্দকারের (এখন উপ-সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ) দোকানের পাশে এসে দরজা নক করে আমি পানি পান করতে চাইলে তিনি আমাকে পানি পান করতে দেন। এরপর এয়ার ফোর্সের সার্জেন্ট আমার জ্যাঠাতো ভাইয়ের কাছে স্টেন দেওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম মোনায়েম খানের সেই দু'জন কর্মচারী মোখলেছুর ও শাহজাহান, আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীক, আমার বাবা, মা সবাই আমার চারপাশে বসা। তারা আমাকে রূপগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বললেও আমি যেতে রাজি হলাম না। আমি বাড়িতেই থাকতে চাইলাম। বাংলা ঘরে আমি শুয়ে ছিলাম। সকালবেলা আমার দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কে? আমার জ্যাঠা মালেক মাস্টারের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, রাতে আকাম করে এসে এখনও ঘরে শুয়ে আছ? আমি বললাম, কেন কী হয়েছে? তিনি বললেন, মোনায়েম খান মারা গেছে। মিলিটারি এসে এখন আমাদের বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দেবে। মোনায়েম খানের মৃত্যুর কথা আমি জ্যাঠার কাছ থেকেই প্রথম শুনতে পাই।
সমকাল : তখন আপনিই যে অপারেশনের মূল নায়ক, সেটি জানাজানি হয়েছিল?
মোজাম্মেল হক : তখন এটা বাইরের কেউ জানত না। যুদ্ধের পর পুরানা পল্টনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গড়ে ওঠে। সেখানে মেজর হায়দার আমাদের একশ' টাকা সম্মানী হিসেবে দেন। সে অনুষ্ঠানে বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়। তিনি আমাকে জানান, পুরস্কারের তালিকায় আমার নাম আছে। পরে পত্রিকায় দেখলাম বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকায় আমার নাম আছে। এরপর বিষয়টি মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তখন থেকেই মানুষ ঘটনাটি জানতে পায়।
সমকাল : ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছিল কখন?
মোজাম্মেল হক : প্রত্যেকটা সেক্টরেই এরিয়াভিত্তিক একেকটি গেরিলা গ্রুপ অপারেশনে পাঠানো হতো। আমাদের পাঠানো হয়েছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ নাম দিয়ে। গ্রুপের সদস্যরা ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা। আমাদের গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৩ জন। আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন এমএ লতিফ। আমাদের অপারেশন করতে হতো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, বনানী ও গুলশানে। মেজর হায়দারের নেতৃত্বে ২ নং সেক্টরের আমাদেরটি ছিল ৭ নং গ্রুপ। জুন-জুলাইয়ের দিকে গ্রুপটি গঠন করা হয়।
সমকাল : ঢাকার কাছাকাছি প্রথম আপনারা আসেন কবে?
মোজাম্মেল হক : জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমরা প্রথম ঢাকায় ঢুকি। আমাদের ট্রেনিং হয়েছিল ভারতে। জুনে আমি ঢাকায় আসি। সরাসরি অস্ত্র ট্রেনিংয়ের আগে ইঞ্জিনিয়ার সিরাজের নেতৃত্বে ঢাকায় একটি গ্রেনেড অপারেশনের গ্রুপ পাঠানো হয়েছিল। সেই অপারেশনে আমি গুলশান অ্যাম্বাসিতে গ্রেনেড চার্জ করি। গ্রেনেড চার্জ করার পর আমাকে প্রশিক্ষণ শিবির মেলাঘরে নিয়ে যায়।
সমকাল : জুনে আপনারা রূপগঞ্জে এলেন। তখন ঢাকায় অপারেশনগুলো কীভাবে করতেন?
মোজাম্মেল হক : প্রতিনিয়তই আমরা ঢাকায় আসা-যাওয়া করতাম। এর মধ্যেই আমাদের অপারেশনগুলো হতো। আমাদের নিজস্ব নৌকা ছিল। বর্ষার সময় আমরা নৌকায় আসা-যাওয়া করতাম। রূপগঞ্জ তখন অনেকটাই মুক্ত এলাকা। সেখানে আমরা অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতাম। রূপগঞ্জ থেকে আমরা শহর এড়িয়ে আমাদের গ্রাম ভাটারা আসতাম, সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্ট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢুকে রেকি করতাম বা অপারেশনগুলো পরিচালনা করতাম।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবর যখন আপনি শুনলেন তখন আপনি কোথায়?
মোজাম্মেল হক : ১৫ তারিখ রাতে আমি ঘোড়াশাল কালীগঞ্জে ছিলাম। কালীগঞ্জে মামার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি রূপগঞ্জ থেকে হেঁটে আসি। ১৫ তারিখ রাতেই শোনা যাচ্ছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। ১৬ তারিখ বিকেলবেলা শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে মামার সঙ্গে আমি গল্প করছিলাম। এমন সময়ই আমি পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পাই।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবরটা আপনারা পেলেন কীভাবে?
মোজাম্মেল হক : হেলিকপ্টারে ছাড়া লিফলেটের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর জানতে পারি। সেই সন্ধ্যা রাতেই মামাদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে আমি ঢাকার দিকে রওনা হই। ১৭ তারিখ সকাল ৭-৮টার দিকে আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করি।
সমকাল : ঢাকায় আসার পথে মানুষের কী প্রতিক্রিয়া দেখেছিলেন?
মোজাম্মেল হক : আসার সময় দেখলাম সব মানুষ আনন্দে আত্মহারা। আনন্দ উদযাপন করতে গিয়েই অনেক মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইনে আহত হয়েছে।
সমকাল : ১৭ তারিখ সকালে ক্যান্টনমেন্টে এসে আপনি কী দেখলেন?
মোজাম্মেল হক : আমি ক্যান্টনমেন্টে এসে দেখি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অস্ত্র পড়ে আছে। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করি। চার-পাঁচটি গরুর গাড়ি ভর্তি অস্ত্র আমি আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। পরবর্তী সময়ে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমাদানের দিন দুই ট্রাক অস্ত্র আমি জমা দেই।
সমকাল : ঢাকা শহরে ঢুকে প্রথম আপনি কী দেখলেন?
মোজাম্মেল হক : শহরের সব মানুষের চোখ-মুখে ছিল মুক্তির আনন্দ। মানুষের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে।

তিতাস নদীকে হাঁটুপানির বিল ভেবে তাতে লাফিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনারা : মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহীম, বীরপ্রতীক


পাক সেনারা তিতাসকে বিল ভেবে লাফিয়ে পড়েছিল :ইবরাহিম
মাহবুব মোর্শেদ
'এস' ফোর্স ও ৩১১ ভারতীয় পদাতিক ব্যাটালিয়নের যৌথ আক্রমণে ৪ ডিসেম্বর মুক্ত হয়েছিল আখাউড়া। কৌশল-গতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখাউড়া অভিযানে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও পাকিস্তানিদের নাস্তানাবুদ হওয়ার কথা। পরাজিত হওয়ার পর পাকিস্তানিরা দিগ্গি্বদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়েছিল। এক পর্যায়ে লাফিয়ে পড়েছিল তিতাস নদীতেও। ইবরাহিম বলেন, 'তিতাস
নদীকে তারা মনে করেছিল হাঁটুপানির কোনো বিল। আমরা দেখলাম, তারা সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর ডুবে মরছে।' ১৬ ডিসেম্বরের ঢাকার স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। বলেছেন, ১৯৭২-এর ৩০ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরে বিহারিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী অভিযানের কথা। ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে সে অভিযানকালেই শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান।
............................................................................................................
সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহীমের জন্ম ৪ অক্টোবর ১৯৪৯ সালে, চট্টগ্রামে। তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে যোগ দিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইনফ্যান্ট্রি করপস-এ কমিশন লাভ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত সময়কালের অভিজ্ঞতা, বিশেষত আখাউড়া দখলের কথা তিনি বলেছেন এ সাক্ষাৎকারে। এসেছে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুর যুদ্ধের বেদনাদায়ক অধ্যায়ের কথাও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ


সমকাল : যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কী ছিল?
ইবরাহীম : ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর দিনটি মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে। মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারছিলাম যুদ্ধের শেষ দিনটি নিকটবর্তী ; এবং সুনিশ্চিতভাবেই আমরা বিজয়ীর বেশে বাংলাদেশে প্রবেশ করব। আমি তখন লেফটেন্যান্ট ইবরাহীম। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের 'সি' কোম্পানির অধিনায়ক। একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নে (যেমনটি ছিল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) চারটি কোম্পানি থাকে আর একটি সদর কোম্পানি বা সব বিষয়ে সহায়তাদানের জন্য কোম্পানি থাকে। আমাদের অধিনায়ক ছিলেন সদ্য মরহুম সেই সময়ের মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী। তিনি পরে বীরবিক্রম খেতাব পেয়েছিলেন। আর আমরা ছিলাম ব্রিগেড সমপর্যায়ের একটি সংগঠন 'এস' ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত। এ সময় 'এস' ফোর্স ও ভারতীয় ৩১১ পদাতিক ব্যাটালিয়ন মিলে আখাউড়া দখল ও মুক্ত করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।
সমকাল : আখাউড়া দখলের পরিকল্পনা কেন নেওয়া হলো?
ইবরাহীম : আখাউড়া হচ্ছে বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তের সীমান্তরেখার নিকটবর্তী একটি শহর। আখাউড়ার পাশেই সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটার দূরে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা অবস্থিত। আখাউড়া একটি রেলওয়ে জংশন। চট্টগ্রাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেললাইন এসে একটি শাখা সিলেট এবং অন্য একটি শাখা ঢাকার দিকে চলে যায়। তাই আখাউড়া দখল করা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আখাউড়ার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তিতাস নদী। তিতাস নদীতে নৌ-চলাচল তখনও ভালোই হতো। এখন অবশ্য পানির অভাবে তা হয় না। মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আখাউড়া আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় এবং আমরা নির্দেশ পাই। এই নির্দেশের ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর দিবাগত রাত অর্থাৎ ১ ডিসেম্বরের প্রত্যুষে আমরা আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন এবং আজমপুর গ্রামের ওপর আক্রমণ করি। সেখানে পাকিস্তানিদের ছোট্ট একটি প্রতিরক্ষা বূ্যহ ছিল। সেখানে নিম্নে ৩০ এবং ঊধর্ে্ব ৫০-এর বেশি সৈন্য ছিল না। সৌভাগ্যের বিষয়, আমাদের আক্রমণের মুহূর্তে তারা কোনো বাধা প্রদান না করে পলায়ন করে। আমরা সেখানে অনেক অস্ত্র পেলেও কোনো মানুষকে ধরতে পারিনি। তারা আজমপুর থেকে পালিয়ে দক্ষিণ দিকে দেড় থেকে দুই মাইল দূরে আখাউড়া চলে যায়। এটি আমাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কারণ আমরা চূড়ান্তভাবে আখাউড়াই দখল করতে চাচ্ছিলাম। তাই আমরা আজমপুর থেকে দক্ষিণ দিকে রেললাইন ধরে আখাউড়ার দিকে গেলাম। আখাউড়াকে অবরোধ করা হলো। অবরোধ করল দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানি বি এবং সি। বি কোম্পানির অধিনায়ক তখন ছিলেন লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান। তিনি পরবর্তীকালে বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন এবং শহীদ হয়েছেন। আর আমি সি কোম্পানি নিয়ে দক্ষিণ দিকে মুভ করে আখাউড়ার উত্তর থেকে আখাউড়া অবরোধ করলাম। বাংলাদেশ এবং ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত রেখার কাছে সেখানে আমাদের গেরিলা এবং নিয়মিত সৈনিকরা ৩নং সেক্টরের সৈন্যরা মেজর আবদুল মতিনের নেতৃত্বে অবরোধ দেয়। দক্ষিণ দিক থেকে অবরোধ সৃষ্টি করে ভারতীয় ৩১১ পদাতিক ব্রিগেড। অতঃপর শুরু হয় গোলাগুলি। খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ এবং খণ্ড খণ্ড আক্রমণ। আমাদের গোলন্দাজ বাহিনী কম ছিল। ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর শত ইচ্ছা থাকলেও সময়মতো তারা আমাদের সহায়তা দিতে পারত না। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে যেহেতু এটি ছিল মরণপণ লড়াই তাই তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রচুর পরিমাণে গোলা শেলিং করত। ৩ তারিখ রাতে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম, আজকে মধ্যরাতের পর আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করব। আক্রমণ করা হলো কিন্তু ওদিকে তারা কী করছে সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম তারা শক্ত বূ্যহ রচনা করেছে। তাদের গোলাগুলির প্রকৃতি বলছিল সে কথাই। মধ্যরাতে শুরু হয় আমাদের আক্রমণ। আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তাদের পক্ষ থেকেও চলতে থাকে সমান প্রতিরোধ। এই গোলাগুলিতে দুর্ভাগ্যবশত একান্তই ভুল বোঝাবুঝির কারণে আমাদের পেছনের বন্ধুপ্রতিম সৈন্যরাও আমাদের প্রতি গুলিবর্ষণ শুরু করে। কারণ তারা মনে করেছিল আমরা আমাদের অবস্থানে নেই। সেখানে একটি কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং সারারাত গোলাগুলি চলে। আমরা আমাদের আক্রমণের শক্তি ও আক্রমণের প্রভাব বুঝতে পারছিলাম না। সেটা দেখা গেল প্রত্যুষে। আমরা টের পেলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা পলায়ন করছে। একটু আলো ফোটার পর আমরা দেখতে পেলাম তারা কাতারবন্দি হয়ে অস্ত্র কাঁধে নিয়ে পালাচ্ছে। কিছুসংখ্যক লোক পালাচ্ছে রেললাইন ধরে আবার কিছুসংখ্যক পানির গভীরতা না বুঝেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে তিতাস নদীতে। তিতাস নদীকে তারা মনে করেছিল হাঁটু পানির কোনো বিল। আমরা দেখলাম তারা সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর ডুবে মরছে। এ রকম একটি অবস্থায় আমরা তাদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখি। এভাবে আমরা আখাউড়ার উত্তর অংশ পুরোটাই নিজেদের দখলে নিয়ে আসি। এ যুদ্ধটি পূর্বাঞ্চলের রণক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ। আখাউড়া মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী রেললাইন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আশুগঞ্জের দিকে এলো এবং মুক্তিবাহিনী মহাসড়ক তথা সিলেট, তেলিয়াপাড়া, মাধবপুর, শাহবাজপুর, সরাইল, আশুগঞ্জের পথ ধরে আশুগঞ্জে আসার সুযোগ পেল। এটি হয়েছিল এস ফোর্সের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন লে. কর্নেল সফিউল্লাহর (পরবর্তীকালে যিনি মেজর জেনারেল, সেনাপ্রধান এবং বীরউত্তম খেতাব লাভ করেন) নেতৃত্বে।
সমকাল : আপনারা কবে ঢাকায় পেঁৗছেছিলেন?
ইবরাহীম : ১৬ তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের খবর আমরা পেলাম ৪টায়। তখন বড় অধিনায়করা ঢাকায় কী করছেন সেটা জানার কোনো প্রয়োজন ও উপায় আমাদের ছিল না। আনুমানিক ৪টার দিকে আমরা খবর পেলাম এ রকম একটা কিছু ঘটতে পারে। সম্ভবত ৫টার দিকে আমরা খবর পেলাম আত্মসমর্পণ হয়ে গেছে। তখন গোলাগুলি বন্ধ। এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা সবাই একত্রিত হয়ে নদী অতিক্রম করে রাস্তা ধরে ডেমরা থেকে হাঁটা শুরু করলাম ঢাকা মহানগরীর দিকে। সে এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। আমরা দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা হাঁটছি রাস্তার দক্ষিণ পাশ দিয়ে, আর রাস্তার উত্তর পাশ দিয়ে হাঁটছে আত্মসমর্পণ করার উদ্দেশ্যে ঢাকাগামী পাকিস্তানি সৈনিকরা। ওদের কিছু ছিল বালুচ, আর মিলিশিয়া ছিল বেশি। এই করে আমরা রাত সাড়ে ৭টা কিংবা ৮টার দিকে ঢাকা মহানগরের গুলিস্তানের কাছে তখনকার আমলের একমাত্র স্টেডিয়ামে এসে উপস্থিত হলাম। তখন চারপাশে গোলাগুলি হচ্ছিল। তবে সেটা ছিল আনন্দের। রাতে আমরা যে যেখানে পারলাম বিশ্রাম নিলাম। পরের দিন আমরা ওপর থেকে কী আদেশ আসে সেটা জানার জন্য এবং তদনুযায়ী কাজ করার জন্য প্রস্তুত হলাম।
সমকাল : ঢাকা শহরে পেঁৗছে কী দেখলেন?
ইবরাহীম : সেদিন ঢাকা শহরের মানুষের মধ্যে ছিল বাঁধভাঙা আনন্দ। যে যেদিক থেকে পারছে ছুটে আসছে স্টেডিয়ামের দিকে। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখার জন্য, তাদের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য। আর চারদিকে গোলাগুলি হলেও কোনো মানুষ কিন্তু মরেনি। আমরা বুঝতে পারছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে এখনও অস্ত্র, গুলি রয়ে গেছে। সেই গুলি ফুটিয়ে তারা পাড়ায়-মহল্লায় আনন্দ প্রকাশ করছে। লোকেরা ঘরে ঘরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াচ্ছে। আমাদের চারদিকে লোকজন ভিড় করছিল। তারা পরস্পরকে বলাবলি করছিল, এরা মুক্তিযোদ্ধা। এ সময় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারাও এসে পেঁৗছে গিয়েছিলেন। যথাসম্ভব তারা কাদেরিয়া বাহিনীর।
সমকাল : ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ বিহারিদের বিরুদ্ধে মিরপুর অপারেশনে আপনি জড়িত ছিলেন?
ইবরাহীম : ৩০ জানুয়ারির অপারেশনটি দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট করেছিল। ২৮ এবং ২৯ জানুয়ারি উচ্চ পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ নির্দেশ প্রদান করে ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে মিরপুরের দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে। এলাকা চেনার পূর্বে এবং পরিস্থিতি বোঝার পূর্বে এ রকম একটি জায়গার দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ। তা সত্ত্বেও তৎকালীন সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর কড়া নির্দেশে এটা করা হলো। আমি তখন দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টারে। রেসকোর্স ময়দানে তাঁবুর নিচে। আর তখনকার একটি কোম্পানি লে. কর্নেল হেলাল মোরশেদের নেতৃত্বে আমরা পাঠালাম মিরপুরে। মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীও গেলেন মিরপুরে। আমাদের দায়িত্ব এলাকাটি ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে বুঝে নেওয়া এবং সেখানে অপারেশন পরিচালনা করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা। স্পর্শকাতর একটি পর্যায়।
সমকাল : জহির রায়হান সেখানে কীভাবে গিয়েছিলেন?
ইবরাহীম : ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত আমার বই 'সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ২৮ বছর'-এ আমি এটি লিখেছি। অতঃপর অনেক সাংবাদিক এটার ওপর গবেষণা শুরু করেন। জহির রায়হান সেখানে কীভাবে গেলেন সেটিও লিখেছিলাম। জহির রায়হান ছিলেন অত্যন্ত বিখ্যাত বামপন্থি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারের ভাই এবং চিত্রপরিচালক। পারিবারিকভাবে তারা অনুমান করেছিলেন যে শহীদুল্লা কায়সারকে বিহারিরা মিরপুরে কোথাও অপহরণ করে লুকিয়ে রেখেছে। তারা অনুরোধ করেছিলেন, ২য় বেঙ্গল যেন শহীদুল্লা কায়সারকে অনুসন্ধানে তাদের সাহায্য করে। ৩০ তারিখ সকালবেলা তাদের পরিবারের ৬-৭ জন লোক মিরপুরে আমার অধিনায়ক মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর কাছে উপস্থিত হন। আমি সেখানে ছিলাম, ওসমান হায়দার চৌধুরী নিজামও ছিলেন।
মঈনুল হোসেন চৌধুরী বললেন, সামরিক অপারেশনে এত সিভিলিয়ানকে সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। আপনারা বলেন কে থাকবেন। পারিবারিক সিদ্ধান্ত ছিল, জহির রায়হান সেনাবাহিনীর সঙ্গে থাকবেন। সেনাবাহিনীর অপারেশনের সময় তিনি বিভিন্ন জায়গায় শহীদুল্লা কায়সারকে খোঁজার চেষ্টা করবেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে গিয়ে জহির রায়হার ওখানে শহীদ হয়ে গেলেন। আমাদের সেনাবাহিনীরও ৩৯ জন ওইদিন শহীদ হয়েছিলেন। পুরো নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক দিনে এত অধিকসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা আমরা হারাইনি। অথচ মিরপুরে সেটি হলো_ ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ।

আত্মসমর্পণ টেবিলের পেছনদিকে থাকার কথা ছিল আমারও : মেজর জেনারেল (অব.) কেএম সফিউল্লাহ, বীরউত্তম


পায়ে হেঁটে আগরতলা থেকে ডেমরা পৌঁছেছিলেন সফিউল্লাহ
মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১ সালের নয় মাসের দীর্ঘ সংগ্রামে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা, তখন ৩ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু করে পাকিস্তান। পরাজয়ের আগ মুহূর্তে কেন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল পাকিস্তান? মেজর জেনারেল (অব.) সফিউল্লাহর মতে, পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায়নি এবং মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণেও ছিল তাদের অনীহা। ফলে মুক্তিবাহিনীর কাছে
পরাজয়ের আগ মুহূর্তে তারা
আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ
ঘোষণা করে। এর মধ্য
দিয়ে তারা চেয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে মোটামুটি সম্মানজনক আত্মসমর্পণের আয়োজন করতে। এ অবস্থায় ডিসেম্বরের ৩ তারিখের পর শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যৌথ কমান্ড। এ সময় 'এস' ফোর্স নিয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন কেএম সফিউল্লাহ। আখাউড়া থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরা পর্যন্ত পেঁৗছেন পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। দুর্গম পথের বাধা, নদী, যানবাহনের অপ্রতুলতা কিছুই এ অগ্রাযাত্রার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সাধারণ মানুষেরও অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সহযোগিতা পেয়েছেন তারা। কিন্তু প্রায় পুরো পথই হেঁটে যেতে হয়েছে এস ফোর্স এবং এর প্রধান কেএম সফিউল্লাহকে। ডেমরায় অবস্থানকালে ১৬ তারিখ সকালে টিম হেড কোয়ার্টার থেকে মেসেজ পান কেএম সফিউল্লাহ। বিকেল ৩টার মধ্যে ঢাকা এয়ারপোর্টে পেঁৗছতে হবে জেনারেল অরোরাকে রিসিভ করার জন্য, বিকেল সাড়ে ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। সেখানে তাকে থাকতে হবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে। কিন্তু সঙ্গে গাড়ি নেই, হেঁটেও সময়মতো পেঁৗছানোর উপায় নেই। ডিসেম্বরের সেই শ্বাসরুদ্ধকর সময়ের কথা বলেছেন মেজর জেনারেল (অব.) সফিউল্লাহ।
.........................................................................................
মেজর জেনারেল (অব.) কেএম সফিউল্লাহর জন্ম ১৯৩৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন মেজর পদবির কর্মকর্তা, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড। গাজীপুরের জয়দেবপুরে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ১৯৭১-এর ১৯ মার্চ তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথমে ৩ নম্বর সেক্টর ও পরে 'এস' ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বীরউত্তম পদকে ভূষিত করা হয়। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বের নানা ঘটনা নিয়ে তিনি সম্প্রতি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ



সমকাল : সমকালের ডিসেম্বরের আয়োজনে মূলত মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বের ঘটনাবলির দিকেই মনোযোগ দেব। আপনি মুক্তিযুদ্ধে 'এস' ফোর্সের প্রধান ছিলেন। আপনার মনে পড়ে, চূড়ান্ত যুদ্ধে কখন আপনারা সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকার দিকে অগ্রসর হবেন?
সফিউল্লাহ : ডিসেম্বরের ঘটনা বলতে হলে পেছনের দিকের অনেক ঘটনার কথা বলতে হবে। আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল নয় মাস। এই নয় মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে এমন এক পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল যে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। তারা এমনি এমনি আত্মসমর্পণ করেনি। ৫ তারিখে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার জন্য আমাদের অপারেশন শুরু হয়েছিল।
সমকাল : ৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা হয়েছিল।
সফিউল্লাহ : ২৯ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি যুদ্ধ করছিলাম আখাউড়ায়। ৩ তারিখেই পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ওই সময়েই ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড কার্যকর হয়। যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হলে আমার ফোর্স ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশনের অধীনে চলে যায়। মাউন্টেন ডিভিশনের সাহায্যে ৪ ডিসেম্বর আমরা আখাউড়া দখল করি। আখাউড়া দখল করার পর সেখানকার পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ৫ তারিখে আমাদের ভারতীয় কমান্ডার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আমরা ঢাকা অগ্রসর হবো। ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল গনজালবেজ যখন ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন ঠিক হলো তিন দিক দিয়ে তিনটি ব্রিগেড ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবে। একটি ব্রিগেড ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবে কুমিল্লা-ব্রাক্ষণবাড়িয়া রোডের উজানিশার ব্রিজ দিয়ে। একটি ব্রিগেড রেলরোড দিয়ে যাবে এবং আমার ব্রিগেড 'এস' ফোর্স যাবে সিলেট হাইওয়ে দিয়ে। আমরা তিন দিক থেকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া গিয়ে মিট করব। আমি সরাইল পেঁৗছাই ৯ ডিসেম্বর। সরাইল পেঁৗছার পর প্রথম বাধা আসে আশুগঞ্জে। পাকিস্তানের ১৪ ডিভিশন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিল। তারা আমাদের ধাওয়া করে ভৈরবের ভেতরে। আশুগঞ্জেই গুলিবিনিময় হয়। ১০ তারিখ তারা আশুগঞ্জের দিকে ভৈরব রেল ব্রিজের একাংশ ধ্বংস করে দেয়। ১১ তারিখ তারা ভৈরবের দিকের ব্রিজ ধ্বংস করে। সেই সময় ভারতীয় একটি ব্যাটালিয়ন হেলিকপ্টারে নদীর ওপারে চলে যায় এবং আমার ব্যাটালিয়ন নদীর এপারে আশুগঞ্জে থাকে। এভাবে আশুগঞ্জ-ভৈরবকে অবরোধ করে রাখা হয়। সেখানে ১৪ ডিভিশন পুরো অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ওখানে আমাদের ফোর্সের একটি অংশ থাকল। ইন্ডিয়ান ফোর্সের বাকি অংশ হেলিকপ্টারে করে নরসিংদী যায়। আমি আমার ফোর্স নিয়ে পায়ে হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে লালপুর, লালপুর থেকে মেঘনা নদীর পাড় হয়ে রায়পুরা, রায়পুরা থেকে নরসিংদী, নরসিংদী থেকে গাউছিয়া যাই। গাউছিয়া থেকে ইন্ডিয়ান আর্মি চলে যায় ডেমরার দিকে। আমি শীতলক্ষ্যা পার হয়ে ডেমরা দিয়ে নদীর পশ্চিম পাশে পেঁৗছলাম। ভারতীয় সেনারা থাকল নদীর পূর্ব পাশে। পশ্চিমে ছিল পাকিস্তানি ১২ ব্যাটালিয়ন। ১৩ তারিখ রাতে আমরা সেখানে পেঁৗছলে ১২ ব্যাটালিয়নের সঙ্গে আমাদের গুলিবিনিময় হয়। ১৪ তারিখ সকালে যখন আমরা ঢাকার দিকে অগ্রসর হবো, তখন থেকেই ইন্ডিয়ান হাইকমান্ড থেকে আকাশবাণীতে একটি মেসেজ প্রচার করা হচ্ছিল পাকিস্তানিদের উদ্দেশে। তাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানো হচ্ছিল। এক পর্যায়ে পাকিস্তানিরা বলল, সিজফায়ার (যুদ্ধবিরতি) করো, সিজফায়ার করলে আমরা আত্মসমর্পণ করব। তখন ১৪ তারিখে সিজফায়ার করে বসে থাকলাম। আমার একটা ব্যাটালিয়ন থাকল আশুগঞ্জে, বাকি একটা ব্যাটালিয়ন নিয়ে আমি ডেমরায় অবস্থান করতে থাকলাম। আমরাও পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করতে বলছিলাম। সিজফায়ারের কথা উঠলে আমরা সিজফায়ার করলাম। আমরা ইচ্ছা করলে ১৪ তারিখে ঢাকায় ঢুকে যেতে পারতাম।
সমকাল : ঢাকার দিকে অগ্রসর হলেন না কেন?
সফিউল্লাহ : ঢাকার দিকে এগোলাম না, কারণ আমরা ডেমরা থেকে দেখছিলাম হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে। অগ্রসর হতে হলে আমাদের ফায়ার করে করে অগ্রসর করে হবে। ফায়ারিং মুভমেন্ট করতে গেলে আমাদের লোকদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
সমকাল : লোকজন ঢাকা ছাড়ছিল কেন?
সফিউল্লাহ : নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে, নিয়াজি আত্মসমর্পণ করছে না। করছে না বিধায় মানুষ মনে করছে, তাহলে তো ঢাকা শহরে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হবে। এই ভয়ে মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। আমরা অগ্রসর হলে ঢাকা ছাড়তে থাকা লোকজন আমাদের গুলির সামনে পড়ত। এ জন্য আমরা ওইখানে অবস্থান করতে থাকলাম। সত্যি কথা বলতে কি, পাকিস্তানিরা সিজফায়ারের নামে আমাদের সঙ্গে বেইমানি করেছে। একদিকে সিজফায়ারের ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে তুলে এনে এবং বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। আমরা যদি ১৪ তারিখে ঢাকায় ঢুকতে পারতাম তবে হয়তোবা কিছু মানুষ বেঁচে যেত বলে আমার বিশ্বাস। ১৬ তারিখ সকালে কমান্ডার বললেন, আমরা ঢাকার দিকে অগ্রসর হবো।
সমকাল : কখন?
সফিউল্লাহ : সকাল ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে। এই সময় আমি একটা মেসেজ পেলাম টিম হেডকোয়ার্টার থেকে। আমি যেন বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা এয়ারপোর্টে উপস্থিত থাকি জেনারেল অরোরাকে রিসিভ করার জন্য। আর বিকেল সাড়ে ৪টায় আমি যেন রেসকোর্সে থাকি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে। আমাকে সেখানে বাংলাদেশ ডেলিগেট হিসেবে থাকতে হবে।
সমকাল : এই মেসেজ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড থেকে এসেছিল?
সফিউল্লাহ : হ্যাঁ। ৫৭ ব্রিগেড কমান্ডারের তরফ থেকে আমার কাছে মেসেজ এসেছিল। ৩১১ মাউন্টেন ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মিশ্রা ও ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং আমাকে এই নির্দেশ দেন। আমি আখাউড়া থেকে ডেমরা পেঁৗছি পায়ে হেঁটে। আমি যখন খবরটা পেলাম তখন ১২টা পার হয়ে গেছে। আমাকে ঢাকায় পেঁৗছতে হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়। তখনও ডেমরা থেকে ঢাকা পর্যন্ত রাস্তাটি একটি রণক্ষেত্র। গাড়ি-ঘোড়া চলছে না। পায়ে হেঁটে ঢাকা যেতে হলে আমি সময়মতো পেঁৗছতে পারব না। তখন আমি গাড়ি খুঁজছি।
সমকাল : কোনো গাড়ি আপনাদের ছিল না?
সফিউল্লাহ : আগরতলা থেকে পুরো পথের সবটাই আমরা পায়ে হেঁটে এসেছি। অল্প কিছু গাড়ি ছিল। কিন্তু আমি তো গাড়ি নিয়ে নদী পার হতে পারিনি। মেঘনা নদী পার হয়েছি নৌকায়। এখন আমার একটি গাড়ি দরকার। পাকিস্তান আর্মির ১২ ব্যাটালিয়ন যেটি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য সিজফায়ার করেছিল, তার কমান্ডার ছিল আমার জানাশোনা একজন। তার নাম ছিল ব্রিগেডিয়ার খিলজি। আমি তার কাছে তার ব্যাটালিয়ন কমান্ডের ভেহিকেল চাইলাম। সে গাড়িতে করে আমি, খিলজি এবং সাবেক সিং রওনা হলাম ঢাকার দিকে। আমরা ডেমরা থেকে ঢাকার দিকে যাওয়ার সময় কলাপাড়ায় পাকিস্তানি সৈন্যরা ওই গাড়ির ওপর গুলি করতে শুরু করল। যদিও খিলজি গাড়ি ড্রাইভ করছিল কিন্তু সাবেক সিং ও আমার পরনে ছিল অলিভ গ্রিন ইউনিফর্ম। এই ইউনিফর্ম দেখে তাদের মনে হয়েছিল, এটি তাদের গাড়ি নয়। খিলজিকে দিয়েই আমরা তাদের গুলি থামিয়েছিলাম।
সমকাল : এয়ারপোর্টে গিয়ে কী দেখলেন?
সফিউল্লাহ : এয়ারপোর্টে আমি জেনারেল জ্যাকবকে দেখলাম, জেনারেল নিয়াজি ছিলেন। তারা জেনারেল অরোরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমরা ওখানে থাকতে থাকতেই এক ঝাঁক হেলিকপ্টার এসে নামল। জেনারেল অরোরা, এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার। খিলজিকে সেখানে রেখে আমি তার গাড়ি নিয়ে রেসকোর্সে চলে গেলাম। এখন রমনায় যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার তার পাশে একটি বটগাছ ছিল। সে বটগাছের নিচে একটা টেবিল ও দুটি চেয়ার পাতা ছিল। সেখানে জেনারেল নিয়াজি ও তার স্টাফ অফিসাররা গেলেন। এ কে খন্দকার গেলেন। আমারও সেখানে থাকার কথা ছিল; কিন্তু আমি ছিলাম টেবিলের সামনে দাঁড়ানো। দলিলে সাইন করার পর জেনারেল নিয়াজি তার বেল্ট, পিস্তল ও ব্যাজ খুলে দিলেন। ওই সময় আমার হাতের এই ঘড়িটায় ৪টা ৩১ মিনিট বাজে।
সমকাল : এই ঘড়িটায়?
সফিউল্লাহ : হ্যাঁ। এই ঘড়িটাই। আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে লোকজন জয় বাংলা স্লোগান দিতে থাকল।
সমকাল : লোকজনের উপস্থিতি কেমন ছিল?
সফিউল্লাহ : মুক্তিযোদ্ধাই বেশি ছিলেন। এলাকার সাধারণ মানুষও ছিল। অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু তখনও পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেনি। মানুষ তখনও ওইভাবে বেরিয়ে আসেনি। তারপরও মানুষ ঢিল ছুড়ছিল, থুথু দিচ্ছিল। তখন আমরা একজন আরেকজনের হাত ধরে নিয়াজিকে ঘিরে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমি যখন ডেমরা থেকে চলে আসি, তখন আমার ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ও ব্রিগেড মেজরকে বলে এসেছিলাম, তাড়াতাড়ি ঢাকায় রেসকোর্সে আসার জন্য। তারা এলে তাদের আমি স্টেডিয়ামে থাকতে বললাম।
সমকাল : আপনি রমনায় ক্যাম্প করলেন ১৭ ডিসেম্বর।
সফিউল্লাহ : ১৬ তারিখ আমার ফোর্স থাকল স্টেডিয়ামে। আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল পাবনা সিল্ক হাউসে। অনেকদিন পর সেই দোকানে গদিতে শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তবে স্টেডিয়ামে যাওয়ার আগে ১৬ তারিখ সন্ধ্যার পর আমি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। সব জায়গায় ইন্ডিয়ান আর্মি গার্ড দিয়ে আছে।
সমকাল : ইন্ডিয়ান আর্মি তখনও সংখ্যায় কম ছিল। সম্ভবত তারা ছিলেন নাগরার নেতৃত্বে আসা এক ডিভিশন সৈন্য।
সফিউল্লাহ : তখনও ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন ক্যান্টনমেন্টের বাইরে। জাতীয় সংসদ ভবন তখন অর্ধসমাপ্ত। সংসদ ভবনের উল্টোদিকে মণিপুরি পাড়ার ফাঁকা জায়গায় তারা ক্যাম্প করেছিল।
সমকাল : তখনও তো পাকিস্তান আর্মি ডিসআর্মড হয়নি।
সফিউল্লাহ : অস্ত্র তাদের হাতেই ছিল। সেনানিবাসে আমার ফ্যামিলি থাকত সেনাভবনের উল্টোদিকে একটা দোতলা সাদা বিল্ডিংয়ে।
সমকাল : যুদ্ধের সময় কি তারা ওখানে ছিল?
সফিউল্লাহ : না। তারা ১০ মার্চ ১৯৭১ এখান থেকে চলে যায়।
সমকাল : আপনি বিদ্রোহ করেছেন ১৯ মার্চ।
সফিউল্লাহ : আমি ১ মার্চ টাঙ্গাইলে ছিলাম। সেখান থেকেই আমি বুঝতে পারছিলাম যে অবস্থা খারাপ। তখন আমি ঢাকায় এসে ফ্যামিলি মেম্বারদের কুমিল্লায় আমার শ্বশুরবাড়ি অথবা রূপগঞ্জে আমার বাড়িতে চলে যেতে বললাম। তখন ফ্যামিলি সরিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। ১০ মার্চ আমার শ্বশুরের মৃত্যুবার্ষিকী ছিল, সে অজুহাতে তারা ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে বের হতে পেরেছিল।
সমকাল : ১৬ তারিখ বাসায় ফিরে আপনি কী দেখলেন?
সফিউল্লাহ : আমার বহু বছর সেই বাড়িতে কেটেছিল, সেখানে গচ্ছিত ছিল সমস্ত সম্পদ। আমি বাড়িতে গিয়ে দরজায় নক করলাম। ভেতর থেকে একজন সোলজার বেরিয়ে এলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কোনো অফিসার আছে কি-না। যে অফিসারটি বেরিয়ে এল, সে আমার পরিচিত। আমাকে দেখে বলল, সফিউল্লাহ কেমন আছ? আমি বললাম, তুমি কি জানো এই বাড়িতে আমি থাকতাম? ও বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি কি জানো আমার পুরো জীবনের সঞ্চয় এখানে আছে? বলল, আমি তা-ই ভেবেছিলাম। আমি তোমার জিনিস দেখাশোনা করেছি। যেগুলো ব্যবহার করার সেগুলো করেছি। আর যেগুলো করার নয় সেগুলো প্যাক করে রেখেছি। তুমি এখনই বাড়ি বুঝে নিতে চাও? আমি বললাম, এখনই চাই না। তুমি আরও কয়েকদিন থাকতে পারো। ওই বাসা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে কিছুদূর যেতেই গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে গেল। দুপুর ১২টা থেকে আমি গাড়ি চালাচ্ছি, কিন্তু পেট্রোল ফুরিয়ে যেতে পারে এটি মাথায় ছিল না। এক্সট্রা ফুয়েলও ছিল না। আমি ভাবছিলাম, পাম্প থেকে পেট্রোল এনে গাড়ি চালু করব। এমন সময় উল্টোদিক থেকে একটা গাড়ি আসতে দেখলাম। গাড়িটা থামালাম। গাড়ি থেকে যে লোকটি বেরিয়ে এলো সে ছিল একজন বাঙালি অফিসার। আমাকে দেখে হাই, হ্যালো করার পর বলল, আমি ডিউটিতে ছিলাম, এখনই ছাড়া পেলাম। এ কথাটা শোনার পর আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল।
সমকাল : তিনি পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন!
সফিউল্লাহ : আত্মসমর্পণ হয়ে গেছে বিকেল সাড়ে ৪টায়। রাত তখন সাড়ে ৮টা-৯টা বাজে। এ পর্যন্ত সে ডিউটি করে এলো। আমি তখন চিৎকার করে উঠলাম। বললাম, গিভ ইওর ওয়েপন অ্যান্ড জিপ, অ্যান্ড গেট লস্ট ফ্রম মাই সাইট। সে পিস্তল দিল, জিপ ছেড়ে চলে গেল।
সমকাল : ক্যান্টনমেন্টে ফোর্স নিয়ে আপনারা ঢুকলেন কবে?
সফিউল্লাহ : ২২ ডিসেম্বর প্রবাসী সরকার ফিরল। ২৪ তারিখে জেনারেল ওসমানী এলেন। এসেই তিনি বললেন, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের হেডকোয়ার্টারে অফিস করতে চান। ২৬-২৭ তারিখের দিকে আমরা ক্যান্টনমেন্টে এলাম। তখন ইন্ডিয়ান আর্মি পার্লামেন্ট ভবনের পাশে ক্যাম্প করে। ৩০ তারিখের দিকে পাকিস্তান আর্মির সদস্যদের অস্ত্রশস্ত্র সহকারে সীমান্তের দিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যায় তারা। ততদিন পর্যন্ত পাকিস্তানিদের ডিসআর্ম করা হয়নি। ইন্ডিয়ান বর্ডার ক্রস করার পর পাকিস্তানিদের ডিসআর্ম করা হয়।
সমকাল : ১৬ তারিখের পর ঢাকার মানুষের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
সফিউল্লাহ : তখন অনেকে প্রশ্ন করত আমাকে, সফিউল্লাহ, আমরা কি হাতবদল হলাম? আমি এর সদুত্তর দিতে পারিনি তখন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী যদি বাংলাদেশ ও ভারতের নেতৃত্বে না থাকতেন, তবে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। ইতিহাসে কোথাও এমন উদাহরণ নেই যে, সাহায্যকারী বাহিনী সাহায্য গ্রহণকারী দেশ এত অল্প সময়ে ছেড়ে গেছে। বাংলাদেশই একমাত্র ব্যতিক্রম। আর এটি ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর ভালোবাসার কারণে।

Tuesday, November 23, 2010

চলতি কথা : বাসাবাড়ির রাজনীতি কি জমবে?


১৪ নভেম্বর। হরতালের পর সন্ধ্যা। রাস্তাঘাটে গাড়ি অল্প। পথচলতি মানুষও কম। ভিড়ভাট্টা নেই বলে বাসে ওঠা গেল সহজে। বসার মতো আসনও মিলে গেল। দেখলাম, বাসযাত্রীরা বেশ বৈঠকি মুডে আছেন। বাসযাত্রীদের বৈঠকি মুড মানেই রাজনীতি নিয়ে তপ্ত কথা। শুরু করলেন একজন। সঙ্গে সঙ্গে তাতে সায় দিলেন কয়েকজন। বিরোধিতার জন্য অনেকে এক পায়ে খাড়া। বোঝা গেল, যাত্রীরা বেশ তেতে আছেন। মওকা পেয়ে নিজের মনোভাব জানিয়ে দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না কেউই। মুহূর্তের মধ্যেই বেশ সরগরম হয়ে উঠল পুরো বাস।
প্রথম বক্তা হরতালের ভুক্তভোগী। ঈদে গ্রামে ফেরার কথা ছিল। ফিরতে পারেননি। আপাতত বাড়ি ফেরার আশা ছেড়ে ঢাকায় ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তার মত_ বাড়ি একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। দেশের আইন-আদালতে বিষয়টার সুরাহা হবে। লড়াই হবে আদালতে। এ নিয়ে রাজনীতি করার স্কোপ নেই। হরতাল ডাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। ঈদের আগে এমন সময় হরতাল ডেকে বিএনপি মানুষের সিমপ্যাথি হারাল।
কথা শেষ হওয়ার আগেই তাকে চেপে ধরলেন একজন। খানিকটা রুষ্ট কণ্ঠে। বললেন, আপনাদেরই-বা কেমন নীতি? ঈদের আগে বাড়ি ছাড়াতে বাধ্য করলেন, তাও এক কাপড়ে? প্রথমজন বললেন, ভাই \'আপনাদের\' মানে কী? আমি তো কোনো দলের লোক না। তিনি হয়তো দলের লোক না। কিন্তু আরেকজন বাসের পেছনের সিট থেকে বলে উঠলেন, ঈদের আগে-পরে তো ব্যাপার না ভাই। অবৈধ বাড়ি থেকে তাকে চলে যেতে হতোই। ৪০ বছর ধরে তিনি যে বাড়িটা দখল করে রেখেছিলেন সেইটাই তো বড় ভুল ছিল। বাড়িটা আগেই ছাড়লে তিনি ভালো করতেন। এই বাড়ি দখলমুক্ত করে এতদিনে একটা কাজের কাজ করল সরকার।
বিএনপির পক্ষে আরেকজন এইবার গলা চড়িয়ে বললেন, বাড়ি অবৈধ হবে কেন? বাড়ি তো এই দেশের সরকারেরই দেওয়া। আর সুপ্রিম কোর্টে তো মামলার সুরাহা হয় নাই। এবার আওয়ামী পক্ষের একজন বললেন, আপনারা তো কথায় কথায় স্বৈরাচার বলেন। এখন স্বৈরাচারের দেওয়া বাড়িতে থাকতে সমস্যা হয় না? স্বৈরাচারের কথায় বৈঠকে নতুন এক তাত্তি্বকের আগমন ঘটল। তিনি বললেন, আসলে এখনও এরশাদই সবকিছুর কলকাঠি নাড়ছেন। কেমনে? খালেদা জিয়াকে বাড়ি দিয়ে তিনি আগেই সমস্যা তৈরি করে রেখেছিলেন। এখন বসে বসে দুই দলের বিবাদ দেখছেন আর মজা পাচ্ছেন। এরশাদবিরোধী একজন দেখা দিলেন সঙ্গে সঙ্গে। বললেন, এরশাদ আসলে এখন আর ফ্যাক্টর না। রাজনীতিতে তার বলার কিছু নাই, দেখারও খুব বেশি কিছু আছে বলে মনে হয় না।
কথা চলছে কখনও উঁচু, কখনও নিচু লয়ে। আলাপ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে রেফারির মতো একেকজন গলা চড়িয়ে বলছেন, আমরা সাধারণ মানুষ। এসব নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে আমাদের কাজ কী? রেফারিদের কথায় কাজ হচ্ছিল। পরক্ষণেই আবার তাপ বাড়ছিল। বাসের আলাপ শুনে মনে হচ্ছিল, রাজনীতি দেশের মানুষের ভাগ্যের নির্ধারক বিষয় না শুধু। মানুষের বিনোদনেরও অন্যতম উৎস বটে। রাজনীতি নিয়ে মুখরোচক আলোচনা করে মানুষ তৃপ্ত হয়। বিতর্কে জড়িয়ে নিজের মতের শক্তি পরীক্ষা করে। পত্রপত্রিকায়, টিভিতে রাজনীতি নিয়ে টক শো গোগ্রাসে গেলে। ক্ষমতাবানদের নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। ক্ষমতার উত্থান-পতন নিয়ে ভাবে। কখনও এ-পক্ষ, কখন ও-পক্ষ এবং শেষ পর্যন্ত একা একা শুধু আত্মপক্ষ। তখন হয়তো তার অতিপ্রয়োজনীয় চালের দাম বাড়তির দিকে, পকেটে টান পড়েছে, বাসার বিদ্যুৎ ফুড়ূৎ ফুড়ূৎ করছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে রাজনীতির যোগ নিয়ে আলোচনা জমে না। জমে খালেদা জিয়ার বাড়ি নিয়েই। আর এ নিয়ে মানুষের নখদর্পণে এত তথ্য, এত উপাত্ত আর এত যুক্তি যে ভাবতে ভালোই লাগে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই বলছিলেন, রাজনীতির পুরনো ধারা আর চলবে না। বাঙালি না বাংলাদেশির মতো সস্তা তর্কে আর মানুষের মন ভিজবে না। দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-দলপ্রীতি আর ফিরতে পারবে না। সংসদে বসে সবকিছুর সমাধান হবে। সহিংসতা-সংঘাতের দিন শেষ। সরকার যখন খালেদা জিয়ার বাড়ির বরাদ্দ বাতিল করল আর বিরোধী দল যখন বিষয়টি শক্তভাবে মোকাবেলা করার হুমকি দিল, তখনও এসব আশাবাদ থিতু হয়ে যায়নি। অনেকেই বলছিলেন, একটা বাড়ি কি আর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে? বাড়ি ইস্যু নিয়ে বিএনপি আর কত দূর যাবে? খালেদা জিয়ার বাড়ি নিয়ে মানুষ রাস্তায় নামবে কেন? এসব কথার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি ফিরছিল পুরনো খাতে। ফিরতে ফিরতে দু\'বছরের মাথায় এসে দেখা গেল_ ঠিকই, একটা বাড়িই রাজনীতির কেন্দ্র হতে পারে। সরকার ও বিরোধী দল মিলে যদি চেষ্টা করে তবে একটা বাড়ি কেন, একটা ইটও রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। সে নিয়ে জনগণ দু\'ভাগে বিভক্ত হতে পারে। বিবাদে জড়িয়ে রক্তও ঝরাতে পারে। আমাদের জনগণেরই-বা দোষ কী? যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যদি বারাক ওবামার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে বিশ্বাস করে আর ভোটে তার প্রভাব পড়ে তবে আমরা আর কতটুকু এগিয়ে থাকব? ভাবতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপকসংখ্যক মানুষ বিশ্বাস করে, বারাক ওবামা মুসলিম এবং কমিউনিস্ট?
মোটাদাগে হিসাব করলে, আমাদের দেশে তিন ধরনের রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন মানুষের দেখা পাওয়া যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় দলের কথা আগে বললাম। এইবার তৃতীয় দলের কথা। তারা মনে করেন, রাজনীতিতে যা হচ্ছে তার কোনোটাই ঠিক হচ্ছে না। ভুল সবই ভুল, এ জীবনের পাতায় পাতায় ভুল। খালেদা জিয়ার বাড়ি নিয়ে তাদের মন্তব্য কী তা নিয়ে স্বাভাবিক একটা কৌতূহল আছে মানুষের মধ্যে। এখন দেখা যাক তারা কী মনে করেন। তারা মনে করেন, এরশাদ যে সেনানিবাসের মইনুল রোডের মতো জায়গার একটা বাড়ি খালেদা জিয়াকে দিয়েছেন সেটা ঠিক করেননি। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, বাড়ি ভেট দিয়ে খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিরত রাখবেন। এই ভাবনা ছিল ভুল। আবার সেনানিবাসের বাড়িতে থেকে রাজনীতিতে জড়ানো ছিল খালেদা জিয়ার ভুল। তার উচিত ছিল, রাজনীতি শুরু করার পর বাড়ি ছেড়ে দেওয়া। বাড়ি তিনি না ছাড়লেও তার মনে রাখা উচিত ছিল, এ বাড়ি কারো স্থায়ী সম্পদ হতে পারে না। ফলে তিনি যে বিকল্প কোনো আবাসে নিজেকে মানিয়ে নেননি সেটা ছিল তার ভুল। আবার মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার বাড়ির বরাদ্দ বাতিল করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তা ছিল একটা ভুল। এ সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারের সিদ্ধান্তের পর খালেদা জিয়া বাড়ি না ছেড়ে একগুঁয়ে মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এতে রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাড়ির বিবাদ আদালতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। কারণ, এতে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার পথ বন্ধ হয়েছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের উচিত ছিল হাইকোর্টের রায় \'স্টে\' করার আবেদন করে আপিলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া। সেটি তারা করেননি, সেটাও ছিল ভুল। আবার আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে সরকার পক্ষ খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাও ছিল ভুল। সরকারের চাপ সত্ত্বেও খালেদা জিয়া যে বাড়ির দখল রাখতে মরিয়া হয়েছিলেন সেটা ছিল ভুল। আবার সরকার যে বেশ জোরজবরদস্তি করেছে সেটাও ছিল ভুল। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসিক্ত হয়ে খালেদা জিয়া দুর্বল মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রীর অশ্রুপাত ও সাজপোশাক নিয়ে মন্তব্য করে সরকারের নেতা-নেত্রীরাও শুভবোধের পরিচয় দেননি। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে ঈদের আগে হরতাল ডেকে বিএনপি ঠিক করেনি। সরকারও ঈদের আগে খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ঠিক করেনি। মোটকথা, যা হয়েছে সবই ভুল, যা হচ্ছে, যা হতে পারে তাও।
অবশ্য ভুলবাদী লোকেরা কী চায়, সেটি বোঝা বড় শক্ত। কারণ, রাজনীতিতে এদের স্পষ্ট ও স্থায়ী কোনো চেহারা নেই। এরা কখনও তৃতীয় পক্ষ, কখনও মধ্যপক্ষ, কখনও কোনো পক্ষই না, স্রেফ সাধারণ নাগরিক।
এদের একদল হৃদয় খুঁজে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে না। তারা চায়, যেমন আছি তেমন রবো। মিলমিশের রাজনীতি চলুক। সংসদে বিতর্ক হোক। হরতাল-সংঘাত না থাকুক। নেতা-নেত্রীদের কথাবার্তা হোক।
আরেক দল চায়, রাজনীতিতে পরিবর্তন আসুক। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নাগরিকদের সামনে যথার্থ কর্মসূচি উত্থাপন করা হোক। দেশ ও জাতি একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাক। যে বিষয়গুলো রাজনীতির প্রকৃত ইস্যু নয়, সেগুলোকে ইস্যু বানানোর প্রক্রিয়াটা আর না চলুক। এটা হোক বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়েই।
আরেক অংশ মনে করেন, রাজনীতির পুরনো চর্চা আর চলবে না। বিদ্যমান রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এমনকি তাদের কর্মসূচিও চলবে না। দেশ চালাবে উচ্চশিক্ষিত, অবসরপ্রাপ্ত লোকেরা। পারলে অগণতান্ত্রিক পথে, অনির্বাচিত সরকার গঠন করেই।
বলাবাহুল্য, দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনের পর দেশে তৃতীয় পক্ষের বক্তব্যের পসার এখন ভালো না। তাদের কথা ভালো কি মন্দ সেটা পরের কথা। কাটতি ভালো না এটাই বাস্তবতা। তৃতীয় পন্থার বিগত সমাধান দেখে মানুষ কিছুটা হতাশ। নতুন করে আশা ফিরতে সময় লাগবে। ফলে আপাতত পুরনো ধারার নাটকের দর্শক হওয়ার বিকল্প কী?
এসব নাটকের ফাঁকে ফাঁকে একটা বিষয় কিন্তু অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে হিংসা-প্রতিহিংসা, ভুল-শুদ্ধ, অগ্রগতি-পশ্চাৎগতি সবই আছে, থাকবেও। খোলা চোখে যত অমানবিক মনে হোক, খালেদা জিয়ার সেনানিবাস ছাড়ার ঘটনা শেষ পর্যন্ত আমাদের রাজনীতিতে একটা অগ্রগতিই। ওয়ান-ইলেভেনের আগে-পরে রাজনীতির সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে প্রচুর কথা হয়েছে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সদস্যরা তো বটেই, শুভবোধসম্পন্ন প্রতিটি মানুষ মনে করে, গণতন্ত্রই শেষ কথা; রাজনীতিতে সশস্ত্র বাহিনীর জড়ানো ঠিক নয়। এই বাস্তবতায় একজন রাজনীতিকের সেনানিবাস ছাড়ার ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ। খালেদা জিয়া বাড়ি থেকে বের হতে বাধ্য হলেন বটে। কিন্তু এর মাধ্যমে সেনানিবাসের সঙ্গে রাজনীতির একটি যোগাযোগ ছিন্ন করল। আরও গ্রহণযোগ্য হতো, যদি এই প্রক্রিয়া শুধু আদালতের রায়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো।
বিএনপির উচিত এখন মানুষের শক্তির দিকে দৃষ্টি দেওয়া, সাধারণের সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করা। সেনানিবাসের বাড়ির স্মৃতি নিশ্চয়ই একজন শীর্ষস্থানীয় নেত্রীকেও অশ্রুসিক্ত করতে পারে। কিন্তু মানুষ নেতা-নেত্রীদের অশ্রুপাত দেখতে চায় না। তারা বরং নেতা-নেত্রীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের কথা মনে করেই অশ্রুপাত করতে চায়। খালেদা জিয়ার উচিত, পুরনো বাড়ির শোক দ্রুত কাটিয়ে উঠে নতুন একটি বাড়ি তৈরি করা। আর নাগরিকদের উচিত খেয়াল রাখা, যাতে স্থায়ী বা অস্থায়ী, বাস্তব বা অবাস্তব কোনো রাজনৈতিক বাড়ি যেন সেনানিবাসে আর তৈরি না হয়।

মাহবুব মোর্শেদ : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mahbubmorshed@ymail.com