Tuesday, June 29, 2010

একশ' রুপির উপন্যাস!


বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের হাল-হকিকত হয়তো অনেকের জানা; কিন্তু কতটুকু জানা থাকা সম্ভব? একুশে বইমেলায় বই প্রকাশিত হয় কয়েক হাজার। এই বিপুল বইয়ের সম্ভারে চেনা-জানা, সিরিয়াস কিংবা জনপ্রিয় লেখকদের বই হাতে গোনা। এ সামান্যসংখ্যক বই নিয়েই পত্র-পত্রিকায় আলোচনা হয়, পাঠকরাও আগ্রহ ভেদে সে বই থেকে কেনাকাটা সারেন। এর বাইরে বইয়ের বিশাল একটি অংশ থেকে যায় সচেতন পাঠকের নাগালের বাইরে। অবশ্য নাগালের বাইরে বললে ভুল হবে, বইমেলার ঠিক বাইরেই রাস্তায় পাটি বিছিয়ে ভারতীয় পাইরেসি বইয়ের পাশে যে দুর্বল মলাটে, হালকা প্রচ্ছদে, বাহারি নামের বইগুলো শোভা পায় সেগুলো তো চেনা লেখকের চেনা বইয়ের চেয়ে হাতের নাগালে মেলে বেশি। নীলক্ষেতে, পুরানা পল্টনে ফুটপাতের বইয়ের দোকানে এ বইগুলোর কাটতি ভালো। আর ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোর বইয়ের দোকান মানে কম দামের এসব বাহারি বইয়ে ভরা সেলফ। বছরখানেক আগে এসব বই নিয়ে একটি প্রতিবেদনও চোখে পড়েছিল। সেখানেই জানতে পেরেছিলাম, ভুল বানানে, কোনো সম্পাদনা, বাছ-বিচারের অবকাশ না রেখে ছাপা এসব বইয়ের নাম নেটবই। বাংলাবাজারের কিছু প্রকাশকের আয়ের উৎস এ নেটবই। নবিশ বা শখের লেখকরা পাণ্ডুলিপি নিয়ে এলে টাকার বিনিময়ে ছেপে কিছু বই লেখককে ধরিয়ে দিয়ে বাকিগুলো বাজারে ছেড়ে কিছু টুপাইস কামান অনেক প্রকাশক। মজার ব্যাপার হলো, মফস্বল বা রাজধানীর শখের লেখকরাই শুধু নন, প্রবাসী লেখকদের মহা-কদর আছে এমন প্রকাশকদের কাছে। নিজের টাকায় বই বের করেন আর সে টাকা থেকে লভ্যাংশটা পকেটে পুরতে পারেন বলে প্রকাশকরা নাকি নেটবইয়ের মুরগা ধরার জন্য তক্কে তক্কে থাকেন। বাংলাবাজারের নেটবই থেকে বেস্ট সেলার বেরিয়েছে কি-না সে খবর এখনও আমরা জানি না। নেটবই ছেপে কোনো প্রকাশক কোটিপতি হয়ে গেছেন কি-না সে বিষয়েও আমরা বেখবর; কিন্তু ভারতের বাজারে এখন নাকি ১০০ রুপির উপন্যাসের বেশ কাটতি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত ২৬ তারিখে এ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছেপেছে। কৌতূহলকর এ রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ভারতের ইংরেজি বইয়ের বাজারে এখন চালু ট্রেন্ড হলো ১০০ রুপির সাহিত্য। প্রকাশনা শিল্পে এ নিয়ে বিরাট একটা হেস্তনেস্ত হয়ে গেছে। কোনো সম্পাদনা, গ্র্যামার, বানানের বালাই নেই, স্রেফ সস্তা প্রেমকাহিনী মলাটবদ্ধ করে ছাড়ছে প্রকাশনা সংস্থাগুলো।
ভারতে ১০০ মিলিয়ন মানুষ ইংরেজিতে কথা বলে। আর এ মানুষগুলোর কাছে এ হালকা উপন্যাসই বিকোচ্ছে দেদার। বলা হয়ে থাকে, ভারতে কোনো বই ৫ হাজার কপি চললেই বইটিকে বেস্ট সেলার তকমা দেওয়া হয়; কিন্তু সৃষ্টি পাবলিশার্স এমন সব ১০০ রুপির উপন্যাস বের করেছে, ভারতজুড়ে এসব বইয়ের ১৬ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত বিক্রি হওয়া কোনো ব্যাপারই নয়। সৃষ্টি পাবলিশার্সের বয়স ১২ বছর। মালিক জয়ন্ত কে বসু। তারা এ জনপ্রিয়তার বাজারে ঢুকেছে মাত্র ২০০৮ সালে। এর মধ্যেই তারা ৩৬ জন নাম না জানা লেখকের বই বাজারে এনেছে। এদের মধ্যে কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ছাত্র, একজন আবার ১৬ বছরের বালক। এদের অনেকে লেখক হওয়ার আগে একটা-দুটোর বেশি বইও পড়েনি। জয়ন্ত কে বসু বলছেন, তারা পাঠক বাড়াচ্ছেন। পাঠকরা পড়ছে, ফলে বই প্রকাশিত হচ্ছে। জয়ন্ত ছিলেন রুপা প্রকাশনীর মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা। এখন তিনি সৃষ্টিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন যে, সৃষ্টি পাবলিশার্সকে এখন একতা কাপুরের বালাজি টেলিফিল্মসের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। একতা কাপুর যেমন প্রত্যেক টিভি সিরিয়াল শুরু করেন কে দিয়ে, তেমনি জয়ন্তও বইয়ের নাম দেন ১৯ বর্ণের। নামগুলোও বাহারি। যেমন- অফকোর্স আই লাভ ইউ...!, নাউ দ্যাট ইউ আর রিচ...। অবস্থা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া, রুপার মতো প্রকাশনীগুলোও বাজারে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ১০০ রুপির উপন্যাস ছাপা শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে_ এ উপন্যাসগুলোতে থাকে কী? একজন লেখক বলছেন, 'আমরা কঠিন শব্দ ব্যবহার করি না। আর গল্পটা এমনভাবে বলি যেন লিখছি না, পাঠক আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমি তাকে বলছি।'

Tuesday, June 15, 2010

দরজায় কড়া নাড়ছে পত্রিকার হকার : অরুন্ধতী রায়




ভারত সরকার যখন দেশের প্রান্ত-অঞ্চলে বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সেনা ও বায়ুসেনা মোতায়েনের চিন্তাভাবনা করছে তখন শহরাঞ্চলে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে। 'গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা কমিটি' ২ জুন মুম্বাই শহরে একটি জনসভার আয়োজন করে। মূল বক্তা ছিলেন 'ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি'র সম্পাদকীয় উপদেষ্টা গৌতম নাভলাখা আর আমি। মিডিয়ার উপস্থিতি ছিল দেখার মতো। সভা হয়েছিল ৩ ঘণ্টা। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তা সাড়ম্বরে প্রচারিতও হয়েছিল। ৩ জুন কিছু পত্রিকা, টিভি ও রেডিফের মতো কিছু অনলাইন খবরদাতা সাইট বস্তুনিষ্ঠভাবে এ বিষয়ক খবর প্রচার করেছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুম্বাই সংস্করণের শিরোনাম হয়েছিল 'আমাদের এখন এমন একটা আদর্শ দরকার যা বামও না, ডানও না।' হিন্দু পত্রিকার খবরের শিরোনাম হয়েছিল 'আমরা কি পাহাড়ে বক্সাইট ফেলে রাখতে পারি?' সভার ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছিল।
কিন্তু মিটিংয়ের পরদিন আমি যা বলেছিলাম তাকে মিথ্যা আকারে কর্কশভাবে উপস্থাপন করে পিটিআই। খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ৩ জুন ১টা ৩৫ মিনিটে। শিরোনামে লেখা হয়েছিল, 'অরুন্ধতী মাওবাদীদের সমর্থন দিচ্ছেন এবং কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করতে পারে এই ভয়ে ভীত নন'। সংবাদের কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি :
"লেখক অরুন্ধতী রায় মাওবাদীদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে যথার্থ মনে করেন এবং এই সমর্থনের জন্য কর্তৃপক্ষ যদি তাকে গ্রেফতার করে তবে তার তোয়াক্কা তিনি করেন না। রায় বলেন, 'নকশাল আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আমিও দোষারোপমূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। এই আন্দোলন সশস্ত্র হওয়াটাই উচিত ছিল। বিরোধিতার গান্ধীবাদী পদ্ধতিতে শ্রোতার প্রয়োজন হয়, যা এখানে অনুপস্থিত।' সংগ্রামের এই পথ বেছে নেওয়ার আগে মানুষ এ নিয়ে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক করেছে। দাতেঁওয়াড়াতে নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে মাওবাদীদের ভয়াবহ হামলায় ৭৬ জন সিআরপিএফ ও পুলিশের মৃত্যুর ঘটনায় অরুন্ধতী মাওবাদীদের স্যালুট জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমি লাইনের একপাশে নই। আমি কারও পরোয়া করি না... আমাকে তুলে নিয়ে জেলে ভরে ফেলো'।"
খবরের শেষ থেকেই শুরু করি। আমি ৭৬ সিআরপিএফ সদস্যের নিহত হওয়ার ঘটনায় দাতেঁওয়াড়ার মানুষকে স্যালুট জানিয়েছি_ এই কথাটি একটি অপরাধমূলক বিকৃতি। আমি সিএনএন-আইবিএনের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে এটি স্পষ্ট করে বলেছি যে, সিআরপিএফ সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাকে আমি দুঃখজনক মনে করি। আমি মনে করি, তারা গরিবের বিরুদ্ধে ধনীদের যুদ্ধে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। মুম্বাইয়ের সভায় আমি যা বলেছি তা হলো, মিডিয়া যে অন্তঃসারশূন্য দোষারোপের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছে আমি তাকে সমালোচনা করি। যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সহিংসতাও বিস্তার লাভ করেছে, এখন দু'পক্ষের নৃশংসতার খবর সংবলিত কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া কঠিন। ফলে এক পক্ষের নৃশংসতার ওপর ভিত্তি করে নৃশংসতার বিশ্লেষণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। আমি বলেছি, আমি ওইখানে সরকার বা মাওবাদী কারও দ্বারাই কোনো সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলাম না। এখন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যে, আদিবাসী গ্রামগুলোতে সিআরপিএফ সদস্যরা ২৭টি একে ফোরটি সেভেন, ৩৮টি আইএনএসএএস, ৭টি এসএলআর, ৬টি লাইট মেশিনগান নিয়ে কী করছিল? যদি তারা যুদ্ধ করতেই গিয়ে থাকে তবে মাওবাদীদের দ্বারা সিআরপিএফ সদস্যদের হত্যার ঘটনাকে দোষারোপ করার মানে হলো, এই যুদ্ধে সরকারের পক্ষাবলম্বন করা। আর এই যুদ্ধের সঙ্গে আমরা অনেকেই দ্বিমত পোষণ করি।
পিটিআইর খবরের বাকি অংশগুলো সভা সম্পর্কে বিদ্বেষপ্রসূত, বুদ্ধিহীন মুড়িঘণ্ট। মাওবাদীদের সম্পর্কে আমার অবস্থান পরিষ্কার। আমি তাদের নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছি। আমি ওই সভায় বলেছি, করপোরেট কোম্পানির ভূমিগ্রাসের বিরুদ্ধে মানুষ যে আন্দোলন করছে তাতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একত্রিত হয়েছে। এই মতাদর্শের মানুষের মধ্যে মাওবাদীরা সবচেয়ে জঙ্গি। আমি বলেছি, সরকার এখন সবাইকে মাওবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করছে, যাতে সবার বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক ও সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আমি বলেছি, সরকার মাওবাদী কথাটাকে এমনভাবে সম্প্রসারিত করেছে যে, যারাই তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে এবং ন্যায়বিচার নিয়ে কথা বলছে তারাই এখন মাওবাদীতে পরিণত হয়েছে। আমি কালিংনগর ও জগৎসিংপুরের মানুষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, যারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেও সশস্ত্র পুলিশের দ্বারা ঘেরাও হয়েছিল এবং তাদের গুলি করা হয়েছিল। আমি বলেছি, স্থানীয় মানুষেরা কী পদ্ধতিতে প্রতিরোধ করবে তা নির্বাচনের জন্য দীর্ঘদিন চিন্তাভাবনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নেয়। আমি বলেছি, কেন গভীর বনের মানুষেরা গান্ধীবাদী প্রতিরোধের পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে না। সত্যাগ্রহের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক মঞ্চ দরকার, এটি কার্যকর করার জন্য দরকার সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের উপস্থিতি, কিন্তু গভীর বনে সেটি নেই। আমি কথা বলেছি ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে, তারা কীভাবে আমরণ অনশনে যাবে? আমি কখনও বলিনি, 'এই আন্দোলন সশস্ত্র হওয়াই উচিত ছিল।' (এই পৃথিবীতে কথাটার মানে কী দাঁড়ায় আমি জানি না।)
আমি বলেছিলাম, বিভিন্ন মতভিন্নতা সত্ত্বেও আজ অনেক আন্দোলন চলছে এবং সেগুলো চলছে একই শত্রুর বিরুদ্ধে। ফলে তারা সবাই একই দিকে এবং আমি তাদের পাশে আছি। কিন্তু লাইনের এই পাশ থেকে শুধু সরকারকে প্রশ্ন করাই কর্তব্য নয়, আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে। আমি যা বলেছিলাম, তা হুবহু এই :
'আমি যে প্রতিরোধকে ধারণ করি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি লাইনের এই পাশে আছি। আমি এ নিয়ে সচেতন। আমি পরোয়া করি না, আমাকে তুলে নাও, জেলে ভরে ফেলো। আমি লাইনের এই পাশে আছি। কিন্তু এই পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো এবং সহযোদ্ধাদের প্রশ্ন করা উচিত।'
এরপর আমি বলেছি, যখন এটা বলা হচ্ছে যে, প্রতিরোধের গান্ধীবাদী পদ্ধতি কার্যকর নয়, তখন এটা মনে রাখা দরকার যে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের মতো কার্যকর গান্ধীবাদী আন্দোলনের একটি মৌলিক ও বিপ্লবী উন্নয়ন দর্শন আছে। কিন্তু মাওবাদী আন্দোলন যেখানে কার্যকর সেখানে তারা কোনো বিকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা ভেবেছেন কি-না এ নিয়ে সন্দেহ আছে। সরকার প্রাইভেট কোম্পানির কাছে খনি বিক্রি করে দিচ্ছে এই তথ্যের বাইরেও যে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, রাষ্ট্রের খনিনীতির চেয়ে মাওবাদীদের খনিনীতি কি খুব আলাদা? তারা কি পাহাড়ে বক্সাইট ফেলে রেখে দেবে? নাকি ক্ষমতায় এলে তারা খনন চালাবে? আমি পাবলো নেরুদার সেই 'আদর্শ তেল কোম্পানি' কবিতাটির কথা উল্লেখ করতে পারি, যেখানে এই পুরনো তর্কটির কথা বলা হয়েছে।

পিটিআই রিপোর্টার আয়োজকদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সভা রেকর্ড করার পর এই মনগড়া 'ব্যাখ্যা' দাঁড় করাতে পারেন না। এটা ভয়াবহ মিথ্যাচার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ৪ জুন বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টিভি একদিনের পুরনো এই রিপোর্ট প্রকাশ করে। আর এসব পত্রিকা ও টিভির নিজেদের রিপোর্টাররা আগের দিন সঠিক সংবাদ দিয়েছেন এবং জানেন পিটিআইর রিপোর্টটি মিথ্যা। দি ইকোনমিক টাইমস বলেছে, 'অরুন্ধতী রায় প্রকাশ্য সভায় অং সান সু চি হতে চেয়েছেন।' আমি এটা জানতে আগ্রহী যে, কেন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো একই খবর একবার সত্য আরেকবার মিথ্যা আকারে মোট দুইবার ছাপতে আগ্রহী হলো?'
ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী আমার দিলি্লর বাসায় এসে জানালায় পাথর ছুড়ে মেরেছে। একটি পাথর রাস্তায় ক্রীড়ারত এক বাচ্চার গায়ে প্রায় আঘাত করতে বসেছিল। এতে ক্ষিপ্ত মানুষ জড়ো হয়, লোক দুটি পালিয়ে যায়। এর মিনিট খানেকের মধ্যেই একটি টাটা ইন্ডিকা এসে হাজির। একটি লোক নিজেকে জিটিভির রিপোর্টার পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করল, এটা কি অরুন্ধতী রায়ের বাড়ি? এখানে কি কোনো সমস্যা হয়েছে? স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এটি আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর পাতানো নাটক মঞ্চায়নের আগ্রহে ঘটেছে, যেখানে দেখানো হতো অরুন্ধতী রায় জনরোষের শিকার হয়েছেন। আমার সৌভাগ্য, তাদের চিত্রনাট্যে ভুল ছিল। কিন্তু আরও অনেক কিছু তখনও বাকি ছিল। ৫ জুন রায়পুরের দৈনিক ভাস্কর একটি খবর ছাপে, যেখানে লেখা হয়, 'সাহস থাকে তো এসি রুম ছেড়ে জঙ্গলে আসুন, অরুন্ধতী রায়।' ওই সংবাদে ছত্তিশগড় পুলিশের মহাপরিচালক বিশ্বরাজন আমার উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, মাওবাদীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমি যেন পুলিশকে মোকাবেলা করি। ভাবুন, পুলিশের মহাপরিচালক বনাম আমি, ম্যান টু ম্যান এমন লড়াইয়ের কথা। ভারতীয় জনতা পার্টির ছত্তিশগড়ের নেতা পুনম চতুর্বেদী সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে চৌরাস্তায় গুলি করে মেরে ফেলা উচিত। এবং আমার মতো অন্য বিশ্বাসঘাতকদের শূলে চড়ানো উচিত (কারও উচিত তাকে জানানো যে, সরাসরি এ ধরনের সহিংসতা ছড়ানো ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে শাস্তিযোগ্য অপরাধ)। ৮ জুন হিন্দি দৈনিক নয়ি দুনিয়া খবর দেয়, 'মাওবাদীদের প্রকাশ্যে সমর্থন' দেওয়ার অপরাধে দুজন ব্যক্তি ছত্তিশগড়ের দুটি থানায় নালিশ জানিয়েছেন।
এটাকেই বলে মনস্তাত্তি্বক যুদ্ধ। নাকি এটি অপারেশন গ্রিন হান্টের শহুরে ভূত? যেখানে একটি সরকারি সংবাদ সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি নথি তৈরি করার জন্য সহায়তা করছে, যখন ওই মন্ত্রণালয় আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ খুঁজেও পায়নি? নাকি পিটিআই সরকারকে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, আমাদের মধ্যে যারা বেশি পরিচিত তাদের গ্রেফতার করলে সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে না? নাকি এটি সেই নিষ্ঠুর খেলার অংশ, যাতে কোনো বিচার-বিবেচনার অবকাশ না রেখে বলা হয়, যদি তুমি আমাদের সঙ্গে না থাক, তবে তুমি মাওবাদীদের সঙ্গে আছ। তুমি শুধু একজন মাওবাদী নও, তুমি বোকা, উগ্র ও উচ্চরবের মাওবাদী। যাই হোক, এটি ভয়ঙ্কর ও লজ্জাহীন এবং নতুন একটি ঘটনা। যে কোনো কাশ্মীরিকে জিজ্ঞেস করুন, বা যে কোনো তরুণ মুসলিমকে যে 'সন্ত্রাসী' হিসেবে গ্রেফতার হয়েছে শুধু ভিত্তিহীন সংবাদের ভিত্তিতে। জিজ্ঞেস করুন মোহাম্মাদ আফজালকে, যাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে 'সমাজের যৌথ অবচেতনাকে শান্তি দিতে'।
এখন অপারেশন গ্রিন হান্ট আমার মতো লোকের দরজায় করাঘাত করতে শুরু করেছে। ভাবুন সেই সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের কথা, যারা সমাজে পরিচিত নন, তাদের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে। ২০০ জনকে জেল দেওয়া হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে অথবা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ঘটনাটি ঘটেছে ২৬ জুন জরুরি অবস্থার ৩৫তম বার্ষিকীতে। যেন ভারতীয় জনগণকেই এখন জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে (কেননা সরকার এটি করবে না)। প্রশ্ন হলো, জরুরি অবস্থা কি কখনও তুলে নেওয়া হয়েছিল? এখন সেন্সরশিপ বড় সমস্যা নয়, এর চেয়ে বড় সমস্যা হলো সংবাদের নির্মাণশিল্প।

ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে
ভাষান্তর : মাহবুব মোর্শেদ

Saturday, June 12, 2010

শাকিরা ও ওয়াকা ওয়াকা



বিশ্বকাপের থিম অ্যানথেমটি এখন সবার মুখে মুখে, টেলিভিশনের পর্দায়, ইউটিউবে, রেডিওতে। লাখ লাখ মানুষ এখন শাকিরার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছেন 'ওয়াকা ওয়াকা'। ওয়াকা শব্দের মানে, 'এখন সময় আফ্রিকার'। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাকিরা যেভাবে তার পরিবেশনা দিয়ে কোটি দর্শককে মাতিয়েছেন তাতে অনেকেই একবাক্যে বলেছে_ অসাধারণ, মোহনীয়, মনোমুগ্ধকর। শাকিরাও বলেছেন, তার জীবনের সবচেয়ে আবেগী মুহূর্তগুলোর একটি এ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করার ঘটনা। কিন্তু খোদ আফ্রিকানরাই বাদ সেধেছে শাকিরার এই গান নিয়ে। এখন সময় আফ্রিকার, এটি আফ্রিকার মানুষের অন্তরের কথা। দক্ষিণ আফ্রিকার জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, দারিদ্র্যপীড়িত কালো মানুষরা জেগে উঠছে। বিত্ত-বৈভবে আফ্রিকার এই উত্থানকে এখন নতুন করে গুনতে হবে বিশ্ববাসীকে। অবশ্য আফ্রিকায় নতুন চৈতন্যের জাগরণ শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা মিসরে আফ্রিকানরাই নির্মাণ করেছিল। আধুনিক পৃথিবীতে নেলসন ম্যান্ডেলাও নতুন জাগরণের মন্ত্র শুনিয়েছিলেন। এবার বিশ্বকাপের প্রথম খেলায় মেক্সিকোর সঙ্গে মারদাঙ্গা লড়াইয়েও তারা দেখিয়ে দিল, ফুটবলেও তাদের গুনতে হবে। হ্যাঁ, আফ্রিকা এবার নতুন করে জাগছে, নতুন যুগে প্রবেশ করছে। বিশ্বকাপের গানে তার প্রতিধ্বনি বাজবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কথাটা শাকিরার মুখ থেকে শুনতে হবে কেন? এ প্রশ্ন তুলেছেন আফ্রিকার তরুণ-তরুণীরা। তারা বলছেন, এ গান তো গাইবার কথা আমাদের। আমরাই বিশ্বকে জানাতে পারতাম আমরা জেগে উঠছি। আমাদের কোথায় কমতি ছিল? কিন্তু আমাদের কথাগুলো বলার জন্য শাকিরাকে ডেকে আনা হলো কেন? গানটি আফ্রিকান ব্যান্ড ফ্রেশলিগ্রাউন্ড ও শাকিরার যৌথ প্রযোজনা। তারপরও মুখ্য ভূমিকা শাকিরারই। ফলে বিশ্বকাপের মাঠে উত্তেজনা ছড়ানোর আগেই গান নিয়ে এক প্রস্থ হয়ে গেছে। আফ্রিকানদের এই তর্কে নিশ্চয়ই অনেকে সায় দেবেন। আফ্রিকা একটি মহাদেশ। এ মহাদেশের গান আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের গানকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। জ্যাজ, রক অ্যান্ড রোলের জন্ম হয়েছিল আফ্রিকান সঙ্গীতের হাত ধরে। শাকিরা তো সেই সঙ্গীতধারারই উত্তরাধিকার। শাকিরার জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭, কলম্বিয়ায়। জীবনের শুরুতেই তিনি লাতিন আমেরিকার শিল্পী হিসেবে গণ্য হন। এরপর পরিণত হন পুরো আমেরিকা মহাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীতে। লাতিন আমেরিকান মেয়েদের কাছে শাকিরা আইকন। নোবেল বিজয়ী কথাশিল্পী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ জানিয়েছিলেন, লাতিন মেয়েরা শাকিরার মতো করে হাঁটে, শাকিরার মতো করে চুল বাঁধে, শাকিরার মতো করে পোশাক পরে। নব্বইয়ের দশকে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকাজুড়ে তিনি খ্যাতিমান হন। গানের এ অপূর্ব ক্ষমতা যে, লাতিন আমেরিকার শিল্পী হয়েও তিনি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হন। বাংলাদেশেও তিনি জনপ্রিয়। শাকিরার গানে নানা জাদু আছে, তার মধ্যে আছে নানা সংস্কৃতির মিশ্রণ। তিনি ইংরেজি, পর্তুুগিজ ও স্প্যানিশ এই তিন ভাষায় কথা বলতে এবং গাইতে পারেন। তার বংশের মধ্যে লেবানিজ ও ইতালীয় ধারাও মিশেছে। শাকিরা শব্দটি আরবি, অর্থ কৃতজ্ঞ। বলা হয়ে থাকে, শাকিরার পরিবেশনার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দিক তার নাচ। আর তার বিশিষ্ট নাচের স্টাইলটি এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের বেলি ড্যান্সিংয়ের এতিহ্য থেকে। কি খ্যাতি কি পরম্পরা কোনো দিক থেকে শাকিরাকে একটি মহাদেশের বলা যাবে না। ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি গোটা বিশ্বের শিল্পী। আইকন। আর এ কারণেই ফিফা তাকে বেছে নিয়েছে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক মার্কেজ ২০০৬ সালে শাকিরাকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন। শাকিরার সাক্ষাৎকার ভিত্তিক লেখাটিতে তিনি শিল্পী অন্তর্লোকের নানা চিত্র তুলে এনেছিলেন। শোনা যায়, মার্কেজের সঙ্গে শাকিরার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। মার্কেজের উপন্যাস অবলম্বনে 'লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা' সিনেমা তৈরির সময় নাকি খোদ মার্কেজ তাকে সিনেমার মিউজিক ট্র্যাক তৈরি করতে বলেছিলেন। মজার ব্যাপার এই, শাকিরা বাংলাদেশে এসেছিলেন। ভয়াবহ সাইক্লোন সিডরের আক্রমণের পর তিনি ঘুরে গেছেন দক্ষিণাঞ্চল। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের মিডিয়া জানতেই পারেনি খবরটি।
http://www.youtube.com/watch?v=v4N5N-mGf4U

Sunday, June 6, 2010

টুইটার ও ব্রেকিং নিউজ


বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন ব্লগিং শুরু করার পর ভারতে একটু তোলপাড় লেগে গিয়েছিল। বিগ বির পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেকেই ব্লগিংয়ের রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেছিলেন। অনেকের মনে পড়বে, তখন আমাদের দেশের বিনোদন পাতাগুলোতে নিয়মিত বলিউডের বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর ব্লগিং করার খবর প্রকাশিত হতো। ব্লগিং নিয়ে বলিউডের ওই তোলপাড়ের সময় পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার একটি মন্তব্য প্রকাশ করেছিল। তাতে একটু পরিহাস করে বলা হয়েছিল, এবার সাংবাদিকদের যুগ শেষ। কারণ কী? কারণ নিউজ নিজেই কথা বলতে শুরু করেছে। আনন্দবাজার বলছিল, সাংবাদিকদের মোক্ষম অস্ত্র হলো, 'জানা যায়', 'বলা হয়ে থাকে', 'ধারণা করা হচ্ছে', 'খবরে প্রকাশ'। সাংবাদিকরা নাকি এই শব্দগুলো তখনই ব্যবহার করেন যখন তার হাতে তেমন তথ্য-প্রমাণ থাকে না। এমনকি তিনি যখন খবরটি উড়োকথা হিসেবে শুনেছেন তখনও নাকি স্রেফ একটি সূত্র জানায় বলে খবর হিসেবে চাউর করে দিতে পারেন। অমিতাভ বচ্চন তো বটেই, হলিউডের তারকারা খবরের বড় উৎস। ফলে তারা নিজেরা লিখতে শুরু করলে সাংবাদিকদের মোক্ষম অস্ত্র কাজে আসবে না বলেই মনে করছিল আনন্দবাজার। তারকারা ব্লগিং শুরু করার পর সাংবাদিকরা কতটা বিপদে পড়েছেন তা গবেষণার বিষয় বটে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে সংবাদের যে অনেক পরিবর্তন ঘটছে না নিশ্চিত করে বলা যায়। গত সপ্তাহে এমনই একটি খবর দিল লন্ডনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা। তারা বলছে, মাইক্রো ব্লগিং সাইট 'টুইটার' এখন সাংবাদিকদের কাছে ব্রেকিং নিউজের অন্যতম সূত্র। পত্রিকাটি ব্রিটেনের নির্বাচনের পর দরকষাকষির সময় ডেভিড ক্যামেরন ও নিক ক্লেগের টুইটার মেসেজের উল্লেখ করেছে। টুইটারে এই নেতারা আভাস দিয়েছিলেন যে, তাদের ঐকমত্য হতে যাচ্ছে। ফলে টুইটারের স্ট্যাটাসকে উদ্ধৃত করেই ব্রেকিং নিউজের অনুসন্ধান শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইন্ডিপেন্ডেন্ট এমন অনেক উদাহরণ দিয়েছে। তারা বলছে, টুইটার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নয়, আবার ব্লগ সাইটও নয়। টুইটারের মাধ্যমে একবারে মাত্র ১৪০ শব্দ শেয়ার করা যায়। ফলে দিন দিন ১০০ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর মধ্যে টুইটার নিউজ সাইট হিসেবেই জনপ্রিয় হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানও সম্প্রতি বলেছে, লোকে টুইটারকে এখন খবরের অল্টারনেটিভ সাইট হিসেবেই গণ্য করছে। আর আমেরিকা-ব্রিটেনের রাজনীতিকরাও টুইটারের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নানা সংবাদের ক্লু দিতে শুরু করেছেন। টুইটার এখন সাংবাদিকদের কাছে ব্রেকিং নিউজের উৎস। ইরানের নির্বাচনের আগে-পরে মীর হোসেইন মুসাভির সমর্থকরা টুইটার ব্যবহার করে কেমন সংগঠিত হয়েছিল সে কথাও এই সূত্রে সবার মনে পড়বে। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যদি এখন ব্রেকিং নিউজের জন্য টুইটারে যান তবে তাদের হতাশ হতে হবে। কারণ টুইটার এখনও বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় নয়। তারও চেয়ে বড় কথা, মোবাইলে এসএমএস সার্ভিসের মাধ্যমে টুইটার ব্যবহার এখনও চালু হয়নি এখানে। ফলে টুইটারের যে সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার তা এখানে চালু হয়নি। কিন্তু ফেসবুক বন্ধ হওয়ার পর টুইটার অ্যালেক্সা ওয়েব র‌্যাংকিংয়ে ১০ নম্বর স্থানে চলে এসেছে এক সপ্তাহেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে আর টুইটারের জন্য মোবাইলের এসএমএস সার্ভিস চালু হলে নিশ্চয় আমাদের আপামর জনসাধারণের সঙ্গে রাজনীতিকরাও টুইটার ব্যবহার করবেন। তখন আমাদের দেশে টুইটার ব্রেকিং নিউজের উৎস হবে, সন্দেহ নেই।

Sunday, May 23, 2010

সমকালের নিউজ কভারেজ : ভায়া টাইমস অব ইন্ডিয়া : ভারতে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংস


টাইমস অব ইন্ডিয়ার শিরোনাম : সত্য হারিয়ে গেল?
মুক্তিযুদ্ধের দলিল খোয়া গেছে ভারতে
মাহবুব মোর্শেদ
রোববার সকালেই দুঃসংবাদটি জানালো ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া। কয়েক ঘণ্টা পত্রিকাটির ওয়েবসাইটে শীর্ষ সংবাদ হিসেবে জ্বলজ্বল করছিল 'সত্য হারিয়ে গেল? বাংলাদেশ যুদ্ধের অধিকাংশ সামরিক দলিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।' পত্রিকাটি জানাচ্ছে, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য খুঁজছিল। সাম্প্রতিক এ অনুসন্ধানের ফলে এ স্পর্শকাতর তথ্যটি জানাজানি হয়ে যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানান, 'আমরা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য খুঁজছিলাম। এই ক্যাম্পগুলো কোথায় ছিল, কারা এগুলোর দায়িত্বে ছিলেন_ এ তথ্যগুলো জানতে চাচ্ছিলাম। ফাইলগুলো খুঁজে না পাওয়ায় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড একটি ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। এরপরই জানতে পারি, দলিলপত্রগুলো খোয়া গেছে।' পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক দুই প্রধানের মতে, সুপরিকল্পিতভাবেই এই দলিলপত্র ধ্বংস করা হতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ ছিলেন লে. জেনারেল এফ আর জ্যাকব। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা জেনারেল জ্যাকবের বই 'স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : বার্থ অব এ নেশন' এবং বিভিন্ন ভারতীয় সূত্র থেকে জানা যায়, তিনিই ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে শুরু হওয়া চূড়ান্ত যুদ্ধে ঢাকা বিজয়কে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। এ বিষয়ে তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল স্যাম
মানেক শ'র দ্বিধা সত্ত্বেও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। জেনারেল জ্যাকব ১৯৭৪ সালের আগস্টে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান হন। জেনারেল জ্যাকব টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান হওয়ায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র চেয়ে পাঠান। তখন তাকে জানানো হয়, দলিলপত্র নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তবে কে দলিল ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়ে থাকতে পারেন সে আলোচনা করতে তিনি রাজি হননি বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তবে পত্রিকাটি বলছে, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক প্রধানদের সঙ্গে আলোচনার সূত্রে বোঝা যায়, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই দলিলগুলো ধ্বংস করা হতে পারে। তখন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, যদি এটি সত্য হয় তবে তা হবে অরোরার ইমেজের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় ও পাকিস্তান বাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নায়ক হিসেবে অরোরা বাংলাদেশ ও ভারতে বীর হিসেবে খ্যাত।
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। পত্রিকাটির অনলাইন পাঠকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ-রকম একটি খবর প্রকাশের জন্য কেউ কেউ পত্রিকাটিকে বাহ্বা দিয়েছেন। কেউ বা প্রশ্ন করেছেন কেন ভারতীয় সেনাবাহিনী এরকম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ধ্বংস করে দিল? কোনো স্পর্শকাতর সামরিক তথ্য কি তারা লুকাতে চেয়েছিল? বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো অনলাইন সংস্করণে টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। 'কেন' এ প্রশ্নটি এখন সবার মুখে মুখে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া সন্দেহ পোষণ করে বলেছে, এসব দলিল হারিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হয়তো কখনো লেখা সম্ভব হবে না। ভারতের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, ভারতের সেনাসদর ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সেনা দফতরেও কিছু দলিল থাকতে পারে। কিন্তু এগুলো থেকে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন, যোদ্ধাদের অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত যুদ্ধে নেতৃত্বদান পর্যন্ত অনেক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের গুরুত্বপূর্ণ এসব অবদান গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকার করা হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এ খবরটি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। তার মতে, ভারতে আর্কাইভাল ডকুমেন্ট সংগ্রহের শক্ত বিধান আছে। ফলে, হুট করে কোনো ডকুমেন্ট ধ্বংস করে দেওয়া সেখানে সম্ভব নয়। বলতে গেলে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একমাত্র বিজয়ের ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ঘটেছে। কেন তারা এমন একটি বিজয়ের দলিল ধ্বংস করবে, এ প্রশ্ন তুলেছেন মুনতাসীর মামুন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও এস ফোর্সের প্রধান, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ (অব.) বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা আমাদের সর্বতোভাবে উপকৃত করেছে এবং সেটি আমাদের স্বার্থেই হয়েছিল। আমরা পাকিস্তানিদের কাবু করে ফেললেও আমাদের বিমান শক্তি ছিল না, দূরপাল্লার অস্ত্রও ছিল না। ফলে, ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অর্জন কঠিন হতো, আরও রক্ত ক্ষয়ের আশঙ্কা ছিল। জেনারেল শফিউল্লাহর মতে, মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প বা প্রশিক্ষণ শিবির সংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে সংরক্ষিত থাকার কথা। মুক্তিযুদ্ধের পর এ দলিলগুলো সেনা সদরে আনা হয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আরেক সাবেক মেজর জেনারেল জানিয়েছেন, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রয়োজনে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সব প্রশিক্ষণ শিবিরের বিস্তারিত তথ্য আনা হয়েছিল। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ও নেতাদের তালিকা তাতে আছে। মুক্তিযুদ্ধের অপারেশনাল ডকুমেন্টেশন মিলিটারি অপারেশন ডিরেক্টরিতে সংরক্ষিত আছে। পরবর্তীকালে এ ডকুমেন্টগুলো ঢাকা সেনানিবাসে স্থাপিত বিজয় কেতন জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। আশির দশকে পাওয়া প্রশিক্ষণ শিবির-সংক্রান্ত ডকুমেন্টগুলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড সূত্রে পাওয়া গেছে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ডকুমেন্টগুলো দিলেও এগুলো পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড সূত্রে পাওয়া গেছে কি-না তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
একজন সামরিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সামরিক দলিলপত্র নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনা রহস্যময় বলেই মনে হচ্ছে। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার আগে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড অষোষিত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছিল। অঘোষিত যুদ্ধের দলিলপত্র হয়তো তারা সংরক্ষণ করতে চাননি। ফলে, যুদ্ধের পর পরই দলিলপত্র নষ্ট করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে, ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ৩ ডিসেম্বরের আগেও অংশ নিয়েছিল তা এখন স্বীকৃত বিষয়। জেনারেল জ্যাকব তার বইয়ে এ সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি জানিয়েছেন অক্টোবরের শুরু থেকেই পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রস্তুতি নিতে থাকে। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ এ প্রস্তুতির বড় অংশ হলেও সেনাবাহিনীতেও সমান্তরাল প্রস্তুতি চলছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মঈদুল হাসান তার 'মূলধারা: '৭১' বইয়ে অক্টোবর-নভেম্বরে এমন প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজিও তার 'দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান' বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় বাহিনী নভেম্বরেই মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতরে অভিযান পরিচালনা করেছে।
ইতিহাসের অনেক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তথ্যগুলো স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পরে এগুলো স্পর্শকাতর বলে বিবেচিত হতে পারে। আর এ কারণেই এগুলো ধ্বংস করা হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে, তিনি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যাবলী সযত্নে সংরক্ষণ করে এবং নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেগুলো প্রকাশ করে তেমন নীতি উপমহাদেশের দেশগুলোতেও অনুসৃত হওয়া উচিত। কারণ, একদিন মানুষকে প্রকৃত ইতিহাসের সামনে দাঁড়াতে হয়। ইতিহাসের পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ তথ্যগুলো বিচার না করলে প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে বিবিসির শুভজিত বাচ্চি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল অশোক মেহতার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। মেহতা বলেন, '৭১ সালের যুদ্ধে তিনি ভালোভাবে জড়িত ছিলেন। ওই নথিতে সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, সে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ওই তথ্যগুলো মুছে ফেলা হয়েছে। এই দলিল কেন বিনষ্ট করা হলো, সে ব্যাপারে জেনারেল মেহতা বলেন, পাকিস্তান সম্পর্ক ভবিষ্যতে প্রভাবিত হতে পারে, এ জন্য এসব দলিল বিনষ্ট করে ফেলা হয়। তিনি বলেন, এটা ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতিতে করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের তথ্য ধ্বংস করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার কিছু জানে না বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম। তিনি গতকাল বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকালে এ মন্তব্য করেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য ধ্বংস করা হলেও ইতিহাস বিষয়ক কোনো তথ্য ধ্বংস করা হয়নি বলে তিনি মনে করেন। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করব।
তিনি বলেন, যদি এগুলো সত্যি ধ্বংস করা হয়ে থাকে তাহলে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে।
সমকাল


মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংস ঘটনার তদন্ত দাবি ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংস করার খবরে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিজেপি, কংগ্রেস ও সিপিআই ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে। গত রোববার ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, কলকাতায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে রক্ষিত ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিষয়ক ফাইলপত্র নষ্ট করা হয়েছে।
ভারতীয় জনতা দল বিজেপির মুখপাত্র রবি শংকর প্রসাদ দলিলপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করেছিল ভারত। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করার ঘটনা ভারতের
ইতিহাসের গৌরবজনক অধ্যায়। সে সময় ভারতের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল ছিল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিজেপি দলিল নষ্ট হওয়ার ঘটনার সরেজমিন তদন্ত দাবি করেছে। দলিল কেন ধ্বংস করা হলো_ এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সরকারকে জনসমক্ষে হাজির হতে হবে।' অবশ্য ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি সামরিক বাহিনীর মনোভাবের সঙ্গে একই মত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, কিছু দলিল প্রকাশিত হলে তা 'ক্ষতিকর' হতো।
কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই) এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহকে উল্টে দেওয়ার জন্য এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হতে পারে।
অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) মুখপাত্র শাকিল আহমেদ বলেছেন, 'এটি বিস্ময়কর একটি তথ্য। ভারতের মহান বিজয়ের ইতিহাসে এ দলিলগুলো মহামূল্যবান হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭১ সালে ঢাকায় প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। দলিল হারানোর ঘটনা যদি সত্য হয় তবে সরকারের উচিত ঘটনা খতিয়ে দেখা এবং ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেওয়া।'
দলিল খোয়া যাওয়ার এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ ও প্রকাশের ব্যাপারে সুস্পষ্ট আইনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো ভারতেও ২৫-৩০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রকাশযোগ্য দলিল উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
উল্লেখ্য, ভারতে বেশ কিছু দিন ধরে তথ্য অধিকার নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানকার গণমাধ্যম ও নাগরিকরা তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করেন, স্পর্শকাতর সামরিক তথ্য ছাড়া ইতিহাসের স্বার্থে ভারত-পাকিস্তান যুুদ্ধের সব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এর ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। ইতিহাসের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়। সামরিক নথিপত্র, যুদ্ধবিষয়ক তথ্যাবলির প্রকাশযোগ্য অংশগুলো অবমুক্ত করার জন্য ভারতে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। সে কমিটি '৬২, '৬৫ ও '৭১ সালের যুদ্ধের বিভিন্ন দলিল প্রকাশের পক্ষে মত দিলেও তা মানা হয়নি। ৩০ বছর পার হওয়ার পর নথিপত্র অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা না থাকলেও সাম্প্রতিককালে ভারত কোনো দলিলপত্র অবমুক্ত করেনি বলে জানিয়েছে সেখানকার পত্রপত্রিকাগুলো।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান দলিলপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আবারও পুরনো ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন নথিপত্র প্রকাশের ব্যাপারে গণমাধ্যম ও নাগরিকদের দাবি সামনে চলে এসেছে।
সমকাল


১৯৭১ সালের নথিপত্র ধ্বংস একটি অপরাধ : ভারতের প্রধান তথ্য কমিশনার
মাহবুব মোর্শেদ
ভারতের প্রধান তথ্য কমিশনার ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ বলেছেন, সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে রক্ষিত ১৯৭১ সালের যুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্যের ধ্বংস সাধন একটি অপরাধমূলক কাজ। এ ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি এড়াতে নথিপত্র অবমুক্ত করার ব্যাপারে সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
বাংলাদেশ যুদ্ধের নথিপত্র ধ্বংসের ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হাবিবুল্লাহ বলেন, 'এ বিষয়ে আইন খুব স্পষ্ট। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ২০ বছরের পুরনো সব নথিই প্রকাশ করতে হবে।' তিনি বলেন, আইনগত অনুমোদন ছাড়া কোনো নথির ধ্বংস সাধন অপরাধমূলক কাজ। 'ধ্বংস সাধনের জন্য আইন আছে।' তবে সে ক্ষেত্রে ধ্বংস করা দলিলপত্রের বিস্তারিত বিবরণ
সরকারের কাছে থাকতে হবে।
এদিকে সেনা সূত্রগুলো টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছে, ১৯৭১ সালের দলিলপত্র ধ্বংসের কোনো লিখিত অনুমোদন ছিল না।
প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার বলেছেন, পুরো ঘটনাটির বিস্তারিত তদন্ত হওয়া উচিত। 'আমাদের জানানো উচিত_ কেন, কোথায় এগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং তা কার স্বার্থে হয়েছে।'
কুলদীপ নায়ার ঢাকার সহযোগিতা নিয়ে পুরো দলিল দ্রুত পুনর্গঠন করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। যুদ্ধের সৈনিকদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করার তাগিদও দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, 'এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দলিল।'
তিনি আরও বলেন, ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত সংঘটিত যুদ্ধের সংরক্ষিত দলিলগুলো প্রকাশ করার জন্য সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। তার ভাষায়, 'সরকার অযথাই কাগজের স্তূপের ওপর বসে আছে। ১৯৪৮, ১৯৬২, ১৯৬৫, ১৯৭১-এর নথিপত্র ছেড়ে দেওয়া উচিত। এমনকি ১৯৪৭ সালের ক্ষমতা হস্তান্তরের দলিলপত্রও আমাদের জাতীয় মহাফেজখানায় নেই।'
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দফতরেই ৩০ হাজার ফাইল বন্দি হয়ে আছে। এ ফাইলের অনেকটিই ভারতের সমান বয়সী। সরকারের দফতরগুলো এ নথিপত্র অবমুক্ত বা মহাফেজখানায় পাঠানোর ব্যাপারে গড়িমসি করে।
অতিরিক্ত গোপনীয়তার কারণে বিভিন্ন দফতরের স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে নথিপত্র বেছে ধ্বংস বা নষ্ট করে দেওয়ার সুযোগ পায়। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সূত্র বলছে, ১৯৭১ সালের দলিলপত্র ধ্বংসের ঘটনাও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।
আরেকটি প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বর্তমান ও সাবেক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন, মুক্তিবাহিনী গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত দলিলগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনায় তারা বিস্মিত নন। কারণ এ দলিলগুলো প্রকাশিত হলে এটি বেরিয়ে আসত যে, ভারতীয় বাহিনী ডিসেম্বরের ঘোষিত যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
১৯৭১ সালের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা যিনি পরবর্তীকালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হয়েছিলেন তিনি বলেন, 'আমি দলিলপত্র ধ্বংসের ব্যাপারে জানি না। আমি তখন ক্যাপ্টেন ছিলাম। যদি এটি করা হয়, তবে সেটি সরকারের পরামর্শেই হয়েছে। ঘোষিত যুদ্ধের অনেক আগেই যে ভারতীয় সেনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়েছিল তা এখন সবার জানা বিষয়। সঙ্গত কারণেই সামরিক বাহিনী এ সম্পর্কিত দলিল সংরক্ষণ করতে চাইবে না।' ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্নেলও বলেছেন, 'যুদ্ধ ঘোষণার অনেক আগেই ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনী সংগঠনের কাজে জড়িত হয়েছিল। ঘোষিত যুদ্ধের অনেক আগে আমি নিজে বাংলাদেশের ভেতরে ছিলাম।'


সমকাল



পাকিস্তানি সাবমেরিন ধ্বংসের তথ্য নথিপত্রও নষ্ট
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ

ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে রক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দলিলপত্র ধ্বংস করার খবরের পর এবার মিলেছে যুদ্ধে নৌবাহিনীর নথিপত্র ধ্বংস করার খবর। ধারণা করা হচ্ছে, গাজি ডুবিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত দলিল নষ্ট করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সূত্রে এ দুঃসংবাদটি বেরিয়ে এসেছে। গত রোববার টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ১৯৭১ সালের যুদ্ধের নথিপত্র ধ্বংসের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতের রাজনৈতিক দল, সরকার, সামরিক ও বেসামরিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। বেরিয়ে আসতে থাকে নানা বিস্ময়কর তথ্য।
১৯৭১ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রথম বড় বিজয় ছিল পাকিস্তানি সাবমেরিন গাজি ধ্বংস করা। ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সাবমেরিন গাজি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধের প্রথম দিনই, ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে বিশাখাপত্তমের কাছে গাজি ডুবে যায়। মারা
যায় গাজির ৯২ জন ক্রু। ভারতীয় নৌবাহিনী দাবি করে, আইএনএস রাজপুত থেকে তীব্র গোলাবর্ষণের মাধ্যমে গাজির পতন ঘটানো হয়। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণের কারণে অথবা বিশাখাপত্তম পোতাশ্রয়ে গাজি যে মাইনগুলো স্থাপন করেছিল তারই আকস্মিক বিস্ফোরণে গাজি ধ্বংস হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার কাছে নৌবাহিনীর নানা সূত্র নিশ্চিত করেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের সূত্র ধরে তারা এই গুরুতর সত্যে উপনীত হয়েছে যে, গাজি ধ্বংসের ফাইলগুলো নেই। গাজি
ধ্বংসের পর ভারতীয় নৌসেনারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু দলিলপত্র সাবমেরিনটি থেকে উদ্ধার করেছিল। সাবমেরিনটির ধ্বংসাবশেষ এখন বিশাখাপট্টনামের সমুদ্রের নিচে আছে।
ভাইস অ্যাডমিরাল হিরানন্দানি ভারতীয় নৌবাহিনীর দাফতরিক ইতিহাস লিখেছেন। ১৯৯৮ সালের ২২ জুন তখনকার পূর্বাঞ্চলীয় নৌকমান্ডের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল কে মোহনরাও তাকে বলেন, 'বিভিন্ন অফিস ও সংস্থায় অনুসন্ধান চালানোর পরও আমি গাজি সংক্রান্ত দলিলপত্র পাইনি। অথচ এর আগে কাজ করার সময় সেগুলো আমি দেখেছি।'
মোহনরাও জানিয়েছিলেন, ডকুমেন্টগুলো পাওয়া গেলেই তা হিরানন্দানির কাছে পাঠানো হবে। কিন্তু মোহনরাও কমোডর পিএস বাওয়ার একটি চিঠির বিষয়ে কিছু বলেননি হিরানন্দানিকে। এই চিঠি বাওয়া ১৯৮০ সালে লিখেছিলেন। ১৯৮০ সালের ২০ ডিসেম্বর বাওয়া লিখেছিলেন, 'ভয়াবহ ব্যাপার হলো বীরবাহুতে আমি গিয়ে জেনেছি গাজি সংক্রান্ত দলিল, সিগন্যাল ও গাজির বিভিন্ন সামগ্রী এ বছরই ধ্বংস করা হয়েছে। এখন সেখানে আর কিছুই নেই।' বিশাখাপট্টনামের বীরবাহুতে গাজি সংক্রান্ত দলিলপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছিল। তিনি এই চিঠি নৌবাহিনীর সদর দফতরের চিফ অব পার্সোনেল এমপি আওয়াতিকে লিখেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনীর কোনো দাফতরিক ইতিহাস প্রণেতাই গাজির ফাইলপত্র হাতে পাননি। ১৯৭১ সালে নৌবাহিনীতে যুক্ত এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, গাজির দলিলপত্র থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের ফাইলপত্র হারানোর সব ঘটনাই যুদ্ধের ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ধারাবাহিকতায় হয়েছে। অথচ এটাই ছিল ইতিহাসের ঘটনাবলিকে জনসমক্ষে আনার সবচেয়ে ভালো সময়।

সমকাল

Saturday, May 22, 2010

ক্লিওপেট্রা অত সুন্দর ছিলেন না!


উইলিয়াম শেক্সপিয়র তার সৌন্দর্য প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'বয়স তাকে বাঁধতে পারে না, প্রথাও তার অনিঃশেষ রূপমাধুরীকে ম্লান করতে পারে না।' চসার তার তুলনা করেছেন, মে মাসের গোলাপের সঙ্গে। মিকেল অ্যাঞ্জেলো থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত চিত্রকররা তাকে এঁকেছেন ভয়ঙ্কর সুন্দর হিসেবে। এখনও শিল্পীরা কল্পনার ক্লিওপেট্রা আঁকেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন, এলিজাবেথ টেলর থেকে শুরু করে বহু দেশের বহু সুন্দরী অভিনেত্রীই তার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কবি ও শিল্পীর কল্পনায় ক্লিওপেট্রা হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের অন্যতম সুন্দরী। কিন্তু কেউ যদি বলে, যেমন ভাবা হয় তেমন সুন্দর ছিলেন না ক্লিওপেট্রা! আর নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিতর্ক হাজির করেন? এমনই কাণ্ড ঘটিয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। ওয়েবসাইটে সম্প্রতি তারা একটি অডিও প্রকাশ করেছে। অডিওতে তারা জানাচ্ছে, কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একজন কিওরেটর পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন, আধুনিককালে আমরা যাকে সুন্দর বলি সে অর্থে সুন্দর ছিলেন না ক্লিওপেট্রা। তাহলে কেমন ছিলেন ক্লিওপেট্রা? প্রত্নতাত্তি্বকরা বলছেন, তিনি ছিলেন মোটাসোটা, বেঢপ কাপড়-চোপড় পরিহিত নারী। নাক ছিল মোটা আর ঝোলানো, দাঁত ছিল নষ্ট, চোখ ছিল তীক্ষষ্ট আর গলা ছিল ছড়ানো। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জানাচ্ছে, যখন এ গবেষণার কথা সবাইকে জানানো হয়েছিল, তখন সারাবিশ্বের পত্রপত্রিকায় ফলাও করে ক্লিওপেট্রার এই রূপের কথা ছাপা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কী? ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জানাচ্ছে এক নতুন খবর, এতসব জানাজানি হওয়ার পরও ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। তাকে নিয়ে মানুষের কল্পনা যেন বাগ মানতে চাইছে না। এখনও তিনি শিল্প আর ফ্যাশনের রানী। ক্লিওপেট্রা এখনও উজ্জ্বল, ত্রূক্রর এবং অবশ্যই মোহনীয় নারী।
কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কিওরেটর ক্লিওপেট্রার রাজকীয় স্ট্যাচু এবং মুদ্রায় ছাপাঙ্কিত তার ছবি বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছিলেন, রানীর এই সৌন্দর্যহীনতার কথা। খ্রিস্টপূর্ব ৩২ অব্দের এক রৌপ্য মুদ্রায় ক্লিওপেট্রার ছবি বিশ্লেষণ করেছেন প্রত্নতাত্তি্বকরা। মুদ্রার এক পাশে মার্ক অ্যান্টনির ছবি, অন্যপাশে ক্লিওপেট্রার। রোমান জেনারেল ও রাজনীতিক মার্ক অ্যান্টনি তার দীর্ঘকালীন প্রেমিক ছিলেন। অ্যান্টনিই এ মুদ্রার উদ্যোক্তা। ফলে আধুনিককালে যে ক্লিওপেট্রার দেখা আমরা পাই তা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা বলেই মনে হয়। নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্তি্বক মিউজিয়ামের পরিচালক বলেছেন, 'রোমান লেখকরা ক্লিওপেট্রার প্রজ্ঞা ও ক্যারিশমার কথা বলেছেন। বলেছেন, তার কণ্ঠস্বর ছিল মোহনীয়।' কিন্তু লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, কেউই তার সৌন্দর্য বিষয়ে কিছু বলেননি। ক্লিওপেট্রার রমণীয় ও মোহনীয় ইমেজটা অতিসাম্প্রতিককালের নির্মাণ বলেই মনে হয়। বলা হচ্ছে, মার্ক অ্যান্টনি সম্ভবত তার প্রজ্ঞার প্রেমে পড়েছিলেন। আর সেটিই ছিল ক্লিওপেট্রার আসল সৌন্দর্য। ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিসরের শেষ ফারাও। তার সময়েই মিসর রোমানদের অধীনে একটি প্রদেশে পরিণত হয়। তিনি মিসরের টলেমি ডাইনেস্টির সদস্য ছিলেন। প্রথমে তিনি পিতা ও ভাইদের সঙ্গে যৌথভাবে দেশ শাসন করেন। পরে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর হন। এবং জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে নিজের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করেন। বলা হয়ে থাকে, রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিলেন ক্লিওপেট্রা। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ অব্দে তিনি রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারকে কাবু করেন। সিজারের এক সন্তানের মা হন। পরে মার্ক অ্যান্টনির সঙ্গে ঘর বাঁধেন এবং তিন সন্তানের মা হন। শেষ পর্যন্ত অক্টাভিয়ানের সঙ্গে যুদ্ধে অ্যান্টনির পরাজয়ের পর ৩১ খিস্টপূর্বাব্দে অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রা দু'জনেই আত্মহত্যা করেন। ক্লিওপেট্রা মিসরীয় কোবরা এসপের দংশন খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। ক্লিওপেট্রা রহসময়ী, তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে বহু মিথ, নাটক, কবিতা, গান, চিত্র, চলচ্চিত্র। তিনি বহু মানুষের প্রিয়। তিনি দুটি সভ্যতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন অপরিসীম বুদ্ধিমত্তা আর কর্মতৎপরতা দিয়ে। বুদ্ধিই তার সৌন্দর্য। কিন্তু মানুষ তার শারীরিক সৌন্দর্যকেই এতকাল তার শক্তি ভেবে এসেছে। প্রত্নতাত্তি্বকদের ভুল ভাঙানোয় তাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বরং এখানেই আশাবাদের শুরু।

Sunday, May 16, 2010

সাদা সাদা আরও সাদা


ছোটবেলায় স্কুল পাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি আপ্তবাক্যের ব্যাখ্যা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের করতে হয়। বাক্যটি হলো, 'অর্থই অনর্থের মূল।' এই অর্থ মিনিং বা মানে নয়, এই অর্থ হলো মুদ্রা বা টাকা। ছোটবেলায় অর্থকে অনর্থের মূল জানলেও ক্রমেই শিক্ষার্থীরা এ বিদ্যা অর্জন করতে পারে যে, টাকা জগতের অন্যতম আরাধ্য। লেখাপড়া করে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ার সৌভাগ্য হয় এ-ও স্কুল পাঠ্যেরই শিক্ষা। গাড়ি-ঘোড়ায় চড়তে টাকা প্রয়োজন, একথা ছোটরা বুঝতে না পারলেও বড়রা বেশ ভালো করে বোঝেন। ফলে বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থাকে বড়রা এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, এর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকা উপার্জন। অভিযোগ আছে, আমাদের বিদ্যায়তনে নৈতিক শিক্ষাকে অনেক নূ্যনতম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে আমাদের প্রজন্মগুলো নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা ছাড়াই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এমনকি ছাত্রাবস্থাতেই তারা টাকা উপার্জনের জন্য মূলধারার রাজনীতি ও রাজনীতির উপসর্গ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, দুর্বৃত্তপনায় হাত পাকিয়ে তুলছে। ফলে অর্থের অনর্থ উপলব্ধির আগেই কিংবা টাকার রঙ বোঝার আগেই তারা টাকা উপার্জন করে টাকার শক্তি ও প্রতিপত্তি উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। সম্প্রতি টাকার সাদা, টাকার কালো নিয়ে এক প্রস্থ তর্ক হয়ে গেল আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে। কেউ বলতে পারেন, খারাপ টাকাকে কালো বলা বর্ণবাদী ব্যাপার। সাদা মানে ভালো আর কালো মানে খারাপ_ এ ধারণা থেকে বের হতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আপাতত বিতর্কটি তোলা থাকুক। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে কালো টাকার গ্রহণযোগ্য একটা নামও আবিষ্কৃত হয়ে যাবে। সরকারি দলের একজন নেতার অভিযোগ, বিরোধীদলীয় নেত্রী কালো টাকা সাদা করেছেন। খবর নতুন নয়, বিস্ময়করও নয়। আমাদের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমলাদের অনেকেই কালো টাকাকে সাদা করেছেন। বৈধভাবে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা আমাদের আছে। তারপরও লোকে কালো টাকা কালোই রাখেন। সাদা করে ঝামেলা বাড়াতে চান না। কিন্তু অর্থনীতিতে কালো টাকা সাদা করাটাকে ভালো চোখেই দেখা হয়। ফলে বিরোধীদলীয় নেত্রী কালোকে সাদা করলে সেটি ভালোই করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এক বিরোধীদলীয় নেতা বললেন, নেত্রী সাদা টাকাকেই সাদা করেছেন। এখানেই তর্কের সূত্রপাত। সাদাকে সাদা করার দরকার পড়ে না। তবে তিনি কেন করলেন? মনে পড়ল, জনপ্রিয় অভিনেতা রিয়াজের সেই দেশব্যাপী বিজ্ঞাপনী অভিযানের কথা। সার্ফ এক্সেল ব্যবহার করে দেশের লোকেরা সাদাকে আরও কত সাদা করে তুলছেন তা দেখতে রিয়াজ দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরছেন সাদা মাপার যন্ত্র সঙ্গে নিয়ে। দেখাচ্ছেন, এক সাদার চেয়ে আরেক সাদা কত সাদা। হয়তো বিরোধীদলীয় নেতা তেমনি আরও সাদার কথা বোঝাচ্ছেন। বলা হয়ে থাকে, আমাদের অর্থনীতিতে নাকি সাদার চেয়ে কালো বেশি। কালো টাকা বন্ধ হলে নাকি অর্থনীতি থমকে যাবে। এমন এক পরিস্থিতিতে সাদাকে আরও সাদা করার উদ্যোগ নিশ্চয়ই অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু সত্যিই কি সাদাকে সাদা করার কোনো উদ্যোগ কখনও চালু হয়েছিল দেশে? ভাবতে হবে। তবে হ্যাঁ, সব কালো তো একই রকম কালো নয়। রোজগারের টাকা থেকে কেউ যদি আয়কর না দেন তবে সেই টাকাও যেমন কালো টাকা হিসেবে গণ্য হয়, তেমনি উৎকোচের টাকাও কালো টাকা আবার লুটের টাকাও কালো টাকা। কোন কালো সবচেয়ে বেশি কালো সেটি নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলবে। বিরোধীদলীয় নেত্রী কালো টাকাকে সাদা করেছেন, নাকি অল্প সাদাকে সাদা করেছেন_ সে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ ব্যাংক বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডই ভালো বলতে পারবে। তবে তর্কটা রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির ব্যাপারই এখন পর্যন্ত। এর পেছনে কারও কোনো সৎ উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছে না। যদি সৎ উদ্দেশ্য থাকত, তবে কে কবে টাকা সাদা করেছেন সে প্রশ্নের চেয়ে অন্য প্রশ্ন উঠত বেশি করে। তা হলো, সরকারদলীয় মন্ত্রী, এমপি, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট করে জনগণের সামনে হাজির করত। মেয়াদ শেষে আবার আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়েই প্রস্থান করত। সেসব এ দেশে দূর ভবিষ্যতে হবে কি-না জানি না_ তবে এমন হাস্যকর বিতর্ক যে আরও হবে তা বলাই বাহুল্য।