Sunday, May 23, 2010

সমকালের নিউজ কভারেজ : ভায়া টাইমস অব ইন্ডিয়া : ভারতে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংস


টাইমস অব ইন্ডিয়ার শিরোনাম : সত্য হারিয়ে গেল?
মুক্তিযুদ্ধের দলিল খোয়া গেছে ভারতে
মাহবুব মোর্শেদ
রোববার সকালেই দুঃসংবাদটি জানালো ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া। কয়েক ঘণ্টা পত্রিকাটির ওয়েবসাইটে শীর্ষ সংবাদ হিসেবে জ্বলজ্বল করছিল 'সত্য হারিয়ে গেল? বাংলাদেশ যুদ্ধের অধিকাংশ সামরিক দলিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।' পত্রিকাটি জানাচ্ছে, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য খুঁজছিল। সাম্প্রতিক এ অনুসন্ধানের ফলে এ স্পর্শকাতর তথ্যটি জানাজানি হয়ে যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানান, 'আমরা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য খুঁজছিলাম। এই ক্যাম্পগুলো কোথায় ছিল, কারা এগুলোর দায়িত্বে ছিলেন_ এ তথ্যগুলো জানতে চাচ্ছিলাম। ফাইলগুলো খুঁজে না পাওয়ায় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড একটি ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। এরপরই জানতে পারি, দলিলপত্রগুলো খোয়া গেছে।' পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক দুই প্রধানের মতে, সুপরিকল্পিতভাবেই এই দলিলপত্র ধ্বংস করা হতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ ছিলেন লে. জেনারেল এফ আর জ্যাকব। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা জেনারেল জ্যাকবের বই 'স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : বার্থ অব এ নেশন' এবং বিভিন্ন ভারতীয় সূত্র থেকে জানা যায়, তিনিই ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে শুরু হওয়া চূড়ান্ত যুদ্ধে ঢাকা বিজয়কে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। এ বিষয়ে তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল স্যাম
মানেক শ'র দ্বিধা সত্ত্বেও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। জেনারেল জ্যাকব ১৯৭৪ সালের আগস্টে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান হন। জেনারেল জ্যাকব টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান হওয়ায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র চেয়ে পাঠান। তখন তাকে জানানো হয়, দলিলপত্র নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তবে কে দলিল ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়ে থাকতে পারেন সে আলোচনা করতে তিনি রাজি হননি বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তবে পত্রিকাটি বলছে, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক প্রধানদের সঙ্গে আলোচনার সূত্রে বোঝা যায়, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই দলিলগুলো ধ্বংস করা হতে পারে। তখন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, যদি এটি সত্য হয় তবে তা হবে অরোরার ইমেজের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় ও পাকিস্তান বাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নায়ক হিসেবে অরোরা বাংলাদেশ ও ভারতে বীর হিসেবে খ্যাত।
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। পত্রিকাটির অনলাইন পাঠকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ-রকম একটি খবর প্রকাশের জন্য কেউ কেউ পত্রিকাটিকে বাহ্বা দিয়েছেন। কেউ বা প্রশ্ন করেছেন কেন ভারতীয় সেনাবাহিনী এরকম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ধ্বংস করে দিল? কোনো স্পর্শকাতর সামরিক তথ্য কি তারা লুকাতে চেয়েছিল? বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো অনলাইন সংস্করণে টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। 'কেন' এ প্রশ্নটি এখন সবার মুখে মুখে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া সন্দেহ পোষণ করে বলেছে, এসব দলিল হারিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হয়তো কখনো লেখা সম্ভব হবে না। ভারতের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, ভারতের সেনাসদর ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সেনা দফতরেও কিছু দলিল থাকতে পারে। কিন্তু এগুলো থেকে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন, যোদ্ধাদের অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত যুদ্ধে নেতৃত্বদান পর্যন্ত অনেক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের গুরুত্বপূর্ণ এসব অবদান গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকার করা হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এ খবরটি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। তার মতে, ভারতে আর্কাইভাল ডকুমেন্ট সংগ্রহের শক্ত বিধান আছে। ফলে, হুট করে কোনো ডকুমেন্ট ধ্বংস করে দেওয়া সেখানে সম্ভব নয়। বলতে গেলে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একমাত্র বিজয়ের ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ঘটেছে। কেন তারা এমন একটি বিজয়ের দলিল ধ্বংস করবে, এ প্রশ্ন তুলেছেন মুনতাসীর মামুন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও এস ফোর্সের প্রধান, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ (অব.) বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা আমাদের সর্বতোভাবে উপকৃত করেছে এবং সেটি আমাদের স্বার্থেই হয়েছিল। আমরা পাকিস্তানিদের কাবু করে ফেললেও আমাদের বিমান শক্তি ছিল না, দূরপাল্লার অস্ত্রও ছিল না। ফলে, ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অর্জন কঠিন হতো, আরও রক্ত ক্ষয়ের আশঙ্কা ছিল। জেনারেল শফিউল্লাহর মতে, মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প বা প্রশিক্ষণ শিবির সংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে সংরক্ষিত থাকার কথা। মুক্তিযুদ্ধের পর এ দলিলগুলো সেনা সদরে আনা হয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আরেক সাবেক মেজর জেনারেল জানিয়েছেন, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রয়োজনে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সব প্রশিক্ষণ শিবিরের বিস্তারিত তথ্য আনা হয়েছিল। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ও নেতাদের তালিকা তাতে আছে। মুক্তিযুদ্ধের অপারেশনাল ডকুমেন্টেশন মিলিটারি অপারেশন ডিরেক্টরিতে সংরক্ষিত আছে। পরবর্তীকালে এ ডকুমেন্টগুলো ঢাকা সেনানিবাসে স্থাপিত বিজয় কেতন জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। আশির দশকে পাওয়া প্রশিক্ষণ শিবির-সংক্রান্ত ডকুমেন্টগুলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড সূত্রে পাওয়া গেছে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ডকুমেন্টগুলো দিলেও এগুলো পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড সূত্রে পাওয়া গেছে কি-না তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
একজন সামরিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সামরিক দলিলপত্র নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনা রহস্যময় বলেই মনে হচ্ছে। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার আগে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড অষোষিত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছিল। অঘোষিত যুদ্ধের দলিলপত্র হয়তো তারা সংরক্ষণ করতে চাননি। ফলে, যুদ্ধের পর পরই দলিলপত্র নষ্ট করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে, ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ৩ ডিসেম্বরের আগেও অংশ নিয়েছিল তা এখন স্বীকৃত বিষয়। জেনারেল জ্যাকব তার বইয়ে এ সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি জানিয়েছেন অক্টোবরের শুরু থেকেই পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রস্তুতি নিতে থাকে। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ এ প্রস্তুতির বড় অংশ হলেও সেনাবাহিনীতেও সমান্তরাল প্রস্তুতি চলছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মঈদুল হাসান তার 'মূলধারা: '৭১' বইয়ে অক্টোবর-নভেম্বরে এমন প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজিও তার 'দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান' বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় বাহিনী নভেম্বরেই মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতরে অভিযান পরিচালনা করেছে।
ইতিহাসের অনেক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তথ্যগুলো স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পরে এগুলো স্পর্শকাতর বলে বিবেচিত হতে পারে। আর এ কারণেই এগুলো ধ্বংস করা হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে, তিনি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যাবলী সযত্নে সংরক্ষণ করে এবং নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেগুলো প্রকাশ করে তেমন নীতি উপমহাদেশের দেশগুলোতেও অনুসৃত হওয়া উচিত। কারণ, একদিন মানুষকে প্রকৃত ইতিহাসের সামনে দাঁড়াতে হয়। ইতিহাসের পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ তথ্যগুলো বিচার না করলে প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে বিবিসির শুভজিত বাচ্চি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল অশোক মেহতার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। মেহতা বলেন, '৭১ সালের যুদ্ধে তিনি ভালোভাবে জড়িত ছিলেন। ওই নথিতে সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, সে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ওই তথ্যগুলো মুছে ফেলা হয়েছে। এই দলিল কেন বিনষ্ট করা হলো, সে ব্যাপারে জেনারেল মেহতা বলেন, পাকিস্তান সম্পর্ক ভবিষ্যতে প্রভাবিত হতে পারে, এ জন্য এসব দলিল বিনষ্ট করে ফেলা হয়। তিনি বলেন, এটা ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতিতে করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের তথ্য ধ্বংস করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার কিছু জানে না বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম। তিনি গতকাল বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকালে এ মন্তব্য করেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য ধ্বংস করা হলেও ইতিহাস বিষয়ক কোনো তথ্য ধ্বংস করা হয়নি বলে তিনি মনে করেন। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করব।
তিনি বলেন, যদি এগুলো সত্যি ধ্বংস করা হয়ে থাকে তাহলে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে।
সমকাল


মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংস ঘটনার তদন্ত দাবি ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংস করার খবরে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিজেপি, কংগ্রেস ও সিপিআই ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে। গত রোববার ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, কলকাতায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে রক্ষিত ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিষয়ক ফাইলপত্র নষ্ট করা হয়েছে।
ভারতীয় জনতা দল বিজেপির মুখপাত্র রবি শংকর প্রসাদ দলিলপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করেছিল ভারত। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করার ঘটনা ভারতের
ইতিহাসের গৌরবজনক অধ্যায়। সে সময় ভারতের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল ছিল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিজেপি দলিল নষ্ট হওয়ার ঘটনার সরেজমিন তদন্ত দাবি করেছে। দলিল কেন ধ্বংস করা হলো_ এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সরকারকে জনসমক্ষে হাজির হতে হবে।' অবশ্য ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি সামরিক বাহিনীর মনোভাবের সঙ্গে একই মত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, কিছু দলিল প্রকাশিত হলে তা 'ক্ষতিকর' হতো।
কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই) এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহকে উল্টে দেওয়ার জন্য এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হতে পারে।
অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) মুখপাত্র শাকিল আহমেদ বলেছেন, 'এটি বিস্ময়কর একটি তথ্য। ভারতের মহান বিজয়ের ইতিহাসে এ দলিলগুলো মহামূল্যবান হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭১ সালে ঢাকায় প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। দলিল হারানোর ঘটনা যদি সত্য হয় তবে সরকারের উচিত ঘটনা খতিয়ে দেখা এবং ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেওয়া।'
দলিল খোয়া যাওয়ার এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ ও প্রকাশের ব্যাপারে সুস্পষ্ট আইনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো ভারতেও ২৫-৩০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রকাশযোগ্য দলিল উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
উল্লেখ্য, ভারতে বেশ কিছু দিন ধরে তথ্য অধিকার নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানকার গণমাধ্যম ও নাগরিকরা তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করেন, স্পর্শকাতর সামরিক তথ্য ছাড়া ইতিহাসের স্বার্থে ভারত-পাকিস্তান যুুদ্ধের সব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এর ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। ইতিহাসের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়। সামরিক নথিপত্র, যুদ্ধবিষয়ক তথ্যাবলির প্রকাশযোগ্য অংশগুলো অবমুক্ত করার জন্য ভারতে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। সে কমিটি '৬২, '৬৫ ও '৭১ সালের যুদ্ধের বিভিন্ন দলিল প্রকাশের পক্ষে মত দিলেও তা মানা হয়নি। ৩০ বছর পার হওয়ার পর নথিপত্র অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা না থাকলেও সাম্প্রতিককালে ভারত কোনো দলিলপত্র অবমুক্ত করেনি বলে জানিয়েছে সেখানকার পত্রপত্রিকাগুলো।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান দলিলপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আবারও পুরনো ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন নথিপত্র প্রকাশের ব্যাপারে গণমাধ্যম ও নাগরিকদের দাবি সামনে চলে এসেছে।
সমকাল


১৯৭১ সালের নথিপত্র ধ্বংস একটি অপরাধ : ভারতের প্রধান তথ্য কমিশনার
মাহবুব মোর্শেদ
ভারতের প্রধান তথ্য কমিশনার ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ বলেছেন, সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে রক্ষিত ১৯৭১ সালের যুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্যের ধ্বংস সাধন একটি অপরাধমূলক কাজ। এ ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি এড়াতে নথিপত্র অবমুক্ত করার ব্যাপারে সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
বাংলাদেশ যুদ্ধের নথিপত্র ধ্বংসের ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হাবিবুল্লাহ বলেন, 'এ বিষয়ে আইন খুব স্পষ্ট। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ২০ বছরের পুরনো সব নথিই প্রকাশ করতে হবে।' তিনি বলেন, আইনগত অনুমোদন ছাড়া কোনো নথির ধ্বংস সাধন অপরাধমূলক কাজ। 'ধ্বংস সাধনের জন্য আইন আছে।' তবে সে ক্ষেত্রে ধ্বংস করা দলিলপত্রের বিস্তারিত বিবরণ
সরকারের কাছে থাকতে হবে।
এদিকে সেনা সূত্রগুলো টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছে, ১৯৭১ সালের দলিলপত্র ধ্বংসের কোনো লিখিত অনুমোদন ছিল না।
প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার বলেছেন, পুরো ঘটনাটির বিস্তারিত তদন্ত হওয়া উচিত। 'আমাদের জানানো উচিত_ কেন, কোথায় এগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং তা কার স্বার্থে হয়েছে।'
কুলদীপ নায়ার ঢাকার সহযোগিতা নিয়ে পুরো দলিল দ্রুত পুনর্গঠন করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। যুদ্ধের সৈনিকদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করার তাগিদও দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, 'এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দলিল।'
তিনি আরও বলেন, ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত সংঘটিত যুদ্ধের সংরক্ষিত দলিলগুলো প্রকাশ করার জন্য সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। তার ভাষায়, 'সরকার অযথাই কাগজের স্তূপের ওপর বসে আছে। ১৯৪৮, ১৯৬২, ১৯৬৫, ১৯৭১-এর নথিপত্র ছেড়ে দেওয়া উচিত। এমনকি ১৯৪৭ সালের ক্ষমতা হস্তান্তরের দলিলপত্রও আমাদের জাতীয় মহাফেজখানায় নেই।'
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দফতরেই ৩০ হাজার ফাইল বন্দি হয়ে আছে। এ ফাইলের অনেকটিই ভারতের সমান বয়সী। সরকারের দফতরগুলো এ নথিপত্র অবমুক্ত বা মহাফেজখানায় পাঠানোর ব্যাপারে গড়িমসি করে।
অতিরিক্ত গোপনীয়তার কারণে বিভিন্ন দফতরের স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে নথিপত্র বেছে ধ্বংস বা নষ্ট করে দেওয়ার সুযোগ পায়। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সূত্র বলছে, ১৯৭১ সালের দলিলপত্র ধ্বংসের ঘটনাও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।
আরেকটি প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বর্তমান ও সাবেক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন, মুক্তিবাহিনী গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত দলিলগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনায় তারা বিস্মিত নন। কারণ এ দলিলগুলো প্রকাশিত হলে এটি বেরিয়ে আসত যে, ভারতীয় বাহিনী ডিসেম্বরের ঘোষিত যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
১৯৭১ সালের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা যিনি পরবর্তীকালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হয়েছিলেন তিনি বলেন, 'আমি দলিলপত্র ধ্বংসের ব্যাপারে জানি না। আমি তখন ক্যাপ্টেন ছিলাম। যদি এটি করা হয়, তবে সেটি সরকারের পরামর্শেই হয়েছে। ঘোষিত যুদ্ধের অনেক আগেই যে ভারতীয় সেনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়েছিল তা এখন সবার জানা বিষয়। সঙ্গত কারণেই সামরিক বাহিনী এ সম্পর্কিত দলিল সংরক্ষণ করতে চাইবে না।' ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্নেলও বলেছেন, 'যুদ্ধ ঘোষণার অনেক আগেই ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনী সংগঠনের কাজে জড়িত হয়েছিল। ঘোষিত যুদ্ধের অনেক আগে আমি নিজে বাংলাদেশের ভেতরে ছিলাম।'


সমকাল



পাকিস্তানি সাবমেরিন ধ্বংসের তথ্য নথিপত্রও নষ্ট
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ

ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে রক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দলিলপত্র ধ্বংস করার খবরের পর এবার মিলেছে যুদ্ধে নৌবাহিনীর নথিপত্র ধ্বংস করার খবর। ধারণা করা হচ্ছে, গাজি ডুবিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত দলিল নষ্ট করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সূত্রে এ দুঃসংবাদটি বেরিয়ে এসেছে। গত রোববার টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ১৯৭১ সালের যুদ্ধের নথিপত্র ধ্বংসের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতের রাজনৈতিক দল, সরকার, সামরিক ও বেসামরিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। বেরিয়ে আসতে থাকে নানা বিস্ময়কর তথ্য।
১৯৭১ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রথম বড় বিজয় ছিল পাকিস্তানি সাবমেরিন গাজি ধ্বংস করা। ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সাবমেরিন গাজি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধের প্রথম দিনই, ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে বিশাখাপত্তমের কাছে গাজি ডুবে যায়। মারা
যায় গাজির ৯২ জন ক্রু। ভারতীয় নৌবাহিনী দাবি করে, আইএনএস রাজপুত থেকে তীব্র গোলাবর্ষণের মাধ্যমে গাজির পতন ঘটানো হয়। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণের কারণে অথবা বিশাখাপত্তম পোতাশ্রয়ে গাজি যে মাইনগুলো স্থাপন করেছিল তারই আকস্মিক বিস্ফোরণে গাজি ধ্বংস হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার কাছে নৌবাহিনীর নানা সূত্র নিশ্চিত করেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের সূত্র ধরে তারা এই গুরুতর সত্যে উপনীত হয়েছে যে, গাজি ধ্বংসের ফাইলগুলো নেই। গাজি
ধ্বংসের পর ভারতীয় নৌসেনারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু দলিলপত্র সাবমেরিনটি থেকে উদ্ধার করেছিল। সাবমেরিনটির ধ্বংসাবশেষ এখন বিশাখাপট্টনামের সমুদ্রের নিচে আছে।
ভাইস অ্যাডমিরাল হিরানন্দানি ভারতীয় নৌবাহিনীর দাফতরিক ইতিহাস লিখেছেন। ১৯৯৮ সালের ২২ জুন তখনকার পূর্বাঞ্চলীয় নৌকমান্ডের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল কে মোহনরাও তাকে বলেন, 'বিভিন্ন অফিস ও সংস্থায় অনুসন্ধান চালানোর পরও আমি গাজি সংক্রান্ত দলিলপত্র পাইনি। অথচ এর আগে কাজ করার সময় সেগুলো আমি দেখেছি।'
মোহনরাও জানিয়েছিলেন, ডকুমেন্টগুলো পাওয়া গেলেই তা হিরানন্দানির কাছে পাঠানো হবে। কিন্তু মোহনরাও কমোডর পিএস বাওয়ার একটি চিঠির বিষয়ে কিছু বলেননি হিরানন্দানিকে। এই চিঠি বাওয়া ১৯৮০ সালে লিখেছিলেন। ১৯৮০ সালের ২০ ডিসেম্বর বাওয়া লিখেছিলেন, 'ভয়াবহ ব্যাপার হলো বীরবাহুতে আমি গিয়ে জেনেছি গাজি সংক্রান্ত দলিল, সিগন্যাল ও গাজির বিভিন্ন সামগ্রী এ বছরই ধ্বংস করা হয়েছে। এখন সেখানে আর কিছুই নেই।' বিশাখাপট্টনামের বীরবাহুতে গাজি সংক্রান্ত দলিলপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছিল। তিনি এই চিঠি নৌবাহিনীর সদর দফতরের চিফ অব পার্সোনেল এমপি আওয়াতিকে লিখেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনীর কোনো দাফতরিক ইতিহাস প্রণেতাই গাজির ফাইলপত্র হাতে পাননি। ১৯৭১ সালে নৌবাহিনীতে যুক্ত এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, গাজির দলিলপত্র থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের ফাইলপত্র হারানোর সব ঘটনাই যুদ্ধের ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ধারাবাহিকতায় হয়েছে। অথচ এটাই ছিল ইতিহাসের ঘটনাবলিকে জনসমক্ষে আনার সবচেয়ে ভালো সময়।

সমকাল

Saturday, May 22, 2010

ক্লিওপেট্রা অত সুন্দর ছিলেন না!


উইলিয়াম শেক্সপিয়র তার সৌন্দর্য প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'বয়স তাকে বাঁধতে পারে না, প্রথাও তার অনিঃশেষ রূপমাধুরীকে ম্লান করতে পারে না।' চসার তার তুলনা করেছেন, মে মাসের গোলাপের সঙ্গে। মিকেল অ্যাঞ্জেলো থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত চিত্রকররা তাকে এঁকেছেন ভয়ঙ্কর সুন্দর হিসেবে। এখনও শিল্পীরা কল্পনার ক্লিওপেট্রা আঁকেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন, এলিজাবেথ টেলর থেকে শুরু করে বহু দেশের বহু সুন্দরী অভিনেত্রীই তার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কবি ও শিল্পীর কল্পনায় ক্লিওপেট্রা হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের অন্যতম সুন্দরী। কিন্তু কেউ যদি বলে, যেমন ভাবা হয় তেমন সুন্দর ছিলেন না ক্লিওপেট্রা! আর নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিতর্ক হাজির করেন? এমনই কাণ্ড ঘটিয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। ওয়েবসাইটে সম্প্রতি তারা একটি অডিও প্রকাশ করেছে। অডিওতে তারা জানাচ্ছে, কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একজন কিওরেটর পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন, আধুনিককালে আমরা যাকে সুন্দর বলি সে অর্থে সুন্দর ছিলেন না ক্লিওপেট্রা। তাহলে কেমন ছিলেন ক্লিওপেট্রা? প্রত্নতাত্তি্বকরা বলছেন, তিনি ছিলেন মোটাসোটা, বেঢপ কাপড়-চোপড় পরিহিত নারী। নাক ছিল মোটা আর ঝোলানো, দাঁত ছিল নষ্ট, চোখ ছিল তীক্ষষ্ট আর গলা ছিল ছড়ানো। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জানাচ্ছে, যখন এ গবেষণার কথা সবাইকে জানানো হয়েছিল, তখন সারাবিশ্বের পত্রপত্রিকায় ফলাও করে ক্লিওপেট্রার এই রূপের কথা ছাপা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কী? ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জানাচ্ছে এক নতুন খবর, এতসব জানাজানি হওয়ার পরও ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। তাকে নিয়ে মানুষের কল্পনা যেন বাগ মানতে চাইছে না। এখনও তিনি শিল্প আর ফ্যাশনের রানী। ক্লিওপেট্রা এখনও উজ্জ্বল, ত্রূক্রর এবং অবশ্যই মোহনীয় নারী।
কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কিওরেটর ক্লিওপেট্রার রাজকীয় স্ট্যাচু এবং মুদ্রায় ছাপাঙ্কিত তার ছবি বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছিলেন, রানীর এই সৌন্দর্যহীনতার কথা। খ্রিস্টপূর্ব ৩২ অব্দের এক রৌপ্য মুদ্রায় ক্লিওপেট্রার ছবি বিশ্লেষণ করেছেন প্রত্নতাত্তি্বকরা। মুদ্রার এক পাশে মার্ক অ্যান্টনির ছবি, অন্যপাশে ক্লিওপেট্রার। রোমান জেনারেল ও রাজনীতিক মার্ক অ্যান্টনি তার দীর্ঘকালীন প্রেমিক ছিলেন। অ্যান্টনিই এ মুদ্রার উদ্যোক্তা। ফলে আধুনিককালে যে ক্লিওপেট্রার দেখা আমরা পাই তা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা বলেই মনে হয়। নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্তি্বক মিউজিয়ামের পরিচালক বলেছেন, 'রোমান লেখকরা ক্লিওপেট্রার প্রজ্ঞা ও ক্যারিশমার কথা বলেছেন। বলেছেন, তার কণ্ঠস্বর ছিল মোহনীয়।' কিন্তু লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, কেউই তার সৌন্দর্য বিষয়ে কিছু বলেননি। ক্লিওপেট্রার রমণীয় ও মোহনীয় ইমেজটা অতিসাম্প্রতিককালের নির্মাণ বলেই মনে হয়। বলা হচ্ছে, মার্ক অ্যান্টনি সম্ভবত তার প্রজ্ঞার প্রেমে পড়েছিলেন। আর সেটিই ছিল ক্লিওপেট্রার আসল সৌন্দর্য। ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিসরের শেষ ফারাও। তার সময়েই মিসর রোমানদের অধীনে একটি প্রদেশে পরিণত হয়। তিনি মিসরের টলেমি ডাইনেস্টির সদস্য ছিলেন। প্রথমে তিনি পিতা ও ভাইদের সঙ্গে যৌথভাবে দেশ শাসন করেন। পরে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর হন। এবং জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে নিজের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করেন। বলা হয়ে থাকে, রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিলেন ক্লিওপেট্রা। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ অব্দে তিনি রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারকে কাবু করেন। সিজারের এক সন্তানের মা হন। পরে মার্ক অ্যান্টনির সঙ্গে ঘর বাঁধেন এবং তিন সন্তানের মা হন। শেষ পর্যন্ত অক্টাভিয়ানের সঙ্গে যুদ্ধে অ্যান্টনির পরাজয়ের পর ৩১ খিস্টপূর্বাব্দে অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রা দু'জনেই আত্মহত্যা করেন। ক্লিওপেট্রা মিসরীয় কোবরা এসপের দংশন খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। ক্লিওপেট্রা রহসময়ী, তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে বহু মিথ, নাটক, কবিতা, গান, চিত্র, চলচ্চিত্র। তিনি বহু মানুষের প্রিয়। তিনি দুটি সভ্যতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন অপরিসীম বুদ্ধিমত্তা আর কর্মতৎপরতা দিয়ে। বুদ্ধিই তার সৌন্দর্য। কিন্তু মানুষ তার শারীরিক সৌন্দর্যকেই এতকাল তার শক্তি ভেবে এসেছে। প্রত্নতাত্তি্বকদের ভুল ভাঙানোয় তাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বরং এখানেই আশাবাদের শুরু।

Sunday, May 16, 2010

সাদা সাদা আরও সাদা


ছোটবেলায় স্কুল পাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি আপ্তবাক্যের ব্যাখ্যা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের করতে হয়। বাক্যটি হলো, 'অর্থই অনর্থের মূল।' এই অর্থ মিনিং বা মানে নয়, এই অর্থ হলো মুদ্রা বা টাকা। ছোটবেলায় অর্থকে অনর্থের মূল জানলেও ক্রমেই শিক্ষার্থীরা এ বিদ্যা অর্জন করতে পারে যে, টাকা জগতের অন্যতম আরাধ্য। লেখাপড়া করে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ার সৌভাগ্য হয় এ-ও স্কুল পাঠ্যেরই শিক্ষা। গাড়ি-ঘোড়ায় চড়তে টাকা প্রয়োজন, একথা ছোটরা বুঝতে না পারলেও বড়রা বেশ ভালো করে বোঝেন। ফলে বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থাকে বড়রা এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, এর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকা উপার্জন। অভিযোগ আছে, আমাদের বিদ্যায়তনে নৈতিক শিক্ষাকে অনেক নূ্যনতম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে আমাদের প্রজন্মগুলো নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা ছাড়াই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এমনকি ছাত্রাবস্থাতেই তারা টাকা উপার্জনের জন্য মূলধারার রাজনীতি ও রাজনীতির উপসর্গ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, দুর্বৃত্তপনায় হাত পাকিয়ে তুলছে। ফলে অর্থের অনর্থ উপলব্ধির আগেই কিংবা টাকার রঙ বোঝার আগেই তারা টাকা উপার্জন করে টাকার শক্তি ও প্রতিপত্তি উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। সম্প্রতি টাকার সাদা, টাকার কালো নিয়ে এক প্রস্থ তর্ক হয়ে গেল আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে। কেউ বলতে পারেন, খারাপ টাকাকে কালো বলা বর্ণবাদী ব্যাপার। সাদা মানে ভালো আর কালো মানে খারাপ_ এ ধারণা থেকে বের হতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আপাতত বিতর্কটি তোলা থাকুক। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে কালো টাকার গ্রহণযোগ্য একটা নামও আবিষ্কৃত হয়ে যাবে। সরকারি দলের একজন নেতার অভিযোগ, বিরোধীদলীয় নেত্রী কালো টাকা সাদা করেছেন। খবর নতুন নয়, বিস্ময়করও নয়। আমাদের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমলাদের অনেকেই কালো টাকাকে সাদা করেছেন। বৈধভাবে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা আমাদের আছে। তারপরও লোকে কালো টাকা কালোই রাখেন। সাদা করে ঝামেলা বাড়াতে চান না। কিন্তু অর্থনীতিতে কালো টাকা সাদা করাটাকে ভালো চোখেই দেখা হয়। ফলে বিরোধীদলীয় নেত্রী কালোকে সাদা করলে সেটি ভালোই করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এক বিরোধীদলীয় নেতা বললেন, নেত্রী সাদা টাকাকেই সাদা করেছেন। এখানেই তর্কের সূত্রপাত। সাদাকে সাদা করার দরকার পড়ে না। তবে তিনি কেন করলেন? মনে পড়ল, জনপ্রিয় অভিনেতা রিয়াজের সেই দেশব্যাপী বিজ্ঞাপনী অভিযানের কথা। সার্ফ এক্সেল ব্যবহার করে দেশের লোকেরা সাদাকে আরও কত সাদা করে তুলছেন তা দেখতে রিয়াজ দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরছেন সাদা মাপার যন্ত্র সঙ্গে নিয়ে। দেখাচ্ছেন, এক সাদার চেয়ে আরেক সাদা কত সাদা। হয়তো বিরোধীদলীয় নেতা তেমনি আরও সাদার কথা বোঝাচ্ছেন। বলা হয়ে থাকে, আমাদের অর্থনীতিতে নাকি সাদার চেয়ে কালো বেশি। কালো টাকা বন্ধ হলে নাকি অর্থনীতি থমকে যাবে। এমন এক পরিস্থিতিতে সাদাকে আরও সাদা করার উদ্যোগ নিশ্চয়ই অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু সত্যিই কি সাদাকে সাদা করার কোনো উদ্যোগ কখনও চালু হয়েছিল দেশে? ভাবতে হবে। তবে হ্যাঁ, সব কালো তো একই রকম কালো নয়। রোজগারের টাকা থেকে কেউ যদি আয়কর না দেন তবে সেই টাকাও যেমন কালো টাকা হিসেবে গণ্য হয়, তেমনি উৎকোচের টাকাও কালো টাকা আবার লুটের টাকাও কালো টাকা। কোন কালো সবচেয়ে বেশি কালো সেটি নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলবে। বিরোধীদলীয় নেত্রী কালো টাকাকে সাদা করেছেন, নাকি অল্প সাদাকে সাদা করেছেন_ সে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ ব্যাংক বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডই ভালো বলতে পারবে। তবে তর্কটা রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির ব্যাপারই এখন পর্যন্ত। এর পেছনে কারও কোনো সৎ উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছে না। যদি সৎ উদ্দেশ্য থাকত, তবে কে কবে টাকা সাদা করেছেন সে প্রশ্নের চেয়ে অন্য প্রশ্ন উঠত বেশি করে। তা হলো, সরকারদলীয় মন্ত্রী, এমপি, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট করে জনগণের সামনে হাজির করত। মেয়াদ শেষে আবার আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়েই প্রস্থান করত। সেসব এ দেশে দূর ভবিষ্যতে হবে কি-না জানি না_ তবে এমন হাস্যকর বিতর্ক যে আরও হবে তা বলাই বাহুল্য।

Thursday, May 13, 2010

এ জার্নি বাই ছাদ!


ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ নিশ্চয়ই এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি তৈরি করে। অ্যাডভেঞ্চার, রুদ্ধশ্বাস ভ্রমণের নাম ট্রেনের ছাদ। এ কারণে মুম্বাইর অ্যাকশন ছবিগুলোতে প্রায়ই দ্রুতগতিতে ছুটে চলা ট্রেনের ছাদে নায়ক আর ভিলেনকে মারপিট করতে দেখা যায়। পুরনো দিনের ছবিতে ট্রেনের ছাদে মারপিট পরিচিত দৃশ্য ছিল। নতুন ছবিগুলোও কম যায় না। হালের ধুম-টুতেও দেখা গেল এমন মারপিটের দৃশ্য। শুধু মুম্বাইর ছবি কেন বাংলাদেশের ছবিতেও ট্রেনের ছাদে মারপিটের দৃশ্য বেশ পরিচিত। তবে ট্রেনের ছাদের সবচেয়ে আকর্ষক দৃশ্য বোধহয় ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া 'দিল সে' সিনেমার সেই 'ছাইয়া ছাইয়া' গানটি। শাহরুখ খান ও মালাইকা অ্যারোরা একদল নারী-পুরুষ সঙ্গে করে পুরো একটি গানের দৃশ্যায়ন করেছেন চলন্ত ট্রেনের ছাদে উঠে। বলতে গেলে চলন্ত ট্রেনের ছাদে দৃশ্যায়িত এ গানটি রোমাঞ্চকর ভ্রমণের এক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এআর রহমানের সুরের এ গান ভারত বাংলাদেশ তো বটেই, বিবিসির টপ চার্টেও উঠেছিল। আর এর প্রভাব এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল যে হলিউডের পরিচালক স্পাইক লির সিনেমা ইনসাইড ম্যানে ছাইয়া ছাইয়া গানটি টাইটেল সং হিসেবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের এমন সব ফিল্মি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে গেল ৬ মে ২০১০ তারিখে বিবিসি ওয়েবসাইটের একটি সংবাদ পড়ে। সংবাদটি অবশ্য রোমাঞ্চের নয়, দুঃখজনক। বিবিসিতে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হলেও সংবাদটি দেশীয় সংবাদমাধ্যমের চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকবে কোনো কারণে। সেবামূলক সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেন সূত্রে বিবিসি জানাচ্ছে, বাংলাদেশে বহু শিশু-কিশোর ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করে। অনেক সময় শিশুরা স্রেফ মজা করার জন্য কিংবা রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য ট্রেনের ছাদে উঠে পড়ে। কিন্তু রোমাঞ্চই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশে যাত্রীর তুলনায় ট্রেনের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে সপ্তাহ শেষে যখন মানুষ বাড়ি ফেরে তখন মালপত্র নিয়ে শিশু-কিশোরদের ছাদেই তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় নিম্ন আয়ের মানুষেরা পুরো পরিবার নিয়েই ছাদে চড়ে বসে। এছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকে না। ছাদে ভ্রমণের ফলে একদিকে যেমন টাকা বাঁচে, অন্যদিকে ভিড় থেকে মুক্তি মেলে। কোনো ঈদ-উৎসবে বাড়ি ফেরার প্রসঙ্গ এলে তো কথাই নেই। বহু শিশু-কিশোর ও বয়স্ক মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সময় ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করে। সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, এভাবে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের মাধ্যমে শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময়ই শিশুরা ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে বা কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অনেক সময় খোলা ইলেকট্রিক তারে লেগে গিয়েও করুণ মৃত্যুবরণ করেছে শিশুরা। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রেনের ছাদে শিশুদের ভ্রমণ বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছে। সরকার বলছে, একমাত্র ট্রেন কোম্পানিগুলোই পারে ছাদে শিশুদের ভ্রমণ বন্ধ করতে। তাদের মতে, রেলের লোকজনই এগুলো বন্ধ করতে পারে। কিন্তু এটি বন্ধ করা কঠিন। কারণ এটি ঝামেলার কাজ।
সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, পুরো বাংলাদেশেই শিশুদের ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করতে দেখা যায়। সেভ দ্য চিলড্রেন এমন নানা বিপদ থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, তারা শিশুর পরিবারকে কাজে সুযোগ করে দিয়ে শিশুর স্কুলে ফেরার পথের বাধা দূর করে। প্রশ্ন হলো, সেভ দ্য চিলড্রেনের এমন আহ্বানের পরও কি ট্রেনের ছাদে এমন আনন্দময় মৃত্যুভ্রমণ বন্ধ হবে?

Wednesday, May 5, 2010

সেলিম আল দীনের শাপলা, মহুয়া আর মুনিয়া পাখিগুলো


তলস্তয় নাকি নিজের সম্পর্কে বলতেন, এই যে মানুষগুলো দেখছ এরা আমার। চারপাশের বিল-ঝিল, ক্ষেত-খামার দেখছ, এগুলো আমার। এমনকি জানালার ধারে যে দোয়েল পাখিটিকে দেখছ সেও আমার।
রাশিয়ার তুলা অঞ্চলে ইয়াস্নাইয়া পলিয়ানায় জন্ম হয়েছিল লেভ নিকোলাইয়েভিচ তলস্তয়ের। তিনি ছিলেন সামন্তপ্রভু। জমিদার হিসেবে তার অধিকারে একটি এলাকা ছিল। ভূমিদাস, বিল-ঝিল, ক্ষেত-খামারের অধিকারও নিশ্চয় তারই ছিল। কিন্তু জানালার ধারে বসে থাকা স্বাধীন দোয়েল পাখিটির মালিকানা যখন তিনি দাবি করে বসেন, তখনই থমকে দাঁড়াতে হয়_ ভাবতে হয় এ তো তাহলে শিল্পীর কথা, জমিদারের নয়। যে শিল্পী সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, গল্পকার হিসেবে স্বীকৃত, যিনি মানবজীবনের এমন সব আখ্যান রচনা করেছেন, যার সামনে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে থমকে দাঁড়াতে হয় তার এমন অধিকারবোধে হয়তো ক্ষুণ্ন হবেন না অনেকেই। কিন্তু একালে যদি কেউ মুনিয়া পাখির দখল দাবি করে বসেন? যদি বিলে ফোটা শাপলার স্বত্বাধিকার দাবি করে বসেন? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে সেলিম আল দীনের সঙ্গে কেটেছিল আমাদের অনেক সময়। নাটক ও নাট্যতত্ত্বের শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমরা অন্য বিষয়ে পড়তাম। কিন্তু ক্যাম্পাসে কেউ সাহিত্যচর্চা করলে তিনি সহজে এই অধ্যাপক ও নাট্যকারের ছাত্রত্ব নিতে পারতেন। তার সঙ্গে অবাধ আড্ডা, আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের সুযোগ মিলত।
সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি, এ আড্ডাগুলো স্রেফ আড্ডা ছিল না। সেলিম আল দীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যের বাইরে আরেক সমান্তরাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের পথে-প্রান্তরে। সেখানে তরুণ সাহিত্যিক, শিল্পী, কবিদের শিক্ষক, অগ্রজ হিসেবে তিনি শিক্ষা ও সঙ্গ দিতেন। খুব সচেতনভাবে চলত না এই সমান্তরাল শিক্ষায়তন, অবচেতনে_ সবার জানাশোনার বাইরে এই আড্ডাগুলোতে সমবেত হতেন তরুণ সাহিত্যিক-কবিরা। তারা নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠতেন, আবার সেলিম আল দীনের কাছ থেকেও শিখতেন। শুধু জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী নন, ঢাকার তরুণরাও বঞ্চিত হননি এসব আড্ডা-আলোচনা থেকে।
রবীন্দ্রনাথ, তলস্তয়ের মতো বড় সাহিত্যিকদের সেলিম আল দীন বলতেন, অমরগণ। অমরদের শিল্প ও জীবনাদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। মাঝে মধ্যে বলতেন_ এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ঢাকা থেকে দূরে প্রশান্ত প্রকৃতির এক জনপদে শান্তিনিকেতনের মতো একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্বপ্নের কথা। সেখানে ক্লাস হবে গাছের তলায়, দেশ-বিদেশের সাহিত্যিক, শিল্পীরা পড়াতে আসবেন। লেখকরা লিখবেন, শিল্পীরা আঁকবেন সেখানে বসে। এসব স্বপ্নের কাছে পেঁৗছাবার অনেক আগে ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তার মৃত্যু হলো। মৃত্যুর পর তার সাহিত্য নিয়ে পাঠকমহলে নতুন কৌতূহল জন্মেছে। বাংলা নাটকে তার অবদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মূল্যায়নের এ আয়োজনগুলো চলতে থাকবে এ আশা করা যায়। পাশাপাশি তার শিক্ষকতা জীবন নিয়ে, জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের প্রভাব নিয়েও বিস্তর আলাপ হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগরে মহুয়া ফুল ফোটার উৎসব হলে, সেলিম আল দীনের কথাই সবার আগে মনে পড়ে। কারণ উৎসবটি তিনি চালু করেছিলেন। তিনিই খবর রাখতেন জাহাঙ্গীরনগরে ক'টা মহুয়া গাছ আছে। বসন্তে কোন গাছে ফুল ফুটবে আর কোন গাছের নিচে আলো জ্বালিয়ে ফুল ফোটার উৎসব পালন করা হবে। বর্ষায় শিরীষের গাছে ফুল ফুটলে তিনি আমাদের শিরীষের তলায় নিয়ে গিয়ে ফুলের ঘ্রাণ নিতে বলতেন। কোথাও লেবু ফুল ফুটে তীব্র গন্ধ ছড়ালে তার সান্ধ্যভ্রমণের গতি স্লথ হয়ে আসত। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, বলো, এ কোন ফুলের ঘ্রাণ! ঘাসে ঘাসে পা ফেলে এমন অনেক প্রাকৃতিক সন্ধ্যা-সকাল আমাদের কেটেছে। প্রকৃতিপ্রেমিক ছিলেন খুব। উপভোগকে তিনি বলতেন, আস্বাদন বা সম্ভোগ। চারপাশের সৌন্দর্যকে সম্ভোগ করার এক মানবিক আর্তি ছিল তার মধ্যে। শিল্পীর জন্য এসব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একদিন তিনি হঠাৎ জাহাঙ্গীরনগরের জঙ্গলে বসবাসরত মুনিয়া পাখিগুলোর স্বত্ব দাবি করে বসলে খুব অবাক হলাম। বললেন, আগে জাহাঙ্গীরনগরে কোনো মুনিয়া পাখি ছিল না। তিনি মানিকগঞ্জ থেকে দুই জোড়া মুনিয়া পাখি এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন জঙ্গলে। সেগুলোই এখন জাহাঙ্গীরনগরে বংশবিস্তার করে অনেক পাখিতে পরিণত হয়েছে। আমরা একটু অবিশ্বাসের সঙ্গে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। এক সকালে জাহাঙ্গীরনগরের লেকে অসংখ্য লাল শাপলা ফুটতে দেখে আমরা যখন বিস্মিত তখন তিনি বলেছিলেন, এ শাপলাগুলোও তার। আগে জাহাঙ্গীরনগরের লেকে শাপলা ফুটত না। তিনি চাঁদপুর থেকে শাপলা এনে লেকের পানিতে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেগুলোই এখন লেকে লেকে ছড়িয়ে শত পুষ্প ফোটাচ্ছে। তার দাবি নিয়ে আমরা খুব মজা করতাম। কিন্তু কখনও কোনো বিষণ্ন মুহূর্তে মনে হতো, এমন যার প্রকৃতিপ্রেম তার জন্যই হয়তো শাপলা ফোটে, মহুয়া গন্ধ ছড়ায়, মুনিয়া পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায়। তার জন্যই হয়তো তলস্তয়ের দেশ সাইবেরিয়া থেকে পাখিরা উড়ে এসে জাহাঙ্গীরনগরের লেকে বসে থাকে। সেলিম আল দীনের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করতে গিয়ে শাপলা আর মুনিয়া পাখির জন্য তার দাবির কথা মনে হলো। মনে হলো, তলস্তয়ও একদিন বলেছিলেন, জানালার ধারে বসে থাকা দোয়েল পাখিটি তার।

বিমানবন্দর বিভ্রাট


লালন সাঁইয়ের গোষ্ঠ গানে শ্রীকৃষ্ণ মাকে বলছেন, গোষ্ঠে আর যাব না মা। কারণ কী? দাদা বলরামের সঙ্গে গরুর পাল নিয়ে গোষ্ঠে যায় রাখাল বালকেরা, সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ যান। কিন্তু গোষ্ঠে গেলে দাদা বলরাম তাকে মারে। কৃষ্ণ মায়ের কাছে তাই বিচার দিচ্ছেন, বলাই দাদার প্রাণে দয়া নেই বলে কৃষ্ণ কানাইয়া মার কাছে আবদার করেছেন যে আর গোষ্ঠে যাবেন না। কিছুদিন আগে আমেরিকার এক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা হুজ্জতির শিকার হয়ে বলিউডের নায়ক শাহরুখ খানও বলেছিলেন, আমেরিকায় আর যাবেন না। বিমানবন্দরের রাখালেরা তাকে ধরে জেরা করেছে, আটকে রেখেছে আর কত কি-না হয়েছে। আমজনতার জন্য এ না হয় নিত্যকার ব্যাপার কিন্তু শাহরুখ তা সইবেন কেন? তাই অভিমান করে তিনি বলেছেন, এ রকম হলে আর আমেরিকায় যাবেন না। কিন্তু একালে আমেরিকায় না গেলে কি চলে? আর কারও চলুক না চলুক শাহরুখ খানদের চলবে না তা বলাবাহুল্য। শুধু শাহরুখ নন, তার আগে ভারতের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামকেও আমেরিকার বিমানবন্দরে নানা হুজ্জতি পোহাতে হয়েছিল। ভারতের মতো দেশের রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সেলিব্রেটি হওয়ার পরও কেন এই ভোগান্তি? আমেরিকার নিরাপত্তা কর্মীরা বলবেন, এ তো রুটিনওয়ার্ক। কিন্তু বাঁকাদৃষ্টির লোকেরা বলেন, মুসলিম না হলে এমন হতো না। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য হয়তো কিছু রেয়াত দেন নিরাপত্তা কর্মীরা। কিন্তু কিছু দেশ একেবারে কালো তালিকায়। তাদের নাগরিকরা বিমানবন্দরে কেমন বিপত্তিতে পড়েন তা বর্ণনা করবার বিষয় নয়। সাপে নাকি যাকে দংশায়নি সে সাপের বিষের মর্ম বুঝতে পারে না। কাস্টমসের কাহিনী যাকে ধরেনি তিনিও নাকি কাস্টমসের মর্ম বুঝতে পারবেন না।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বহু সংস্কৃতির দেশ। আফ্রিকান আমেরিকান, এশিয়ান আমেরিকান, লাতিন আমেরিকান কত শত নাম নিয়ে ঘোরাফেরা করেন এসব সংস্কৃতির লোকেরা। নানা মহাদেশ থেকে সমুদ্র, বনপথ পাড়ি দিয়ে তারা স্বপ্নের দেশে পেঁৗছেছেন। এই তো সেদিনও বলা হতো, এ দেশ হলো স্বাধীনতার, ফ্রিডমই এর মূলমন্ত্র। কিন্তু নাইন-ইলেভেন স্বাধীনতার মূলে হানা দিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমেরিকানরা এখন নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতেও রাজি। দুষ্ট লোকেরা বলত, আমেরিকার রাষ্ট্র পরিচালনায় আগে-পরে সবসময়ই বিগ ব্রাদারের বিশাল ভূমিকা। বিগ ব্রাদার জর্জ অরওয়েলের সেই চরিত্র যে নাকি নাগরিকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায়। এ ব্যবস্থা আগে-পরে ছিল আমেরিকায়। কিন্তু নাইন-ইলেভেনজনিত নিরাপত্তাহীনতায় সব নজরদারি, তল্লাশি আর তদারকিকে মার্কিন নাগরিকরা খোলাখুলি মুখ বুজে সয়ে নিয়েছেন। ফ্রিডম জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও জঙ্গিবাদ ঠেকাও এই হয়েছে মূলমন্ত্র। তাতে রাষ্ট্রের সুবিধা হয়েছে। এতসব নজরদারির মধ্যে জঙ্গিবাদ ঠেকানো যাক না যাক, নজরদারির আয়োজন চলছে বেশ। বছরে দু'বছরে হয়তো একজন জঙ্গি আটক হচ্ছে কিন্তু জঙ্গি সন্দেহে সবাইকে তল্লাশি করে ছাড়া হচ্ছে। মুসলিমদের ধরে মুসলিম হওয়ার বেদনাটা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে নাইজেরিয়ার জঙ্গি ওমর ফারুককে নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল। এক ধাক্কায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কঠোরতম অবস্থায় চলে গেল। এ নিয়ে একটি কার্টুন এঁকেছেন ক্লে বেনেট। কার্টুন দেখে ফেলুদার গল্পের কথা মনে পড়ল। সত্যজিৎ রায় বইয়ের নাম দিয়েছিলেন গ্যাংটকে গণ্ডগোল। বিমানবন্দরে তল্লাশি নিয়ে বেনেটের কার্টুন দেখে মনে হলো, বিমানবন্দরে বিভ্রাট নিয়ে কাহিনী লেখার সময় এসে গেছে। এ অবশ্য গোয়েন্দা গল্প হবে না। এ হবে স্বপ্নের দেশের দরজায় অতিথি অভ্যাগতদের নাকাল হওয়ার ট্র্যাজিক কাহিনী।

পদবঞ্চিতদের মানভঞ্জন


খবর পড়ে নিধুবাবুর টপ্পার সেই বিখ্যাত লাইনগুলোর কথাই ঘুরেফিরে মনে আসছে। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে যারা নিধুবাবুর গানটি শুনেছেন, ছাপার অক্ষরে দেখলে তাদের সুরসমেত মনে পড়ার কথা। নিধুবাবু কার উদ্দেশে বলছেন কে জানে! কিন্তু বলছেন, 'অনুগত জনে কেন করো এত প্রবঞ্চনা?/ তুমি মারিলে মারিতে পারো/ রাখিতে কে করে মানা?' টপ্পার খোশমেজাজি তালে গানের যে রস তৈরি হয় তা তো লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু আকেলমন্দ কে লিয়ে ইশারা হি কাফি। বুঝমানের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট। গানটির কথা বিশেষ করে মনে হলো সোমবারের সমকালে ছাপা একটি খবর পড়ে। খবরে প্রকাশ, ১০ জানুয়ারি সকালে আওয়ামী লীগের তিন নেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে দেখা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠান ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের। সেখানে তিন নেতাকে বক্তৃতা দেওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। নেতারা আসেন, বক্তৃতা দেন এবং নেতাকর্মীদের প্রশংসাও কুড়ান। শুধু তিন নেতাই নন, বিএনপির কাউন্সিলে গিয়ে জোটবিরোধী বক্তৃতা দেওয়ায় একটু পিছলে পড়েছিলেন অসীম কুমার উকিল, তিনিও ১০ তারিখের অনুষ্ঠানে সভা পরিচালনার দায়িত্ব পান। বেশ একটা ঐক্য ও সংহতির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে বটে। কিন্তু যারা রাজনীতির উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সমঝদার, তারা ভালো করেই জানেন, রাজনীতিতে মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগ বলে কিছু নেই। ফলে মানভঞ্জনের বিষয়ও নেই। রাজনীতি শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের মতো কাব্য নয়, আবার রোমান্সও নয়। কোমল শিল্পকলায় পারদর্শী কবিমন রাজনীতিতে শিশুমাত্র। বলতে হয়, রাজনীতি কঠোর শিল্পকলা। ওয়ান-ইলেভেনের পর কতকিছুই না ঘটেছিল! সংস্কার সংস্কার রব উঠে মাঠ গরম করে দিয়েছিল। সংস্কার নিয়ে যারা সরব হয়েছিলেন, তাদের গায়ে সংস্কারপন্থির ছাপ পড়েছিল। তখন অনেকে ভেবেছিলেন, সংস্কারের ছাপ যাদের গায়ে পড়ল না তারা বোধহয় রাজনীতি থেকেই নাই হয়ে গেলেন। কিন্তু নজরুল বহু আগে গেয়ে গেছেন, 'চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।' সেদিন যারা ওয়ান-ইলেভেনের রথে শামিল হননি, তারা আজ গণতন্ত্রের রথে সওয়ার হয়েছেন। আর যারা সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, তারা খানিকটা সংস্কার হয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর অনেকে বলেছিলেন, যা হয়ে গেছে তা তো ফেরানো যাবে না। এবার মিলেমিশে দেশগড়ার কাজ চলুক। কিন্তু নেত্রী বলেছেন, ক্ষমা করলেও ভুলে যাবেন না। দেখি কী হয়, দেখি কী হয় করে এক বছর গেল সরকারের। না দলে, না সরকারে কোথাও ভালো জায়গা হলো না সংস্কারপন্থিদের। সবশেষে পত্র-পত্রিকায় মৃদু গুঞ্জন উঠেছিল_ মন্ত্রিসভা বাড়ছে, উনি মন্ত্রী হচ্ছেন, উনি অমুক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর আর ফুরাচ্ছে না। সংস্কারপন্থিদের শনি কাটছে না। মান-অভিমান করে তো আর রাজনীতি হয় না! রাজনীতি ক্ষমতা ও আনুগত্যের কঠোর হিসাবে চলে। ফলে নেতাদের আপাতত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে, অনুশোচনা করে কাটাতে হবে হয়তো আরও কিছুদিন। বলছিলাম নিধুবাবুর টপ্পার কথা। এদেশে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার কথা কে না জানে! শিশুপাঠ্যে ছিল, একে চন্দ্র, দুইয়ে পক্ষ, তিনে নেত্র, চারে বেদ। আমাদের রাজনীতিপাঠ্যে লেখা আছে, একে দেশ, দুইয়ে নেত্রী। এক-এগারোর সামান্য ধাক্কায় অনেকে ব্যাপারটা ভুলতে বসেছিলেন। নির্বাচনের পর বেশ মনে পড়েছে। কিন্তু তখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন যদি নেত্রী খুশি হন, যদি তার মনে ক্ষমা জাগে তো কখনও হয়তো পদবঞ্চিতদের জন্য পদ মিলতে পারে। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের টিভিতে বিজ্ঞাপনের একটি কথা মনে পড়ছে, 'পাহেলে যদি পাতাহি থা, তো এস্তেমাল কিঁউ নেহি কিয়া?' যদি জানাই ছিল তবে আগে ব্যবহার করেননি কেন? জানা না থাকার তো কথা নয়। শেখ হাসিনার মতো নেত্রীকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়_ এ তো জানাই ছিল। তবে আর সংস্কারের কথা উঠিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার বাসনা অল্প হলেও প্রকাশ করেছিলেন কেন?