Tuesday, October 2, 2012

এরিক হবসবম

যবনিকা বলে একটি কথা আছে। শব্দটির অর্থ পর্দা বা আড়াল। নাটকের শেষে মঞ্চে যবনিকাপাত ঘটে। যবনিকা ভারী বা পাতলা কাপড়ের হতে পারে। কিন্তু লৌহ যবনিকা কি হয়? এমন পর্দা কি আছে যা ইতিহাসের দুইকাল পর্বের মধ্যে লৌহ যবনিকা তৈরি করে ফেলতে পারে? যাদের চোখের সামনে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন, দুই জার্মানির একত্রীকরণ, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ভাঙন ও ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে তাদের কাছে হয়তো লৌহ যবনিকা শব্দের একটি অর্থ থাকতে পারে। তৎক্ষণাৎ হয়তো এ কথা কারও মনে হয়নি যে, চোখের সামনে একটা লোহার পর্দা পড়ে গেল। কিন্তু ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, পৃথিবী আর আগের মতো নেই। শুধু রাজনীতিতেই নয়, চিন্তাবিশ্বেও ঘটে গেছে গুরুতর ব্যত্যয়। এককালের সেলিব্রেটি ও ডাকসাইটে মার্কসবাদী চিন্তাবিদদের খোঁজ পরবর্তীকালে কেউ সেভাবে নিয়েছে কি? যার মতাদর্শ রাজত্ব করে না তার মতাদর্শের খোঁজ কে নেয়? বেদনা সঞ্চার করার মতো খবর হলেও আসলে সত্য যে, এরিক হবসবমের মৃত্যুর আগে আমরা কি মনে রেখেছিলাম যে, তিনি জীবিত আছেন? যুক্তরাজ্যের মতো দেশে পুঁজিবাদের অন্তরের ভেতর তিনি ছিলেন আমরণ মার্কসবাদী তাত্তি্বক ও ইতিহাসবিদ হিসেবে। বেঁচেছিলেন ৯৫ বছর। গার্ডিয়ান পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে বড় করে তার মৃত্যুসংবাদ দেখে তাই একটু অপরাধবোধও হলো। এরিক হবসবমের মতো বহু মার্কসবাদী পণ্ডিত, তাত্তি্বক আজও আছেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়ের ভাষায় কথা বলতে না পেরে অনেকেই জীবিত অবস্থায় হারিয়ে গিয়েছেন। অথচ কত প্রয়োজনীয় ছিল তাদের চিন্তাচর্চা। রাজনীতি রাতারাতি তাদের হাওয়া করে দিতে চেয়েছে। রাজনীতি বলে দিয়েছে তারা অপ্রাসঙ্গিক। বিস্মৃতি তাহলে সবচেয়ে বড় রাজনীতি! এরিক হবসবম লিখেছেন, এইজ অব রেভলিউশন, এইজ অব ক্যাপিটাল, এইজ অব এম্পায়ার। তিনটি মিলে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি ট্রিলজি বলে আখ্যায়িত হয়। আধুনিক ইতিহাস পাঠ করতে গেলে ওই ট্রিলজি অবশ্য পাঠ্য বলে গণ্য। এরিক ও টিও রেঞ্জার মিলে একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। ইনভেন্টেড ট্র্যাডিশন বা আবিষ্কৃত ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত ওই তত্ত্ব। 'ইনভেনশন অব ট্র্যাডিশন' বইয়ে তারা ওই তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। ঐতিহ্য বলতেই এমন বিষয় বোঝানো হয় যা পুরনো। কিন্তু কোনো কোনো সময় ঐতিহ্যকে সাম্প্রতিক হিসেবে আবিষ্কার করা সম্ভব। আবিষ্কার হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যের নতুন সূচনা ও নবায়ন ঘটানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় আধুনিক জাতি ও জাতীয়তার ধারণাগুলোর বিকাশ ঘটে।
এরিক জন আর্নেস্ট হবসবমের জন্ম ১৯১৭ সালে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় একটি ইহুদি পরিবারে। বেড়ে উঠেছেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা ও জার্মানির বার্লিনে। হিটলার ক্ষমতায় আসার বছরে ১৯৩৩ সালে তারা চলে আসেন ব্রিটেনে। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে। শিষ্যদের কাছে তিনি প্রিয় মার্কসিস্ট হিসেবে পরিচিত। মার্কসবাদী অভিধা সত্ত্বেও একাডেমিক অঙ্গনে তার অবদান বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই স্বীকৃত হয়েছে সে দেশে। তার শেষ বইটি প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। কাজও শেষ দিকে। এর আগেই চলে গেলেন তিনি। ১ অক্টোবর ২০১২ তারিখে।

টাকা গাছেই ধরে

জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, টাকা কি গাছে ধরে? দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করে মনমোহন সিংকে এমন কঠোর উক্তি করতে হয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, টাকা সহজলভ্য নয়। চাইলেই টাকা মেলে না। কিন্তু সমালোচকরাও বসে নেই। মনমোহন কেন এ কথা বললেন, তার উদ্দেশ্য কী ইত্যাদি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি রাজনীতিক যশোবন্ত সিং পত্রিকায় কলাম লিখে বলেছেন, হ্যাঁ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টাকা গাছেই ধরে। তার বক্তব্য হলো, প্রধানমন্ত্রী না জানলেও সামান্য লোকেরাও জানে টাকা গাছে ধরে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে বলতে গেলে গাছই টাকার একমাত্র উৎস। আমরা শস্য বিক্রি করে টাকা পাই। শিল্পকারখানাতেও গাছ কাজে লাগে। গবাদিপশু গাছের ওপর নির্ভর করেই বেড়ে ওঠে। গাছ আমাদের খাদ্যও জোগায়। মজার ব্যাপার হলো, অর্থনীতির এই অন্যতম খুঁটি গাছ থেকে টাকাও তৈরি হয়। টাকা যেহেতু কাগজে তৈরি, অতএব গাছের উপাদান ব্যবহার করেই টাকাও তৈরি হয়। সমালোচকরা প্রমাণ করে দিচ্ছেন, টাকা গাছেই ধরে। কিন্তু ভারতের অর্থনীতির যে পরিস্থিতি তাতে প্রমাণ করলেই গাছ থেকে টাকা পাড়া যাচ্ছে না। টাকা পেড়ে যাবতীয় সমস্যার সমাধানও করা যাচ্ছে না। বস্তুত ভারতীয় সরকারকে বহু অর্থনৈতিক বাধা অতিক্রম করেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। জোট সরকার নানা অর্থনৈতিক ইস্যুতেই ক্ষণে ক্ষণে টালমাটাল হয়ে উঠছে। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সরকার ছাড়লেন তার মূলেও আছে অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহসা এ বছর নেমে এসেছে। নানা সংস্কার দরকার, বিপ্লবী কর্মসূচিও জরুরি। কিন্তু নাজুক সরকারের পক্ষে তেমন উদ্যোগ সম্ভব হচ্ছে না। কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে মনমোহন সরকার। যে ব্যক্তির হাতে একদা ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের সূত্রপাত ঘটেছিল যিনি ছিলেন নতুন সমৃদ্ধ ভারতের উদ্গাতা তার হাতেই অর্থনীতির এমন বেহাল পরিস্থিতি, তাই কঠোর সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসক হিসেবে মনমোহন অতটা দক্ষ নন। যে সিদ্ধান্ত আজ নিতে হবে সে সিদ্ধান্ত তিনি নিচ্ছেন কাল। যে ওয়ালমার্ট বন্ধ করে দিচ্ছে পশ্চিমারা সে ওয়ালমার্টকে তিনি এখন ভারতে ব্যবসা করার অনুমতি দিচ্ছেন। তেলের দাম বাড়ছে। বিরোধীরাও ইস্যু পেয়ে বন্ধ পালন করছেন। প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বাম-ডান মিলে মনমোহনকে বেকায়দায় ফেলতে সবাই প্রস্তুত। কিন্তু মনমোহন সরকার ম্যানেজ করতে পারছে না কিছুই। গোলমাল চলছেই। এত গোলমালের মধ্যে মনমোহনও মৌনব্রত পালন করে চলছিলেন। সে মৌনব্রত অনেকের প্রশংসাও পেয়েছিল। কিন্তু মৌন থেকে তো সমস্যার সমাধান হয় না। সব সমালোচনাকে নিরুত্তর যেতেও দেওয়া যায় না। তাই শেষ পর্যন্ত তাকে বলতেই হলো, টাকা কি গাছে ধরে? টাকা গাছে ধরে বটে। কিন্তু তার জন্য সময় দিতে হয়। অর্থনীতি যখন সমস্যায় পড়ে তখন নগদ টাকার দরকার হয়। এই টাকা কিন্তু গাছে মেলে না। কিন্তু এই কথা সমালোচকদের বোঝাবে কে?
 

Wednesday, September 19, 2012

পাপারাৎসি ও ব্রিটিশ রাজপরিবার

ব্রিটিশ রাজপরিবারের পিছু ছাড়ছে না পাপারাৎসি বা পাপারাজ্জি। প্রিন্সেস ডায়ানার পেছনে কেমনভাবে লেগেছিল নাছোড়বান্দা ফটোগ্রাফাররা, সে স্মৃতি এখনও মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। ডায়ানা জীবিত থাকাকালে মাঝে মাঝেই ফটোসাংবাদিকদের গোয়েন্দাবৃত্তির ফলে মিডিয়ায় আসা ছবিগুলো আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলত। গোপনে তোলা ব্যক্তিগত এসব ছবি গণমাধ্যমগুলোর পসার কতটা বাড়াতে পেরেছিল জানা না গেলেও এগুলো যে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল তা অনেকেই বিশ্বাস করেন। প্যারিসের টানেলে গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পেছনে পরোক্ষে পাপারাৎসিদের হাত ছিল বলে মনে করা হয়। ডায়ানা নিঃসন্দেহে রাজপরিবারের সবচেয়ে সেলিব্রেটি নারী। যারা তার থেকে কম সেলিব্রেটি তাদের নিয়েও ফটোগ্রাফারদের উৎসাহের শেষ নেই। রাজপরিবারের তরুণ-তরুণীদের নগ্ন-অর্ধনগ্ন ছবি তাই অনলাইনে সহজলভ্য। শুধু রাজপরিবার কেন, বৈবাহিক সূত্রে রাজপরিবারের আত্মীয় পিপ্পা মিডলটনকে নিয়ে কম তোলপাড় করেনি ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো। নানা রকমের ছবি তো খবরের আবশ্যিক অনুষঙ্গ। পাপারাৎসিদের দৌরাত্ম্য ডায়ানার ছেলেদেরও ছাড়ছে না। ছেলে-বউকে তো না-ই। কিছুদিন আগে লাস ভেগাসে বেড়াতে গিয়ে প্রিন্সেস ডায়ানার ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারি বেশ বিপদে পড়েছিলেন। হোটেলে কাটানো ব্যক্তিগত সময়ের বেশকিছু ছবি পাচার হয়ে যায়। হ্যারির ক্ষেত্রে অবশ্য পাপারাৎসিদের দিকে অভিযোগ ওঠেনি। কেননা, নাছোড়বান্দা প্রফেশনালরা নন, বরং হ্যারির বন্ধু-বান্ধবদের মধ্য থেকেই ছবি ছড়িয়েছে। আর এই ছবি বেচে বেশ টুপাইস কামিয়েও নিয়েছেন তিনি। হ্যারির সেসব ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। নানা আলাপ-আলোচনাও উঠেছে। কিন্তু, হ্যারি যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেন সেই বাহিনীর তরুণরা তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। আপাতত হ্যারি তাদেরই সনি্নধানে, আফগানিস্তানে। হ্যারির নগ্ন ছবির ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ফরাসি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কেট মিডলটন ও প্রিন্স উইলিয়ামের ছবি। তারা ডিউক অ্যান্ড ডাচেস অব ক্যাম্ব্রিজ। কেট ও উইলিয়াম গিয়েছিলেন ফ্রান্সে_ ব্যক্তিগত ছুটি কাটানোর মানসে। থেকেছেন শ্যাতো দ্য আউলে নামক এক অবসর কেন্দ্রে। সেখানে তাদের ব্যক্তিগত নানা মুহূর্তের ছবি বড় লেন্সের সাহায্যে তুলেছেন পাপারাৎসিরা। সেসব ছবি ছাপা হয়েছে ফরাসি পত্রিকায়। আর এতে স্বভাবতই ডিউক ও ডাচেস তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন। রাজপ্রসাদের তরফে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। পত্র-পত্রিকাও ফলাও করে খবর প্রচার করছে। তবে ফ্রান্সে ঘটা এই ঘটনায় সবাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন ডায়ানার বিয়োগান্ত ঘটনার কথা। কেননা সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ফলে ঘটনার গুরুত্ব বেড়ে গেছে। অবশ্য এখানে ফ্রান্স বনাম ব্রিটেন বলে কোনো ব্যাপার দাঁড়াচ্ছে না। আমাদের অর্থমন্ত্রীর ভাষায় বলতে গেলে, ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলো কম 'দুষ্টু' নয়। তারা রাজপরিবারকে ছেড়ে কথা কয় না। রাজপরিবার সংশ্লিষ্টদের নগ্ন ছবির প্রতি তাদের আগ্রহ বিপুল। বরং ফ্রেঞ্চরা ট্যাবলয়েডের ব্যাপারে নাক সিটকায়। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোর জনপ্রিয়তা বিপুল। এখন প্রশ্ন হলো, রূপালি পর্দার এত সেলিব্রেটি থাকতে কেন রাজপরিবারের প্রতি ট্যাবলয়েডগুলোর এই বিশেষ আকর্ষণ? বহু শতাব্দী প্রাচীন, আড়ম্বরপূর্ণ, সম্মানিত ভাবমূর্তির প্রতি কোনো অবচেতন বিরাগ নেই তো এর মধ্যে? নিশ্চয়ই মনোবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু পাপারাৎসির হাত থেকে মুক্তি নেই রাজপরিবারের। ফলে রাজপুত্র ও রাজকন্যাদের নিজ দায়িত্বে কাপড় সামলাতে হবে ভবিষ্যতেও। পাপারাৎসি শব্দটা ইতালিয়ান। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফেদরিকো ফেলেনির ছবি 'লা দোলচে ভিটা'য় প্রসঙ্গক্রমে শব্দটি উচ্চারিত হয়। আর এখান থেকেই তা চালু হয়ে গেছে। তবে গোপনে ছবি তোলার ঘটনা ফেলেনি চালু করেননি। বলাই বাহুল্য।

Thursday, September 13, 2012

ইউ পম গানা?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগে বাংলা সিনেমার নায়ক এম এ জলিল অনন্তকে নিয়ে বিপুল হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত একটি বাংলা টিভি চ্যানেলে অনন্তর সাক্ষাৎকার থেকে। বিগ বাজেটের সিনেমা করে অনন্ত আলোচনায় এসেছেন। এর আগে নির্মাণ করেছেন 'খোঁজ_ দ্য সার্চ', সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে আরেকটি সিনেমা 'মোস্ট ওয়েলকাম'। নায়ক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে টিভি সাক্ষাৎকারে অনন্ত শোনাচ্ছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা। রাজধানীর দামি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে গিয়ে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন অনন্ত। সেখানে খেতে আসা উচ্চবিত্তের আধুনিক ছেলে-মেয়েরা অনন্তকে দেখিয়ে বলেন, ওই দেখ বাংলা সিনেমার নায়ক। বলাবাহুল্য, তাকে দেখেই হাস্যরসের আবহ সৃষ্টি হয়। অনন্ত হাসিরস হজম না করে তাদের দিকে এগিয়ে যান। তাদের উদ্দেশে যা বলেন তা মোটামুটি এইরকম_ ইউ পম গানা? ইউ লিভ বাংলাদেশ, ইউ ইট ফুড ইন বাংলাদেশ, ম্যান ইউ হ্যাভ টু রেসপেক্ট ইন বাংলাদেশ। অনন্ত বলতে চেয়েছেন, তোমরা কি ঘানা থেকে এসেছো? তোমরা বাংলাদেশে থাকো, এখানকার খাবার খাও। বাংলাদেশের প্রতি তোমাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। খানিকটা ভুল ও বিচিত্র ইংরেজি উচ্চারণের কারণে সাক্ষাৎকারটি হাস্যরসের জন্ম দেয়। প্রযুক্তির কল্যাণে ইউটিউব, ফেসবুক, ব্লগ মারফত ছড়িয়ে যায়। মুখে মুখে ফিরতে থাকে, ইউ পম গানা? কাউকে পরিহাস করতে এখন হামেশা এই ডায়লগ ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি বুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে পরিহাস করতে অনন্তের ডায়লগ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। অনন্তকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে, ফান ম্যাগাজিন-কার্টুনের বিষয় হয়েছেন অনন্ত। সঙ্গে অবশ্য কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলছেন, এত হাস্যরসের কারণ কী? ভুল ইংরেজিতে কথা বললেই কি হাসতে হবে? নাকি বাংলা সিনেমার নায়ক বলেই তিনি ভুল বলতে পারবেন না? অবশ্য বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে হাস্যরস তৈরির ঘটনা এই প্রথম নয়। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের দর্শকরা সাধারণত সিনেমা হলে এফডিসিতে তৈরি বাংলা সিনেমা দেখতে যান না। কেন যান না তার কারণ স্পষ্ট। এই ভোক্তাদের দিকে লক্ষ্য রেখে সিনেমা তৈরি হয় না। ফলে এই শ্রেণীগুলোর সঙ্গে বাংলা সিনেমার এ ধরনের অপরিচয় ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সে দূরত্ব সত্ত্বেও বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকারা জনপ্রিয় হচ্ছেন। গরিব সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা খারাপ। ব্যবসা কমে যাচ্ছে। তবু সিনেমা তৈরি হচ্ছে_ গরিবের বিনোদনের জন্য। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের বিনোদনের জগৎ ভিন্ন। বাংলা সিনেমার প্রতি তাদের প্রত্যাখ্যান সহজাত, হাস্যরসও স্বাভাবিক। বাংলা সিনেমার নায়করা জোরে কথা বলেন কেন, নায়িকারা এত মোটা হন কেন, এসব প্রশ্ন ওঠে। সিনেমার নানা গৎবাঁধা ডায়ালগ নিয়েও হাসিঠাট্টা হয়। ফলে অনন্তর প্রতি এই হাস্যরস নতুন নয়। তবে হাস্যরসের ব্যাপ্তিটা লক্ষ্য করার মতো। বাংলা সিনেমার প্রতি বিরাগের পাশাপাশি এই হাসির পেছনে আছে ভাষার শুদ্ধতার জন্য এক ধরনের আহাজারি। বাংলা সিনেমার নায়ক ইংরেজি ডায়লগ কেন দেবে তাও ভুলভাল ইংরেজিতে? বলাবাহুল্য, ভুল ইংরেজিকে এখানে অন্যতম অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেউ যদি ভারতীয় লোকসভার অধিবেশন শোনেন, কিংবা ভারতের টিভি চ্যানেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন নেতাদের সাক্ষাৎকার দেখেন তবে বুঝবেন তারা অকপটে কত ভুলভাল ইংরেজি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ভারতে ইংরেজিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সেখানে সেটি যোগাযোগের ভাষা। ফলে না জানলেও বলতে হবে, শিখে নিতে হবে। নতুন প্রজন্মগুলো সেখানে স্বচ্ছন্দে ইংরেজি বলে। শুধু বলে না, ইংরেজিতে লেখে, পড়েও। পূর্বপ্রজন্মের ভুলভাল ইংরেজির ওপর দাঁড়িয়ে আছে পরের প্রজন্মের এই স্মার্ট ইংরেজি। বৈশ্বিক কমিউনিকেশনের জন্য আমরাও ইংরেজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নতুন প্রজন্মগুলো এখানে ইংরেজিতে কতটা দক্ষ? যারা অনন্তকে নিয়ে হাসাহাসি করছেন তাদের সবাই ভালো ইংরেজি বলেন তা তো নয়। কিন্তু অধিকাংশই ইংরেজি বলতে সংকোচ বোধ করেন, যদি ভুল হয়ে যায়। কিন্তু এক প্রজন্ম ভুল না বললে পরের প্রজন্ম সঠিক বলবে কী করে?

Friday, August 31, 2012

ইকুয়েডর কোথায়?

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় দিয়ে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে ইকুয়েডর। বিশ্ব এখন মোটামুটিভাবে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। এক মেরুর এই বিশ্বে বড় রাষ্ট্রগুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝে চলে। গুরুতর ভিন্নমত হলে নানা ছল করে কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে তা বোঝাবার ব্যবস্থা হয়। আলাপ-আলোচনা করে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা সবার। এমন অবস্থায় চীন নয়, ব্রাজিল নয়, ভারত নয়; ইউরোপের কোনো দেশ নয়_ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শত্রু জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় দিল ইকুয়েডর। ইকুয়েডর চীনের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি নয়। ইউরোপের মতো উদারপন্থিও নয়। গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যে যে খুব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার শখ দেশটির_ তাও নয়। তবু তিন কূল হারানো ডিজিটাল বিপ্লবীকে আশ্রয় দেওয়ার কাজটি তারাই করল। অ্যাসাঞ্জ ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। অবস্থা বেগতিক দেখে অস্ট্রেলিয়া তাকে ত্যাজ্য করেছে। যুক্তরাজ্য প্রথমে কিছুটা উদারতা দেখালেও শেষ পর্যন্ত তাকে সুইডেনের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। সুইডেনে ধর্ষণের দায়ে তার বিচার হওয়ার কথা ছিল। অ্যাসাঞ্জ অবশ্য বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। যা হওয়ার সমঝোতার ভিত্তিতে হয়েছিল। স্রেফ ষড়যন্ত্র করেই তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রেও নানা অভিযোগ শাসানো হচ্ছিল। এমন হতেই পারত যে, সুইডেন হয়ে তার গন্তব্য হতো যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার। বাদ সাধল ইকুয়েডর। প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে পেরু আর কলম্বিয়ার সীমান্তের দেশটি। এ দেশের মার্কিন বিরোধিতার ঐতিহ্য দীর্ঘ। এজন্য মার্কিনিরাও কম দায়ী নয়। দক্ষিণ আমেরিকার সামরিক স্বৈরাচারদের মাধ্যমে একের পর এক দেশে গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বহু বছর ধরে জনগণ সে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে গণতান্ত্রিক সরকার এনেছে। আর এ সরকারগুলো হয়েছে স্বভাবের দিক থেকে পুরো মার্কিনবিরোধী। লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন দেশ মিলে তৈরি করেছে অ্যান্টি অ্যামেরিকান জোট_ অ্যালবা। এরা উঠতে-বসতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানা কথা বলে। নামে অবশ্য এ দেশগুলোও আমেরিকা। কিন্তু কাজে অ্যান্টি আমেরিকা। তবে এই অ্যান্টি আমেরিকানদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতাও অব্যাহত। অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় দেওয়া নিয়েই সপ্তকাণ্ড রচিত হয়ে গেছে। গণতন্ত্র ও স্বাধীন মতপ্রকাশের বিশাল ধ্বজাধারী হলেও ইউরোপের দেশগুলো অ্যাসাঞ্জের ব্যাপারে চুপ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভিন্নমতাবলম্বীদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে যারা চ্যাম্পিয়ন; অ্যাসাঞ্জের ব্যাপারে তাদের কোনো বক্তব্যই নেই। আশ্রয় দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও কম যায় না। একসময় ভিন্নমতাবলম্বী রাশিয়ানদের আশ্রয় দিয়েছে তারা প্রচুর। এখন চীনের ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিয়ে তাদের আগ্রহের শেষ নেই। কিন্তু যেই তাদের এক ভিন্নমতাবলম্বীকে আশ্রয় দিতে গেল ইকুয়েডর, অমনি তার সমালোচনা শুরু হলো। বলা হলো, ন্যায়বিচারের পথে বাধা দেওয়া হলো। ইকুয়েডর স্রেফ পাগলামি করছে। ইকুয়েডরের লন্ডন দূতাবাসে অভিযান চালানোর ভয়ও দেখানো হয়েছে।
এখন বলা হচ্ছে, ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া নির্বাচনে জয়ের জন্য অ্যাসাঞ্জ কার্ড ব্যবহার করতে চাইছেন। বিশ্বে একটা ভাবমূর্তি গড়ার চিন্তাও নাকি তার আছে। সব মিলিয়ে এক গুরুতর পরিস্থিতি। অ্যাসাঞ্জ প্রসঙ্গে ইকুয়েডরের পদক্ষেপকে কিন্তু বিশ্বের নাগরিকদের আলাদা করে ধন্যবাদ দিতেই হবে।
এই বিশ্বে মতাদর্শের লড়াইয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই। অ্যাসাঞ্জ যে শেষ পর্যন্ত একটি দেশে আশ্রয় পেয়েছেন_ এটি আশ্বস্ত হওয়ার মতো বিষয়। পৃথিবী অনন্ত সম্ভাবনাময়। এর আশ্রয়ও অনন্ত। রাজনীতির জটিল হিসাবনিকাশের বাইরে এই সত্যটাও জানা থাকা দরকার। এই সামান্য সত্যটা জানাবার জন্যও তো
ইকুয়েডরকে ধন্যবাদ জানানো
যেতে পারে।

Tuesday, August 14, 2012

তালা

একান্ত অসতর্ক ও ভুলোমন না হলে নিজের বাসায় তালা না লাগিয়ে পাশের বাসাতেও বেড়াতে যান না রাজধানীর অধিবাসীরা। ঈদে বা দীর্ঘ ছুটি কাটাতে দূরে গেলে তো কথাই নেই। একেকটি দরজায় সাধ্য ও সুবিধামতো নানাপ্রকার তালা দেওয়া হয়। তালা দেওয়ার আগে ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে চলে ঘরকে রীতিমতো বেহুলার বাসরঘর বানানোর আয়োজন। দরজায় একাধিক ব্র্যান্ডের হরেক রকম তালা লাগিয়েও শান্তি নেই। যদি জানা যায়, আশপাশের বাসার কেউ ছুটি কাটাতে গ্রামে যাচ্ছেন না তবে তার কাছে অনুরোধ থাকে_ ভাই কি আপা, একটু চোখকান খোলা রাখবেন। বাসার দারোয়ানকে বাড়তি বকশিশ ধরিয়ে একটু নিয়মিত চোখ রাখার অনুরোধও করা হয়। তবুও কাজ হয় না। চোর-ডাকাতদের রোধ করার সাধ্য কার? ওনারা গ্রিল কেটে বাসায় ঢুকতে পারেন যেমন, তেমনি তালা ভাঙতেও সময় লাগে না। তাই যত তালাই লাগানো হোক, বাসা ছাড়তে গেলেই মনটা একটু খচখচ করবেই। তালা লাগানোর পর এ শহরে কার এমন বুকের পাটা যে, তিনি নিশ্চিন্তে থাকেন? হ্যাঁ, যার নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, পুলিশ প্রহরায় যার বাসা সুরক্ষিত, তিনি ঘর খোলা রাখলেও আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু বাদবাকি সবাই তালাঅন্তপ্রাণ। তালাময় জীবনে অভ্যস্ত এই নাগরিকদের যদি কেউ তালা লাগানোর অনুরোধ জানান, তবে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠাই স্বাভাবিক। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে তালা লাগিয়ে নিশ্চিন্তে গ্রামে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন নগরবাসীকে, তা তিনি করতেই পারেন। সবাই ঘর খুলে রেখে যাবে চোরদের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য আর ফিরে এসে সরকারের দোষ দেবে_ তা তো হতে পারে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই-খুনোখুনি নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় বিপদে পড়তে না চায় তবে কেউ বিপদ ঘটাতে আসবে কেন? মন্ত্রীর দিক থেকে তাই তালা লাগানোর পরামর্শে কোনো ভুল নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথাযথ খবর তিনি জানেন কিনা? খুন-খারাবি, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধের বাড়বাড়ন্তের খবর জানতে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়ার দরকার পড়ে না। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে চোখ বোলালেই হয়। সাধারণ মানুষ তো ভুক্তভোগী, পরিস্থিতির শিকার। তারা যখন দেখছে, যে বিষয়ের মন্ত্রী তিনি সে বিষয়েই বেখবর শুধু নন, উল্টো খবর দিচ্ছেন; তখন তারা তার ভালো কথাকেও ইতিবাচকভাবে নিতে পারছে না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। তালা প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তর কথা হচ্ছে। মেঠো আড্ডা, ভার্চুয়াল স্পেস, মিডিয়ায় কথা প্রসঙ্গে তালা প্রসঙ্গ উঠছে। কেউ রুষ্ট, কেউ দুষ্ট। মন্ত্রীর কথায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের দাবি জানাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এ নিয়ে নানা পরিহাস করছেন। অতীত-বর্তমানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। তালা নিয়ে বিস্তর তত্ত্বতালাশ চলছে। সাতক্ষীরার তালা থেকে শুরু করে মনের তালা পর্যন্ত নানা কথা হচ্ছে। মন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে এই যে নানামুখী কথাবার্তা, এতে কিন্তু সাধারণের মনোভাব কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। সে মনোভাব বুঝে নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াটা সরকারের কাজ। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই যদি মনে করেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে সন্তোষজনক, তবে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আদেশ-নির্দেশ কে দেবেন? এত বড় শহর, এত মানুষ, এত ঘরবাড়ি, এত চোর-ডাকাত_ এই শহরের নিরাপত্তার জন্য ২ হাজার র‌্যাব সদস্য যে যথেষ্ট নয়, তা তো সবার জানা। তালা লাগালেই সমাধান নিশ্চিত হবে না। তাই তালা লাগানোর কথাটা বাড়তি। মন্ত্রীর এই বাড়তি কথায় রুষ্ট হয়ে তাই কেউ কেউ বলেই ফেলছেন_ মাননীয় মন্ত্রী, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেবেন না। আমরা তালা লাগাই। আপনার কথা মনে রেখে এবার বেশি করে তালা লাগাব। আপনি এবার মুখে তালা লাগান।

Wednesday, August 8, 2012

তরুণরা আসলে কী চায়

সারাবিশ্বেই রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের কাছে এটি বড় এক প্রশ্ন যে, তরুণরা আসলে কী চায়? প্রশ্নটি আগেও কমবেশি ছিল। কিন্তু এখন বোধহয় আগের যে কোনো সময়ের থেকে বেশি। প্রশ্নটা যে বেশি বেশি করে উঠছে, তার প্রেক্ষাপট কী? একটা অনুমান করা যেতে পারে। দু'চার দশক আগেও প্রজন্ম ব্যবধান বা জেনারেশন গ্যাপ ব্যাপারটি প্রজন্মগুলোর মধ্যে গুরুতর বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেনি। পুরনো প্রজন্মগুলোর পক্ষে নতুন প্রজন্মগুলোর চিন্তার গতিপ্রকৃতি বুঝে ওঠা খুব কঠিন ছিল; কিন্তু সেটি একেবারে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। এখন প্রজন্ম ব্যবধান গুরুতর সমস্যা। রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের পুরনো প্রজন্ম তো বটেই, পিঠাপিঠি দুই প্রজন্মের মানুষের পরস্পরকে বুঝে ওঠার প্রক্রিয়াও ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। পরস্পরের প্রতি মনোযোগ কমেছে কি? হতে পারে। চিন্তাচর্চার ক্ষেত্রে বড় কোনো প্রভাবক তৈরি হয়েছে কি? অবশ্যই। এই প্রভাবকের নাম তথ্যপ্রযুক্তি। ইন্টারনেট নীরবে-নিভৃতে নতুন প্রজন্মের ভাষাভঙ্গি ও জীবনরীতিকে যেভাবে বদলে দিয়েছে অনেক বড় বড় আবিষ্কার ও উদ্ভাবনও তা অতীতে পারেনি। যারা ছোটবেলা থেকে ই-যোগাযোগের মধ্যে নেই আর যারা আছে তাদের চিন্তার ভঙ্গি, মনোজগতের আদলের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। বছর তিনেক আগে আরব বিশ্বের তরুণদের নিয়ে একটি লেখা পড়ছিলাম পশ্চিমা কোনো সংবাদপত্রে। তাতে লেখা হয়েছিল, ইন্টারনেট আরব বিশ্বের তরুণদের পরিবর্তিত করে ফেলছে। তারা কথা বলছে শত্রুদের সঙ্গে। মানে সেখানকার পুরনো প্রজন্ম যাদের শত্রুজ্ঞান করে মিশত না_ সেই শত্রুদের সঙ্গে মিশছে তরুণরা। মিশে মিশে তরুণরা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও পরিবর্তন শিখেছে। এই মেশামেশির ফল তো আমরা দেখলাম। আরব বসন্ত। পরিবর্তনের যে ডাক তরুণরা দিয়েছে তাতে পুরো বিশ্ব কেঁপে উঠেছে। কিন্তু পরিবর্তন কি হয়েছে? আরব বসন্ত নিয়ে এখন ফুটবল খেলছে সামরিক জেনারেল আর ইসলামপন্থিরা। অনেক তরুণের কাছে পরিবর্তন হয়তো এখন একটা ইলিউশনই। তবে এই জাগরণে বোঝা গেছে, পরিবর্তন একটা এক্সপ্রেশন তরুণদের। বিশ্বে অনেক রাজনীতিকই তরুণদের এ এক্সপ্রেশনের কথা জানেন। গত মার্কিন নির্বাচনে বারাক ওবামা পরিবর্তনের ডাক দিয়ে কেমন সাড়া ফেলেছেন সেটি মনে আছে। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি সেখানেও। ফলে অনেক মার্কিনির কাছেও পরিবর্তন মানে এখন হয়তো ইলিউশনই। বাংলাদেশেও পরিবর্তনের ডাক এসেছিল। অনেকে বলেন পরিবর্তন নয়, এখানে যা হয়েছে তা পুরাতনের প্রত্যাবর্তন। তরুণরা পরিবর্তন চায়, কিন্তু পথে নামলে তা হচ্ছে না। ভোট দিলেও তা হচ্ছে না। তবে কি তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে? আর পরিবর্তন চায়টা কোথায়? যতটুকু মনে হয় তাতে অস্ত্র হাতে নিয়ে পরিবর্তনের সংগ্রামে নামবার মতো মানসিকতা তরুণদের মধ্যে নেই। নিদেনপক্ষে একটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেও তাদের মন বসবে বলে মনে হয় না। স্বল্পমেয়াদে মাঠে নেমে একটা হেস্তনেস্ত করার মনোভাব আছে। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা কী চায়? শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি? সমাজতন্ত্র? ধর্মরাষ্ট্র? এসব কিছুই না। তরুণরা যা চায় ভদ্রভাষায় বলতে গেলে তা হলো_ স্বাধীনতা, মুক্তি, গণতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আদলে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। ভারতের জনপ্রিয় লেখক চেতন ভগতের ভাষায় বলতে গেলে, নোকরি, ছুকরি আর সামাজিক অবস্থান। চেতন ভগতের উপন্যাস ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান অবলম্বনে নির্মিত হিন্দি সিনেমা থ্রি ইডিয়টসের কারণে তিনি তরুণদের মধ্যে সুপরিচিত। তিনি তরুণদের মুখপাত্র। তরুণরা কী চায় সে প্রশ্নের জবাবে তিনি এ জবাবই দিয়েছেন। মনে হতে পারে, খুব অসঙ্গত জবাব। তাছাড়া তরুণীদের কথা তার বিবেচনায় এলো না। কিন্তু সত্য হয়তো এটাই। নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের মধ্যে তারা চায় চাকরি, সঙ্গিনী ও সামাজিক মর্যাদা। সরকারের কাজ সেসব নিশ্চিত করা। এ জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা। রাজনৈতিক ক্ষমতায় যদি তরুণরা বাগড়া না দিতে আসে তবে এটুকু চাওয়া তো সরকারগুলো সানন্দে পূরণ করতে চাইতে পারে। কিন্তু পারছে কি? বাংলাদেশে যদি তরুণরা বলে, আমরা শুধু চাকরি, সঙ্গী-সঙ্গিনী আর সামাজিক মর্যাদা চাই। তবে সেটুকু পূরণের আন্তরিক চেষ্টা কি কেউ করবে?