Tuesday, January 17, 2012

ভারত চীন নয়

সম্পাদকীয়, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৪ জানুয়ারি ২০১২, শনিবার
দিল্লির একটি নিম্ন আদালতের রায়ের পর দিল্লি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হলে আদালত ফেসবুক ও গুগলসহ ২১ কোম্পানির কর্মকর্তাদের এই মর্মে হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, 'আপত্তিকর' উপাদান না সরালে সাইটগুলো একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিচারক সুরেশ কাইতের ভাষায় : 'আপনাদের তদারকি ব্যবস্থায় কড়াকড়ি আনতে হবে। নয়তো, চীনের মতো আমরাও এ ধরনের সব ওয়েবসাইট বন্ধ করার আদেশ দেব।' সরকারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তারা এই ধরনের মামলা (যার অনেক অভিযোগই জামিন অযোগ্য) চালানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করে কি-না। সরকার মামলায় সম্মতি দিয়েছে। আইটি ও এইচআরডিমন্ত্রী কপিল সিবাল সামাজিক মাধ্যমের 'আপত্তিকর' উপাদানের উলেল্গখ করে ভারতের সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ উপাদান সরিয়ে ফেলার ঘোষণা দেওয়ার মাসখানেক পর এমন ঘটনা ঘটল।
ওয়েবের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার অভাবেই সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কে সাম্প্রতিক আলোচনার উদ্ভব ঘটেছে। পেশাদার সংবাদপত্র ও সম্প্রচার মাধ্যমের মতো নয়, বরং গুগল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি পোস্ট অফিসের মতো মধ্যবর্তী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তারা সরল অর্থে কোটি মানুষের জন্য এমন একটি পল্গাটফর্ম তৈরি করে যেখানে লোকেরা পরস্পরের মধ্যে কথা বলতে পারে। সামাজিক মাধ্যম সরলার্থে আমাদের ধ্যান-ধারণার প্রকাশ ঘটায়, এর মাধ্যমে যেমন ঘৃণার বাক্য ও পর্নো এবং ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানো সম্ভব তেমনি উদ্দীপনামূলক কথা ও শুভেচ্ছাবাণীও বিনিময় করা যায়। ব্যবহারকারীরা যদি কোনো উপাদানকে সমস্যাজনক মনে করে অভিযোগ দাখিল না করেন তবে নিজে থেকে সাইটগুলো সব কথোপকথন মডারেশন করতে পারে না_ অপরাধীকে শনাক্ত করে শাস্তিও দিতে পারে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, যুগপৎভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আপত্তিকর উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করা যায় না_ এ বিষয়ে সল বেলোর সেই উক্তিটি স্মরণীয়, যেখানে তিনি বলেছেন, 'দমননীতির চূড়ান্ত বা যথাযথ অবস্থা বলে কিছু নেই_ কেউ যদি কানকে দমন করতে যায় তবে আবশ্যিকভাবে মাথাটিও দমিত হবে।'
এটা সত্য যে, অনলাইন বা অফলাইন যেখানেই ঘটুক_ সহিংসতার উস্কানি বা অপরাধে মদদের ঘটনা ঘটলে এর আইনি পরিণতি থাকে। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় যে, আমাদের স্বাধীন আদালত এবং গণতান্ত্রিক সরকার এ বিষয়ে চীনের সমকক্ষ হওয়াকে গর্বের বিষয় মনে করে। চীন সরকার আইএসপি ও কনটেন্ট প্রোভাইডারদের অনলাইন উপাদান তদারক করতে বাধ্য করেছে, 'সাইবার ভিন্নমতাবলম্বীদের' কারারুদ্ধ করেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের এই বার্তা দিয়েছে যে, তারা তদারকি ও শাস্তির আওতায় আছে। তারপরও তাদের প্রক্সি সার্ভার, বিকল্প পদ্ধতি ও একই ধরনের চীনা ওয়েবসাইটগুলোর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। ওয়েবে সেন্সর আরোপের যে প্রযুক্তিগত বাধা আছে তার বাইরেও ভারত অপরিহার্যভাবে পরিপকস্ফ গণতন্ত্রের অধিকারী। ভারতের উচিত ওয়েব নিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের অভিপ্রায় প্রত্যাখ্যান করা, কেননা ভারত চীন নয়।

Sunday, January 15, 2012

চীন হওয়ার সহজ উপায়

ভারতের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী কপিল সিবাল গত মাসে ফেসবুক ও গুগল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে রীতিমতো বিপদে পড়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যবহারকারীরা তো বটেই, গণতান্ত্রিক ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও রীতিমতো তোপ দেগেছে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন পত্রিকা সম্পাদকীয় প্রকাশ করে মন্ত্রীর সমালোচনা করেছিল। এ সম্পাদকীয়গুলোর মধ্যে একটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তারা বলেছিল, ভারতের মধ্যে চীন হওয়ার বাসনা কাজ করছে। চীন ও ভারতকে আগামী বিশ্বের বড় দুই অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীনের প্রবৃদ্ধি, বাজার ও উন্নয়নের গতি ভারতকে নিত্যই তাড়া করে ফেরে। ভারতের সরকার, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সবসময় চীনকে চোখে চোখে রাখেন। ফলে ভারতে বহু উচ্চারিত শব্দ চীন, হয়তো চীনেও ভারত বেশ আলোচিত প্রসঙ্গ। ভারত যে অর্থনৈতিক নিরিখে চীন হওয়ার বাসনা পোষণ করে সেটি অনেকের গ্রহণযোগ্য বিষয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারত যদি গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে চীনের মতো দমননীতি অবলম্বন করে তবে প্রথমত তা পরিহাসের বিষয়, পরে উদ্বেগের বিষয়ও হয়ে উঠতে পারে। একদলীয় অর্থাৎ কমিউনিস্ট শাসনের আদর্শে দীক্ষিত চীনে স্বাধীন গণমাধ্যম নেই, জনগণের মতপ্রকাশের অধিকারও নেই। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আছে বটে কিন্তু ফেসবুক, গুগল সেখানে নিষিদ্ধ। চীনের নাগরিকরা ইচ্ছা করলেই কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে বা মত জানাতে পারেন না। কিন্তু ভারতে উল্টো পরিস্থিতি। বহু বছরের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের কারণে ভারতে শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে উঠেছে। জনমতের শক্তিও সেখানে ব্যাপক। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশটির নাগরিকরা নিজেদের মত ব্যক্ত করছেন, সংগঠিত হচ্ছেন। এই ভারতে যদি কোনো অজুহাতে কেউ গুগল-ফেসবুক নিষিদ্ধ করার দাবি জানায় তবে তাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। হয়েছেও তাই। মন্ত্রীর উক্তির পর কেউ কেউ বলেই ফেলেছেন, ভারত কি জনমত রূদ্ধ করে চীনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে? যদি তাই হয় তবে চীন হওয়ার দরকার আমাদের নেই। এই চীন হয়ে আমরা কী করব? যদি নাগরিকদের স্বাধীনতাই না থাকে তবে অর্থনীতি দিয়ে কী হবে? তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, ইন্টারনেটের ওপর কড়াকাড়ি আরোপই কি চীনের উন্নয়নের মন্ত্র? যাই হোক, কপিল সিবালের মন্তব্যের পর অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়ে গেছে। কিন্তু সরকার দমেনি। তারা গুগল ও ফেসবুকের কর্তাদের ডেকেছেন। ডেকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য সরানোর উপায় নিয়ে চীনা স্টাইলে চাপ দিয়েছেন। গুগল, ফেসবুকের বড় বাণিজ্যিক স্বার্থ আছে ভারতে। তারাও সরকারের ডাকে সাড়া দিয়েছে। ফেসবুক ও গুগল হরহামেশা বিভিন্ন সরকারের আহ্বানে কনটেন্ট সরায় বা লুকিয়ে ফেলে। ভারত সরকার তাদের সাম্প্রদায়িক উস্কানি বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান সরিয়ে ফেলার অনুরোধ জানাতে পারে। যদি জানায় তবে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গুগল বলে, বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের কাছে সরকারবিরোধী উপাদান সরানোর আহ্বান জানায় এবং তারা সেগুলো সরায়। অনুরোধের দলে ভারত অন্যতম দেশ। ফেসবুকও অনুরোধে ঢেঁকি গেলে। যদি তাই হয়, তবে আর এ সাইটগুলো বন্ধ করার হুমকি উঠবে কেন? মাথায় ব্যথা হলে ব্যথার ওষুধ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মাথা কাটা হবে কেন? ভারতের একটি আদালত সম্প্রতি ফেসবুক ও গুগলের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আপনাদের অবশ্যই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। নইলে আমরা চীনের মতো এ ধরনের সাইট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবো। আপত্তিকর উপাদান থাকলে তা সরানোর নির্দেশ আসতেই পারে। একেবারে নিরাময় অযোগ্য ব্যাধি হলে সাইটও বন্ধ করে দেওয়ার উদাহরণ আছে। তাই বলে চীনের মতো? ভারত চীনের মতো হতে চাইলে তাতে দুঃখের যথেষ্ট কারণ আছে। কথায় আছে, পুঁজিবাদে পেঁৗছানোর সবচেয়ে দীর্ঘতম পথের নাম সমাজতন্ত্র। আর সমাজতন্ত্রে পেঁৗছানোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হলো মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করা। লোকে ভেবেছিল, ভারতের নব উত্থানে তাদের যাত্রা হবে গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো। সে আশায় বুঝি এবার বালি পড়ল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে চীন যাত্রা শুরু হলো তার।

Thursday, January 12, 2012

ইউক্যালিপটাস

ইউক্যালিপটাস বৃক্ষ দেখতে মনোহর। আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকা এমন বৃক্ষ দেশীয় জাতের মধ্যে দুর্লভ। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষের মধ্যে একমাত্র গগন শিরিষের সঙ্গেই এর তুলনা চলে। ইউক্যালিপটাস গাছ বাড়ে দ্রুত। ইউক্যালিপটাস শোভিত অঙ্গনের সৌন্দর্যও অন্যরকম। অনেক সময় আশপাশের কোনো এলাকায় মনোহর সৌন্দর্য দেখে আমরা আপন মনে বলে উঠি, ছবির মতো সুন্দর। অথবা এমন দৃশ্য শুধু বিদেশেই দেখতে পাওয়া যায়। যেন সুন্দর হতে হলে কোনো দৃশ্যকে ছবিতে স্থান পেতে হবে কিংবা বিদেশি হতে হবে। ইউক্যালিপটাস শোভিত অঙ্গনগুলো এমন ছবির মতো কিংবা বিদেশি দৃশ্যের মতো হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য দেখতে সুন্দর হলেও কাজে খাটো নয়। কাঠ যথেষ্ট ভালো, ইলেকট্রিক খুঁটি তৈরিতে নাকি ইউক্যালিপটাসের জুড়ি নেই। অল্প সময়ে কেজো কাঠের উৎপাদন করতে হলে ইউক্যালিপটাস যথার্থ নির্বাচন। এত ভালো একটা গাছ হলেও ইউক্যালিপটাসের মধ্যে অহিতকর উপাদানও কম নয়। ইউক্যালিপটাস নিজে বাড়ে সত্য, কিন্তু বাড়তে গিয়ে সে অন্য গাছের জীবনীশক্তি শোষণ করে। আশপাশের বৃক্ষরাজিকে বাড়তে দেয় না। এ গাছে পাখি বাসা বানাতে পারে না। ফলে বাগানের মধ্যে এ গাছ নিতান্তই অনাহূত বলে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বিদেশ থেকে আমদানি করে লাখ লাখ ইউক্যালিপটাস গাছ আমাদের দেশে লাগানো হয়েছে। শুধু ইউক্যালিপটাস নয়, অ্যাকাশিয়া এমনকি যে চেরি গাছের ফলন এ দেশে হতেই চায় না, সে চেরিও শত শত লাগানো হয়েছে। অনেকে বলেন, এটা পরজীবিতার লক্ষণ। বিদেশের অনেক শহরে ইউক্যালিপটাস, অ্যাকাশিয়া-শোভিত রাস্তা আছে। ফলে কেউ কেউ নাকি চেয়েছিলেন আমাদের রাস্তাগুলোর পাশে বিদেশি গাছ থাকুক। শুধু রাস্তায় নয়_ প্রাঙ্গণে, চত্বরে, মাঠেও বিদেশি গাছের বনায়ন হয়েছে। নিশ্চয় এটি অপরিপকস্ফতা ও অপরিকল্পনার ফল। আমাদের দেশীয় হাজার জাতের গাছ আছে। এসব গাছ ফল দেয়, ফুল দেয়, ছায়া দেয়, কাঠও দেয়। খুঁজলে লম্বা-উঁচু এবং সুদর্শন গাছও মিলতে পারে। কিন্তু দেশি গাছ বিসর্জন দিয়ে আমরা বিদেশি গাছ দিয়ে বনায়ন করেছি। প্রকৃতিতে তার কুফলও ফলেছে যথেষ্ট। কিন্তু শোধরাতে গিয়ে দেরি হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা, মূলত ইউক্যালিপটাস অ্যাকাশিয়া নিধন করে দেশি গাছ লাগানোর পক্ষে মত দিলেও কোনো এক অজানা কারণে এখনও দেশজুড়ে এসব ক্ষতিকর গাছের রাজত্ব। অবশ্য ধীরে ধীরে কিছু অগ্রগতি হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি সংসদ ভবন এলাকায় ৪৭২টি ইউক্যালিপটাস গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গাছ কাটার এমন সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। আরও আশার কথা যে, এসব গাছ কেটে ফলদ গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ দৃষ্টান্ত সংসদ কর্তৃপক্ষের বাইরে অন্যরা অনুসরণ করলে শুভ ফল মিলবে। আমাদের দেশে রাস্তার পাশে কিংবা পাবলিক প্লেসে নিষ্ফলা বৃক্ষ লাগানোর পক্ষে যুক্তিগুলো খুব অদ্ভুত। বলা হয়ে থাকে, ফলদ বৃক্ষ লাগালে সে ফল লোকে খেয়ে ফেলবে, তাই নিষ্ফলা বৃক্ষ লাগানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফল লোকে খেয়ে ফেললে অসুবিধাটা কোথায়? লোকে খেয়ে পুষ্টি পাবে। লোকে যদি নাও খায় তবে পাখি খাবে। এ রকম এক স্বার্থবাদী সংকীর্ণ চিন্তা কার মাথায় এসেছিল কে জানে। কিন্তু সে চিন্তা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন এজমালি জায়গায় ফলদ গাছ দেখাই যায় না। এখন সংসদের সিদ্ধান্তের পর অন্যরাও ইউক্যালিপটাস কেটে ফলদ গাছ লাগালে সেটি ধীরে ধীরে ভালো ফল দিতে পারে।

Friday, December 30, 2011

সংলাপ

হাওয়া কোনদিকে তা বোঝা বড় ভার। দেশে আবহাওয়া অফিস আছে। তারা সারাক্ষণই হাওয়ার গতিবিধি খেয়ালে রাখে। কখন ঝড় হবে, কখন বৃষ্টি হবে, কখন শৈত্যপ্রবাহ হবে তার খবর রাখে। খবর রাখলেও সবসময় যে সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে_ তা নয়। কেননা, খবর রাখাটাই জরুরি নয়, খবর নিয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যদ্বাণীটিই জরুরি। আমাদের দেশে অবশ্য আবহাওয়া অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকার রেওয়াজ নেই। কেউ আবহাওয়া অফিসের সংকেত মেনে ছাতা নিয়ে বেরিয়েছেন ঘর ছেড়ে_ এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে না। কিন্তু পাশ্চাত্যে লোকে রেডিও, টিভি, ইন্টারনেটে আবহাওয়ার সংবাদ শুনে, দেখে, পরে ঘর থেকে বের হন। সবসময় মিলতে হবে তা নয়, কিন্তু কিছুটা মিললেও প্রস্তুতির সার্থকতা মেলে। খবর যা মেলে তাতে বোঝা যায়, পাশ্চাত্যের লোকেরা আবহাওয়ার সংবাদে খুশি। আমাদের অবশ্য তত খুশির অবকাশ নেই। পাশ্চাত্যের আবহাওয়া দফতরগুলো মারফত খবর মিললে তা আমাদের আবহাওয়ায় ফলে বটে। কিন্তু দেশীয় আবহাওয়া দফতরের খবরে ভরসা অনেকেরই নেই। আবহাওয়া দফতরগুলোর তরফেও ভরসা আনার উদ্যোগ নেই। খুব চাপাচাপি করলে তারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির অভাবের কথা জানিয়ে দেয়। সত্যিই তো, আগামীকাল কী ঘটবে তা জানার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কি আমাদের আছে? আবহাওয়ায় যেমন, তেমনি রাজনীতিতেও_ আগামীকাল কী ঘটবে তা জানার উপায় নেই।
এখন রাজনীতিতে চলছে শীতকাল, সংলাপের মৌসুম। শীতের শুরুতে অবশ্য মনে হয়েছিল আবহাওয়া শীতল থাকলেও রাজনীতি গরম থাকবে। বিরোধী দল একটু গরম কর্মসূচি নিয়েছিল; সরকারও গরম হয়েছে। ভাংচুর-অগি্নসংযোগ, ধরপাকড় সব ঘটবার পর একেবারে সব নিশ্চুপ। কোনো কোনো তরফে বলা হচ্ছে; না, এখনও সময় আসেনি। কেউ বলছেন, ধ্বংসের পথ নয়, সৃষ্টির পথে থাকুন। এসব কথায় কাজ হচ্ছে। বিরোধী দল ঠাণ্ডা হয়েছে। কতটা ঠাণ্ডা হয়েছে তা আবহাওয়া অফিস বলতে পারবে। কিন্তু কিছুটা ঠাণ্ডা যে হয়েছে তা নিশ্চিত। রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে তারা যেতে রাজি হয়েছে। বলেছে, আন্দোলনের অংশ হিসেবেই যাচ্ছে আলোচনায়। দাবি জানানোই মূল উদ্দেশ্য। মুখে যাই বলুক, যাচ্ছে_ সেটাই বড় কথা। রাষ্ট্রপতি ডাকলে যাওয়াটাই শ্রেয়। এর মধ্যে অবাক করার আরেক কথা শোনা গেল। পরিবেশ পেলে বিরোধীরা নাকি সংসদেও যাবেন। বেশ! সহসা কি রাজনীতির হাওয়া উল্টে গেল তাহলে? কোথায় লোকে ভেবেছিল, বিরোধীরা মাঠ গরম করবে; উল্টো সংসদ-সংলাপ শুরু হলো? রাজনীতির হাওয়া বদলের এসব চিহ্ন দেখে কিছু বোঝা যায়? শীত ঋতুতে বৃষ্টি হবে, নাকি শৈত্যপ্রবাহ, তাও কি বলা সম্ভব? যাই হোক, সংলাপ চলছে। বিষয় নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন। একে একে সবাই যাচ্ছেন। কেউ বলছেন, আইন করুন। আইন করে নিয়োগ দিন। কেউ বলছেন, এখনকার নিয়মেই চলুক। কেউ বলছেন, এই কমিশনই থাকুক। কেউ বলছেন, নতুন লোক আনুন। কেউ বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছাড়া হবে না। কেউ বলছেন, ওটি ছাড়াই কাজ সারুন। সবার কথাই শোনা হচ্ছে, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না_ শেষে কী হবে? নানা মুনির নানা মত উজিয়ে সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবু তো সংলাপ হচ্ছে। দু'বছর বাদে নির্বাচন। সময় তো চোখের পলকে চলে যায়। দেখতে দেখতে দু'বছর কেটে যাবে। তার চেয়ে বড় কথা, এখনই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ না দিলে চলবে না। নির্বাচন কমিশন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই দুই নিয়েই তো চিন্তা। দেশে তো আর কোনো বিষয় নেই। থাকলেও রাজনীতিকদের সেসব নিয়ে ভাবতে নেই। কথা বলতেও নেই। টম অ্যান্ড জেরির মতো তারা পঞ্চবার্ষিক তত্ত্বাবধায়ক খেলা খেলে যাবেন। আন্দোলন করবেন, মারপিট করবেন, ধরপাকড় করবেন, সংলাপ করবেন। সংসদ ছেড়ে রাজপথ, রাজপথ ছেড়ে সংসদ_ এই নিয়ে কাটিয়ে দেবেন। বেশ তো! রাজনীতি এখন অনেক ভালো। হরতাল কম, জ্বালাও-পোড়াও কম। ষড়যন্ত্র অল্প। এতেই নাগরিকদের স্বস্তি পাওয়া উচিত। নাগরিকদের সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় কারও কি আছে? না থাকুক। তবু রাজনীতি ভালো থাকুক। ভালো নির্বাচন কমিশন হোক, নির্বাচন নিয়ে ভালো ব্যবস্থা হোক। নাকি শেষে দেখা যাবে, এসব কিছুই হচ্ছে না। ফাইনাল খেলা রাজপথেই হচ্ছে! সে আমরা চাই না। আমরা চাই, রাজনীতিকরা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সংলাপ করে একটা সমাধান করুন। রাজনীতিকরা সুখে থাকলে দেশের মানুষও সুখে থাকবে নিশ্চিত।

Friday, December 23, 2011

তেল ও জলের দর

দুধ বেচে মদ খাওয়ার কথা আমাদের লোকপ্রবাদে আছে। মূল্যজ্ঞান লোপ হয়েছে এমন ব্যক্তির পরিস্থিতি বর্ণনা করতে দুধ বেচে মদ খাওয়ার উদাহরণ দেওয়া হয়। আমাদের সামাজিক ধারণায় মদ্যপান অহিতকর, পরিত্যাজ্য। পুষ্টির জন্য দুগ্ধপান উৎসাহিত করা হয়। ফলে বাজারে মদ যে দামেই বিক্রি হোক, কেউ যদি দুধ বেচে মদ খায় তবে তার মূল্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে বলে ধরা হয়। দুধ বেচে যে মদ খায় সে নিশ্চিত উচ্ছন্নে গিয়েছে। অবশ্য ভ্রমণপিপাসু লোকদের কাছে শুনেছি, কোনো কোনো দেশে নাকি পানি, ওয়াইন আর দুধের মূল্য এক। কোথাও কোথাও নাকি একগ্গ্নাস পানির দর এক পেগ হুইস্কির চাইতে বেশি। বাজারে কোন জিনিসের দাম বেশি হবে তা ওই জিনিসের প্রাপ্যতা ও উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করে। যেখানে মদের চাইতে পানির দাম বেশি সেখানে পানি উৎপাদনের খরচও নিশ্চয় বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে এটি জানবার মতো খবর বটে। কেননা মদ এখানে দুর্মূল্য। অন্যদিকে সস্তায় কোনো জিনিস বিক্রি হলে আমরা বলি_ পানির দরে বিক্রি হচ্ছে, বোঝা যায় পানির দাম কত কম। অবশ্য ক্রমশ পানির দাম বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে পানির দাম, দুধের দাম, মদের দাম কখনও এক হবে বলে মনে হয় না। কেননা, বাজারই শুধু মূল্য নির্ধারণ করে না। সমাজও মূল্য তৈরি করে, এমনকি মূল্যবোধও তৈরি করে। আমরা কথায় কথায় বলি, অমুক আর অমুক এক পঙ্ক্তিতে বসতে পারে না। পঙ্ক্তি মানে কবিতার লাইন নয়, বসার লাইন। খাবার আসরে একই মর্যাদার মানুষের একই পাতে বা লাইনে বসার রেওয়াজ। অসম মর্যাদার ব্যক্তিরা একই পঙ্ক্তিতে বসলে তাতে মূল্যের হানি ঘটে বলে সামাজিক ধারণা। অনেক সময় বলা হয়, অমুক ও অমুককে একই পাল্লায় মেপো না। পাল্লাও এখানে মর্যাদারই স্মারক। যে পাল্লায় চাল মাপা হয়, একই পাল্লায় মিষ্টি মাপার রেওয়াজ নেই। একইভাবে বলা হয়, তেল ও জলের দাম এক করো না। সমাজের মূল্যবোধ বদলের সঙ্গে বহু পরিবর্তন ঘটেছে। এখন এক পঙ্ক্তিতে বসার ক্ষেত্রে মর্যাদার প্রশ্ন ওঠে না। আকবর বাদশাহ আর হরিপদ কেরানীকে এক পাল্লায় মাপলে কেউ সমালোচনার তর্জনী বাড়িয়ে দেন না। জলজ পানীয়গুলোর সমমূল্য কোনো দেশে থাকলে তা বিস্ময়কর হলেও, অগ্রহণযোগ্য খবর নয়। কিন্তু তেল ও জলের দাম এক হওয়া কঠিন। মাঝে মধ্যে দেশে অভিনব কিছু খবর মেলে, তাতে তেলের বদলে পানি, কচুরিপানা, খড় দিয়ে গাড়ি চালনার মতো বিস্ময়কর আবিষ্কারের কথা বলা হয়। এত আবিষ্কারের পরও তেলের মূল্য আর পানির মূল্য এক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বোঝা যায়, তেল ও পানির ক্ষেত্রে বাজার ও সমাজের মূল্যবোধ এখনও অটুট। ভবিষ্যতে বহুদিন তা থাকবে। তবে সম্প্রতি ভারত সরকার তেল ও জলের মূল্য এক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে। তারা পেট্রোলের দাম খুব বেশি কমায়নি, আপাতত রাজনৈতিক কৌশলের কারণে স্থিতিশীল রেখেছে। কিন্তু ভারত-রত্ন পুরস্কারকে গণচরিত্র দিয়েছে। ভারতের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবটি এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের রথী-মহারথীদের বাইরের লোকদের মধ্যেও বিতরণ করা হবে। ক্রিকেটার ও চলচ্চিত্র অভিনেতারাও পুরস্কৃত হবেন। এ নিয়ে ভারতের পত্রপত্রিকায় শোর উঠেছে। নাগরিক সমাজও সোচ্চার হয়েছে। তারা বলছেন, ক্রিকেট জনপ্রিয়, বলিউডের ফিল্মও জনপ্রিয়। কিন্তু বিদ্যা-জ্ঞান ও সামাজিক-রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এগুলোর অবদান কী? শচীন টেন্ডুলকার কি সিভি রমণ রাধাকৃষ্ণনের মতো পণ্ডিতদের পঙ্ক্তিতে বসতে পারেন? ভারতীয় প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মার্কন্ডেয় কাটজু বলেছেন, তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মির্জা গালিবকে ভারত-রত্ন দেওয়ার কথা বলে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এখন ফিল্মস্টার আর ক্রিকেট স্টারদের পুরস্কার দেওয়ার কথা হচ্ছে। এটা করা হলে তার কোনো সামাজিক গুরুত্ব থাকবে না, এটা হবে স্রেফ একটা পরিহাস। ক্রিকেটারদের দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে ভারতীয় পত্রিকাগুলো যেভাবে কথা বলছে ভারত-রত্নের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তা প্রশংসনীয় বটে। জনপ্রিয়তাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয় তবে তো সমাজে কোনো দণ্ডই স্থির থাকতে পারে না। ফলে তেল ও জলের দাম কখনও এক হওয়া উচিত নয়। জলের কাছে তেলের কাজ আশা করাও ভুল কিংবা তেলের কাছে জলের কাজ। ভারতের সৌভাগ্য যে, সে দেশে তেল ও জল সকলে চেনে। আমাদের দেশে সমাজের জ্ঞানী-বিদ্বানদের চিহ্নিত করার ব্যবস্থাই নেই। ফলে এসব কথা আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয় বলেই মনে হয়।

Sunday, December 11, 2011

পৃথিবীর সীমাহীন নিঃসঙ্গতা ও কেপলার-২২বি

আমাদের কবি একদা লিখেছিলেন, 'বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।' পৃথিবীকে সত্যিই কতটুকু জানা হয়েছে মানুষের? দেশে দেশে কত নগর, কত রাজধানী অলক্ষ্যে পড়ে রয়েছে। অনাস্বাদিত, অশ্রুত ও অদৃষ্ট সেসব নগর-বন্দর-রাজধানীকে জানার নিরন্তর প্রক্রিয়া চলছে। আজ অনেকেই বলেন, হাতের মুঠোয় এসে গেছে পৃথিবী। ধারণাগত দিক থেকে হাতের মুঠোয় এলেও বাস্তবে কিন্তু পৃথিবীতে জানা ও বোঝার জন্য জ্ঞান এবং তথ্য আহরণের প্রচেষ্টা চলছে নিরন্তর। শুধু পৃথিবী নয়, জানার প্রক্রিয়া পৃথিবীর বাইরে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। পৃথিবীকে যদি কবির ভাষায় বলতে হয় বিপুলা, তবে পৃথিবীর বাইরের পুরো বিশ্বজগৎকে বলতে হবে মহা মহা বিপুলা। কত নক্ষত্র, কত গ্রহ, কত ছায়াপথ সেখানে। আমাদের আরেক কবি লিখেছিলেন, "মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া,/উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর।" বিশ্ববিধাতৃর বিস্ময় উৎপাদনের মতো পদক্ষেপ এখন মানুষের আয়ত্তে আসেনি। মানুষের পদধূলি সৌর জগতের বাইরে এখনও পড়েনি। কিন্তু দূরবীক্ষণের সাহচর্য নিয়ে মানুষের চোখ চলে গেছে অনেক দূর কোটি আলোকবর্ষেরও ওপারে। মহাবিশ্বজুড়ে মানুষ খুঁজে চলেছে অনেক কিছু। দেখে চলেছে যা দেখা যায়। কিন্তু অনুসন্ধানী মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন শুরুতে যা ছিল এখনও তা-ই। মহাবিশ্বে কি পৃথিবী একটাই, বুদ্ধিমান প্রাণী বলতে কি মানুষই একমাত্র? এ প্রশ্নে পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ নয় শুধু, পৃথিবী হলো উপযুক্ত তাপ, চাপ, জলবায়ুর সমন্বয়ে গঠিত প্রাণধারণ উপযোগী গ্রহ। পৃথিবীতে বসে আরেক পৃথিবীকে খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাণের সামান্যতম সম্ভাবনা কোথাও দেখা দিলে সমস্বরে ঘোষণা করছেন, হ্যাঁ মঙ্গলে মিললেও মিলতে পারে প্রাণ। বা অন্য কোথাও_ অন্য কোনোখানে। কিন্তু মানুষের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে পারে এমন তথ্য এখনও মেলেনি। সবার বিশ্বাস উৎপাদন করতে পারে এমন কথা এখনও কেউ বলেনি। তবু এবার আশা একটু বেশি। নাসার বিজ্ঞানীরা এবার একটু ভেবেচিন্তে, অপেক্ষা করে ঘোষণা দিলেন। বললেন, আছে আরেক পৃথিবী। আমাদের পৃথিবীর বোন। তার নাম কেপলার-বি২২। আমাদের গ্রহ থেকে দুই কোটি বিশ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। অনেক দূরের সেই গ্রহ আমাদের পৃথিবীর মতোই আরেক সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সেখানেও দিন হচ্ছে, রাত হচ্ছে। তবে সেখানে কি প্রাণ আছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর মতো অনুকূল তাপ আছে সেখানে। যুক্তি মোতাবেক, প্রাণ থাকার কথা। প্রাণ যদি থাকে তবে বিবর্তনের পথ ধরে সে প্রাণ কি মানুষের মতো বুদ্ধি সঞ্চয় করেছে? এখনও কেউ জানে না। তবে নাসার বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তবে কি মানুষের সীমাহীন নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে যাচ্ছে কেপলার-বি২২? হয়তো। আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ যদি জানতে পারে যে সেখানে প্রাণ আছে; তবে পৃথিবীর সন্তানদের সঙ্গে কেপলার বি২২-এর সন্তানদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? ধরা যাক, সেখানে সভ্যতার পর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীরা এখন উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করছে। নয়তো, তারা আছে আদিম কোনো অবস্থানে। বিকশিত হতে হতে একদিন উন্নতির শীর্ষে উঠবে। আবিষ্কার করবে প্রযুক্তি। দূরবীক্ষণে তাকিয়ে দেখবে আকাশ, নক্ষত্রলোক। আমাদের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হবে। ভাববে, এখানে আছে প্রাণের সম্ভাবনা। মহাবিশ্বে তারা আর একা নয়। কিন্তু তারা কি আরেক গ্রহের প্রাণের সন্ধানে যাত্রা করবে? দুই কোটি ২০ লাখ বছর পর এসে পেঁৗছাবে? অথবা আমাদের পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানীরা কি রওনা হবেন সুদূর ভবিষ্যতের কোনো একদিন সেই পৃথিবীর উদ্দেশে? প্রযুক্তি এখনও সে শক্তি অর্জন করেনি। আপাতত তাই কবির কথা দিয়ে শেষ করি, 'আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি/সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ।' বিশ্বজগতে পৃথিবীর মতোই আরেক গ্রহ আছে, আপাতত এই আমাদের সুখের খবর।

Thursday, December 1, 2011

নতুন ঢাকা, পুরান ঢাকা

ঢাকার অধিবাসীদের কাছে শহরটি বহুদিন ধরেই দুই ভাগে বিভক্ত। সিটি করপোরেশন ভাগ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে এই সাধারণ তথ্যটির দিকে কারও মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি বলেই মনে হয়। তীব্র রাজনৈতিক তর্কের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ তথ্যটিও অনেক সময় সবার অলক্ষ্যে থেকে যায়। সেটা স্বাভাবিকও। ঢাকার অধিবাসীদের কাছে শহরের পুরাতন অংশটি পুরান ঢাকা আর নতুন অংশটি নতুন ঢাকা বা ঢাকা বলে পরিচিত। একদা বুড়িগঙ্গার তীরে এ নগরীর পত্তন ঘটেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা মোটামুটিভাবে পুরাতন অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পর ঢাকা উত্তরে বিস্তৃত হয়েছে_ টঙ্গীর সীমান্ত উত্তরা পর্যন্ত। স্বাধীনতার পরের চার দশকে যে ঢাকা তৈরি হয়েছে তাকে সহজে চেনা যায়। পুরান ঢাকাকেও আলাদা করে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ২৯ নভেম্বর সংসদে বিল পাস হয়ে ঢাকা দু'ভাগ হলো। আর এ বিলে ঢাকা ভাগের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে ঢাকার ওই ধারণাগত বিভক্তিটাই সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল। ঢাকা দক্ষিণ মোটাদাগে স্বাধীনতার আগের শহুরে জনবসতি। আর ঢাকা উত্তর স্বাধীনতার পরের জনবসতি। বিভক্ত ঢাকার ম্যাপের দিকে তাকালে এ সত্যটি সহজেই সবার চোখে ধরা দেওয়ার কথা। আর যারা সচক্ষে প্রতিদিন এ শহরকে দেখেন তারা সহজেই এ দুই ঢাকার গুণগত পার্থক্যের কথা জানেন। এ কথা সত্য, পুরান ঢাকার উত্তরাংশে অর্থাৎ ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুরে কিছু উন্নয়ন ঘটলেও, এর অধিকাংশ এলাকাই অবহেলিত। ঠিক যেন মেট্রোপলিটন শহর হয়ে উঠতে পারেনি। এক রাইডে উত্তরার রাস্তা থেকে চলমান একটি গাড়ি ওয়ারির রাস্তায় এসে পড়লে সহজে বোঝা যেতে পারে গুণগত পার্থক্যটি। সরকার ঢাকাকে দু'ভাগ করে ফেলায় এখন বুঝতে সুবিধা হবে। শহরের দুই অংশে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের সমতা বিধানের জন্য যদি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা হয় তবে নিশ্চয়ই নাগরিকরা তাকে স্বাগত জানাবেন। দুটি সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পার্থক্যও বোঝা যাবে সহজে।
সবচেয়ে ভালো হতো যদি উত্তর-দক্ষিণ দিকনির্দেশ না করে পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকা নাম দেওয়া হতো। ভারতের রাজধানী দিলি্লর ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ আছে। তবে দিলি্ল বলতে যে পুরনো শহরের কথা আমরা জানি তা কিন্তু রাজধানী নয়। রাজধানী হলো নয়াদিলি্ল। দিলি্লর নতুন ও পুরাতনের সঙ্গে ঢাকার নতুন ও পুরাতনের বেশ মিল আছে। তবে দিলি্ল শুধু শহর নয়, শহরভিত্তিক একটি রাজ্যও। দিলি্লর পথ অনুসরণ করে ঢাকা নামটি শহরের পুরনো অংশকে দিয়ে নতুন অংশের আলাদা একটি নাম খোঁজা হলে আরও ভালো হতো। ঢাকার এই বিভক্তি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে এক ধরনের সংশয় কাজ করেছে আগাগোড়া। সত্যি কথা বলতে, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, রাজনৈতিক দল সবাই ঢাকা ভাগের বিপক্ষে। বলা যায়, সরকারি দলের গুটিকয় মানুষ ছাড়া প্রকাশ্যে কেউ ভাগ সমর্থন করেননি। তবু সংসদে বিল পাস হয়েছে। এখন দ্বিখণ্ডিত সিটি করপোরেশন নগরবাসীর জন্য বাস্তবতা। ঢাকা শুধু সিটি করপোরেশন নয়, বাংলাদেশের রাজধানীও। সিটি করপোরেশন দু'ভাগ হলেও রাজধানী নিশ্চয়ই দু'ভাগ হতে পারবে না। সঙ্গত কারণেই যে কোনো এক ভাগকে রাজধানী ঘোষণা করতে হবে, নয়তো বলতে হবে উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে পুরোটাই রাজধানী। অর্থাৎ শুধু সিটি করপোরেশনের সেবা দু'ভাগ হলো, রাজধানী নয়। তবে ঢাকা শহরের যে বাস্তবতা তাতে রাজধানীটিকে যে কোনো একটি অংশে ফেললেই ভালো হতো। যদিও পুরান ঢাকা রাজধানী নয় তবু রাজধানী ঐতিহ্যের কাছাকাছি থাকল। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সব ভবন পুরাতন অংশে স্থানান্তর করে ফেলা যেতে পারে। আবার নতুন ঢাকাতেও রাজধানী আসতে পারে, নতুন রূপ নিয়ে নতুন কোনো জায়গায় প্রশাসনিক ভবনগুলো স্থাপন করা যেতে পারে। শহরের দুই অংশের আলাদা চরিত্রও দাঁড় করানো যেতে পারে। এসব গঠনমূলক চিন্তা_ অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে। আমাদের রাজনীতি যেভাবে চলে সে ধারায় ঢাকা চললে, যে ঢাকা সেই ঢাকাই থাকবে। দুই কেন চার ভাগ করলেও কোনো পরিকল্পিত, আধুনিক ও উন্নত শহর অদূর ভবিষ্যতে আমরা পাব না।