Thursday, January 12, 2012

ইউক্যালিপটাস

ইউক্যালিপটাস বৃক্ষ দেখতে মনোহর। আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকা এমন বৃক্ষ দেশীয় জাতের মধ্যে দুর্লভ। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষের মধ্যে একমাত্র গগন শিরিষের সঙ্গেই এর তুলনা চলে। ইউক্যালিপটাস গাছ বাড়ে দ্রুত। ইউক্যালিপটাস শোভিত অঙ্গনের সৌন্দর্যও অন্যরকম। অনেক সময় আশপাশের কোনো এলাকায় মনোহর সৌন্দর্য দেখে আমরা আপন মনে বলে উঠি, ছবির মতো সুন্দর। অথবা এমন দৃশ্য শুধু বিদেশেই দেখতে পাওয়া যায়। যেন সুন্দর হতে হলে কোনো দৃশ্যকে ছবিতে স্থান পেতে হবে কিংবা বিদেশি হতে হবে। ইউক্যালিপটাস শোভিত অঙ্গনগুলো এমন ছবির মতো কিংবা বিদেশি দৃশ্যের মতো হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য দেখতে সুন্দর হলেও কাজে খাটো নয়। কাঠ যথেষ্ট ভালো, ইলেকট্রিক খুঁটি তৈরিতে নাকি ইউক্যালিপটাসের জুড়ি নেই। অল্প সময়ে কেজো কাঠের উৎপাদন করতে হলে ইউক্যালিপটাস যথার্থ নির্বাচন। এত ভালো একটা গাছ হলেও ইউক্যালিপটাসের মধ্যে অহিতকর উপাদানও কম নয়। ইউক্যালিপটাস নিজে বাড়ে সত্য, কিন্তু বাড়তে গিয়ে সে অন্য গাছের জীবনীশক্তি শোষণ করে। আশপাশের বৃক্ষরাজিকে বাড়তে দেয় না। এ গাছে পাখি বাসা বানাতে পারে না। ফলে বাগানের মধ্যে এ গাছ নিতান্তই অনাহূত বলে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বিদেশ থেকে আমদানি করে লাখ লাখ ইউক্যালিপটাস গাছ আমাদের দেশে লাগানো হয়েছে। শুধু ইউক্যালিপটাস নয়, অ্যাকাশিয়া এমনকি যে চেরি গাছের ফলন এ দেশে হতেই চায় না, সে চেরিও শত শত লাগানো হয়েছে। অনেকে বলেন, এটা পরজীবিতার লক্ষণ। বিদেশের অনেক শহরে ইউক্যালিপটাস, অ্যাকাশিয়া-শোভিত রাস্তা আছে। ফলে কেউ কেউ নাকি চেয়েছিলেন আমাদের রাস্তাগুলোর পাশে বিদেশি গাছ থাকুক। শুধু রাস্তায় নয়_ প্রাঙ্গণে, চত্বরে, মাঠেও বিদেশি গাছের বনায়ন হয়েছে। নিশ্চয় এটি অপরিপকস্ফতা ও অপরিকল্পনার ফল। আমাদের দেশীয় হাজার জাতের গাছ আছে। এসব গাছ ফল দেয়, ফুল দেয়, ছায়া দেয়, কাঠও দেয়। খুঁজলে লম্বা-উঁচু এবং সুদর্শন গাছও মিলতে পারে। কিন্তু দেশি গাছ বিসর্জন দিয়ে আমরা বিদেশি গাছ দিয়ে বনায়ন করেছি। প্রকৃতিতে তার কুফলও ফলেছে যথেষ্ট। কিন্তু শোধরাতে গিয়ে দেরি হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা, মূলত ইউক্যালিপটাস অ্যাকাশিয়া নিধন করে দেশি গাছ লাগানোর পক্ষে মত দিলেও কোনো এক অজানা কারণে এখনও দেশজুড়ে এসব ক্ষতিকর গাছের রাজত্ব। অবশ্য ধীরে ধীরে কিছু অগ্রগতি হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি সংসদ ভবন এলাকায় ৪৭২টি ইউক্যালিপটাস গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গাছ কাটার এমন সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। আরও আশার কথা যে, এসব গাছ কেটে ফলদ গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ দৃষ্টান্ত সংসদ কর্তৃপক্ষের বাইরে অন্যরা অনুসরণ করলে শুভ ফল মিলবে। আমাদের দেশে রাস্তার পাশে কিংবা পাবলিক প্লেসে নিষ্ফলা বৃক্ষ লাগানোর পক্ষে যুক্তিগুলো খুব অদ্ভুত। বলা হয়ে থাকে, ফলদ বৃক্ষ লাগালে সে ফল লোকে খেয়ে ফেলবে, তাই নিষ্ফলা বৃক্ষ লাগানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফল লোকে খেয়ে ফেললে অসুবিধাটা কোথায়? লোকে খেয়ে পুষ্টি পাবে। লোকে যদি নাও খায় তবে পাখি খাবে। এ রকম এক স্বার্থবাদী সংকীর্ণ চিন্তা কার মাথায় এসেছিল কে জানে। কিন্তু সে চিন্তা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন এজমালি জায়গায় ফলদ গাছ দেখাই যায় না। এখন সংসদের সিদ্ধান্তের পর অন্যরাও ইউক্যালিপটাস কেটে ফলদ গাছ লাগালে সেটি ধীরে ধীরে ভালো ফল দিতে পারে।

Friday, December 30, 2011

সংলাপ

হাওয়া কোনদিকে তা বোঝা বড় ভার। দেশে আবহাওয়া অফিস আছে। তারা সারাক্ষণই হাওয়ার গতিবিধি খেয়ালে রাখে। কখন ঝড় হবে, কখন বৃষ্টি হবে, কখন শৈত্যপ্রবাহ হবে তার খবর রাখে। খবর রাখলেও সবসময় যে সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে_ তা নয়। কেননা, খবর রাখাটাই জরুরি নয়, খবর নিয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যদ্বাণীটিই জরুরি। আমাদের দেশে অবশ্য আবহাওয়া অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকার রেওয়াজ নেই। কেউ আবহাওয়া অফিসের সংকেত মেনে ছাতা নিয়ে বেরিয়েছেন ঘর ছেড়ে_ এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে না। কিন্তু পাশ্চাত্যে লোকে রেডিও, টিভি, ইন্টারনেটে আবহাওয়ার সংবাদ শুনে, দেখে, পরে ঘর থেকে বের হন। সবসময় মিলতে হবে তা নয়, কিন্তু কিছুটা মিললেও প্রস্তুতির সার্থকতা মেলে। খবর যা মেলে তাতে বোঝা যায়, পাশ্চাত্যের লোকেরা আবহাওয়ার সংবাদে খুশি। আমাদের অবশ্য তত খুশির অবকাশ নেই। পাশ্চাত্যের আবহাওয়া দফতরগুলো মারফত খবর মিললে তা আমাদের আবহাওয়ায় ফলে বটে। কিন্তু দেশীয় আবহাওয়া দফতরের খবরে ভরসা অনেকেরই নেই। আবহাওয়া দফতরগুলোর তরফেও ভরসা আনার উদ্যোগ নেই। খুব চাপাচাপি করলে তারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির অভাবের কথা জানিয়ে দেয়। সত্যিই তো, আগামীকাল কী ঘটবে তা জানার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কি আমাদের আছে? আবহাওয়ায় যেমন, তেমনি রাজনীতিতেও_ আগামীকাল কী ঘটবে তা জানার উপায় নেই।
এখন রাজনীতিতে চলছে শীতকাল, সংলাপের মৌসুম। শীতের শুরুতে অবশ্য মনে হয়েছিল আবহাওয়া শীতল থাকলেও রাজনীতি গরম থাকবে। বিরোধী দল একটু গরম কর্মসূচি নিয়েছিল; সরকারও গরম হয়েছে। ভাংচুর-অগি্নসংযোগ, ধরপাকড় সব ঘটবার পর একেবারে সব নিশ্চুপ। কোনো কোনো তরফে বলা হচ্ছে; না, এখনও সময় আসেনি। কেউ বলছেন, ধ্বংসের পথ নয়, সৃষ্টির পথে থাকুন। এসব কথায় কাজ হচ্ছে। বিরোধী দল ঠাণ্ডা হয়েছে। কতটা ঠাণ্ডা হয়েছে তা আবহাওয়া অফিস বলতে পারবে। কিন্তু কিছুটা ঠাণ্ডা যে হয়েছে তা নিশ্চিত। রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে তারা যেতে রাজি হয়েছে। বলেছে, আন্দোলনের অংশ হিসেবেই যাচ্ছে আলোচনায়। দাবি জানানোই মূল উদ্দেশ্য। মুখে যাই বলুক, যাচ্ছে_ সেটাই বড় কথা। রাষ্ট্রপতি ডাকলে যাওয়াটাই শ্রেয়। এর মধ্যে অবাক করার আরেক কথা শোনা গেল। পরিবেশ পেলে বিরোধীরা নাকি সংসদেও যাবেন। বেশ! সহসা কি রাজনীতির হাওয়া উল্টে গেল তাহলে? কোথায় লোকে ভেবেছিল, বিরোধীরা মাঠ গরম করবে; উল্টো সংসদ-সংলাপ শুরু হলো? রাজনীতির হাওয়া বদলের এসব চিহ্ন দেখে কিছু বোঝা যায়? শীত ঋতুতে বৃষ্টি হবে, নাকি শৈত্যপ্রবাহ, তাও কি বলা সম্ভব? যাই হোক, সংলাপ চলছে। বিষয় নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন। একে একে সবাই যাচ্ছেন। কেউ বলছেন, আইন করুন। আইন করে নিয়োগ দিন। কেউ বলছেন, এখনকার নিয়মেই চলুক। কেউ বলছেন, এই কমিশনই থাকুক। কেউ বলছেন, নতুন লোক আনুন। কেউ বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছাড়া হবে না। কেউ বলছেন, ওটি ছাড়াই কাজ সারুন। সবার কথাই শোনা হচ্ছে, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না_ শেষে কী হবে? নানা মুনির নানা মত উজিয়ে সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবু তো সংলাপ হচ্ছে। দু'বছর বাদে নির্বাচন। সময় তো চোখের পলকে চলে যায়। দেখতে দেখতে দু'বছর কেটে যাবে। তার চেয়ে বড় কথা, এখনই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ না দিলে চলবে না। নির্বাচন কমিশন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই দুই নিয়েই তো চিন্তা। দেশে তো আর কোনো বিষয় নেই। থাকলেও রাজনীতিকদের সেসব নিয়ে ভাবতে নেই। কথা বলতেও নেই। টম অ্যান্ড জেরির মতো তারা পঞ্চবার্ষিক তত্ত্বাবধায়ক খেলা খেলে যাবেন। আন্দোলন করবেন, মারপিট করবেন, ধরপাকড় করবেন, সংলাপ করবেন। সংসদ ছেড়ে রাজপথ, রাজপথ ছেড়ে সংসদ_ এই নিয়ে কাটিয়ে দেবেন। বেশ তো! রাজনীতি এখন অনেক ভালো। হরতাল কম, জ্বালাও-পোড়াও কম। ষড়যন্ত্র অল্প। এতেই নাগরিকদের স্বস্তি পাওয়া উচিত। নাগরিকদের সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় কারও কি আছে? না থাকুক। তবু রাজনীতি ভালো থাকুক। ভালো নির্বাচন কমিশন হোক, নির্বাচন নিয়ে ভালো ব্যবস্থা হোক। নাকি শেষে দেখা যাবে, এসব কিছুই হচ্ছে না। ফাইনাল খেলা রাজপথেই হচ্ছে! সে আমরা চাই না। আমরা চাই, রাজনীতিকরা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সংলাপ করে একটা সমাধান করুন। রাজনীতিকরা সুখে থাকলে দেশের মানুষও সুখে থাকবে নিশ্চিত।

Friday, December 23, 2011

তেল ও জলের দর

দুধ বেচে মদ খাওয়ার কথা আমাদের লোকপ্রবাদে আছে। মূল্যজ্ঞান লোপ হয়েছে এমন ব্যক্তির পরিস্থিতি বর্ণনা করতে দুধ বেচে মদ খাওয়ার উদাহরণ দেওয়া হয়। আমাদের সামাজিক ধারণায় মদ্যপান অহিতকর, পরিত্যাজ্য। পুষ্টির জন্য দুগ্ধপান উৎসাহিত করা হয়। ফলে বাজারে মদ যে দামেই বিক্রি হোক, কেউ যদি দুধ বেচে মদ খায় তবে তার মূল্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে বলে ধরা হয়। দুধ বেচে যে মদ খায় সে নিশ্চিত উচ্ছন্নে গিয়েছে। অবশ্য ভ্রমণপিপাসু লোকদের কাছে শুনেছি, কোনো কোনো দেশে নাকি পানি, ওয়াইন আর দুধের মূল্য এক। কোথাও কোথাও নাকি একগ্গ্নাস পানির দর এক পেগ হুইস্কির চাইতে বেশি। বাজারে কোন জিনিসের দাম বেশি হবে তা ওই জিনিসের প্রাপ্যতা ও উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করে। যেখানে মদের চাইতে পানির দাম বেশি সেখানে পানি উৎপাদনের খরচও নিশ্চয় বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে এটি জানবার মতো খবর বটে। কেননা মদ এখানে দুর্মূল্য। অন্যদিকে সস্তায় কোনো জিনিস বিক্রি হলে আমরা বলি_ পানির দরে বিক্রি হচ্ছে, বোঝা যায় পানির দাম কত কম। অবশ্য ক্রমশ পানির দাম বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে পানির দাম, দুধের দাম, মদের দাম কখনও এক হবে বলে মনে হয় না। কেননা, বাজারই শুধু মূল্য নির্ধারণ করে না। সমাজও মূল্য তৈরি করে, এমনকি মূল্যবোধও তৈরি করে। আমরা কথায় কথায় বলি, অমুক আর অমুক এক পঙ্ক্তিতে বসতে পারে না। পঙ্ক্তি মানে কবিতার লাইন নয়, বসার লাইন। খাবার আসরে একই মর্যাদার মানুষের একই পাতে বা লাইনে বসার রেওয়াজ। অসম মর্যাদার ব্যক্তিরা একই পঙ্ক্তিতে বসলে তাতে মূল্যের হানি ঘটে বলে সামাজিক ধারণা। অনেক সময় বলা হয়, অমুক ও অমুককে একই পাল্লায় মেপো না। পাল্লাও এখানে মর্যাদারই স্মারক। যে পাল্লায় চাল মাপা হয়, একই পাল্লায় মিষ্টি মাপার রেওয়াজ নেই। একইভাবে বলা হয়, তেল ও জলের দাম এক করো না। সমাজের মূল্যবোধ বদলের সঙ্গে বহু পরিবর্তন ঘটেছে। এখন এক পঙ্ক্তিতে বসার ক্ষেত্রে মর্যাদার প্রশ্ন ওঠে না। আকবর বাদশাহ আর হরিপদ কেরানীকে এক পাল্লায় মাপলে কেউ সমালোচনার তর্জনী বাড়িয়ে দেন না। জলজ পানীয়গুলোর সমমূল্য কোনো দেশে থাকলে তা বিস্ময়কর হলেও, অগ্রহণযোগ্য খবর নয়। কিন্তু তেল ও জলের দাম এক হওয়া কঠিন। মাঝে মধ্যে দেশে অভিনব কিছু খবর মেলে, তাতে তেলের বদলে পানি, কচুরিপানা, খড় দিয়ে গাড়ি চালনার মতো বিস্ময়কর আবিষ্কারের কথা বলা হয়। এত আবিষ্কারের পরও তেলের মূল্য আর পানির মূল্য এক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বোঝা যায়, তেল ও পানির ক্ষেত্রে বাজার ও সমাজের মূল্যবোধ এখনও অটুট। ভবিষ্যতে বহুদিন তা থাকবে। তবে সম্প্রতি ভারত সরকার তেল ও জলের মূল্য এক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে। তারা পেট্রোলের দাম খুব বেশি কমায়নি, আপাতত রাজনৈতিক কৌশলের কারণে স্থিতিশীল রেখেছে। কিন্তু ভারত-রত্ন পুরস্কারকে গণচরিত্র দিয়েছে। ভারতের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবটি এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের রথী-মহারথীদের বাইরের লোকদের মধ্যেও বিতরণ করা হবে। ক্রিকেটার ও চলচ্চিত্র অভিনেতারাও পুরস্কৃত হবেন। এ নিয়ে ভারতের পত্রপত্রিকায় শোর উঠেছে। নাগরিক সমাজও সোচ্চার হয়েছে। তারা বলছেন, ক্রিকেট জনপ্রিয়, বলিউডের ফিল্মও জনপ্রিয়। কিন্তু বিদ্যা-জ্ঞান ও সামাজিক-রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এগুলোর অবদান কী? শচীন টেন্ডুলকার কি সিভি রমণ রাধাকৃষ্ণনের মতো পণ্ডিতদের পঙ্ক্তিতে বসতে পারেন? ভারতীয় প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মার্কন্ডেয় কাটজু বলেছেন, তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মির্জা গালিবকে ভারত-রত্ন দেওয়ার কথা বলে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এখন ফিল্মস্টার আর ক্রিকেট স্টারদের পুরস্কার দেওয়ার কথা হচ্ছে। এটা করা হলে তার কোনো সামাজিক গুরুত্ব থাকবে না, এটা হবে স্রেফ একটা পরিহাস। ক্রিকেটারদের দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে ভারতীয় পত্রিকাগুলো যেভাবে কথা বলছে ভারত-রত্নের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তা প্রশংসনীয় বটে। জনপ্রিয়তাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয় তবে তো সমাজে কোনো দণ্ডই স্থির থাকতে পারে না। ফলে তেল ও জলের দাম কখনও এক হওয়া উচিত নয়। জলের কাছে তেলের কাজ আশা করাও ভুল কিংবা তেলের কাছে জলের কাজ। ভারতের সৌভাগ্য যে, সে দেশে তেল ও জল সকলে চেনে। আমাদের দেশে সমাজের জ্ঞানী-বিদ্বানদের চিহ্নিত করার ব্যবস্থাই নেই। ফলে এসব কথা আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয় বলেই মনে হয়।

Sunday, December 11, 2011

পৃথিবীর সীমাহীন নিঃসঙ্গতা ও কেপলার-২২বি

আমাদের কবি একদা লিখেছিলেন, 'বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।' পৃথিবীকে সত্যিই কতটুকু জানা হয়েছে মানুষের? দেশে দেশে কত নগর, কত রাজধানী অলক্ষ্যে পড়ে রয়েছে। অনাস্বাদিত, অশ্রুত ও অদৃষ্ট সেসব নগর-বন্দর-রাজধানীকে জানার নিরন্তর প্রক্রিয়া চলছে। আজ অনেকেই বলেন, হাতের মুঠোয় এসে গেছে পৃথিবী। ধারণাগত দিক থেকে হাতের মুঠোয় এলেও বাস্তবে কিন্তু পৃথিবীতে জানা ও বোঝার জন্য জ্ঞান এবং তথ্য আহরণের প্রচেষ্টা চলছে নিরন্তর। শুধু পৃথিবী নয়, জানার প্রক্রিয়া পৃথিবীর বাইরে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। পৃথিবীকে যদি কবির ভাষায় বলতে হয় বিপুলা, তবে পৃথিবীর বাইরের পুরো বিশ্বজগৎকে বলতে হবে মহা মহা বিপুলা। কত নক্ষত্র, কত গ্রহ, কত ছায়াপথ সেখানে। আমাদের আরেক কবি লিখেছিলেন, "মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া,/উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর।" বিশ্ববিধাতৃর বিস্ময় উৎপাদনের মতো পদক্ষেপ এখন মানুষের আয়ত্তে আসেনি। মানুষের পদধূলি সৌর জগতের বাইরে এখনও পড়েনি। কিন্তু দূরবীক্ষণের সাহচর্য নিয়ে মানুষের চোখ চলে গেছে অনেক দূর কোটি আলোকবর্ষেরও ওপারে। মহাবিশ্বজুড়ে মানুষ খুঁজে চলেছে অনেক কিছু। দেখে চলেছে যা দেখা যায়। কিন্তু অনুসন্ধানী মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন শুরুতে যা ছিল এখনও তা-ই। মহাবিশ্বে কি পৃথিবী একটাই, বুদ্ধিমান প্রাণী বলতে কি মানুষই একমাত্র? এ প্রশ্নে পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ নয় শুধু, পৃথিবী হলো উপযুক্ত তাপ, চাপ, জলবায়ুর সমন্বয়ে গঠিত প্রাণধারণ উপযোগী গ্রহ। পৃথিবীতে বসে আরেক পৃথিবীকে খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাণের সামান্যতম সম্ভাবনা কোথাও দেখা দিলে সমস্বরে ঘোষণা করছেন, হ্যাঁ মঙ্গলে মিললেও মিলতে পারে প্রাণ। বা অন্য কোথাও_ অন্য কোনোখানে। কিন্তু মানুষের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে পারে এমন তথ্য এখনও মেলেনি। সবার বিশ্বাস উৎপাদন করতে পারে এমন কথা এখনও কেউ বলেনি। তবু এবার আশা একটু বেশি। নাসার বিজ্ঞানীরা এবার একটু ভেবেচিন্তে, অপেক্ষা করে ঘোষণা দিলেন। বললেন, আছে আরেক পৃথিবী। আমাদের পৃথিবীর বোন। তার নাম কেপলার-বি২২। আমাদের গ্রহ থেকে দুই কোটি বিশ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। অনেক দূরের সেই গ্রহ আমাদের পৃথিবীর মতোই আরেক সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সেখানেও দিন হচ্ছে, রাত হচ্ছে। তবে সেখানে কি প্রাণ আছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর মতো অনুকূল তাপ আছে সেখানে। যুক্তি মোতাবেক, প্রাণ থাকার কথা। প্রাণ যদি থাকে তবে বিবর্তনের পথ ধরে সে প্রাণ কি মানুষের মতো বুদ্ধি সঞ্চয় করেছে? এখনও কেউ জানে না। তবে নাসার বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তবে কি মানুষের সীমাহীন নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে যাচ্ছে কেপলার-বি২২? হয়তো। আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ যদি জানতে পারে যে সেখানে প্রাণ আছে; তবে পৃথিবীর সন্তানদের সঙ্গে কেপলার বি২২-এর সন্তানদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? ধরা যাক, সেখানে সভ্যতার পর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীরা এখন উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করছে। নয়তো, তারা আছে আদিম কোনো অবস্থানে। বিকশিত হতে হতে একদিন উন্নতির শীর্ষে উঠবে। আবিষ্কার করবে প্রযুক্তি। দূরবীক্ষণে তাকিয়ে দেখবে আকাশ, নক্ষত্রলোক। আমাদের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হবে। ভাববে, এখানে আছে প্রাণের সম্ভাবনা। মহাবিশ্বে তারা আর একা নয়। কিন্তু তারা কি আরেক গ্রহের প্রাণের সন্ধানে যাত্রা করবে? দুই কোটি ২০ লাখ বছর পর এসে পেঁৗছাবে? অথবা আমাদের পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানীরা কি রওনা হবেন সুদূর ভবিষ্যতের কোনো একদিন সেই পৃথিবীর উদ্দেশে? প্রযুক্তি এখনও সে শক্তি অর্জন করেনি। আপাতত তাই কবির কথা দিয়ে শেষ করি, 'আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি/সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ।' বিশ্বজগতে পৃথিবীর মতোই আরেক গ্রহ আছে, আপাতত এই আমাদের সুখের খবর।

Thursday, December 1, 2011

নতুন ঢাকা, পুরান ঢাকা

ঢাকার অধিবাসীদের কাছে শহরটি বহুদিন ধরেই দুই ভাগে বিভক্ত। সিটি করপোরেশন ভাগ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে এই সাধারণ তথ্যটির দিকে কারও মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি বলেই মনে হয়। তীব্র রাজনৈতিক তর্কের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ তথ্যটিও অনেক সময় সবার অলক্ষ্যে থেকে যায়। সেটা স্বাভাবিকও। ঢাকার অধিবাসীদের কাছে শহরের পুরাতন অংশটি পুরান ঢাকা আর নতুন অংশটি নতুন ঢাকা বা ঢাকা বলে পরিচিত। একদা বুড়িগঙ্গার তীরে এ নগরীর পত্তন ঘটেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা মোটামুটিভাবে পুরাতন অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পর ঢাকা উত্তরে বিস্তৃত হয়েছে_ টঙ্গীর সীমান্ত উত্তরা পর্যন্ত। স্বাধীনতার পরের চার দশকে যে ঢাকা তৈরি হয়েছে তাকে সহজে চেনা যায়। পুরান ঢাকাকেও আলাদা করে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ২৯ নভেম্বর সংসদে বিল পাস হয়ে ঢাকা দু'ভাগ হলো। আর এ বিলে ঢাকা ভাগের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে ঢাকার ওই ধারণাগত বিভক্তিটাই সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল। ঢাকা দক্ষিণ মোটাদাগে স্বাধীনতার আগের শহুরে জনবসতি। আর ঢাকা উত্তর স্বাধীনতার পরের জনবসতি। বিভক্ত ঢাকার ম্যাপের দিকে তাকালে এ সত্যটি সহজেই সবার চোখে ধরা দেওয়ার কথা। আর যারা সচক্ষে প্রতিদিন এ শহরকে দেখেন তারা সহজেই এ দুই ঢাকার গুণগত পার্থক্যের কথা জানেন। এ কথা সত্য, পুরান ঢাকার উত্তরাংশে অর্থাৎ ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুরে কিছু উন্নয়ন ঘটলেও, এর অধিকাংশ এলাকাই অবহেলিত। ঠিক যেন মেট্রোপলিটন শহর হয়ে উঠতে পারেনি। এক রাইডে উত্তরার রাস্তা থেকে চলমান একটি গাড়ি ওয়ারির রাস্তায় এসে পড়লে সহজে বোঝা যেতে পারে গুণগত পার্থক্যটি। সরকার ঢাকাকে দু'ভাগ করে ফেলায় এখন বুঝতে সুবিধা হবে। শহরের দুই অংশে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের সমতা বিধানের জন্য যদি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা হয় তবে নিশ্চয়ই নাগরিকরা তাকে স্বাগত জানাবেন। দুটি সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পার্থক্যও বোঝা যাবে সহজে।
সবচেয়ে ভালো হতো যদি উত্তর-দক্ষিণ দিকনির্দেশ না করে পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকা নাম দেওয়া হতো। ভারতের রাজধানী দিলি্লর ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ আছে। তবে দিলি্ল বলতে যে পুরনো শহরের কথা আমরা জানি তা কিন্তু রাজধানী নয়। রাজধানী হলো নয়াদিলি্ল। দিলি্লর নতুন ও পুরাতনের সঙ্গে ঢাকার নতুন ও পুরাতনের বেশ মিল আছে। তবে দিলি্ল শুধু শহর নয়, শহরভিত্তিক একটি রাজ্যও। দিলি্লর পথ অনুসরণ করে ঢাকা নামটি শহরের পুরনো অংশকে দিয়ে নতুন অংশের আলাদা একটি নাম খোঁজা হলে আরও ভালো হতো। ঢাকার এই বিভক্তি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে এক ধরনের সংশয় কাজ করেছে আগাগোড়া। সত্যি কথা বলতে, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, রাজনৈতিক দল সবাই ঢাকা ভাগের বিপক্ষে। বলা যায়, সরকারি দলের গুটিকয় মানুষ ছাড়া প্রকাশ্যে কেউ ভাগ সমর্থন করেননি। তবু সংসদে বিল পাস হয়েছে। এখন দ্বিখণ্ডিত সিটি করপোরেশন নগরবাসীর জন্য বাস্তবতা। ঢাকা শুধু সিটি করপোরেশন নয়, বাংলাদেশের রাজধানীও। সিটি করপোরেশন দু'ভাগ হলেও রাজধানী নিশ্চয়ই দু'ভাগ হতে পারবে না। সঙ্গত কারণেই যে কোনো এক ভাগকে রাজধানী ঘোষণা করতে হবে, নয়তো বলতে হবে উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে পুরোটাই রাজধানী। অর্থাৎ শুধু সিটি করপোরেশনের সেবা দু'ভাগ হলো, রাজধানী নয়। তবে ঢাকা শহরের যে বাস্তবতা তাতে রাজধানীটিকে যে কোনো একটি অংশে ফেললেই ভালো হতো। যদিও পুরান ঢাকা রাজধানী নয় তবু রাজধানী ঐতিহ্যের কাছাকাছি থাকল। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সব ভবন পুরাতন অংশে স্থানান্তর করে ফেলা যেতে পারে। আবার নতুন ঢাকাতেও রাজধানী আসতে পারে, নতুন রূপ নিয়ে নতুন কোনো জায়গায় প্রশাসনিক ভবনগুলো স্থাপন করা যেতে পারে। শহরের দুই অংশের আলাদা চরিত্রও দাঁড় করানো যেতে পারে। এসব গঠনমূলক চিন্তা_ অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে। আমাদের রাজনীতি যেভাবে চলে সে ধারায় ঢাকা চললে, যে ঢাকা সেই ঢাকাই থাকবে। দুই কেন চার ভাগ করলেও কোনো পরিকল্পিত, আধুনিক ও উন্নত শহর অদূর ভবিষ্যতে আমরা পাব না।

Saturday, November 26, 2011

চপেটাঘাত

চারদিকে কত খুনোখুনি, কত রক্তপাত_ তোলপাড় করা নানা হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সেসব নিয়ে যেন কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। গোটা ভারত গতকাল মগ্ন ছিল একটা চড় নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলে মাওবাদী নেতা কিশেনজি নিহত হলেন। বৃহস্পতিবারের ঘটনা হলেও সে নিয়ে খুব বেশি কথাবার্তা ছিল না সংবাদমাধ্যমগুলোতে। কিশেনজির মৃত্যুর খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু লোকের মুখে মুখে ফিরছিল সামান্য এক চড়ের ঘটনা। কে, কাকে চড় মেরেছে? টেম্পোচালক হরবিন্দর সিং চড় মেরেছিলেন কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ারকে। কেন মেরেছেন? মন্ত্রী বা ভিআইপিদের ওপর হামলা হলে ধরেই নেওয়া হয় যে, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তা হয়েছে। নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হামলা। কিন্তু টিভিগুলোর লাইভ প্রচারের দৌরাত্ম্যে দেখা গেল হত্যা বা মারাত্মক আহত করার উদ্দেশ্য হরবিন্দরের ছিল না। ছোট একটি চাকু হাতে থাকলেও তা ব্যবহার করেননি হরবিন্দর। বরং একটি চড় মেরেই রাগ প্রকাশ করেছেন। চড়টি মারার পর খোদ হরবিন্দরই শারদ পাওয়ারের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রচণ্ড কিল-ঘুষির শিকার হয়েছেন। বেদম চড়চাপড় খেয়েছেন। মজার ব্যাপার, ঢিলটি সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেলেও পাটকেলটি কিন্তু গুরুত্ব পায়নি। সবাই গুনে বলতে পারছেন, শারদ পাওয়ার একটি চড় খেয়েছেন। কিন্তু বদলে হরবিন্দর কতটি চড় খেয়েছেন সেটি কিন্তু কেউ গোনার প্রয়োজন মনে করছে না। তবে একটি চড়ই পুরো ভারতকে মাতিয়েছে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে রস করেছেন। রস করতে গিয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারে তো বেফাঁস এক মন্তব্যই করে বসেছেন। চড়ের সংবাদ শুনে তিনি বলে বসেছেন, 'এক হি মারা কেয়া?' তিনি জানতে চেয়েছিলেন, চড় কি একটাই মেরেছিল কি-না। পরে অবশ্য সমালোচনা হওয়ায় তিনি দায়িত্বশীল বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'সকালে একজন আমাকে খবরটা দেওয়ার পর আমি জানতে চেয়েছিলাম একটাই চড় মেরেছিল কি-না। সেটাকেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি চড় মেরেছিলেন তিনি হয়তো রাগান্বিত ছিলেন। রাগ ভালো জিনিস নয়। সংবিধান সহিংসতা সমর্থন করে না।' শারদ পাওয়ার চড় খেয়েছেন শুনে আন্না হাজারে হয়তো সত্যিই জানতে চেয়েছিলেন চড় কতটি পড়েছে? কিন্তু ভারতের অনেক আম আদমি এতে খুশি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বল্গাহারা গতিতে চড়ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ত্রাহি রব চারদিকে। মানুষ কতটা অসহায় তার পুরো সংবাদ গণমাধ্যমে আসে না। আসলে সে সংবাদের নানা মাত্রা থাকে। হরবিন্দর সিংয়ের পকেটের হিসাব মিলছে না কিন্তু বাজারের নীতি, প্রবৃদ্ধি, ভর্তুকি নানা হিসাবে শেষ পর্যন্ত হরবিন্দরদের পকেটের হিসাব হারিয়ে যায়। তো হরবিন্দর ঠিক করেছেন, খবরটা জানানো দরকার আলাদা করে। আর সে কারণেই বাসা থেকে বেরিয়েছেন মন্ত্রীকে চড় কষাবেন বলে। ঝাঁকের মধ্যে মিশে গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থেকেছেন। সুযোগ পেয়ে মেরে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মন্ত্রীকে এভাবে অপমান করা ঠিক নয়। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংবিধানও এটা সমর্থন করে না। কিন্তু এর তো একটা বার্তাও আছে। হরবিন্দর যে বার্তাটা পেঁৗছে দিতে চাইলেন তার সমাধান না করে যদি তাকে আলাদা করে শাস্তি দেওয়া হয় তবে সেটি কেমন হবে? ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে এ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে, হরবিন্দর এখন নায়ক। অনেকেই স্মরণ করছেন জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মারা সেই ইরাকি সাংবাদিকের কথা। সে ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। গুণে-মানে হয়তো এটি অনেক ছোট। কিন্তু হরবিন্দরের নাম অনেকেই যে মনে রাখতে চেষ্টা করবেন, তা নিশ্চিত।

Saturday, November 12, 2011

কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি

কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি'_ এই হিন্দি বাক্যটির অর্থ 'কেননা শাশুড়িও কোনো এক সময় বউ ছিলেন।' হিন্দি এই বাক্যটি রীতিমতো একটি বাগ্ধারায় পরিণত হয়েছে একটি টিভি সিরিয়ালের কল্যাণে। সিরিয়ালের নাম 'কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি'। স্টার প্লাসে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বকালের সেরা দশটি অনুষ্ঠানের প্রথমটি এই সিরিয়াল। শুধু তাই নয়, এশিয়ার সবচেয়ে বেশি দেখা ও সবচেয়ে বেশি পুরস্কার পাওয়া সোপ অপেরাও এটি। হিন্দি ভাষায় প্রচারিত এই সিরিয়ালটি প্রযোজনা করেছিল একতা কাপুর ও শোভা কাপুরের বালাজি টেলিফিল্মস। ২০০০-০৮ পর্যন্ত ৮ বছরে এর এক হাজার ৮৩০টি পর্ব প্রচারিত হয়েছিল। পর্বগুলো পরিচালনা করেছেন ২০ জনেরও বেশি পরিচালক। সিরিয়ালটিতে একটি পরিবারের পাঁচ প্রজন্মের ইতিহাস দেখানো হয়েছে। গৃহবিবাদ, গৃহদাহ ও গৃহদুর্ঘটই এই সিরিয়ালের বিষয়। তবে মূল থিম অবশ্যই বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক। সত্য যে, উপমহাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক শাশুড়িই একদিন নববধূ হিসেবে স্বামীর ঘরে আসেন। শাশুড়ির সঙ্গ পান, তার কাছে সংসারের প্রয়োজনীয় দীক্ষাও নেন। আবার গৃহের কর্তৃত্ব নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে বউয়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কাহিনীও আছে। এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে একদিন নববধূও শাশুড়ি হন। উপমহাদেশের নারীদের এই রূপান্তর বহু বছর ধরে চলছে। দায়িত্বের বণ্টনও নতুন কিছু নয়। তারপরও পরিবারগুলোতে বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব খুব আলোচিত বিষয়। আলোচিত শুধু নয়, রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এ এমনই চাঞ্চল্যকর যে, এ নিয়ে নাটক-সিনেমা হলে তা জনপ্রিয় হবেই এটা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়। কিঁউ কি সাস ভির সাফল্যের পেছনে খুব গূঢ় রহস্য খোঁজার দরকার নেই বলেই মনে হয়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও গৃহবধূরা প্রতি সন্ধ্যায় পরম আগ্রহে স্টার খুলে বসেছেন সোপ অপেরাটি দেখার জন্য। শাশুড়িরা যেমন গৃহবধূরাও তেমন নিজেদের পছন্দের বিষয়টি সেখানে পেয়েছেন। শুধু এই সিরিয়াল নয়, বহু হিন্দি সিরিয়ালের সাফল্যের মূল সূত্রও ওই গৃহবিবাদ। কেউ কেউ বলেন, হিন্দি সিরিয়ালের গৃহবিবাদ আমাদের দেশে গৃহবিবাদকে উস্কে দিচ্ছে। সরাসরি হয়তো দোষ দেওয়া যাবে না এভাবে। কিন্তু পরোক্ষে হলেও কিছু প্রভাব তো পড়ছে। ঈদের বাজারে গেলে মেয়েদের পোশাক-আশাক যত দেখা যায় তার বেশিরভাগই হিন্দি সিরিয়াল বা সিনেমা প্রভাবিত। শুধু মেয়েদের পোশাক কেন? ছেলেদের অজস্র পোশাক বাজারজাত হচ্ছে যা শুধু হিন্দি সিরিয়ালের চরিত্রদেরই পরতে দেখা যায়। সিরিয়ালগুলোতে যেমন দু'দিন পরপর আনন্দ-আয়োজন লেগে থাকে, তাতে সেখানকার চরিত্রদের নানা রকম শেরওয়ানি, পাঞ্জাবি, দোপাট্টা, চুড়িদার পরতে হয় বটে। কিন্তু সিরিয়াল দেখে যারা পোশাক কেনেন তাদের হয়তো বছরে এক-দু'বারই সেগুলো পরার অবকাশ জোটে। হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব কতটা পড়ছে আমাদের সমাজে তা আলোচনার বিষয় নয়। বিষয় বউ-শাশুড়ি সম্পর্কই। ভেবেছিলাম, শুধু সিরিয়ালের নামটি বলে প্রসঙ্গে আসব। কিন্তু বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক আর হিন্দি সিরিয়াল যেমন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িয়ে আছে তাতে আলাপের একটু বিস্তার না করলে কি চলে? ঘটনা জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার। সেখানে শাখারগঞ্জ-চৌধুরীপাড়ায় এক অভিনব আয়োজন হয়েছে সম্প্রতি। সেখানে বউ-শাশুড়ির মেলা হয়েছে। এলাকার গৃহবধূ ও শাশুড়িরা মেলা করেছেন। হৈ-হল্লা করে সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু অভিনব এ আয়োজন অনেককে আকৃষ্ট করেছে। হাজারো মানুষ মেলা দেখতে এসেছেন। হঠাৎ করে বউ-শাশুড়ি মেলার কারণ কী? হয়তো ঈদের সাইড এফেক্ট। শহর থেকে লোকেরা ঘরে ফিরেছে। এ অবকাশে ভিন্নধর্মী এ আয়োজনের আইডিয়া খেলে গেছে কারও মনে। কিন্তু এমন মেলা সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে পরিবারগুলোতে। বউ-শাশুড়ি সংঘাত পরিবারগুলোতে যে গৃহদাহ তৈরি করে তাতে এ মেলাগুলো আলাপ-আলোচনার খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করতে পারে। আর ওই বাগ্ধারাটিও কিন্তু ফেলনা নয়। কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি। শাশুড়িও একদিন বউ ছিলেন_ এটি যেমন সত্য তেমনি এও সত্য যে, বউও একদিন শাশুড়ি
হতে পারেন। ফলে মিলেমিশে থাকাটাই শ্রেয়।