Sunday, December 11, 2011

পৃথিবীর সীমাহীন নিঃসঙ্গতা ও কেপলার-২২বি

আমাদের কবি একদা লিখেছিলেন, 'বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।' পৃথিবীকে সত্যিই কতটুকু জানা হয়েছে মানুষের? দেশে দেশে কত নগর, কত রাজধানী অলক্ষ্যে পড়ে রয়েছে। অনাস্বাদিত, অশ্রুত ও অদৃষ্ট সেসব নগর-বন্দর-রাজধানীকে জানার নিরন্তর প্রক্রিয়া চলছে। আজ অনেকেই বলেন, হাতের মুঠোয় এসে গেছে পৃথিবী। ধারণাগত দিক থেকে হাতের মুঠোয় এলেও বাস্তবে কিন্তু পৃথিবীতে জানা ও বোঝার জন্য জ্ঞান এবং তথ্য আহরণের প্রচেষ্টা চলছে নিরন্তর। শুধু পৃথিবী নয়, জানার প্রক্রিয়া পৃথিবীর বাইরে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। পৃথিবীকে যদি কবির ভাষায় বলতে হয় বিপুলা, তবে পৃথিবীর বাইরের পুরো বিশ্বজগৎকে বলতে হবে মহা মহা বিপুলা। কত নক্ষত্র, কত গ্রহ, কত ছায়াপথ সেখানে। আমাদের আরেক কবি লিখেছিলেন, "মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া,/উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর।" বিশ্ববিধাতৃর বিস্ময় উৎপাদনের মতো পদক্ষেপ এখন মানুষের আয়ত্তে আসেনি। মানুষের পদধূলি সৌর জগতের বাইরে এখনও পড়েনি। কিন্তু দূরবীক্ষণের সাহচর্য নিয়ে মানুষের চোখ চলে গেছে অনেক দূর কোটি আলোকবর্ষেরও ওপারে। মহাবিশ্বজুড়ে মানুষ খুঁজে চলেছে অনেক কিছু। দেখে চলেছে যা দেখা যায়। কিন্তু অনুসন্ধানী মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন শুরুতে যা ছিল এখনও তা-ই। মহাবিশ্বে কি পৃথিবী একটাই, বুদ্ধিমান প্রাণী বলতে কি মানুষই একমাত্র? এ প্রশ্নে পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ নয় শুধু, পৃথিবী হলো উপযুক্ত তাপ, চাপ, জলবায়ুর সমন্বয়ে গঠিত প্রাণধারণ উপযোগী গ্রহ। পৃথিবীতে বসে আরেক পৃথিবীকে খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাণের সামান্যতম সম্ভাবনা কোথাও দেখা দিলে সমস্বরে ঘোষণা করছেন, হ্যাঁ মঙ্গলে মিললেও মিলতে পারে প্রাণ। বা অন্য কোথাও_ অন্য কোনোখানে। কিন্তু মানুষের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে পারে এমন তথ্য এখনও মেলেনি। সবার বিশ্বাস উৎপাদন করতে পারে এমন কথা এখনও কেউ বলেনি। তবু এবার আশা একটু বেশি। নাসার বিজ্ঞানীরা এবার একটু ভেবেচিন্তে, অপেক্ষা করে ঘোষণা দিলেন। বললেন, আছে আরেক পৃথিবী। আমাদের পৃথিবীর বোন। তার নাম কেপলার-বি২২। আমাদের গ্রহ থেকে দুই কোটি বিশ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। অনেক দূরের সেই গ্রহ আমাদের পৃথিবীর মতোই আরেক সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সেখানেও দিন হচ্ছে, রাত হচ্ছে। তবে সেখানে কি প্রাণ আছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর মতো অনুকূল তাপ আছে সেখানে। যুক্তি মোতাবেক, প্রাণ থাকার কথা। প্রাণ যদি থাকে তবে বিবর্তনের পথ ধরে সে প্রাণ কি মানুষের মতো বুদ্ধি সঞ্চয় করেছে? এখনও কেউ জানে না। তবে নাসার বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তবে কি মানুষের সীমাহীন নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে যাচ্ছে কেপলার-বি২২? হয়তো। আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ যদি জানতে পারে যে সেখানে প্রাণ আছে; তবে পৃথিবীর সন্তানদের সঙ্গে কেপলার বি২২-এর সন্তানদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? ধরা যাক, সেখানে সভ্যতার পর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীরা এখন উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করছে। নয়তো, তারা আছে আদিম কোনো অবস্থানে। বিকশিত হতে হতে একদিন উন্নতির শীর্ষে উঠবে। আবিষ্কার করবে প্রযুক্তি। দূরবীক্ষণে তাকিয়ে দেখবে আকাশ, নক্ষত্রলোক। আমাদের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হবে। ভাববে, এখানে আছে প্রাণের সম্ভাবনা। মহাবিশ্বে তারা আর একা নয়। কিন্তু তারা কি আরেক গ্রহের প্রাণের সন্ধানে যাত্রা করবে? দুই কোটি ২০ লাখ বছর পর এসে পেঁৗছাবে? অথবা আমাদের পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানীরা কি রওনা হবেন সুদূর ভবিষ্যতের কোনো একদিন সেই পৃথিবীর উদ্দেশে? প্রযুক্তি এখনও সে শক্তি অর্জন করেনি। আপাতত তাই কবির কথা দিয়ে শেষ করি, 'আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি/সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ।' বিশ্বজগতে পৃথিবীর মতোই আরেক গ্রহ আছে, আপাতত এই আমাদের সুখের খবর।

Thursday, December 1, 2011

নতুন ঢাকা, পুরান ঢাকা

ঢাকার অধিবাসীদের কাছে শহরটি বহুদিন ধরেই দুই ভাগে বিভক্ত। সিটি করপোরেশন ভাগ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে এই সাধারণ তথ্যটির দিকে কারও মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি বলেই মনে হয়। তীব্র রাজনৈতিক তর্কের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ তথ্যটিও অনেক সময় সবার অলক্ষ্যে থেকে যায়। সেটা স্বাভাবিকও। ঢাকার অধিবাসীদের কাছে শহরের পুরাতন অংশটি পুরান ঢাকা আর নতুন অংশটি নতুন ঢাকা বা ঢাকা বলে পরিচিত। একদা বুড়িগঙ্গার তীরে এ নগরীর পত্তন ঘটেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা মোটামুটিভাবে পুরাতন অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পর ঢাকা উত্তরে বিস্তৃত হয়েছে_ টঙ্গীর সীমান্ত উত্তরা পর্যন্ত। স্বাধীনতার পরের চার দশকে যে ঢাকা তৈরি হয়েছে তাকে সহজে চেনা যায়। পুরান ঢাকাকেও আলাদা করে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ২৯ নভেম্বর সংসদে বিল পাস হয়ে ঢাকা দু'ভাগ হলো। আর এ বিলে ঢাকা ভাগের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে ঢাকার ওই ধারণাগত বিভক্তিটাই সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল। ঢাকা দক্ষিণ মোটাদাগে স্বাধীনতার আগের শহুরে জনবসতি। আর ঢাকা উত্তর স্বাধীনতার পরের জনবসতি। বিভক্ত ঢাকার ম্যাপের দিকে তাকালে এ সত্যটি সহজেই সবার চোখে ধরা দেওয়ার কথা। আর যারা সচক্ষে প্রতিদিন এ শহরকে দেখেন তারা সহজেই এ দুই ঢাকার গুণগত পার্থক্যের কথা জানেন। এ কথা সত্য, পুরান ঢাকার উত্তরাংশে অর্থাৎ ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুরে কিছু উন্নয়ন ঘটলেও, এর অধিকাংশ এলাকাই অবহেলিত। ঠিক যেন মেট্রোপলিটন শহর হয়ে উঠতে পারেনি। এক রাইডে উত্তরার রাস্তা থেকে চলমান একটি গাড়ি ওয়ারির রাস্তায় এসে পড়লে সহজে বোঝা যেতে পারে গুণগত পার্থক্যটি। সরকার ঢাকাকে দু'ভাগ করে ফেলায় এখন বুঝতে সুবিধা হবে। শহরের দুই অংশে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের সমতা বিধানের জন্য যদি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা হয় তবে নিশ্চয়ই নাগরিকরা তাকে স্বাগত জানাবেন। দুটি সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পার্থক্যও বোঝা যাবে সহজে।
সবচেয়ে ভালো হতো যদি উত্তর-দক্ষিণ দিকনির্দেশ না করে পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকা নাম দেওয়া হতো। ভারতের রাজধানী দিলি্লর ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ আছে। তবে দিলি্ল বলতে যে পুরনো শহরের কথা আমরা জানি তা কিন্তু রাজধানী নয়। রাজধানী হলো নয়াদিলি্ল। দিলি্লর নতুন ও পুরাতনের সঙ্গে ঢাকার নতুন ও পুরাতনের বেশ মিল আছে। তবে দিলি্ল শুধু শহর নয়, শহরভিত্তিক একটি রাজ্যও। দিলি্লর পথ অনুসরণ করে ঢাকা নামটি শহরের পুরনো অংশকে দিয়ে নতুন অংশের আলাদা একটি নাম খোঁজা হলে আরও ভালো হতো। ঢাকার এই বিভক্তি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে এক ধরনের সংশয় কাজ করেছে আগাগোড়া। সত্যি কথা বলতে, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, রাজনৈতিক দল সবাই ঢাকা ভাগের বিপক্ষে। বলা যায়, সরকারি দলের গুটিকয় মানুষ ছাড়া প্রকাশ্যে কেউ ভাগ সমর্থন করেননি। তবু সংসদে বিল পাস হয়েছে। এখন দ্বিখণ্ডিত সিটি করপোরেশন নগরবাসীর জন্য বাস্তবতা। ঢাকা শুধু সিটি করপোরেশন নয়, বাংলাদেশের রাজধানীও। সিটি করপোরেশন দু'ভাগ হলেও রাজধানী নিশ্চয়ই দু'ভাগ হতে পারবে না। সঙ্গত কারণেই যে কোনো এক ভাগকে রাজধানী ঘোষণা করতে হবে, নয়তো বলতে হবে উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে পুরোটাই রাজধানী। অর্থাৎ শুধু সিটি করপোরেশনের সেবা দু'ভাগ হলো, রাজধানী নয়। তবে ঢাকা শহরের যে বাস্তবতা তাতে রাজধানীটিকে যে কোনো একটি অংশে ফেললেই ভালো হতো। যদিও পুরান ঢাকা রাজধানী নয় তবু রাজধানী ঐতিহ্যের কাছাকাছি থাকল। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সব ভবন পুরাতন অংশে স্থানান্তর করে ফেলা যেতে পারে। আবার নতুন ঢাকাতেও রাজধানী আসতে পারে, নতুন রূপ নিয়ে নতুন কোনো জায়গায় প্রশাসনিক ভবনগুলো স্থাপন করা যেতে পারে। শহরের দুই অংশের আলাদা চরিত্রও দাঁড় করানো যেতে পারে। এসব গঠনমূলক চিন্তা_ অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে। আমাদের রাজনীতি যেভাবে চলে সে ধারায় ঢাকা চললে, যে ঢাকা সেই ঢাকাই থাকবে। দুই কেন চার ভাগ করলেও কোনো পরিকল্পিত, আধুনিক ও উন্নত শহর অদূর ভবিষ্যতে আমরা পাব না।

Saturday, November 26, 2011

চপেটাঘাত

চারদিকে কত খুনোখুনি, কত রক্তপাত_ তোলপাড় করা নানা হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সেসব নিয়ে যেন কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। গোটা ভারত গতকাল মগ্ন ছিল একটা চড় নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলে মাওবাদী নেতা কিশেনজি নিহত হলেন। বৃহস্পতিবারের ঘটনা হলেও সে নিয়ে খুব বেশি কথাবার্তা ছিল না সংবাদমাধ্যমগুলোতে। কিশেনজির মৃত্যুর খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু লোকের মুখে মুখে ফিরছিল সামান্য এক চড়ের ঘটনা। কে, কাকে চড় মেরেছে? টেম্পোচালক হরবিন্দর সিং চড় মেরেছিলেন কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ারকে। কেন মেরেছেন? মন্ত্রী বা ভিআইপিদের ওপর হামলা হলে ধরেই নেওয়া হয় যে, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তা হয়েছে। নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হামলা। কিন্তু টিভিগুলোর লাইভ প্রচারের দৌরাত্ম্যে দেখা গেল হত্যা বা মারাত্মক আহত করার উদ্দেশ্য হরবিন্দরের ছিল না। ছোট একটি চাকু হাতে থাকলেও তা ব্যবহার করেননি হরবিন্দর। বরং একটি চড় মেরেই রাগ প্রকাশ করেছেন। চড়টি মারার পর খোদ হরবিন্দরই শারদ পাওয়ারের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রচণ্ড কিল-ঘুষির শিকার হয়েছেন। বেদম চড়চাপড় খেয়েছেন। মজার ব্যাপার, ঢিলটি সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেলেও পাটকেলটি কিন্তু গুরুত্ব পায়নি। সবাই গুনে বলতে পারছেন, শারদ পাওয়ার একটি চড় খেয়েছেন। কিন্তু বদলে হরবিন্দর কতটি চড় খেয়েছেন সেটি কিন্তু কেউ গোনার প্রয়োজন মনে করছে না। তবে একটি চড়ই পুরো ভারতকে মাতিয়েছে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে রস করেছেন। রস করতে গিয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারে তো বেফাঁস এক মন্তব্যই করে বসেছেন। চড়ের সংবাদ শুনে তিনি বলে বসেছেন, 'এক হি মারা কেয়া?' তিনি জানতে চেয়েছিলেন, চড় কি একটাই মেরেছিল কি-না। পরে অবশ্য সমালোচনা হওয়ায় তিনি দায়িত্বশীল বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'সকালে একজন আমাকে খবরটা দেওয়ার পর আমি জানতে চেয়েছিলাম একটাই চড় মেরেছিল কি-না। সেটাকেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি চড় মেরেছিলেন তিনি হয়তো রাগান্বিত ছিলেন। রাগ ভালো জিনিস নয়। সংবিধান সহিংসতা সমর্থন করে না।' শারদ পাওয়ার চড় খেয়েছেন শুনে আন্না হাজারে হয়তো সত্যিই জানতে চেয়েছিলেন চড় কতটি পড়েছে? কিন্তু ভারতের অনেক আম আদমি এতে খুশি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বল্গাহারা গতিতে চড়ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ত্রাহি রব চারদিকে। মানুষ কতটা অসহায় তার পুরো সংবাদ গণমাধ্যমে আসে না। আসলে সে সংবাদের নানা মাত্রা থাকে। হরবিন্দর সিংয়ের পকেটের হিসাব মিলছে না কিন্তু বাজারের নীতি, প্রবৃদ্ধি, ভর্তুকি নানা হিসাবে শেষ পর্যন্ত হরবিন্দরদের পকেটের হিসাব হারিয়ে যায়। তো হরবিন্দর ঠিক করেছেন, খবরটা জানানো দরকার আলাদা করে। আর সে কারণেই বাসা থেকে বেরিয়েছেন মন্ত্রীকে চড় কষাবেন বলে। ঝাঁকের মধ্যে মিশে গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থেকেছেন। সুযোগ পেয়ে মেরে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মন্ত্রীকে এভাবে অপমান করা ঠিক নয়। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংবিধানও এটা সমর্থন করে না। কিন্তু এর তো একটা বার্তাও আছে। হরবিন্দর যে বার্তাটা পেঁৗছে দিতে চাইলেন তার সমাধান না করে যদি তাকে আলাদা করে শাস্তি দেওয়া হয় তবে সেটি কেমন হবে? ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে এ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে, হরবিন্দর এখন নায়ক। অনেকেই স্মরণ করছেন জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মারা সেই ইরাকি সাংবাদিকের কথা। সে ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। গুণে-মানে হয়তো এটি অনেক ছোট। কিন্তু হরবিন্দরের নাম অনেকেই যে মনে রাখতে চেষ্টা করবেন, তা নিশ্চিত।

Saturday, November 12, 2011

কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি

কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি'_ এই হিন্দি বাক্যটির অর্থ 'কেননা শাশুড়িও কোনো এক সময় বউ ছিলেন।' হিন্দি এই বাক্যটি রীতিমতো একটি বাগ্ধারায় পরিণত হয়েছে একটি টিভি সিরিয়ালের কল্যাণে। সিরিয়ালের নাম 'কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি'। স্টার প্লাসে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বকালের সেরা দশটি অনুষ্ঠানের প্রথমটি এই সিরিয়াল। শুধু তাই নয়, এশিয়ার সবচেয়ে বেশি দেখা ও সবচেয়ে বেশি পুরস্কার পাওয়া সোপ অপেরাও এটি। হিন্দি ভাষায় প্রচারিত এই সিরিয়ালটি প্রযোজনা করেছিল একতা কাপুর ও শোভা কাপুরের বালাজি টেলিফিল্মস। ২০০০-০৮ পর্যন্ত ৮ বছরে এর এক হাজার ৮৩০টি পর্ব প্রচারিত হয়েছিল। পর্বগুলো পরিচালনা করেছেন ২০ জনেরও বেশি পরিচালক। সিরিয়ালটিতে একটি পরিবারের পাঁচ প্রজন্মের ইতিহাস দেখানো হয়েছে। গৃহবিবাদ, গৃহদাহ ও গৃহদুর্ঘটই এই সিরিয়ালের বিষয়। তবে মূল থিম অবশ্যই বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক। সত্য যে, উপমহাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক শাশুড়িই একদিন নববধূ হিসেবে স্বামীর ঘরে আসেন। শাশুড়ির সঙ্গ পান, তার কাছে সংসারের প্রয়োজনীয় দীক্ষাও নেন। আবার গৃহের কর্তৃত্ব নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে বউয়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কাহিনীও আছে। এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে একদিন নববধূও শাশুড়ি হন। উপমহাদেশের নারীদের এই রূপান্তর বহু বছর ধরে চলছে। দায়িত্বের বণ্টনও নতুন কিছু নয়। তারপরও পরিবারগুলোতে বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব খুব আলোচিত বিষয়। আলোচিত শুধু নয়, রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এ এমনই চাঞ্চল্যকর যে, এ নিয়ে নাটক-সিনেমা হলে তা জনপ্রিয় হবেই এটা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়। কিঁউ কি সাস ভির সাফল্যের পেছনে খুব গূঢ় রহস্য খোঁজার দরকার নেই বলেই মনে হয়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও গৃহবধূরা প্রতি সন্ধ্যায় পরম আগ্রহে স্টার খুলে বসেছেন সোপ অপেরাটি দেখার জন্য। শাশুড়িরা যেমন গৃহবধূরাও তেমন নিজেদের পছন্দের বিষয়টি সেখানে পেয়েছেন। শুধু এই সিরিয়াল নয়, বহু হিন্দি সিরিয়ালের সাফল্যের মূল সূত্রও ওই গৃহবিবাদ। কেউ কেউ বলেন, হিন্দি সিরিয়ালের গৃহবিবাদ আমাদের দেশে গৃহবিবাদকে উস্কে দিচ্ছে। সরাসরি হয়তো দোষ দেওয়া যাবে না এভাবে। কিন্তু পরোক্ষে হলেও কিছু প্রভাব তো পড়ছে। ঈদের বাজারে গেলে মেয়েদের পোশাক-আশাক যত দেখা যায় তার বেশিরভাগই হিন্দি সিরিয়াল বা সিনেমা প্রভাবিত। শুধু মেয়েদের পোশাক কেন? ছেলেদের অজস্র পোশাক বাজারজাত হচ্ছে যা শুধু হিন্দি সিরিয়ালের চরিত্রদেরই পরতে দেখা যায়। সিরিয়ালগুলোতে যেমন দু'দিন পরপর আনন্দ-আয়োজন লেগে থাকে, তাতে সেখানকার চরিত্রদের নানা রকম শেরওয়ানি, পাঞ্জাবি, দোপাট্টা, চুড়িদার পরতে হয় বটে। কিন্তু সিরিয়াল দেখে যারা পোশাক কেনেন তাদের হয়তো বছরে এক-দু'বারই সেগুলো পরার অবকাশ জোটে। হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব কতটা পড়ছে আমাদের সমাজে তা আলোচনার বিষয় নয়। বিষয় বউ-শাশুড়ি সম্পর্কই। ভেবেছিলাম, শুধু সিরিয়ালের নামটি বলে প্রসঙ্গে আসব। কিন্তু বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক আর হিন্দি সিরিয়াল যেমন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িয়ে আছে তাতে আলাপের একটু বিস্তার না করলে কি চলে? ঘটনা জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার। সেখানে শাখারগঞ্জ-চৌধুরীপাড়ায় এক অভিনব আয়োজন হয়েছে সম্প্রতি। সেখানে বউ-শাশুড়ির মেলা হয়েছে। এলাকার গৃহবধূ ও শাশুড়িরা মেলা করেছেন। হৈ-হল্লা করে সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু অভিনব এ আয়োজন অনেককে আকৃষ্ট করেছে। হাজারো মানুষ মেলা দেখতে এসেছেন। হঠাৎ করে বউ-শাশুড়ি মেলার কারণ কী? হয়তো ঈদের সাইড এফেক্ট। শহর থেকে লোকেরা ঘরে ফিরেছে। এ অবকাশে ভিন্নধর্মী এ আয়োজনের আইডিয়া খেলে গেছে কারও মনে। কিন্তু এমন মেলা সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে পরিবারগুলোতে। বউ-শাশুড়ি সংঘাত পরিবারগুলোতে যে গৃহদাহ তৈরি করে তাতে এ মেলাগুলো আলাপ-আলোচনার খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করতে পারে। আর ওই বাগ্ধারাটিও কিন্তু ফেলনা নয়। কিঁউ কি সাস ভি কাভি বহু থি। শাশুড়িও একদিন বউ ছিলেন_ এটি যেমন সত্য তেমনি এও সত্য যে, বউও একদিন শাশুড়ি
হতে পারেন। ফলে মিলেমিশে থাকাটাই শ্রেয়।

Friday, November 11, 2011

১১/১১/১১

বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে আজ কার্তিকের ২৭। সন ১৪১৮। অতীতের হাজারো কার্তিকের মতো এ কার্তিকেরও বিশেষত্ব নেই। বিশেষত্ব একেবারেই নেই তা নয়_ সাম্প্রতিক তীব্র তাপদাহের পর আবহাওয়া এখন অনেকটাই সহনীয়। কার্তিকের নবান্নের দেশে এখন শীতের আমেজ। গ্রামে ইতিমধ্যে শীত পড়ে গেছে। কার্বনপ্রবণ উষ্ণ শহুরে এলাকাগুলোতেও এখন হিমেল উত্তুরে হাওয়ার রেশ। সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে ২৭ কার্তিক ১৪১৮'র বিশেষ গুরুত্ব থাকার কথা নয়। বাঙালির জীবনে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব গণনা, কুষ্ঠি বিচার, মঙ্গল-অমঙ্গল নির্ধারণ এখনও বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারেই হয়। তবে বাংলা ক্যালেন্ডারের দাপট এখন সীমিত পর্যায়ে। জীবনের বড় জায়গাজুড়ে এখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের দাপট। এ ক্যালেন্ডারের ভালো-মন্দ, গ্রহ-নক্ষত্র এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। কেউ কেউ মনে করেন, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে ২০১২ সালে পৃথিবী ধ্বংস হবে। অগ্ন্যুৎপাত, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আগ্নেয়গিরি, ঝঞ্ঝা পৃথিবীতে আকুল করে তুলে শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাবে। এ নিয়ে বই লেখা হয়েছে, সিনেমাও তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশেও কেউ কেউ এ বিশ্বাস পোষণ করছেন। এ ক্যালেন্ডারের সংখ্যাতত্ত্ব এখন অনেক মানুষের বিশ্বাসের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যেমন ঘটেছে ২০১১ সালের ৩১৫তম দিনটিকে নিয়ে। বছর শেষ হতে বাকি মাত্র ৫০ দিন। অর্থাৎ পৃথিবী ধ্বংসের বহুল প্রচারিত বছরটি এখনও খানিক দূরে। কিন্তু ১১/১১/১১-তে এসে বিশ্বব্যাপী গোল বেধেছে। সারা পৃথিবীতে দিনটি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। জল্পনার ঢেউ এসে লেগেছে আমাদের দেশেও। কোনো কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বলছে, ২০১২ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না_ ১১/১১/১১ অর্থাৎ আজকেই পৃথিবীর শেষ দিন। শুক্রবার হওয়ায় এ আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে গেছে। অবশ্য পৃথিবী ধ্বংসের মতটা তত প্রচার পায়নি। গুরুত্ব হয়েছে বেশ কিছু ইতিবাচক ব্যাপার। ১১ সংখ্যাটি বহু মানুষের কাছে সৌভাগ্যের সূচক। আর আজ তো ক্যালেন্ডারে ১১'র আধিপত্য। পুরো ১০০ বছর পর এমন এগারোময় দিন এলো। ১৯১১ সালে এমনকি ১৮১১ সালেও এমন দিন এসেছিল। আগামী ১০০ বছর পরপর এমন দিন আসতেই থাকবে। কিন্তু মানুষের জীবনের জন্য ১০০ বছর এখনও লম্বা সময়। তাই অনেকের ভাগ্যেই তিনটা ১১ দেখার ভাগ্য হয় না। যাদের হয়েছে তারা দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চাইছেন। সৌভাগ্যের দিন হিসেবে অনেকে চাইছেন এ দিনে বিয়ে করতে। গর্ভবতীরা মা হতে চাইছেন এ দিনটিতে। পৃথিবীর অনেক স্থানে রীতিমতো বিয়ে আর সন্তান প্রসবের বিপুল প্রস্তুতি চলছে। সবার নজর বিভিন্ন অদ্ভুত ঘটনার দিকে। যেমন খবর মিলেছে এক জোড়া যমজ শিশু আজকেই ১১ বছরে পড়তে যাচ্ছে। তাদের জীবনে ১১ বিশেষ প্রসঙ্গ হয়ে আসছে। ভারতে বাজিকররা ব্যস্ত অনাগত এক শিশুকে নিয়ে। অমিতাভ বচ্চনের নাতি, অভিষেক আর ঐশ্বরিয়ার যমজ কন্যার জন্ম হওয়ার কথা নাকি ১১ নভেম্বর। এ নিয়ে বাজিকররা কোটি কোটি টাকা ইতিমধ্যে লগি্ন করে ফেলেছেন। ১১ উদ্যাপনের পেছনে মানুষের নির্ভেজাল আনন্দ উপভোগের আয়োজন আছে সত্য, কিন্তু সঙ্গে আছে অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারেরও নানা প্রভাব। আর এ কুসংস্কারগুলো তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবে পুরো পৃথিবীতেই ছড়িয়েছে। ফলে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার মতো বড় ঘটনা না ঘটলেও ছোটখাটো কিছু অঘটন যে ঘটবে তা বলাই বাহুল্য। আজ যা ঘটবে তা আগামীকালের সংবাদপত্রে নিশ্চয় আমরা জানব। কিন্তু ১৯১১ সালের ১১ নভেম্বর কী ঘটেছিল তা জেনে নেওয়া যেতে পারে। তখন পৃথিবী এত কানেকটেড ছিল না। ফলে সারা পৃথিবীর কোথায় কী ঘটেছিল তা জেনে নেওয়া কঠিন। এটুকু জানা যায়, এদিনে যুক্তরাষ্ট্রে মিড-ওয়েস্টার্ন রাজ্যগুলোতে তাপমাত্রা বিকেলে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছিল আর রাতে সর্বনিম্ন হয়েছিল। খুব অবাক করার ব্যাপার বটে। এবার তেমন অবাক করার ব্যাপার ঘটবে কি? পৃথিবীর জন্য শুভ ও সুন্দর কিছু ঘটুক, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিবাহ ও সন্তান জন্মদানের নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রিয় পৃথিবীর কল্যাণই কামনা করছি এবং সেটাই আপাতত সুখবর।

Monday, October 31, 2011

তাতা

তাতা বললে সহসা তাকে কারও চিনতে পারার কথা নয়। যদি বলা হয় মানিকের বাবা তাহলেও চেনা কঠিন। নামডাক ও ডাকনামের মধ্যে একটা সংঘর্ষ আছে। কারও নামডাক হলে তার ডাকনামটা সকলেই ভুলে যায়। যেমন সুকুমার রায়ের ডাকনাম যে তাতা সেটি তার নামডাকের পর অনেকেই ভুলে গেছে। তাকে যারা ডাকনামে ডাকতেন তাদের অনুপস্থিতি বড় কারণ বটে। কিন্তু শিশুদের কাছে ডাকনামের গুরুত্ব অনেক। ছোটরা ডাকনামেই অভ্যস্ত। ফলে তারা যখন শোনে যার ছড়া পড়ে তারা খুব পছন্দ করছে তার নাম তাতা, তবে নিজেদের একজন ভেবে নিতে সহজ হওয়ার কথা। তাতার কথা লোকে ভুলে গেলেও তাতার ছেলে মানিকের কথা অবশ্য অনেকেরই মনে থাকার কথা। চলচ্চিত্র অঙ্গনে এমন বহু মানুষ এখনও জীবিত যারা সত্যজিৎ রায়কে মানিকদা বলে ডাকতেন। তারা যখন সত্যজিৎ প্রসঙ্গে লিখেছেন তখন আমরাও জেনে গেছি যে ছোটদের প্রিয় চলচ্চিত্রকারের ডাকনাম মানিক। সুকুমার ও সত্যজিৎ দু'জনে বড়দেরও বেশ প্রিয়। সুকুমারের বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও ছোটদের বিশেষ পছন্দের নাম। রায় পরিবারের কথা বিশেষভাবে উঠছে, কারণ গতকাল ছিল তাতা অর্থাৎ সুকুমার রায়ের জন্মদিন। জন্মদিনের বাসি লেখা লেখার রেওয়াজ পত্রিকায় নেই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, বাংলাদেশে বোধহয় কারোই মনে ছিল না, কবে সুকুমার রায়ের জন্মদিন। আমারও মনে ছিল না। জন্ম ও মৃত্যুদিবসকে কেন্দ্র করে আমাদের আয়োজন কয়েকটা তারিখকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ২৫ বৈশাখ, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ২২ শ্রাবণ আমরা বেশ ঘটা করে পালন করি। এ দিনগুলোকে একেবারে জাতীয়ভাবে পালনীয় দিন বটে। কোনো কোনো দিবস ঘিরে মাস এমনকি বছরভর অনুষ্ঠানও হয়। মজার ব্যাপার, অনেকের অনেক পছন্দের কবি জীবনানন্দের জন্ম-মৃত্যুদিন কিন্তু অত ঘটা করে পালিত হয় না। এর কারণ কী? কেন বাৎসরিক রিচুয়ালের অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না স্মরণযোগ্য বাকি দিনগুলো? শুধু দু'চারজন বড় কবিকে স্মরণ করলেই কি দায় চুকে যায়? নতুন প্রজন্মের কাছে অন্যদের কথা পেঁৗছাবার দায় কার? সমালোচকরা বলেন, রিচুয়াল মেনে কাউকে স্মরণ করলে তাকে আত্মস্থ করা যায় না। এটা বহিরঙ্গের দিক। কিন্তু অন্তরে কোনো সাহিত্যিককে ধারণ করতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে, সাহিত্যকে ধারণ করতে হবে। কিন্তু রিচুয়ালের বহিরঙ্গেও কিন্তু অনেক মেসেজ থাকে। স্কুল পড়ূয়া শিক্ষার্থীরা কিন্তু এসব দেখে বুঝতে শেখে। তাদের কাছে, প্রিয় ও প্রয়োজনীয় মানুষগুলোকে তুলে ধরাও কিন্তু কর্তব্য। সেদিক থেকে সুকুমার রায় শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় সাহিত্যিক। প্রিয় তো বটেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় বলার পেছনে বিশেষ কারণ হলো, সুকুমার রায়ের গুরুত্ব ছোটদের জন্য এখনও সমান। অনেকেই বলেন, ছোটদের জন্য লেখা খুব বেশি এগোয়নি। কোথায় যেন থমকে আছে। অথচ শিশুদের জন্য তো ছড়া দরকার। গল্প দরকার। এখনও ছড়ার জন্য সুকুমারের কাছেই হাত পাততে হয়। ইংরেজি ভাষায় নার্সারি রাইমস বলে যে ছড়ার বিপুল সম্ভার আছে তার সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন বাংলা ছড়া নেই।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ইংরেজি ছড়াগুলো ইংরেজি ভাষাভাষী সব দেশে এমনকি ইংরেজি মাধ্যমের সব স্কুলে ছড়িয়ে গেছে। তুলনায় বাংলা ছড়ার কী হাল? সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, শিশুদের জন্য সহজবোধ্য ছড়া কয়টি? তাই ছোটদের স্বার্থেই সুকুমার রায়কে স্মরণ করা দরকার। এখনও যদি ছোটদের জন্য সমৃদ্ধ সাহিত্যের ভাণ্ডার তৈরি না হয়, তবে কবে হবে? সুকুমার এখানে আমাদের অনেক কিছু শেখাতেও পারেন।

Thursday, October 27, 2011

কে হতে চায় কোটিপতি?

ভারতের সনি বা বাংলাদেশের দেশটিভিতে যারা 'কৌন বানেগা ক্রোড়পতি' বা 'কে হতে চায় কোটিপতি' অনুষ্ঠান দুটির নিয়মিত দর্শক, তাদের অনেকের কাছে হয়তো এমন কুইজ শোতে অংশ নিয়ে কোটিপতি হওয়াটাই সহজ পন্থা। কিন্তু কুইজ শো ছাড়া কোটিপতি হওয়ার আর উপায় কী? শোনা যায়, দেশে এখন হাজার হাজার কোটিপতি আছে। তাদের কাছে জেনে নেওয়া যেতে পারে কোটিপতি হওয়ার উপায়। কিন্তু কোটিপতিরা কোটিপতি হওয়ার গল্প কি সহজে বলেন? টাকা বানানোর জাদুর প্রদীপ যাদের হাতে তারা সহজে প্রদীপের রহস্য ফাঁস করতে চান না। ঠেকে ঠেকে শিখতে হয়। যারা বাঁকা চোখে দেখতে অভ্যস্ত তারা বলেন, এমন অনেক কোটিপতি আছেন যারা কখনও কোটিপতি হওয়ার গল্পটি বলতে পারবেন না। কেননা, কোটিপতি হওয়ার অনেক পথই বন্ধুর, সাধারণ দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য বলেও বিবেচিত হতে পারে। তবু কিছু গল্প প্রেরণাদায়ক। সে গল্পগুলোও বলা যায়, শোনা যায়। সত্যি কথা বলতে, নতুন প্রজন্মের কাছে কোটিপতি হওয়ার ভালো গল্পগুলো পেঁৗছানো দরকার। শচীন বনশাল ও বিনি্ন বনশালের গল্প এ দেশের কোটিপতিদের উৎসাহিত করতে পারে। গল্পটি ছাপা হয়েছে ইকোনমিস্টের চলতি সংখ্যায়_ ভারতের বাণিজ্য নিয়ে বিশেষ আয়োজনে। এ দু'জন ভাই নন, আত্মীয়ও নন। কিন্তু দু'জনের মিল দারুণ। দু'জনেই বড় হয়েছেন চণ্ডীগড়ে, দিলি্ল আইআইটিতে পড়েছেন, একটি আমেরিকান ফার্মে কাজ করেছেন। দুই বছর কাজ করার পর নিজেদের ১০ হাজার ডলারের সঞ্চয় নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে শুরু করেছেন ই-কমার্সের একটি উদ্যোগ। ব্যবসা শুরুর সাল ২০০৫। অ্যামাজন ডটকমের মতো একটি সাইট শুরু করেছিলেন তারা। নাম ফ্লিপকার্ট। বই বিক্রি দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে আরও পণ্য যুক্ত হয়েছে তাদের তালিকায়। এখন ওয়েবসাইটের রেজিস্টার্ড ইউজার ১০ লাখ। আর মাসে বিক্রি এক কোটি ডলার। এমন অবস্থানে পেঁৗছাতে দীর্ঘ একটি পথ পাড়ি দিয়েছে ফ্লিপকার্ট। ভারতের ই-কমার্সের অবস্থা এখন কিছুটা উন্নত হলেও পাঁচ বছর আগে আমাদের দেশের মতোই ছিল। অনলাইনে কেনাকাটা প্রায় অসম্ভব কাজ। অনলাইনে কেনাকাটার জন্য অনলাইন ব্যাংকি বা ক্রেডিট কার্ড সিস্টেম উপযুক্ত নয়। পে-পালের মতো নিরাপদ কেনাকাটার সাইট ভারতে চালু কিন্তু খুব বেশি মানুষ এটি ব্যবহার করেন না। অনলাইনে কিছু বিক্রি করে টাকা আয় করা কঠিন। শুধু পেমেন্ট বা ব্যাংকিংই নয়, ক্রেতা যে জিনিসটি কিনলেন সেটি ক্রেতার কাছে পেঁৗছানোও কঠিন। কেননা, ভারতে ডিএইচএলের মতো কুরিয়ার সার্ভিস নেই। স্থানীয় কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর ওপর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করতে পারেনি ফ্লিপকার্ট। ফলে তারা চালু করেছে এক অভিনব পদ্ধতি_ পিওডি_ পেমেন্ট অন ডেলিভারি। ফ্লিপকার্ট ডটকমে কেউ কোনো বইয়ের অর্ডার করলে দুই থেকে চারদিনের মধ্যে ফ্লিপকার্টের কর্মী পেঁৗছে যাবে ক্রেতার বাড়িতে, বই বুঝিয়ে দিয়ে দাম নিয়ে আসবে। এভাবে অনলাইন পেমেন্টের জটিলতা এবং পেঁৗছানোর সমস্যা দুটিকেই জয় করেছে ফ্লিপকার্ট। অবশ্য যারা ক্রেডিট কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিং বা পে-পালের মাধ্যমে কিনতে চান তাদেরও সুব্যবস্থা আছে। কিন্তু মাল পেঁৗছানোর দায়িত্ব ফ্লিপকার্টের কর্মীদের। আর তাদের তৎপরতা দেখে বড় গ্রুপ ও কোম্পানিগুলোও এখন ফ্লিপকার্টের মাধ্যমে বিকিকিনি করতে উৎসাহী হচ্ছে। ফ্লিপকার্টকে বলা হচ্ছে, আরেক ইনফসিস। ভারতীয় উদ্যোগে বিশাল এক আইটি সংস্থা ইনফসিস। প্রশ্ন হলো, শচীন ও বিনি্নর মতো উদ্যোগ কি বাংলাদেশে শুরু হতে পারে? ভারতের সঙ্গে তুলনীয় হলেও আমাদের অবস্থা অনেক খারাপ। এখানে কেউ যদি একটি ওয়েবসাইট খুলতে চান তবে সোজাসুজি ডোমেইন হোস্টিং পর্যন্ত কিনতে পারবেন না। কিছু কিনে দেশের বাইরে টাকা পাঠাবার সহজ উপায় নেই। অনলাইন ব্যাংকিং বলে যে ব্যাপারের কথা শোনা যায় তার সঙ্গে ই-কমার্সের যোগাযোগ সামান্য। পে-পাল চালু হয়নি হাজার দাবি সত্ত্বেও। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে অনলাইনে কেনাকাটার নজির খুব কম। এ অবস্থায় অ্যামাজনের মতো সাইট এখানে চালু করা মুশকিল। সে ক্ষেত্রে ফ্লিপকার্ট বিশেষ সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে পিওডি সিস্টেম জ্যামের শহরে জনপ্রিয় হতে পারে।