Monday, October 24, 2011

আরব রাজনীতির পিকাসো

লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির পতন তখন আসন্ন। সবাই ভাবছেন ক্ষমতার চূড়া থেকে পতনের পর এখন কী করবেন কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি? গণমাধ্যমে জোর গুজব দেশ ছেড়ে সপরিবারে পালাচ্ছেন গাদ্দাফি। সে সময়ও তিনি বলেছেন, 'আমি এই ভূমি ছেড়ে কোথাও যাব না। এখানেই যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হব।' দেশবাসীর উদ্দেশে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে তারা ঘর ছেড়ে ময়দানে, রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ করেন বিদ্রোহী সেনাদের। দীর্ঘদিনের অপশাসনে ক্লান্ত, ত্যক্ত-বিরক্ত মানুষ তার পক্ষে নেমে আসেনি। বরং বিদ্রোহীদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছে। কিন্তু কথা রেখেছেন গাদ্দাফি। ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এনটিসি) যোদ্ধারা যখন একের পর এক শহরের পতন ঘটিয়ে গাদ্দাফির জন্মস্থান সিরতের দিকে এগোচ্ছিল, তখনও তিনি দেশে ছিলেন। সিরতের চূড়ান্ত পতনের সময়ও তিনি যুদ্ধরত ছিলেন। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা যাচ্ছে, সিরতেই তিনি আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন। গ্রেফতারকৃত অবস্থায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এনটিসির শীর্ষ মুখপাত্র মাহমুদ শাম্মাম বলেছেন, কর্নেল গাদ্দাফি মারা গেছেন। 'আজ নতুন এক লিবিয়ার জন্ম হলো। এটাই প্রকৃত মুক্তির দিন। আমরা তার বিচার করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিলাম। আল্লাহর হয়তো অন্য ইচ্ছা ছিল।' এভাবেই তার মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করেছেন শাম্মাম। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর পর আরব বিশ্বে তিনিই ছিলেন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর চক্ষুশূল একমাত্র জীবিত নেতা। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৩-এ গ্রেফতারের পর বিচারের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর ২০০৬ তারিখে। কর্নেল গাদ্দাফি কোনো বিচারের মুখোমুখি হতে পারলেন না। ২০ অক্টোবর ২০১১ তারিখটিই ইতিহাসে তার মৃত্যুদিন হিসেবে লেখা
থাকবে। তবে, অনেক বিষয়ে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে তার মিল। সাদ্দামের মতো গাদ্দাফিও আত্মরক্ষা ও পলায়নের জন্য পাতালপুরী ও পাতালপথ তৈরি করেছিলেন। সেগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে আসেনি। ধরা পড়ার মুহূর্তে দুই নেতাই গর্তে লুকিয়ে আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা করেছেন_ এও এক আশ্চর্য মিল।
সংবাদমাধ্যম তাকে বলে লিবীয় একনায়ক। কেউ কেউ বলে লিবীয় নেতা। লিবিয়ায় সীমিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তার পদবি হয় 'ব্রাদার লিডার অ্যান্ড দ্য গাইড অব রেভলিউশন'_ অর্থাৎ নেতাভাই ও বিপ্লবের পথপ্রদর্শক। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য গণআন্দোলন শুরু হলে গাদ্দাফি বলেছিলেন তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা প্রেসিডেন্ট নন। তিনি লিবীয়দের স্বাভাবিক নেতা। দেশের সবাই তাকে ভালোবাসে। তাই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়।
কেউ তাকে বলেছেন খামখেয়ালি, গোঁড়া, কেউ বলেছেন পাগল। তার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও তৈরি করেছেন অনেক নেতা। সম্পর্কের প্রয়োজন ফুরালে আবার তাকেই পাগল বলে গালি দিয়েছেন। গাদ্দাফি বহু বছর পশ্চিমাদের কাছে শত্রু বলে বিবেচিত হলেও নাইন ইলেভেনের পর তার ও পশ্চিমাদের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটে। তিনিই প্রথম ওসামা বিন লাদেনের গ্রেফতার দাবি করেছিলেন। লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছিলেন। রীতিমতো প্রেমে পড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসের। তাকে প্রিয় আফ্রিকান নারী হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। লিবিয়ার এই পরিবর্তিত মনোভাবকে স্বাগত জানিয়েছিল ওয়াশিংটন, লন্ডনসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ। কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল। এনটিসির যোদ্ধারা আগস্টে গাদ্দাফির প্রাসাদের পতন ঘটানোর পর বেশ কিছু নথিপত্র মিলেছে যাতে বোঝা যায় শেষ সময়ে পাশ্চাত্য শক্তিগুলো তাকে রক্ষার চেষ্টাও করেছিল।
নিজের ও নিজের দেশের জন্য পৃথক একটি রাজনৈতিক দর্শন তৈরি করেছিলেন গাদ্দাফি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ক্ষমতা দখল করার পর নিজেকে মরুর বেদুইন দার্শনিক ও রাজা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি লিবিয়ার নতুন নাম দিয়েছিলেন_ দ্য গ্রেট সোশালিস্ট পিপলস লিবিয়ান জামাহিরিয়া। আরবি জামাহিরিয়ার অর্থ গণপ্রজাতন্ত্র। তার দর্শন অনুসারে জনগণ ক্ষমতাশালী হলে ধীরে ধীরে নেতৃত্বের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তিনি স্থায়ী বিপ্লবের দর্শন প্রচার করেছিলেন যা বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র বিতাড়িত হবে।
দেশের মানুষের অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে মাও সে তুংয়ের রেড বুকের আদলে লিখেছিলেন গ্রিন বুক। তাতে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের নানা কৌশল ছিল, সঙ্গে ছিল দেশ গড়ার স্বপ্নও।
ভিন্নধর্মী পোশাক-আশাক ও কথাবার্তার কারণে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাকে অভিহিত করেছিল বৃদ্ধ রকস্টার বলে। যে কোনো আন্তর্জাতিক আসরে সবার নজর কাড়ার মতো ব্যক্তিত্ব ছিল তার। ব্যতিক্রমধর্মী পোশাক, সোজাসাপ্টা কথাবার্তা আর চমকে দেওয়ার মতো ব্যবহার ছিল তার। প্যারিস, রোম এমনকি নিউ ইয়র্ক যেখানেই যেতেন সেখানেই সাদা তাঁবু সঙ্গে নিতেন তিনি। তাঁবু খাটিয়ে তাতে থাকতেন। তাঁবুর দেয়ালে মরুর খেজুর গাছ, উট এবং গাদ্দাফির বাণী থাকত।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। জাতিসংঘে ২০১০ সালে শেষ যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতেও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ আর দুনিয়াজুড়ে তাদের দখলদারিত্বে তীব্র বিরোধিতা ছিল। লিবীয়দের মধ্যে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে যে তীব্র ঘৃণা ছিল তার মূর্ত রূপ ছিলেন গাদ্দাফি। পশ্চিমের দেশগুলো গাদ্দাফির প্রতিটি পদক্ষেপ খেয়াল করত। তিনি তো বটেই, তার রাজনৈতিক দর্শন, তার দেশে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা পৃথিবীতে অনেক হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত হয়েছে। বিশেষত লকারবি বোমা হামলার জন্য তাকে দায়ী করা হয়। অভিযোগ যাই থাকুক। তিনি যে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সাহসী ছিলেন এ বিষয়ে তার চরম শত্রুও সন্দেহ পোষণ করবে না। একজন আরব বিশ্লেষকের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, তাকে সম্প্রতি আরব রাজনীতির পিকাসো হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। বিশ্বখ্যাত চিত্রকর পাবলো পিকাসোর শিল্পী জীবনে যেমন ছিল ব্লু, রোজ, কিউবিস্ট নানা কালপর্ব তেমনি গাদ্দাফির জীবনেও ছিল প্যান-আরব, ইসলামিস্ট এবং প্যান-আফ্রিকান পর্ব। ৪২ বছরের অধিক সময়ে ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলেছেন গাদ্দাফি। আরব ঐক্য, মুসলিম ঐক্য, আফ্রিকান ঐক্যের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের ধুয়াও তুলেছিলেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে গোপন ও প্রকাশ্য বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৪২ সালে সিরতের কাছে এক আরব বেদুইন তাঁবুতে গাদ্দাফির জন্ম। তিনি ছিলেন গাদ্দাফা নামে আরবদের ছোট এক গোত্রের সন্তান। শৈশবেই তিনি দেখেছেন ইসরায়েলের কাছে আরব বিশ্বের পরাজয়ের নানা নজির। তখন কিশোর হিসেবে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তার কাছে তখনকার নেতা ছিলেন মিসরের গামাল আবদুল নাসের। ১৯৬১ সালে বেনগাজি মিলিটারি একাডেমীতে প্রশিক্ষণ নেন, ১৯৬৬ সালে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন যুক্তরাজ্যে। যখন ক্ষমতা দখল করেন তখন তিনি ছিলেন একজন লেফটেন্যান্ট।
লিবিয়ার ক্ষমতা দখলের উদ্যোগের পেছনেও ছিল কৈশোরের গুরু গামাল আবদুল নাসেরের প্রেরণা। ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তরুণ অফিসারদের সংগঠিত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন গামাল আবদুল নাসের। তরুণ অফিসারদের তৎপরতা 'ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট' হিসেবে পরিচিত হয়েছিল। সে আদলেই ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর তরুণ অফিসারদের নিয়ে অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন গাদ্দাফি।
ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বহুদিন পর্যন্ত আরব জাতিগুলোর মধ্যে ঐক্যের উদ্যোক্তা ছিলেন গাদ্দাফি। তিনি আরব নেতাদের একত্র করার বহু চেষ্টা নিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে পশ্চিমাদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবে। শেষ পর্যন্ত সে আশা পূর্ণ হয়নি। পশ্চিমাদের কৌশলের কারণেই হোক আর নিজেদের মধ্যকার বিবাদের কারণেই হোক আরব নেতারা একত্র হতে পারেননি। তবে আরব দেশগুলোর বহু মানুষ তাকে স্বাধীনচেতা আরব নেতা হিসেবেই গণ্য করেছে। শুধু আরব দেশগুলো নয়, আরব দুনিয়ার বাইরেও মুসলমানরা তাকে সাদ্দামের মতোই সাহসী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখতেন।
আরব বিশ্বের ঐক্যের স্বপ্ন বিফল হলে তিনি মুসলিম ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। তাতেও তেমন সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত তার উপলব্ধি হয় যে আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার নেতা হিসেবে তার কথা আরবরা শুনবে না। ফলে, আফ্রিকার ঐক্যের দিকেই তার মনোযোগ সরে যায়। তিনি বলেন, আরব ঐক্যের কথা তো অনেক বললাম গত ৪২ বছরে, কেউ বুঝল না। এখন আফ্রিকান ঐক্যই আমার লক্ষ্য। এ উপলব্ধি থেকে তিনি আফ্রিকান জাতিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং তাতে কিছুটা সফলও হন। সাম্প্রতিক সংকটে আফ্রিকার নেতা ও গোত্রপ্রধানদের অনেকেই তার পাশে ছিলেন। তার একটি স্বপ্ন আফ্রিকান জাতিগুলো পূরণ করতে পারেনি। তিনি চেয়েছিলেন পুরো আফ্রিকার রাজাদের রাজা হতে। সে আশা পূরণ হয়নি।
যখন তিনি হতে চেয়েছিলেন আফ্রিকার রাজাদের রাজা, তখন নিজের দেশেই তার সিংহাসন টলোমলো। ৪২ বছর তিনি লিবিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ১৯৫৯ সালে তেলের খনি আবিষ্কারের আগে লিবিয়া দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু তেল আবিষ্কারের এক দশক পর্যন্ত তাদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। ১৯৬৯ সালের অভ্যুত্থানের পর লিবীয় সরকার তেল কোম্পানিগুলোতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এবং তাদের ন্যায্য হিস্যা দিতে বাধ্য করে। লিবিয়ার সাফল্য তখন অন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকেও উৎসাহিত করেছিল। রাজস্ব আয় বেড়ে যাওয়ার পর রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর বানাতে শুরু করে গাদ্দাফি সরকার। দেশকে সবুজায়ন করার বিপুল উদ্যোগ নেয়। ১৯৬৯ সালে লিবীয়দের গড় আয়ু ছিল ৫১ বছর, এখন সেটি ৭৪-এ উন্নীত। স্বাক্ষরতার হার এখন ৮৮ শতাংশ। মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১২ হাজার ডলারে পেঁৗছেছে। কিন্তু গণতন্ত্র, আধুনিকতা আর মুক্তির স্বাদ দিতে পারেনি লিবিয়ার জনগণ। এজন্য একা গাদ্দাফিকে দোষারোপ করছেন না বিশ্লেষকরা। আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গণতন্ত্রবঞ্চিত। গণতান্ত্রিক অধিকার সেখানে সীমিত। ফলে, নতুন যুগের হাওয়া লেগে যখন তিউনিসিয়া থেকে সিরিয়া পর্যন্ত লণ্ডভণ্ড হতে থাকল তখন গাদ্দাফির লৌহশাসন অবসানের বীণাও বেজে উঠল। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি গাদ্দাফি। নতুন যুগের চাওয়া অনুসারে নিজেকে ও দেশকে পরিচালনা করতে পারেননি। লিবিয়ায় কোনো সংসদ নেই, একক সামরিক নেতৃত্ব নেই, রাজনৈতিক দল নেই, কোনো গণসংগঠন নেই, নাগরিক সমাজ নেই, এমনকি কোনো এনজিও-ও নেই। একক শাসন পাকাপোক্ত করতে দীর্ঘদিন সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছেন তিনি। দেশবাসীর গণতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিহত করতে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেছেন। সেই যুদ্ধের পরিণতিতেই বিদায় নিতে হলো তাকে, হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে। কেননা, মুক্তির জন্য দেশবাসীর চূড়ান্ত মুক্তি সংগ্রামে প্রধান শত্রু তিনি। আরব বেদুইন তাঁবুতে যে ইতিহাসের শুরু হয়েছিল একদিন সেই তাঁবুর কাছে সে ইতিহাসের যবনিকাপাত ঘটল। গাদ্দাফির পর নতুন যুগের সূচনা ঘটল বটে কিন্তু লিবিয়া কী মুক্ত হলো নাকি নতুন শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়ল সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে এখনই।

Wednesday, October 19, 2011

মহাবন্যা

বন্যাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের বিশেষ পরিচয় আছে। শোনা যায়, এক সময় দেশের বাইরে বাংলাদেশের অধিবাসী বলে পরিচয় দিলেই বিদেশিদের মুখে মেঘ করে আসত। মুহূর্তেই তারা ভেবে বসতেন এ লোক নিশ্চয়ই বানভাসি, নয়তো সাইক্লোনতাড়িত, নয়তো কোনো ঝড়ে এর ভিটেমাটি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। এখনও এই পরিচয় পুরোটা ঘোচেনি। তবে দুর্যোগতাড়িত বাঙালির আরও নানা পরিচয় জুটেছে বিশ্বের দরবারে। আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিচয় আছে। সঙ্গে আছে প্রবাসী, অনাবাসীদের নানা সুকৃতিও। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বললে বন্যায় প্লাবিত সেই বিস্তীর্ণ ভূভাগের কথা সহসা চোখে ভাসে না। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা কম হয়েছে। কিন্তু বন্যার বাস্তবতা তিরোহিত হয়েছে বলে মনে হয় না। এ দেশে সবাই জানেন, বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। তাতে জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে। দেখার মতো প্রস্তুতি না থাকলেও মনে মনে সবাই প্রস্তুত থাকে। নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করলেই নানা আশঙ্কায় সকলে দিন গুনতে থাকে। এমন বন্যাপ্রবণ দেশ হিসেবে পৃথিবীর কোথায় বন্যা হচ্ছে তার খোঁজখবর রাখাটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিককালের কয়েকটি মহাবন্যার খবরও এ দেশের মানুষকে তেমন দোলা দিয়েছে বলে মনে হয় না। মহাপ্লাবনের কথা আমরা ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ, পুরনো সাহিত্য থেকে জানি। সাম্প্রতিক এ ঘটনাগুলোকে অনেকে মহাপ্লাবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু আপাতত মহাবন্যা বললেই বোঝা যাবে এগুলোর আকার-প্রকার। থাইল্যান্ডের মহাবন্যা প্লাবিত করেছে চাও ফারিয়া নদীর দুই কূল। বন্যা এখনও চলছে। ছড়িয়েছে মেকং নদীতেও। সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে অক্টোবরে বন্যা বিস্তীর্ণ এলাকার জনজীবনকে প্লাবিত, পর্যুদস্ত করে তুলেছে। সেখানকার বন্যার সচিত্র খবর প্রতিদিনই বাইরের পত্রিকাগুলোতে দেখা গেলেও আমাদের পত্রপত্রিকাগুলোতে কিন্তু এখনও দেখার মতো করে ছাপা হচ্ছে না। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মহাবন্যার তেমন খবরও আমরা দেখিনি। কুইন্সল্যান্ড ও ভিক্টোরিয়ার বিপুল অঞ্চল ২০১০-১১তে পুরো তলিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি, প্লাবন ও ঢলে মানুষের জীবন অচল হয়ে গিয়েছিল। তখন বাইরের পত্রিকাগুলোতে এ বন্যাকে মহাপ্লাবন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এমনকি সার্কভুক্ত পাকিস্তানের বন্যাও আমাদের এখানে বড় খবর তৈরি করতে পারেনি। প্রায় ৩০ লাখ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়েছিল ২০১০ সালে। জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। পাকিস্তানে বোমা বিস্ফোরণ বা এমন কিছু ঘটলে তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায়। অথচ বন্যায় ২০ মিলিয়ন মানুষ প্রচণ্ড দুর্বিপাকে কাটাল সে খবর আমরা নিলামই না। বন্যা এবারও হয়েছে পাকিস্তানে। ২০১০-এর মতো না হলেও এবারের বন্যার ভয়াবহতাও কম নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নানা খবরকে ছাড়িয়ে সে বন্যার খবর আমাদের কানে পশতে পারেনি। পৃথিবীতে বড় ঘটনা ঘটলে তা প্রচার পাওয়ার কথা। এর নিজস্ব রীতি আছে। পাঠক পড়তে চায়। কিন্তু বন্যার ব্যাপারটা আলাদা। আমরা যখন পাশের দেশে এশিয়ায় বন্যার খবর নিচ্ছি না, বিচলিত হচ্ছি না তখন আমাদের দেশে বন্যা, সাইক্লোন হলে পাশের দেশগুলোর মিডিয়ায় তা ফলাও করে প্রচার হবে এটি কীভাবে আশা করব? আমরা কি তখন বলব, বাংলাদেশের খবর বিশ্বমিডিয়ায় উপেক্ষিত? আমরা যখন দায়িত্ব পালন করি না তখন অন্যদের দায়িত্ববোধ কীভাবে আশা করব?

Monday, October 17, 2011

সে আগুন ছড়িয়ে গেল

টাইম ম্যাগাজিন সাধারণত তাদের প্রকাশিতব্য সংখ্যাটি ছাপা কাগজে প্রকাশের আগেই ইন্টারনেটে প্রকাশ করে। ইন্টারনেটের সুবিধা হলো সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া, ইউরোপ এবং সাউথ প্যাসিফিকের চারটি সংস্করণই পরপর দেওয়া থাকে। চাইলে যে কেউ যে কোনো সংস্করণ পড়তে পারেন। ছাপা কাগজে যারা টাইম ম্যাগাজিন পড়েন তাদের সে সুযোগ থাকে না। এশিয়ার দেশগুলোর পাঠকরা এশীয় সংস্করণই সাধারণত বাজারে কিনতে পারেন। ইন্টারনেটের সুবিধা হলো, প্রতিটি সংস্করণ মিলিয়ে পড়া যায়। তাতে সূক্ষ্ম ও স্থূল অনেক পার্থক্য থাকে। যেমন, একবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সংস্করণের একটি লেখার শিরোনাম দেওয়া হয়_ 'আফগানিস্তানে আমরা কী করছি?' আবার এশিয়া ও সাউথ প্যাসিফিক সংস্করণে একই লেখার শিরোনাম_ 'আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র কী করছে?' পার্থক্যটা খেয়াল করার মতো। ২৪ অক্টোবর টাইম ম্যাগাজিনের যে সংখ্যা প্রকাশ হবে তার তিনটি সংস্করণের বিষয় একই, সেই আফগানিস্তান_ 'কেন যুক্তরাষ্ট্র কখনও আফগানিস্তানকে বাঁচাবে না?' কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রকাশিত সংস্করণের বিষয়_ 'নিশ্চুপ সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাবর্তন'। 'দ্য রিটার্ন অব দ্য সাইলেন্ট মেজরিটি'। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে অনেকের আগ্রহ আছে। সবাই বুঝতে চান কী ঘটছে। বোঝার ক্ষেত্রে টাইমের পর্যবেক্ষণ অবশ্যই প্রভাব ফেলে। তারা যেভাবে বিষয়টাকে নিশ্চুপ সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তাকে অনেকেই যথার্থ মনে করবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করপোরেট কোম্পানিগুলোর যে একাধিপত্য তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাদেরই রমরমা। সাধারণের মতের বিশেষ গুরুত্ব নেই। মত দেওয়ার সুযোগও নেই। সেখানকার সমাজে জনমত বলে যে বিষয়টির অস্তিত্ব তাও করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে বহুকাল সাধারণের কথা সেখানে শোনা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মন্দার সময় সাধারণ লোকে ভুগেছে, চাকরি হারিয়েছে, কষ্টে দিনযাপন করেছে। কিন্তু খুব বেশি প্রতিবাদ রাস্তায় দেখা যায়নি। কিন্তু এবার মন্দার পূর্বাভাসেই রাস্তা ফুঁসে উঠেছে। মার্কিনরা ওয়ালস্ট্রিট দখলের কর্মসূচি দিয়েছে। ওয়ালস্ট্রিট সেখানে করপোরেট কোম্পানি, ব্যাংক-বীমার আখড়া। ওয়ালস্ট্রিটমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বার্তা দিতে চাইছে মানুষ। সরকার, রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় করপোরেট আধিপত্যের অবসান চাইছে। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট বা ওয়ালস্ট্রিট দখলের কর্মসূচি যারা পালন করছে তাদের অধিকাংশই তরুণ। কোনো কোনো পত্রিকায় তাদের কিডস বা নিতান্তই বাচ্চা বলে অভিহিত করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, বাচ্চা ছেলেদের আন্দোলন কিন্তু বাচ্চা থেকে ক্রমে বড় হচ্ছে। আমেরিকার আন্দোলন ইউরোপ ছাড়িয়ে আফ্রিকা পর্যন্ত দোলা দিয়েছে। সর্বত্র করপোরেটবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট মুভমেন্ট দেখে অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, এবার টুইটার ফেসবুকের ঘরেই আগুন লাগল। টুইটার ফেসবুকের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর জন্মস্থান আমেরিকা। কিন্তু এ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আরব বিশ্বে একটির পর একটি দেশ স্বাধীন হচ্ছে। তরুণরা বড় বড় আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে। এমনকি ভারতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানেও প্রযুক্তির বিপুল প্রভাব। এসব দেখে উৎসাহিত হয়েছে আমেরিকার তরুণরা। তারা প্রশ্ন করেছে, ওখানে হলে এখানেও সম্ভব নয় কেন? লেডি গাগার ভক্ত, জাস্টিন বেইবারের অনুরক্ত, ঘরকুনো স্বভাবের, চ্যাটে মগ্ন একটি প্রজন্ম ভার্চুয়াল বাস্তবতার পর্দা ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসছে। পরস্পরের সঙ্গে আগুন ভাগ করে নিচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তারা কি আনতে পারবে নতুন যুগ? এই পৃথিবীর মধ্যে আরেকটি পৃথিবীর উত্থানের সম্ভাবনা কি আসন্ন?

Tuesday, October 11, 2011

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

গায়কদের নিয়ে সাধারণের বিস্ময়ের সীমা নেই। শুধু সাধারণ কেন, অসাধারণ গীতিকার, কবি ও বিদগ্ধ একজন মানুষও যখন প্রশ্ন করেন, তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, তখন বোঝা যায় সুরের এক অদেখা ক্ষমতা আছে। কবির মতো সকলেই অবাক হয়ে গান শোনে। দেখে, সুরের আলো ভুবন ছেয়ে ফেলছে, পাষাণ ছিন্ন করে ব্যাকুল বেগে সুরের সুরধুনী বয়ে চলেছে। অমন সুরে গাইবার আকাঙ্ক্ষা জাগলেও কণ্ঠে সবার সুর মেলে না। কথা বলতে গিয়েও বেধে যায়। ফলে প্রাণ কাঁদে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মানুষও যখন ভাবেন গানের গুণী তার চারধারে সুরের জাল বুনে তাকে এক ফাঁদে ফেলেছেন তখন সাধারণ শ্রোতাদের হাল কী তা বলাই বাহুল্য। আমাদের প্রিয় কবির এ গানের কথা আবারও মনে পড়ে গেল সঙ্গীতগুরু জগজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর খবরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার গানে মজেছে, তার সুরে সুর ভেজেছে_ তার বাণীতে নিজেদের মর্মবেদনার প্রকাশ দেখেছে। এক প্রজন্ম চলে গেলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও তার আবেদন একটুকু কমেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও পরিবর্তিত হয়েছেন। গজলের পরবর্তীকালের গায়করা তাকে গুরু মেনেই গেয়েছেন। এমনকি যে বাংলা ভাষায় গজলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নেই, সে ভাষাতেও গজল গেয়ে তিনি দর্শকদের মোহিত করেছেন। জগজিৎ সিং বললেই বহু বাঙালির কাছে সেই মধুর বাণী গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে_ বেদনা মধুর হয়ে যায়, তুমি যদি দাও। কিংবা আজ কিছু হতে চলেছে, বেশি কিছু আশা করা ভুল, তোমার চুল বাঁধা দেখতে দেখতে...। এসব গান বহু বছর ধরে শোনার পরও কারও কি মনে হয়েছে, এ শিল্পী পাঞ্জাবি? এ প্রশ্ন আজও শুনিনি। তাতেই অবাক লাগছে। গায়করা কেমন গুণী? যে ভাষা তার নয়, সে ভাষাতেও তারা হিল্লোল তোলেন কীভাবে? শুধু বাংলাই তো নয়_ মাতৃভাষা পাঞ্জাবির বাইরে তিনি গেয়েছেন হিন্দি, গুজরাটি, উর্দু, সিন্ধি এমনকি নেপালি ভাষাতেও। ভারতের শিল্পীদের মধ্যে যারা বড় তারা সাধারণত এক ভাষায় আটকে থাকতে চান না। এক ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে বহু ভাষায় ছড়িয়ে যেতে চান। তারা সর্বভারতীয় বলে আখ্যায়িত হন। জগজিৎ সিং অবশ্য সর্বভারতীয় শুধু নন, তিনি ভারতের গণ্ডি ছড়িয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয়। তার মৃত্যুর খবরে ভারতের মতো শোকগ্রস্ত হয়েছেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মানুষও। কেউ স্মরণ করছেন তার বাংলা গানের কথা। কেউ বলছেন, মির্জা গালিব টিভি সিরিয়ালে গালিবের কথায় তার গানের কথা। কেউবা ভাজছেন হিন্দি সিনেমায় গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর স্মৃতি। ৭০ বছর খুব কম সময় নয়, তার কাজের ব্যাপ্তিও কম নয়। তবু এই সেদিন পর্যন্ত যিনি সচল ছিলেন, স্টেজে লাইভ পারফরম্যান্সে মাতিয়েছেন সবাইকে তার চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়। মানব কী? গায়কের মৃত্যু হলে গান থাকে, কবিদের মৃত্যু হলে কবিতা থাকে। মানব কি তবে মানুষের কর্মের সারাৎসার? যারা জগজিৎ সিংয়ের গান শুনেছেন সরাসরি, দেখেছেন তাকে_ তাদের বাইরে বিপুলসংখ্যক শ্রোতার কাছে তিনি শুধুই গান। এক প্রজন্মের কাছে তিনি গ্রামোফোনের গান, আরেক প্রজন্মের কাছে ক্যাসেট প্লেয়ারের গান, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কমপ্যাক্ট ডিস্কের গান। গান শুনে শুনেই তার সম্পর্কে একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন শ্রোতারা। তার মৃত্যু হলেও তিনি থাকবেন তেমনি। তার গান থাকবে। শিল্পের, কল্পনার, অনুভবের জগৎ ফুরাবে না। কিন্তু বাস্তবের যে জগজিৎ সিং তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আর কোনো দিন লাইভ আসরে তাকে দেখতে পাবে না কেউ।

Wednesday, September 21, 2011

পশ্চিমের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার ৭শ' বছর আগে নালন্দা স্থাপিত হয়েছিল

অমর্ত্য সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তি নিকেতনে। অমর্ত্য সেনের পরিবারের নিবাস ছিল পুরান ঢাকার ওয়ারীতে। কৈশোরে কিছুকাল ঢাকায় থেকেছেন তিনি। এখানেই তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বাংলার সংস্কৃতি, জীবন, মানুষ, অভাব, দুর্ভিক্ষ অমর্ত্য সেনের পরবর্তী কর্মকাফ্ফে বিশেষ ভহৃমিকা পালন করেছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একাধারে দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক হিসেবেও খ্যাত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও দর্শনের অধ্যাপক তিনি। কয়েক বছর আগে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা পুনর্গঠনের কাজ হাতে নিয়েছেন তিনি। শত ব্যস্ততার মধ্যেও ইতিহাসের দায় থেকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তী পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৮ সালে নোবেল বিজয়ী এ অর্থনীতিবিদের কাছে নালন্দা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রেরণা। বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম কেন্দ্র নালন্দা পুনর্গঠনে ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি এশীয় দেশ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নালন্দা ভারতের বিহারে অবস্থিত। অতীতে বৌদ্ধ মতবাদ শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্যোতির্বিদ্যা, রাজনীতি, ওষুধশাস্ত্র এবং শিল্পকলা বিষয়ে পাঠ দেওয়া হতো। ১১৯৭ সালে ধ্বংসের আগে এ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বেরর নানা প্রান্ত থেকে আসা ১০ হাজার শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করেন। নালন্দা পুনর্গঠন নিয়ে এশিয়া সোসাইটি পত্রিকায় ড. সেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শ্রেয়া সিনহা। সাক্ষাৎকারটি সমকালের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করা হলো।  ভাষান্তর : মাহবুব মোর্শেদ


 প্রাচীন নালন্দায় অমর্ত্য ও সহযোগীরা
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্টতা কী ছিল?
প্রাচীন নালন্দা ছিল পুরোপুরি বিদ্যার অনুধ্যানে নিয়োজিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য নিবেদিত। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন ও তা রক্ষার এমন এক ঐতিহ্য নালন্দা তৈরি করেছিল যে চীন, জাপান, কোরিয়া ও পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকে এখানে শিক্ষার্থীরা আসতে উদ্বুদ্ধ হতেন। শুরুতে বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে এটি চালু হলেও নালন্দা শিক্ষা কার্যক্রম শুধু বৌদ্ধ মতবাদে আবদ্ধ ছিল না। সেক্যুলার বিষয়, যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভাষাতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির সুখ্যাতি ছিল। নালন্দা গুপ্তদের মতো হিন্দু রাজাদের আনুকূল্য পেয়েছে, বাংলার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারাও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সহায়তা দিয়েছেন। কোনো অর্থেই এটি বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং এটি জ্ঞান ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ঐতিহ্য ধারণ করে মানবিক অশান্তি থেকে মুক্তির পথ খুঁজত। একই সঙ্গে এটি ছিল আধুনিক প্রতিষ্ঠান। নালন্দা সে সময়ে অবশ্যই আধুনিক ছিল। ধর্মের বাইরের বিষয়, যেমন জ্যোতির্বিদ্যা। মানুষের কাজে লাগে এমন বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হতো, যেমন স্বাস্থ্যসেবা।
নালন্দার ভবিষ্যৎ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
এ বিশ্ববিদ্যালয় মানবজাতির সামনে যে রূপকল্প হাজির করেছিল তা ছোটবেলায় প্রথম নালন্দা দেখার দিন থেকেই আমার মধ্যে আত্মস্থ হয়ে গিয়েছিল। একদিন এ মহান বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনর্জীবন দেওয়ার স্বপ্ন আমি লালন করতাম। কৈশোরে আমি বারবার নালন্দায় গিয়েছি, প্রতিবারই ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্র বিহারে অবস্থিত এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আমাকে আচ্ছন্ন করেছে। যখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার প্রস্তাব দিলেন আমি তার স্বপ্নের সঙ্গে আমার আকাঙ্ক্ষার মিল দেখে খুব আশ্বস্ত হয়েছিলাম। তারা চেয়েছিলেন পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়টির পাশে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় হোক। আমি সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন দেখতে চাই_ অন্তত এর সূচনা দেখতে চাই। সত্য হলো, বিহার অমোচনীয় দারিদ্র্যসহ প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংকটে পতিত। এ অবস্থায় নতুন নালন্দা তাদের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশবিদ্যা, ব্যবস্থাপনার মতো কার্যকর শিল্পগুলো শেখানো হয় তবে তা তাদের কাজে আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বেছে নেওয়া হয়েছে কীভাবে? কোন ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা আপনারা চাচ্ছিলেন?
পূর্ব এশিয়া সম্মেলনের সদস্য দেশগুলোর জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর পদটি উন্মুক্ত থাকার কথা। তারপরও মেন্টর গ্রুপ প্রথম ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে একজন ভারতীয়কেই প্রাধান্য দিয়েছে, যার কাজ করার ও প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। মেন্টর গ্রুপের পক্ষ থেকে সিলেকশন কমিটির কাছে যে চারটি চাওয়া ছিল তা হলো_ ১. প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ২. প্রশাসনিক সক্ষমতা ৩. নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বিষয়ে আগ্রহ ও দায়বোধ ৪. নালন্দায় নতুন ক্যাম্পাসে অবস্থান ও এখানে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয় এবং বিহারের সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।
সিলেকশন কমিটির সদস্যরা অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরামর্শ মোতাবেক সত্যিই যখন বিশ্ববিদ্যালয়টি কাজ শুরু করবে, তখন নালন্দায় থাকার সম্ভাব্যতা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। সময়ে সময়ে যে কোনোভাবেই হোক ভারতীয় পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে নানা খবর বেরিয়েছে। আবাসিক ভাইস-চ্যান্সেলরের বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও পত্রিকাগুলো নানাজনের কাছে অফার পেঁৗছানোর খবর দিয়েছে। সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কমিটি ড. গোপা সাবহারওয়ালকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে এমন তিন ব্যক্তির নাম ভারত সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। ড. সাবহারওয়ালের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা অসাধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে আমাদের পরামর্শক ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সমাজতাত্তি্বক আন্দ্রে বেতেই। তার প্রশাসনিক যোগ্যতাও সুগভীর। তিনি নালন্দা প্রকল্পের প্রতি দায়বদ্ধ। তিনি বিহারের সঙ্গে জড়িত। নালন্দায় অবস্থানের ব্যাপারে তার আগ্রহ অন্যদের থেকে তাকে এগিয়ে দিয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলর নির্বাচনে ক্ষমতার অধিকারী নালন্দা মেন্টর গ্রুপ ড. সাবহারওয়ালসহ তিনজনের নাম সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছে। সরকার ওই পদের জন্য মনোনীত করে ড. সাবহারওয়ালকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মেন্টর গ্রুপ খুশি যে প্রস্তাব পাওয়ার পর তিনি তা গ্রহণ করেছেন।
আমি বুঝতে পেরেছি, কিছু গণমাধ্যমে এ প্রশ্ন উঠেছে যে যিনি পূর্ণ অধ্যাপক নন তিনি কীভাবে ভাইস-চ্যান্সেলর পদের জন্য নির্বাচিত হন। আমার মনে হয়, পদ ও মর্যাদার দ্বারা আচ্ছন্ন সমাজে কিছু মানুষ ব্যক্তিকে তার পদ ও সামাজিক অবস্থান দিয়েই বিচার করতে চান_ তার যোগ্যতা ও গুণ দিয়ে নয়।
ড. গোপা সাবহারওয়াল কি কাজ শুরু করেছেন? বৃহৎ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে তিনি কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
বিহার সরকারের সহায়তায় ড. সাবহারওয়াল ইতিমধ্যে একটি ক্যাম্পাস স্থাপন করেছেন। আইনগত, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছেন। প্রথম দুটি বিভাগ হবে পরিবেশবিদ্যা ও ইতিহাসবিদ্যাকেন্দ্রিক, এরপরই হবে তথ্যপ্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ। এই বিভাগগুলো চালুর কাজ ইতিমধ্যে অনেক এগিয়েছে। তার নেতৃত্বে সিঙ্গাপুরের নালন্দা-শ্রীবিজয় সেন্টার, থাইল্যান্ডের চুলালঙকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। প্রফেসর ওয়াঙ বাঙওয়েই-এর মাধ্যমে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইনফরমাল সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছে। প্রফেসর ওয়াঙ নালন্দা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, মেন্টর গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য। কোরিয়া, জাপান ও আমেরিকার নেতৃস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও পারস্পরিক অংশীদারিত্বমূলক সহযোগিতার পথ খুলবে। এই সম্ভাবনাগুলোর অনুসন্ধান এখনও চলছে। বিহার সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে যে জমি দিয়েছে তা দেখভাল করার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাস ও ভবনের স্থাপত্য-পরিকল্পনা এখন জোরেশোরে শুরু হয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ড. সাবহারওয়াল এখনও প্রকৃত ভাইস-চ্যান্সেলর না হয়ে মনোনীত ভাইস-চ্যান্সেলর রয়ে গেছেন। এর পেছনে ভারত সরকারের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাই দায়ী। এটি না হলে তিনি আরও দক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ড আশা করে শিগগির এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটবে। তাতে কাজে গতি আসবে। মেন্টর গ্রুপের পরামর্শ মোতাবেক গত নভেম্বরে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
এ মুহূর্তে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারই সব ব্যয়ভার বহন করছে। সরকার প্রশাসনিক জটিলতাগুলো দূর করার চেষ্টাও করছে। বাইরে থেকে অনুদানের প্রতিশ্রুতি আছে। চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, লাওসসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও বেসরকারি খাত থেকে সহায়তা মিলবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।
বৈশ্বিকভাবে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নালন্দার ভূমিকা কী হবে?
আন্তঃএশীয় সহযোগিতা ও জ্ঞান অর্জনে পুরাতন নালন্দার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। এখানকার শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণা শুধু ধর্মশিক্ষার সঙ্গেই জড়িত ছিল না, ব্যবহারিক জ্ঞান ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল। সে সময়কার শিল্পবোধের প্রতিফলন ছিল এর কার্যক্রমে। নতুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাম্প্রতিক শিক্ষাঙ্গন হিসেবে গড়ে উঠবে। আজকের সাম্প্রতিক বিষয় পরিবেশ সমস্যা ও তথ্যপ্রযুক্তি। এই ক্ষেত্রগুলোতে আন্তঃএশীয় সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়গুলোতে সহযোগিতা বাড়বে। বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ অবদান আছে, বৈশ্বিক জ্ঞানক্ষেত্র তৈরিতে তারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু মনে রাখার মতো বিষয় হলো, পশ্চিমের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার ৭শ' বছর আগে নালন্দা স্থাপিত হয়েছিল। এটি ছিল ইউরোপের বোলঙনা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা তখনই এটি পুরো এশিয়ার মধ্যে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের যোগাযোগ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও হবে।
বিহারের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব কী?
প্রায় এক হাজার বছর ধরে বিহার ছিল ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্র। এটি পাটনা বা পাটালিপুত্র থেকে শুরু হয়েছিল। এখানেই প্রথম সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল। বিহারেই প্রথম বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সভায় নাগরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরল উদাহরণ তৈরি হয়েছিল। নাগরিক আলোচনাই গণতন্ত্রচর্চার কেন্দ্রীয় বিষয়। বিহারেই প্রথম জনস্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছিল। যা নালন্দা পড়তে এসে ফা হিয়েন ও ইৎ সিঙ আমাদের জানিয়েছিলেন। পাটালিপুত্রের কুসুমপুরেই আদি ভারতীয় গণিতচর্চার শুরু হয়েছিল। বিহার আধুনিক ইতিহাসে পশ্চাৎপদ একটি জনপদ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, কিন্তু এর রয়েছে উজ্জ্বল ইতিহাস। ইতিহাস এখানকার শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রণোদনা দিতে পারে এবং তা দ্রুতলয়ে ঘটছেও।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প গ্রহণের আগে বিহার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এমন প্রণোদনার ভাবনা ছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এর ভিত্তিভূমির পুনর্জাগরণের ব্যাপারে পুরোপুরি দায়বদ্ধ। নালন্দা বিশুদ্ধ একাডেমিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকে থাকবে না। তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিবেশবিদ্যার মতো ব্যবহারিক বিষয়ের মধ্য দিয়ে বিহারের মানুষের জীবনযাত্রার দিক পরিবর্তনের চেষ্টাও থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তারের সঙ্গে যেমন নালন্দার নিরাপদ অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হবে, তেমনি আন্তঃএশীয় সহযোগিতার মাধ্যমে সর্বভারতীয় বিস্তারও ঘটবে বিশ্ববিদ্যালয়টির। বিহার নালন্দাকে সমর্থন দিয়েছে, প্রত্যুত্তরে আমরা চাই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিহারকে সমর্থন জোগাবে।

Friday, September 16, 2011

শুধু আসা শুধু আশা

চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা বলেন, নগর হলো শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ থাকার স্থান। কথাটা অনেকটা রূপকার্থে বলা। প্রকৃত নগরে, মানে যেখানে নাগরিক সংস্কৃতি মেট্রোপলিটন স্তরে উন্নীত সেখানে কেউ কারো জাত জানতে চায় না, অপরিচিত লোকদের দেখলে জেরা করে না। শুধু শরণার্থী নয়, নানা বর্ণের, নানা ধর্মের, নানা মতের মানুষের অস্থায়ী আবাস পৃথিবীর নগরগুলো। নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে তদারকি ছাড়া নিউইয়র্কে কোনো বাঙালি, কোনো চীনা কিংবা কোনো নাইজেরিয়ানকে দেখলে সাধারণ নাগরিকদের মনে এ প্রশ্ন উঠবে সে কী করছে এখানে, কেন এসেছে, কয়দিন থাকবে। কিন্তু ঢাকায় একটু অচেনা বর্ণের, অচেনা মতের মানুষের চলাচল দেখলেই সাধারণ মানুষই প্রশ্ন তুলবে, এ কে? বৈরিতা হোক কি বন্ধুত্ব কোনো অর্থেই এ প্রশ্ন ওঠা নাগরিক সংস্কৃতি-সম্মত নয়। কিন্তু ঢাকায় এ প্রশ্ন ওঠে। আর প্রশ্ন ওঠার অর্থই হলো, আমাদের নাগরিকতা প্রকৃত নাগরিকতা হয়ে ওঠেনি। আর্থসামাজিক সূত্রে গ্রামের টান সেখানে রয়ে গেছে। নগরের আরেক বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে সবসময় কর্মক্ষম তরুণদের ভিড় থাকবে। তরুণরা বৃদ্ধ হলে অবসর নিয়ে একসময় নগর ছেড়ে দূরের শহরে কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত গ্রামে চলে যাবে। নতুন প্রাণোচ্ছল তরুণরা এসে নগর দখল করবে। কিন্তু ঢাকায় মানুষের আসাটা একমুখী। এখানে মানুষ আসে শুধু, এখান থেকে মানুষ যায় না। আরও শুদ্ধ করে বললে, যেতে চায় না। বাধ্য হলে কেউ কেউ যায়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ একবার নগর জীবনে অভ্যস্ত হলে আর গ্রামে ফিরতে চায় না। গ্রামের ছেলেটি শহরে পড়তে এসে চাকরি করে, পয়সা জমায়, পয়সা জমিয়ে নগরেই থেকে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। পরবর্তী প্রজন্মের উন্নততর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার তাগিদে ঢাকায় বা আশপাশে বাড়ি করে। থেকে যায়। গত চলি্লশ বছরে থেকে যাওয়ার হার এতটাই বেশি যে, ঢাকার আশপাশের জেলা শহরগুলো, কৃষিজমি, অকৃষিজমি, বনবাদাড় সব উজাড় করে তৈরি হচ্ছে মানববসতি। এই বসতিগুলোর আকুতি একটাই, ঢাকার পাশে থাকা। অবস্থাপন্ন মানুষরা তো আসন গেড়ে বসেছেনই। ঢাকায় একবার ঢুকলে এর বিকল্প ভাবেন না শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাও। ঋণ করে, কষ্ট করে একটা ফ্ল্যাটের কথা মাথা থেকে কিছুতেই বাদ যায় না। যারা শেষ পর্যন্ত বাড়ি কিনতে পারেন না, তাদেরও অনেকে ভাড়া বাড়িতেই থেকে যান। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, নারায়ণগঞ্জের এক স্থায়ী বাসিন্দা একটি লেখায় লিখেছিলেন, রাজধানীর চাহিদা মেটাতে গিয়ে আশপাশের আদি অধিবাসীদের টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। খুব গভীর এক সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে ঢাকা। আগামীতে যারা ঢাকায় থেকে যেতে চান তাদের অধিকাংশ চাইলেও থাকতে পারবেন না। জায়গা হবে না। কিন্তু ঢাকার বাইরে যদি নাগরিক সুবিধা-সম্পন্ন শহর থাকত। জেলা শহরগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন যদি নিশ্চিত করা যেত, গ্রামে যদি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো যেত তাহলে কিন্তু লোকে এভাবে ঢাকার জন্য মরিয়া হয়ে থাকতেন না। একজন আর্মি অফিসার অবসর নিয়ে চলে যেতেন গ্রামে। একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন অধ্যাপক মফস্বলে থাকতেন। তাদের মাধ্যমে মফস্বল-গ্রাম আলোকিত হতো। জ্যামের শহরে, নাগরিক জীবনের দুর্বিপাকের চক্রে তাদের অবসর জীবন কাটাতে হতো না। এমন হলে মানুষ বিকল্প ঠিকানার জন্য প্রস্তুত হতে পারত। নাগরিক জীবনের সুবিধার জন্য প্রাণান্ত সংগ্রামের বদলে অন্য কিছু তখন চোখে পড়ত আমাদের।

আমার 'দেহ' বই নিয়া চঞ্চল আশরাফের সমালোচনা

মাহবুব মোর্শেদের দেহতত্ত্বদেহ_মাহবুব মোর্শেদ। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : ঐতিহ্য, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১১। মূল্য : ১৫০ টাকাচঞ্চল আশরাফমাহবুব মোর্শেদের 'দেহ' গল্পগ্রন্থটিকে ভুল বোঝার কারণ যথেষ্ট রয়েছে। প্রধানত মনে হতে পারে, এটি ফ্রয়েডীয় যৌন সর্বস্বতাবাদের প্রতিনিধিত্ব করছে। মনে হতে পারে, বেশির ভাগ গল্পের বিষয় শরীর বা সে সম্পর্কিত প্রসঙ্গগুলো। আমি মনে করি, যাঁরা এই ফাঁদে পড়বেন, তাঁরা গ্রন্থটির সম্ভবত প্রকৃত পাঠক নন। কেন নন, তা পরে আলোচ্য কিংবা এই আলোচনা থেকে কিছুটা বুঝতে পারা যাবে।
শরীরসংক্রান্ত যে থিসিস বইটির গল্পগুলোয় পাই, তাতে শেষ পর্যন্ত এটা নিশ্চিত যে 'দেহ' আদৌ ফ্রয়েডভাবিত গল্প সংকলন নয়। লোকদর্শনের অন্তর্গত দেহতত্ত্বের প্রতিনিধিত্বও এটি করছে না। হতে পারে ফ্রয়েডের অনুরসদ মাত্র; কিন্তু এর আসল জিনিসটি হলো সমকালীন বাস্তবতার পটভূমিতে মানুষের (নারী-পুরুষের) সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার ভাষা। 'জিসম' গল্পটি এর একটি উদাহরণ। এর থিসিসটি হলো, শরীর শেষ পর্যন্ত একটা সংস্কার, যাকে আত্মস্থ ও অতিক্রম করতে হয়; নইলে এটি আচ্ছন্ন ও অধিকার করে ফেলে ব্যক্তিকে। করে ফেললে, সমষ্টি উপেক্ষিত হয়, যা সমাজবদলের প্রধান বাধা। গল্পকার পরোক্ষে একটি বার্তাও দিয়েছেন : সমাজ পরিবর্তনে সব কিছুর আগে দরকার শরীরসংক্রান্ত সংস্কার ভেঙে ফেলা। তা করতে গেলে জানা চাই শরীর কী জিনিস; তবে সেই জ্ঞান পুস্তকনির্দেশিত হলে চলবে না। হাতে-কলমে তা হওয়া চাই। গল্পটি পড়তে পড়তে হার্বাট মার্কুইসের একটি প্রত্যয়ের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছেন, মুক্তযৌনতা আসলে সামাজিক প্রতিবাদের অংশ। 'জিসম' ধারণ করেছে মুক্তযৌনতার প্রত্যয়টি, এর মধ্যে প্রতিবাদ আছে; এবং একে সমষ্টিতে সঞ্চারের অভিপ্রায়ও দুর্লক্ষ্য নয় (পড়ুন ১০৩ পৃষ্ঠায় : শোনো, ও যখন যৌন সম্পর্ক করে তখন নিজের জীবনের ব্যর্থতা, গ্লানি, আমার মৃত স্বামীর প্রতি ক্ষোভ, এই ব্যবস্থা_সব কিছুর বিরুদ্ধে তার শারীরিক প্রতিবাদ জানায়। অ্যান্ড আই এনজয় ইট)। মনে হতে পারে, বিষয়টি ব্যক্তিক। কিন্তু গল্পের মধ্যেই সমষ্টির সূত্রটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তিন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী তিনজনের পার্টি দিয়ে শুরু, শরীরসংক্রান্ত সংস্কার ভাঙার তথা প্রতিবাদও এই তিনে মিলেই ঘটানো হয়েছে। এসব নিয়ে 'জিসম' হয়ে উঠেছে প্রচলিত সংস্কার ও সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শারীরিক ভাষা। শুধু এতেই গল্পটির মর্ম নিঃশেষিত নয়; এর আরো ব্যাখ্যাসাপেক্ষ প্রান্ত রয়েছে। সেসব নিয়ে অন্যত্র আলোচনার আশা রাখি। গ্রন্থের প্রথম গল্প 'রাখী' এক ধরনের প্রতিবাদ আর প্রত্যাখ্যানের গল্প। 'আজ রাতে কোথায় ঘুমাব'ও প্রচলিত সমাজকে অস্বীকারের ভাষাকে মর্মে ধরেছে। তবে বইয়ের কোনো গল্পই চিন্তা বা আইডিয়ার দিক থেকে জিসমের মতো এত উচ্চাভিলাষী নয়; যদিও সেগুলো কোনো না কোনোভাবে সমকালীন বাস্তবতার পটভূমিতে মানবসম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার রূপক হয়ে উঠেছে। 'লোলিতা রিলোডেড', 'লুক থ্রু সি থ্রু', 'ঘর মন জানালা, লাইফস্টাইল, আপনার রাশিফল', 'মেলানকলি', 'রুখসানার হাজব্যান্ড'_এই গল্পগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তবে 'সি পেই' গ্রন্থটির মান ও বৈশিষ্ট্যকে খানিকটা ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে হয়। রচনাটি দুর্বল, কারণ সেটা নয়; কারণ এটিও_বইয়ের অন্যান্য গল্পের সঙ্গে এর তাৎপর্যগত কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না।
মাহবুব মোর্শেদের 'দেহ' গল্পগ্রন্থের মূল অভিনিবেশ সময় ও সমাজের সমালোচনায় এবং বোঝা যায়, বেশ ভালো করে বোঝা যায়_গল্পকার প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, বিশ্বাস, সংস্কার, রাজনীতি_এসবের প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট নন। এই অসন্তোষ তাঁর গল্পভাষায়ও সঞ্চারিত হয়েছে। ব্যঙ্গ, বক্রোক্তি, পরিহাসে তা স্পষ্ট। প্রায় সব গল্পে চরিত্রের আত্মবিশ্লেষণই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সময়ের স্থবিরতা প্রামাণ্য করতে অবতারণা ঘটেছে অ্যাবসার্ডিটির (বিশেষ দ্রষ্টব্য 'অর্ডার অব থিংস'), তাতে সমাজ সম্পর্কে লেখকের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্য হয়ে গেছে; গল্পের মধ্যে রচয়িতার সরাসরি অংশগ্রহণও রয়েছে; কিন্তু তা বিশ্বস্ততায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলে মনে হয় না। বলা প্রয়োজন, মাহবুব মোর্শেদের গল্পের প্রধান সম্পদ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, যা প্রভুত্ব করে চরিত্র কিংবা চরিত্র নির্বাচনের ওপর, ভাষায়ও করে; কিন্তু জবরদস্তি হয়ে তা দেখা দেয় না। এমনটি মনে হওয়ার কারণ, লেখক চরিত্রগুলোকে তাদের মতো করে কথা বলতে দেন; তাদের আচরণ সময়ের চেহারায় নির্দেশিত হলেও ঘটনাগুলো পূর্বনির্দিষ্টভাবে ঘটে না। শ্রেণীচরিত্রও গল্পে উপেক্ষিত নয়। তবে বোঝা যায়, লেখকেরও শ্রেণীগত একটি অবস্থান রয়েছে। সেটি কী? 'জিসম' গল্পের শিষ্যটির দিকে মনোযোগ দিলেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।


কালের কণ্ঠে প্রকাশিত