Monday, October 17, 2011

সে আগুন ছড়িয়ে গেল

টাইম ম্যাগাজিন সাধারণত তাদের প্রকাশিতব্য সংখ্যাটি ছাপা কাগজে প্রকাশের আগেই ইন্টারনেটে প্রকাশ করে। ইন্টারনেটের সুবিধা হলো সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া, ইউরোপ এবং সাউথ প্যাসিফিকের চারটি সংস্করণই পরপর দেওয়া থাকে। চাইলে যে কেউ যে কোনো সংস্করণ পড়তে পারেন। ছাপা কাগজে যারা টাইম ম্যাগাজিন পড়েন তাদের সে সুযোগ থাকে না। এশিয়ার দেশগুলোর পাঠকরা এশীয় সংস্করণই সাধারণত বাজারে কিনতে পারেন। ইন্টারনেটের সুবিধা হলো, প্রতিটি সংস্করণ মিলিয়ে পড়া যায়। তাতে সূক্ষ্ম ও স্থূল অনেক পার্থক্য থাকে। যেমন, একবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সংস্করণের একটি লেখার শিরোনাম দেওয়া হয়_ 'আফগানিস্তানে আমরা কী করছি?' আবার এশিয়া ও সাউথ প্যাসিফিক সংস্করণে একই লেখার শিরোনাম_ 'আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র কী করছে?' পার্থক্যটা খেয়াল করার মতো। ২৪ অক্টোবর টাইম ম্যাগাজিনের যে সংখ্যা প্রকাশ হবে তার তিনটি সংস্করণের বিষয় একই, সেই আফগানিস্তান_ 'কেন যুক্তরাষ্ট্র কখনও আফগানিস্তানকে বাঁচাবে না?' কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রকাশিত সংস্করণের বিষয়_ 'নিশ্চুপ সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাবর্তন'। 'দ্য রিটার্ন অব দ্য সাইলেন্ট মেজরিটি'। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে অনেকের আগ্রহ আছে। সবাই বুঝতে চান কী ঘটছে। বোঝার ক্ষেত্রে টাইমের পর্যবেক্ষণ অবশ্যই প্রভাব ফেলে। তারা যেভাবে বিষয়টাকে নিশ্চুপ সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তাকে অনেকেই যথার্থ মনে করবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করপোরেট কোম্পানিগুলোর যে একাধিপত্য তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাদেরই রমরমা। সাধারণের মতের বিশেষ গুরুত্ব নেই। মত দেওয়ার সুযোগও নেই। সেখানকার সমাজে জনমত বলে যে বিষয়টির অস্তিত্ব তাও করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে বহুকাল সাধারণের কথা সেখানে শোনা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মন্দার সময় সাধারণ লোকে ভুগেছে, চাকরি হারিয়েছে, কষ্টে দিনযাপন করেছে। কিন্তু খুব বেশি প্রতিবাদ রাস্তায় দেখা যায়নি। কিন্তু এবার মন্দার পূর্বাভাসেই রাস্তা ফুঁসে উঠেছে। মার্কিনরা ওয়ালস্ট্রিট দখলের কর্মসূচি দিয়েছে। ওয়ালস্ট্রিট সেখানে করপোরেট কোম্পানি, ব্যাংক-বীমার আখড়া। ওয়ালস্ট্রিটমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বার্তা দিতে চাইছে মানুষ। সরকার, রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় করপোরেট আধিপত্যের অবসান চাইছে। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট বা ওয়ালস্ট্রিট দখলের কর্মসূচি যারা পালন করছে তাদের অধিকাংশই তরুণ। কোনো কোনো পত্রিকায় তাদের কিডস বা নিতান্তই বাচ্চা বলে অভিহিত করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, বাচ্চা ছেলেদের আন্দোলন কিন্তু বাচ্চা থেকে ক্রমে বড় হচ্ছে। আমেরিকার আন্দোলন ইউরোপ ছাড়িয়ে আফ্রিকা পর্যন্ত দোলা দিয়েছে। সর্বত্র করপোরেটবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট মুভমেন্ট দেখে অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, এবার টুইটার ফেসবুকের ঘরেই আগুন লাগল। টুইটার ফেসবুকের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর জন্মস্থান আমেরিকা। কিন্তু এ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আরব বিশ্বে একটির পর একটি দেশ স্বাধীন হচ্ছে। তরুণরা বড় বড় আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে। এমনকি ভারতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানেও প্রযুক্তির বিপুল প্রভাব। এসব দেখে উৎসাহিত হয়েছে আমেরিকার তরুণরা। তারা প্রশ্ন করেছে, ওখানে হলে এখানেও সম্ভব নয় কেন? লেডি গাগার ভক্ত, জাস্টিন বেইবারের অনুরক্ত, ঘরকুনো স্বভাবের, চ্যাটে মগ্ন একটি প্রজন্ম ভার্চুয়াল বাস্তবতার পর্দা ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসছে। পরস্পরের সঙ্গে আগুন ভাগ করে নিচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তারা কি আনতে পারবে নতুন যুগ? এই পৃথিবীর মধ্যে আরেকটি পৃথিবীর উত্থানের সম্ভাবনা কি আসন্ন?

Tuesday, October 11, 2011

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

গায়কদের নিয়ে সাধারণের বিস্ময়ের সীমা নেই। শুধু সাধারণ কেন, অসাধারণ গীতিকার, কবি ও বিদগ্ধ একজন মানুষও যখন প্রশ্ন করেন, তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, তখন বোঝা যায় সুরের এক অদেখা ক্ষমতা আছে। কবির মতো সকলেই অবাক হয়ে গান শোনে। দেখে, সুরের আলো ভুবন ছেয়ে ফেলছে, পাষাণ ছিন্ন করে ব্যাকুল বেগে সুরের সুরধুনী বয়ে চলেছে। অমন সুরে গাইবার আকাঙ্ক্ষা জাগলেও কণ্ঠে সবার সুর মেলে না। কথা বলতে গিয়েও বেধে যায়। ফলে প্রাণ কাঁদে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মানুষও যখন ভাবেন গানের গুণী তার চারধারে সুরের জাল বুনে তাকে এক ফাঁদে ফেলেছেন তখন সাধারণ শ্রোতাদের হাল কী তা বলাই বাহুল্য। আমাদের প্রিয় কবির এ গানের কথা আবারও মনে পড়ে গেল সঙ্গীতগুরু জগজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর খবরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার গানে মজেছে, তার সুরে সুর ভেজেছে_ তার বাণীতে নিজেদের মর্মবেদনার প্রকাশ দেখেছে। এক প্রজন্ম চলে গেলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও তার আবেদন একটুকু কমেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও পরিবর্তিত হয়েছেন। গজলের পরবর্তীকালের গায়করা তাকে গুরু মেনেই গেয়েছেন। এমনকি যে বাংলা ভাষায় গজলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নেই, সে ভাষাতেও গজল গেয়ে তিনি দর্শকদের মোহিত করেছেন। জগজিৎ সিং বললেই বহু বাঙালির কাছে সেই মধুর বাণী গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে_ বেদনা মধুর হয়ে যায়, তুমি যদি দাও। কিংবা আজ কিছু হতে চলেছে, বেশি কিছু আশা করা ভুল, তোমার চুল বাঁধা দেখতে দেখতে...। এসব গান বহু বছর ধরে শোনার পরও কারও কি মনে হয়েছে, এ শিল্পী পাঞ্জাবি? এ প্রশ্ন আজও শুনিনি। তাতেই অবাক লাগছে। গায়করা কেমন গুণী? যে ভাষা তার নয়, সে ভাষাতেও তারা হিল্লোল তোলেন কীভাবে? শুধু বাংলাই তো নয়_ মাতৃভাষা পাঞ্জাবির বাইরে তিনি গেয়েছেন হিন্দি, গুজরাটি, উর্দু, সিন্ধি এমনকি নেপালি ভাষাতেও। ভারতের শিল্পীদের মধ্যে যারা বড় তারা সাধারণত এক ভাষায় আটকে থাকতে চান না। এক ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে বহু ভাষায় ছড়িয়ে যেতে চান। তারা সর্বভারতীয় বলে আখ্যায়িত হন। জগজিৎ সিং অবশ্য সর্বভারতীয় শুধু নন, তিনি ভারতের গণ্ডি ছড়িয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয়। তার মৃত্যুর খবরে ভারতের মতো শোকগ্রস্ত হয়েছেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মানুষও। কেউ স্মরণ করছেন তার বাংলা গানের কথা। কেউ বলছেন, মির্জা গালিব টিভি সিরিয়ালে গালিবের কথায় তার গানের কথা। কেউবা ভাজছেন হিন্দি সিনেমায় গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর স্মৃতি। ৭০ বছর খুব কম সময় নয়, তার কাজের ব্যাপ্তিও কম নয়। তবু এই সেদিন পর্যন্ত যিনি সচল ছিলেন, স্টেজে লাইভ পারফরম্যান্সে মাতিয়েছেন সবাইকে তার চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়। মানব কী? গায়কের মৃত্যু হলে গান থাকে, কবিদের মৃত্যু হলে কবিতা থাকে। মানব কি তবে মানুষের কর্মের সারাৎসার? যারা জগজিৎ সিংয়ের গান শুনেছেন সরাসরি, দেখেছেন তাকে_ তাদের বাইরে বিপুলসংখ্যক শ্রোতার কাছে তিনি শুধুই গান। এক প্রজন্মের কাছে তিনি গ্রামোফোনের গান, আরেক প্রজন্মের কাছে ক্যাসেট প্লেয়ারের গান, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কমপ্যাক্ট ডিস্কের গান। গান শুনে শুনেই তার সম্পর্কে একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন শ্রোতারা। তার মৃত্যু হলেও তিনি থাকবেন তেমনি। তার গান থাকবে। শিল্পের, কল্পনার, অনুভবের জগৎ ফুরাবে না। কিন্তু বাস্তবের যে জগজিৎ সিং তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আর কোনো দিন লাইভ আসরে তাকে দেখতে পাবে না কেউ।

Wednesday, September 21, 2011

পশ্চিমের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার ৭শ' বছর আগে নালন্দা স্থাপিত হয়েছিল

অমর্ত্য সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তি নিকেতনে। অমর্ত্য সেনের পরিবারের নিবাস ছিল পুরান ঢাকার ওয়ারীতে। কৈশোরে কিছুকাল ঢাকায় থেকেছেন তিনি। এখানেই তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বাংলার সংস্কৃতি, জীবন, মানুষ, অভাব, দুর্ভিক্ষ অমর্ত্য সেনের পরবর্তী কর্মকাফ্ফে বিশেষ ভহৃমিকা পালন করেছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একাধারে দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক হিসেবেও খ্যাত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও দর্শনের অধ্যাপক তিনি। কয়েক বছর আগে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা পুনর্গঠনের কাজ হাতে নিয়েছেন তিনি। শত ব্যস্ততার মধ্যেও ইতিহাসের দায় থেকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তী পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৮ সালে নোবেল বিজয়ী এ অর্থনীতিবিদের কাছে নালন্দা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রেরণা। বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম কেন্দ্র নালন্দা পুনর্গঠনে ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি এশীয় দেশ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নালন্দা ভারতের বিহারে অবস্থিত। অতীতে বৌদ্ধ মতবাদ শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্যোতির্বিদ্যা, রাজনীতি, ওষুধশাস্ত্র এবং শিল্পকলা বিষয়ে পাঠ দেওয়া হতো। ১১৯৭ সালে ধ্বংসের আগে এ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বেরর নানা প্রান্ত থেকে আসা ১০ হাজার শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করেন। নালন্দা পুনর্গঠন নিয়ে এশিয়া সোসাইটি পত্রিকায় ড. সেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শ্রেয়া সিনহা। সাক্ষাৎকারটি সমকালের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করা হলো।  ভাষান্তর : মাহবুব মোর্শেদ


 প্রাচীন নালন্দায় অমর্ত্য ও সহযোগীরা
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্টতা কী ছিল?
প্রাচীন নালন্দা ছিল পুরোপুরি বিদ্যার অনুধ্যানে নিয়োজিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য নিবেদিত। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন ও তা রক্ষার এমন এক ঐতিহ্য নালন্দা তৈরি করেছিল যে চীন, জাপান, কোরিয়া ও পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকে এখানে শিক্ষার্থীরা আসতে উদ্বুদ্ধ হতেন। শুরুতে বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে এটি চালু হলেও নালন্দা শিক্ষা কার্যক্রম শুধু বৌদ্ধ মতবাদে আবদ্ধ ছিল না। সেক্যুলার বিষয়, যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভাষাতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির সুখ্যাতি ছিল। নালন্দা গুপ্তদের মতো হিন্দু রাজাদের আনুকূল্য পেয়েছে, বাংলার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারাও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সহায়তা দিয়েছেন। কোনো অর্থেই এটি বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং এটি জ্ঞান ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ঐতিহ্য ধারণ করে মানবিক অশান্তি থেকে মুক্তির পথ খুঁজত। একই সঙ্গে এটি ছিল আধুনিক প্রতিষ্ঠান। নালন্দা সে সময়ে অবশ্যই আধুনিক ছিল। ধর্মের বাইরের বিষয়, যেমন জ্যোতির্বিদ্যা। মানুষের কাজে লাগে এমন বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হতো, যেমন স্বাস্থ্যসেবা।
নালন্দার ভবিষ্যৎ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
এ বিশ্ববিদ্যালয় মানবজাতির সামনে যে রূপকল্প হাজির করেছিল তা ছোটবেলায় প্রথম নালন্দা দেখার দিন থেকেই আমার মধ্যে আত্মস্থ হয়ে গিয়েছিল। একদিন এ মহান বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনর্জীবন দেওয়ার স্বপ্ন আমি লালন করতাম। কৈশোরে আমি বারবার নালন্দায় গিয়েছি, প্রতিবারই ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্র বিহারে অবস্থিত এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আমাকে আচ্ছন্ন করেছে। যখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার প্রস্তাব দিলেন আমি তার স্বপ্নের সঙ্গে আমার আকাঙ্ক্ষার মিল দেখে খুব আশ্বস্ত হয়েছিলাম। তারা চেয়েছিলেন পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়টির পাশে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় হোক। আমি সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন দেখতে চাই_ অন্তত এর সূচনা দেখতে চাই। সত্য হলো, বিহার অমোচনীয় দারিদ্র্যসহ প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংকটে পতিত। এ অবস্থায় নতুন নালন্দা তাদের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশবিদ্যা, ব্যবস্থাপনার মতো কার্যকর শিল্পগুলো শেখানো হয় তবে তা তাদের কাজে আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বেছে নেওয়া হয়েছে কীভাবে? কোন ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা আপনারা চাচ্ছিলেন?
পূর্ব এশিয়া সম্মেলনের সদস্য দেশগুলোর জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর পদটি উন্মুক্ত থাকার কথা। তারপরও মেন্টর গ্রুপ প্রথম ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে একজন ভারতীয়কেই প্রাধান্য দিয়েছে, যার কাজ করার ও প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। মেন্টর গ্রুপের পক্ষ থেকে সিলেকশন কমিটির কাছে যে চারটি চাওয়া ছিল তা হলো_ ১. প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ২. প্রশাসনিক সক্ষমতা ৩. নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বিষয়ে আগ্রহ ও দায়বোধ ৪. নালন্দায় নতুন ক্যাম্পাসে অবস্থান ও এখানে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয় এবং বিহারের সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।
সিলেকশন কমিটির সদস্যরা অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরামর্শ মোতাবেক সত্যিই যখন বিশ্ববিদ্যালয়টি কাজ শুরু করবে, তখন নালন্দায় থাকার সম্ভাব্যতা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। সময়ে সময়ে যে কোনোভাবেই হোক ভারতীয় পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে নানা খবর বেরিয়েছে। আবাসিক ভাইস-চ্যান্সেলরের বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও পত্রিকাগুলো নানাজনের কাছে অফার পেঁৗছানোর খবর দিয়েছে। সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কমিটি ড. গোপা সাবহারওয়ালকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে এমন তিন ব্যক্তির নাম ভারত সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। ড. সাবহারওয়ালের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা অসাধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে আমাদের পরামর্শক ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সমাজতাত্তি্বক আন্দ্রে বেতেই। তার প্রশাসনিক যোগ্যতাও সুগভীর। তিনি নালন্দা প্রকল্পের প্রতি দায়বদ্ধ। তিনি বিহারের সঙ্গে জড়িত। নালন্দায় অবস্থানের ব্যাপারে তার আগ্রহ অন্যদের থেকে তাকে এগিয়ে দিয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলর নির্বাচনে ক্ষমতার অধিকারী নালন্দা মেন্টর গ্রুপ ড. সাবহারওয়ালসহ তিনজনের নাম সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছে। সরকার ওই পদের জন্য মনোনীত করে ড. সাবহারওয়ালকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মেন্টর গ্রুপ খুশি যে প্রস্তাব পাওয়ার পর তিনি তা গ্রহণ করেছেন।
আমি বুঝতে পেরেছি, কিছু গণমাধ্যমে এ প্রশ্ন উঠেছে যে যিনি পূর্ণ অধ্যাপক নন তিনি কীভাবে ভাইস-চ্যান্সেলর পদের জন্য নির্বাচিত হন। আমার মনে হয়, পদ ও মর্যাদার দ্বারা আচ্ছন্ন সমাজে কিছু মানুষ ব্যক্তিকে তার পদ ও সামাজিক অবস্থান দিয়েই বিচার করতে চান_ তার যোগ্যতা ও গুণ দিয়ে নয়।
ড. গোপা সাবহারওয়াল কি কাজ শুরু করেছেন? বৃহৎ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে তিনি কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
বিহার সরকারের সহায়তায় ড. সাবহারওয়াল ইতিমধ্যে একটি ক্যাম্পাস স্থাপন করেছেন। আইনগত, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছেন। প্রথম দুটি বিভাগ হবে পরিবেশবিদ্যা ও ইতিহাসবিদ্যাকেন্দ্রিক, এরপরই হবে তথ্যপ্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ। এই বিভাগগুলো চালুর কাজ ইতিমধ্যে অনেক এগিয়েছে। তার নেতৃত্বে সিঙ্গাপুরের নালন্দা-শ্রীবিজয় সেন্টার, থাইল্যান্ডের চুলালঙকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। প্রফেসর ওয়াঙ বাঙওয়েই-এর মাধ্যমে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইনফরমাল সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছে। প্রফেসর ওয়াঙ নালন্দা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, মেন্টর গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য। কোরিয়া, জাপান ও আমেরিকার নেতৃস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও পারস্পরিক অংশীদারিত্বমূলক সহযোগিতার পথ খুলবে। এই সম্ভাবনাগুলোর অনুসন্ধান এখনও চলছে। বিহার সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে যে জমি দিয়েছে তা দেখভাল করার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাস ও ভবনের স্থাপত্য-পরিকল্পনা এখন জোরেশোরে শুরু হয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ড. সাবহারওয়াল এখনও প্রকৃত ভাইস-চ্যান্সেলর না হয়ে মনোনীত ভাইস-চ্যান্সেলর রয়ে গেছেন। এর পেছনে ভারত সরকারের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাই দায়ী। এটি না হলে তিনি আরও দক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ড আশা করে শিগগির এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটবে। তাতে কাজে গতি আসবে। মেন্টর গ্রুপের পরামর্শ মোতাবেক গত নভেম্বরে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
এ মুহূর্তে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারই সব ব্যয়ভার বহন করছে। সরকার প্রশাসনিক জটিলতাগুলো দূর করার চেষ্টাও করছে। বাইরে থেকে অনুদানের প্রতিশ্রুতি আছে। চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, লাওসসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও বেসরকারি খাত থেকে সহায়তা মিলবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।
বৈশ্বিকভাবে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নালন্দার ভূমিকা কী হবে?
আন্তঃএশীয় সহযোগিতা ও জ্ঞান অর্জনে পুরাতন নালন্দার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। এখানকার শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণা শুধু ধর্মশিক্ষার সঙ্গেই জড়িত ছিল না, ব্যবহারিক জ্ঞান ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল। সে সময়কার শিল্পবোধের প্রতিফলন ছিল এর কার্যক্রমে। নতুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাম্প্রতিক শিক্ষাঙ্গন হিসেবে গড়ে উঠবে। আজকের সাম্প্রতিক বিষয় পরিবেশ সমস্যা ও তথ্যপ্রযুক্তি। এই ক্ষেত্রগুলোতে আন্তঃএশীয় সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়গুলোতে সহযোগিতা বাড়বে। বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ অবদান আছে, বৈশ্বিক জ্ঞানক্ষেত্র তৈরিতে তারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু মনে রাখার মতো বিষয় হলো, পশ্চিমের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার ৭শ' বছর আগে নালন্দা স্থাপিত হয়েছিল। এটি ছিল ইউরোপের বোলঙনা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা তখনই এটি পুরো এশিয়ার মধ্যে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের যোগাযোগ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও হবে।
বিহারের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব কী?
প্রায় এক হাজার বছর ধরে বিহার ছিল ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্র। এটি পাটনা বা পাটালিপুত্র থেকে শুরু হয়েছিল। এখানেই প্রথম সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল। বিহারেই প্রথম বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সভায় নাগরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরল উদাহরণ তৈরি হয়েছিল। নাগরিক আলোচনাই গণতন্ত্রচর্চার কেন্দ্রীয় বিষয়। বিহারেই প্রথম জনস্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছিল। যা নালন্দা পড়তে এসে ফা হিয়েন ও ইৎ সিঙ আমাদের জানিয়েছিলেন। পাটালিপুত্রের কুসুমপুরেই আদি ভারতীয় গণিতচর্চার শুরু হয়েছিল। বিহার আধুনিক ইতিহাসে পশ্চাৎপদ একটি জনপদ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, কিন্তু এর রয়েছে উজ্জ্বল ইতিহাস। ইতিহাস এখানকার শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রণোদনা দিতে পারে এবং তা দ্রুতলয়ে ঘটছেও।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প গ্রহণের আগে বিহার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এমন প্রণোদনার ভাবনা ছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এর ভিত্তিভূমির পুনর্জাগরণের ব্যাপারে পুরোপুরি দায়বদ্ধ। নালন্দা বিশুদ্ধ একাডেমিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকে থাকবে না। তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিবেশবিদ্যার মতো ব্যবহারিক বিষয়ের মধ্য দিয়ে বিহারের মানুষের জীবনযাত্রার দিক পরিবর্তনের চেষ্টাও থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তারের সঙ্গে যেমন নালন্দার নিরাপদ অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হবে, তেমনি আন্তঃএশীয় সহযোগিতার মাধ্যমে সর্বভারতীয় বিস্তারও ঘটবে বিশ্ববিদ্যালয়টির। বিহার নালন্দাকে সমর্থন দিয়েছে, প্রত্যুত্তরে আমরা চাই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিহারকে সমর্থন জোগাবে।

Friday, September 16, 2011

শুধু আসা শুধু আশা

চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা বলেন, নগর হলো শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ থাকার স্থান। কথাটা অনেকটা রূপকার্থে বলা। প্রকৃত নগরে, মানে যেখানে নাগরিক সংস্কৃতি মেট্রোপলিটন স্তরে উন্নীত সেখানে কেউ কারো জাত জানতে চায় না, অপরিচিত লোকদের দেখলে জেরা করে না। শুধু শরণার্থী নয়, নানা বর্ণের, নানা ধর্মের, নানা মতের মানুষের অস্থায়ী আবাস পৃথিবীর নগরগুলো। নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে তদারকি ছাড়া নিউইয়র্কে কোনো বাঙালি, কোনো চীনা কিংবা কোনো নাইজেরিয়ানকে দেখলে সাধারণ নাগরিকদের মনে এ প্রশ্ন উঠবে সে কী করছে এখানে, কেন এসেছে, কয়দিন থাকবে। কিন্তু ঢাকায় একটু অচেনা বর্ণের, অচেনা মতের মানুষের চলাচল দেখলেই সাধারণ মানুষই প্রশ্ন তুলবে, এ কে? বৈরিতা হোক কি বন্ধুত্ব কোনো অর্থেই এ প্রশ্ন ওঠা নাগরিক সংস্কৃতি-সম্মত নয়। কিন্তু ঢাকায় এ প্রশ্ন ওঠে। আর প্রশ্ন ওঠার অর্থই হলো, আমাদের নাগরিকতা প্রকৃত নাগরিকতা হয়ে ওঠেনি। আর্থসামাজিক সূত্রে গ্রামের টান সেখানে রয়ে গেছে। নগরের আরেক বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে সবসময় কর্মক্ষম তরুণদের ভিড় থাকবে। তরুণরা বৃদ্ধ হলে অবসর নিয়ে একসময় নগর ছেড়ে দূরের শহরে কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত গ্রামে চলে যাবে। নতুন প্রাণোচ্ছল তরুণরা এসে নগর দখল করবে। কিন্তু ঢাকায় মানুষের আসাটা একমুখী। এখানে মানুষ আসে শুধু, এখান থেকে মানুষ যায় না। আরও শুদ্ধ করে বললে, যেতে চায় না। বাধ্য হলে কেউ কেউ যায়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ একবার নগর জীবনে অভ্যস্ত হলে আর গ্রামে ফিরতে চায় না। গ্রামের ছেলেটি শহরে পড়তে এসে চাকরি করে, পয়সা জমায়, পয়সা জমিয়ে নগরেই থেকে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। পরবর্তী প্রজন্মের উন্নততর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার তাগিদে ঢাকায় বা আশপাশে বাড়ি করে। থেকে যায়। গত চলি্লশ বছরে থেকে যাওয়ার হার এতটাই বেশি যে, ঢাকার আশপাশের জেলা শহরগুলো, কৃষিজমি, অকৃষিজমি, বনবাদাড় সব উজাড় করে তৈরি হচ্ছে মানববসতি। এই বসতিগুলোর আকুতি একটাই, ঢাকার পাশে থাকা। অবস্থাপন্ন মানুষরা তো আসন গেড়ে বসেছেনই। ঢাকায় একবার ঢুকলে এর বিকল্প ভাবেন না শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাও। ঋণ করে, কষ্ট করে একটা ফ্ল্যাটের কথা মাথা থেকে কিছুতেই বাদ যায় না। যারা শেষ পর্যন্ত বাড়ি কিনতে পারেন না, তাদেরও অনেকে ভাড়া বাড়িতেই থেকে যান। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, নারায়ণগঞ্জের এক স্থায়ী বাসিন্দা একটি লেখায় লিখেছিলেন, রাজধানীর চাহিদা মেটাতে গিয়ে আশপাশের আদি অধিবাসীদের টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। খুব গভীর এক সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে ঢাকা। আগামীতে যারা ঢাকায় থেকে যেতে চান তাদের অধিকাংশ চাইলেও থাকতে পারবেন না। জায়গা হবে না। কিন্তু ঢাকার বাইরে যদি নাগরিক সুবিধা-সম্পন্ন শহর থাকত। জেলা শহরগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন যদি নিশ্চিত করা যেত, গ্রামে যদি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো যেত তাহলে কিন্তু লোকে এভাবে ঢাকার জন্য মরিয়া হয়ে থাকতেন না। একজন আর্মি অফিসার অবসর নিয়ে চলে যেতেন গ্রামে। একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন অধ্যাপক মফস্বলে থাকতেন। তাদের মাধ্যমে মফস্বল-গ্রাম আলোকিত হতো। জ্যামের শহরে, নাগরিক জীবনের দুর্বিপাকের চক্রে তাদের অবসর জীবন কাটাতে হতো না। এমন হলে মানুষ বিকল্প ঠিকানার জন্য প্রস্তুত হতে পারত। নাগরিক জীবনের সুবিধার জন্য প্রাণান্ত সংগ্রামের বদলে অন্য কিছু তখন চোখে পড়ত আমাদের।

আমার 'দেহ' বই নিয়া চঞ্চল আশরাফের সমালোচনা

মাহবুব মোর্শেদের দেহতত্ত্বদেহ_মাহবুব মোর্শেদ। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : ঐতিহ্য, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১১। মূল্য : ১৫০ টাকাচঞ্চল আশরাফমাহবুব মোর্শেদের 'দেহ' গল্পগ্রন্থটিকে ভুল বোঝার কারণ যথেষ্ট রয়েছে। প্রধানত মনে হতে পারে, এটি ফ্রয়েডীয় যৌন সর্বস্বতাবাদের প্রতিনিধিত্ব করছে। মনে হতে পারে, বেশির ভাগ গল্পের বিষয় শরীর বা সে সম্পর্কিত প্রসঙ্গগুলো। আমি মনে করি, যাঁরা এই ফাঁদে পড়বেন, তাঁরা গ্রন্থটির সম্ভবত প্রকৃত পাঠক নন। কেন নন, তা পরে আলোচ্য কিংবা এই আলোচনা থেকে কিছুটা বুঝতে পারা যাবে।
শরীরসংক্রান্ত যে থিসিস বইটির গল্পগুলোয় পাই, তাতে শেষ পর্যন্ত এটা নিশ্চিত যে 'দেহ' আদৌ ফ্রয়েডভাবিত গল্প সংকলন নয়। লোকদর্শনের অন্তর্গত দেহতত্ত্বের প্রতিনিধিত্বও এটি করছে না। হতে পারে ফ্রয়েডের অনুরসদ মাত্র; কিন্তু এর আসল জিনিসটি হলো সমকালীন বাস্তবতার পটভূমিতে মানুষের (নারী-পুরুষের) সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার ভাষা। 'জিসম' গল্পটি এর একটি উদাহরণ। এর থিসিসটি হলো, শরীর শেষ পর্যন্ত একটা সংস্কার, যাকে আত্মস্থ ও অতিক্রম করতে হয়; নইলে এটি আচ্ছন্ন ও অধিকার করে ফেলে ব্যক্তিকে। করে ফেললে, সমষ্টি উপেক্ষিত হয়, যা সমাজবদলের প্রধান বাধা। গল্পকার পরোক্ষে একটি বার্তাও দিয়েছেন : সমাজ পরিবর্তনে সব কিছুর আগে দরকার শরীরসংক্রান্ত সংস্কার ভেঙে ফেলা। তা করতে গেলে জানা চাই শরীর কী জিনিস; তবে সেই জ্ঞান পুস্তকনির্দেশিত হলে চলবে না। হাতে-কলমে তা হওয়া চাই। গল্পটি পড়তে পড়তে হার্বাট মার্কুইসের একটি প্রত্যয়ের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছেন, মুক্তযৌনতা আসলে সামাজিক প্রতিবাদের অংশ। 'জিসম' ধারণ করেছে মুক্তযৌনতার প্রত্যয়টি, এর মধ্যে প্রতিবাদ আছে; এবং একে সমষ্টিতে সঞ্চারের অভিপ্রায়ও দুর্লক্ষ্য নয় (পড়ুন ১০৩ পৃষ্ঠায় : শোনো, ও যখন যৌন সম্পর্ক করে তখন নিজের জীবনের ব্যর্থতা, গ্লানি, আমার মৃত স্বামীর প্রতি ক্ষোভ, এই ব্যবস্থা_সব কিছুর বিরুদ্ধে তার শারীরিক প্রতিবাদ জানায়। অ্যান্ড আই এনজয় ইট)। মনে হতে পারে, বিষয়টি ব্যক্তিক। কিন্তু গল্পের মধ্যেই সমষ্টির সূত্রটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তিন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী তিনজনের পার্টি দিয়ে শুরু, শরীরসংক্রান্ত সংস্কার ভাঙার তথা প্রতিবাদও এই তিনে মিলেই ঘটানো হয়েছে। এসব নিয়ে 'জিসম' হয়ে উঠেছে প্রচলিত সংস্কার ও সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শারীরিক ভাষা। শুধু এতেই গল্পটির মর্ম নিঃশেষিত নয়; এর আরো ব্যাখ্যাসাপেক্ষ প্রান্ত রয়েছে। সেসব নিয়ে অন্যত্র আলোচনার আশা রাখি। গ্রন্থের প্রথম গল্প 'রাখী' এক ধরনের প্রতিবাদ আর প্রত্যাখ্যানের গল্প। 'আজ রাতে কোথায় ঘুমাব'ও প্রচলিত সমাজকে অস্বীকারের ভাষাকে মর্মে ধরেছে। তবে বইয়ের কোনো গল্পই চিন্তা বা আইডিয়ার দিক থেকে জিসমের মতো এত উচ্চাভিলাষী নয়; যদিও সেগুলো কোনো না কোনোভাবে সমকালীন বাস্তবতার পটভূমিতে মানবসম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার রূপক হয়ে উঠেছে। 'লোলিতা রিলোডেড', 'লুক থ্রু সি থ্রু', 'ঘর মন জানালা, লাইফস্টাইল, আপনার রাশিফল', 'মেলানকলি', 'রুখসানার হাজব্যান্ড'_এই গল্পগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তবে 'সি পেই' গ্রন্থটির মান ও বৈশিষ্ট্যকে খানিকটা ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে হয়। রচনাটি দুর্বল, কারণ সেটা নয়; কারণ এটিও_বইয়ের অন্যান্য গল্পের সঙ্গে এর তাৎপর্যগত কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না।
মাহবুব মোর্শেদের 'দেহ' গল্পগ্রন্থের মূল অভিনিবেশ সময় ও সমাজের সমালোচনায় এবং বোঝা যায়, বেশ ভালো করে বোঝা যায়_গল্পকার প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, বিশ্বাস, সংস্কার, রাজনীতি_এসবের প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট নন। এই অসন্তোষ তাঁর গল্পভাষায়ও সঞ্চারিত হয়েছে। ব্যঙ্গ, বক্রোক্তি, পরিহাসে তা স্পষ্ট। প্রায় সব গল্পে চরিত্রের আত্মবিশ্লেষণই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সময়ের স্থবিরতা প্রামাণ্য করতে অবতারণা ঘটেছে অ্যাবসার্ডিটির (বিশেষ দ্রষ্টব্য 'অর্ডার অব থিংস'), তাতে সমাজ সম্পর্কে লেখকের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্য হয়ে গেছে; গল্পের মধ্যে রচয়িতার সরাসরি অংশগ্রহণও রয়েছে; কিন্তু তা বিশ্বস্ততায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলে মনে হয় না। বলা প্রয়োজন, মাহবুব মোর্শেদের গল্পের প্রধান সম্পদ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, যা প্রভুত্ব করে চরিত্র কিংবা চরিত্র নির্বাচনের ওপর, ভাষায়ও করে; কিন্তু জবরদস্তি হয়ে তা দেখা দেয় না। এমনটি মনে হওয়ার কারণ, লেখক চরিত্রগুলোকে তাদের মতো করে কথা বলতে দেন; তাদের আচরণ সময়ের চেহারায় নির্দেশিত হলেও ঘটনাগুলো পূর্বনির্দিষ্টভাবে ঘটে না। শ্রেণীচরিত্রও গল্পে উপেক্ষিত নয়। তবে বোঝা যায়, লেখকেরও শ্রেণীগত একটি অবস্থান রয়েছে। সেটি কী? 'জিসম' গল্পের শিষ্যটির দিকে মনোযোগ দিলেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।


কালের কণ্ঠে প্রকাশিত   

আমার বই ‌'দেহ' নিয়া নিজের লেখা

'দেহ' শব্দটি আমাদের ভাষায় কিছুটা মরমি আবহ সঙ্গে নিয়ে উচ্চারিত হয়। আমাদের দর্শনের ইতিহাসে দেহতত্ত্ব বলে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় আছে। আমাদের কবিরা দেহ
বিষয়টিকে রূপক, প্রতীক, উপমা ও উৎপ্রেক্ষার অন্তরালে বর্ণনা করেছেন। কবি-দার্শনিকের কাছে দেহ কখনো রূপকাঠের নৌকা, কখনো যন্ত্র, কখনো মেশিন, কখনো বা খেলার মাঠ। দেহ শব্দটিকে আড়াল করতে গিয়ে যত রূপকের ব্যবহার হয়েছে তা বোধহয় অনেক ক্ষেত্রেই ঘটেনি।
‘দেহ’ নিয়ে এই দর্শন ও কবিতার উত্তরাধিকার আমাদের চেতনে যেমন অবচেতনেও তেমনি ক্রিয়া করে। একে অস্বীকার করার উপায় কোথায়? কিন্তু এই রূপকের দেহের বাইরে এক পার্থিব দেহ নিয়েও আমাদের চলতে হয়। এ দেহ আমরা ধারণ করি, এ দেহ আমরা পালন করি, এ দেহ আমরা ত্যাগ করি। এ দেহের সাহায্যে আমাদের সঙ্গে অপর মানুষের এবং বস্তু পৃথিবীর সম্পর্ক তৈরি হয়। এ দেহের কথাও আমাদের কবিরা বলে গেছেন। রচনা করেছেন আখ্যান। আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানে গানে যে দেহের কথা বলেছেন, সে দেহ কখনো রূপকের, রূপকাঠের, কখনো বা দুনিয়াবি শরীর। কাব্য অনেক সময়ই খোলাসা করে না, কী নিয়ে সে বলছে। কিন্তু গদ্যের জগতে খোলাসা না করে উপায় নেই। আমাদের ফিকশনের জগতে দেহ খানিকটা আড়ষ্ঠ, খানিকটা ইতস্তত-ভিক্টরীয় নৈতিকতায় আচ্ছন্ন। তবুও তো মানুষ বলছে, গল্প রচিত হচ্ছে। রচিত হচ্ছে শরীরের আখ্যান, দেহের ভাষ্য। দেহই আমাদের ক্ষুধা, নিদ্রা, নিরাপত্তা, বসবাস ও জৈবিকতার আধার। ফলে, ‘দেহ’ আমার বইয়ের নাম। গত ১০ বছরে বিভিন্ন সময় লেখা গল্পগুলো থেকে বেছে নেওয়া গল্পগুলো এতে গ্রন্থিত হয়েছে।
দেহ-নাম, বিষয়-সম্পর্ক। আমাদের যাপনের মধ্যে মানবিক সম্পর্কগুলো কদর্যতা ও মাধুর্য, আমাদের নাগরিক জীবনের সংশয়-সন্দেহ, অতিসাম্প্রতিক বোধ ও মূল্যবোধগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার সামান্য চেষ্টা এ বইয়ে থাকতে পারে। লেখক হিসেবে এর বেশি দাবি আমার নেই।
‘দেহ’ আমার দ্বিতীয় গল্পের বই। প্রথম বইটি ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কাগজ প্রকাশনী থেকে। ২০১০ সালে একটি উপন্যাস ছেপেছিল ভাষাচিত্র প্রকাশনী। ‘দেহ’ প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী। বইটি মেলায় এসেছে ৫ ফেব্র“য়ারি। দাম ১৫০ টাকা। বইটি উৎসর্গ করেছি আমার ছেলে নিভৃত অনুরণনকে। সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় আমি লক্ষ করেছি, পোশাক নয়-যাকে আমরা আদিম বলি সেই শরীরেই আসলে আমরা নির্মাণ করি সভ্যতা। শরীরের বেড়ে ওঠার সঙ্গে বেড়ে ওঠে সভ্যতাও।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত

আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশ

পার্বত্য দার্জিলিংয়ের একটি স্থানের নাম 'ঘুম'। সেখানে আছে একটি ছোট রেলওয়ে স্টেশন। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ৪০৭ ফুট ওপরের এ স্টেশনটি ভারতের সবচেয়ে উচ্চতম রেলওয়ে স্টেশন। দার্জিলিংয়ে দর্শনীয় স্থানের মধ্যে ঘুম অন্যতম। জায়গাটির নাম ঘুম বলে নয়, ঘুমের কাছের টাইগার হিলই বরং পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। টাইগার হিল থেকে সুন্দরতম পার্বত্য চূড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট দেখা যায়। আকাশ ফরসা থাকলে মাউন্ট এভারেস্টের দেখাও মেলে। অবশ্য সবার কাঞ্চনজঙ্ঘা বা এভারেস্ট দেখার ভাগ্য হয় না। কারণ ঘুম মেঘের রাজ্য। সুউচ্চ এই পার্বত্য এলাকায় মানববসতির গায়ে গা ঘেঁষে মেঘ থাকে। চাইলেই ছোঁয়া যায় এমন সব মেঘ। পাশ দিয়ে মেঘ উড়ে গেলেও লোকে ভিজে যায়। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি হয়। আর দৃষ্টিপথকে আচ্ছন্ন করতে ঘুমের মেঘের কোনো জুড়ি নেই। তাই মেঘই ঠিক করে দেয় কে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবে, কে দেখবে না।
আমি কখনও দার্জিলিং যাইনি, ঘুম দূরের কথা। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় দার্জিলিং দেখেছি। কলকাতার পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের একটি সিনেমার নাম 'তিতলি'। তিতলি মানে বর্ষার প্রথম দিন। হিন্দিতে তিতলি মানে অবশ্য প্রজাপতি। মিঠুন চক্রবর্তী, কঙ্কনা সেনশর্মা, অপর্ণা সেন অভিনীত সেই সিনেমায় ঘুম নামের জায়গাটিতে মিঠুন চক্রবর্তীর গাড়ি থেমে গিয়েছিল। বাংলা অঞ্চলে ঘুম নামে যে একটি জায়গা আছে সেটি জানা হয়ে যায় ওই সিনেমা দেখতে দেখতে। ঘুম শব্দটি তখন থেকেই আমার কাছে একটি স্থানের নাম। সুউচ্চ পার্বত্য দার্জিলিংয়ের নির্জন একটি জায়গা। যেখানে মেঘের নিবাস। চাইলেই, হাত বাড়ালেই মেঘ ছোঁয়া যায়। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি এসে পথিককে ভিজিয়ে দেয় যেখানে। ঘুম বললে একটি দৃশ্যহীনতা তৈরি হওয়ার কথা। বড়জোর পাতা বন্ধ দুটো চোখের দৃশ্য ভাসতে পারে। কিন্তু ঘুম বলতে যে একরাশ বৃষ্টিভেজা সবুজ চোখে ভাসতে পারে তার কৃতিত্ব ঘুম জায়গাটিকেই দিতে হবে। কিন্তু জায়গাটির নাম কীভাবে ঘুম হলো? হয়তো পর্যটকের ভিড় লাগেনি যখন, যখন নীরবতাই ছিল স্থানটির আবহসঙ্গীত, তখন এর নামকরণ হয়েছিল ঘুম। নৈঃশব্দ্য জায়গাটিকে ঘুমের তুলনীয় করে তুলেছিল।
কিন্তু ঘুম কি নীরবতা? আমাদের কবির কাছেও ঘুম অরব অন্ধকারের ব্যাপার। কোন কবি? প্রশ্নটা কি খুব কঠিন? কে ঘুম শব্দটাকে বাংলায় বহুবর্ণিল তাৎপর্যে ও গভীর দ্যোতনায় ব্যবহার করেছেন সবচেয়ে বেশি? জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দীয় ঘুম আসলে মৃত্যুরই আরেক নাম। 'আট বছর আগে একদিন' কবিতার সেই বিখ্যাত ঘুমের কথা অনেকের কণ্ঠস্থ। একবার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল কবিতার চরিত্রটির। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত জাগরণের কালে জ্যোৎস্নায় সে হয়তো কোনো ভূতকেই দেখে ফেলেছিল। এর পর থেকে প্রেম, আশা, সন্তান, বধূসহ জীবনের সব আয়োজন থাকার পরও তার মরিবার সাধ হয়। অশ্বত্থের শাখায় উদ্বন্ধনে আত্মাহুতি দেয় সে। অবশেষে আকাঙ্ক্ষিত ঘুম আসে তার। লাশ কাটা ঘরে টেবিলের 'পরে শুয়ে ঘুমায় এবার। কিন্তু কখন মানুষ এই ঘুম চায়? 'নারীর হৃদয়_ প্রেম-শিশু-গৃহ_ নয় সবখানি;/অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়_/আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে;/আমাদের ক্লান্ত করে;/ক্লান্ত ক্লান্ত করে ;/লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই,/তাই/লাশকাটা ঘরে/চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের 'পরে।' তবে কি এক ধরনের বিদগ্ধ ক্লান্তি, জীবনের নেতিবাচক উপলব্ধি থেকে পলায়নের জন্য ঘুমকে আশ্রয় করে লোকে। কোনোদিন জাগিবে না জেনেও, সেই ঘুমকে আবাহন করে। কেননা সে জাগিবার গাঢ় বেদনার অবিরাম অবিরাম ভার আর সহিবে না বলে সিদ্ধান্তে এসেছে। তাই এই চিরঘুম, চিরনীরবতা। অবশ্য 'অন্ধকার' কবিতার প্রথম পঙ্ক্তিতে চিরঘুম থেকে জাগবার ক্ষীণ আশা দেখা গিয়েছিল। সেখানে শুরুতেই কবি বলেছেন, 'গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার'। কিন্তু পাঠক এই জাগরণকে স্বাগত জানাবার আগেই কবি জাগরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। বললেন, কোনোদিন জাগবেন না জেনেই পৌষের রাতে ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে শুয়েছিলেন। কিন্তু জেগে উঠে দেখলেন পাণ্ডুর চাঁদ কীর্তিনাশার দিক থেকে অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে। অবশ্য এই চাঁদের ক্ষমতা সামান্য। হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে, রয়েছে যে অগাধ ঘুম, সে ঘুম নষ্ট করার শেল তীব্রতা এ চাঁদের নেই। দোষ শুধু চাঁদের নয়। অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকার পর হঠাৎ আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে পৃথিবীর জীব বলে নিজেকে শনাক্ত করতে পারলেও কবি ভয় পেয়েছেন, বেদনাবিদ্ধ হয়েছেন, ঘৃণা ও আক্রোশে তার হৃদয় ভরে গেছে। তাই আবারও ঘুমকেই_ শ্রেয়তর মনে হয়েছে তার। 'গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;/আমাকে কেন জাগাতে চাও?/হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘনিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি, হে হিম হাওয়া/আমাকে জাগাতে চাও কেন।/অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠব না আর;/তাকিয়ে দেখব না নির্জন বিমিশ্র চাঁদ বৈতরণীর থেকে/অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে/কীর্তিনাশার দিকে।/ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব-ধীরে-পউষের রাতে।/কোনদিন জাগব না জেনে-/কোনোদিন জাগব না আমি_ কোনোদিন আর।'
আমাদের প্রিয় কবির কাছে ঘুম হলো জীবনের প্রতি নির্মম প্রতিশোধের উপায়_ মৃত্যু। মৃত্যুর উপমা হিসেবে ঘুমের ব্যবহারে জীবনের প্রতি প্রত্যাখ্যান আছে; আশাহীন, দিশাহীন জীবন থেকে পলায়নের বার্তাও আছে।
বিশ শতকের আধুনিক এক কবির ঘুম চেতনায় হয়তো কেউ বিস্মিত হবেন না বা চমকে যাবেন না। নেতির এ আয়োজন আধুনিকোচিত বলেই বিবেচিত হয়। কিন্তু কোনো ধর্মীয় আচারে যদি ঘুমকে মৃত্যুর সমতুল্য বলা হয় তবে হয়তো অনেকেই চমকে যাবেন। মুসলমানরা দৈনন্দিন প্রায় সব কাজের আগে দোয়া পড়ে আল্লাহকে স্মরণ করেন। ঘুমের আগে তারা যে দোয়াটি পড়েন তা হলো, 'আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া'। আরবি এ দোয়ার অর্থ_ 'হে আল্লাহ তোমার নামে আমি মৃত্যুকে বরণ করলাম, তোমার নামেই জেগে উঠব আবার।' এখানে কি ঘুম মৃত্যুর উপমা, নাকি মৃত্যুই ঘুম এখানে?
ঘুমকে অন্য এক তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হতে দেখা যায় সুরা কাহফে। কোরআনের তাফসিরকারীদের মতে, ঘটনাটি এফসুস অঞ্চলের। রোমান শাসক সিজার দাকিয়ানুস বা ডিসিয়াসের সময়কার। তখন রোমে অনেকে ঈসা নবীর প্রচারে ধর্মান্তরিত হলেও সম্রাট ডিসিয়াস ছিলেন প্রচণ্ড বিরোধী মনোভাবাপন্ন। তার সাম্রাজ্যের কয়েকজন যুবক ঈসা নবীর অনুসারী হয়েছে জানতে পেরে তিনি তাদের ডেকে পাঠান এবং ধর্মমত পরিবর্তনের জন্য তিন দিন সময় বেঁধে দেন। তিন দিনের অবকাশের সুযোগে যুবকরা পাহাড়ের পথ ধরেন। তারা চেয়েছিলেন পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে থেকে রাজার রুদ্ররোষ থেকে বাঁচতে। পথে একটি কুকুর তাদের সঙ্গী হয়। পাহাড়ে গিয়ে একটি গুহায় লুকিয়ে পড়েন তারা। সঙ্গী কুকুরটি গুহার দরজায় পাহারার দায়িত্ব নেয়। যুবকরা জেগে ওঠার পর পরস্পরের মধ্যে কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। তাদের কেউ বলেন, একদিন, কেউ বলেন দিনের একটি অংশ বড়জোর ঘুমিয়েছেন তারা। ক্ষুধার্ত থাকায় সঙ্গীদের একজনকে খাবার আনতে শহরে পাঠান তারা। সঙ্গী খাবার আনতে গিয়ে দেখেন শহরে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। মূর্তিপূজা ছেড়ে সবাই এক স্রষ্টার অনুসারী হয়েছে। এতে তিনি ভীষণ অবাক হয়ে যান। দোকানে খাবারের বিনিময়ে মুদ্রা দিতে গেলে দোকানদার তাকে অবাক করে দিয়ে বলেন, এ মুদ্রা তো দুশ' বছর আগেকার। গুহাবাসী যুবক তখন বলেন, কালই তারা শহর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে গিয়েছিলেন। দোকানদার ও আশপাশের লোকেরা যুবককে সম্রাট তেযোসিস বা সিজার দ্বিতীয় থিয়োডসিসের কাছে নিয়ে যান। সম্রাটসহ লোকেরা গুহা পর্যন্ত তার সঙ্গী হন। গিয়ে দেখেন সত্যিই সেখানে দুশ' বছর আগের যুবকরা অবস্থান করছে। তখন মৃত্যুর পরের জীবনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিকে হয়ে আসছিল। আসহাবে কাহফের অভিনব ঘটনায় মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও পরকালের প্রতি সবার বিশ্বাস ফিরে আসে। লোকদের বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়ে যুবকরা আবার গুহায় গিয়ে শুয়ে পড়েন এবং সেখানে তাদের মৃত্যু হয়। আসহাবে কাহফ বা গুহার মানুষদের এ ঘটনা ঘুমের অন্য এক তাৎপর্য হাজির করে। ঘুম মৃত্যুর সমান_ এ কথা যেমন বলা হয়েছে; তেমনি ইসলামী বিশ্বাসে মৃত্যুর তুলনা হিসেবেও ঘুম ব্যবহৃত হয়েছে। ঘুমের পর যেমন আছে জাগরণ, তেমনি মৃত্যুর পরও আছে পুনরুত্থান ও পরকাল।
আসহাবে কাহফের ঘটনা ঈসা নবীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘটিত হলেও বাইবেলে এ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। জেমস সারোজি নামের একজন খ্রিস্টান জাজক ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। ষোড়শ শতকের প্রোটেস্টান্ট সাহিত্যে এবং সিরিয়ান সাহিত্যে এ ঘটনার উল্লেখ আছে। কোরআনে ঘুমন্ত ব্যক্তিদের নিশ্চিত কোনো সংখ্যা বলা না হলেও পাশ্চাত্যের সাহিত্যে সাত সংখ্যাটি পরিচিত। পরবর্তীকালে পাহাড়ের সাত ঘুমন্ত ব্যক্তির দীর্ঘ ঘুমের ধারণা অবলম্বন করে আধুনিক সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে আমেরিকান লেখক ওয়াশিংটন আরভিংয়ের 'রিপ ভ্যান উইঙ্কেল' ব্যাপকভাবে পরিচিত। উপন্যাসে রিপ ভ্যান উইঙ্কেল একজন আমুদে, অলস ব্যক্তি। শহরে সবাই তাকে পছন্দ করে। কিন্তু বউ তাকে খোঁটা দেয়। বউয়ের খোঁটা সইতে না পেরে একদিন সে অপরিচিত কিছু লোকের সঙ্গী হয়। এবং সঙ্গীদের সঙ্গে নেশা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। জেগে ওঠার পর বাড়িতে গিয়ে কিছুই আর চিনতে পারে না। শহরে গিয়েও দেখে সবকিছু পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কেননা ঘুমের মধ্যেই অনেক বছর কাটিয়ে জেগে উঠেছিল রিপ ভ্যান উইঙ্কেল। রিপ ভ্যানের মতোই আরেক অলস চরিত্র অবলোমভ। রিপ ভ্যানের মতো বিখ্যাত না হলেও অবলোমভই বেশি অলস। তবে দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের চক্করে অবলোমভকে পড়তে দেখি না আমরা। অবলোমভ বরং দীর্ঘস্থায়ী আলস্যের চক্করে পড়ে থাকে। অবলোমভ রাশিয়ান চরিত্র। তার আলস্য এতটাই সিরিয়াস ছিল যে, ১৯২২ সালে রাশিয়ার বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ ইলিয়ানভ লেনিন একটি বক্তৃতায় বলেন, 'রাশিয়া তিন-তিনটি বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু অবলোমভরা এখনও রয়ে গেছে, এদের ধুয়ে দিতে হবে, পরিষ্কার করে ফেলতে হবে, এদের মূলোৎপাটন করতে হবে। নতুনভাবে জেগে ওঠার আগে এদের ঝাড়েবংশে নির্মূল করতে হবে।' লেনিনের ঘোরতর শত্রু অবলোমভরা কিন্তু প্রতাপশালী জার, সামন্ত প্রভু বা বুর্জোয়া নয়। এরা একান্তই আলস্যের প্রতিভূ। তাও আবার বাস্তবের অলস নয়, উপন্যাসের চরিত্র। ইভান গনচারভের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলোমভের মূল চরিত্র অবলোমভ। রাশিয়ার অভিজাত পরিবারের সদস্য অবলোমভ উদ্যমহীনতা, কর্মহীনতা, উদ্যোগহীনতা সর্বোপরি আলস্যের প্রতীক। রাশিয়ায় তরুণদের মধ্যে, বিশেষত অবস্থাপন্ন ঘরের তরুণদের মধ্যে একসময় আলস্য প্রবণতা প্রচণ্ড জাঁকিয়ে বসেছিল। এদের মাথায় রেখেই অবলোমভ উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল। পরে এ ধরনের লোকদের অবলোমভ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতে থাকে। এবং অবলোমভিজম নামে একটি মতবাদেরও জন্ম হয়। অবলোমভিজমের প্রভাব কতদূর বিস্তৃত তা বলতে গিয়ে এক সমালোচক লিখেছেন, এমনকি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের কারণও এই অবলোমভিজম। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়া তার জগৎ বিখ্যাত আলস্য কোথায় পেল? উত্তরও এসেছে। তা হলো পূর্বদিক বা প্রাচ্য থেকে এই আলস্য এসেছে। পূর্বদিক মানে আমাদের অঞ্চল। আমাদের অঞ্চল থেকে যদি আলস্য রাশিয়ায় রফতানি হয়ে থাকে তবে এখানে আলস্য ব্যাপারটা কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়। একসময় আমাদের অঞ্চলে আলস্য ব্যাপারটি দর্শনের পর্যায়ে পেঁৗছে গিয়েছিল। মহাযান বৌদ্ধ মতবাদে জেন বলে একটি ঘরানা আছে। তাতে 'আর্ট অব ডুয়িং নাথিং' শেখানো হয়। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিছু না করা তো শিখতে হয় না, কিছু না করলেই হয়। কিন্তু জেন মতবাদে বলা হচ্ছে, 'নিশ্চিতভাবেই আমরা সবাই জানি কীভাবে কিছু না করতে হয়। আমরা সবাই জানি কীভাবে বসে থেকে সময় নষ্ট করতে হয়। আমাদের অনেকেই এই কিছু না করতেই ব্যস্ত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আমরা যখন কিছু করি না তখন আমাদের মন ব্যস্ত থাকে অন্যত্র, সে কিছু না করায় স্থিত থাকে না। আমরা আসলে আরাম করতে এবং কিছু না করাকে উপভোগ করতে পারি না।' জেন কিছু পালনীয় নিয়মের কথা বলছে যেগুলোর মাধ্যমে কিছু না করা একেবারে কিছু না করায় পর্যবসিত হতে পারে। রাশিয়ানরা যদি আরামের ব্যাপারটি জেনদের কাছে শিখে থাকে তাহলে তারা অনেকটা ভুল শিখেছে তা নিশ্চিত। জেনে যেমন আর্ট অব ডুয়িং নাথিং বলে একটি ব্যাপার আছে, তেমনি আর্ট অব সাউন্ড স্লিপিং বলে একটি ব্যাপারও আছে। নিরাপদ নিরবচ্ছিন্ন ঘুম কতটা প্রয়োজনীয় তা সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারেন অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত মানুষেরা। অনিদ্রা রোগে আক্রান্তদের জন্য বহু আগে থেকে এক শান্তিদায়ক তেল তৈরি হয় এ দেশে। তেলটির নাম মোহনীয়_ নিদ্রাকুসুম। নিরাপদ ও নিরুপদ্রব আরাম ও ঘুমের মতো কি শান্তিময় মৃত্যুও আছে নাকি? একসময় কি শিখতে হবে কীভাবে নিরাপদে মরা যায়? তা যদি না হবে তাহলে আমাদের সমাজে কেন 'নিরাপদ মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই' দাবিটি দিনকে দিন জোরালো হচ্ছে?