পৃথিবীর বৃহত্তম চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান কোনটি? প্রশ্নটি শোনার পর অনেকেই
হিসাব মেলানোর চেষ্টা করবেন। স্বভাবতই প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোক্তাদের কথাই
প্রথমে মাথায় আসবে অনেকের। বিশ্বে এখন প্রাইভেট সেক্টরের জয়জয়কার।
মাল্টিন্যাশনাল, ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানির দাপট অনেক। তারা বিশ্বজুড়ে
প্রচুর মানুষকে চাকরি দিচ্ছে। কিন্তু চাকরি নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন
তারা বলছেন, প্রাইভেট সেক্টর কাজ দিতে কার্পণ্য করে। কাজ তৈরির ক্ষেত্রে
তাদের পূর্বাপর ভাবনায় অনেক সময় চলে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, মুনাফা যখন প্রধান
লক্ষ্য তখন তারা কাজ তৈরির চেয়ে কাজ কমানোর চিন্তাই বেশি করে। ফলে যখন
মন্দা দেখা দেয়, যখন দ্রুত সক্ষম নাগরিকদের জন্য কাজ সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা
দেয় তখন প্রাইভেট সেক্টর খুব বেশি ভরসা জাগাতে পারে না। প্রাইভেট সেক্টরের
ভরসা না পেয়ে সরকারগুলো পাবলিক সেক্টরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই প্রাইভেট
সেক্টরের রমরমার এই যুগেও পাবলিক সেক্টরই শেষ ভরসা। সম্প্রতি পৃথিবীর
বৃহত্তম চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকা দেখে
অনেকেই ভিরমি খাবেন। কেননা, শীর্ষ ১০ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের ৭টিই সরকারি।
তার চেয়ে বড় কথা, এগুলো খুবই ট্রাডিশনাল প্রতিষ্ঠান। অন্তত প্রথম দুটি
প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্কই নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে ৩.২ মিলিয়ন (৩২ লাখ) মানুষ। আর এ
প্রতিষ্ঠানটির নাম ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স, ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।
অর্থাৎ মার্কিন সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে
কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের ১ শতাংশ মানুষ। দ্বিতীয় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে ২৩ লাখ মানুষ। চীনের
আরও তিনটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পঞ্চম, ষষ্ঠ ও নবম অবস্থানে আছে। চায়না
ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে কাজ করে ১৭ লাখ লোক। আর স্টেট গ্রিড
করপোরেশন অব চায়নাতে কাজ করে ১৬ লাখ মানুষ। চায়না পোস্ট গ্রুপে কর্মী
সংখ্যা ৯ লাখ। যুক্তরাজ্যে আর্মি নয়, রাষ্ট্রীয় হেলথ সেক্টরে সবচেয়ে বেশি
লোক কাজ করে। সংখ্যায় তারা ১৪ লাখ আর শতাংশের হিসাবে মোট জনগোষ্ঠীর ২.৫%।
ভারতেও সবচেয়ে বড় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চলে। এর নাম
ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ। এতে কাজ করে ১৪ লাখ লোক। পৃথিবীর শীর্ষ দশ চাকরিদাতা
প্রতিষ্ঠানে প্রাইভেট সেক্টরের প্রতিষ্ঠান মাত্র তিনটি। চেইন শপ ওয়ালমার্ট,
চেইন ফুডশপ ম্যাকডোনাল্ডস, ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতির প্রতিষ্ঠান হ্যানহুই।
এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীসংখ্যা যথাক্রমে ২১ লাখ, ১৭ লাখ ও ৮ লাখ। তথ্যগুলো
নিশ্চয় বিশদ আলোচনা ও মনোযোগ দাবি করে। কোন দেশ কোন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব
দেয় এবং কোথায় নাগরিকদের নিয়োজিত রাখে তাও এ থেকে বোঝা যায়। তবে আজকের
পৃথিবীতেও যে শীর্ষ চাকরিদাতা দুটি প্রতিষ্ঠান দুটি দেশের সেনাবাহিনী এ
তথ্যটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা হয় কি-না জানা
নেই। হলেও গণমাধ্যম পর্যন্ত পেঁৗছায় না। কেন হয় না এবং কেন পেঁৗছায় না সেটি
কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু এ দেশে শীর্ষ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান কোনটি? এ প্রশ্নের
উত্তর নিশ্চয়ই তত কঠিন নয়।
Wednesday, September 14, 2011
Wednesday, September 7, 2011
দিল্লিতে নাশতা, চট্টগ্রামে লাঞ্চ মান্দালয়ে রাতের খাবার

কয়েক বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আশা প্রকাশ করেছিলেন- দিল্লিতে নাশতা, লাহোরে লাঞ্চ আর কাবুলে রাতের খাবার খাবেন। ভারতের পশ্চিমের দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে মনমোহন এমন স্বপ্ন ব্যক্ত করেছিলেন। ভারত আশা করেছিল, শান্তি আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে একটা চমৎকার সম্পর্কে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু মুম্বাইয়ে হোটেল তাজে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা তার সে আশার গুড়ে বালি ফেলে দেয়। এখন ঢাকা সফরের আগে ভারতের কয়েকজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী তার সে ইচ্ছার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য সি. রাজা মোহন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় দুটি কলাম লিখে এ বিষয়ে মনমোহন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন তিনি। বলেছেন, পশ্চিম সীমান্তে যা হয়নি পুবে তা হতে দোষ কি? মনমোহন দিল্লিতে নাশতা, চট্টগ্রামে লাঞ্চ আর মান্দালয় বা কুনমিংয়ে রাতের খাবারের কথা ভাবছেন না কেন? ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে পূর্বদিকে সম্পর্কোন্নয়নের এই আইডিয়া আসার পেছনে বড় একটি কারণ চীন। বেশ কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশীদের বেলায় চীন যে নীতি অনুসরণ করছে তা শুধু এশিয়াতে নয়, পুরো বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রতিবেশীদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। তাদের সঙ্গে উন্নয়ন, অগ্রগতি ভাগ করে নিতে চেয়েছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা, বাণিজ্য, যোগাযোগে তাদের সহায়তা করেছে। এর ফল হয়েছে দারুণ। দেখা গেছে, সীমান্তজুড়ে চীনের বন্ধুর শেষ নেই। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অগ্রগতি হয়েছে সত্য, কিন্তু প্রতিবেশীদের তাতে কোনো ভাগ নেই। ভারতের চারদিকে বিরোধিতাই মূল আবহসঙ্গীত হিসেবে বেজে চলেছে। বিশ্বে শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে গেলে এটা সুখকর কোনো অবস্থান হতে পারে না। তাই ক্ষীণ হলেও ভারতে এখন সমঝোতার কূটনীতি জায়গা করে নিয়েছে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তো আছেই। নিজেদের স্বার্থেও ভারতের এখন এটি দরকার। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে এ মনোভাবের ছাপ পড়তে পারে বলে আশা করছিলেন কেউ কেউ। সি. রাজা মোহন মনে করেন, এ সফরটি 'গেম চেঞ্জার' বা 'খেলার বদল ঘটানো' উদ্যোগ। রাজা মোহন বলেছেন, মনমোহনের এই সফর শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের জন্যই একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং চীন পর্যন্ত এ সফরের প্রভাব পড়তে পারে। তার মতে, ভারতের জন্য এটি একটি সুযোগ। বাংলাদেশও মনে করে ট্রানজিটকে বাংলাদেশ- ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিস্তৃত করা দরকার। ট্রানজিট থেকে ভারত যেমন তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে তেমনি বাংলাদেশেরও উপযুক্ত ট্রানজিট মাশুল পাওয়া উচিত। দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের বাইরে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত ট্রানজিট সুবিধা বিস্তৃত হওয়া উচিত। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই উপমহাদেশের পূর্বাংশের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে চীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সঙ্গে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, নেপাল এবং পূর্ব ভারতের আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ইউনান থেকে মিয়ানমার-বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। ব্রিটিশরাজ যা পারেনি তা এবার সম্ভব হচ্ছে। মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেল ট্রানজিটের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। রাজা মোহন মনে করেন, এই সফরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর উচিত শেখ হাসিনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে দক্ষিণ এশীয় রেল নেটওয়ার্কে ভারতের যুক্ত হওয়ার পথে শক্ত অবস্থান নেওয়া। রাজা মোহনের মত যে খুব গৃহীত হচ্ছে তা নয়। বরং এখনও রক্ষণশীল প্রতিবেশী নীতিই ভারতে প্রধান। মনমোহন সেই রক্ষণশীলতা কাটিয়ে চীনের মতো ভারতকেও আঞ্চলিক নেতার মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারবেন কি-না, প্রতিবেশীদের ছাড় দিয়ে, সুযোগ দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন কি-না সেটি ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
Tuesday, September 6, 2011
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক :: অমীমাংসিত ইস্যু দীর্ঘ তালিকা :পথের শেষ কোথায়
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে বন্ধুত্ব, শান্তি, সহযোগিতা, বাণিজ্য ও
অংশীদারিত্বের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ অতীতে এসেছে। কখনও ভুল বোঝাবুঝি, কখনওবা
আন্তরিকতার অভাব কিংবা রাজনৈতিক পালাবদলে অনেক উদ্যোগ পথ হারিয়েছে।
টানাপড়েনের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে বহুবার। বিবদমান বিভিন্ন ইস্যুতে
চাপান-উতোর চলেছে দু'দেশের মধ্যে। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের
ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক পৌঁছাতে চাইছে নতুন দিগন্তে। নতুন যুগে,
নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দু'দেশই বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, বাণিজ্য ও কানেকটিভিটির
অর্থপূর্ণ কর্মসূচির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, ট্রানজিট,
সহযোগিতার সমন্বিত রূপরেখা, ১৯৭৪ সালের সীমান্ত নির্ধারণ, সুন্দরবন ও বাঘ
রক্ষা, রেলওয়ে সহযোগিতাসহ বারোটি সম্মতিপত্র, চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা
স্মারক এ সফরে স্বাক্ষরিত হবে। তবে, সব পক্ষই স্বীকার করে বরফ গলতে শুরু
করেছে মাত্র। সব সমস্যার সমাধান এক সফরেই হবে না। সন্ত্রাসবাদ, পানি বণ্টন,
সমুদ্রসীমানা নির্ধারণ, বাণিজ্য ঘাটতি, ভিসা জটিলতা, আস্থার সংকটসহ বহু
ইস্যু এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। দু'দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সম্পর্কই পারে
ক্রমান্বয়ে এসব সমস্যার সমাধান করতে।
অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন
ভারত ও বাংলাদেশ ৫৪টি অভিন্ন নদীর অংশীদার।
বাংলাদেশ আশা করে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে উজানের দেশ হিসেবে ভারত
বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা দেবে। বাস্তবে সেটি ঘটেনি। বিগত আওয়ামী
লীগ সরকারের আমলে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ৩০ বছর
মেয়াদি এ চুক্তির ফলে পদ্মায় পানিপ্রবাহ বেড়েছে। বাকি নদীগুলোর ক্ষেত্রে
এমন চুক্তির প্রত্যাশা থাকলেও এতকালে তা হয়নি। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি
ছিল উত্তরাঞ্চলের সেচকাজের সঙ্গে জড়িত তিস্তা ব্যারাজের স্বার্থে তিস্তা
চুক্তি হোক। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির
কারণে পূর্বনির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এ সফরে তিস্তা নদীর পানি
বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না।
ভবিষ্যতে বহুল আলোচিত টিপাইমুখ প্রকল্পটি আবার আলোচনায় আসতে পারে। ভারত যদি বৃহৎ এ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জলাধার প্রকল্প চালু করার উদ্যোগ নেয়, তবে দু'দেশের নদ-নদীর পানির হিস্যা নিয়ে নতুন সংকট দেখা দেবে। বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় নতুন প্রতিবেশগত সংকটও ঘনীভূত হবে।
ভবিষ্যতে বহুল আলোচিত টিপাইমুখ প্রকল্পটি আবার আলোচনায় আসতে পারে। ভারত যদি বৃহৎ এ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জলাধার প্রকল্প চালু করার উদ্যোগ নেয়, তবে দু'দেশের নদ-নদীর পানির হিস্যা নিয়ে নতুন সংকট দেখা দেবে। বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় নতুন প্রতিবেশগত সংকটও ঘনীভূত হবে।
বাণিজ্য ঘাটতি
বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানির ক্ষেত্রে ৪৮০টি পণ্য
স্পর্শকাতর হিসেবে তালিকাভুক্ত আছে। গত রোববার ভারতের বাজারে ৪৮০টি পণ্যের
ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন
এফবিসিসিআই। ৬২টি সুনির্দিষ্ট পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে রাজি
হয়েছে ভারত। এ পণ্যের ৪৭টি বস্ত্র খাতের। আশা করা হচ্ছে, মনমোহন সিংয়ের
সফরের সময় বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। ৩ সেপ্টেম্বর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের
সূত্রে বিবিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৬১টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার
দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি এ. কে. আজাদ
জানিয়েছেন, ২০১০-১১ অর্থবছরে ভারত থেকে ৪৫৭ কোটি ডলার আমদানির বিপরীতে
বাংলাদেশ থেকে ভারতে মাত্র ৫১ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। দুই
দেশের বাণিজ্য বাড়ছে, সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়ছে।
সুষম সম্পর্কের স্বার্থেই ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে। এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ১২ জুলাই তারিখের সম্পাদকীয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আনন্দবাজার লিখেছে, 'বাংলাদেশের জন্য শর্তহীনভাবে ভারতীয় বাজার খুলিয়া দিতে হইবে যাহাতে বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতকে স্বাভাবিক বাজার হিসাবে বিবেচনা করিতে পারেন। বাংলাদেশি পণ্যের উপর কোনও আমদানি শুল্ক আরোপ করা চলিবে না। বাংলাদেশের নিকট ইহার প্রতিদান চাহিবার প্রশ্নই নাই। তাহাতে ভারতের কোনও ক্ষতি নাই। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মোট রফতানির পরিমাণ ১৫০০ কোটি ডলার, আর ভারতের মোট আমদানির পরিমাণ ৩২,১০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের সমস্ত পণ্যও যদি ভারতীয় বাজারে পৌঁছায়, তাহারও প্রভাব ভারতীয় অর্থনীতির উপর নামমাত্র।'
ভারতের বাজারের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে তারা বাংলাদেশের জন্য যে ছাড় দিতে যাচ্ছে তাকে রক্ষণশীলতাতাড়িত সামান্য ছাড় বলতে হয়। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দু'দেশের অংশীদারিত্বের অনেক ইস্যু মনমোহন সিংয়ের সফরের পরও অমীমাংসিত থেকে যাবে। ২০১১ সালে দু'দেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ঘটনা হলো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশে তৈরি ১ কোটি পিস শুল্কমুক্ত পোশাক ভারতের বাজারে রফতানি করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ৩১ লাখ ও ৪৫ লাখ পিস পোশাক রফতানির সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। সুযোগগুলো কাজে লাগেনি অশুল্ক (নন-ট্যারিফ) বাধার কারণে। এবার রফতানির ক্ষেত্রে শুল্ক দিতে হয়নি, আবার অশুল্ক বাধাও ছিল না। এ অভিজ্ঞতা থেকে রফতানিকারক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুল্ক বাধা দূর করার সঙ্গে অশুল্ক বাধাগুলোও দূর করা দরকার।
সুষম সম্পর্কের স্বার্থেই ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে। এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ১২ জুলাই তারিখের সম্পাদকীয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আনন্দবাজার লিখেছে, 'বাংলাদেশের জন্য শর্তহীনভাবে ভারতীয় বাজার খুলিয়া দিতে হইবে যাহাতে বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতকে স্বাভাবিক বাজার হিসাবে বিবেচনা করিতে পারেন। বাংলাদেশি পণ্যের উপর কোনও আমদানি শুল্ক আরোপ করা চলিবে না। বাংলাদেশের নিকট ইহার প্রতিদান চাহিবার প্রশ্নই নাই। তাহাতে ভারতের কোনও ক্ষতি নাই। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মোট রফতানির পরিমাণ ১৫০০ কোটি ডলার, আর ভারতের মোট আমদানির পরিমাণ ৩২,১০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের সমস্ত পণ্যও যদি ভারতীয় বাজারে পৌঁছায়, তাহারও প্রভাব ভারতীয় অর্থনীতির উপর নামমাত্র।'
ভারতের বাজারের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে তারা বাংলাদেশের জন্য যে ছাড় দিতে যাচ্ছে তাকে রক্ষণশীলতাতাড়িত সামান্য ছাড় বলতে হয়। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দু'দেশের অংশীদারিত্বের অনেক ইস্যু মনমোহন সিংয়ের সফরের পরও অমীমাংসিত থেকে যাবে। ২০১১ সালে দু'দেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ঘটনা হলো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশে তৈরি ১ কোটি পিস শুল্কমুক্ত পোশাক ভারতের বাজারে রফতানি করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ৩১ লাখ ও ৪৫ লাখ পিস পোশাক রফতানির সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। সুযোগগুলো কাজে লাগেনি অশুল্ক (নন-ট্যারিফ) বাধার কারণে। এবার রফতানির ক্ষেত্রে শুল্ক দিতে হয়নি, আবার অশুল্ক বাধাও ছিল না। এ অভিজ্ঞতা থেকে রফতানিকারক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুল্ক বাধা দূর করার সঙ্গে অশুল্ক বাধাগুলোও দূর করা দরকার।
ট্রানজিট
বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে
পণ্য পেঁৗছানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে ট্রানজিটের দাবি করে আসছে ভারত। এ দাবির
সঙ্গে জড়িত মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের প্রশ্নও। অতীতমুখী মানসিকতা
ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে অগ্রসর ভূমিকা নিয়েছে। বাংলাদেশ শুধু
ভারত-বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিটই নয়, ভুটান-নেপাল এমনকি চীন পর্যন্ত
ট্রানজিটের ব্যাপারে উৎসাহী। ড. সিংয়ের সফরে ট্রানজিট নিয়ে সম্মতিপত্র
স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের
সঙ্গে দরকষাকষির মূল ভিত্তি ট্রানজিট। ফলে প্রস্তুতি নিয়েই চূড়ান্ত চুক্তি
করতে হবে। অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এখনও সন্তোষজনক নয়। এমন পরিস্থিতিতে
ট্রানজিট থেকে মাশুলসহ অর্থনৈতিক লাভের বিষয়গুলো জনসমক্ষে তুলে ধরার ওপর
গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এতে উভয় দেশ অতীতে লাভবান হয়েছে। দিলি্লভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো সি. রাজা মোহন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখেছেন, মনমোহনের এই সফর শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের জন্যই একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং চীন পর্যন্ত এ সফরের প্রভাব পড়তে পারে। ট্রানজিট থেকে ভারত যেমন পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে, তেমনি বাংলাদেশেরও উপযুক্ত ট্রানজিট মাশুল পাওয়া উচিত। দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের বাইরে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত ট্রানজিট সুবিধা বিস্তৃত হওয়া উচিত।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এতে উভয় দেশ অতীতে লাভবান হয়েছে। দিলি্লভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো সি. রাজা মোহন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখেছেন, মনমোহনের এই সফর শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের জন্যই একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং চীন পর্যন্ত এ সফরের প্রভাব পড়তে পারে। ট্রানজিট থেকে ভারত যেমন পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে, তেমনি বাংলাদেশেরও উপযুক্ত ট্রানজিট মাশুল পাওয়া উচিত। দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের বাইরে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত ট্রানজিট সুবিধা বিস্তৃত হওয়া উচিত।
সমুদ্রসীমা
বাংলাদেশ ও ভারতের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর অন্যতম সমুদ্রসীমা।
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও
মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশ। দুঃখজনক হলেও সত্য,
দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনার পথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পথ সুগম হয়নি। সরকার
তাৎক্ষণিকভাবে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন ফর ল' অব
সি (ইউএনসিএলওএস) অনুসারে হেগভিত্তিক পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশনের
দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেকেই মনে করেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত
সঠিক ছিল। সালিশ আদালতে বাংলাদেশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও মিয়ানমারও
তাদের দাবি জানিয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, গভীর সমুদ্রের প্রায় পুরো এলাকাই
নিজেদের বলে দাবি করেছে দেশ দুটি। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বাংলাদেশ এখন
সমুদ্রের ন্যায্য অংশ পাবে বলে আশা করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে
দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যাটির সমাধান কেন বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর মধ্যে সম্ভব হলো
না এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রতিবেশী অনেক দেশই সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে
পরস্পরের মধ্যে চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ-ভারতের ক্ষেত্রে তা হবে না কেন, এ
প্রশ্ন সবার। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ ছাড়াও দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা,
হাড়িভাঙা নদীপ্রবাহের দাবি অমীমাংসিত সমস্যার তালিকা দীর্ঘদিন ধরেই ভারী
করে রেখেছে।
ছিটমহল ও সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ
ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশে, আর
বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল আছে ভারতে। সীমান্ত নির্ধারণের জটিলতায় দেশভাগের
সময় থেকেই এসব ছেঁড়া ভূখণ্ড তৈরি হয়েছে। 'না ঘরকা না ঘাটকা' অবস্থানে
ছিটমহলবাসী একরকম বন্দি জীবন-যাপন করেন। তিন বিঘা করিডোরের মানুষের যাতায়াত
সমস্যা বহুল আলোচিত। একটি ওভারব্রিজ নির্মাণ করে এ ছিটমহলে বাংলাদেশিদের
যাতায়াত সুগম করার ব্যবস্থা এবার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে
করেন, কিছু ছিটমহলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও
বেশ কয়েকটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক যোগাযোগের আওতায় আসবে না। ফলে ছিটমহল
বিনিময়ই যথার্থ সমাধান দিতে পারে। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্বাক্ষরিত
মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের কথা থাকলেও তা সীমিত আকারে
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাস্তবায়িত হয়েছে। ভারত পার্লামেন্টে ইন্দিরা-মুজিব
চুক্তি রেটিফাই করেনি বলে তাদের দিক থেকে চুক্তি বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
এবার আশা করা হচ্ছে, দু'দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি
চূড়ান্ত হবে। ছিটমহলবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। বাংলাদেশে ভারতের ছিটমহল আছে ১৭ হাজার ১৫৮ একর আর
বাংলাদেশের ভারতে ছিটমহলের মোট আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর। ইতিমধ্যে ভারতের
বিজেপি, আসামের উলফাসহ বিভিন্ন কট্টর রাজনৈতিক দল ভূমি বিনিময়ের বিরোধিতা
করেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ টিম ইতিমধ্যে ৪০৯০ কিলোমিটার অপদখলীয় ভূমি সমস্যা সমাধান ও অনির্ধারিত সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ টিম ইতিমধ্যে ৪০৯০ কিলোমিটার অপদখলীয় ভূমি সমস্যা সমাধান ও অনির্ধারিত সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে।
সন্ত্রাসবাদ-বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অপরাধ
২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিলি্ল সফরের সময় যৌথ ইশতেহারে সব ধরনের
সন্ত্রাসবাদী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অপরাধীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যৌথ অঙ্গীকার
ব্যক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ এ অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অতিদ্রুত সক্রিয়
হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের খুঁজে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দিলি্ল-ঢাকা
সম্পর্কের ব্যারোমিটার ইতিহাসে বহুবার ওঠানামা করেছে এ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের
কেন্দ্র করে। এবার ঢাকার অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা দিলি্লকে আশ্বস্ত করতে
পেরেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বাংলাদেশের দিক থেকে ভারতে লুকিয়ে থাকা
অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের হস্তান্তরের দাবি আছে। ভারতে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর
সাজাপ্রাপ্ত দুই খুনিকে ফেরত চায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সন্ত্রাসী ও
অপরাধীরা সীমান্ত পেরিয়ে যাতে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য ভারতের
মনোযোগও বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে মানব পাচার,
মাদক পাচার বন্ধের বিষয়গুলোও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করছে। ভারতের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরমের সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে সন্ত্রাসী,
অপরাধী ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত প্রদানের আশ্বাস পাওয়া গেছে। আশা করা
হচ্ছে, পারস্পরিক স্বার্থেই দু'দেশ সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধীদের বিষয়ে সজাগ
থাকবে।
সীমান্তে রক্তপাত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দীর্ঘদিনের সমস্যা ভারতীয়
সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বেসামরিক ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি। অতীতে এ
সমস্যার কারণে বহুবার দু'দেশের মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে।
বিএসএফ, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধের আশ্বাস দিলেও
পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। প্রাণঘাতী নয়, এমন রাবার বুলেট ব্যবহারের
প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। তাতেও হত্যাকাণ্ড কমেনি। অবশ্য ভারতের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরমের বাংলাদেশ সফরের পর সীমান্তে হত্যাকাণ্ড
কমে এসেছে। সাধারণত গ্রামবাসী, কৃষক, রাখালরা অসাবধানতাবশত সীমান্ত অতিক্রম
করে গুলির মুখে পড়ে। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও গুলির শিকার হন।
আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে অসাবধানতাবশত সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য দায়ী
ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর হাতে সোপর্দও করা যায়। তা না করে গুলি করাকে সমাধান হিসেবে মানতে
নারাজ বাংলাদেশের মানুষ। সমস্যা সমাধানের জন্য প্রাণহানির বিকল্প কোনো পথ
বের হলে দু'দেশের জন্য তা স্বস্তির কারণ হবে।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিনিময়
স্মরণাতীত কাল থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একই
ইতিহাসের অংশীদার। ঐতিহাসিক কারণেই দু'দেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক,
বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক বিনিময় চালু আছে। স্বাভাবিক এই যোগাযোগ কখনও কখনও
রাষ্ট্রীয় গণ্ডিকেও অতিক্রম করতে চায়। ভারত ও বাংলাদেশে এমন বহু ভাঙা
পরিবার আছে যাদের এক অংশ থাকে বাংলাদেশে আরেক অংশ পশ্চিমবঙ্গে। এ
পরিবারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। এছাড়া
শিক্ষাগত প্রয়োজন, ব্যবসা, পর্যটন, চিকিৎসাসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা
কারণে দু'দেশে মানুষের যাতায়াত আছে। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সাফল্য অনেকটাই
নির্ভর করে এ যোগাযোগের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভারতে ভিসা পাওয়ার
ক্ষেত্রে নানা জটিলতা আছে। অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা
পদ্ধতি সম্মানজনক নয়। সম্প্রতি অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা হয়েছে কিন্তু
তাতে ভিসা ভোগান্তি কমেনি। বাংলাদেশিরা এ ক্ষেত্রে সম্মানজনক ও সহজ একটি
ব্যবস্থা আশা করে।
সড়ক ও রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা আছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাস যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। দু'দেশের মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়েছে। শ্লথগতির কারণে মৈত্রী এক্সপ্রেস যাত্রী আকৃষ্ট করতে পারছে না। অথচ ট্রেনকে জনপ্রিয় করতে পারলে দু'দেশের যোগাযোগ সহজ ও সুলভ হতে পারত। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে ট্রেনের মধ্যেই কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হোক। তাতে ভোগান্তি কমবে, সময়ও বাঁচবে।
দু'দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা আছে। বিশেষত বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারতে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে বাধা আছে তা অপসারণ করার দাবি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। দু'দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি করে বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করেন। ভারতীয় কেবল অপারেটর ও ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের চুক্তি করতে হবে। কিন্তু এমন যোগাযোগ শিগগিরই হয়ে উঠছে না। আছে বই আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রেও জটিলতা। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ভাষা এক হলেও বই বা পত্রিকা বিনিময় এত বছরেও একপক্ষীয় রয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রকাশকদের দাবি এ দেশের পর্যাপ্ত বই ভারতে রফতানির ব্যবস্থা হোক। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের প্রক্রিয়া ইতিবাচক গতি পাক, এটাই এদেশের সচেতন নাগরিকদের আশা।
সড়ক ও রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা আছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাস যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। দু'দেশের মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়েছে। শ্লথগতির কারণে মৈত্রী এক্সপ্রেস যাত্রী আকৃষ্ট করতে পারছে না। অথচ ট্রেনকে জনপ্রিয় করতে পারলে দু'দেশের যোগাযোগ সহজ ও সুলভ হতে পারত। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে ট্রেনের মধ্যেই কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হোক। তাতে ভোগান্তি কমবে, সময়ও বাঁচবে।
দু'দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা আছে। বিশেষত বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারতে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে বাধা আছে তা অপসারণ করার দাবি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। দু'দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি করে বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করেন। ভারতীয় কেবল অপারেটর ও ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের চুক্তি করতে হবে। কিন্তু এমন যোগাযোগ শিগগিরই হয়ে উঠছে না। আছে বই আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রেও জটিলতা। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ভাষা এক হলেও বই বা পত্রিকা বিনিময় এত বছরেও একপক্ষীয় রয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রকাশকদের দাবি এ দেশের পর্যাপ্ত বই ভারতে রফতানির ব্যবস্থা হোক। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের প্রক্রিয়া ইতিবাচক গতি পাক, এটাই এদেশের সচেতন নাগরিকদের আশা।
Wednesday, August 24, 2011
অতি অল্প হইল
আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন নিয়ে একটি লেখা পড়ছিলাম। তাতে পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন নিয়ে ভারতের ওই রাজ্যটির সরকারের উদ্যোগ নিয়ে বেশ সমালোচনা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে মূলত 'পরিবর্তনে'র স্লোগান দিয়ে। বামফ্রন্টের দীর্ঘদিনের শাসনের পরিবর্তন শুধু নয়, তিনি জানিয়েছিলেন ক্ষমতায় গেলে রাজ্যটির অনেক কিছুই পাল্টে দেবেন। সিংহাসনে আসীন হয়ে তিনি অনেক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেগুলো পশ্চিমবঙ্গে ইতিবাচক হিসেবেই গৃহীত হয়েছে। পরিবর্তনের তালিকায় ছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নামও। বহুদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গবাসীর দাবি ছিল তাদের রাজ্যটির নাম বদল হোক। পশ্চিমবঙ্গ একটি আপেক্ষিক নাম। বঙ্গের পশ্চিম অংশই পশ্চিমবঙ্গ। মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ থাকলে পূর্ববঙ্গও থাকতে হয়। কিন্তু পূর্ববঙ্গ আর নেই। সে স্থলে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব জ্বলজ্বল করছে। তাই পশ্চিমবঙ্গবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তাদের রাজ্যটির নাম পরিবর্তন হোক। বাংলা, বঙ্গ, বঙ্গভূমি, গৌড়বঙ্গ যাই হোক নামে একটা পরিবর্তন আসুক। পরিবর্তনের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে দাবি মাথায় নিয়েই রাজ্যের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ নিয়ে রাজ্যটির পত্রপত্রিকায় নানা জল্পনা-কল্পনাও চলেছে খুব। লেখক সাহিত্যিক রাজনীতিকরা সমানে তর্ক-বিতর্ক করেছেন রাজ্যের ভাবি নাম নিয়ে। তর্কে-বিতর্কে একটি পাহাড় জমেছিল। কিন্তু এতশত তর্ক শেষ পর্যন্ত যে ফল দিল তাকে বাংলা একটি বাগধারা মেনে বলা যায়, পর্বতের মূষিক প্রসব। সিদ্ধান্ত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের নাম পশ্চিমবঙ্গই থাকবে। কিন্তু ইংরেজিতে পশ্চিমবঙ্গকে একদিন যে ওয়েস্ট বেঙ্গল বলা হতো তা এবার রদ করা হয়েছে। ইংরেজিতেও পশ্চিমবঙ্গই লিখতে হবে। এতে লাভ কী হলো? পশ্চিমবঙ্গের বাইরে রাজ্যটির নাম ওয়েস্ট বেঙ্গল এবং শব্দটির শুরু ডাবলিউ বর্ণ দিয়ে বলে ভারতীয় নানা সভা-সেমিনারে এ রাজ্যের প্রতিনিধির নাম আসত বর্ণানুক্রমিকভাবে সবার শেষে। এখন সেটি পি বর্ণ দিয়ে শুরু হবে। রাজ্যের নাম অনেক এগিয়ে আসবে। পর্বতের মূষিক প্রসবের এই ঘটনার পর কড়া সমালোচনা শুরু হয়েছে। বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, অতি অল্প হইল। পরিবর্তন যদি করতেই হয় তবে বড় পরিবর্তনই প্রত্যাশিত ছিল। তা না করে এইটুকু করাটা গ্রহণযোগ্য হলো না। শুধু এই সমালোচনাই নয়। আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পাদকীয় লিখে এই নাম পরিবর্তনের সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, পশ্চিমবঙ্গের নাম এ রাজ্যের লোকে কী বলে সেটার চেয়ে বাইরের লোকে এ রাজ্যকে কী নামে চেনে সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে লোকে ওয়েস্ট বেঙ্গল বলত, সেটাই চেনা নাম, সেটি পরিবর্তন শ্রেয় হয়নি। যাই হোক, এই অতি অল্প পরিবর্তনে নাখোশ মানুষরা সমালোচনা করলেও এখনও আন্দোলনে নামেননি। বরং পত্রপত্রিকাতেই স্থিত আছেন। তবে এ ঘটনাটি পরিবর্তনের পরিমাণ নিয়ে একটা সন্দেহ তৈরি করেছে। পরিবর্তন আসলে কতটা সম্ভব? মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও চেইঞ্জ বা পরিবর্তনের ধুয়া তুলেছিলেন। তার করা পরিবর্তন নিয়ে সন্তুষ্ট নয় মার্কিনিরা। তারাও বলছে, অতি অল্প হইল। বিশ্বে তবে কি পরিবর্তন শব্দটাও এবার গুরুত্ব হারাবে? পরিবর্তনের কথা বলে ক্ষমতা আরোহণ ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে? লোকে পরিবর্তনের কথায় আর ভুলবে না? পরিবর্তন এক লোভনীয় শব্দ যে যার মতো করে পরিবর্তন চায়। বিদ্যমান অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। কেউ যদি মুক্তির স্বাদ দিতে চায় তবে স্বাভাবিক লোভ হয়। কিন্তু রাজনীতির নিজস্ব বাস্তবতা পরিবর্তনের পথে রাশ টেনে ধরে। পশ্চিমবঙ্গের নামে যে তেমন পরিবর্তন এলো না তাতে কত পিছুটান কাজ করেছে কে জানে?
Monday, August 22, 2011
ছুটি
ছুটি পেলে লোকে কোথায় যায়, এ প্রশ্নের সঙ্গে নাগরিকতার প্রশ্ন যেমন জড়িত, তেমনি জড়িত জীবনাচারের প্রশ্নও। বিদেশে, বিশেষত পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ছুটি পেলে লোকে বেড়াতে যায়, আর দেশে ছুটি পেলে লোকে বাড়িতে যায়। বছরের বিশেষ দীর্ঘ ছুটির প্রসঙ্গ পরে। জানা যায়, 'উইকএন্ড' বলে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বিদেশিরা পালন করে তাতেও এক ধরনের মহাসমারোহ থাকে। আমাদের 'ছুটির দিনে'র সঙ্গে উইকএন্ডের পার্থক্য শুধু ভাষাতেই নয়। উইকএন্ড আসার আগেই প্রস্তুতি শুরু হয়। উইকএন্ড এলে গাড়ি নিয়ে সপরিবারে দূরের পথে বেরিয়ে পড়া বা কোনো জম্পেশ পার্টিতে মজা করার আয়োজন থাকেই। এমন উইকএন্ড পাশ্চাত্যের মধ্যবিত্ত জীবনে দুর্লক্ষ্য যেদিন তারা বাঁধভাঙা উৎসবে যোগ দেয় না। হৈ-হুল্লোড়ে উইকএন্ড কাটিয়ে উইকডেইজগুলোতে আবার কাজে ডুবে যাওয়ার চমৎকার এক রীতি পালন করে তারা। কিন্তু আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ছুটির দিন একেবারেই আলাদা। ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে বোকাবাক্সের সামনে বসে কোথা দিয়ে ছুটির দিন চলে যায় অনেক পরিবারই সে খবর রাখে না। তবে কি বাঙালি স্বভাবে ঘরকুনো? বোধহয় তা না, ছুটির দিনে বাইরে যেতে হলে যে সচ্ছলতা দরকার অনেক পরিবারে তা নেই। আগে লোকে বায়ু পরিবর্তনের জন্য সমুদ্রতীরে যেত এমন উদাহরণ সাহিত্যে পাওয়া যায়। কিন্তু বায়ু পরিবর্তনের মধ্যে একধরনের বাধ্যবাধকতা থাকত। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্যই ডাক্তাররা সাধারণত বায়ু পরিবর্তনের দাওয়াই দিতেন। রোগীর সঙ্গে আত্মীয়রাও তাতে বেড়ানোর সুযোগ পেতেন। কলকাতার পত্রপত্রিকাগুলো দেখলে বোঝা যায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তেমন বাইরে বের না হলেও পূজার লম্বা ছুটিতে তারা দূরে বেড়াতে যাওয়ার একটা অভ্যাস ইতিমধ্যে রপ্ত করেছেন। কোথায় কীভাবে যাওয়া যায় এ নিয়ে পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে সেখানে। কিন্তু ঢাকায় এখনও অনেকের কাছে ছুটি মানে বেড়াতে যাওয়া নয়, বাড়িতে যাওয়া। ঈদের ছুটিতে এখন অনেকে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি বেড়াতে যায়। শোনা যায়, ঈদে নাকি সেখানকার হোটেল-মোটেলে জায়গা পাওয়াই ভার। কিন্তু খুব অল্প লোকের কাছেই ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার গুরুত্ব আছে। শহরবাসীর অধিকাংশই বরং গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্যই উদগ্রীব। কোটি মানুষের শহর আছে আমাদের সত্য, কিন্তু সাকুল্যে লাখো মানুষের ফেরার ব্যবস্থা নেই। তাই যেদিন আগাম টিকিট বিক্রি করার কথা সেদিন টিকিট হাওয়া। মানুষের প্রয়োজন টিকিটের চেয়ে বহুগুণ। টিকিট কালোবাজারে গেল না সাদাবাজারে গেল তা দেখার অবকাশ নেই। টিকিট চাই, বাড়ি যেতে হবে। অনেকে যেতে পারেন, অনেকেই পারেন না। যারা যেতে পারেন না, তারা স্বেচ্ছায় থেকে যাওয়ার দলে নন; যেতে না পারার দলে। তাই ঈদের আনন্দ তাদের মনে বিষাদ ও বেদনার সুর জাগায়। এমন বিষাদ কতজনের মনে কাজ করে সে হিসাব কে করবে? কিন্তু ঈদের সময় অনেকেই শহরে থাকেন। বাড়ি না যাওয়া এসব মানুষ যানজটমুক্ত শহরে দিগ্গি্বদিক ঘুরতে থাকেন। তাদের বিনোদনের সামান্য কিছু ব্যবস্থা থাকে বাইরে। বাকিটা ঘরের ভেতরে টেলিভিশনের সামনে। সত্যি কথা বলতে, ছুটি কাটাতেও বোধহয় জানি না আমরা। সামার ভ্যাকেশন বলে একটা ব্যাপার আছে পাশ্চাত্যে। গ্রীষ্মের ছুটি। এ সময় স্কুল বন্ধ, অনেকের অফিসও। সপরিবারে কাছে বা দূরে সাগরে-বনে-পাহাড়ে চলে যায় সেখানকার মানুষ। সামার ভ্যাকেশনের আগে পত্রপত্রিকায় ছাপা হতে থাকে এবার ছুটিতে কোন বইগুলো পড়লে ভালো লাগবে। বিক্রি বেড়ে যায় বইয়ের। ঘর থেকে বেরিয়ে লোকে বই পড়ে। আড্ডায়, হুল্লোড়ে জীবন উপভোগ করে। লম্বা ছুটিকে কাজে লাগায়। আমাদের কর্মক্ষেত্রগুলোতে ছুটি কম নয়। কিন্তু সব ছুটিই ছন্নছাড়া। কোনো ছুটি তিনদিনের কোনোটি একদিনের। ছুটি ছড়ানো বছরভর। সে ছুটিতে কিছু করার চিন্তা করাই মুশকিল। আবার যখন স্কুলগামী বাচ্চাদের ছুটি তখন অফিসগামী বাবার কাজের চাপ। ফলে সপরিবারে কোথাও দীর্ঘ সময়ের জন্য বেড়াতে যাওয়ার প্রসঙ্গই ওঠে না। আমাদের ছড়ানো-ছিটানো ছুটিগুলো যদি একসূত্রে বেঁধে দেওয়া হতো তবে হয়তো কিছু পরিকল্পনা করা যেত। কিন্তু তেমন ছুটি আমাদের দেশে হবে না। কারণ আমরা কাজপাগল জাতি! রাজ্যের যত কাজ শুধু আমরাই করি। পাশ্চাত্যের লোকেরা কাজ করে না, তারা শুধু বসে বসে লম্বা ছুটি কাটায়!
Monday, August 8, 2011
ছোট দলের ছোট ছোট সুখ
কথা হচ্ছিল ছোট রাজনৈতিক দলের এক নেতার সঙ্গে। এক না বলে একমাত্র বলাই ভালো। তার দলের নাম শুনি, বড় একটা জোটে দলের অংশগ্রহণের খবরও পাই পত্রিকায়। কিন্তু ওই নেতা ভিন্ন আর কারও দেখা পাই না। ফলে দল বলতে তার কথাই মনে হয়। তার বাইরে দল কতটা আছে সন্দেহ হয়। ছোট দলের সেই নেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার দল আসলে কোথায়? দল কী করে? নেতা জানালেন, দল নিশ্চয়ই আছে। সবচেয়ে বড় কথা পূর্ণাঙ্গ কমিটিও আছে। কিন্তু কমিটির সদস্যরা নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে ছোট ছোট দলের ছোট জোটে বা বড় ও ছোট দলের বড় জোটে তাকেই প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। তাই তার নামটাই লোকে জানে, তাকেই চেনে। কিন্তু জেনে রাখার মতো খবর হলো, একটা পূর্ণাঙ্গ কমিটি তাদের আছে। জোটগতভাবে কর্মসূচিও থাকে। কমিটির সদস্যরা কম হোক বেশি হোক কর্মসূচিতে অংশও নেন। আর নেতা বড় বড় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দেশের নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। নেতার সঙ্গে আলাপ করে বুঝে ওঠা কঠিন ছোট দলের কাজ আসলে কী? তবে মোটামুটি বোঝা যায়_ ছোট দলের একটা বড় কাজ হলো রাজনৈতিক জোটে দলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। জোট গঠন করতে গেলেই বোঝা যায়, ১৪-১৬ কোটি মানুষের দেশে দল কত কম। এত লোক অথচ ক্ষমতাসীন জোটগুলো মাত্র ১৪ বা ৪ দল নিয়ে গঠিত হয়। অথচ সংখ্যানুপাতিক হারে জোটে দলের সংখ্যা আরও বেশি হওয়া উচিত। আশার কথা, দেশের বড় দুটি দল এখন জোট বৃদ্ধি করার কাজে মন দিয়েছে। ভোট নেই, আন্দোলন নেই তবু সংখ্যাবৃৃদ্ধি কেন_ এ প্রশ্নের জবাব মিলছে না। কিন্তু ছোট দলগুলো বেশ শান্তিতে আছে। যেসব ছোট দলের নেতারা বড় তারা একটু এগিয়ে চরম শান্তিতে আছেন। মিডিয়া তাদের কভারেজ দিচ্ছে। তারা দেশ ও দশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছেন। সরকারের আয়ুষ্কাল নিয়ে জ্যোতিষচর্চা করছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা_ বিশেষ করে লিয়াজোঁ বিশারদরা ছোট দলের নেতাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। ছোট দলের নেতারা বাগে পেয়ে তাদের গামছা পরাচ্ছেন। টুপি-পাগড়িও পরাবেন বোঝা যাচ্ছে। সাধারণত, ছোট দলের নেতারা বড় দলের নেতাদের কাছে ফুল ও দলবল নিয়ে যায়। ফুল দিয়ে দলে যোগ দেয়। নরমালি যে যোগ দিল তাকেই ফুল দিয়ে বরণ করার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে। যিনি যোগ দেবেন তিনি ফুল নিয়ে যান। এবার আরও ব্যতিক্রম ঘটছে। যিনি অতিথি তারই উপহার নিয়ে বাসায় যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে, উল্টো গামছা-টুপি-পাগড়ি নিয়ে ফিরছেন তারা। এইসব আলাপ-আলোচনা, বৈঠক-ফিরতি বৈঠকের তালিকায় এখন স্থান পেয়েছে ইফতার সারপ্রাইজ। সবচেয়ে বড় ইফতার সারপ্রাইজ হতে পারত যদি বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর অথবা প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার ইফতারে উপস্থিত হতেন। বাস্তবে তা ঘটছে না, বরং ছোট দলের নেতারা ইফতারে উপস্থিত হয়ে চমক দিচ্ছেন। অবশ্য চমকেই শেষ হচ্ছে ব্যাপারগুলো। এখন পর্যন্ত কোনো ছোট দলই কোনো জোটের দিকে হেলেনি। পাকা কথা দেয়নি। বোঝা যায়, অনেক দিন পাদপ্রদীপের বাইরে থাকার পর এখন তারা ধীরে এগুনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফয়সালা হয়ে গেলে আলো সরে যাবে। তাই ছোট ছোট সুখগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন তারা। ছোট দলগুলোর ছোট সুখগুলো দীর্ঘজীবী হোক। কিন্তু বড় দলগুলোর ছোট-প্রীতি সহসা কেন উথলে উঠল সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কিছুতেই মিলছে না। বড়র মন বোঝা বড় ভার।
Saturday, August 6, 2011
শিশুটির জ্বর এখন কত?

অ্যানসেল অ্যাডাম নামের একজন ফটোগ্রাফার ও পরিবেশবাদী বলেছেন, 'ছবি শুধু চোখ বোলানোর জন্য, খুব কম ছবিই দেখা হয়।' কথাটা সত্যি। আমাদের ইন্দ্রিয় এখন অনেকটাই দৃশ্য ও শ্রুতিনির্ভর_ অডিওভিজ্যুয়াল। প্রতিদিন টিভি, সংবাদপত্র, ইন্টারনেটে অসংখ্য ছবিতে চোখ বোলাতে হয় আমাদের। সংবাদপত্র পাঠ্য হলেও এখন এর অধিকাংশ সংবাদ এমনকি অভিমতগুলোও সচিত্র হয়ে উঠেছে। আর টেলিভিশন তো রীতিমতো অডিও ভিজ্যুয়ালের রাজা। ইন্টারনেটেও কখনও অডিও কখনও ভিজ্যুয়াল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেখা ও শোনার বাইরে_ স্পর্শ, স্বাদ, গন্ধের কারবার ক্রমশ কমে আসছে। ফলে কান ও চোখই শরীরের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের সংযোগ মাধ্যম_ মিডিয়া। অত্যধিক ব্যবহারের ফলে এ দুটি মিডিয়া ভোঁতা হয়ে গেছে কি-না এ সন্দেহ হয়। চোখে পড়ার মতো অনেক দৃশ্য যখন চোখে পড়তে চায় না, চমকে দেওয়ার মতো কোনো শব্দ যখন শুনেও শুনি না, তখন সন্দেহটা গাঢ় হয়। ফুটপাতে শুয়ে থাকা শিশুদের আমরা অনেক দেখি। বাস থেকে, পথ চলতে_ উদ্বাস্তু পরিবার চোখে পড়ে না এমন ঢাকায় ঘটে না। দেখি কিন্তু দেখি না। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি ছবি দেখে শুধু চোখ বুলিয়ে চলে যাওয়া হলো না। দৃষ্টিকে থামাতে হলো। রাজধানীর গাবতলী থেকে রাশেদ সুমন ছবিটি তুলেছেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় বেশ বড় স্থান পেয়েছে। একটি শিশু রাস্তার পাশে শুয়ে আছে। শিশুটির খুব জ্বর। পাঁচ দিন ধরে। জ্বরে গা পুড়তে থাকা শিশুটি শুয়ে আছে একটা জীর্ণ বালিশে। গায়ের ওপর কয়েকটা নিমডাল। নিমপাতা ঢেকে রেখেছে তার দেহ। শিশুর মা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য বদল হয়নি। পানি বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয় তা থেকে কোনো রকমে দিনের খাবার জোটে। চিকিৎসার খরচ হয় না। বাচ্চার জ্বর হলে তাই নিমপাতাই সম্বল। চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নিমপাতার কাছে শুশ্রূষা আশা করেছেন নিরুপায় মা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিমপাতা কি পাঁচ দিন জ্বরে ভোগা শিশুটিকে শুশ্রূষা দিতে পারবে? ছবিটি সুন্দর। অনেক কথা বলে। কিন্তু ছবিটি দেখে আমরা কি বুঝতে পারব, শিশুটির জ্বর এখন কত? আমরা দেখি, আমরা পড়ি। আমরা শুনিও। একটি শিশু শুয়ে আছে ফুটপাতের নোংরা বিছানায়, এমন ঘটনা কি ঘটবে কখনও যে আমরা জানতে চাইব_ এই শিশুটির জ্বর কত? তার শরীরের তাপ অনুভব করার জন্য কখনও কি তার কপালে হাত রাখব
Subscribe to:
Posts (Atom)


