Monday, August 8, 2011

ছোট দলের ছোট ছোট সুখ


খালেদা জিয়াকে গামছা পরাচ্ছেন কাদের সিদ্দিকীর প্রতিনিধি
কথা হচ্ছিল ছোট রাজনৈতিক দলের এক নেতার সঙ্গে। এক না বলে একমাত্র বলাই ভালো। তার দলের নাম শুনি, বড় একটা জোটে দলের অংশগ্রহণের খবরও পাই পত্রিকায়। কিন্তু ওই নেতা ভিন্ন আর কারও দেখা পাই না। ফলে দল বলতে তার কথাই মনে হয়। তার বাইরে দল কতটা আছে সন্দেহ হয়। ছোট দলের সেই নেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার দল আসলে কোথায়? দল কী করে? নেতা জানালেন, দল নিশ্চয়ই আছে। সবচেয়ে বড় কথা পূর্ণাঙ্গ কমিটিও আছে। কিন্তু কমিটির সদস্যরা নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে ছোট ছোট দলের ছোট জোটে বা বড় ও ছোট দলের বড় জোটে তাকেই প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। তাই তার নামটাই লোকে জানে, তাকেই চেনে। কিন্তু জেনে রাখার মতো খবর হলো, একটা পূর্ণাঙ্গ কমিটি তাদের আছে। জোটগতভাবে কর্মসূচিও থাকে। কমিটির সদস্যরা কম হোক বেশি হোক কর্মসূচিতে অংশও নেন। আর নেতা বড় বড় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দেশের নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। নেতার সঙ্গে আলাপ করে বুঝে ওঠা কঠিন ছোট দলের কাজ আসলে কী? তবে মোটামুটি বোঝা যায়_ ছোট দলের একটা বড় কাজ হলো রাজনৈতিক জোটে দলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। জোট গঠন করতে গেলেই বোঝা যায়, ১৪-১৬ কোটি মানুষের দেশে দল কত কম। এত লোক অথচ ক্ষমতাসীন জোটগুলো মাত্র ১৪ বা ৪ দল নিয়ে গঠিত হয়। অথচ সংখ্যানুপাতিক হারে জোটে দলের সংখ্যা আরও বেশি হওয়া উচিত। আশার কথা, দেশের বড় দুটি দল এখন জোট বৃদ্ধি করার কাজে মন দিয়েছে। ভোট নেই, আন্দোলন নেই তবু সংখ্যাবৃৃদ্ধি কেন_ এ প্রশ্নের জবাব মিলছে না। কিন্তু ছোট দলগুলো বেশ শান্তিতে আছে। যেসব ছোট দলের নেতারা বড় তারা একটু এগিয়ে চরম শান্তিতে আছেন। মিডিয়া তাদের কভারেজ দিচ্ছে। তারা দেশ ও দশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছেন। সরকারের আয়ুষ্কাল নিয়ে জ্যোতিষচর্চা করছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা_ বিশেষ করে লিয়াজোঁ বিশারদরা ছোট দলের নেতাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। ছোট দলের নেতারা বাগে পেয়ে তাদের গামছা পরাচ্ছেন। টুপি-পাগড়িও পরাবেন বোঝা যাচ্ছে। সাধারণত, ছোট দলের নেতারা বড় দলের নেতাদের কাছে ফুল ও দলবল নিয়ে যায়। ফুল দিয়ে দলে যোগ দেয়। নরমালি যে যোগ দিল তাকেই ফুল দিয়ে বরণ করার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে। যিনি যোগ দেবেন তিনি ফুল নিয়ে যান। এবার আরও ব্যতিক্রম ঘটছে। যিনি অতিথি তারই উপহার নিয়ে বাসায় যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে, উল্টো গামছা-টুপি-পাগড়ি নিয়ে ফিরছেন তারা। এইসব আলাপ-আলোচনা, বৈঠক-ফিরতি বৈঠকের তালিকায় এখন স্থান পেয়েছে ইফতার সারপ্রাইজ। সবচেয়ে বড় ইফতার সারপ্রাইজ হতে পারত যদি বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর অথবা প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার ইফতারে উপস্থিত হতেন। বাস্তবে তা ঘটছে না, বরং ছোট দলের নেতারা ইফতারে উপস্থিত হয়ে চমক দিচ্ছেন। অবশ্য চমকেই শেষ হচ্ছে ব্যাপারগুলো। এখন পর্যন্ত কোনো ছোট দলই কোনো জোটের দিকে হেলেনি। পাকা কথা দেয়নি। বোঝা যায়, অনেক দিন পাদপ্রদীপের বাইরে থাকার পর এখন তারা ধীরে এগুনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফয়সালা হয়ে গেলে আলো সরে যাবে। তাই ছোট ছোট সুখগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন তারা। ছোট দলগুলোর ছোট সুখগুলো দীর্ঘজীবী হোক। কিন্তু বড় দলগুলোর ছোট-প্রীতি সহসা কেন উথলে উঠল সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কিছুতেই মিলছে না। বড়র মন বোঝা বড় ভার।

Saturday, August 6, 2011

শিশুটির জ্বর এখন কত?


অ্যানসেল অ্যাডাম নামের একজন ফটোগ্রাফার ও পরিবেশবাদী বলেছেন, 'ছবি শুধু চোখ বোলানোর জন্য, খুব কম ছবিই দেখা হয়।' কথাটা সত্যি। আমাদের ইন্দ্রিয় এখন অনেকটাই দৃশ্য ও শ্রুতিনির্ভর_ অডিওভিজ্যুয়াল। প্রতিদিন টিভি, সংবাদপত্র, ইন্টারনেটে অসংখ্য ছবিতে চোখ বোলাতে হয় আমাদের। সংবাদপত্র পাঠ্য হলেও এখন এর অধিকাংশ সংবাদ এমনকি অভিমতগুলোও সচিত্র হয়ে উঠেছে। আর টেলিভিশন তো রীতিমতো অডিও ভিজ্যুয়ালের রাজা। ইন্টারনেটেও কখনও অডিও কখনও ভিজ্যুয়াল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেখা ও শোনার বাইরে_ স্পর্শ, স্বাদ, গন্ধের কারবার ক্রমশ কমে আসছে। ফলে কান ও চোখই শরীরের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের সংযোগ মাধ্যম_ মিডিয়া। অত্যধিক ব্যবহারের ফলে এ দুটি মিডিয়া ভোঁতা হয়ে গেছে কি-না এ সন্দেহ হয়। চোখে পড়ার মতো অনেক দৃশ্য যখন চোখে পড়তে চায় না, চমকে দেওয়ার মতো কোনো শব্দ যখন শুনেও শুনি না, তখন সন্দেহটা গাঢ় হয়। ফুটপাতে শুয়ে থাকা শিশুদের আমরা অনেক দেখি। বাস থেকে, পথ চলতে_ উদ্বাস্তু পরিবার চোখে পড়ে না এমন ঢাকায় ঘটে না। দেখি কিন্তু দেখি না। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি ছবি দেখে শুধু চোখ বুলিয়ে চলে যাওয়া হলো না। দৃষ্টিকে থামাতে হলো। রাজধানীর গাবতলী থেকে রাশেদ সুমন ছবিটি তুলেছেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় বেশ বড় স্থান পেয়েছে। একটি শিশু রাস্তার পাশে শুয়ে আছে। শিশুটির খুব জ্বর। পাঁচ দিন ধরে। জ্বরে গা পুড়তে থাকা শিশুটি শুয়ে আছে একটা জীর্ণ বালিশে। গায়ের ওপর কয়েকটা নিমডাল। নিমপাতা ঢেকে রেখেছে তার দেহ। শিশুর মা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য বদল হয়নি। পানি বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয় তা থেকে কোনো রকমে দিনের খাবার জোটে। চিকিৎসার খরচ হয় না। বাচ্চার জ্বর হলে তাই নিমপাতাই সম্বল। চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নিমপাতার কাছে শুশ্রূষা আশা করেছেন নিরুপায় মা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিমপাতা কি পাঁচ দিন জ্বরে ভোগা শিশুটিকে শুশ্রূষা দিতে পারবে? ছবিটি সুন্দর। অনেক কথা বলে। কিন্তু ছবিটি দেখে আমরা কি বুঝতে পারব, শিশুটির জ্বর এখন কত? আমরা দেখি, আমরা পড়ি। আমরা শুনিও। একটি শিশু শুয়ে আছে ফুটপাতের নোংরা বিছানায়, এমন ঘটনা কি ঘটবে কখনও যে আমরা জানতে চাইব_ এই শিশুটির জ্বর কত? তার শরীরের তাপ অনুভব করার জন্য কখনও কি তার কপালে হাত রাখব

Saturday, July 23, 2011

ভারতের সেরা রফতানি


ভারতের সেরা রফতানি পণ্য কী? অনেকেই অনেক পণ্যের কথা বলতে পারেন, কিন্তু 'টাইম' ম্যাগাজিনের একটি লেখায় কার্লা পাওয়ার বলছেন 'সিইও'। সুলিখিত ও সাবলীল এ রচনায় কার্লা যে পণ্যের কথা বলছেন তা মোটেও পণ্য নয়, বরং পণ্য বিক্রির কারিগর_ সিইও বা চিফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। বিশ্বজুড়ে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে ভারতীয় সিইওদের একচ্ছত্র দাপট এখন। এই সিইওদের দু'জন বঙ্গ ব্রাদার্স। বিন্দি বঙ্গ ছিলেন ইউনিলিভারের শীর্ষ কর্মকর্তা, পরে হয়েছেন ক্লেটন, ডাবিলিয়ার অ্যান্ড রাইসের অংশীদার। আর তার ছোট ভাই ছিলেন সিটি গ্রুপের এশীয় প্রধান, পরে হয়েছেন মাস্টারকার্ডের সিইও। এই বাঘা সিইওদ্বয়ের জন্ম এক মায়ের পেটে। টাইম ম্যাগাজিন প্রশ্ন করেছে, বঙ্গভ্রাতাদের মা তাদের কোন দোকানের চাল খাওয়াতেন যে, তারা কোনো পশ্চিমা ডিগ্রি ছাড়াই এমন অবস্থানে যেতে পারলেন? বঙ্গ ভাইরা বলেন, তাদের মা ছিলেন বাঙালি বাঘিনী। আর বাবা ছিলেন ভারতীয় আর্মিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল। বাবার বদলির চাকরিবলে নতুন জায়গায় নতুন বল্পুব্দ, নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বড় হয়েছেন তারা। শুধু বঙ্গ ভাইরাই নন, সিটি গ্রুপের বিক্রম পণ্ডিত, পেপসিকোর ইন্দ্র নুয়ি, মটোরোলার সঞ্জয় ঝাঁ, হাথাওয়ের অজিৎ জৈন, ইনসিডের ডিন দীপক জৈনসহ বহু নামই এখন বিশ্ববাজারে সমীহেরু সঙ্গে উচ্চারিত হয়। দিন দিন বিশ্ববাজারে ভারতীয়দের দাপট বাড়ছে। কিন্তু এর পেছনের কাহিনীটা কী? চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এমনকি আমেরিকায়ও প্রশ্নটা ওঠে অহরহ। ভারতীয়রা কেন এ কাজগুলো পাচ্ছে?
প্রথমত, এ এক্সিকিউটিভরা এমন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন যে, আজকের বিশ্ববাজারের জন্য তারা উপযুক্ত। দ্বিতীয়ত, ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা একজন এক্সিকিউটিভের জন্য বাইরের বাজার-সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে ওঠা সহজ। তৃতীয়ত, জটিল প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের পরিচিতি। চতৃর্থত, কম সম্পদের উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকবলে ভারতীয়রা এখানকার পরিস্থিতি বোঝেন। পঞ্চমত, বিশ্ববাজারের ভাষা ইংরেজিতে কথা বলেন তারা। ষষ্ঠত, এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারের সঙ্গে ভারতীয়দের সুপরিচিতি। সপ্তমত, চীন ও ভারত মাল্টিন্যাশনালদের কাছে মুনাফার অভয়ারণ্য। ফলে, আগামী দিনের গ্গ্নোবাল লিডাররা তাদের মধ্য থেকে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক।
ভারতীয়দের আরও নানা গুণের কথা কার্লাকে বলেছেন জিল অ্যাডের নামে এক সিইও। যেমন ভারতীয়রা এশিয়ায় সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তারা ইংরেজিতে চিন্তা করে। নিজ দেশের বহুজাতীয় সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। মানিয়ে নিতে পারদর্শী এবং ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। মোগল থেকে ব্রিটিশ_ সব ঔপনিবেশিক শক্তির সংস্কৃতি আত্মস্থ করে ভারত এক মহাশক্তি হয়ে উঠেছে। ভারতীয়রা গুণী, কিন্তু ভারতীয় সিইওদের তৈরি গুণকে সম্পদে পরিণত করছে কারা? সিগনে স্পেনসার নামে এক লেখক বলছেন, ভারতের লোকজন হার্ভার্ড বা এমআইটির চেয়ে তাদের আইআইটি বা আইআইএম বেশি পছন্দ করে। ছোটবেলা থেকেই ছাত্রদের মধ্যে শক্ত প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতা চলে এগুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য। আইআইটি হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। আর আইআইএম হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট। দেশের নানা জায়গায় ছড়ানো এ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। ছাতাধরা ভবনে ক্লাস হয়, চিপা রুমে ঘুমাতে হয়। তবু ছাত্ররা গ্গ্নোবাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে; বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াও তাদের চমৎকার। ৬০ বছর বয়সেও কোন ক্লাসে কে কত নম্বর পেয়েছিল তা তাদের মনে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, ভারত এই বিজনেস এক্সপার্টদের তৈরি করছে। কিন্তু তারা দেশের বদলে দেশের বাইরেই বেশি কাজ করতে পছন্দ করছেন। একজন চীনা এক্সিকিউটিভকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে কাজ করতে যাবেন কি-না। তখন পার্টির মারফত নিয়োগ পাওয়া এক্সিকিউটিভ প্রশ্ন করবেন, কেন যাব? কিন্তু ভারতীয়রা একপায়ে খাড়া। ভারতে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিতে বা একটি কারখানা তৈরি করতে একজন সিইওকে ৮০ জায়গায় পারমিশন নিতে হয়। সেখানে চীনে একটি কারখানা বসাতে দুই বা তিন জায়গায় অনুমতি নিলেই চলে। নতুন উদ্যোগের জন্য চীনারা লাল গালিচা পেতে দেয়, আর ভারতীয়রা উদ্যোগটাকে লালফিতায় আটকে ফেলে। দেশের এ পরিস্থিতি ভারতীয় এক্সিকিউটিভদের বিদেশমুখী করছে। বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠছে ভারতীয় সিইওদের স্বর্গরাজ্য।

Friday, July 22, 2011

মিডিয়া মোগল


প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় ভাষার কিছু শব্দ ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যেমন পণ্ডিত। বিদ্বান ব্যক্তিকে পণ্ডিত বলে আখ্যায়িত করার রেওয়াজ আছে। তেমনি মোগল আরেক ভারতীয় শব্দ। মিডিয়া মোগল কথাটা বেশ পরিচিত। মিডিয়া সম্রাট অর্থে মিডিয়া মোগল কথাটার ব্যবহার। সম্রাট শব্দটা আমাদের মিডিয়ায়ও আকসার ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তি নাম হিসেবেও সম্রাট জনপ্রিয়। কিন্তু মোগল বলে সাধারণত কাউকে আখ্যায়িত করা হয়। এখানে মোগল বলতে মোগল সম্রাটদেরই বোঝানো হয়। একটা প্রবাদ অবশ্য ব্যতিক্রম_ 'পড়েছি মোগলের হাতে_ খানা খেতে হবে সাথে।' এই প্রবাদে সাধারণ অথচ খাদ্যরসিক ব্যক্তিকে মোগল বলতে দেখা যায়। এর বাইরে সাধারণত কাউকে মোগল বলা হয় না। সম্প্রতি মিডিয়া মোগল কথাটা বেশ আলোচিত হচ্ছে একজন মোগলের সূত্রে। রুপার্ট মারডককে অবশ্য শুধু মোগল নয়_ ব্যারন, টাইকুন, বস নানা অভিধায় ডাকা হয়। রুপার্ট মারডক কেমন মোগল তা আমাদের সম্রাটের ধারণা থেকে বোঝা একটু কঠিন। তিনি যে কোম্পানিটির সিইও সেই নিউজ করপোরেশন বিশাল প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় কনগ্গ্নোমারেট। নানা ধরনের, নানা কাজের, নানা কিসিমের প্রতিষ্ঠানের যৌথ রূপ হলো কনগ্গ্নোমারেট। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশ করে, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল চালায়, টিভির জন্য অনুষ্ঠান বানায়, সিনেমা প্রযোজন করে, অ্যালবাম প্রকাশ করে, স্টুডিও পরিচালনা করে, ইন্টারনেটভিত্তিক বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেয়। মোটকথা, মিডিয়া বলতে যা বোঝায় তার সব শাখাতেই এর বিস্তার। সহজভাবে বললে, এক নিউজ করপোরেশনের অধীনে কাজ করে শত শত প্রতিষ্ঠান। তারা একজোট হয়ে বিশ্বের মিডিয়া সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। রুপার্ট মারডক যে ধরনের ব্যবসায়ী তেমন ব্যবসা বুঝে ওঠাই আমাদের জন্য কঠিন। কেননা এমন ব্যবসার উদাহরণ আমাদের দেশে নেই। মিডিয়া ব্যবসায় করপোরেট উদ্যোগ এ দেশে আছে, কিন্তু কোনো শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী শুধু মিডিয়ায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছেন এমন উদাহরণ দেওয়া কষ্টকর হবে। ফলে রুপার্ট মারডক আমাদের দেশে খানিকটা ইতিহাসের মোগলদের মতোই। যার কর্মকাণ্ড আমরা আঁচ করতে পারি, কিন্তু পুরো বুঝে ওঠা কঠিন। শত শত পত্রিকা, টিভি চ্যানেলের কর্ণধার সম্প্রতি ব্রিটেনে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েডের কারণে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন। নানা প্রশ্নের মুখে রীতিমতো নাকাল হতে হয়েছে তাকে। অভিযোগটা সবার জানা। তার 'নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড' পত্রিকাটি রসাল ও কৌতূহলোদ্দীপক খবরের জন্য পুলিশের সাহায্যে বহু মানুষের ফোন হ্যাক করেছে। অর্থমন্ত্রী, রাজপরিবারের সদস্য, যুদ্ধে নিহত সৈন্য, হত্যার শিকার ব্যক্তি কেউই তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা থেকে বাদ পড়েনি। বহুদিন ধরে চলছিল এই অপকর্ম। পত্রিকাও রসাল আইটেম সমৃদ্ধ হয়ে বাজার মাত করছিল। কিন্তু সহসা ফাঁস হয়ে গেলে পুরনো কাসুন্দি সবার চোখের সামনেই ঘাঁটা হচ্ছে। পুরনো সাংবাদিক, পুলিশ অফিসার, রাজনীতিক থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বহু মানুষ প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড অপরাধ করেছে, অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নাম ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছে। কারা অপরাধী সে প্রশ্ন নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো_ এত বড় ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মধ্যে নৈতিকতার অবস্থান কোথায়? শুধু ব্যবসা এবং মুনাফার জন্য যেনতেন প্রকারে সংবাদ সংগ্রহের প্রবণতার মধ্যে দায়িত্ববোধের অবস্থান কোথায়? এ প্রশ্নগুলো আরও কিছু প্রশ্নকে উস্কে দিচ্ছে। সেগুলো হলো মুক্ত সংবাদপত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি প্রশ্নহীন বা পর্যবেক্ষণহীন থাকা উচিত? আরও একটি প্রশ্ন অবশ্য বাতাসে ঘুরছে। তা হলো, ট্যাবলয়েডের যুগ কি শেষ হয়ে এলো? নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে এ প্রশ্ন উঠছে যে, এমন সংবাদপত্রগুলো ভবিষ্যতে কি গ্রহণযোগ্যতা পাবে? লোকে রসাল খবর পছন্দ করে বটে, কিন্তু রসাল খবরের উৎস যদি বন্ধ হয় তবে পত্রিকা সেগুলো ছাপবে কীভাবে আর মানুষই-বা পড়বে কীভাবে?

Thursday, July 14, 2011

পশ্চিমবঙ্গ


ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদপত্রের খবরে জানা যাচ্ছে, সিঙ্গুরের জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে জঙ্গলমহলে শান্তি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত নানা উদ্যোগে সদা ব্যস্ত তিনি। এর মধ্যে বহুদিনের প্রত্যাশিত ও প্রতীক্ষিত নানা উদ্যোগও আছে। এগুলোর কোনোটা হয়তো জনদাবি, কোনোটা হয়তো প্রত্যাশা। কোনোটা হয়তো অনিবার্য, কোনোটা হয়তো ঐচ্ছিক। এমনই এক ঐচ্ছিক প্রসঙ্গ তালিকায় ছিল, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন হবে। তার ঘোষণার পর থেকে সরব হয়ে উঠছেন বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক মহল। পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন হলে পরিবর্তিত নাম কী হওয়া উচিত তা নিয়ে বেশ বিতর্ক জমে উঠেছে সেখানকার বাংলা পত্রিকাগুলোতে। অনেক রেফারেন্স আসছে। ইংরেজদের ক্যালকাটা নাম পরিবর্তন করে কলকাতা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কলকাতা প্রতিষ্ঠিত নাম। কলকাতা থেকে দূরের মাদ্রাজ চেন্নাই হয়েছে, বোম্বে হয়েছে মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর হয়েছে ব্যাঙ্গালুরু। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সেই পশ্চিমবঙ্গই রয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পশ্চিমবঙ্গের নাম কেন পরিবর্তন করতে হবে। যুক্তিটা পরিষ্কার। আগে পশ্চিমবঙ্গ ছিল, সেটা সবাই মেনেও নিয়েছিল। কারণ, পূর্ববঙ্গ বলে একটা জায়গার অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু পূর্ববঙ্গ অনেক আগেই বাংলাদেশ হয়ে গেছে। পুরনো সাহিত্যে ছাড়া পূর্ববঙ্গের অস্তিত্ব আজ আর নেই। ফলে পশ্চিমবঙ্গ একা আর বঙ্গের পশ্চিম দিক নির্দেশ করে যাবে কেন? তাই নাম পাল্টানোর দাবি ও আলোচনা বেশ হাওয়া পেয়েছে। মানতেই হবে, বাংলাদেশ নামটা অপূর্ব। ১৯৭১ সালেই যে বাংলাদেশ নামটা তৈরি হয়েছে তা নয়। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় আমরা বাংলাদেশ বা বাংলা দেশ পাই। বাঙালির পুরো বসতিকেই তখন লেখকরা বাংলাদেশ বলতেন। মনীষীদের বলা সেই নামই আমরা আমাদের দেশকে দিয়েছি, রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সে নামকে প্রতিষ্ঠাও করেছি। চাইলেও পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ নামটি নিতে পারবে না। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নাম হোক বাংলা। এক দশক আগেও এমন দাবি উঠেছিল। তখন কর্তাব্যক্তিরা দাবিটিকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কারণ, নীতি অনুসারে ভারতের কোনো রাজ্যের নাম ভাষা অনুসারে হতে পারে না। বাঙালি ছাড়াও অন্য ভাষার লোক সে রাজ্যে বাস করে। ফলে বাংলা নামটি আপাতত হচ্ছে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। কেউ বলছেন, তবে নাম দেওয়া হোক বঙ্গ। অথবা বঙ্গদেশ বা বঙ্গপ্রদেশ। প্রদেশের কথায় কেউ কেউ ফোঁড়ন কাটছেন। বলছেন, নামের কি আকালটাই না পড়েছিল ভারতে। নাম নেই তাই রাজ্যের নাম দেওয়া হয়েছে উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ। প্রদেশজুড়ে রাজ্যের নাম দেওয়ার চাইতে বরং শুধু বঙ্গ নামটাই ভালো। কেউ কেউ বঙ্গ শব্দটার সঙ্গে ভারত জুড়ে দিয়ে বঙ্গ-ভারত নাম নেওয়ার পক্ষে বলছেন। তাতে ভারতের সঙ্গে নামটা জুড়ে থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা অবশ্য বলছেন, নাম হোক বঙ্গভূমি। নানা মুনির নানা নাম নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, আলাপ-আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে অবশ্য সে আলোচনার ঢেউ সামান্যই পেঁৗছাচ্ছে। কারণ, নাম নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আমাদের অনেক নিকটবর্তী হলেও রাজনৈতিকভাবে অনেক দূরে। ফলে সেখানকার মাঠে-ময়দানে কী হচ্ছে সেটা এখানে বসে জানা কঠিন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নাম পরিবর্তনের কারণ আমরাই। পূর্ববঙ্গ নেই বলে পশ্চিমবঙ্গ নাম পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। একথা ঠিক যে, পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা তাদের রাজ্যের নাম কী দেবে সে নিয়ে আমাদের মতের গুরুত্ব নেই। আর নামে কী আসে যায়। আমরা শুধু আশা করব, তারা যেন সুন্দর একটি নাম নিয়ে সুপ্রতিবেশী হিসেবে আমাদের পাশে থাকতে পারে।

Thursday, July 7, 2011

গুগল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট


ইন্টারনেটে সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান যন্ত্র গুগল, একে বলা হয় সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটি সাধারণ অভ্যাস হলো, যে কোনো বিষয়ে তথ্য খুঁজতে প্রথমেই গুগল খুলে সার্চ দেওয়া। ব্যবহারকারীদের জানাশোনার মধ্যে প্রচুর ওয়েবসাইটই থাকে। কিন্তু ব্যবহারকারীরা যখন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য খোঁজ করেন তখন কোথায় তা থাকতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নির্দিষ্ট সাইটে সার্চ করেন না। তারা সাহায্য নেন সার্চ ইঞ্জিনের। সার্চ ইঞ্জিনগুলো কি ওয়ার্ডের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে তার প্রয়োজনীয় তথ্যের কাছে নিয়ে যায় বা তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে তার নির্দেশনা দেয়। এ কাজের জন্য লাখ লাখ ওয়েবসাইট থেকে তথ্য জোগাড় করে সার্চ ইঞ্জিনগুলো। এ কাজে গুগলই সেরা। শুধু সেরা নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা গুগলের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে কোনো তথ্য গুগলে না থাকলে সে তথ্য প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। গুগলের এই উপযোগিতার কারণে সাইটটি প্রায় সব দেশেই ট্রাফিক র‌্যাংকিংয়ে এক বা দুই নাম্বারে থাকে। ব্যবহারকারীরা যেমন চায় প্রয়োজনীয় সব তথ্য গুগলের আওতায় থাকুক, তেমনি যারা তথ্য জানাতে ভয় পায় তারাও চায় গুগলে তথ্যটি না থাকুক। ফলে নানা দেশের সরকার গুগলের কাছে নিয়মিত নানা বিষয়ে তথ্য মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। শুধু তথ্য মুছে দেওয়াই নয়, ব্যবহারকারীর তথ্য জানতে চেয়েও চিঠি দেয় সরকারগুলো। ব্যবসার প্রয়োজনে গুগল তথ্য সরবরাহ করে। গুগলের এমন তথ্য সরবরাহের নানা নজির থেকে কেউ কেউ এ সার্চ ইঞ্জিনটিকে স্পাই বলেও অভিযোগ করেন। কিন্তু গুগল বলছে, তথ্য মুছে দেওয়া বা সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের পালনীয় নীতি আছে। সেগুলো মেনেই তারা কাজ চালায়। নানা দেশের নানা আইন বা রীতি, কোনো আদালত যদি কোনো তথ্য মুছে দেওয়ার নির্দেশ দেন, কোনো তথ্য/ছবি/ভিডিও যদি ঘৃণা ছড়ায়, পর্নোগ্রাফিক হয় কিংবা আইনগতভাবে অন্যায্য হয় তবে সে তথ্য মুছে ফেললে কেউ আপত্তি করবেন না। কিন্তু যদি সরকারের অনুরোধে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বঞ্চিত করা হয় তবে আপত্তি থাকার কথা। আর সরকারের অনুরোধে ব্যবহারকারীদের তথ্য পাচার করলে তো সেটি গুরুতর ঘটনা। গুগল এসব করে, কিন্তু এবার তাতে একটু স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি। তারা রীতিমতো একটি ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। কোন দেশ তাদের কাছে কত তথ্য মুছে দেওয়ার অনুরোধ করেছে, কত তথ্য মুছে দেওয়া হয়েছে তার একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকাটি অনেককেই বিস্মিত করবে। কেননা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং গণতান্ত্রিক বলে কথিত দেশগুলোর অবস্থান এ তালিকার শীর্ষে। প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাজিল, তৃতীয় অবস্থানে ভারত, চতুর্থ অবস্থানে ইংল্যান্ড, পঞ্চম ফ্রান্স, ষষ্ঠ জার্মানি। গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট দেশগুলোকে সচেতন করবে বলেই মনে হয়। ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানো বা ক্ষতিকর কোনো তথ্য ছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য বন্ধ করার উদ্যোগ সমর্থন করা যায় না। এক্ষেত্রে গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট কাজে আসতে পারে। তবে রিপোর্টটিকে আরও বিস্তারিত হতে হবে। সরকারের কয়টি আবেদন আদালতের নির্দেশে, আর কয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সে কথাগুলো রিপোর্টে উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার ধরনগুলোও উল্লেখ করা প্রয়োজন। মজার ব্যাপার, মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত এমন দেশ চীন কিন্তু গুগলের কাছে কোনো চিঠি পাঠায়নি। কারণ, চীনে গুগল বন্ধ। মূল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টে দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম না থাকলেও ট্রাফিক রিপোর্টে আছে। কেননা, ২০০৯ সালের মার্চে বাংলাদেশে চারদিন ইউটিউব বন্ধ ছিল।

Sunday, June 26, 2011

অমৃতবৃক্ষের বিষফল


picture : http://ricknval.blogspot.com/
সাহিত্যের পাঠকরা 'বিষবৃক্ষ' কথাটির সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। শুধু বাংলা সাহিত্যের পাঠকই নয়, ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকও বিষবৃক্ষ চেনে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৩ সালে বিষবৃক্ষ উপন্যাস লিখেছিলেন। আর উইলিয়াম ব্লেক ১৭৯৪ সালে 'এ পয়জন ট্রি' নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। সাহিত্যে চিনি বটে কিন্তু বাস্তবের বিষবৃক্ষ কেমন? যদি প্রশ্ন করা হয়, হাজারো বৃক্ষের মধ্যে বিষবৃক্ষ কোনটি_ তবে উত্তর মিলবে? বৃক্ষে যদি বিষাক্ত ফল হয় তবে সে বৃক্ষকে বিষবৃক্ষ বলা যায়। কিন্তু কোনো বৃক্ষ বিষ উৎপাদন করে? আপেলের বীজে বিষ থাকে, কিন্তু আপেল তো অমৃতসম। চকোলেট বৃক্ষেও বিষ থাকে, কিন্তু চকোলেট উপাদেয় খাবার। এমনকি রসুন-পেঁয়াজের মধ্যেও বিষ থাকে। এ বিষ কুকুর-বিড়ালের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মানুষের রসনা পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া তৃপ্ত হয় না। বৃক্ষে বা বৃক্ষফলে বিষ থাকলেও বিষটুকু বাদ দিয়ে অমৃতটুকু মানুষ ঠিকই বেছে নিতে পারে। কখনও কখনও মানুষ স্বেচ্ছায় বিষাক্ত নেশাদ্রব্য পানও করে। কিন্তু বঙ্কিম ও উইলিয়াম ব্লেক কি এমন কোনো প্রাকৃতিক বৃক্ষকে বিষবৃক্ষ বলেছেন? না। বঙ্কিম বা ব্লেকের কাছে মানুষই বিষবৃক্ষ। মানববৃক্ষে উৎপাদিত বিষফলের কারণেই তারা একে বিষবৃক্ষ বলেছেন। ধর্মগ্রন্থে, পুরাণে এমনকি বিজ্ঞানেও মানুষকে বিকশিত, শ্রেষ্ঠ, শ্রেয়তর জীব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে_ এ হয়তো সত্য। কিন্তু প্রাণিকুলে মানুষের চেয়ে কে বেশি বিষোদ্গার করতে পারে? ব্যক্তিমানুষের বিষোদ্গারের ক্ষমতা নিয়ে তেমন কথা না হলেও আমাদের রাজনীতিতে বিষোদ্গার কথাটি বেশ পরিচিত। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে। কিন্তু ব্যক্তিমানুষের বিষোদ্গারের ক্ষমতা রাজনীতির চেয়ে কম নয়? কথায়-চিন্তায়-ভাবনায় যে বিষ ভয়ঙ্কর। এ বিষ হয়তো মোকাবেলা করা সম্ভব কিন্তু মানুষ যখন মুনাফার লোভে খাদ্যদ্রব্যে, ফলমূলে বিষ ছড়ায় তা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কী? অন্তরের বিষ যুদ্ধ, হিংসা, বিদ্বেষ তৈরি করে প্রাণ-সম্পদ ও প্রকৃতি ক্ষয়ের কারণ হতে পারে। সরাসরি বিষ প্রয়োগ করে এক ব্যক্তির প্রাণ হরণ করা যেতে পারে। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যে বিষ এর চেয়ে ভয়ঙ্কর। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিপর্যস্ত, বিকলাঙ্গ করে দিতে পারে এটি। যুদ্ধের হিংসার চেয়ে এটি কম কিসে? দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত খাদ্যদ্রব্যে বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস সংরক্ষণের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের রীতি এখানে এমনই শিকড় গেড়েছে যে, এ থেকে নিস্তার মেলার পথ কী কেউ জানে না। সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। ফলের মৌসুমে সংবাদ আরও বেশি করে প্রকাশিত হচ্ছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ। না, বৃক্ষ এই বিষফল তৈরি করেনি। বৃক্ষ দিয়েছিল অমৃতফল। কিন্তু মানুষ সে ফল থেকে মুনাফা বাড়াতে একে বিষময় করে তুলেছে। সে বিষ স্লোপয়জনিং করছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। আমাদের সামনে বিকলাঙ্গ এক প্রজন্মের উত্থানকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলছে। প্রশ্ন হলো, জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এই ভয়ঙ্কর বিষ প্রয়োগ বন্ধ করা হচ্ছে না কেন? কেন কঠোর ব্যবস্থা আসছে না? এর উত্তর নেই। হয় কোনো কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন নেই, অথবা থাকলেও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তারা থোড়াই কেয়ার করে। যদি তেমন ব্যবস্থা থাকত তবে ফরমালিনসহ ক্ষতিকর ও বিষাক্ত দ্রব্যগুলো বাজার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হতো এতদিনে। কঠোর ব্যবস্থা নেই, তাই বিষ আছে। মুনাফালোভীদের অন্তরের বিষ আর বাহিরের বিষ মিলেমিশে বিষাক্ত করে তুলতে পারছে আমাদের ভবিষ্যৎও।