Saturday, July 23, 2011

ভারতের সেরা রফতানি


ভারতের সেরা রফতানি পণ্য কী? অনেকেই অনেক পণ্যের কথা বলতে পারেন, কিন্তু 'টাইম' ম্যাগাজিনের একটি লেখায় কার্লা পাওয়ার বলছেন 'সিইও'। সুলিখিত ও সাবলীল এ রচনায় কার্লা যে পণ্যের কথা বলছেন তা মোটেও পণ্য নয়, বরং পণ্য বিক্রির কারিগর_ সিইও বা চিফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। বিশ্বজুড়ে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে ভারতীয় সিইওদের একচ্ছত্র দাপট এখন। এই সিইওদের দু'জন বঙ্গ ব্রাদার্স। বিন্দি বঙ্গ ছিলেন ইউনিলিভারের শীর্ষ কর্মকর্তা, পরে হয়েছেন ক্লেটন, ডাবিলিয়ার অ্যান্ড রাইসের অংশীদার। আর তার ছোট ভাই ছিলেন সিটি গ্রুপের এশীয় প্রধান, পরে হয়েছেন মাস্টারকার্ডের সিইও। এই বাঘা সিইওদ্বয়ের জন্ম এক মায়ের পেটে। টাইম ম্যাগাজিন প্রশ্ন করেছে, বঙ্গভ্রাতাদের মা তাদের কোন দোকানের চাল খাওয়াতেন যে, তারা কোনো পশ্চিমা ডিগ্রি ছাড়াই এমন অবস্থানে যেতে পারলেন? বঙ্গ ভাইরা বলেন, তাদের মা ছিলেন বাঙালি বাঘিনী। আর বাবা ছিলেন ভারতীয় আর্মিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল। বাবার বদলির চাকরিবলে নতুন জায়গায় নতুন বল্পুব্দ, নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বড় হয়েছেন তারা। শুধু বঙ্গ ভাইরাই নন, সিটি গ্রুপের বিক্রম পণ্ডিত, পেপসিকোর ইন্দ্র নুয়ি, মটোরোলার সঞ্জয় ঝাঁ, হাথাওয়ের অজিৎ জৈন, ইনসিডের ডিন দীপক জৈনসহ বহু নামই এখন বিশ্ববাজারে সমীহেরু সঙ্গে উচ্চারিত হয়। দিন দিন বিশ্ববাজারে ভারতীয়দের দাপট বাড়ছে। কিন্তু এর পেছনের কাহিনীটা কী? চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এমনকি আমেরিকায়ও প্রশ্নটা ওঠে অহরহ। ভারতীয়রা কেন এ কাজগুলো পাচ্ছে?
প্রথমত, এ এক্সিকিউটিভরা এমন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন যে, আজকের বিশ্ববাজারের জন্য তারা উপযুক্ত। দ্বিতীয়ত, ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা একজন এক্সিকিউটিভের জন্য বাইরের বাজার-সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে ওঠা সহজ। তৃতীয়ত, জটিল প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের পরিচিতি। চতৃর্থত, কম সম্পদের উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকবলে ভারতীয়রা এখানকার পরিস্থিতি বোঝেন। পঞ্চমত, বিশ্ববাজারের ভাষা ইংরেজিতে কথা বলেন তারা। ষষ্ঠত, এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারের সঙ্গে ভারতীয়দের সুপরিচিতি। সপ্তমত, চীন ও ভারত মাল্টিন্যাশনালদের কাছে মুনাফার অভয়ারণ্য। ফলে, আগামী দিনের গ্গ্নোবাল লিডাররা তাদের মধ্য থেকে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক।
ভারতীয়দের আরও নানা গুণের কথা কার্লাকে বলেছেন জিল অ্যাডের নামে এক সিইও। যেমন ভারতীয়রা এশিয়ায় সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তারা ইংরেজিতে চিন্তা করে। নিজ দেশের বহুজাতীয় সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। মানিয়ে নিতে পারদর্শী এবং ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। মোগল থেকে ব্রিটিশ_ সব ঔপনিবেশিক শক্তির সংস্কৃতি আত্মস্থ করে ভারত এক মহাশক্তি হয়ে উঠেছে। ভারতীয়রা গুণী, কিন্তু ভারতীয় সিইওদের তৈরি গুণকে সম্পদে পরিণত করছে কারা? সিগনে স্পেনসার নামে এক লেখক বলছেন, ভারতের লোকজন হার্ভার্ড বা এমআইটির চেয়ে তাদের আইআইটি বা আইআইএম বেশি পছন্দ করে। ছোটবেলা থেকেই ছাত্রদের মধ্যে শক্ত প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতা চলে এগুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য। আইআইটি হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। আর আইআইএম হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট। দেশের নানা জায়গায় ছড়ানো এ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। ছাতাধরা ভবনে ক্লাস হয়, চিপা রুমে ঘুমাতে হয়। তবু ছাত্ররা গ্গ্নোবাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে; বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াও তাদের চমৎকার। ৬০ বছর বয়সেও কোন ক্লাসে কে কত নম্বর পেয়েছিল তা তাদের মনে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, ভারত এই বিজনেস এক্সপার্টদের তৈরি করছে। কিন্তু তারা দেশের বদলে দেশের বাইরেই বেশি কাজ করতে পছন্দ করছেন। একজন চীনা এক্সিকিউটিভকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে কাজ করতে যাবেন কি-না। তখন পার্টির মারফত নিয়োগ পাওয়া এক্সিকিউটিভ প্রশ্ন করবেন, কেন যাব? কিন্তু ভারতীয়রা একপায়ে খাড়া। ভারতে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিতে বা একটি কারখানা তৈরি করতে একজন সিইওকে ৮০ জায়গায় পারমিশন নিতে হয়। সেখানে চীনে একটি কারখানা বসাতে দুই বা তিন জায়গায় অনুমতি নিলেই চলে। নতুন উদ্যোগের জন্য চীনারা লাল গালিচা পেতে দেয়, আর ভারতীয়রা উদ্যোগটাকে লালফিতায় আটকে ফেলে। দেশের এ পরিস্থিতি ভারতীয় এক্সিকিউটিভদের বিদেশমুখী করছে। বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠছে ভারতীয় সিইওদের স্বর্গরাজ্য।

Friday, July 22, 2011

মিডিয়া মোগল


প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় ভাষার কিছু শব্দ ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যেমন পণ্ডিত। বিদ্বান ব্যক্তিকে পণ্ডিত বলে আখ্যায়িত করার রেওয়াজ আছে। তেমনি মোগল আরেক ভারতীয় শব্দ। মিডিয়া মোগল কথাটা বেশ পরিচিত। মিডিয়া সম্রাট অর্থে মিডিয়া মোগল কথাটার ব্যবহার। সম্রাট শব্দটা আমাদের মিডিয়ায়ও আকসার ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তি নাম হিসেবেও সম্রাট জনপ্রিয়। কিন্তু মোগল বলে সাধারণত কাউকে আখ্যায়িত করা হয়। এখানে মোগল বলতে মোগল সম্রাটদেরই বোঝানো হয়। একটা প্রবাদ অবশ্য ব্যতিক্রম_ 'পড়েছি মোগলের হাতে_ খানা খেতে হবে সাথে।' এই প্রবাদে সাধারণ অথচ খাদ্যরসিক ব্যক্তিকে মোগল বলতে দেখা যায়। এর বাইরে সাধারণত কাউকে মোগল বলা হয় না। সম্প্রতি মিডিয়া মোগল কথাটা বেশ আলোচিত হচ্ছে একজন মোগলের সূত্রে। রুপার্ট মারডককে অবশ্য শুধু মোগল নয়_ ব্যারন, টাইকুন, বস নানা অভিধায় ডাকা হয়। রুপার্ট মারডক কেমন মোগল তা আমাদের সম্রাটের ধারণা থেকে বোঝা একটু কঠিন। তিনি যে কোম্পানিটির সিইও সেই নিউজ করপোরেশন বিশাল প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় কনগ্গ্নোমারেট। নানা ধরনের, নানা কাজের, নানা কিসিমের প্রতিষ্ঠানের যৌথ রূপ হলো কনগ্গ্নোমারেট। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশ করে, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল চালায়, টিভির জন্য অনুষ্ঠান বানায়, সিনেমা প্রযোজন করে, অ্যালবাম প্রকাশ করে, স্টুডিও পরিচালনা করে, ইন্টারনেটভিত্তিক বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেয়। মোটকথা, মিডিয়া বলতে যা বোঝায় তার সব শাখাতেই এর বিস্তার। সহজভাবে বললে, এক নিউজ করপোরেশনের অধীনে কাজ করে শত শত প্রতিষ্ঠান। তারা একজোট হয়ে বিশ্বের মিডিয়া সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। রুপার্ট মারডক যে ধরনের ব্যবসায়ী তেমন ব্যবসা বুঝে ওঠাই আমাদের জন্য কঠিন। কেননা এমন ব্যবসার উদাহরণ আমাদের দেশে নেই। মিডিয়া ব্যবসায় করপোরেট উদ্যোগ এ দেশে আছে, কিন্তু কোনো শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী শুধু মিডিয়ায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছেন এমন উদাহরণ দেওয়া কষ্টকর হবে। ফলে রুপার্ট মারডক আমাদের দেশে খানিকটা ইতিহাসের মোগলদের মতোই। যার কর্মকাণ্ড আমরা আঁচ করতে পারি, কিন্তু পুরো বুঝে ওঠা কঠিন। শত শত পত্রিকা, টিভি চ্যানেলের কর্ণধার সম্প্রতি ব্রিটেনে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েডের কারণে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন। নানা প্রশ্নের মুখে রীতিমতো নাকাল হতে হয়েছে তাকে। অভিযোগটা সবার জানা। তার 'নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড' পত্রিকাটি রসাল ও কৌতূহলোদ্দীপক খবরের জন্য পুলিশের সাহায্যে বহু মানুষের ফোন হ্যাক করেছে। অর্থমন্ত্রী, রাজপরিবারের সদস্য, যুদ্ধে নিহত সৈন্য, হত্যার শিকার ব্যক্তি কেউই তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা থেকে বাদ পড়েনি। বহুদিন ধরে চলছিল এই অপকর্ম। পত্রিকাও রসাল আইটেম সমৃদ্ধ হয়ে বাজার মাত করছিল। কিন্তু সহসা ফাঁস হয়ে গেলে পুরনো কাসুন্দি সবার চোখের সামনেই ঘাঁটা হচ্ছে। পুরনো সাংবাদিক, পুলিশ অফিসার, রাজনীতিক থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বহু মানুষ প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড অপরাধ করেছে, অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নাম ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছে। কারা অপরাধী সে প্রশ্ন নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো_ এত বড় ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মধ্যে নৈতিকতার অবস্থান কোথায়? শুধু ব্যবসা এবং মুনাফার জন্য যেনতেন প্রকারে সংবাদ সংগ্রহের প্রবণতার মধ্যে দায়িত্ববোধের অবস্থান কোথায়? এ প্রশ্নগুলো আরও কিছু প্রশ্নকে উস্কে দিচ্ছে। সেগুলো হলো মুক্ত সংবাদপত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি প্রশ্নহীন বা পর্যবেক্ষণহীন থাকা উচিত? আরও একটি প্রশ্ন অবশ্য বাতাসে ঘুরছে। তা হলো, ট্যাবলয়েডের যুগ কি শেষ হয়ে এলো? নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে এ প্রশ্ন উঠছে যে, এমন সংবাদপত্রগুলো ভবিষ্যতে কি গ্রহণযোগ্যতা পাবে? লোকে রসাল খবর পছন্দ করে বটে, কিন্তু রসাল খবরের উৎস যদি বন্ধ হয় তবে পত্রিকা সেগুলো ছাপবে কীভাবে আর মানুষই-বা পড়বে কীভাবে?

Thursday, July 14, 2011

পশ্চিমবঙ্গ


ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদপত্রের খবরে জানা যাচ্ছে, সিঙ্গুরের জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে জঙ্গলমহলে শান্তি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত নানা উদ্যোগে সদা ব্যস্ত তিনি। এর মধ্যে বহুদিনের প্রত্যাশিত ও প্রতীক্ষিত নানা উদ্যোগও আছে। এগুলোর কোনোটা হয়তো জনদাবি, কোনোটা হয়তো প্রত্যাশা। কোনোটা হয়তো অনিবার্য, কোনোটা হয়তো ঐচ্ছিক। এমনই এক ঐচ্ছিক প্রসঙ্গ তালিকায় ছিল, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন হবে। তার ঘোষণার পর থেকে সরব হয়ে উঠছেন বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক মহল। পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন হলে পরিবর্তিত নাম কী হওয়া উচিত তা নিয়ে বেশ বিতর্ক জমে উঠেছে সেখানকার বাংলা পত্রিকাগুলোতে। অনেক রেফারেন্স আসছে। ইংরেজদের ক্যালকাটা নাম পরিবর্তন করে কলকাতা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কলকাতা প্রতিষ্ঠিত নাম। কলকাতা থেকে দূরের মাদ্রাজ চেন্নাই হয়েছে, বোম্বে হয়েছে মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর হয়েছে ব্যাঙ্গালুরু। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সেই পশ্চিমবঙ্গই রয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পশ্চিমবঙ্গের নাম কেন পরিবর্তন করতে হবে। যুক্তিটা পরিষ্কার। আগে পশ্চিমবঙ্গ ছিল, সেটা সবাই মেনেও নিয়েছিল। কারণ, পূর্ববঙ্গ বলে একটা জায়গার অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু পূর্ববঙ্গ অনেক আগেই বাংলাদেশ হয়ে গেছে। পুরনো সাহিত্যে ছাড়া পূর্ববঙ্গের অস্তিত্ব আজ আর নেই। ফলে পশ্চিমবঙ্গ একা আর বঙ্গের পশ্চিম দিক নির্দেশ করে যাবে কেন? তাই নাম পাল্টানোর দাবি ও আলোচনা বেশ হাওয়া পেয়েছে। মানতেই হবে, বাংলাদেশ নামটা অপূর্ব। ১৯৭১ সালেই যে বাংলাদেশ নামটা তৈরি হয়েছে তা নয়। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় আমরা বাংলাদেশ বা বাংলা দেশ পাই। বাঙালির পুরো বসতিকেই তখন লেখকরা বাংলাদেশ বলতেন। মনীষীদের বলা সেই নামই আমরা আমাদের দেশকে দিয়েছি, রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সে নামকে প্রতিষ্ঠাও করেছি। চাইলেও পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ নামটি নিতে পারবে না। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নাম হোক বাংলা। এক দশক আগেও এমন দাবি উঠেছিল। তখন কর্তাব্যক্তিরা দাবিটিকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কারণ, নীতি অনুসারে ভারতের কোনো রাজ্যের নাম ভাষা অনুসারে হতে পারে না। বাঙালি ছাড়াও অন্য ভাষার লোক সে রাজ্যে বাস করে। ফলে বাংলা নামটি আপাতত হচ্ছে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। কেউ বলছেন, তবে নাম দেওয়া হোক বঙ্গ। অথবা বঙ্গদেশ বা বঙ্গপ্রদেশ। প্রদেশের কথায় কেউ কেউ ফোঁড়ন কাটছেন। বলছেন, নামের কি আকালটাই না পড়েছিল ভারতে। নাম নেই তাই রাজ্যের নাম দেওয়া হয়েছে উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ। প্রদেশজুড়ে রাজ্যের নাম দেওয়ার চাইতে বরং শুধু বঙ্গ নামটাই ভালো। কেউ কেউ বঙ্গ শব্দটার সঙ্গে ভারত জুড়ে দিয়ে বঙ্গ-ভারত নাম নেওয়ার পক্ষে বলছেন। তাতে ভারতের সঙ্গে নামটা জুড়ে থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা অবশ্য বলছেন, নাম হোক বঙ্গভূমি। নানা মুনির নানা নাম নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, আলাপ-আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে অবশ্য সে আলোচনার ঢেউ সামান্যই পেঁৗছাচ্ছে। কারণ, নাম নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আমাদের অনেক নিকটবর্তী হলেও রাজনৈতিকভাবে অনেক দূরে। ফলে সেখানকার মাঠে-ময়দানে কী হচ্ছে সেটা এখানে বসে জানা কঠিন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নাম পরিবর্তনের কারণ আমরাই। পূর্ববঙ্গ নেই বলে পশ্চিমবঙ্গ নাম পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। একথা ঠিক যে, পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা তাদের রাজ্যের নাম কী দেবে সে নিয়ে আমাদের মতের গুরুত্ব নেই। আর নামে কী আসে যায়। আমরা শুধু আশা করব, তারা যেন সুন্দর একটি নাম নিয়ে সুপ্রতিবেশী হিসেবে আমাদের পাশে থাকতে পারে।

Thursday, July 7, 2011

গুগল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট


ইন্টারনেটে সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান যন্ত্র গুগল, একে বলা হয় সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটি সাধারণ অভ্যাস হলো, যে কোনো বিষয়ে তথ্য খুঁজতে প্রথমেই গুগল খুলে সার্চ দেওয়া। ব্যবহারকারীদের জানাশোনার মধ্যে প্রচুর ওয়েবসাইটই থাকে। কিন্তু ব্যবহারকারীরা যখন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য খোঁজ করেন তখন কোথায় তা থাকতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নির্দিষ্ট সাইটে সার্চ করেন না। তারা সাহায্য নেন সার্চ ইঞ্জিনের। সার্চ ইঞ্জিনগুলো কি ওয়ার্ডের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে তার প্রয়োজনীয় তথ্যের কাছে নিয়ে যায় বা তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে তার নির্দেশনা দেয়। এ কাজের জন্য লাখ লাখ ওয়েবসাইট থেকে তথ্য জোগাড় করে সার্চ ইঞ্জিনগুলো। এ কাজে গুগলই সেরা। শুধু সেরা নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা গুগলের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে কোনো তথ্য গুগলে না থাকলে সে তথ্য প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। গুগলের এই উপযোগিতার কারণে সাইটটি প্রায় সব দেশেই ট্রাফিক র‌্যাংকিংয়ে এক বা দুই নাম্বারে থাকে। ব্যবহারকারীরা যেমন চায় প্রয়োজনীয় সব তথ্য গুগলের আওতায় থাকুক, তেমনি যারা তথ্য জানাতে ভয় পায় তারাও চায় গুগলে তথ্যটি না থাকুক। ফলে নানা দেশের সরকার গুগলের কাছে নিয়মিত নানা বিষয়ে তথ্য মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। শুধু তথ্য মুছে দেওয়াই নয়, ব্যবহারকারীর তথ্য জানতে চেয়েও চিঠি দেয় সরকারগুলো। ব্যবসার প্রয়োজনে গুগল তথ্য সরবরাহ করে। গুগলের এমন তথ্য সরবরাহের নানা নজির থেকে কেউ কেউ এ সার্চ ইঞ্জিনটিকে স্পাই বলেও অভিযোগ করেন। কিন্তু গুগল বলছে, তথ্য মুছে দেওয়া বা সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের পালনীয় নীতি আছে। সেগুলো মেনেই তারা কাজ চালায়। নানা দেশের নানা আইন বা রীতি, কোনো আদালত যদি কোনো তথ্য মুছে দেওয়ার নির্দেশ দেন, কোনো তথ্য/ছবি/ভিডিও যদি ঘৃণা ছড়ায়, পর্নোগ্রাফিক হয় কিংবা আইনগতভাবে অন্যায্য হয় তবে সে তথ্য মুছে ফেললে কেউ আপত্তি করবেন না। কিন্তু যদি সরকারের অনুরোধে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বঞ্চিত করা হয় তবে আপত্তি থাকার কথা। আর সরকারের অনুরোধে ব্যবহারকারীদের তথ্য পাচার করলে তো সেটি গুরুতর ঘটনা। গুগল এসব করে, কিন্তু এবার তাতে একটু স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি। তারা রীতিমতো একটি ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। কোন দেশ তাদের কাছে কত তথ্য মুছে দেওয়ার অনুরোধ করেছে, কত তথ্য মুছে দেওয়া হয়েছে তার একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকাটি অনেককেই বিস্মিত করবে। কেননা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং গণতান্ত্রিক বলে কথিত দেশগুলোর অবস্থান এ তালিকার শীর্ষে। প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাজিল, তৃতীয় অবস্থানে ভারত, চতুর্থ অবস্থানে ইংল্যান্ড, পঞ্চম ফ্রান্স, ষষ্ঠ জার্মানি। গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট দেশগুলোকে সচেতন করবে বলেই মনে হয়। ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানো বা ক্ষতিকর কোনো তথ্য ছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য বন্ধ করার উদ্যোগ সমর্থন করা যায় না। এক্ষেত্রে গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট কাজে আসতে পারে। তবে রিপোর্টটিকে আরও বিস্তারিত হতে হবে। সরকারের কয়টি আবেদন আদালতের নির্দেশে, আর কয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সে কথাগুলো রিপোর্টে উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার ধরনগুলোও উল্লেখ করা প্রয়োজন। মজার ব্যাপার, মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত এমন দেশ চীন কিন্তু গুগলের কাছে কোনো চিঠি পাঠায়নি। কারণ, চীনে গুগল বন্ধ। মূল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টে দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম না থাকলেও ট্রাফিক রিপোর্টে আছে। কেননা, ২০০৯ সালের মার্চে বাংলাদেশে চারদিন ইউটিউব বন্ধ ছিল।

Sunday, June 26, 2011

অমৃতবৃক্ষের বিষফল


picture : http://ricknval.blogspot.com/
সাহিত্যের পাঠকরা 'বিষবৃক্ষ' কথাটির সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। শুধু বাংলা সাহিত্যের পাঠকই নয়, ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকও বিষবৃক্ষ চেনে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৩ সালে বিষবৃক্ষ উপন্যাস লিখেছিলেন। আর উইলিয়াম ব্লেক ১৭৯৪ সালে 'এ পয়জন ট্রি' নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। সাহিত্যে চিনি বটে কিন্তু বাস্তবের বিষবৃক্ষ কেমন? যদি প্রশ্ন করা হয়, হাজারো বৃক্ষের মধ্যে বিষবৃক্ষ কোনটি_ তবে উত্তর মিলবে? বৃক্ষে যদি বিষাক্ত ফল হয় তবে সে বৃক্ষকে বিষবৃক্ষ বলা যায়। কিন্তু কোনো বৃক্ষ বিষ উৎপাদন করে? আপেলের বীজে বিষ থাকে, কিন্তু আপেল তো অমৃতসম। চকোলেট বৃক্ষেও বিষ থাকে, কিন্তু চকোলেট উপাদেয় খাবার। এমনকি রসুন-পেঁয়াজের মধ্যেও বিষ থাকে। এ বিষ কুকুর-বিড়ালের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মানুষের রসনা পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া তৃপ্ত হয় না। বৃক্ষে বা বৃক্ষফলে বিষ থাকলেও বিষটুকু বাদ দিয়ে অমৃতটুকু মানুষ ঠিকই বেছে নিতে পারে। কখনও কখনও মানুষ স্বেচ্ছায় বিষাক্ত নেশাদ্রব্য পানও করে। কিন্তু বঙ্কিম ও উইলিয়াম ব্লেক কি এমন কোনো প্রাকৃতিক বৃক্ষকে বিষবৃক্ষ বলেছেন? না। বঙ্কিম বা ব্লেকের কাছে মানুষই বিষবৃক্ষ। মানববৃক্ষে উৎপাদিত বিষফলের কারণেই তারা একে বিষবৃক্ষ বলেছেন। ধর্মগ্রন্থে, পুরাণে এমনকি বিজ্ঞানেও মানুষকে বিকশিত, শ্রেষ্ঠ, শ্রেয়তর জীব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে_ এ হয়তো সত্য। কিন্তু প্রাণিকুলে মানুষের চেয়ে কে বেশি বিষোদ্গার করতে পারে? ব্যক্তিমানুষের বিষোদ্গারের ক্ষমতা নিয়ে তেমন কথা না হলেও আমাদের রাজনীতিতে বিষোদ্গার কথাটি বেশ পরিচিত। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে। কিন্তু ব্যক্তিমানুষের বিষোদ্গারের ক্ষমতা রাজনীতির চেয়ে কম নয়? কথায়-চিন্তায়-ভাবনায় যে বিষ ভয়ঙ্কর। এ বিষ হয়তো মোকাবেলা করা সম্ভব কিন্তু মানুষ যখন মুনাফার লোভে খাদ্যদ্রব্যে, ফলমূলে বিষ ছড়ায় তা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কী? অন্তরের বিষ যুদ্ধ, হিংসা, বিদ্বেষ তৈরি করে প্রাণ-সম্পদ ও প্রকৃতি ক্ষয়ের কারণ হতে পারে। সরাসরি বিষ প্রয়োগ করে এক ব্যক্তির প্রাণ হরণ করা যেতে পারে। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যে বিষ এর চেয়ে ভয়ঙ্কর। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিপর্যস্ত, বিকলাঙ্গ করে দিতে পারে এটি। যুদ্ধের হিংসার চেয়ে এটি কম কিসে? দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত খাদ্যদ্রব্যে বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস সংরক্ষণের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের রীতি এখানে এমনই শিকড় গেড়েছে যে, এ থেকে নিস্তার মেলার পথ কী কেউ জানে না। সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। ফলের মৌসুমে সংবাদ আরও বেশি করে প্রকাশিত হচ্ছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ। না, বৃক্ষ এই বিষফল তৈরি করেনি। বৃক্ষ দিয়েছিল অমৃতফল। কিন্তু মানুষ সে ফল থেকে মুনাফা বাড়াতে একে বিষময় করে তুলেছে। সে বিষ স্লোপয়জনিং করছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। আমাদের সামনে বিকলাঙ্গ এক প্রজন্মের উত্থানকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলছে। প্রশ্ন হলো, জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এই ভয়ঙ্কর বিষ প্রয়োগ বন্ধ করা হচ্ছে না কেন? কেন কঠোর ব্যবস্থা আসছে না? এর উত্তর নেই। হয় কোনো কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন নেই, অথবা থাকলেও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তারা থোড়াই কেয়ার করে। যদি তেমন ব্যবস্থা থাকত তবে ফরমালিনসহ ক্ষতিকর ও বিষাক্ত দ্রব্যগুলো বাজার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হতো এতদিনে। কঠোর ব্যবস্থা নেই, তাই বিষ আছে। মুনাফালোভীদের অন্তরের বিষ আর বাহিরের বিষ মিলেমিশে বিষাক্ত করে তুলতে পারছে আমাদের ভবিষ্যৎও।

Saturday, June 18, 2011

হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন


হিন্দি ভাষার বিখ্যাত বাক্য 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন'। বাংলায় অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়_ 'আমি আপনার কে হই?' নব্বইয়ের দশকে 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন' নামে একটি সিনেমা নির্মিত হয়েছিল বলিউডে। সুরজ আর বারজাতিয়া পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সালমান খান ও মাধুরী দীক্ষিত। সর্বকালের সেরা ব্যবসাসফল হিন্দি সিনেমাগুলোর একটি হাম আপকে...। শুধু ব্যবসার দিক থেকেই নয়, নামের দিক থেকেও নাকি এ সিনেমা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। পুরো একটি বাক্যে সিনেমার নাম দেওয়ার রীতি চালু বেশ জেঁকে বসে 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন' সিনেমার পর। এর আগে বড়জোর একটি বা দুটি শব্দে সিনেমার নাম দেওয়ার প্রচলন ছিল। অনেকেরই মনে থাকার কথা, সিনেমাটির কাহিনী কী ছিল। ঘটনার সূত্রপাত একটি বিয়েবাড়িতে। মাধুরীর বড় বোনের সঙ্গে সালমানের বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিয়েবাড়ির খুনসুটি মাধুরী ও সালমানের মধ্যে একটি নাটকীয় প্রেমের সূচনা ঘটায় এবং কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে। বাংলাদেশেও অনেক ক্ষেত্রে কনের বোন আর বরের ভাইয়ের সম্পর্ককে রোমান্টিক বলে বিবেচনা করা হয়। এই সম্পর্কটির নাম বেয়াই-বেয়াইন। বাংলা সিনেমায় হরহামেশা বেয়াই-বেয়াইনদের প্রেম ঘটতে দেখা যায়। একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার গানই আছে এ নিয়ে। 'আসসালামুয়ালাইকুম বেয়াই সাব...' গানটি অনেকের শুনে থাকবার কথা। এই গান বা হাম আপকে সিনেমার কথা মনে পড়ার বিশেষ কারণ বৃহস্পতিবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর। আনন্দবাজার খবর দিয়েছে, ফিলিপা শার্লট মিডলটন ও প্রিন্স হ্যারি প্রেমে পড়েছেন বলে খবর রটেছে। প্রিন্স হ্যারি_ ডিউক অব ক্যামব্রিজ প্রিন্স উইলিয়ামের ছোট ভাই। প্রিন্সেস ডায়ানার ছোট ছেলে। আর ফিলিপা যাকে সংক্ষেপে পিপ্পা বলা হয়, তিনি ক্যাথেরিন এলিজাবেথ মিডলটন বা কেট বা ডাচেস অব ক্যামব্রিজের ছোট বোন। কেট ও উইলিয়ামের বিয়ের দিন বিশ্বের কোটি মানুষের চোখের সামনে রীতি অনুসারে পিপ্পা ও হ্যারি যথোচিত গাম্ভীর্য রক্ষা করেছেন বলেই মনে হয়। বাংলা বা হিন্দি সিনেমার মতো বেয়াই-বেয়াইনদের নাচে-গানে তাদের অংশ নিতে দেখা যায়নি। কিন্তু নাচ-গান, রসালাপ না থাকলেও পর্যবেক্ষকরা রীতিমতো আতশ কাচ নিয়ে পিপ্পা আর হ্যারির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা পরস্পরের সঙ্গে খোশগল্প করলেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়েছেন। বিয়ের দিন থেকে পিপ্পা স্টার। ব্রিটেনসহ বিশ্বের পত্রপত্রিকাগুলো পিপ্পাকে বিশেষ ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তাকে নিয়ে নানা গল্প ফেঁদেছে ট্যাবলয়েডগুলো। কবে কার সঙ্গে তার প্রেম ছিল, সে প্রেম আছে না ভেঙেছে, পোশাক কোথায় বানিয়েছেন, স্টাইল কী ইত্যাদি নিয়ে তো কথা চলেছেই। এত সবের মধ্যে প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে পিপ্পাকে জড়িয়ে খবর রটতে রটতেও রটেনি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, দু'জনের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে। একসঙ্গে দু'জনকে ঘুরতে-ফিরতে দেখা যাচ্ছে।
পত্রিকাগুলো রসাল কাহিনী পেয়ে এখন নানামুখী জল্পনা-কল্পনা জুড়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি ব্রিটেনের রাজপরিবারেও একটি 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন' ঘটতে যাচ্ছে? খবর সত্যি হলে রাশভারি সেই বিয়ের অনুষ্ঠান থেকেই গল্প শুরু হবে। শেষ খবর হলো, পিপ্পার সঙ্গে তার আগের প্রেমিকের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। এখন তিনি 'একা'। আর প্রিন্স হ্যারি আবার আফগানিস্তান যাচ্ছেন। যুদ্ধের ময়দানে আপাচি হেলিকপ্টার চালাবেন। গল্প রুদ্ধশ্বাস ক্লাইমেক্সের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু গল্পের শেষ কোথায় সেটি জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু দিন।

Saturday, May 14, 2011

বিন লাদেন : ক্রমশ বদলে যাওয়া গল্প






"We're an empire now, and when we act, we create our own reality. And while you're studying that reality—judiciously, as you will—we'll act again, creating other new realities, which you can study too, and that's how things will sort out. We're history's actors…and you, all of you, will be left to just study what we do."

Karl Christian Rove, Senior Advisor and Deputy Chief of Staff to former President George W. Bush, on October 17, 2004


জর্জ ডবলিউ বুশের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও ডেপুটি চিফ অব স্টাফ কার্ল রোভ ১৭ অক্টোবর ২০০৪ তারিখে ওপরের উক্তিটি করে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পুরনো সত্য বা বাস্তবতার ধারণা এখন অচল। পৃথিবী এখন নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কার্ল রোভ বলেছিলেন, 'আমরা এখন এমপায়ার/সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে আমরা নিজস্ব সত্য/বাস্তবতা তৈরি করি। আপনারা সেই বাস্তবতাকে যাচাই করেন। আপনারা যাচাই করতে গেলে আমরা আবারও তৎপরতা চালাই, আরও নতুন সত্য/বাস্তবতা তৈরি করি। সেটাও আপনারা যাচাই করতে পারেন। এ প্রক্রিয়াতেই বিষয়গুলো আকার পায়। আমরাই ইতিহাসের কুশীলব। আপনারা_ আপনারা সবাই, আমরা যা করি তার পর্যবেক্ষক মাত্র।'

স্টিলথ চপারের ধ্বংসাবশেষ
কার্ল রোভের এই উক্তিটির কথা নতুন করে অনেকের মনে পড়েছে ২০১১'র মে'র প্রথম সপ্তাহজুড়ে বিন লাদেন হত্যাকাণ্ডের ক্রমপরিবর্তনশীল বিবরণের প্রেক্ষাপটে। পহেলা মে-তে [পাকিস্তান তখন ২ মে, রাত ১টা] পাকিস্তানের রাজধানী থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গ্যারিসন শহর এবোটাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের মোস্ট ওয়ান্টেড টেরোরিস্ট ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের পর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে বিশেষ বাহিনী 'নেভি সিলস'-এর ৭৯ সৈন্যের একটি দল [Navy SEALs- Navy Sea, Air and Land, সাগর, আকাশ ও ভূমিতে সমান পারদর্শী সেনাদল] প্রথমে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে গিয়েছিল। পাকিস্তানের গাজি এয়ারবেস থেকে ৪টি হেলিকপ্টারে [প্রথমে বলা হয়েছিল দুটি বা তিনটি] করে উপস্থিত হয়েছিল ওসামা বিন লাদেনের বাড়িতে। প্রথমে বলা হয়েছিল হেলিকপ্টারগুলো ছিল এমএইচ-সিক্সটি। পরে ঘটনাস্থলে একটি হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ থেকে জানা যায়, এই বিশেষ মিশনে স্টিলথ চপার নামে বিশেষ হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। সম্ভবত বিশেষভাবে নির্মিত এই হেলিকপ্টারের কারণেই পাকিস্তানের রাডারকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে এই হেলিকপ্টার কোনো মিশনে ব্যবহৃত হয়নি এবং প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টারটি ব্যবহার করতে গিয়ে একটি বিপর্যয় ঘটে। স্থানীয় উচ্চতাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে একটি স্টিলথ চপারে আগুন ধরে যায়।
নেভি সিলস সদস্যরা ৪০ মিনিটের অভিযানে বিন লাদেনসহ ৫ জনকে হত্যা করে। বিন লাদেন ছাড়া অন্য মৃতদেহগুলো তারা এবোটাবাদের বাড়িতেই রেখে আসে। জানা যায়, মুসলিম রীতি মেনে জানাজা পড়ে বিন লাদেনের লাশ আরব সাগরে সমাহিত করা হয়। অভিযান শেষ হলে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হোয়াইট হাউসে সকণ্ঠে বিন লাদেনের মৃত্যুর প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারে হামলাসহ ন্যক্কারজনক সব সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিটিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার করা হলো। প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা পুরো বিশ্বকে নড়েচড়ে বসিয়ে দেয়। অভিযান চলেছিল যুক্তরাষ্ট্র সময় দুপুরে। প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দেন রাতে এবং রাতেই মার্কিন নাগরিকরা বেরিয়ে পড়ে উৎসব করতে। মূলত হোয়াইট হাউসের সামনে ও গ্রাউন্ড জিরোতে সমবেত হয়ে তারা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ড উদযাপন করতে থাকে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমে বিন লাদেন হত্যার খবরটি নিয়ে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। অভিযানের ৪০ মিনিটে কী ঘটেছিল তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। হোয়াইট হাউস ও মিডিয়ার প্রযোজনায় শুরু হয় একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প রচনার প্রতিযোগিতা। ক্রমশ বদলে বদলে যেতে থাকে বিবরণ।

লাদেনের মিলিয়ন ডলার (?) মূল্যের বাড়ি
প্রথমে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের এবোটাবাদে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও উচ্চবিত্তের মানুষদের জন্য নির্মিত অভিজাত আবাসিক এলাকায় মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি আলিশান বাড়িতে থাকতেন। মিডিয়া এখনও বাড়িটিতে বিন লাদেন কম্পাউন্ড বলছে। পরে জানা গেল, বাড়ির দাম মোটেও মিলিয়ন ডলার নয়। তবে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল। দুই স্তরের দেয়ালের মধ্যে কাঁটাতার ঘেরা তিনতলা বাড়িটি বিন লাদেনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এ বাড়িতে কোনো এসি ছিল না, টেলিফোন সংযোগ বা ইন্টারনেট ছিল না। উপরন্তু বাড়িটি মোটেও অভিজাত এলাকায় নয়। এবোটাবাদ অভিজাত শহর, কাকুল মিলিটারি একাডেমীসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাও এ শহরে আছে। কিন্তু বিন লাদেনের বাড়ি শহরতলির প্রান্তে ক্ষেতখামারের মধ্যে ও নোংরা রাস্তার ধারে অবস্থিত। বাড়িটি আশপাশের বাড়িগুলোর থেকে বড়, অনেক জায়গা নিয়ে তৈরি হলেও এমন বাড়ি এবোটাবাদে অনেক আছে। হিমালয়ের পাদদেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নির্জনতায় বিন লাদেনের বার্তাবাহক বলে কথিত দুই পশতুন কাজিন এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানেরও জিও টিভি ও যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিহতের একটি ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হোয়াইট হাউস বলে, ছবিটি আসল নয়। এমনকি এনবিসিকে ছবি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। জানা যায়, ফটোশপের মাধ্যমে মৃত লাদেনের মাধ্যমে ছবিটি তৈরি করা হয়েছিল। জিও টিভিতে স্থানীয়ভাবে অ্যামেচার ক্যামেরায় তোলা একটি ভিডিও চিত্র সম্প্রচারিত হয়। তাতে বিন লাদেনের বাড়ির আশপাশে প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাতের ছবি দেখা যায়। এতে অনেকে ধারণা করেন, আল কায়দা নেতাকে হত্যা করতে গিয়ে মার্কিনিরা প্রচণ্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। উভয় পক্ষে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু পরে জানা যায়, মার্কিন হেলিকপ্টার স্টিলথ চপার বিস্ফোরণের কারণেই মূল অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। ভবনের গেট বা দেয়াল ধসানোর জন্যও সৈন্যরা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। হেলিকপ্টারের অপারেশন বলে মিডিয়া প্রথমে ধারণা করেছিল, হেলিকপ্টার বিন লাদেনের বাড়ির ছাদে অবতরণ করেছিল এবং ছাদে নামতে গিয়েই প্রতিপক্ষের গুলিতে একটি হেলিকপ্টার খোয়া যায়। কিন্তু পরে জানা যায়, বিন লাদেনের বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় সৈন্যরা নেমেছিল। তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে বিন লাদেনের কক্ষে ঢুকেছিল।
হোয়াইট হাউস প্রথমে বলেছিল, বিন লাদেন ও তার সহযোগীরা সশস্ত্র ছিলেন। তারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি বিন লাদেন একজন নারীকে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করে বাঁচতে চেষ্টা করেছেন। পরে বলা হয়, যে লোকটি একজন নারীকে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন তিনি বিন লাদেন নন, তার একজন সহযোগী। পরে এই ঘটনাকে আরও পরিবর্তিত করে বলা হয়, আসলে লাদেনের বাড়িতে সৈন্যরা কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। একজন সহযোগী বাদে সবাই নিরস্ত্র ছিলেন সেখানে। মানববর্ম হিসেবে নারীকে ব্যবহারের কথা সম্ভবত নারী হত্যার দায় ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। এখন জানা যাচ্ছে, অপারেশনের পর থেকেই বিন লাদেনের শিশুপুত্র নিখোঁজ। কেউ কেউ এতে ধারণা করছেন, অভিযানে শিশু হত্যার ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে। প্রথমে বলা হয়েছিল, বিন লাদেন সশস্ত্র ছিলেন। প্রতিরোধ করতে গিয়েই তিনি মারা পড়েছেন। পরে বলা হলো, বিন লাদেন নিরস্ত্র অবস্থায় ছিলেন। নিরস্ত্র অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। আরও পরে বলা হয়, বিন লাদেন গ্রেফতার হয়েছিলেন কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন ভেবে তাকে গুলি করা হয়। বিন লাদেনের মেয়ে পরে জানায়, তার বাবাকে গ্রেফতারকৃত অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। অভিযানে বাড়ির ২২ জন বাসিন্দার ৫ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়েছে। বাকিদের পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করে।

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ওবামা ও তার সহযোগীদের সেই বিখ্যাত ছবি

এবোটাবাদে 'অপারেশন জেরোনিমো' নামে যে অভিযান চলে তাতে বারাক ওবামা স্বাক্ষর করেছিলেন ২৯ এপ্রিল সকালবেলা। এতে বিন লাদেনকে হত্যার অধিকার সৈন্যদের দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তিনি নগ্ন না থাকলে তাকে হত্যা করতে। তবে গ্রেফতারের বিকল্পও ছিল। অভিযানের অনুমোদন থেকে বাস্তবায়নের শেষ সময় পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার সহযোগীরা মুখ খোলেননি। স্বাভাবিক কাজকর্ম করে গেছেন। ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও জানানো হয়নি। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষও কিছু জানত না। পাকিস্তানের কেউ অপারেশনে বাধা দিতে পারে বা অপারেশনকে ব্যর্থ করে দিতে পারে এই আশঙ্কায় তাদের জানানো হয়নি। পাকিস্তানে যখন ৪০ মিনিটের অভিযান চলে তখন ওবামা কী করছিলেন, এমন প্রশ্ন সাধারণত ওঠার কথা না। কিন্তু প্রশ্নটিকে উস্কে দেয় হোয়াইট হাউস। মৃতের ছবি প্রকাশ না করে হত্যাকাণ্ডের পরদিন হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সিচুয়েশন রুমের একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ক্লাসিফায়েড হিসেবে চিহ্নিত ছবিটি নানামুখী জল্পনার জন্ম দেয়। ছবির বিবরণে বলা হয়, হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগীরা অপারেশনের আপডেট জানছেন। কিন্তু ছবিতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মুখভঙ্গিতে মনে হয়, তারা সকলে মিলে উৎকণ্ঠিতভাবে কিছু দেখছেন। মূলধারার মিডিয়াগুলো ছবিটিকে ব্যাখ্যা করে বাড়তি খবর তৈরি না করলেও ছবির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে প্রেসিডেন্ট যে লাইভ লাদেন হত্যাকাণ্ড দেখছিলেন সে খবর কিছু মিডিয়া প্রচার করে। সিআইএ প্রধান লেওন পেনেট্টাকে উদ্ধৃত করে কিছু বিবরণও তারা যোগ করে। কীভাবে সৈন্যদের হেলমেটে থাকা ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও হেলিকপ্টারের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে গ্রহণ করে উপগ্রহের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে সম্প্রচারিত হতে পারে তার একটি কাল্পনিক চিত্রও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সিআইএ জানায়, সিচুয়েশন রুমে প্রেসিডেন্টকে সিআইএ সদর দফতর থেকে আপডেট জানানো হচ্ছিল। পরে আরও জানানো হয়, সিআইএ সদর দফতর ও অভিযানকালে সৈন্যদের থেকে হোয়াইট হাউস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। লাইভ ভিডিও দূরের কথা, ওসামার বাড়িতে তখন কী ঘটছিল তাও বোঝা যাচ্ছিল না। যতদূর বোঝা যাচ্ছে, সম্ভবত স্টিলথ চপার বিস্ফোরণের পর থেকে লাদেনের লাশ হেলিকপ্টারে তোলা পর্যন্ত হোয়াইট হাউস ও সৈন্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, এ সময় প্রতিটি মিনিট তাদের কাছে একেকটি দিনের সমান মনে হচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামাও একটি টিভি চ্যানেলকে জানিয়েছেন, তারা ওই সময় সৈন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। কিছুই জানতে পারছিলেন না। ওবামার কাছেও এই ৪০ মিনিটকে জীবনের দীর্ঘতম সময় বলে মনে হয়েছে। তবে যদি সত্যই হোয়াইট হাউসে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমেই অপারেশন ঘটে থাকে এবং নিরস্ত্র লাদেনকে গ্রেফতারের পর হত্যা করা হয়ে থাকে তবে আরও বেশ কিছু প্রশ্ন ভবিষ্যতে উঠবে।
মৃত বিন লাদেনের প্রথম ভুল ছবিটি সম্প্রচারের পর হোয়াইট হাউস বলে তারা আসল ছবি প্রকাশ করবে। ছবি প্রকাশ করার একটি সম্ভাব্য দিনক্ষণও অনুমিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সিদ্ধান্তে ঠিক হয়, হোয়াইট হাউস মৃত ওসামার কোনো ছবি প্রকাশ করবে না। কারণ মৃত বিন লাদেনের ছবি ইসলামিক জঙ্গিদের উস্কে দিতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস শেষ পর্যন্ত জীবিত লাদেনের ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে। বলা হয়, নেভি সিলস সদস্যরা ওসামার লাশ ছাড়াও এবোটাবাদের বাড়ি থেকে তার কম্পিউটার হার্ডড্রাইভসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করে। এই আলামতগুলোর মধ্যে ওসামার কিছু ভিডিও চিত্র ছিল। সেগুলোই প্রচার করা হয়। এই ভিডিও চিত্রগুলো নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। কেউ এগুলো দেখে মনে করেছেন ওসামা গৃহবন্দি ছিলেন। কেউবা বলেছেন, ওসামা এই বাড়ি থেকে আল কায়দা পরিচালনা করতেন। কেউবা বলেছেন, এই ভিডিওগুলোর কোনো বক্তব্য নেই। স্রেফ মনের খেয়ালে ওসামা ভিডিওগুলো রেকর্ড করেছিলেন।
এবোটাবাদের বাড়িতে ওসামা কতদিন ছিলেন? ন্যাটো বাহিনীর অভিযানে আফগানিস্তানের পতনের পর নানা স্থানে ঘুরে ওসামা আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে হরিপুর নামে একটি উপজাতীয় গ্রামে বিন লাদেন সপরিবারে আড়াই বছর ছিলেন। পাকিস্তানের ভূমিকম্পের সময় প্রচুর আহত মানুষকে সীমান্ত অঞ্চল থেকে এবোটাবাদে নিয়ে আসা হয়েছিল। সম্ভবত সেই দলের সঙ্গে ওসামাও এবোটাবাদে আসেন। ২০০৫ সালে তিনি এবোটাবাদের বিল্লাল টাউনে এসেছিলেন। তখন থেকে ২০১১'র পহেলা মে পর্যন্ত পশতুন ভাইদের বানানো বাড়িতেই ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, ওসামার কবর যেন চরমপন্থিদের পবিত্র স্থানে পরিণত না হয় তাই লাশ সাগরে ফেলা হয়। কিন্তু এ বাড়িটি ইতিমধ্যে দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীরা শহরটিকে বিন লাদেন সিটি বলে ডাকতে শুরু করেছেন।

দর্শনীয়
লাদেন নিশ্চয়ই সন্ত্রাসবাদী ছিলেন, ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছিলেন। বহু মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিলেন। শান্তির ধর্মকে কলঙ্কিত করেছেন। বিচারে হোক আর বিনাবিচারে হোক একটি মৃত্যুই তার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে যেভাবে একের পর এক মিথ্যা খবর ছড়ানো হয়েছে তাতে অনেক সন্দেহ-সংশয়ই ঘনীভূত হয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য যে হত্যাকাণ্ড তাতে এমন সব বিবরণ কেন ঢুকল আগামী পৃথিবী তার উত্তর দেবে, নাকি একে আমেরিকার তৈরি নতুন বাস্তবতা হিসেবেই মেনে নেবে?