Saturday, June 18, 2011

হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন


হিন্দি ভাষার বিখ্যাত বাক্য 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন'। বাংলায় অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়_ 'আমি আপনার কে হই?' নব্বইয়ের দশকে 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন' নামে একটি সিনেমা নির্মিত হয়েছিল বলিউডে। সুরজ আর বারজাতিয়া পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সালমান খান ও মাধুরী দীক্ষিত। সর্বকালের সেরা ব্যবসাসফল হিন্দি সিনেমাগুলোর একটি হাম আপকে...। শুধু ব্যবসার দিক থেকেই নয়, নামের দিক থেকেও নাকি এ সিনেমা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। পুরো একটি বাক্যে সিনেমার নাম দেওয়ার রীতি চালু বেশ জেঁকে বসে 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন' সিনেমার পর। এর আগে বড়জোর একটি বা দুটি শব্দে সিনেমার নাম দেওয়ার প্রচলন ছিল। অনেকেরই মনে থাকার কথা, সিনেমাটির কাহিনী কী ছিল। ঘটনার সূত্রপাত একটি বিয়েবাড়িতে। মাধুরীর বড় বোনের সঙ্গে সালমানের বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিয়েবাড়ির খুনসুটি মাধুরী ও সালমানের মধ্যে একটি নাটকীয় প্রেমের সূচনা ঘটায় এবং কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে। বাংলাদেশেও অনেক ক্ষেত্রে কনের বোন আর বরের ভাইয়ের সম্পর্ককে রোমান্টিক বলে বিবেচনা করা হয়। এই সম্পর্কটির নাম বেয়াই-বেয়াইন। বাংলা সিনেমায় হরহামেশা বেয়াই-বেয়াইনদের প্রেম ঘটতে দেখা যায়। একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার গানই আছে এ নিয়ে। 'আসসালামুয়ালাইকুম বেয়াই সাব...' গানটি অনেকের শুনে থাকবার কথা। এই গান বা হাম আপকে সিনেমার কথা মনে পড়ার বিশেষ কারণ বৃহস্পতিবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর। আনন্দবাজার খবর দিয়েছে, ফিলিপা শার্লট মিডলটন ও প্রিন্স হ্যারি প্রেমে পড়েছেন বলে খবর রটেছে। প্রিন্স হ্যারি_ ডিউক অব ক্যামব্রিজ প্রিন্স উইলিয়ামের ছোট ভাই। প্রিন্সেস ডায়ানার ছোট ছেলে। আর ফিলিপা যাকে সংক্ষেপে পিপ্পা বলা হয়, তিনি ক্যাথেরিন এলিজাবেথ মিডলটন বা কেট বা ডাচেস অব ক্যামব্রিজের ছোট বোন। কেট ও উইলিয়ামের বিয়ের দিন বিশ্বের কোটি মানুষের চোখের সামনে রীতি অনুসারে পিপ্পা ও হ্যারি যথোচিত গাম্ভীর্য রক্ষা করেছেন বলেই মনে হয়। বাংলা বা হিন্দি সিনেমার মতো বেয়াই-বেয়াইনদের নাচে-গানে তাদের অংশ নিতে দেখা যায়নি। কিন্তু নাচ-গান, রসালাপ না থাকলেও পর্যবেক্ষকরা রীতিমতো আতশ কাচ নিয়ে পিপ্পা আর হ্যারির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা পরস্পরের সঙ্গে খোশগল্প করলেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়েছেন। বিয়ের দিন থেকে পিপ্পা স্টার। ব্রিটেনসহ বিশ্বের পত্রপত্রিকাগুলো পিপ্পাকে বিশেষ ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তাকে নিয়ে নানা গল্প ফেঁদেছে ট্যাবলয়েডগুলো। কবে কার সঙ্গে তার প্রেম ছিল, সে প্রেম আছে না ভেঙেছে, পোশাক কোথায় বানিয়েছেন, স্টাইল কী ইত্যাদি নিয়ে তো কথা চলেছেই। এত সবের মধ্যে প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে পিপ্পাকে জড়িয়ে খবর রটতে রটতেও রটেনি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, দু'জনের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে। একসঙ্গে দু'জনকে ঘুরতে-ফিরতে দেখা যাচ্ছে।
পত্রিকাগুলো রসাল কাহিনী পেয়ে এখন নানামুখী জল্পনা-কল্পনা জুড়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি ব্রিটেনের রাজপরিবারেও একটি 'হাম আপকে হ্যাঁয় কৌন' ঘটতে যাচ্ছে? খবর সত্যি হলে রাশভারি সেই বিয়ের অনুষ্ঠান থেকেই গল্প শুরু হবে। শেষ খবর হলো, পিপ্পার সঙ্গে তার আগের প্রেমিকের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। এখন তিনি 'একা'। আর প্রিন্স হ্যারি আবার আফগানিস্তান যাচ্ছেন। যুদ্ধের ময়দানে আপাচি হেলিকপ্টার চালাবেন। গল্প রুদ্ধশ্বাস ক্লাইমেক্সের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু গল্পের শেষ কোথায় সেটি জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু দিন।

Saturday, May 14, 2011

বিন লাদেন : ক্রমশ বদলে যাওয়া গল্প






"We're an empire now, and when we act, we create our own reality. And while you're studying that reality—judiciously, as you will—we'll act again, creating other new realities, which you can study too, and that's how things will sort out. We're history's actors…and you, all of you, will be left to just study what we do."

Karl Christian Rove, Senior Advisor and Deputy Chief of Staff to former President George W. Bush, on October 17, 2004


জর্জ ডবলিউ বুশের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও ডেপুটি চিফ অব স্টাফ কার্ল রোভ ১৭ অক্টোবর ২০০৪ তারিখে ওপরের উক্তিটি করে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পুরনো সত্য বা বাস্তবতার ধারণা এখন অচল। পৃথিবী এখন নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কার্ল রোভ বলেছিলেন, 'আমরা এখন এমপায়ার/সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে আমরা নিজস্ব সত্য/বাস্তবতা তৈরি করি। আপনারা সেই বাস্তবতাকে যাচাই করেন। আপনারা যাচাই করতে গেলে আমরা আবারও তৎপরতা চালাই, আরও নতুন সত্য/বাস্তবতা তৈরি করি। সেটাও আপনারা যাচাই করতে পারেন। এ প্রক্রিয়াতেই বিষয়গুলো আকার পায়। আমরাই ইতিহাসের কুশীলব। আপনারা_ আপনারা সবাই, আমরা যা করি তার পর্যবেক্ষক মাত্র।'

স্টিলথ চপারের ধ্বংসাবশেষ
কার্ল রোভের এই উক্তিটির কথা নতুন করে অনেকের মনে পড়েছে ২০১১'র মে'র প্রথম সপ্তাহজুড়ে বিন লাদেন হত্যাকাণ্ডের ক্রমপরিবর্তনশীল বিবরণের প্রেক্ষাপটে। পহেলা মে-তে [পাকিস্তান তখন ২ মে, রাত ১টা] পাকিস্তানের রাজধানী থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গ্যারিসন শহর এবোটাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের মোস্ট ওয়ান্টেড টেরোরিস্ট ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের পর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে বিশেষ বাহিনী 'নেভি সিলস'-এর ৭৯ সৈন্যের একটি দল [Navy SEALs- Navy Sea, Air and Land, সাগর, আকাশ ও ভূমিতে সমান পারদর্শী সেনাদল] প্রথমে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে গিয়েছিল। পাকিস্তানের গাজি এয়ারবেস থেকে ৪টি হেলিকপ্টারে [প্রথমে বলা হয়েছিল দুটি বা তিনটি] করে উপস্থিত হয়েছিল ওসামা বিন লাদেনের বাড়িতে। প্রথমে বলা হয়েছিল হেলিকপ্টারগুলো ছিল এমএইচ-সিক্সটি। পরে ঘটনাস্থলে একটি হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ থেকে জানা যায়, এই বিশেষ মিশনে স্টিলথ চপার নামে বিশেষ হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। সম্ভবত বিশেষভাবে নির্মিত এই হেলিকপ্টারের কারণেই পাকিস্তানের রাডারকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে এই হেলিকপ্টার কোনো মিশনে ব্যবহৃত হয়নি এবং প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টারটি ব্যবহার করতে গিয়ে একটি বিপর্যয় ঘটে। স্থানীয় উচ্চতাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে একটি স্টিলথ চপারে আগুন ধরে যায়।
নেভি সিলস সদস্যরা ৪০ মিনিটের অভিযানে বিন লাদেনসহ ৫ জনকে হত্যা করে। বিন লাদেন ছাড়া অন্য মৃতদেহগুলো তারা এবোটাবাদের বাড়িতেই রেখে আসে। জানা যায়, মুসলিম রীতি মেনে জানাজা পড়ে বিন লাদেনের লাশ আরব সাগরে সমাহিত করা হয়। অভিযান শেষ হলে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হোয়াইট হাউসে সকণ্ঠে বিন লাদেনের মৃত্যুর প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারে হামলাসহ ন্যক্কারজনক সব সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিটিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার করা হলো। প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা পুরো বিশ্বকে নড়েচড়ে বসিয়ে দেয়। অভিযান চলেছিল যুক্তরাষ্ট্র সময় দুপুরে। প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দেন রাতে এবং রাতেই মার্কিন নাগরিকরা বেরিয়ে পড়ে উৎসব করতে। মূলত হোয়াইট হাউসের সামনে ও গ্রাউন্ড জিরোতে সমবেত হয়ে তারা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ড উদযাপন করতে থাকে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমে বিন লাদেন হত্যার খবরটি নিয়ে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। অভিযানের ৪০ মিনিটে কী ঘটেছিল তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। হোয়াইট হাউস ও মিডিয়ার প্রযোজনায় শুরু হয় একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প রচনার প্রতিযোগিতা। ক্রমশ বদলে বদলে যেতে থাকে বিবরণ।

লাদেনের মিলিয়ন ডলার (?) মূল্যের বাড়ি
প্রথমে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের এবোটাবাদে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও উচ্চবিত্তের মানুষদের জন্য নির্মিত অভিজাত আবাসিক এলাকায় মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি আলিশান বাড়িতে থাকতেন। মিডিয়া এখনও বাড়িটিতে বিন লাদেন কম্পাউন্ড বলছে। পরে জানা গেল, বাড়ির দাম মোটেও মিলিয়ন ডলার নয়। তবে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল। দুই স্তরের দেয়ালের মধ্যে কাঁটাতার ঘেরা তিনতলা বাড়িটি বিন লাদেনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এ বাড়িতে কোনো এসি ছিল না, টেলিফোন সংযোগ বা ইন্টারনেট ছিল না। উপরন্তু বাড়িটি মোটেও অভিজাত এলাকায় নয়। এবোটাবাদ অভিজাত শহর, কাকুল মিলিটারি একাডেমীসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাও এ শহরে আছে। কিন্তু বিন লাদেনের বাড়ি শহরতলির প্রান্তে ক্ষেতখামারের মধ্যে ও নোংরা রাস্তার ধারে অবস্থিত। বাড়িটি আশপাশের বাড়িগুলোর থেকে বড়, অনেক জায়গা নিয়ে তৈরি হলেও এমন বাড়ি এবোটাবাদে অনেক আছে। হিমালয়ের পাদদেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নির্জনতায় বিন লাদেনের বার্তাবাহক বলে কথিত দুই পশতুন কাজিন এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানেরও জিও টিভি ও যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিহতের একটি ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হোয়াইট হাউস বলে, ছবিটি আসল নয়। এমনকি এনবিসিকে ছবি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। জানা যায়, ফটোশপের মাধ্যমে মৃত লাদেনের মাধ্যমে ছবিটি তৈরি করা হয়েছিল। জিও টিভিতে স্থানীয়ভাবে অ্যামেচার ক্যামেরায় তোলা একটি ভিডিও চিত্র সম্প্রচারিত হয়। তাতে বিন লাদেনের বাড়ির আশপাশে প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাতের ছবি দেখা যায়। এতে অনেকে ধারণা করেন, আল কায়দা নেতাকে হত্যা করতে গিয়ে মার্কিনিরা প্রচণ্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। উভয় পক্ষে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু পরে জানা যায়, মার্কিন হেলিকপ্টার স্টিলথ চপার বিস্ফোরণের কারণেই মূল অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। ভবনের গেট বা দেয়াল ধসানোর জন্যও সৈন্যরা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। হেলিকপ্টারের অপারেশন বলে মিডিয়া প্রথমে ধারণা করেছিল, হেলিকপ্টার বিন লাদেনের বাড়ির ছাদে অবতরণ করেছিল এবং ছাদে নামতে গিয়েই প্রতিপক্ষের গুলিতে একটি হেলিকপ্টার খোয়া যায়। কিন্তু পরে জানা যায়, বিন লাদেনের বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় সৈন্যরা নেমেছিল। তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে বিন লাদেনের কক্ষে ঢুকেছিল।
হোয়াইট হাউস প্রথমে বলেছিল, বিন লাদেন ও তার সহযোগীরা সশস্ত্র ছিলেন। তারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি বিন লাদেন একজন নারীকে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করে বাঁচতে চেষ্টা করেছেন। পরে বলা হয়, যে লোকটি একজন নারীকে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন তিনি বিন লাদেন নন, তার একজন সহযোগী। পরে এই ঘটনাকে আরও পরিবর্তিত করে বলা হয়, আসলে লাদেনের বাড়িতে সৈন্যরা কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। একজন সহযোগী বাদে সবাই নিরস্ত্র ছিলেন সেখানে। মানববর্ম হিসেবে নারীকে ব্যবহারের কথা সম্ভবত নারী হত্যার দায় ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। এখন জানা যাচ্ছে, অপারেশনের পর থেকেই বিন লাদেনের শিশুপুত্র নিখোঁজ। কেউ কেউ এতে ধারণা করছেন, অভিযানে শিশু হত্যার ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে। প্রথমে বলা হয়েছিল, বিন লাদেন সশস্ত্র ছিলেন। প্রতিরোধ করতে গিয়েই তিনি মারা পড়েছেন। পরে বলা হলো, বিন লাদেন নিরস্ত্র অবস্থায় ছিলেন। নিরস্ত্র অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। আরও পরে বলা হয়, বিন লাদেন গ্রেফতার হয়েছিলেন কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন ভেবে তাকে গুলি করা হয়। বিন লাদেনের মেয়ে পরে জানায়, তার বাবাকে গ্রেফতারকৃত অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। অভিযানে বাড়ির ২২ জন বাসিন্দার ৫ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়েছে। বাকিদের পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করে।

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ওবামা ও তার সহযোগীদের সেই বিখ্যাত ছবি

এবোটাবাদে 'অপারেশন জেরোনিমো' নামে যে অভিযান চলে তাতে বারাক ওবামা স্বাক্ষর করেছিলেন ২৯ এপ্রিল সকালবেলা। এতে বিন লাদেনকে হত্যার অধিকার সৈন্যদের দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তিনি নগ্ন না থাকলে তাকে হত্যা করতে। তবে গ্রেফতারের বিকল্পও ছিল। অভিযানের অনুমোদন থেকে বাস্তবায়নের শেষ সময় পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার সহযোগীরা মুখ খোলেননি। স্বাভাবিক কাজকর্ম করে গেছেন। ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও জানানো হয়নি। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষও কিছু জানত না। পাকিস্তানের কেউ অপারেশনে বাধা দিতে পারে বা অপারেশনকে ব্যর্থ করে দিতে পারে এই আশঙ্কায় তাদের জানানো হয়নি। পাকিস্তানে যখন ৪০ মিনিটের অভিযান চলে তখন ওবামা কী করছিলেন, এমন প্রশ্ন সাধারণত ওঠার কথা না। কিন্তু প্রশ্নটিকে উস্কে দেয় হোয়াইট হাউস। মৃতের ছবি প্রকাশ না করে হত্যাকাণ্ডের পরদিন হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সিচুয়েশন রুমের একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ক্লাসিফায়েড হিসেবে চিহ্নিত ছবিটি নানামুখী জল্পনার জন্ম দেয়। ছবির বিবরণে বলা হয়, হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগীরা অপারেশনের আপডেট জানছেন। কিন্তু ছবিতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মুখভঙ্গিতে মনে হয়, তারা সকলে মিলে উৎকণ্ঠিতভাবে কিছু দেখছেন। মূলধারার মিডিয়াগুলো ছবিটিকে ব্যাখ্যা করে বাড়তি খবর তৈরি না করলেও ছবির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে প্রেসিডেন্ট যে লাইভ লাদেন হত্যাকাণ্ড দেখছিলেন সে খবর কিছু মিডিয়া প্রচার করে। সিআইএ প্রধান লেওন পেনেট্টাকে উদ্ধৃত করে কিছু বিবরণও তারা যোগ করে। কীভাবে সৈন্যদের হেলমেটে থাকা ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও হেলিকপ্টারের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে গ্রহণ করে উপগ্রহের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে সম্প্রচারিত হতে পারে তার একটি কাল্পনিক চিত্রও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সিআইএ জানায়, সিচুয়েশন রুমে প্রেসিডেন্টকে সিআইএ সদর দফতর থেকে আপডেট জানানো হচ্ছিল। পরে আরও জানানো হয়, সিআইএ সদর দফতর ও অভিযানকালে সৈন্যদের থেকে হোয়াইট হাউস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। লাইভ ভিডিও দূরের কথা, ওসামার বাড়িতে তখন কী ঘটছিল তাও বোঝা যাচ্ছিল না। যতদূর বোঝা যাচ্ছে, সম্ভবত স্টিলথ চপার বিস্ফোরণের পর থেকে লাদেনের লাশ হেলিকপ্টারে তোলা পর্যন্ত হোয়াইট হাউস ও সৈন্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, এ সময় প্রতিটি মিনিট তাদের কাছে একেকটি দিনের সমান মনে হচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামাও একটি টিভি চ্যানেলকে জানিয়েছেন, তারা ওই সময় সৈন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। কিছুই জানতে পারছিলেন না। ওবামার কাছেও এই ৪০ মিনিটকে জীবনের দীর্ঘতম সময় বলে মনে হয়েছে। তবে যদি সত্যই হোয়াইট হাউসে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমেই অপারেশন ঘটে থাকে এবং নিরস্ত্র লাদেনকে গ্রেফতারের পর হত্যা করা হয়ে থাকে তবে আরও বেশ কিছু প্রশ্ন ভবিষ্যতে উঠবে।
মৃত বিন লাদেনের প্রথম ভুল ছবিটি সম্প্রচারের পর হোয়াইট হাউস বলে তারা আসল ছবি প্রকাশ করবে। ছবি প্রকাশ করার একটি সম্ভাব্য দিনক্ষণও অনুমিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সিদ্ধান্তে ঠিক হয়, হোয়াইট হাউস মৃত ওসামার কোনো ছবি প্রকাশ করবে না। কারণ মৃত বিন লাদেনের ছবি ইসলামিক জঙ্গিদের উস্কে দিতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস শেষ পর্যন্ত জীবিত লাদেনের ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে। বলা হয়, নেভি সিলস সদস্যরা ওসামার লাশ ছাড়াও এবোটাবাদের বাড়ি থেকে তার কম্পিউটার হার্ডড্রাইভসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করে। এই আলামতগুলোর মধ্যে ওসামার কিছু ভিডিও চিত্র ছিল। সেগুলোই প্রচার করা হয়। এই ভিডিও চিত্রগুলো নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। কেউ এগুলো দেখে মনে করেছেন ওসামা গৃহবন্দি ছিলেন। কেউবা বলেছেন, ওসামা এই বাড়ি থেকে আল কায়দা পরিচালনা করতেন। কেউবা বলেছেন, এই ভিডিওগুলোর কোনো বক্তব্য নেই। স্রেফ মনের খেয়ালে ওসামা ভিডিওগুলো রেকর্ড করেছিলেন।
এবোটাবাদের বাড়িতে ওসামা কতদিন ছিলেন? ন্যাটো বাহিনীর অভিযানে আফগানিস্তানের পতনের পর নানা স্থানে ঘুরে ওসামা আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে হরিপুর নামে একটি উপজাতীয় গ্রামে বিন লাদেন সপরিবারে আড়াই বছর ছিলেন। পাকিস্তানের ভূমিকম্পের সময় প্রচুর আহত মানুষকে সীমান্ত অঞ্চল থেকে এবোটাবাদে নিয়ে আসা হয়েছিল। সম্ভবত সেই দলের সঙ্গে ওসামাও এবোটাবাদে আসেন। ২০০৫ সালে তিনি এবোটাবাদের বিল্লাল টাউনে এসেছিলেন। তখন থেকে ২০১১'র পহেলা মে পর্যন্ত পশতুন ভাইদের বানানো বাড়িতেই ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, ওসামার কবর যেন চরমপন্থিদের পবিত্র স্থানে পরিণত না হয় তাই লাশ সাগরে ফেলা হয়। কিন্তু এ বাড়িটি ইতিমধ্যে দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীরা শহরটিকে বিন লাদেন সিটি বলে ডাকতে শুরু করেছেন।

দর্শনীয়
লাদেন নিশ্চয়ই সন্ত্রাসবাদী ছিলেন, ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছিলেন। বহু মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিলেন। শান্তির ধর্মকে কলঙ্কিত করেছেন। বিচারে হোক আর বিনাবিচারে হোক একটি মৃত্যুই তার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে যেভাবে একের পর এক মিথ্যা খবর ছড়ানো হয়েছে তাতে অনেক সন্দেহ-সংশয়ই ঘনীভূত হয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য যে হত্যাকাণ্ড তাতে এমন সব বিবরণ কেন ঢুকল আগামী পৃথিবী তার উত্তর দেবে, নাকি একে আমেরিকার তৈরি নতুন বাস্তবতা হিসেবেই মেনে নেবে?

Tuesday, May 10, 2011

অসহনীয়!


রাধাচূড়া ও কৃষ্ণচূড়া। ছবি : নিয়াজ আহমেদ
টিএস এলিয়ট ওয়েস্টল্যান্ড কবিতায় লিখেছিলেন, 'এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ...' অর্থাৎ নিষ্ঠুরতম মাস এপ্রিল। পাশ্চাত্যে কতটা নিষ্ঠুর ছিল এপ্রিল এলিয়টের কালে তা নিশ্চয়ই আবহাওয়াবিশারদদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে এপ্রিল উষ্ণতম তা নির্ভাবনায় বলে দেওয়া যায়। শুধু এপ্রিল কেন, মে-ও কম উষ্ণ নয়। বাংলা মাসের হিসেবে বৈশাখ। বৈশাখ রুদ্র। কালবৈশাখীর জন্যই হয়তো বৈশাখের রুদ্রতা বিশেষ প্রচার পেয়েছে। কিন্তু অসহনীয় গরমের জন্যও কি বৈশাখের প্রচার হয়েছে? জীবনানন্দ দাশ কবিতার মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, একদিন এই পৃথিবীর রোদ ছিল আরও লাল। অতীতের কোনো পৃথিবীতে হয়তো রোদের রঙ লালই ছিল। এখন রোদের রঙ খানিকটা ফিকে হয়ে গেছে। রোদ লালিমা হারিয়েছে বটে কিন্তু বেড়েছে তার তীব্রতা, আঘাতের শক্তি। রোদের রশ্মিতে যুক্ত হয়েছে জানা-অজানা সব অতিবেগুনি উপাদান। রোদের রঙ বদলেছে, রূপ বদলেছে। আর পৃথিবীর উষ্ণায়নের সঙ্গে বেড়েছে গরম। বৈশাখে একটা স্বাভাবিক গরম বহু প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গদেশে পড়ে। শুধু বৈশাখ নয়, জ্যৈষ্ঠ এমনকি ভাদ্র মাসের গরমও বেশ বিখ্যাত। আর এ দেশের গরমের নিত্যসঙ্গী আর্দ্রতা। রোদের নিচে দাঁড়ালেই ঘেমে-নেয়ে ওঠে মানুষ। দেশে এখন রুদ্র বৈশাখের দাবদাহ চলছে। গরম অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গরম বাড়লে শহরে আবশ্যিকভাবে দুটো দুর্বিপাক এসে হাজির হয়। আর্দ্রতা ও উষ্ণতার চেয়ে কম কিছু নয় তারা। প্রথমজন লোডশেডিং, দ্বিতীয়জন ট্রাফিক জ্যাম। গরমে এসি বেশি চলে, ফ্যান বেশি ঘোরে, বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যায়। চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহের বিদ্যুতে লোডশেডিংয়ের একটা যুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু ট্রাফিক জ্যাম? গরম বাড়লে কেন ট্রাফিক জ্যাম বাড়ে তা জানতে নিশ্চয়ই নগরবিশারদদের দ্বারস্থ হতে হবে। উষ্ণতা, আর্দ্রতা, লোডশেডিং, জ্যামের বাইরে গ্রীষ্মের আরেক রূপ আছে। শহরে, গ্রামে প্রচুর ফুল ফোটে। বিশেষ করে কৃষ্ণচূড়া। কৃষ্ণচূড়া ফোটার জন্য ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা লাগে। আর সে তাপমাত্রা বৈশাখে মিলে যায়। বাগানে লালের আগুন লেগে যায়। শহরের রাস্তায় কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি মোহময় এক আবহ তৈরি করে। শুধু কৃষ্ণচূড়া নয়, কনকচূড়া, জারুল, রাধাচূড়া, অলকানন্দা ফুল ফোটে এ সময়। তবে কৃষ্ণচূড়ার আধিপত্যই সর্বত্র বিস্তৃত। শহর সাজানোর জন্য কৃষ্ণচূড়ার বেশ কদর আছে কর্তাদের কাছে। বলা হয়ে থাকে, গাছটি নাকি টিকেই আছে নগর পরিকল্পনাকারীদের আতিথ্যে। এমনিতে বন্য অবস্থায় একে পাওয়া যায় না। কিন্তু শহর সাজাতে কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া, জারুল পরপর লাগানোর একটা রীতি নাগরিকরা রপ্ত করেছেন। কৃষ্ণচূড়া নামটি সহজবোধ্য। হিন্দিতে এ ফুলের নাম গুলমোহর। মানে ময়ূর ফুল। ময়ূরের পেখমের সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করতেই এ নাম। ভিয়েতনামে এর নাম ফুঙ ভি। মানে রূপকথার পাখি ফিনিক্সের লেজ। হিন্দি ভাষায় হলুদ কৃষ্ণচূড়াকেও বলা হয় গুলমোহর। আমাদের দেশে এ ফুলের নাম রাধাচূড়া। আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনের পার্শ্ববর্তী রাস্তায় কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া অনেকটা পরপর লাগানো। গরমের দিনে লোডশেডিং আর জ্যাম পেরিয়ে ঘামতে ঘামতে কেউ যদি সহসা এসব রাস্তায় পেঁৗছান তবে তার কাছে ফুলের সৌন্দর্য কি বার্তা বয়ে আনবে? তিনি কি বলবেন, সুন্দর। নাকি নিজের অজান্তেই গাছে ফোটা ফুলের অপূর্ব রূপ দেখে এই সৌন্দর্যকেও বলে বসবেন অসহনীয়?

Monday, May 9, 2011

রবীন্দ্র-পুরস্কার


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে বহুবর্ণিল আয়োজনে মেতেছে বাংলাদেশ। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে আয়োজন চলছে। চলবে আরও কিছুকাল। অনুরাগীরা বলছেন, আয়োজন যেন সার্ধশতবর্ষ পালনেই থেমে না থাকে। রবীন্দ্রনাথকে অনুধাবনের চেষ্টাটা যেন অনুষ্ঠান-আয়োজনের বাইরেও চলতে থাকে। বস্তুত, এই প্রত্যাশার মধ্যে ইতিবাচক দিক যেমন আছে তেমনি এর অন্তর্গত মৃদু পরিহাসও লক্ষ্য করার মতো। আমাদের গুণীরা বলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের সর্বত্র। প্রশ্ন করেন রবীন্দ্রনাথ কোথায় নেই? সাহিত্যে, শিক্ষায়, জীবনে, রাজনীতিতে, সমাজে সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা আমাদের পাথেয়। কিন্তু কেতাবের কথা বাদ দিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, রবীন্দ্রনাথ আসলে আমাদের জীবনে, জীবনাচারে, রাজনীতিতে, সমাজে কোথায় আছেন? তবে অনেকেরই মাথায় হাত পড়বে। অনেকেই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও আদর্শ খুঁজতে রীতিমতো গবেষণা শুরু করবেন।
বস্তুত, আমাদের জীবনের বহিরঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আছেন বটে; কিন্তু অন্তরে রবীন্দ্রনাথ বোধহয় অনুপস্থিত। তার সাহিত্য অনুধাবনের চেষ্টা কতটা আমাদের পাঠকদের মধ্যে আছে, সে প্রশ্ন তুলে রেখে যদি এ প্রশ্ন করা যায়, তার মতো সাহিত্য সাধনা, পরিশ্রম, নিষ্ঠা কি আজকাল কোনো সাহিত্যিকের মধ্যে দেখা যায়? সাহিত্যিক হিসেবে তিনি অনন্য প্রতিভা নিশ্চয়ই কিন্তু কর্মোদ্যোগী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের যে শিক্ষা, সামাজিক উদ্যোগ তেমন উদ্যোগও কি আছে আমাদের সমাজে? রবীন্দ্রনাথকে, তার শুভ কাজকে অনুসরণের চেষ্টা যদি না থাকে, তাকে স্মরণ করে এত এত উৎসবের কী প্রয়োজন? কেউ বলবেন, উৎসবের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার নাম, গান, বাণীকে কিছুটা হলেও সঞ্চারিত করতে পারে এ উৎসবগুলো। সে নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু কতটুকু পারে? উৎসব শেষে প্যান্ডেল পড়ে থাকে, শামিয়ানার নিচে প্রচুর আবর্জনাও জমে। বক্তৃতা শেষ হলে তার অনুরণন রয়ে যায়। চারপাশে যত আয়োজন তার অধিকাংশই তো এভাবেই ফুরাবে। হয়তো কিছু বই, কিছু প্রকাশনা থাকবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রচনার চেয়ে শ্রেয়তর তো নয় সেসব। তবে? রবীন্দ্রনাথের রচনাকে মানুষের কাছে পেঁৗছানোর কোনো আয়োজন কিন্তু এবার এত ডামাডোলের মধ্যেও চোখে পড়ল না। রচনার কথা বাদ, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের বাইরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখার মতো কিছু কি হলো? রবীন্দ্রনাথের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই বাংলাদেশে। কোনো একাডেমী, ইনস্টিটিউট নেই, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এক বছরে কিছু গড়ে উঠল না। গড়ার উদ্যোগও এলো না। অন্যদিকে ভারতের দিকে তাকান। অনুষ্ঠান আয়োজনে ভারত আমাদের সঙ্গী। কলকাতা-দিলি্লতে নানা আয়োজন চলছে আমাদের মতোই। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও কাজের উত্তরাধিকার ভারতীয়রাও গভীরভাবে বহন করে। ইতিমধ্যে সরকারি উদ্যোগে রবীন্দ্র-রচনাবলি অনলাইনে প্রকাশ করে ভারত আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে। এবার রবীন্দ্রনাথের ২০০০ ছবি অনলাইনে প্রকাশ করা হলো। রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীকে নতুনভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলো ৯৫ কোটি রুপি। ঘোষণা এসেছে শান্তিনিকেতনসহ রবীন্দ্রস্মৃতিগুলো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সংরক্ষণেরও। আর আগামী বছর থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য এক ব্যক্তিকে রবীন্দ্র-পুরস্কারে ভূষিত করা হবে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বদৃষ্টিকে আবারও সবার সামনে তুলে ধরার এমন আয়োজন নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। দেশে যেমন, দেশের বাইরেও তেমন পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষায় ভারতীয়রা বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। দলমতের বাইরে এসে দেশের ভেতরে গুণীজনদের পুরস্কৃত করার একটি শক্তিশালী ধারা তারা গড়ে তুলেছে। তাদের আয়োজনে রবীন্দ্র-পুরস্কার নিশ্চয়ই বিশেষ মর্যাদা পাবে। কীভাবে গুণীদের পুরস্কৃত করতে হয় তা নিশ্চয় আমরা তাদের কাছে শিখতে পারি। একই সঙ্গে আরও একটি বিষয় শিখে নিতে হবে। সাময়িক আয়োজনে, তাৎক্ষণিক আবেগে না ভেসে কীভাবে একটি স্মরণ আয়োজনকে দীর্ঘস্থায়ী মাত্রা দেওয়া যায়, সে শিক্ষাও ভারতীয়দের কাছ থেকেই নিতে হবে।

Saturday, April 30, 2011

অ-মৌসুমি বইমেলা

আমাদের বইমেলার মৌসুম ফেব্রুয়ারি, বাংলা মাসের হিসাবে মাঘ-ফাল্গুন। ফেব্রুয়ারির অমর একুশে বইমেলা নিয়ে আমাদের গর্ব অনেক। সময়ে, স্থানে ও গুরুত্বে একুশে বইমেলার সঙ্গে তুলনীয় কোনো বইমেলার কথা ভাবা যায় না। এককালে একুশে বইমেলাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য ঢাকা বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল ফেব্রুয়ারির মেলার ঠিক আগে ডিসেম্বরে। প্রথম প্রথম অনেকে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ভেবেছিলেন, একুশে বইমেলা গুরুত্ব হারাবে। আন্তর্জাতিক একটি মেলা হিসেবে ঢাকা বইমেলার পরিকল্পনা হয়েছিল। সাজানো হয়েছিল জাঁকজমক আয়োজনে। কিন্তু পাঠকের সাড়া তেমন মেলেনি। পাঠকের সাড়া মেলেনি বলে, লেখক-প্রকাশকের সাড়াও মেলেনি। এমনকি দেশের বাইরের প্রকাশকরা পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখাননি। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশের বাংলা বইয়ের প্রকাশকরা পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখাননি। ঢাকা বইমেলা এখন নিবুনিবু। একুশে বইমেলাই বইয়ের মূলধারা হিসেবে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সমস্যা হলো, মেলার সঙ্গে বই লেখা, বই প্রকাশ, বিপণন এমনকি বই কেনা পর্যন্ত সব কার্যক্রম যেন ফেব্রুয়ারির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। বইয়ের এই ফেব্রুয়ারিনির্ভরতা নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সারা বছরে যদি এক মাসেই পাঠকের বইয়ের কথা মনে হয়, তবে তো প্রতিদিনের বা নিদেনপক্ষে নিয়মিত পাঠাভ্যাসটুকু গড়ে উঠবে না। সবচেয়ে বড় কথা, প্রকাশনা শিল্প মৌসুমি ভিত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। সারা বছরের বিপণন চালু হবে না। এমন একটি পরিস্থিতিতে অনেকেই ভাবছেন সারা বছর নানা উপায়ে বই নিয়ে পাঠকের দোরগোড়ায় হাজির থাকার কথা। কাজটি কিন্তু সহজ নয়, কেননা দেশব্যাপী বইয়ের দোকান নেই, যে দোকান আছে সেখানে মানসম্মত বই বিপণনের তেমন ব্যবস্থা নেই। দেশের প্রেক্ষাপট অনেক বড়, খোদ রাজধানী শহরে এমন দোকান উঠে যেতে বসেছে যেখানে গেলে প্রত্যাশিত বইটি কিনতে পাওয়া যাবে। এখনও যে ক'টি দোকান আছে আজিজ মার্কেটে, নিউ মার্কেটে তা কতদিন থাকবে সে এক বড় প্রশ্ন। সারা বছর বই বিপণনের এই বেহাল পরিস্থিতি থেকে মনে হয়, আমরা ক্রমশ পাঠাভ্যাসবঞ্চিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে চলেছি। আমাদের বিপণি কেন্দ্রগুলোতে এমনকি আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রেও বই বিক্রির ব্যবস্থা নেই। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের পরও, জীবনধারার পরিবর্তন সত্ত্বেও পৃথিবীর অনেক জাতি বইয়ের সঙ্গ ছাড়েনি। আমরা মনে করি, এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের বইয়ের জন্য কিছু জায়গা তৈরি করা উচিত। ঢাকার প্রকাশকদের মধ্যে অনেকে, বিশেষত তরুণরা এখন বই বিপণনের উপায় নিয়ে ভাবছেন। তারা ফেব্রুয়ারির বইমেলার বাইরে ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বইমেলার আয়োজন করছেন। বই বিপণনের এই বিকল্প আয়োজনগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। এগুলো যত নিয়মিত হবে পাঠক ততই বছরভর বইয়ের কথা ভাবতে পারবেন। এখন শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্য ও শুদ্ধস্বরের বৈশাখী বইমেলা। অনেক ছাড় দিয়ে বিক্রি হচ্ছে বই। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এবং ঢাকার বাইরে এমন বইমেলার নিয়মিত আয়োজন মানুষের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক বাড়াবে বলে আমাদের আশা।

Saturday, March 26, 2011

নিউ মিডিয়া :: আগের মতো থাকবে না কিছুই


চোখের সামনের পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও বদলটা চোখে পড়ত না। মনে হতো, বদলটা যেন অন্তঃসলীলা ফল্গুধারার মতো। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান আগের মতোই থাকবে। বদলটা হবে ভেতরে ভেতরে। মানুষের মনোজগতে একটা প্রবল বিপ্লব ঘটে যাবে। বাইরে সে বিপ্লবের ছিটেফোঁটাও দেখা যাবে না। কেন এই ধারণা হয়েছিল অনেকের? কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি, সারাদিন ফেসবুকে বসে বন্ধুদের সঙ্গে অকারণে চ্যাট করে যে ছেলেটি বা মেয়েটি, পারলে নাওয়া-খাওয়া সব কম্পিউটারের সামনেই সেরে ফেলে, সে ছেলেটি বসে বসে ফেসবুক বা টুইটারের স্টেটাসে বড় বড় কথা বলবে। বলবে, পৃথিবীটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু কাজের কাজ সে কিছুই করবে না। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে নিজের জন্য একটা ভালো চাকরি ঠিকই সে জোগাড় করে নেবে। কিন্তু এই আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্ম দেশ-জাতি নিয়ে কখনোই চিন্তা করবে না। কিছু ব্যতিক্রম সামনে ছিল। যেমন ১৯৯৯ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ভণ্ডুল করেছিল যারা, তারা সংগঠিত হয়েছিল ইন্টারনেট মাধ্যম ব্যবহার করেই। মেক্সিকোর জাপাতিস্তা আর্মি অব ন্যাশনাল লিবারেশনের উদাহরণও সামনে ছিল। আরও উদাহরণ তৈরি হচ্ছিল একে একে। কিন্তু খানিকটা বুদবুদ দেখিয়ে থেমে যাচ্ছিল সেগুলো। কিন্তু এবার যা ঘটল উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে, তার তুলনা আর কোনো কিছুর সঙ্গেই চলে না। রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণে ছিল সবকিছু। দেশগুলোর গণমাধ্যম কথা বলছিল হরেদরে শাসকেরই সুরে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী, বিদেশি বন্ধু, শাসক শ্রেণী_ সব মিলিয়ে এক দুর্ভেদ্য অচলায়তন গড়ে উঠেছিল। এ অচলায়তন কখনও ভাঙবে, কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারেননি। লৌহবাসরের অন্তরালে চলছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। কখন যে লৌহবাসর ভেদ করে মনসার প্রতিনিধি ঢুকে গিয়েছিল তা কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু যখন বিস্ফোরণ ঘটল তখন সবাই জানল, এই লৌহবাসরও অভেদ্য নয়। আরব বিশ্বের তরুণরা হঠাৎ জেগে উঠল। বলল, কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। সত্যিই পুরনো সবকিছু ভেঙে যেতে থাকল একে একে। অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়ে গেল সপ্তাহের মাথায়। যে ব্যাপারগুলো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, সবাই বলছেন, সেগুলোও শিগগিরই বদলাবে। আল কায়দার মতো সন্ত্রাস সৃষ্টি করে নয়, মতাদর্শের প্রবল শক্তিতে নয়_ আরব বিশ্বে তরুণরা জেগে উঠেছে প্রযুক্তির শক্তিতে। তাদের ভাষায়, আমরা সংগঠিত হয়েছি ফেসবুকের মাধ্যমে, কর্মসূচি জানান দিয়েছি টুইটারের মাধ্যমে, আর বিশ্বকে আমাদের কথা জানিয়েছি ইউটিউবের মাধ্যমে। ইন্টারনেট_ ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এখন সশস্ত্র যুদ্ধের হাতিয়ারের চেয়ে শক্তিশালী তবে? তা-ই তো মনে হচ্ছে।
বস্তুত বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্য সব অঞ্চলের মতো আরব বিশ্বের তরুণরাও পরস্পরকে জানছিল, বুঝছিল। পরস্পরের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছিল। এই বোঝাটা আজকের বাস্তবতায় পেঁৗছাত না যদি তাদের পরস্পরের মধ্যকার বোঝাপড়া বা দেশ-জাতি সম্পর্কে তাদের বোধবুদ্ধি জাগানোর দায়িত্বটা পালন করত ওল্ড মিডিয়া, যাকে আমরা আদর করে গণমাধ্যম বলে থাকি। আদরের নাম গণমাধ্যম হলেও শাসকের, বিনিয়োগকারীর স্বার্থ-ভাষা ও বক্তব্যের বাইরে গণমাধ্যম কিছু বলে না। ফলে নতুন যুগ নিয়ে আসার জন্য যে জরুরি প্রস্তুতি তা পুরনো গণমাধ্যম ও যোগাযোগ মাধ্যমে সম্ভব হতো না, হয়ওনি। কিন্তু নিউ মিডিয়া একেবারেই আলাদা। পুরনো প্রিন্ট মিডিয়া বা অ্যানালগ ইলেকট্রনিক মিডিয়াও কাজ করে এক থেকে বহুতে। তৈরি সংবাদ, ভাষ্য ও বিশ্লেষণ এক থেকে বহুতে যায়। একটি কোম্পানি সংবাদ তৈরি করে তার কর্মীদের মাধ্যমে, সে সংবাদ যখন পাঠক গ্রহণ করে তখন তারা একক ভোক্তা। এ থেকে বিচ্ছিন্ন বহুতে সংবাদ সঞ্চারিত হয়। কিন্তু নতুন মাধ্যমগুলো একেবারেই আলাদা। একটি সংবাদ এক থেকে বহুতে যায়, আবার বহু থেকে বহুতে যায়। একটি সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মত ছড়াতে থাকে। ব্লগে, ফেসবুকে, টুইটারে সংবাদের বিশ্লেষণ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোনো বড় পত্রিকার সংবাদও ইন্টারনেট মাধ্যমে এসে তার দুর্বলতা, চালাকি ও রাজনীতির তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে। পাঠক-দর্শক-শ্রোতারা সমস্বরে এর প্রতিক্রিয়া জানাতে জানাতে এর একটা রূপান্তর ঘটান। আবার ব্লগ-ফেসবুক-ইউটিউব ব্যবহার করে যে কেউ সাংবাদিক-বিশ্লেষক হয়ে যেতে পারেন। লিখে, ছবি তুলে, রেকর্ড করে সেটি ছড়িয়ে দিতে পারেন। সংবাদ তৈরি করতে পারেন। সবার হাতে যখন সংবাদ বা ভাষ্য নির্মাণের ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটিকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল ডেমেক্রেসি। এ গণতন্ত্র শুধু তথ্যমাধ্যমের নয়, গণতন্ত্র সর্বত্র। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র নেই, কিন্তু রাষ্ট্রে তো ইন্টারনেট ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে না। ইন্টারনেট দেশে এলে তরুণরা তা ব্যবহার করবেই। যতই নিষেধাজ্ঞা থাকুক, তারা ঠিকই বের করে নেবে মত প্রকাশ ও যোগাযোগের উপায়। পরস্পরের কথা জানতে পারলে আজ হোক বা কাল রাস্তায় নেমে পড়বেই। আর এত মানুষ যখন রাস্তায় নেমে আসে কোনো ইন্ধন, প্রচারণা ছাড়াই তখন পুরনো যা কিছু তা টিকে থাকবে কী করে?
আরব বিশ্বের পরিবর্তন নিউ মিডিয়া ও নতুন ধারার যোগাযোগের একটা দিক। সামাজিক পরিবর্তনের বাইরেও আছে এর হাজারো মাত্রা।
উন্নত দেশগুলোর পুরনো মিডিয়া বা গণমাধ্যম এখন নিউ মিডিয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দেশগুলোতে ইন্টারনেট সেবা চমৎকার, ইন্টারনেট ব্যবহার করে পড়াশোনা-দেখার প্রযুক্তিও আমাদের থেকে উন্নত। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণে সেখানে সুযোগও অবারিত। ফলে সেখানে নিউ মিডিয়া সব ম্যাজিক ঘটাচ্ছে। একটি বাচ্চা মেয়ের বোকা বোকা লিরিকের গান যখন নামিদামি গায়কের গান টপকে লিস্টে এক নম্বরে উঠে যায়, তখন বড় আর্টিস্টদের স্টারডম থমকে যায়। তেমনি নামি সাংবাদিকের কলামের চেয়ে ব্লগের কলাম যখন জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় এগিয়ে থাকে তখন পত্রিকা থমকে যায়। গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস তাই ব্লগ চালু করে এগিয়ে থাকতে চায়, সিএনএন-বিবিসি ইউটিউবে চ্যানেল খোলে, ফেসবুকে পেজ খোলে। নাগরিক সাংবাদিকতা বা সিটিজেন জার্নালিজমের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়। জাপানে ভূমিকম্প, ইরাকে সংঘর্ষ, লিবিয়ায় হামলা_ সর্বত্র নাগরিক সাংবাদিকতার জয়যাত্রা। ফলে আজকের বাস্তবতা হলো_ দেশে গণতন্ত্র থাকুক বা না থাকুক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকুক বা না থাকুক, মুক্ত ইন্টারনেট থাকলেই নিউ মিডিয়ায় কমবেশি গণতন্ত্র থাকবে। কারফিউ থাকলেও মানুষ কথা বলতে পারবে। এমনকি আচমকা রাস্তায় জড়ো হওয়ার মতো প্রস্তুতিও নিতে পারবে, রক্তচক্ষুর অন্তরালে। ডিজিটাল ডেমোক্রেসির বাইরে নিউ মিডিয়ার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইন্টারঅ্যাকটিভিটি। মত-পাল্টামত-বহুমতের উৎসার এই নিউ মিডিয়া। এর কাছে ছাপা কাগজ ক্রমে কুপোকাত হচ্ছে। আমাদের দেশে এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ছাপা কাগজের সংবাদপত্র এখনও বিকাশমান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এমন কিছু শহর তৈরি হয়েছে যেখানে ছাপা সংবাদপত্র নেই। বড় বড় অনেক কাগজের সার্কুলেশন নেমে গেছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে শুধু অনলাইনেই পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেছে। নিউ মিডিয়ার উত্থানের মাত্র কুড়ি বছরের মাথায় ডাকসাইটে পত্রিকা, ঐতিহ্যবাহী সাংবাদিকতার এমন পতনের কথা কেউ হয়তো ভাবেননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে আরও পরিবর্তন আসছে। একটা জেনারেশন তৈরি হবে, যারা কম্পিউটারে, বইপত্র পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে শুধু। তাদের কাছে ছাপা কাগজের আলাদা গুরুত্ব আর থাকবে না। আমাদের দেশে ছাপা কাগজের কদর এখনও বেশি, কারণ ইন্টারনেট কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ছড়ায়নি, তার গতিও বাড়েনি। কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থা পরিবর্তন হবে। কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। বাংলাদেশের একজন তরুণের জন্য আজ ফেসবুক-ইউটিউব-টুইটার-ব্লগ যে বাস্তবতা, তার সঙ্গে সৌদি আরবের বা যুক্তরাষ্ট্রের তরুণটির বাস্তবতার খুব বেশি পার্থক্য নেই। প্রায় ১০ লাখ অগ্রসর-শিক্ষিত-সচ্ছল তরুণ আজ ফেসবুকের ভোক্তা। একটা নতুন জেনারেশন তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সর্বসাম্প্রতিক চিন্তা-জ্ঞান ও তথ্যের সঙ্গে তাদের সহজ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। এ দেশের বাস্তবতায় তারা পথ চলে, কিন্তু মনোজগতে তারা আরেক বাস্তবতায় বাস করে। কখনো সে বাস্তব এ বাস্তবকে ছাপিয়ে উঠবে না এ নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?
এ দেশে ব্লগ তৈরি হয়েছে, নিত্যনতুন নিউজ মিডিয়া তৈরি হচ্ছে, সংবাদ ও ভাষ্য তৈরি হচ্ছে, মত গড়ে উঠছে। পুরনো মিডিয়ার আভিজাত্য, ব্যবসা, রাজনীতি, বিজ্ঞাপন-বিপণন ব্যবস্থা এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু হবে। তার জন্য প্রস্তুতি কি চলছে?
চলি্লশ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ গণতন্ত্র, মুক্তমত, নাগরিক অধিকারের যেসব স্বপ্ন অর্জনের জন্য অপেক্ষা করছে তার সঙ্গে দেখা হবে শিগগিরই। বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, দুটি শক্তি_ তারুণ্য ও ইন্টারনেট সেটি সম্ভব করে তুলতে পারে। নিউ মিডিয়া সেই সব সম্ভবের উপায়। কিন্তু তাকে কাজে লাগাতে হবে।


লেখক : সাংবাদিক ও কথাশিল্পী

Wednesday, March 2, 2011

আলু


আলুর সঙ্গে সামরিকতা, অভিযান ও দেশ দখলের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। আলু চাষের ইতিহাসে দেখা যায়, এই খাদ্যশস্যটির আদি উৎস আন্দিজ পর্বতমালাসংলগ্ন দেশগুলোতে, বৃহত্তর অর্থে লাতিন আমেরিকায়। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ পেরুর মানুষেরা বন্য আলুকে পোষ মানিয়ে কৃষিজাত শস্যে পরিণত করেছিল। উত্তর-দক্ষিণ, লাতিন নির্বিশেষে বন্য আলুর দেখা পাওয়া যায়। লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় বিশেষ করে স্প্যানিশ শাসনের বিস্তারের মাধ্যমে বিজয়ী স্প্যানিশদের সঙ্গে আলুর পরিচয় ঘটে। ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনে আলুর চাষ হয়। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মাধ্যমে ইউরোপে আলু এলেও পশ্চিমা কৃষকরা আলুকে প্রথমে খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত, আলু চাষ করতে চাইত না। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যশস্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তারা আলু চাষে উৎসাহী হয়। কৃষকদের এই উৎসাহের আগে ইউরোপের নানা স্থানে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় আলু চাষ হতো। স্প্যানিশ সৈন্যদের জন্যই মূলত এই আলু চাষ হতো। পরে এই চাষ ইউরোপের অন্য জাতিগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। ব্রিটেনে ১৯ শতকের শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে আলু চাষের বিস্তার ঘটে। ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস বলেন, শিল্প বিপ্লবে লোহা বা ইস্পাতের যে ভূমিকা, আলুরও সেই ভূমিকা। বিশ্বাস করা হয় যে, আফ্রিকায় ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমেই আলু চাষ বিস্তার লাভ করে। তবে এ ধারণাও আছে, আফ্রিকার সঙ্গে লাতিন আমেরিকার যোগাযোগ থেকেও সেখানে আলু চাষের প্রচলন হতে পারে। ঔপনিবেশিকরা কম দামের খাবার হিসেবে আলুর ওপর জোর দেয় এবং এটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক অজনপ্রিয় খাবার হিসেবে বিবেচিত হতো। ধারণা করা হয়, ঔপনিবেশিকদের হাত ধরে এশিয়াতেও আলু এসেছিল। আঠারো শতকে কুয়ানলঙ শাসনের সময় অভাব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে চীনে আলু চাষ শুরু হয়। তবে ভারতে শস্য হিসেবে আলু চাষ শুরু হয় আঠারো শতকের শেষ দিকে। আফ্রিকায় আলু শস্যের মর্যাদা পায় বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে। আগে সীমিত আকারে চাষ থাকলেও, ব্যাপক আলু চাষের পেছনে যে ঔপনিবেশিকদের হাত ছিল তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। আলু খুব সাদামাটা শস্য বা কন্দ হলেও এর ইতিহাস খুবই জটিল। প্রথমে পরাজিতদের কাছ থেকে এটি বিজয়ীরা রপ্ত করে পরে বিজিতদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল। দুটোর সঙ্গেই সামরিক অভিযান ও সাফল্যের সম্পর্ক জড়িত। মজার ব্যাপার হলো, সামরিক বাহিনীর সাধারণ সভ্যদের খাবার হিসেবে আলুর ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে অতীতে। দুর্ভিক্ষ, অভাব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেও আলুর কদর বেড়েছে। আলু চাষকে নতুন এলাকায় প্রথমে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হলেও পরে চাষে বাধ্য হয়েছে কৃষকরা। বাংলাদেশেও বহুদিন পর্যন্ত আলু চাষে কৃষকরা অনুৎসাহী ছিল। আলুকে খাবার হিসেবে নিম্নমানের বলে বিবেচনা করা হতো। ব্যাপকভাবে আলু চাষ ও আলুর ব্যাপক ব্যবহার অতি সাম্প্রতিক ঘটনা। আমাদের এখানে প্রধান খাদ্যশস্য ধান বা চাল। আলু সাধারণত প্রধান খাবার হিসেবে খাওয়া হয় না। বিভিন্ন তরকারির সঙ্গে সহযোগী আইটেম হিসেবে আলু ব্যবহৃত হয়। তবে খাদ্যশস্যের অভাব দেখা দিলে কিংবা চালের দাম বাড়লে এখানে শাসকরা আলু জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেন। ঐতিহাসিকভাবে আলুর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্কের কারণেই হয়তো বা এদেশের সামরিক ও সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারগুলো আলু জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনে আলু জনপ্রিয় করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সামরিক বাহিনী সমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও আলু নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ এসেছিল। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো আলুকে ততটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাসে যাই ঘটুক, আলু এখন বাস্তবতা। আলু চাষ করে কৃষকরা মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে সেটি ভালো কথা নয়। আলু আগামী দিনের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব কোল্ডস্টোরেজ সিস্টেমের মাধ্যমে। চালের বর্তমান বাজারে আলু খাওয়াকে উৎসাহিতও করা যেতে পারে। কিন্তু সেটি গণতান্ত্রিক পন্থায় হলে ভালো।