Tuesday, May 10, 2011
অসহনীয়!
টিএস এলিয়ট ওয়েস্টল্যান্ড কবিতায় লিখেছিলেন, 'এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ...' অর্থাৎ নিষ্ঠুরতম মাস এপ্রিল। পাশ্চাত্যে কতটা নিষ্ঠুর ছিল এপ্রিল এলিয়টের কালে তা নিশ্চয়ই আবহাওয়াবিশারদদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে এপ্রিল উষ্ণতম তা নির্ভাবনায় বলে দেওয়া যায়। শুধু এপ্রিল কেন, মে-ও কম উষ্ণ নয়। বাংলা মাসের হিসেবে বৈশাখ। বৈশাখ রুদ্র। কালবৈশাখীর জন্যই হয়তো বৈশাখের রুদ্রতা বিশেষ প্রচার পেয়েছে। কিন্তু অসহনীয় গরমের জন্যও কি বৈশাখের প্রচার হয়েছে? জীবনানন্দ দাশ কবিতার মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, একদিন এই পৃথিবীর রোদ ছিল আরও লাল। অতীতের কোনো পৃথিবীতে হয়তো রোদের রঙ লালই ছিল। এখন রোদের রঙ খানিকটা ফিকে হয়ে গেছে। রোদ লালিমা হারিয়েছে বটে কিন্তু বেড়েছে তার তীব্রতা, আঘাতের শক্তি। রোদের রশ্মিতে যুক্ত হয়েছে জানা-অজানা সব অতিবেগুনি উপাদান। রোদের রঙ বদলেছে, রূপ বদলেছে। আর পৃথিবীর উষ্ণায়নের সঙ্গে বেড়েছে গরম। বৈশাখে একটা স্বাভাবিক গরম বহু প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গদেশে পড়ে। শুধু বৈশাখ নয়, জ্যৈষ্ঠ এমনকি ভাদ্র মাসের গরমও বেশ বিখ্যাত। আর এ দেশের গরমের নিত্যসঙ্গী আর্দ্রতা। রোদের নিচে দাঁড়ালেই ঘেমে-নেয়ে ওঠে মানুষ। দেশে এখন রুদ্র বৈশাখের দাবদাহ চলছে। গরম অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গরম বাড়লে শহরে আবশ্যিকভাবে দুটো দুর্বিপাক এসে হাজির হয়। আর্দ্রতা ও উষ্ণতার চেয়ে কম কিছু নয় তারা। প্রথমজন লোডশেডিং, দ্বিতীয়জন ট্রাফিক জ্যাম। গরমে এসি বেশি চলে, ফ্যান বেশি ঘোরে, বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যায়। চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহের বিদ্যুতে লোডশেডিংয়ের একটা যুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু ট্রাফিক জ্যাম? গরম বাড়লে কেন ট্রাফিক জ্যাম বাড়ে তা জানতে নিশ্চয়ই নগরবিশারদদের দ্বারস্থ হতে হবে। উষ্ণতা, আর্দ্রতা, লোডশেডিং, জ্যামের বাইরে গ্রীষ্মের আরেক রূপ আছে। শহরে, গ্রামে প্রচুর ফুল ফোটে। বিশেষ করে কৃষ্ণচূড়া। কৃষ্ণচূড়া ফোটার জন্য ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা লাগে। আর সে তাপমাত্রা বৈশাখে মিলে যায়। বাগানে লালের আগুন লেগে যায়। শহরের রাস্তায় কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি মোহময় এক আবহ তৈরি করে। শুধু কৃষ্ণচূড়া নয়, কনকচূড়া, জারুল, রাধাচূড়া, অলকানন্দা ফুল ফোটে এ সময়। তবে কৃষ্ণচূড়ার আধিপত্যই সর্বত্র বিস্তৃত। শহর সাজানোর জন্য কৃষ্ণচূড়ার বেশ কদর আছে কর্তাদের কাছে। বলা হয়ে থাকে, গাছটি নাকি টিকেই আছে নগর পরিকল্পনাকারীদের আতিথ্যে। এমনিতে বন্য অবস্থায় একে পাওয়া যায় না। কিন্তু শহর সাজাতে কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া, জারুল পরপর লাগানোর একটা রীতি নাগরিকরা রপ্ত করেছেন। কৃষ্ণচূড়া নামটি সহজবোধ্য। হিন্দিতে এ ফুলের নাম গুলমোহর। মানে ময়ূর ফুল। ময়ূরের পেখমের সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করতেই এ নাম। ভিয়েতনামে এর নাম ফুঙ ভি। মানে রূপকথার পাখি ফিনিক্সের লেজ। হিন্দি ভাষায় হলুদ কৃষ্ণচূড়াকেও বলা হয় গুলমোহর। আমাদের দেশে এ ফুলের নাম রাধাচূড়া। আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনের পার্শ্ববর্তী রাস্তায় কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া অনেকটা পরপর লাগানো। গরমের দিনে লোডশেডিং আর জ্যাম পেরিয়ে ঘামতে ঘামতে কেউ যদি সহসা এসব রাস্তায় পেঁৗছান তবে তার কাছে ফুলের সৌন্দর্য কি বার্তা বয়ে আনবে? তিনি কি বলবেন, সুন্দর। নাকি নিজের অজান্তেই গাছে ফোটা ফুলের অপূর্ব রূপ দেখে এই সৌন্দর্যকেও বলে বসবেন অসহনীয়?
Monday, May 9, 2011
রবীন্দ্র-পুরস্কার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে বহুবর্ণিল আয়োজনে মেতেছে বাংলাদেশ। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে আয়োজন চলছে। চলবে আরও কিছুকাল। অনুরাগীরা বলছেন, আয়োজন যেন সার্ধশতবর্ষ পালনেই থেমে না থাকে। রবীন্দ্রনাথকে অনুধাবনের চেষ্টাটা যেন অনুষ্ঠান-আয়োজনের বাইরেও চলতে থাকে। বস্তুত, এই প্রত্যাশার মধ্যে ইতিবাচক দিক যেমন আছে তেমনি এর অন্তর্গত মৃদু পরিহাসও লক্ষ্য করার মতো। আমাদের গুণীরা বলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের সর্বত্র। প্রশ্ন করেন রবীন্দ্রনাথ কোথায় নেই? সাহিত্যে, শিক্ষায়, জীবনে, রাজনীতিতে, সমাজে সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা আমাদের পাথেয়। কিন্তু কেতাবের কথা বাদ দিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, রবীন্দ্রনাথ আসলে আমাদের জীবনে, জীবনাচারে, রাজনীতিতে, সমাজে কোথায় আছেন? তবে অনেকেরই মাথায় হাত পড়বে। অনেকেই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও আদর্শ খুঁজতে রীতিমতো গবেষণা শুরু করবেন।
বস্তুত, আমাদের জীবনের বহিরঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আছেন বটে; কিন্তু অন্তরে রবীন্দ্রনাথ বোধহয় অনুপস্থিত। তার সাহিত্য অনুধাবনের চেষ্টা কতটা আমাদের পাঠকদের মধ্যে আছে, সে প্রশ্ন তুলে রেখে যদি এ প্রশ্ন করা যায়, তার মতো সাহিত্য সাধনা, পরিশ্রম, নিষ্ঠা কি আজকাল কোনো সাহিত্যিকের মধ্যে দেখা যায়? সাহিত্যিক হিসেবে তিনি অনন্য প্রতিভা নিশ্চয়ই কিন্তু কর্মোদ্যোগী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের যে শিক্ষা, সামাজিক উদ্যোগ তেমন উদ্যোগও কি আছে আমাদের সমাজে? রবীন্দ্রনাথকে, তার শুভ কাজকে অনুসরণের চেষ্টা যদি না থাকে, তাকে স্মরণ করে এত এত উৎসবের কী প্রয়োজন? কেউ বলবেন, উৎসবের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার নাম, গান, বাণীকে কিছুটা হলেও সঞ্চারিত করতে পারে এ উৎসবগুলো। সে নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু কতটুকু পারে? উৎসব শেষে প্যান্ডেল পড়ে থাকে, শামিয়ানার নিচে প্রচুর আবর্জনাও জমে। বক্তৃতা শেষ হলে তার অনুরণন রয়ে যায়। চারপাশে যত আয়োজন তার অধিকাংশই তো এভাবেই ফুরাবে। হয়তো কিছু বই, কিছু প্রকাশনা থাকবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রচনার চেয়ে শ্রেয়তর তো নয় সেসব। তবে? রবীন্দ্রনাথের রচনাকে মানুষের কাছে পেঁৗছানোর কোনো আয়োজন কিন্তু এবার এত ডামাডোলের মধ্যেও চোখে পড়ল না। রচনার কথা বাদ, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের বাইরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখার মতো কিছু কি হলো? রবীন্দ্রনাথের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই বাংলাদেশে। কোনো একাডেমী, ইনস্টিটিউট নেই, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এক বছরে কিছু গড়ে উঠল না। গড়ার উদ্যোগও এলো না। অন্যদিকে ভারতের দিকে তাকান। অনুষ্ঠান আয়োজনে ভারত আমাদের সঙ্গী। কলকাতা-দিলি্লতে নানা আয়োজন চলছে আমাদের মতোই। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও কাজের উত্তরাধিকার ভারতীয়রাও গভীরভাবে বহন করে। ইতিমধ্যে সরকারি উদ্যোগে রবীন্দ্র-রচনাবলি অনলাইনে প্রকাশ করে ভারত আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে। এবার রবীন্দ্রনাথের ২০০০ ছবি অনলাইনে প্রকাশ করা হলো। রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীকে নতুনভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলো ৯৫ কোটি রুপি। ঘোষণা এসেছে শান্তিনিকেতনসহ রবীন্দ্রস্মৃতিগুলো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সংরক্ষণেরও। আর আগামী বছর থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য এক ব্যক্তিকে রবীন্দ্র-পুরস্কারে ভূষিত করা হবে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বদৃষ্টিকে আবারও সবার সামনে তুলে ধরার এমন আয়োজন নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। দেশে যেমন, দেশের বাইরেও তেমন পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষায় ভারতীয়রা বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। দলমতের বাইরে এসে দেশের ভেতরে গুণীজনদের পুরস্কৃত করার একটি শক্তিশালী ধারা তারা গড়ে তুলেছে। তাদের আয়োজনে রবীন্দ্র-পুরস্কার নিশ্চয়ই বিশেষ মর্যাদা পাবে। কীভাবে গুণীদের পুরস্কৃত করতে হয় তা নিশ্চয় আমরা তাদের কাছে শিখতে পারি। একই সঙ্গে আরও একটি বিষয় শিখে নিতে হবে। সাময়িক আয়োজনে, তাৎক্ষণিক আবেগে না ভেসে কীভাবে একটি স্মরণ আয়োজনকে দীর্ঘস্থায়ী মাত্রা দেওয়া যায়, সে শিক্ষাও ভারতীয়দের কাছ থেকেই নিতে হবে।
Saturday, April 30, 2011
অ-মৌসুমি বইমেলা
আমাদের বইমেলার মৌসুম ফেব্রুয়ারি, বাংলা মাসের হিসাবে মাঘ-ফাল্গুন। ফেব্রুয়ারির অমর একুশে বইমেলা নিয়ে আমাদের গর্ব অনেক। সময়ে, স্থানে ও গুরুত্বে একুশে বইমেলার সঙ্গে তুলনীয় কোনো বইমেলার কথা ভাবা যায় না। এককালে একুশে বইমেলাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য ঢাকা বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল ফেব্রুয়ারির মেলার ঠিক আগে ডিসেম্বরে। প্রথম প্রথম অনেকে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ভেবেছিলেন, একুশে বইমেলা গুরুত্ব হারাবে। আন্তর্জাতিক একটি মেলা হিসেবে ঢাকা বইমেলার পরিকল্পনা হয়েছিল। সাজানো হয়েছিল জাঁকজমক আয়োজনে। কিন্তু পাঠকের সাড়া তেমন মেলেনি। পাঠকের সাড়া মেলেনি বলে, লেখক-প্রকাশকের সাড়াও মেলেনি। এমনকি দেশের বাইরের প্রকাশকরা পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখাননি। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশের বাংলা বইয়ের প্রকাশকরা পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখাননি। ঢাকা বইমেলা এখন নিবুনিবু। একুশে বইমেলাই বইয়ের মূলধারা হিসেবে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সমস্যা হলো, মেলার সঙ্গে বই লেখা, বই প্রকাশ, বিপণন এমনকি বই কেনা পর্যন্ত সব কার্যক্রম যেন ফেব্রুয়ারির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। বইয়ের এই ফেব্রুয়ারিনির্ভরতা নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সারা বছরে যদি এক মাসেই পাঠকের বইয়ের কথা মনে হয়, তবে তো প্রতিদিনের বা নিদেনপক্ষে নিয়মিত পাঠাভ্যাসটুকু গড়ে উঠবে না। সবচেয়ে বড় কথা, প্রকাশনা শিল্প মৌসুমি ভিত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। সারা বছরের বিপণন চালু হবে না। এমন একটি পরিস্থিতিতে অনেকেই ভাবছেন সারা বছর নানা উপায়ে বই নিয়ে পাঠকের দোরগোড়ায় হাজির থাকার কথা। কাজটি কিন্তু সহজ নয়, কেননা দেশব্যাপী বইয়ের দোকান নেই, যে দোকান আছে সেখানে মানসম্মত বই বিপণনের তেমন ব্যবস্থা নেই। দেশের প্রেক্ষাপট অনেক বড়, খোদ রাজধানী শহরে এমন দোকান উঠে যেতে বসেছে যেখানে গেলে প্রত্যাশিত বইটি কিনতে পাওয়া যাবে। এখনও যে ক'টি দোকান আছে আজিজ মার্কেটে, নিউ মার্কেটে তা কতদিন থাকবে সে এক বড় প্রশ্ন। সারা বছর বই বিপণনের এই বেহাল পরিস্থিতি থেকে মনে হয়, আমরা ক্রমশ পাঠাভ্যাসবঞ্চিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে চলেছি। আমাদের বিপণি কেন্দ্রগুলোতে এমনকি আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রেও বই বিক্রির ব্যবস্থা নেই। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের পরও, জীবনধারার পরিবর্তন সত্ত্বেও পৃথিবীর অনেক জাতি বইয়ের সঙ্গ ছাড়েনি। আমরা মনে করি, এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের বইয়ের জন্য কিছু জায়গা তৈরি করা উচিত। ঢাকার প্রকাশকদের মধ্যে অনেকে, বিশেষত তরুণরা এখন বই বিপণনের উপায় নিয়ে ভাবছেন। তারা ফেব্রুয়ারির বইমেলার বাইরে ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বইমেলার আয়োজন করছেন। বই বিপণনের এই বিকল্প আয়োজনগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। এগুলো যত নিয়মিত হবে পাঠক ততই বছরভর বইয়ের কথা ভাবতে পারবেন। এখন শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্য ও শুদ্ধস্বরের বৈশাখী বইমেলা। অনেক ছাড় দিয়ে বিক্রি হচ্ছে বই। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এবং ঢাকার বাইরে এমন বইমেলার নিয়মিত আয়োজন মানুষের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক বাড়াবে বলে আমাদের আশা।
Saturday, March 26, 2011
নিউ মিডিয়া :: আগের মতো থাকবে না কিছুই

চোখের সামনের পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও বদলটা চোখে পড়ত না। মনে হতো, বদলটা যেন অন্তঃসলীলা ফল্গুধারার মতো। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান আগের মতোই থাকবে। বদলটা হবে ভেতরে ভেতরে। মানুষের মনোজগতে একটা প্রবল বিপ্লব ঘটে যাবে। বাইরে সে বিপ্লবের ছিটেফোঁটাও দেখা যাবে না। কেন এই ধারণা হয়েছিল অনেকের? কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি, সারাদিন ফেসবুকে বসে বন্ধুদের সঙ্গে অকারণে চ্যাট করে যে ছেলেটি বা মেয়েটি, পারলে নাওয়া-খাওয়া সব কম্পিউটারের সামনেই সেরে ফেলে, সে ছেলেটি বসে বসে ফেসবুক বা টুইটারের স্টেটাসে বড় বড় কথা বলবে। বলবে, পৃথিবীটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু কাজের কাজ সে কিছুই করবে না। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে নিজের জন্য একটা ভালো চাকরি ঠিকই সে জোগাড় করে নেবে। কিন্তু এই আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্ম দেশ-জাতি নিয়ে কখনোই চিন্তা করবে না। কিছু ব্যতিক্রম সামনে ছিল। যেমন ১৯৯৯ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ভণ্ডুল করেছিল যারা, তারা সংগঠিত হয়েছিল ইন্টারনেট মাধ্যম ব্যবহার করেই। মেক্সিকোর জাপাতিস্তা আর্মি অব ন্যাশনাল লিবারেশনের উদাহরণও সামনে ছিল। আরও উদাহরণ তৈরি হচ্ছিল একে একে। কিন্তু খানিকটা বুদবুদ দেখিয়ে থেমে যাচ্ছিল সেগুলো। কিন্তু এবার যা ঘটল উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে, তার তুলনা আর কোনো কিছুর সঙ্গেই চলে না। রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণে ছিল সবকিছু। দেশগুলোর গণমাধ্যম কথা বলছিল হরেদরে শাসকেরই সুরে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী, বিদেশি বন্ধু, শাসক শ্রেণী_ সব মিলিয়ে এক দুর্ভেদ্য অচলায়তন গড়ে উঠেছিল। এ অচলায়তন কখনও ভাঙবে, কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারেননি। লৌহবাসরের অন্তরালে চলছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। কখন যে লৌহবাসর ভেদ করে মনসার প্রতিনিধি ঢুকে গিয়েছিল তা কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু যখন বিস্ফোরণ ঘটল তখন সবাই জানল, এই লৌহবাসরও অভেদ্য নয়। আরব বিশ্বের তরুণরা হঠাৎ জেগে উঠল। বলল, কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। সত্যিই পুরনো সবকিছু ভেঙে যেতে থাকল একে একে। অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়ে গেল সপ্তাহের মাথায়। যে ব্যাপারগুলো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, সবাই বলছেন, সেগুলোও শিগগিরই বদলাবে। আল কায়দার মতো সন্ত্রাস সৃষ্টি করে নয়, মতাদর্শের প্রবল শক্তিতে নয়_ আরব বিশ্বে তরুণরা জেগে উঠেছে প্রযুক্তির শক্তিতে। তাদের ভাষায়, আমরা সংগঠিত হয়েছি ফেসবুকের মাধ্যমে, কর্মসূচি জানান দিয়েছি টুইটারের মাধ্যমে, আর বিশ্বকে আমাদের কথা জানিয়েছি ইউটিউবের মাধ্যমে। ইন্টারনেট_ ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এখন সশস্ত্র যুদ্ধের হাতিয়ারের চেয়ে শক্তিশালী তবে? তা-ই তো মনে হচ্ছে।
বস্তুত বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্য সব অঞ্চলের মতো আরব বিশ্বের তরুণরাও পরস্পরকে জানছিল, বুঝছিল। পরস্পরের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছিল। এই বোঝাটা আজকের বাস্তবতায় পেঁৗছাত না যদি তাদের পরস্পরের মধ্যকার বোঝাপড়া বা দেশ-জাতি সম্পর্কে তাদের বোধবুদ্ধি জাগানোর দায়িত্বটা পালন করত ওল্ড মিডিয়া, যাকে আমরা আদর করে গণমাধ্যম বলে থাকি। আদরের নাম গণমাধ্যম হলেও শাসকের, বিনিয়োগকারীর স্বার্থ-ভাষা ও বক্তব্যের বাইরে গণমাধ্যম কিছু বলে না। ফলে নতুন যুগ নিয়ে আসার জন্য যে জরুরি প্রস্তুতি তা পুরনো গণমাধ্যম ও যোগাযোগ মাধ্যমে সম্ভব হতো না, হয়ওনি। কিন্তু নিউ মিডিয়া একেবারেই আলাদা। পুরনো প্রিন্ট মিডিয়া বা অ্যানালগ ইলেকট্রনিক মিডিয়াও কাজ করে এক থেকে বহুতে। তৈরি সংবাদ, ভাষ্য ও বিশ্লেষণ এক থেকে বহুতে যায়। একটি কোম্পানি সংবাদ তৈরি করে তার কর্মীদের মাধ্যমে, সে সংবাদ যখন পাঠক গ্রহণ করে তখন তারা একক ভোক্তা। এ থেকে বিচ্ছিন্ন বহুতে সংবাদ সঞ্চারিত হয়। কিন্তু নতুন মাধ্যমগুলো একেবারেই আলাদা। একটি সংবাদ এক থেকে বহুতে যায়, আবার বহু থেকে বহুতে যায়। একটি সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মত ছড়াতে থাকে। ব্লগে, ফেসবুকে, টুইটারে সংবাদের বিশ্লেষণ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোনো বড় পত্রিকার সংবাদও ইন্টারনেট মাধ্যমে এসে তার দুর্বলতা, চালাকি ও রাজনীতির তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে। পাঠক-দর্শক-শ্রোতারা সমস্বরে এর প্রতিক্রিয়া জানাতে জানাতে এর একটা রূপান্তর ঘটান। আবার ব্লগ-ফেসবুক-ইউটিউব ব্যবহার করে যে কেউ সাংবাদিক-বিশ্লেষক হয়ে যেতে পারেন। লিখে, ছবি তুলে, রেকর্ড করে সেটি ছড়িয়ে দিতে পারেন। সংবাদ তৈরি করতে পারেন। সবার হাতে যখন সংবাদ বা ভাষ্য নির্মাণের ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটিকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল ডেমেক্রেসি। এ গণতন্ত্র শুধু তথ্যমাধ্যমের নয়, গণতন্ত্র সর্বত্র। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র নেই, কিন্তু রাষ্ট্রে তো ইন্টারনেট ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে না। ইন্টারনেট দেশে এলে তরুণরা তা ব্যবহার করবেই। যতই নিষেধাজ্ঞা থাকুক, তারা ঠিকই বের করে নেবে মত প্রকাশ ও যোগাযোগের উপায়। পরস্পরের কথা জানতে পারলে আজ হোক বা কাল রাস্তায় নেমে পড়বেই। আর এত মানুষ যখন রাস্তায় নেমে আসে কোনো ইন্ধন, প্রচারণা ছাড়াই তখন পুরনো যা কিছু তা টিকে থাকবে কী করে?
আরব বিশ্বের পরিবর্তন নিউ মিডিয়া ও নতুন ধারার যোগাযোগের একটা দিক। সামাজিক পরিবর্তনের বাইরেও আছে এর হাজারো মাত্রা।
উন্নত দেশগুলোর পুরনো মিডিয়া বা গণমাধ্যম এখন নিউ মিডিয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দেশগুলোতে ইন্টারনেট সেবা চমৎকার, ইন্টারনেট ব্যবহার করে পড়াশোনা-দেখার প্রযুক্তিও আমাদের থেকে উন্নত। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণে সেখানে সুযোগও অবারিত। ফলে সেখানে নিউ মিডিয়া সব ম্যাজিক ঘটাচ্ছে। একটি বাচ্চা মেয়ের বোকা বোকা লিরিকের গান যখন নামিদামি গায়কের গান টপকে লিস্টে এক নম্বরে উঠে যায়, তখন বড় আর্টিস্টদের স্টারডম থমকে যায়। তেমনি নামি সাংবাদিকের কলামের চেয়ে ব্লগের কলাম যখন জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় এগিয়ে থাকে তখন পত্রিকা থমকে যায়। গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস তাই ব্লগ চালু করে এগিয়ে থাকতে চায়, সিএনএন-বিবিসি ইউটিউবে চ্যানেল খোলে, ফেসবুকে পেজ খোলে। নাগরিক সাংবাদিকতা বা সিটিজেন জার্নালিজমের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়। জাপানে ভূমিকম্প, ইরাকে সংঘর্ষ, লিবিয়ায় হামলা_ সর্বত্র নাগরিক সাংবাদিকতার জয়যাত্রা। ফলে আজকের বাস্তবতা হলো_ দেশে গণতন্ত্র থাকুক বা না থাকুক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকুক বা না থাকুক, মুক্ত ইন্টারনেট থাকলেই নিউ মিডিয়ায় কমবেশি গণতন্ত্র থাকবে। কারফিউ থাকলেও মানুষ কথা বলতে পারবে। এমনকি আচমকা রাস্তায় জড়ো হওয়ার মতো প্রস্তুতিও নিতে পারবে, রক্তচক্ষুর অন্তরালে। ডিজিটাল ডেমোক্রেসির বাইরে নিউ মিডিয়ার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইন্টারঅ্যাকটিভিটি। মত-পাল্টামত-বহুমতের উৎসার এই নিউ মিডিয়া। এর কাছে ছাপা কাগজ ক্রমে কুপোকাত হচ্ছে। আমাদের দেশে এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ছাপা কাগজের সংবাদপত্র এখনও বিকাশমান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এমন কিছু শহর তৈরি হয়েছে যেখানে ছাপা সংবাদপত্র নেই। বড় বড় অনেক কাগজের সার্কুলেশন নেমে গেছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে শুধু অনলাইনেই পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেছে। নিউ মিডিয়ার উত্থানের মাত্র কুড়ি বছরের মাথায় ডাকসাইটে পত্রিকা, ঐতিহ্যবাহী সাংবাদিকতার এমন পতনের কথা কেউ হয়তো ভাবেননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে আরও পরিবর্তন আসছে। একটা জেনারেশন তৈরি হবে, যারা কম্পিউটারে, বইপত্র পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে শুধু। তাদের কাছে ছাপা কাগজের আলাদা গুরুত্ব আর থাকবে না। আমাদের দেশে ছাপা কাগজের কদর এখনও বেশি, কারণ ইন্টারনেট কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ছড়ায়নি, তার গতিও বাড়েনি। কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থা পরিবর্তন হবে। কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। বাংলাদেশের একজন তরুণের জন্য আজ ফেসবুক-ইউটিউব-টুইটার-ব্লগ যে বাস্তবতা, তার সঙ্গে সৌদি আরবের বা যুক্তরাষ্ট্রের তরুণটির বাস্তবতার খুব বেশি পার্থক্য নেই। প্রায় ১০ লাখ অগ্রসর-শিক্ষিত-সচ্ছল তরুণ আজ ফেসবুকের ভোক্তা। একটা নতুন জেনারেশন তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সর্বসাম্প্রতিক চিন্তা-জ্ঞান ও তথ্যের সঙ্গে তাদের সহজ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। এ দেশের বাস্তবতায় তারা পথ চলে, কিন্তু মনোজগতে তারা আরেক বাস্তবতায় বাস করে। কখনো সে বাস্তব এ বাস্তবকে ছাপিয়ে উঠবে না এ নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?
এ দেশে ব্লগ তৈরি হয়েছে, নিত্যনতুন নিউজ মিডিয়া তৈরি হচ্ছে, সংবাদ ও ভাষ্য তৈরি হচ্ছে, মত গড়ে উঠছে। পুরনো মিডিয়ার আভিজাত্য, ব্যবসা, রাজনীতি, বিজ্ঞাপন-বিপণন ব্যবস্থা এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু হবে। তার জন্য প্রস্তুতি কি চলছে?
চলি্লশ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ গণতন্ত্র, মুক্তমত, নাগরিক অধিকারের যেসব স্বপ্ন অর্জনের জন্য অপেক্ষা করছে তার সঙ্গে দেখা হবে শিগগিরই। বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, দুটি শক্তি_ তারুণ্য ও ইন্টারনেট সেটি সম্ভব করে তুলতে পারে। নিউ মিডিয়া সেই সব সম্ভবের উপায়। কিন্তু তাকে কাজে লাগাতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাশিল্পী
Wednesday, March 2, 2011
আলু

আলুর সঙ্গে সামরিকতা, অভিযান ও দেশ দখলের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। আলু চাষের ইতিহাসে দেখা যায়, এই খাদ্যশস্যটির আদি উৎস আন্দিজ পর্বতমালাসংলগ্ন দেশগুলোতে, বৃহত্তর অর্থে লাতিন আমেরিকায়। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ পেরুর মানুষেরা বন্য আলুকে পোষ মানিয়ে কৃষিজাত শস্যে পরিণত করেছিল। উত্তর-দক্ষিণ, লাতিন নির্বিশেষে বন্য আলুর দেখা পাওয়া যায়। লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় বিশেষ করে স্প্যানিশ শাসনের বিস্তারের মাধ্যমে বিজয়ী স্প্যানিশদের সঙ্গে আলুর পরিচয় ঘটে। ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনে আলুর চাষ হয়। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মাধ্যমে ইউরোপে আলু এলেও পশ্চিমা কৃষকরা আলুকে প্রথমে খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত, আলু চাষ করতে চাইত না। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যশস্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তারা আলু চাষে উৎসাহী হয়। কৃষকদের এই উৎসাহের আগে ইউরোপের নানা স্থানে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় আলু চাষ হতো। স্প্যানিশ সৈন্যদের জন্যই মূলত এই আলু চাষ হতো। পরে এই চাষ ইউরোপের অন্য জাতিগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। ব্রিটেনে ১৯ শতকের শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে আলু চাষের বিস্তার ঘটে। ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস বলেন, শিল্প বিপ্লবে লোহা বা ইস্পাতের যে ভূমিকা, আলুরও সেই ভূমিকা। বিশ্বাস করা হয় যে, আফ্রিকায় ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমেই আলু চাষ বিস্তার লাভ করে। তবে এ ধারণাও আছে, আফ্রিকার সঙ্গে লাতিন আমেরিকার যোগাযোগ থেকেও সেখানে আলু চাষের প্রচলন হতে পারে। ঔপনিবেশিকরা কম দামের খাবার হিসেবে আলুর ওপর জোর দেয় এবং এটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক অজনপ্রিয় খাবার হিসেবে বিবেচিত হতো। ধারণা করা হয়, ঔপনিবেশিকদের হাত ধরে এশিয়াতেও আলু এসেছিল। আঠারো শতকে কুয়ানলঙ শাসনের সময় অভাব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে চীনে আলু চাষ শুরু হয়। তবে ভারতে শস্য হিসেবে আলু চাষ শুরু হয় আঠারো শতকের শেষ দিকে। আফ্রিকায় আলু শস্যের মর্যাদা পায় বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে। আগে সীমিত আকারে চাষ থাকলেও, ব্যাপক আলু চাষের পেছনে যে ঔপনিবেশিকদের হাত ছিল তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। আলু খুব সাদামাটা শস্য বা কন্দ হলেও এর ইতিহাস খুবই জটিল। প্রথমে পরাজিতদের কাছ থেকে এটি বিজয়ীরা রপ্ত করে পরে বিজিতদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল। দুটোর সঙ্গেই সামরিক অভিযান ও সাফল্যের সম্পর্ক জড়িত। মজার ব্যাপার হলো, সামরিক বাহিনীর সাধারণ সভ্যদের খাবার হিসেবে আলুর ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে অতীতে। দুর্ভিক্ষ, অভাব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেও আলুর কদর বেড়েছে। আলু চাষকে নতুন এলাকায় প্রথমে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হলেও পরে চাষে বাধ্য হয়েছে কৃষকরা। বাংলাদেশেও বহুদিন পর্যন্ত আলু চাষে কৃষকরা অনুৎসাহী ছিল। আলুকে খাবার হিসেবে নিম্নমানের বলে বিবেচনা করা হতো। ব্যাপকভাবে আলু চাষ ও আলুর ব্যাপক ব্যবহার অতি সাম্প্রতিক ঘটনা। আমাদের এখানে প্রধান খাদ্যশস্য ধান বা চাল। আলু সাধারণত প্রধান খাবার হিসেবে খাওয়া হয় না। বিভিন্ন তরকারির সঙ্গে সহযোগী আইটেম হিসেবে আলু ব্যবহৃত হয়। তবে খাদ্যশস্যের অভাব দেখা দিলে কিংবা চালের দাম বাড়লে এখানে শাসকরা আলু জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেন। ঐতিহাসিকভাবে আলুর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্কের কারণেই হয়তো বা এদেশের সামরিক ও সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারগুলো আলু জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনে আলু জনপ্রিয় করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সামরিক বাহিনী সমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও আলু নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ এসেছিল। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো আলুকে ততটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাসে যাই ঘটুক, আলু এখন বাস্তবতা। আলু চাষ করে কৃষকরা মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে সেটি ভালো কথা নয়। আলু আগামী দিনের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব কোল্ডস্টোরেজ সিস্টেমের মাধ্যমে। চালের বর্তমান বাজারে আলু খাওয়াকে উৎসাহিতও করা যেতে পারে। কিন্তু সেটি গণতান্ত্রিক পন্থায় হলে ভালো।
Thursday, February 24, 2011
শেষ দিক থেকে দ্বিতীয়

তালিকাটি যদি দুর্নীতির ধারণাসূচক হতো তবে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। একদল বলত, দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। আরেক দল বলত, দুর্নীতির ক্ষেত্রে পিছিয়েও যায়নি দেশ, অর্থাৎ পরপর দুই বছর দুর্নীতির ধারণাসূচকে একই অবস্থানে থাকা একটা স্থিতিশীলতার লক্ষণ। এমন স্থিতিশীল অবস্থানে আমরা বেশ কয়েক বছর ছিলাম। দুর্নীতির ধারণাসূচকে একেবারে শীর্ষস্থানে থাকার সেই সময়ের কথা অনেকের মনে পড়বে এ প্রসঙ্গে। এবার দেশ নয় শহর। দুর্নীতি বিষয় নয়, বিষয় বসবাসযোগ্যতা। বসবাস অযোগ্যতার দিক থেকে গত বছর ঢাকা ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে, এবারও তালিকায় দ্বিতীয় রয়েছে। ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে তারা বলতে পারেন, পরপর দুই বছর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্থিতিশীলতার লক্ষণ। অবস্থা খারাপ হয়নি, এটাই তো স্বস্তির কথা। আগ বাড়িয়ে কেউ কেউ আবার ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটকে দোষারোপ করতে পারেন। বলতে পারেন, তাদের জরিপে ভুল ছিল, তারা ধারণার ওপর জরিপ করেছেন। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য এ ধরনের জরিপ চালানো হয়েছে, এমন কথাও উঠতে পারে। আরেকটু আগ বাড়িয়ে এ ধরনের জরিপের সঙ্গে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের সংযোগও খুঁজে দেখা যেতে পারে। কেউ বলতে পারেন, আমাদের শহর আমাদের মতোই। আমাদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মতোই আমাদের শহরও। এ শহর বিদেশিদের কাছে যাই হোক, আমরা সুখে আছি। আশার কথা, এখনও এমন মেঠোতর্কের দেখা মিলছে না। বোঝা যাচ্ছে, দুর্নীতি সূচকের মতো বসবাসযোগ্যতার সুযোগ এখানে কল্কে পাচ্ছে না। এ কথা সত্য, দুর্নীতি যেভাবে সমাজের নানা স্তরে বসবাসরত মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দেয়, শহরের বাসযোগ্যতা ততটা করে না। শহরে বাস করে এমন কোটি মানুষের কাছে ঢাকাই একমাত্র শহর। পৃথিবীর অন্য কোনো শহর কতটা বাসযোগ্য তা তুলনা করে দেখার অবকাশ তাদের নেই। তুলনা করতে পারে শুধু তারাই যারা আর দশটা শহর দেখেছে, স্বচক্ষে না দেখলেও টিভি-ইন্টারনেটের কল্যাণে আর দশটা শহর সম্পর্কে ধারণা আছে। এমন মানুষের সংখ্যা কম। আমাদের অধিকাংশ মানুষ জানেন না নাগরিক সুবিধা, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, বসবাসের স্বস্তি কী জিনিস? সত্যি কথা বলতে, সর্বনিম্ন সুবিধা যা না থাকলে শহরটি বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে_ সেই গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতেই আমাদের ব্যবস্থাপকরা হিমশিম খেয়ে যান। আমাদের রাস্তার তুলনায় যান বেশি, যানের তুলনায় লোক বেশি। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। পরিস্থিতি এমন যে, যারা কোনোদিন অন্য শহর দেখেননি, কোনো শহর সম্পর্কে শোনেননি পর্যন্ত, তারাও এ শহরকে বসবাসের অনুপযুক্ত ভাবে। আর যারা জানেন, বোঝেন তারা একটু বেশি অস্বস্তিতে থাকবেন এটা স্বাভাবিক। বিদেশিদের ক্ষেত্রে কী হবে সেটি বলাই বাহুল্য। ফলে তারা যখন গবেষণা করে একটি তালিকা করবেন তাতে ঢাকা শহরের নাম শেষ দিকে থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষকবলিত হারারের পর? আমাদের চেয়ে অনেক অনুন্নত দেশের শহরও আমাদের থেকে উন্নত, অধিকতর বসবাসযোগ্য। সে দিকগুলো বিচার করলে মনে হয়, শহরের বাসযোগ্যতা শুধু অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, সদিচ্ছা এমন কিছু জরুরি ব্যাপার অনুন্নত দেশের শহরকেও উজ্জ্বল করে তুলতে পারে। সম্প্রতি বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী হয়ে গেল। শহরকে ঘষে মেজে সাফ করে আমরা বিদেশিদের সামনে উপস্থাপন করতে চাইলাম। কোটি কোটি টাকা খরচ হলো শহর আলোকিত করতে গিয়ে। নানা আশাবাদ তৈরি হলো। মনে হলো, বিদেশিরা এবার পর্যটনের জন্য আসতে শুরু করবে। কিন্তু এখন ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ দেখে মনে হচ্ছে, সে আশা এখনও অনেক দূরের বিষয়। বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে একটু একটু করে এগোতে পারলে নাগরিকদের যেমন অতিথিদেরও তেমনি উপকার হতো। কৃত্রিম ঝাড়ফুঁকে শহর সাজিয়ে লাভ নেই।
Saturday, February 19, 2011
ব্রান্ডিং রিকশা

ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই বাংলাদেশে। ঢাকার রাস্তা নানা বর্ণের আলোয় সেজেছে। একদিকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, অন্যদিকে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম_ নগরবাসী গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে আলো দেখছেন, আলোর ঝরনাধারার পাশে ছবি তুলছেন। ক্ষণে ক্ষণে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হচ্ছে রাস্তায়। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাহারি স্যুভেনির বের হয়েছে_ বাচ্চাদের হাতে শোভা পাচ্ছে তেমন স্যুভেনির। অনেকেই বাংলাদেশের জার্সি পরে ঘুরছেন ও পতাকা বহন করছেন পরম উৎসাহে। রাতের রাস্তায় শুধু যে আলোর বাহার তা নয়, রাজনৈতিক প্রচারণা থেকে ক্রিকেটারদের প্রতি অভিনন্দন বাণী, নানা দেশের ক্রিকেটারদের ছবি, মাস্কট, নেতা-নেত্রীদের ছবিসহ অনেক কিছুই দেখা যাচ্ছে। ঢাকার রাস্তার সংস্কার হয়েছে চোখে পড়ার মতো। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোতে রিকশা আগেও ছিল না, এখনও নেই। নতুন করে অনেক অগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা থেকে রিকশা উধাও হয়ে গেছে। শহরের লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো হাওয়ায় মিশে গেছে। তবু রাস্তায় ভিড় নেই, বাসস্ট্যান্ডে মানুষের অধীর প্রতীক্ষা নেই। উদ্বোধনীর দিন আধাবেলা বন্ধ থেকে দু'দিনের বন্ধে বেশ একটা উৎসবের আমেজ এসেছে শহরে। রাস্তা সংস্কারের এই বিপুল আয়োজনের মধ্যে অল্প লোকই রাস্তায় বেরোনোর কথা ভাবছেন। এই অবসরে এখনও রাস্তার সমস্যা, চলাচলের সমস্যা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে না। অতএব ভালয় ভালয় উদ্বোধনী থেকে প্রথম ম্যাচ পর্যন্ত সময় গড়াল তা স্বীকার করতেই হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে রিকশায় করে অধিনায়কদের মঞ্চে আগমন বেশ নজর কেড়েছে। রিকশা যে আমাদের শহরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, এটি আমরা গর্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছি, বিশ্ববাসী দেখে প্রশংসাও করেছে। শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই নয়, ঢাকার রাস্তাগুলোর সজ্জাতেও দেখছি রিকশাকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বোঝা যায়, আয়োজকদের মাথায় রিকশা বেশ একটা জায়গা করে নিয়েছিল। বিশ্বকাপের মধ্য দিয়ে আমরা রিকশার একটা ব্রান্ডিং করে ফেললাম। রিকশার জায়গায় অনেক কিছুই থাকতে পারত। সুন্দরবনের বাঘ তো আছেই, সুন্দরবন, কক্সবাজারসহ অনেক কিছুই আরও গুরুত্ব পেতে পারত। কিন্তু সেসবকে ছাপিয়ে রিকশা যে বিশেষ একটা জায়গা জুড়ে এলো, তার কারণ কী? রিকশা ঢাকা শহরের অন্যতম যান, একথা ঠিক। যানটি পরিবেশসম্মত, জ্বালানিনির্ভর নয়_ ফলে এখন সমাদৃত হওয়ার মতো যানই বটে। কিন্তু আমাদের শহরে কি রিকশার সে কদর আছে? আমাদের শহরের সব সমস্যার প্রথম কারণ হিসেবে আমরা রিকশাকে দায়ী করে, একে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলেছি। শহরে রিকশা করে কোথাও থেকে কোথাও যাওয়ার উপায় খুব একটা নেই। রিকশা এখন মোটামুটি পাড়ার গলিতে চলার বাহন। শহরে রিকশার জন্য আমরা কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি, করতেও চাই না। তারপরও রিকশাকে যে বিশ্বসভার সামনে গর্বভরে উপস্থাপন করছি তার কারণ কী? হয়তো যানটি দৃষ্টিনন্দন, এটাই হয়তো মুখ্য কারণ। কিন্তু আমাদের অবচেতনে কি এমন মনোভাবও আছে যে, এ যানটি পরিবেশবান্ধব এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী। এমন দিন হয়তো আমাদের দেশেও খুব দূরে নয়, যখন জ্বালানি বাঁচাতে রিকশা বা রিকশার মতো বাহনকে বেছে নিতে হবে, তেমন মেসেজ কি এবারের বিশ্বকাপের মধ্য দিয়ে আমরা দিয়ে ফেললাম? আমাদের রিকশা আর্ট অনেক আগেই শিল্পবোদ্ধাদের কদর পেয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মানুষের পায়ে টানা এমন যান অমানবিক। তারপরও এ কথা সত্য, আমাদের শহরে বহু মানুষের কাছে রিকশাই জীবিকার একমাত্র উৎস। রিকশার ব্রান্ডিংয়ে কে কী বুঝেছে জানি না। তবে খেটে খাওয়া মানুষগুলো যে বিশ্বকাপের সঙ্গে অধিকতর একাত্ম বোধ করেছে তা বলাই বাহুল্য।
Subscribe to:
Posts (Atom)
