Wednesday, December 8, 2010

মিসেস আহমেদ ছদ্মনাম নিয়েছিলাম : এডলিন মালাকার


মাহবুব মোর্শেদ
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভিন্ন এক কাহিনী শুনিয়েছেন এডলিন মালাকার। স্বামী যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি থেকে যান ঢাকায়। নিজের বাড়িতে নিরাপদ নন বলে অন্যদের বাড়িতে থেকেছেন পুরো মার্চ থেকে ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। চলাফেরার সুবিধার্থে জোগাড় করেছিলেন মিসেস আহমেদ ছদ্মনামে একটি আইডি কার্ড। ঢাকা শহরের তখনকার আতঙ্ক, অস্থিরতা ও যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে।
বিস্তারিত সাক্ষাৎকার পড়ূন পৃষ্ঠা-৫
.............................................
সমকাল : ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আপনি কোথায় ছিলেন?
এডলিন মালাকার : তখন আমি ঢাকা ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলে (এখনকার উদয়ন স্কুল) চাকরি করতাম। আমার বাসা ছিল ফার্মগেট এলাকায়। ২৫ মার্চে আমাদের বাড়ির চারপাশে প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছিল। এলাকাটি নিরাপদ ছিল না। আমার স্বামীও মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলেন। তিনি দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে পার্টির লোকদের সঙ্গে আমারও কিছু যোগাযোগ ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়ার পর বাড়ি ছাড়লাম আমরা। আমার ছোট্ট দুটি সন্তান ছিল। স্বামীর বন্ধু নুরুর রহমান তার ধানমণ্ডির বাসায় নিয়ে যান আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের সময় আরও ক'টি পরিবার তার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে অনেকেই সংখ্যালঘু ছিলেন। ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত সে-বাড়িতেই ছিলাম। ঢাকার ওপর যৌথবাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে আমাদের মনে হলো, ঢাকায় থাকা নিরাপদ নয়। তখন সে-বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলাম আমরা।
সমকাল : আপনি তো ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ঢাকায় চলাফেরা করতে হতো আপনাদের। এ সময় কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন?
এডলিন মালাকার : আমরা তো নন-মুসলিম। বাসা থেকে আমাকে বলল, তোমার একটা কার্ড করা দরকার। তখন আমরা নাম পরিবর্তন করে স্কুল থেকে কার্ড করলাম। আমার দু'ছেলের নাম শাহীন এবং শামীম। চলাফেরার সুবিধার্থে আমি মিসেস আহমেদ ছদ্মনামে একটি আইডি কার্ড বানিয়ে নিয়েছিলাম। কার্ড সঙ্গে রাখতাম। স্কুল ও বাসা ছাড়া আর তেমন কোথাও যেতাম না। খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হতো আমাদের। একবার খুব বিপদে পড়তে হয়েছিল। সে সময় আমাদের কাজ ছিল সীমান্তের ওপার থেকে আসা পত্রিকাগুলো ঘরে ঘরে পেঁৗছে দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের ওপর এসব পত্রিকা আমরা আঁচলের নিচে লুকিয়ে বিতরণ করতাম। একবার পত্রিকা বিতরণ করতে যাচ্ছি। পথে আলবদরের এক কর্মী গাড়ি আটকালো। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ড্রাইভার আগেই বলে দিয়েছিল স্বাভাবিক থাকতে হবে। সেই আলবদরটির সঙ্গে কথা বলেছিল। আইডি কার্ড আর দেখাতে হয়নি। পত্রিকা বিতরণ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতাম। এমনিতে রিকশায় চলাফেরা করতাম, ঢাকা শহরে তখন বাস চলত খুবই কম।
সমকাল : স্বামী মুক্তিযুদ্ধে গেছেন বলে কি বাড়তি সতর্কতা নিতে হতো?
এডলিন মালাকার : হ্যাঁ, সতর্ক থাকতে হতো যাতে কেউ না জানে। আমার ছেলেদের শিখিয়ে দিয়েছিলাম, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, তুমি বলবে বাবা নানাবাড়ি গেছেন। নুরুর রহমানের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত ছিল। তার দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তাদের বন্ধুরা আসত। তবে তাদের এই যাতায়াত খুব গোপনে হতো। এত সতর্কতার মধ্যেও একবার ঢাকার মুক্তিযোদ্ধারা গ্রীন রোডে একটা অপারেশন করলেন। তখন সবাই বলল, এবার ধানমণ্ডি এলাকায় রেইড হবে। সে রাতে রেইড না হলেও পরদিন সকালে দেখা গেল ঠিকই আর্মি জিপ পেঁৗছে গেছে। তবে তারা বাসার ভেতর ঢোকেনি। গেটে গিয়ে নুরুর রহমান সাহেব তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা চলে গিয়েছিল।
সমকাল : মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কারা কারা ওই বাড়িতে আসতেন?
এডলিন মালাকার : নাসিরউদ্দিন ইউসুফরা আসত, আর্টিস্ট শাহাবুদ্দিন আহমেদ এসেছিল। আরও কয়েকজন; কিন্তু সবার নাম এখন আর আমার মনে নেই।
সমকাল : কার্ড করার পর রাস্তাঘাটে আপনাকে কি কেউ আটকিয়ে ছিল?
এডলিন মালাকার : কার্ডটি আমরা করেছিলাম মূলত নিরাপত্তার জন্য। এক দিন এক রাজাকার আমাদের পথরোধ করেছিল। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেই সে আমাকে ছেড়ে দিল। তবে কার্ড দেখানোর প্রয়োজন হয়নি। অমুসলিমদের ভয়টা তখন বেশি ছিল। আর যাদের লোকজন বেশি চিনত তাদের সমস্যাটা ছিল আরও বেশি। মেয়েদের ক্ষেত্রে সে সমস্যাটা আরও বেশি হতো।
সমকাল : ধানমণ্ডি এলাকায় লোকজন তখন কেমন ছিল?
এডলিন মালাকার : আমরা থাকতাম ৭ নম্বর রোডে। তখন সেখানে একটা বড় পুকুর ছিল। আশপাশে ছিল অনেক কোয়ার্টার। মানুষের জীবনযাপন যে খুব স্বাভাবিক ছিল, তা নয়। স্বাভাবিক জীবনযাপন করাটা সে সময় অনেক কঠিন ছিল।
সমকাল : স্কুলে বাচ্চারা আসত?
এডলিন মালাকার : প্রথমে তো স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে সামরিক নির্দেশে স্বাভাবিক অবস্থা দেখানোর জন্য স্কুল খুলে দেওয়া হলো। চারদিকে ভীতিকর পরিস্থিতি। আমাদের স্কুলে তখন খুব বেশি বাচ্চা ছিল না। কিছু কিছু বাচ্চা আসত। ক্লাসও হতো।
সমকাল : তখন তো আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যেতেন। ওখানে কী দেখতেন?
এডলিন মালাকার : লোকজনের চলাচল খুব কম ছিল। ক্লাস হতো কি-না সেটি এখন আমার মনে নেই।
সমকাল : ধানমণ্ডি এলাকা ছাড়লেন কবে?
এডলিন মালাকার : ঢাকায় বিমান আক্রমণ বেড়ে গেলে আমরা বাড়ি পরিবর্তন করে জিগাতলায় আমার স্বামীর এক বন্ধুর বাড়িতে গেলাম। নভেম্বরের দিকে আমরা বাড়ি পরিবর্তন করে বংশালে চলে গেলাম। সে বাড়িতে অনেক মুক্তিযোদ্ধার যাওয়া-আসা ছিল। পাকিস্তানিরা তখন ছোট বিমানে করে বোমা ফেলছিল। মাঝে মাঝে হেলিকপ্টারও উড়ছিল। তখন কেউ কেউ বলছিলেন, এটা কি ভারতীয় বাহিনীর কাজ? পরে বোঝা গেল, এগুলো পাকিস্তানিদেরই কাজ। এ অবস্থায় বংশালে আমরা নিরাপদ বোধ করলাম না। সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা ঢাকার কাছেই বাঘৈরে গেলাম।
সমকাল : আপনারা বাঘৈর গেলেন কবে?
এডলিন মালাকার : এটা সম্ভবত ৩ ডিসেম্বরের পর।
সমকাল : পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?
এডলিন মালাকার : বাঘৈরে থাকতেই খবর পেলাম। খবরটি রেডিওতে প্রচারিত হওয়ার পর সবার মুখে মুখে ফিরছিল। আমিও সেভাবেই শুনেছিলাম। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণে সবাই ছিল উৎফুল্ল। আমরাও বাড়ির ছাদে উঠে উল্লাস প্রকাশ করেছিলাম। অনেক দিন পর খুব মজা হয়েছিল।
সমকাল : ঢাকায় ফিরলেন কবে?
এডলিন মালাকার : ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে, বিকেলের দিকে। আমরা সবাই একসঙ্গে ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়েছিলাম। মনে আছে, অনেকে মিলে ফিরেছিলাম।
সমকাল : ঢাকায় এসে কী দেখলেন?
এডলিন মালাকার : ঢাকায় এসে দেখলাম বেশ আনন্দঘন পরিবেশ। কিছু আতঙ্ক ছিল। কিন্তু তার চেয়ে বেশি ছিল আনন্দ। পরে রায়েরবাজারে বুদ্ধিজীবী হত্যার খবর পেয়ে হতবাক হয়েছিলাম। ডা. আলিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়েছিলেন। তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল আলবদররা। আমার বড় ছেলে অনেক দিন আলিম চৌধুরীর বাসায় ছিল। ঢাকায় এসে খবর শুনে আমরা আলিম চৌধুরীর বাসায় গেলাম। শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ছিলেন। সেখানে কান্নার রোল পড়ে গেল।
সমকাল : রায়েরবাজারে গিয়েছিলেন?
এডলিন মালাকার : গিয়েছিলাম, কয়েক দিন পর। কোনো লাশ বোধহয় ছিল না। কিন্তু সেখানে তখনও অনেক লোক। অনেক মানুষ তখনও নিখোঁজ। তারা স্বজনদের খুঁজছিলেন।
সমকাল : আপনারা মুক্তিযোদ্ধাদের কীভাবে সাহায্য করতেন?
এডলিন মালাকার : আমি শ্যামলী নাসরিন এবং আমার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কাজ করতাম। শ্যামলী নাসরিনের মাও মুক্তিযুদ্ধে অনেক কাজ করেছেন। অর্থ সংগ্রহ, ওষুধ সংগ্রহ এবং তা পেঁৗছানো, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করা_ এভাবেই ঢাকা শহরের নারীরা তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। অনেকে নার্সিংয়ে চলে গিয়েছিলেন। কবি সুফিয়া কামাল (আমাদের সুফিয়া খালা) নানাভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। সুলতানা কামাল এবং সাঈদা কামাল কলকাতায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নার্স হিসেবে কাজ করেছেন। আয়শা খানম, নার্গিস, রত্না, ফৌজিয়া, রোকেয়া কবীর_ তারা সবাই সীমান্তের ওপারে থেকে কাজ করেছেন। সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও এটা কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এটাও ছিল বড় একটা যুদ্ধ। আর যেসব নারী তখন ঢাকা শহরে ছিলেন, তাদের জীবনও ছিল অনেক বড় ঝুঁকির মধ্যে। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করার চেষ্টা করতাম। শীতকাল চলে এসেছিল। পরিচিত বাড়ি ঘুরে অনেক কাপড় জোগাড় করেছিলাম। এক দিন শিল্পী হাশেম খানকে বললাম, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু কাপড়-চোপড় লাগবে। হাশেম খান এক রিকশা বোঝাই করে কাপড় নিয়ে আসতে গিয়ে এক দিন হঠাৎ আর্মির গাড়ি সামনে পড়ে। তখন বুদ্ধি করে হাশেম খান পাশের একটি লন্ড্রিতে ঢুকে পড়ে। পরে লন্ড্রি থেকে সে কাপড় উদ্ধার করা হয়েছিল।

৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিমান বাহিনীই প্রথম আক্রমণ করে : এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার, বীরউত্তম

সবার বামে কালো সোয়েটার শাদা শার্ট পরা এ কে খন্দকার

মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে ঢাকার আকাশে ঢুকে পড়ে মিত্রবাহিনীর বিমান। সে আক্রমণে পাকবাহিনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস হয়। মুক্তিবাহিনীর উপ-অধিনায়ক এ কে খন্দকার জানান, প্রথম আক্রমণে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলটরা ছিলেন। ৩ ডিসেম্বরের পরের যুদ্ধপরিস্থিতি, যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম, ১৬ ডিসেম্বরে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বিমান বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে।
বিস্তারিত সাক্ষাৎকার পড়ূন পৃষ্ঠা-৫
......................................
এ কে খন্দকারের জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৩০ সালে। মুক্তিবাহিনীর উপ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান এয়ারফোর্সে কমিশন লাভ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন উইং কমান্ডার। প্রবাসী সরকার তাকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি দেয়। পরে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মুক্তিবাহিনীর উপ-অধিনায়ক হিসেবে তার কাজ, ডিসেম্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধ ও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ


সমকাল : বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী ও এর নেতৃত্বের কর্মতৎপরতায় কি পরিবর্তন এসেছিল?
এ কে খন্দকার : যৌথ বাহিনী বলতে বোঝায় দুটি বাহিনীর এক হয়ে যুদ্ধ করা। সত্য কথা বললে, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই এটা চলছিল। আমরা যুদ্ধ করছিলাম আর ভারতীয় বাহিনী আমাদের সাহায্য করছিল। এই প্রক্রিয়াটা চলছিল সমানভাবে। পরে দুই সরকারের মধ্যে আলোচনা করে যৌথ বাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনী মিলে যৌথ বাহিনী গঠন করে। যৌথ বাহিনী সক্রিয় হওয়ার পর আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করতে আরম্ভ করলাম। অনেক জায়গায় তারা আমাদের সাপোর্ট দিতে আরম্ভ করল। কোনো কোনো জায়গায় তারা এবং কোনো কোনো জায়গায় আমরাও নতুনভাবে আক্রমণ করতে আরম্ভ করলাম। এভাবে ৪ ডিসেম্বর থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হলো। একটি কথা বলে রাখা দরকার, এই অভিযান শুরু হওয়ার অনেক আগেই যুদ্ধ করার মতো মানসিক এবং শারীরিক সামর্থ্য পাকিস্তানের ছিল না। কারণ, মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে তারা এমনভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিল যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। তাছাড়া তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা খুব বেশিদিন ছিল না। ভারত মিত্রবাহিনী হিসেবে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার ফলে যুদ্ধের গতিটা অনেক বেড়ে গেল। ৩ ডিসেম্বর শেষ রাতে যে যুদ্ধ আরম্ভ হয়, তাতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীই প্রথম আক্রমণ করে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে পাকিস্তানি টার্গেটে প্রথম আক্রমণ করে। তারা নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে এবং ফিউয়েল ডাম্পে আক্রমণ করে দুটিকে এমনভাবে ধ্বংস করে যে, পাকিস্তানি বাহিনীর যেখানে-সেখানে যাওয়া-আসার ক্ষমতা কমে যায়। তাদের তেল সরবরাহ ধ্বংস হয়ে যাবে এটা তারা চিন্তা করতে পারেনি। ৩ তারিখ শেষ রাতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪, ৫, ৬ তারিখের মধ্যেই যশোরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পতন হলো। ওদিকে ঠাকুরগাঁও স্বাধীন হয়ে গেছে। ৭ তারিখেই পাকিস্তানিরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রথম জানাল, যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনা করতে হবে। ইয়াহিয়া তাদের কথায় পাত্তা দিলেন না। তাদের ধারণা ছিল, উত্তর থেকে চীন এবং দক্ষিণ থেকে আমেরিকা উভয়েই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করবে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, তাদের সমর্থন করলেও যুদ্ধে জড়াতে তারা রাজি নয়। আর এদিকে ৯ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে আসা শুরু করল। এ নিয়ে যে আমাদের চিন্তা ছিল না তা নয়। আমাদের চিন্তা ছিল তারা যদি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, তাহলে এটি একটি বড় যুদ্ধে পরিণত হবে। তখন পাকিস্তান ছিল আনন্দে উৎফুল্ল। তাদের মনোভাবটা ছিল এমন_ এই বুঝি যুদ্ধ শেষ হলো। যুদ্ধ শেষে তারাই জিতবে। কিন্তু সপ্তম নৌবহর যখন ইন্দোনেশিয়ায় পেঁৗছেছে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু সাবমেরিন এবং যুদ্ধজাহাজ ভারত সাগরে উপস্থিত হয়। সুতরাং সপ্তম নৌবহরের পক্ষেও কিন্তু বাংলাদেশে যুদ্ধে নেমে পড়া সহজ ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত তারা বঙ্গোপসাগরে আসেনি। যৌথ বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর এই যে যুদ্ধ চলল, সত্যিকার অর্থেই এটি ছিল একটি অসম যুদ্ধ। কারণ আগেই বললাম, পাকিস্তানিদের যুদ্ধ করার মতো শক্তি ছিল না। না মানসিক, না শারীরিকভাবে।
সমকাল : লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএফআর জ্যাকব তার বই 'স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা'য় দাবি করেছেন_ পাকিস্তানি ফরমেশন ও ক্যান্টনমেন্ট এড়িয়ে সরাসরি ঢাকায় আসার আইডিয়াটা তার ছিল। মানেকশ তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।
এ কে খন্দকার : এ সম্পর্কে তাদের মধ্যে কী আলাপ হয়েছিল কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে মতদ্বৈধতা তৈরি হয়েছিল বলা কঠিন। তবে জ্যাকব এটাকে সমর্থন করতেন যে, পাকিস্তানিদের সামরিক অবস্থানগুলো এড়িয়ে যাওয়া। তিনি নিজেও তখন এটি বলেছেন। শক্ত ঘাঁটিগুলোতে সম্মুখ সমরে লিপ্ত না হয়ে তাদের এড়িয়ে যেতে পারাটাই ভালো হবে, এটা তিনি বলেছিলেন।
সমকাল : আপনারা এই পরিকল্পনা জানতেন এবং সমর্থন করতেন?
এ কে খন্দকার : আমরা তো যৌথ বাহিনীতে ছিলাম। ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সদর দফতর_ ফোর্ট উইলিয়ামসে গিয়ে আমি তো তাদের সঙ্গে আলোচনা করতাম।
সমকাল : সেখানে কী ধরনের আলোচনা হতো?
এ কে খন্দকার : যুদ্ধকৌশল নিয়ে আলোচনা হতো। কোন কোন টার্গেটে আক্রমণ চালানো হবে সেসবও আলোচনা হতো। কীভাবে যুদ্ধ চালানো হচ্ছে সে আলোচনাও হতো। সুতরাং আমার পক্ষে জানাটা অনেক সহজ ছিল।
সমকাল : ওই সভায় মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে আর কে কে থাকতেন?
এ কে খন্দকার : আমি একাই থাকতাম। সে সময় জেনারেল এমএজি ওসমানী অতটা ইনভলভ ছিলেন না।
সমকাল : জেনারেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে তখন আপনার আলোচনা হতো?
এ কে খন্দকার : হতো না। তিনি তখন একটু নিশ্চুপ ছিলেন। আর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমি ব্যস্ত থাকতাম।
সমকাল : সামরিক যেসব সিদ্ধান্ত আপনারা গ্রহণ করতেন সেগুলো জানার জন্য তাজউদ্দীন আহমদ আগ্রহী ছিলেন?
এ কে খন্দকার : হ্যাঁ। এসব জানার জন্য তিনি খুব আগ্রহী ছিলেন। তিনি আমার কাছে শুনতেন, যুদ্ধ কেমনভাবে চলছে, কতদিন লাগবে, আমরা জয়লাভ করব কি-না_ এরকম অনেক প্রশ্ন তিনি আমাকে করতেন। আমি পরিষ্কারভাবে তাকে বলতাম, স্যার আমরা জিতবই। জয়ের ব্যাপারে আমার মনে কোনোরকম সন্দেহ ছিল না।
সমকাল : আপনার কি মনে হতো যুদ্ধ ৯ মাসে শেষ হবে?
এ কে খন্দকার : আমি মে মাসে এই কথাটা আমার বন্ধুদের বলতাম যে, ডিসেম্বর মাসে আমরা দেশে ফিরে যাব। কারণ, আমি ভাবতাম এক কোটি শরণার্থীকে খুব বেশিদিন রাখা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বর মাস হবে শীতের মাস। তখন চীন আসতে পারবে না। কারণ, বরফ পড়বে। পাকিস্তানিরা পশ্চিম সীমান্ত থেকে এসে এখানে যুদ্ধ করতে পারবে না। অথচ ভারতে সমস্ত সুবিধা থাকবে। সে জন্য ভারত মিত্র হিসেবে আমাদের সঙ্গে যখন যোগ দেবে তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে এত বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়বে যে, তাদের পক্ষে যুদ্ধ বেশিদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই এ যুদ্ধে জয়লাভ করে ডিসেম্বরেই আমরা দেশে ফিরে যাব।
সমকাল : আত্মসমর্পণের সময় আপনি রেসকোর্সে উপস্থিত ছিলেন। আপনি কখন জানলেন যে, ১৬ তারিখ আপনাকে ঢাকায় আসতে হবে?
এ কে খন্দকার : ১৬ তারিখ সকালে আমি একটা কাজে বের হই। সকাল ১০টার দিকে ফিরে এসে দেখি সবাই আমাকে খুঁজছে। জানতে পারলাম, বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা জেনারেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হননি। জেনারেল এমএজি ওসমানী তখন সিলেট চলে গিয়েছিলেন। তিনি কোথায় আছেন সেটা কেউ জানত না। তখন মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয়, রেসকোর্স ময়দানে যে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে, সেখানে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করব আমি। আমাকে তখনি বলা হলো, তুমি এখনি চলে যাও। দমদম এয়ারপোর্টে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন ভারতীয় প্রতিনিধিরা।
সমকাল : কোথায় এসে আপনি এটা শুনলেন?
এ কে খন্দকার : কলকাতার থিয়েটার রোডের অফিসে। সেখানেই আমাদের হেডকোয়ার্টার ছিল।
সমকাল : আপনার সঙ্গে তখন কেউ ছিল?
এ কে খন্দকার : আমার সঙ্গে ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা ও শিশু।
সমকাল : কীভাবে আপনারা দমদম পেঁৗছলেন?
এ কে খন্দকার : তৎক্ষণাৎ একটা জিপে চড়ে আমরা দমদমে পেঁৗছলাম। গিয়ে দেখি, একটা উড়োজাহাজ প্রস্তুত হয়ে আছে। অনেক সিনিয়র অফিসার ভেতরে অপেক্ষা করছেন। আমি উড়োজাহাজে উঠতে যাব এমন সময় দেখি আরেকটি জিপ খুব দ্রুতবেগে জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। দেখতে পেলাম সেই জিপে জেনারেল অরোরা এবং তার স্ত্রীও আসছেন। তারা যখন জিপ থেকে নামলেন, তখন আমি জাহাজে ওঠার সিঁড়ি থেকে একটু পিছিয়ে গেলাম। কারণ, তিনি ছিলেন আমার থেকে অনেক সিনিয়র একজন অফিসার। অথচ তিনি এসে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, না না। তুমিই আগে যাবে। কারণ, তুমি মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। আমি তোমাকে পেছন থেকে অনুসরণ করব। তার এই ভদ্রতাটুকু আমার চিরদিন মনে থাকবে। এই সম্মান মুক্তিবাহিনীর। তারা স্বীকারও করেছেন, মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে কীভাবে পর্যুদস্ত করেছে। তারা সবাই বলেছেন, যুদ্ধটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার একটাই কারণ, মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে একেবারেই কোণঠাসা করে ফেলেছিল।
সমকাল : তারপর?
এ কে খন্দকার : এরপর আমরা উড়োজাহাজে করে আগরতলা গেলাম। ঢাকার ওপর দিয়েই আমরা গেলাম।
সমকাল : ঢাকায় সরাসরি নামলেন না কেন?
এ কে খন্দকার : ঢাকার রানওয়ে তখন এত বিধ্বস্ত ছিল যে নামা যেত না। আগরতলায় গিয়ে দেখি ৭-৮টি হেলিকপ্টার দাঁড় করানো। হেলিকপ্টারে আমরা ঢাকা বিমানবন্দরে এসে পেঁৗছলাম। বিমানবন্দরে এসে দেখি জেনারেল নিয়াজি, জ্যাকবসহ অন্য জেনারেলরা আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছেন। তারপর জিপে করে আমরা সোজা চলে গেলাম রমনা ময়দানে।
সমকাল : রমনা ময়দানে যাওয়ার পথে কী দেখলেন?
এ কে খন্দকার : দেখলাম, হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দু'পাশে অপেক্ষা করছে।
সমকাল : ততক্ষণে কি আত্মসমর্পণ হওয়ার খবরটি ছড়িয়ে পড়েছে?
এ কে খন্দকার : হ্যাঁ। কিছু একটা হচ্ছে এ ধরনের একটি খবর ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছিল। মানুষের মধ্যে ছিল উৎফুল্ল একটা ভাব।
সমকাল : রমনা ময়দানে পেঁৗছে?
এ কে খন্দকার : সেখানে পেঁৗছে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হলো। অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। দুটি চেয়ার ও একটা টেবিল পাতা ছিল। জেনারেল অরোরা এবং জেনারেল নিয়াজি দু'জনেই স্বাক্ষর করলেন। তারপর জেনারেল নিয়াজি এবং অন্য পাকিস্তানি অফিসারদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। কারণ, সে সময় তাদের জীবন ছিল একেবারেই অনিরাপদ। চারদিকে জনগণ চিৎকার করছিল। এতদিন তারা যে অত্যাচার বাঙালিদের ওপর করেছে তাদের সেই শাস্তি দাবি করছিল তারা। কিন্তু সেটা তখন সম্ভব ছিল না। আত্মসমর্পণ করার পর আমাদের দায়িত্ব ছিল তাদের রক্ষা করা। কোনো ক্ষতি হতে না দেওয়া।
সমকাল : এরপর তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হলো?
এ কে খন্দকার : এরপর ক্যান্টনমেন্টে যেখানে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, সেখানে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা সবাই আবার বিমানবন্দরে চলে গেলাম।
সমকাল : সেদিনের বিশেষ কোনো কথা মনে পড়ে?
এ কে খন্দকার : আমার মনে পড়ে, সেদিন অনেক মানুষ আমাকে আলিঙ্গন করেছে। কত মানুষ যে আমার সঙ্গে আলিঙ্গন করেছে তার হিসাব নেই। আলিঙ্গন করে তারা বলেছে, আজ থেকে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব।
সমকাল : তখন আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
এ কে খন্দকার : আমি আল্লাহর কাছে হাজার শুকর করলাম। আমি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা দিতে পেরেছি এটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
সমকাল : এয়ারপোর্ট থেকে আপনারা কোথায় গেলেন?
এ কে খন্দকার : এয়ারপোর্ট থেকে আমরা আবার গেলাম আগরতলায়। আগরতলা থেকে ওই প্লেনে চড়ে আবার এলাম কলকাতায়।
সমকাল : স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরার প্রক্রিয়া কী ছিল?
এ কে খন্দকার : আমার ইচ্ছা ছিল পরদিনই চলে আসার। তখন ওসমানী সাহেব আমাকে আসতে দিলেন না। তিনি বললেন, না ওখানে এখনও বিপদ রয়েছে। আগে সবকিছু ঠিক হোক তারপর যাব। কিন্তু ওখানে থাকতে আমার ভালো লাগছিল না। ১৮-১৯ তারিখে তাজউদ্দীন সাহেবকে বলে আমি একাই চলে এলাম। এসে যারা ছিল তাদের সবাইকে একত্র করে পরদিন সকাল থেকেই আমি কাজ শুরু করলাম, যাতে বিমান বাহিনী পুনরায় দাঁড়াতে পারে। তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর যেসব বিমান ছিল পাকিস্তানিরা গুলি করে সেসব বিমান নষ্ট করে রেখে গিয়েছিল, যাতে আমরা সেগুলো ব্যবহার করতে না পারি। কিন্তু আমরা টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে অন্য বিমানের ছোট ছোট যন্ত্রাংশ খুলে যে বিমানটি সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটি ঠিক করলাম। সেটিতে আমি এবং অন্য একজন ফ্লাই করলাম। তারপর ধীরে ধীরে এয়ারফোর্স গড়ে উঠল।
সমকাল : আপনি অফিস নিয়েছিলেন কোথায়?
এ কে খন্দকার : আমার অফিস ছিল ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের ছোট্ট একটি ঘর। এটি ছিল মাটির নিচে।
সমকাল : ১৬ ডিসেম্বর কতদিন পর ঢাকা ফিরেছিলেন?
এ কে খন্দকার : আমি ঢাকা ছেড়ে ছিলাম ১০ মে। এর আগে আরও দু'বার আমি যাওয়ার চেষ্টা করি। প্রথমবার এপ্রিল মাসের ১-২ তারিখে। কিন্তু গফরগাঁওয়ে পেঁৗছে আমরা দেখি যে নদীতে পানি নেই। লঞ্চ আর সামনের দিকে যাচ্ছে না। আমাদের ফিরে আসতে হলো। দ্বিতীয়বার এপ্রিলের ১৭-১৮ তারিখে আবার আরিচা দিয়ে রাজশাহী হয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করলাম। আরিচা পেঁৗছে আমরা দেখলাম, আরিচা পাকিস্তানি সৈন্যে বোঝাই। দেখলাম, ওখান দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফিরে এলাম। ফিরে এসে চিন্তা করলাম, এতগুলো বাঙালি পাইলট যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত। আমি একা চলে যাচ্ছি কেন? পাইলটরা যুদ্ধ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত কি-না তা আমি জানতাম না। তখন আমি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজার মারফত উইং কমান্ডার বাশারের কাছে খবর পাঠালাম। জুনিয়র অফিসারদের কাছে জানতে চাইলাম, বিদ্রোহ করে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত কি-না। তখন এয়ারফোর্স থেকে বিদ্রোহ করে বের হয়ে যুদ্ধে যাওয়া খুব বড় একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার ছিল। বাশার এবং রেজা জুনিয়র অফিসারদের কাছে জানতে পেল তারা সবাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তখন একজনকে আমরা পাঠালাম কোন রাস্তা নিরাপদ তা যাচাই করার জন্য। দু'দিন পর সে ফিরে এসে আমাদের জানাল। তখন আমরা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হলাম। এটা এ জন্য যে, এক গ্রুপ ধরা পড়লেও অন্য গ্রুপ যাতে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। এরপর ১০ মে পুরো গ্রুপ মিলে আমরা রওনা হলাম। সৌভাগ্যবশত আমরা দু'দলই আগরতলায় গিয়ে পেঁৗছলাম।
সমকাল : আপনি বললেন, ৩ ডিসেম্বর প্রথম যে বিমান আক্রমণ হয়েছিল ঢাকার ওপর তা আমাদের বিমান বাহিনী করেছিল। এটা ঠিক কোন সময়ে?
এ কে খন্দকার : এটা হয়েছিল ৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিটে কিংবা ৩টার দিকে। এখানে একটি বিষয় আমি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করতে চাই তা হলো, আমাদের পাইলটরা রাতেই ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে এসে আক্রমণ করেছিল। ওপর দিয়ে ফ্লাই করে এসে আক্রমণ করলে রাডারে ধরা পড়ার ভয় ছিল। তাই তারা গাছের ওপর দিয়ে এসে আক্রমণ করেছিল। অন্ধকার রাতে গাছের ওপর দিয়ে আসা যে কত বিপজ্জনক তা একমাত্র পাইলটরাই বুঝবে। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে তারা আক্রমণ করেছিল।
সমকাল : বিমান তো দিয়েছিল ভারত?
এ কে খন্দকার : হ্যাঁ। নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড ছিল। ওই এয়ারফিল্ডে গিয়ে আমরা প্রশিক্ষণ আরম্ভ করলাম। আমি গিয়ে ওদের সঙ্গে ফ্লাইও করতাম। তারা কেমন করছে, টার্গেটে ঠিকমতো অ্যাটাক হচ্ছে কি-না, তাদের কোনো অসুবিধা আছে কি-না এসব পর্যবেক্ষণ করতাম। সে সময় ছিল খুব বৃষ্টি। আমরা সবাই ডিমাপুরে একত্র হই ২৮ সেপ্টেম্বর। সেদিন থেকেই বাংলাদেশ এয়ারফোর্র্সের জন্ম। সেখানে আমাদের আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি ছিল না। আমরা শুধু ম্যাপ এবং টাইমিংয়ের ওপর নির্ভর করে ফ্লাই করতাম। আমাদের তো তখন টার্গেট নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে আমরা কীভাবে টার্গেট নির্ধারণ করব? তখন পাহাড়ের ওপর উঠে আমরা একটা সাদা প্যারাসুট ফেলে দিলাম। যাতে ওই সাদা চিহ্ন দেখে আমরা আক্রমণ করতে পারি। আমরা যখন আক্রমণ করতাম তখন সাদা প্যারাসুটটাকে মনে হতো ছোট্ট একটা বিন্দু। ওই বিন্দু দেখে আমরা আক্রমণ করতাম। ওখানে চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। গাছপালা চারদিকে প্রচুর। কেউ যদি প্লেন থেকে পড়ে যেত তাকে আর উদ্ধার করা যেত না। আগেই বলেছি, সে সময় প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। গাছের ওপরে ছিল মেঘ। মেঘ এবং গাছের মাঝখানে ফ্লাই করে পাইলটদের ট্রেনিং নিতে হয়েছে। তাদের মধ্যে গভীর দেশপ্রেম না থাকলে এটা করা সম্ভব হতো না। পাইলটদের মধ্যে ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল, পিআইএর ক্যাপ্টেন আকরাম, ক্যাপ্টেন সাহাব প্রমুখ। এরা ৩ ডিসেম্বরের আক্রমণে ফ্লাই করেছিলেন।

Tuesday, December 7, 2010

ঢাকার চারদিকে মুক্তাঞ্চল :মোস্তফা মহসীন মন্টু


মাহবুব মোর্শেদ
ঢাকার আশপাশ এলাকায় শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ২ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধারা এলাকাবাসীর
সহযোগিতা নিয়ে বেশকিছু শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন। কেরানীগঞ্জকেন্দ্রিক ঘাঁটির নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা মহসীন মন্টু। তার মতে, ঢাকার চারপাশের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা ছিল বলেই মিত্রবাহিনীর পক্ষে সরাসরি ঢাকা আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছিল ৩ ডিসেম্বরের পর। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দুঃসাহসিক নানা অভিযান, ডিসেম্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধ ও গেরিলাযুদ্ধ কৌশল নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে।
বিস্তারিত সাক্ষাৎকার পড়ূন পৃষ্ঠা-৪
...........................................
ঢাকার চারদিকে মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠেছিল


সমকাল : ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আপনাদের বাহিনীর অবস্থান কোথায় ছিল?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : ৩ ডিসেম্বর যখন এয়ার রেইড হয় সে সময়টায় আমি ছিলাম সাভার থানার কাছাকাছি। এর আগে ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আমাদের বড় ধরনের একটি যুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটি হয়েছিল সোনাকান্দা, সৈয়দপুর, মরিচাঘাটে। এক রাত এবং দু'দিন স্থায়ী হয়েছিল সে যুদ্ধ। কেরানীগঞ্জের রুইৎপুর ইউনিয়নের তুলসীখালী, মরিচাঘাট, ধলেশ্বরী নদীর এপার-ওপারে এ যুদ্ধ হয়েছিল। পাক হানাদাররা মানিকগঞ্জ থেকে নবাবগঞ্জ হয়ে কেরানীগঞ্জ আসছিল। তারা নবাবগঞ্জে থাকার সময়ই আমরা তাদের আসার খবর পেয়ে যাই। আমি তখন কেরানীগঞ্জেই ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল প্রায় ৩শ' জন মুক্তিযোদ্ধা। কেরানীগঞ্জের অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছেও আমি তখন খবর পেঁৗছে দেই। ঢাকা শহরের উপকণ্ঠেই কেরানীগঞ্জের অবস্থান। মূলত এখান থেকেই আমরা ঢাকা শহরের অপারেশনগুলো পরিচালনা করতাম। ধলেশ্বরী নদীর দু'দিকে আমরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য ওত পেতে ছিলাম। এদিকে ধলেশ্বর নদীর ঘাটে দুটি নৌকা রেখে বাকি নৌকাগুলো আমরা বন্ধ করে দিই। ওই দুটি নৌকাকে ফেরি বানিয়ে পাক হানাদাররা নদী পার হচ্ছিল। আমরা এটা করেছিলাম তাদের মুভমেন্টকে ধীরগতি করার জন্য। ভোরবেলা তারা ওই নৌকাতে পার হচ্ছিল। সঙ্গে তাদের গোলাবারুদ পার করছিল। এভাবে তারা অর্ধেকেরও বেশি রসদ ও কিছু সৈন্য পার করে ফেলার পর আমরা তাদের আক্রমণ করি। এর আগে আমরা তাদের বুঝতেও দিইনি। নভেম্বর মাস, জায়গায় জায়গায় মাটি ছিল শুকনো এবং ওই জায়গাটা ছিল একটু উঁচু ধরনের। জমিতে রবিশস্য লাগানো হয়েছিল। কথা ছিল, তারা অর্ধেকের বেশি রসদ পার করলেই সংকেত দেওয়া হবে। তখন দু'দিক থেকে আমরা আক্রমণ করব। সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার শুরু হলো। প্রথম ফায়ার ওপেন করেছিল আমার ছোট ভাই। ফায়ার করেই সে বাঙ্কারে চলে গেল। পাক হানাদার বাহিনী তার অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি শুরু করল। আর এদিকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের লোকজনও গাছ থেকে নেমে পড়ল। তারপর আমরা সে অবস্থান থেকে আমাদের লোকজন নিয়ে পাকিস্তানিদের ঘেরাও করি। এ যুদ্ধে তাদের প্রায় ১৫-২০ জন মারা গেল এবং আমাদের হাতে ধরা পড়ল ২৭ জন।
সমকাল : যারা ধরা পড়ল তারা কারা?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : তারা পাঞ্জাব আর্মি। এর মধ্যে একজন ক্যাপ্টেন ছিল।
সমকাল : যুদ্ধ দু'দিন চলল?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : আমরা সারারাত তাদের ঘেরাও করে পজিশন নিয়েছিলাম। পরের দিন তাদের দিক থেকে গুলি কমে এলো। তখন শত্রুর অবস্থান জানার জন্য আমরা এলএমজিতে ৫ রাউন্ড পরপর একটা করে ট্রেসার রাউন্ড সেট করতাম। এই বুলেটটি যাওয়ার সময় আলো ছড়ায়। এভাবে ওরাও ট্রেসার রাউন্ড হিট করছে, আমরাও করছি। সকালের দিকটা একটু ঠাণ্ডা। তখন পাকিস্তানিদের দিক থেকে ওদের ওয়্যারলেস বার্তার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা জোরে জোরে বলছে, রেসকিউ রেসকিউ। ওদের বাকি সিগন্যালগুলো আমরা বুঝতে পারছিলাম না। সে সময় আমরা খবর পেলাম, পাক হানাদাররা এসে বাড়িঘরের দরজা ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমি অনুমান করলাম, তারা এটা করছে লাশ অথবা আহতদের সরানোর জন্য স্ট্রেচার তৈরির কাজে। তখন আমি কিছু ছেলেকে গ্রামের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। তখন ১০-১৫ জন গিয়ে গ্রামে পজিশন নিল। যখনই তারা গ্রামে ঢুকতে যায় তখনই তারা ফায়ার করে। তবে এই সময়ের মধ্যে তারা ১০-১২টি বাড়ির দরজা ভেঙেছিল। সকাল থেকে সারাদিন আমরা ফায়ার করলাম এবং ওখান থেকে আমরা একজন ক্যাপ্টেনসহ ১৫-১৬ জন পাক আর্মিকে গ্রেফতার করলাম। দুপুর ২টার দিকে দুটি পাকিস্তানি স্যাবর জেট এবং একটি হেলিকপ্টার আকাশে কয়েকবার চক্কর দিল। তখন তারা নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্য আটকেপড়া সৈন্যরা দুটি ভেরি লাইট পিস্তল থেকে আকাশের দিকে গুলি করল। আমাদের কাছে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট কোনো অস্ত্র ছিল না। ছিল এলএমজি এবং একটা এমএমজি। সেটা দিয়ে তাদের সঙ্গে ফাইট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবু ৩টা পর্যন্ত যুদ্ধ হলো। ৫টার দিকে আমি আমার ফোর্স নিয়ে হযরতপুর ইউনিয়নের দিকে গেলাম। রাস্তার মাঝখানে আরেকটি সমস্যা তৈরি হলো, গ্রেফতারকৃত সৈন্যরা হাঁটতে চায় না। আস্তে হেঁটে তারা আমাদের মুভমেন্টটাকে স্লো করে দিতে চাচ্ছিল। তখন আমি ক্যাপ্টেনকে বললাম, আমি তো তোমাকে এখন মেরে ফেলব। ক্যাপ্টেন বলল, তুমি তো এখন আমাকে মারবেই। আমি হলেও তোমাকে তাই করতাম। কারণ, আমি তো বন্ধু না। আমরা তো ইচ্ছা করে এখানে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমাদের এখানে জোর করে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়েছে। কারণ, আমরা জানি সম্পূর্ণ বৈরী পরিবেশে যুদ্ধ করে আমরা জয়লাভ করতে পারব না। আর নির্বাচনে তোমরা জয়লাভ করেছ। তার সঙ্গে আমার বেশ কিছু কথাবার্তা হয়েছে। আমার পরিচয় পাওয়ার পর অবাক হয়ে সে আমাকে জিজ্ঞেসা করে_ তুমি ঢাকায়? ইয়াহিয়া সরকার না তোমাকে '৭০-এ ফাঁসির আদেশ দিল। তুমি কনভিকটেড। তুমি জেল থেকে পালিয়ে গেছ। তোমাকে তো খোঁজা হচ্ছে। তোমরা মোস্ট ওয়ান্টেডরা যখন ঢাকায় বসে যুদ্ধ করছ, তখন ঢাকা শহর তো আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। ঢাকা শহরে ইতিমধ্যেই তখন অনেক অপারেশন হয়ে গেছে। এটা ২৮ তারিখের ঘটনা। ভারতীয় সৈন্যবাহিনী তখনও বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। তারপর চরের কাছে এসে দু'জন ছেলেকে বললাম, এদের মেরে ফেল। তখন ক্যাপ্টেন আমাকে বলল, যেহেতু তুমি এদের নেতা। মারলে তুমিই আমাকে মার। তখন আমি ক্যাপ্টেনকে গুলি করলাম। আর আমার সঙ্গের ছেলে দু'জন বাকি সৈন্যদের মেরে ফেলল। মানুষ মারতে খারাপ লাগে। কিন্তু যখন আমি দেখেছি, আমার মা-বোন ধর্ষিত, আমার চোখের সামনে আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে, তখন পাগল হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সমকাল : ঢাকায় আপনারা অপারেশন চালাতেন কীভাবে?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : এটা অনেক লম্বা ইতিহাস। আসলে কেরানীগঞ্জে যুদ্ধ শুরু হয়েছে কিন্তু ৩ মার্চ, ১৯৭১ থেকে। সেদিন আমরা কেরানীগঞ্জের নেক্রোসবাগে প্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প উদ্বোধন করি। সেখানে সুবেদার রফিক নামের বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন অফিসারকে আমরা নিয়ে আসি। তারপর ৯ তারিখে বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগনের বাড়ি পলাউসিয়ায় আরেকটি ট্রেনিং ক্যাম্প উদ্বোধন করা হয়। ২৫ মার্চের আগেই নেক্রোসবাগের মাঠে আমি প্রায় ১০০-১৫০ জন ছেলেকে ট্রেনিং দিয়েছি। ৩-৪টি ব্যাচকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে।
সমকাল : কী ট্রেনিং দেওয়া হতো?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : অস্ত্র ট্রেনিং।
সমকাল : তখন আপনাদের কাছে অস্ত্র ছিল?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : হ্যাঁ, তখন আমাদের কাছে কিছু অস্ত্র ছিল।
সমকাল : অস্ত্রগুলো আপনারা পেলেন কীভাবে?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে যেদিন মতিউর মারা যায়, সেদিন মতিউরের লাশ দেখার জন্য আমাদের ছেলেরা যাচ্ছিল। ছেলেরা পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মন্ত্রী সুলতান আহমাদ চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকলে নিরাপত্তা রক্ষীরা গুলি করে। তখন তার বাড়িতে ভাংচুর চালানো হয়। আমাদের ছেলেরা তখন পুলিশের অস্ত্রগুলো লুট করে নিয়ে আসে। আমি, কামরুল আলম খসরু অস্ত্রগুলো নিয়ে এসে ইকবাল হলে লুকিয়ে রেখেছিলাম। সেখানে আমাদের ৭-৮টি রাইফেল ছিল। পরে ঢাকা শহরের যেসব সিভিল মানুষের বন্দুক ছিল সেগুলোও আমরা নিয়েছিলাম।
সমকাল : অস্ত্রগুলো নিয়েই কেরানীগঞ্জে গিয়েছিলেন?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে আমরা রাত সাড়ে ৯টার দিকে বেরিয়ে এলাম। রাত পৌনে ১২টার দিকে ট্যাঙ্ক মুভ করল এবং সে সময় এসএম হলের গম্বুজে একটি শেল পড়ল। তারপর ট্রেসার রাউন্ডের ফায়ার শুরু হলো। তখন ইকবাল হলে আমাদের যেসব অস্ত্র ছিল সেগুলো দুটি গাড়িতে উঠাচ্ছি। যখন হামলা বেড়ে গেল তখন আমরা বুঝলাম আর পালানোর সুযোগ নেই। আমি প্রথম গাড়িতে। পেছনের গাড়িতে আরেকজন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে এবং জগন্নাথ হলের পাশের রাস্তা দিয়ে আমরা সোজা রমনা পার্কের দিকে চলে গেলাম। অনেক ট্যাঙ্ক তখন গড়গড় করে আসছিল। আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে দু'চারটি গুলিও হয়েছে। কিন্তু গুলি ওভারলুক করে আমরা চলে গেলাম। নবাবগঞ্জে গিয়ে বাড়ি থেকে পরিচিত-অপরিচিত লোকজনকে ধরে নিয়ে এসে আমরা বললাম, আমাদের এগুলো পার করে দাও। তারপর সেই অস্ত্রগুলো নৌকায় করে নিয়ে আমরা নেক্রোসবাগে আসি। এগুলো করতে করতে প্রায় ৩টা-সাড়ে ৩টা বেজে গেল। ঢাকা শহর তখন দাউদাউ করে জ্বলছে। ভাবলাম, যুদ্ধ করার জন্য আমাদের আরও অনেক অস্ত্র প্রয়োজন। তখন আমরা কেরানীগঞ্জ থানার অস্ত্র লুট করার পরিকল্পনা করলাম। থানার কাছে আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব ছিল। তাদের সহায়তায় আমরা থানা ঘেরাও করি। সকাল ৬টার দিকে আমরা থানা আক্রমণ করি। সে সময় ওখানকার ওসি তার বাড়ি থেকে দৌড়ে এসে আমাদের চাবি দিলেন। তালা খুলে আমরা থানার সব অস্ত্র নিজেদের কাছে নিয়ে নিই। সকাল ৬টায় থানার যেখানে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানো হতো, সেখানে আমরা বাংলাদেশের পতাকা ওড়াই। আমাদের কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে সেখানে জাতীয় সঙ্গীতও গায়। এ অস্ত্রগুলোসহ আমরা কেরানীগঞ্জের নেক্রোসবাদে আসি।
সমকাল : ঢাকার ভেতরে অপারেশন করেছেন?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : রমনা মাঠে এবং ঢাকা ক্লাবে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প ছিল। সেখানে আমাদের ছেলেরা অপারেশন চালিয়েছে। এছাড় গ্রীন রোড, নিউ মার্কেট এবং যাত্রাবাড়ীতেও আমাদের ছেলেরা অপারেশন চালিয়েছে।
সমকাল : অপারেশন চালাতে গিয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা কি আপনার মনে পড়ে?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : একবার অপারেশন চালাতে গিয়ে আমাদের দু'জন ছেলে গ্রেফতার হয়। পাক হানাদাররা তাদের ওপর নিদারুণ নির্যাতন চালায়। গায়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়ায় তাদের সমস্ত গায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। পরে আমরা রাজাকারদের ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে এনেছিলাম।
সমকাল : ২নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ হতো কীভাবে?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : ২নং সেক্টরের যোদ্ধাদের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে অপারেশন পরিচালনা করতাম। আমাদের কোনো বিভেদ-বিভাজন ছিল না। যে কোনো অপারেশন হলে সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়তাম।
সমকাল : নভেম্বর নাগাদ মুক্তিযোদ্ধারা পুরো ঢাকা ঘিরে ফেলেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কি ঢাকা দখল করা সম্ভব ছিল?
মোস্তফা মহসীন মন্টু : আমাদের হাইকমান্ড থেকে নিষেধ করা হয়েছিল। সে কারণে আমরা দখল করার উদ্দেশ্যে বড় অপারেশন চালাইনি ঢাকায়। আমাদের বলা হয়েছিল, শক্তি বৃদ্ধি করে শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। যুদ্ধ এত তাড়াতাড়ি শেষ হবে এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে হয় বছরের পর বছর। ১০-২০ বছরেও একটা বিজয় আসে না। আমরাও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম যে, আমরা স্বাধীনতা দেখে যাব না। হয়তো আমাদের পরের প্রজন্ম স্বাধীন দেশ পাবে।

Monday, December 6, 2010

তান্দুয়ায় চলছিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি : হাসানুল হক ইনু


হাসানুল হক ইনুর জন্ম ১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বুয়েটের ছাত্রনেতা হাসানুল হক ইনু ঢাকার আশপাশের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে চলে যান সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায়। সেখান থেকে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে। প্রশিক্ষণের পর তাকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার ভার দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল ভারতের দেরাদুনের অদূরে ছোট শহর তান্দুয়ায়। সেখানে চলছিল রাজনৈতিক কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণের কাজ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ১৪ ব্যাচে ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তান্দুয়ায়। যুদ্ধকালে তান্দুয়া প্রশিক্ষণ শিবিরের অভিজ্ঞতা, মুজিব বাহিনী, মুক্তিবাহিনী বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠন ও রাজনৈতিক কর্মীদের সামরিক তৎপরতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
মাহবুব মোর্শেদ

সমকাল : ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আপনি কোথায় ছিলেন?
হাসানুল হক ইনু : ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আমি ভারতের দেরাদুনের অদূরে তান্দুয়া নামক এক পাহাড়ি শহরের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে ছিলাম। সমতল থেকে প্রশিক্ষণ শিবিরের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭ হাজার ফুট। মুজিব বাহিনীর সবচেয়ে বড় গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল তান্দুয়ায়। আমি সেই গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান ছিলাম। প্রশিক্ষকও ছিলাম।
সমকাল : কী ধরনের প্রশিক্ষণ আপনারা দিতেন?
হাসানুল হক ইনু : আমি সেখানে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষকের দায়িত্বে ছিলাম। বুয়েটে থাকার সময়ই আমরা গ্রেনেড তৈরি থেকে শুরু করে, অস্ত্র চালনাসহ নানা সামরিক অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম। সে অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল। ভারতে যাওয়ার পর শুরুতে আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সমকাল : বিএলএফের কাজ শুরু হয় কখন?
হাসানুল হক ইনু : এপ্রিল থেকে প্রস্তুতি শুরু করলেও মে মাসের প্রথম থেকেই মুজিব বাহিনীর কাজ শুরু হয়। মিত্রবাহিনী যখন ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে তখন একটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষ করে আমরা আরেকটি ব্যাচের প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই সময় পর্যন্ত আমরা ১৪টি ব্যাচ পাঠিয়েছি। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সকে সহযোগিতা করার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল উবানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চার অধিনায়কের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের কলাকৌশল ঠিক করতেন।
সমকাল : প্রশিক্ষণ কি তান্দুয়াতেই শুরু হয়?
হাসানুল হক ইনু : দুটি ট্রেনিং সেন্টার দিয়ে বিএলএফের কাজ শুরু হয়। একটি ছিল মেঘালয়ের হাফলংয়ে। কিন্তু এক ব্যাচের প্রশিক্ষণের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি তান্দুয়াতে ছিল। এখান থেকে গেরিলাদের প্রায় ১৪টি ব্যাচ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মোট হিসাব করলে তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার।
সমকাল : কারা সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন?
হাসানুল হক ইনু : তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠনগুলোর তরুণ নেতা, যারা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন_ তারা তান্দুয়ায় প্রশিক্ষণ নিতেন। তাদের অনেকেই ছিলেন থানা পর্যায়ের নেতা। সেই তরুণ যুবকদের আমরা গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতাম। যুদ্ধের কলাকৌশল এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করতে হয় সেই প্রশিক্ষণও আমরা তাদের দিতাম। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধটি ছিল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ। রাজনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদেরও রাজনৈতিক জ্ঞান থাকা উচিত, রাজনৈতিক আদর্শ থাকা উচিত। সেই হিসেবে ১৯৬৫ সালের পর থেকে যারা জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন সংগ্রামে সামনের কাতারে এসেছেন সেসব যুব এবং ছাত্র নেতাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেই বাছাই করা রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আমরা চেয়েছিলাম যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি থানার রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ পায়। প্রতিটি জেলায় যেন প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক কর্মীরা ছড়িয়ে যেতে পারেন।
সমকাল : কত মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো?
হাসানুল হক ইনু : নূ্যনতম এক মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এত ভালো ট্রেনিং যুদ্ধের সময় আর কেউ পায়নি। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ হতো ৭-১০ দিন। কিন্তু আমরা যে প্রশিক্ষণ প্রদান করতাম তাতে তারা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত হতো। এভাবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমরা প্রশিক্ষিত ১০ হাজার নেতা তৈরি করেছি। তারা অস্ত্র বিদ্যা শিখত, গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শিখত, যুদ্ধবিদ্যা শিখত এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল শিখত। তান্দুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আমি ৫২ জন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করি। এই ৫২ জন প্রশিক্ষকের নেতৃত্বে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দান করি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সহযোগিতা করত।
সমকাল : কোন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠন করা হয়?
হাসানুল হক ইনু : মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের পরিকল্পনায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনে এবং তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরাসরি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের অধীনে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স কাজ করতে শুরু করে।
এর কৌশল ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক। যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ইচ্ছা করলেই প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য এখানে আসতে পারতেন না। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি থানা এবং জেলা থেকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করে নিয়ে আসা হতো। যারা ছাত্র ও যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সে রকম ব্যক্তিকে এখানে প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা হতো। সুতরাং এই কেন্দ্র থেকে যে ১০ হাজার গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন তারা বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী যুব নেতা, ছাত্র নেতা অথবা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের তরুণ নেতা। তারাই এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছেন। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক যু্দ্ধ তাই রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন নেতাদের সামরিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যাতে করে তারা ভেতর থেকে যুদ্ধ করতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক কর্মীরা যুদ্ধ করেনি_ এ ধরনের যে কথাটি প্রচলিত আছে তা ঠিক নয়। বরং বিএলএফের মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায়ের ছাত্র এবং যুব নেতারা এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধও করেছেন।
সমকাল : বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন কারা?
হাসানুল হক ইনু : বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চার জন অধিনায়ক ছিলেন। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ এবং আবদুর রাজ্জাক। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তখন চারটি সেক্টরে ভাগ হয়ে কাজ করত। উত্তরবঙ্গ সেক্টর_ শিলিগুড়ির জলপাইগুড়ির পাঙ্গা নামক স্থানে এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল। এই সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। সহ-অধিনায়ক ছিলেন মনিরুল ইসলাম ওরফে মার্শাল মনিরুল ইসলাম। পশ্চিম অঞ্চলের সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল ভারতের ব্যারাকপুরে। এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমদ। সহ-অধিনায়ক ছিলেন জাসদ নেতা নূর আলম জিকু। প্রয়াত কাজী আরেফ আহমেদ তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। আরেকটি সেক্টর ছিল ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের ভেতরে তুরা নামক স্থানে। ওই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক এবং সহ-অধিনায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ আহমেদ। চতুর্থ সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল আগরতলায়। সেখানকার অধিনায়ক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি এবং তার সহযোগী চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান। তার সঙ্গে সহযোগিতা করতেন আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ। জেনারেল এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীরই একটি বাহিনী ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চারজন অধিনায়ক থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন তিনিই। সাধারণ যে কনভেনশনাল আর্মি সেটা গড়ে উঠেছে অন্যভাবে। আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য ছিল এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে তারা নিজ নিজ থানায় চলে যাবেন। আগে থেকেই বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স সেখানে আশ্রয়স্থল ঠিক করে দেয়। সেখানে কিছু দিন টিকে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। সীমান্ত থেকে সেখানে নিরাপদে পেঁৗছানোর ব্যবস্থা করে দেবে। একবার ভেতরে ঢুকলে জরুরি কাজ ছাড়া তারা আর ভারতে আসবেন না। তারা প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করবেন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। যুদ্ধের রসদও তাদের কাছে সেভাবে দিয়ে দেওয়া হতো। সুতরাং একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়েই কাজটা শুরু করা হয়েছিল।
সমকাল : ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কী হলো?
হাসানুল হক ইনু : তখন প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ব্যাচ আসা বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম দেশে ফেরত এসে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি এবং আমার ৫২ জন প্রশিক্ষক ওখান থেকে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ফেরত আসার জন্য আমি সামরিক সিগনাল চাচ্ছিলাম। কিন্তু আমরা আসলে আসতে পারিনি। আমাদের আসার মতো যানবাহন ছিল না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষও আমাদের আসার মতো কোনো যানবাহন দেয়নি। তাই আমরা ভেতরের যু্েদ্ধ অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
সমকাল : ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের খবর আপনারা পেলেন কীভাবে?
হাসানুল হক ইনু : ওখানে সামরিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমরা আত্মসমর্পণের খবর পেয়েছি। সুতরাং আত্মসমর্পণের ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছে সেটা আমি স্বচক্ষে দেখতে পারিনি।
সমকাল : ওখান থেকে কীভাবে আপনারা ফেরত এলেন?
হাসানুল হক ইনু : ওখান থেকে ট্রেনে করে কলকাতায় আসতে আমাদের ৩-৪ দিন সময় লেগেছে। কলকাতায় এসে একদিন থেকে আমরা দেশের ভেতরে চলে আসি। দেশের ভেতর আসার পর নিজ নিজ এলাকায় আমরা ফিরে যাই।
সমকাল : দেশে ফিরলেন কবে?
হাসানুল হক ইনু : তারিখটা এখন ঠিক মনে নেই। তবে সেটা ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যুদ্ধোত্তর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেরও একটা ব্যাপার ছিল। তাই তারা খুব তাড়াতাড়ি এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়েছিল।
সমকাল : ঢাকা শহরে এসে আপনি কী দেখলেন?
হাসানুল হক ইনু : তখন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, যেমন আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আবদুুল কুদ্দুস মাখন তারা সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ঘাঁটি গেড়ে ঢাকা শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন।
সমকাল : বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের সদস্যদের সঙ্গে এরপর কি আপনাদের যোগাযোগ হতো?
হাসানুল হক ইনু : আমাদের মধ্যে আমরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছি। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর জানুয়ারি মাসের শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে আমরা তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি। আমাদের বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের চার অধিনায়ক বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে অস্ত্র রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে।
সমকাল : সারাদেশে বিএলএফ কত জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
হাসানুল হক ইনু : বিএলএফ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় এক লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। অর্থাৎ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন গড়ে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
সমকাল : যুদ্ধক্ষেত্রে মুজিব বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়েছিল_ এ ধরনের একটি বিতর্ক প্রচলিত আছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
হাসানুল হক ইনু : যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক, আদর্শগত, সামরিক কোনো ধরনেরই বিরোধ ছিল না, এরা ছিল পরস্পরের সহযোগী শক্তি। দু'একটি ক্ষেত্রে বিরোধ হতে পারে, কিন্তু প্রধানত কোনো বিরোধ ছিল না। এমন ছোটখাটো বিরোধ যুদ্ধাবস্থায় হতেই পারে। যে বিতর্কগুলো তৈরি হয়েছে তা পরবর্তীকালের প্রতিক্রিয়াশীল, ক্ষমতা দখলে ইচ্ছুক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়ানো হয়েছিল।

ঢাকার অসংখ্য বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবারিত : মফিদুল হক


মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর ঢাকা ছেড়ে গিয়ে ১৪ এপ্রিল ফিরে আসেন লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সংগঠক মফিদুল হক। উদ্দেশ্য, ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা তৎপরতায় সহযোগিতা করা। এ কাজ করতে গিয়েই দেখেছেন এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের ঢাকা। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন ডিসেম্বরের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আগে-পরের কিছু বিরল অভিজ্ঞতার কথা।
............................
মফিদুল হকের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে, নোয়াখালীতে। ১৯৭১ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এপ্রিলে যখন সবাই ঢাকা ছাড়ছিল তখন পার্টির সিদ্ধান্তে ঢাকায় ফিরে আসেন মফিদুল হক ও তার কয়েকজন সহকর্মী। উদ্দেশ্য, যুদ্ধাবস্থায় পার্টির তৎপরতা বজায় রাখা। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়, বিশেষত ডিসেম্বরে ঢাকা শহরের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ


সমকাল : কোন প্রেক্ষাপটে আপনি ১৯৭১-এ ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন?
মফিদুল হক : আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মার্চে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমি ঢাকা ছেড়ে চলে যাই। সীমান্তে তখন আমাদের একটা সভা হয়েছিল নিলখিয়াতে। তাতে ঠিক হয়, ১৪ এপ্রিল আমরা ঢাকায় ফিরে আসব। সেদিনের কথা বেশ মনে আছে। পহেলা বৈশাখ ছিল সেদিন। ঢাকা থেকে অসংখ্য মানুষ চলে যাচ্ছিল আর আমরা কয়েকজন মাত্র ফিরছিলাম। আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকায় আটকেপড়া নেতাকর্মী-শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। আমার সঙ্গে ছিলেন নিজাম উদ্দিন আজাদ (পরে তিনি সীমান্তে চলে যান গেরিলা ট্রেনিং নিতে। বেতিয়ারা যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। আজাদের মৃত্যুর সংবাদটি আমাদের জন্য খুব কষ্টকর ছিল), নূহ-উল-আলম লেনিন এবং আরও অনেকে। আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকায় একটি নেটওয়ার্ক গঠন করা। এরপর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা সময়টাই আমরা ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকায় ছিলাম। আমাদের কাজগুলো করতে হতো খুব গোপনে। প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করা থাকত। প্রত্যেকেই তার এলাকায় গোপনীয়তা রক্ষা করে কাজ করত। দায়িত্বের মধ্যে ছিল মূলত যোগাযোগ রক্ষা করা, আশ্রয়ের জায়গা ঠিক করা, মুক্তাঞ্চল থেকে আমাদের উদ্যোগে বের হওয়া 'মুক্তিযুদ্ধ' পত্রিকাটি বিতরণ করা। যাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করতাম তাদের মধ্যে ছিলেন কবি শামসুর রাহমান, কাইয়ুম চৌধুরী, নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকী প্রমুখ। তারাও দায়িত্ব পালনে আমাদের নানাভাবে সাহায্য করতেন। ঢাকার গেরিলা তৎপরতায় এখানকার অনেক বাড়ির বিশেষ অবদান ছিল। অসংখ্য বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবারিত। এটা না থাকলে যুদ্ধ চালানো অনেক কঠিন হতো। ঢাকার আশপাশের গ্রামের মানুষও অভূতপূর্ব সহযোগিতা করেছিল।
সমকাল : যুদ্ধের শেষ দিকে ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল?
মফিদুল হক : নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সংঘাত বাড়তে থাকে। তখন শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নিয়ে একটা আশঙ্কা ছিল সবার মধ্যে। কারণ, বোঝা যাচ্ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের শেষ কীভাবে হবে তা উপলব্ধি করা তখন খুব কঠিন ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ছিল একটি সংগঠিত সশস্ত্র বাহিনী। তাদের কাবু করাটাও খুব কঠিন ছিল। নভেম্বরের শেষ দিকে সীমান্তে অনেক অঞ্চল যখন মুক্ত হতে শুরু করল তখন বোঝা গেল যে, যুদ্ধটা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। ভারতীয় বাহিনীও অনেক জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করে। এরপর ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হলো। শুরু হলো সর্বাত্মক যুদ্ধ।
সমকাল : ঢাকায় আপনারা সেটা টের পেলেন কখন?
মফিদুল হক : ঢাকায় আমরা সেটা টের পেলাম ভোরের দিকে। রেডিওর মাধ্যমে আমাদের কাছে খবর পেঁৗছত। বিশেষ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী ও বিবিসি খবরের বড় উৎস ছিল। ইন্দিরা গান্ধী ৩ তারিখ কলকাতার জনসভা শেষ করে দিলি্ল ফিরে গেলেন। রাতে পার্লামেন্টে ভাষণ দিলেন। ভাষণ শেষ হতে না হতেই ঢাকার আকাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পাকিস্তানি বাহিনী লেসার বুলেট আকাশের দিকে ছোড়া শুরু করল। একটু পরেই বোঝা গেল, ভারতীয় বিমান ঢাকার আকাশে ঢুকে পড়েছে। রাডারের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বিমানের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের প্রতিহত করার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করেছিল।
সমকাল : তখন আপনি ঢাকায়?
মফিদুল হক : হ্যাঁ, তখন আমি ঢাকায়। ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে থাকতাম আমরা। ভারতীয় বাহিনী তখন টার্গেট করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোম্বিং করেছিল। বিশেষ করে তারা বোম্বিং করেছিল ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। সে ঘটনাটাই মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঢাকা শহরে তখন মানুষ ছিল খুব কম। কারফিউ জারি করা হয়েছিল। জীবনযাত্রা ছিল অস্বাভাবিক। তবে রাস্তাঘাটে বের হলে মানুষের চোখের ভাষায়ও একটা পালাবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। মিত্রবাহিনীও তখন আস্তে আস্তে ঢাকার দিকে এগোতে লাগল। এ খবরগুলো এখানকার পত্রপত্রিকাগুলোতে বিকৃতভাবে ছাপা হলেও মানুষের মধ্যে তার প্রভাব পড়ত না।
সমকাল : যুদ্ধ চলাকালীন খবরগুলো আপনারা পেতেন কীভাবে?
মফিদুল হক : যুদ্ধ চলাকালে আমরা খবরগুলো পেতাম মূলত বেতারের মাধ্যমে। এগুলোই ছিল আমাদের খবরের মূল উৎস। তবে মানুষ কোনো না কোনোভাবে সব খবরই পেয়ে যেত। ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখ থেকে যে পরিস্থিতি দাঁড়াল তাতে মূল যে প্রশ্নটি উঠল তা হলো, যুদ্ধটা শেষ হবে কীভাবে। আর একটা আশঙ্কা তখন ছিল_ ঢাকায় চূড়ান্ত লড়াই হবে কি-না। এই আশঙ্কা থেকেই চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য যে যার মতো প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তবে সেটা শেষ পর্যন্ত ঘটেনি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকার বাইরেই পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। যদি 'ঢাকা ওয়ার' বলে কিছু হতো তবে ঢাকার অবস্থা খুব ভয়ঙ্কর হতো। কারণ চোখে পড়ার মতো না হলেও যে পরিমাণ বেসামরিক মানুষ ঢাকায় ছিল তার সংখ্যাও ছিল অনেক।
আর পাকিস্তানি বাহিনী কী করতে পারে ৩০ নভেম্বর থেকেই সেটা বোঝা গিয়েছিল। ওষুধ ছিটানোর জন্য ব্যবহৃত ছোট্ট বিমানে করে বোমা নিয়ে এসে তারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ফেলত। প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা এটা করত। এর কোনো সামরিক গুরুত্ব ছিল না। বোমা ফেলার আরেকটি কারণ ছিল। তাদের ধারণা ছিল, এ ধরনের বোমা ফেললে লোকজন মনে করবে ভারতীয় বাহিনী এটা ফেলেছে এবং এর একটি প্রতিক্রিয়া হবে। কিন্তু বিমানের আওয়াজ এবং প্রকৃতি তখন মানুষের জানা হয়ে গিয়েছিল। মানুষ বুঝতে পারত কোনটা পাকিস্তানি এবং কোনটা ভারতীয় বিমান। এর মধ্যে যে বড় ঘটনাটি পাকিস্তানি বাহিনী ঘটাল তা হলো বুদ্ধিজীবী হত্যা।
সমকাল : বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনাটি আপনারা জানতে পারলেন কখন?
মফিদুল হক : বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের একটি। ১৭ ডিসেম্বরের আগে আমরা এটা জানতে পারিনি। ১৭ ডিসেম্বরের সকালে কেউ কেউ জানতে পারলেও বিষয়টি সবাই জানতে পারে ১৮ ডিসেম্বর। এ রকম অনেক নৃশংস ঘটনাই পাকিস্তানি বাহিনী ঘটিয়েছে। তেজগাঁও বিমানবন্দরে একটি এতিমখানার ওপর তারা বোমা ফেলেছিল। তাতে অনেক শিশু মারা গিয়েছিল।
সমকাল : ১৬ ডিসেম্বরে ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল?
মফিদুল হক : ১৬ তারিখে ঢাকায় একটা টেনশন বিরাজ করছিল। ভারতীয় বাহিনীর দুটি দল ঢাকায় ঢুকেছিল। তাদের একটি গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের দিকে এবং অপরটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (এখনকার শেরাটন হোটেল) দিকে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল তখন রেডক্রসের আন্ডারে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা তখন দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছিল ক্যান্টনমেন্টের দিকে। বাইরে ঢাকার দিকে আসার সময়ও পাকিস্তানি বাহিনী গোলাগুলি করেছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে হঠাৎ করে একটা সংঘর্ষ বেধে গিয়েছিল। তখন ভারতীয় বাহিনীও তাদের অবস্থান নিল। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে কিছু পাকিস্তানি সৈন্যের মৃত্যু ঘটে।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবর জানলেন কীভাবে?
মফিদুল হক : আত্মসমর্পণ যে হতে যাচ্ছে এটা ১৬ তারিখ সকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। কারণ, যুদ্ধের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বোঝা যাচ্ছিল একটা যুদ্ধবিরতি ঘটেছে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও মানুষ মুক্তির স্বাদ পেল ১৭ ডিসেম্বর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে চলে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশের পর সেখানে আরেকটি সামরিক সারেন্ডার অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার বাইরে থেকে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারাও ১৭ তারিখে ঢাকায় আসতে শুরু করে। ১৭ তারিখ বিকেলেই বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে শহীদ মিনারে জমায়েত হয়। যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা তো আর ছিল না। অনেকেই সেখানে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। ১৭ তারিখ থেকে মানুষ মুক্তির স্বাদ পেলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতাও কাজ করছিল। বিজয়ের আগে ছিল শঙ্কা। আর বিজয় হওয়ার পর তৈরি হলো বিষণ্নতা।
সমকাল : ১৬ তারিখে আপনি কোথায় ছিলেন?
মফিদুল হক : ১৬ তারিখে আমি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ১৬ তারিখ সকালে আমি ডেমরার দিকে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় এলাম গভর্নর হাউস হয়ে (এখনকার বঙ্গভবন)। ইন্ডিয়ান আর্মি সেখানে বোম্বিং করেছিল। দরবার হলে গিয়ে আমি দেখলাম বোমার আঘাতে ছাদে বিশাল একটা গর্ত তৈরি হয়েছে। মূলত গভর্নর হাউসে এই আক্রমণের ফলেই গভর্নর মালিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সমকাল : কেউ বাধা দিল না?
মফিদুল হক : না, কোনো বাধা ছাড়াই আমি দরবার হলে প্রবেশ করতে সক্ষম হই।
সমকাল : এটা কোন সময়ে?
মফিদুল হক : এটা বিকেলের দিকে কোনো এক সময়ে। তখন অবশ্য আত্মসমর্পণ হয়ে গেছে। এরপর আমি চলে এলাম তেজগাঁও বিমানবন্দরে। জেনারেল অরোরা এবং অন্য ভারতীয় সামরিক অফিসাররা তখন দেশে ফিরে যাচ্ছিলেন। আমি এসে দেখলাম তাদের বিদায়ের দৃশ্য। সেখানে বাঙালি সামরিক অফিসাররাও ছিলেন। মেজর হায়দার ছিলেন। একটা মিলনমেলা হলো সেখানে। আমরা যারা কাজ করতাম তাদের সবার সঙ্গে তো আর দেখা হতো না। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় সেদিন সেটা ঘটে গেল।
সমকাল : নয় মাসে একটি শক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন কীভাবে?
মফিদুল হক : এটা আমরা কেউ পুরোপুরি জানতাম না। উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা জানতেন। আমরা শুধু আদেশ পালন করতাম। নিতুন কুণ্ডু যখন চলে গেলেন, তার গাড়িটা আমাদের দিয়ে গেলেন। আমরা তার গাড়িটা ব্যবহার করতাম। ওই গাড়িটা আমাদের বড় একটা অবলম্বন হয়েছিল। ওই গাড়িটা নিয়েই আমরা বিভিন্ন জায়গায় যেতাম এবং যোগাযোগ রক্ষা করতাম। আমাদের বলা হতো, এখান থেকে ওষুধ নিয়ে ওখানে যাও। এ জিনিসটা ওখানে পেঁৗছে দাও।
সমকাল : আপনাদের নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করতেন কে?
মফিদুল হক : আমাদের নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করতেন কাজী আজিজুল হক, ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম। আগে থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির গোপন তৎপরতা থাকায় আমাদের পক্ষে একটি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়েছিল। নতুন করে নেটওয়ার্ক গঠন করার জন্য তেমন কোনো প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি। এটি ছিল খুব ভালো একটি দিক।
সমকাল : দুই নম্বর সেক্টর বা ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ হতো না?
মফিদুল হক : ফরমাল যোগাযোগের দরকার পড়ত না। ওরা নিজেদের মতো করে কাজ করত। আমরাও। তবে দেখা-সাক্ষাৎ কিছু কিছু হতো। সবাই জানত আমরা যার যার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। যদি ঢাকায় একটা বড় রকমের লড়াইয়ের দরকার হতো তখন হয়তো পারস্পরিক যোগাযোগের দরকার পড়ত।
সমকাল : এমন প্রস্তুতি ছিল?
মফিদুল হক : যদি তেমন ঘটত তবে প্রস্তুতিটা হয়ে যেত। কারণ ঢাকার আশপাশে গেরিলাদের একটা বড় বেল্ট দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বাঙালি প্রস্তুত ছিল।
সমকাল : যুদ্ধের সময় ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের মনোভাব কেমন ছিল?
মফিদুল হক : তারা ছিলেন খুবই স্বতঃস্ফূর্ত। আমাদের সঙ্গে একটা বড় যোগাযোগ ছিল শামসুর রাহমানের। তিনি আমাদের সহযোগিতা করতেন। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। আজাদ ২৫ মার্চের পর শহীদ মধুদার বাড়িতে গিয়ে বুলেটের অনেক খোসা কুড়িয়ে এনেছিল। সে খোসাগুলো নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম শামসুর রাহমানের বাড়িতে। তিনি মধুদাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার কিছু কবিতা আমরা কপি করে পাঠিয়েছিলাম। অবশ্য শাহাদৎ চৌধুরীর পাঠানো কবিতাগুলোই আগে পেঁৗছে গিয়েছিল। কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। ঠাণ্ডা চলে এলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শীতের কাপড়ের প্রয়োজন হয়েছিল। তিনি গায়ের কোটটাও খুলে দিয়েছিলেন। ইমদাদ হোসেনের বাসা ছিল আমাদের একটা বড় কেন্দ্র।
সমকাল : মুনির চৌধুরী বা শহীদুল্লা কায়সার?
মফিদুল হক : মুনির চৌধুরীর সঙ্গে অন্যদের যোগাযোগ ছিল। শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে মাঝে মধ্যে দেখা হতো। তিনি আমাদের পাড়ায় থাকতেন।
সমকাল : ১৬ তারিখের পরের বিশেষ কোনো ঘটনার কথা আপনার মনে পড়ে?
মফিদুল হক : ১৭ তারিখে জেলখানা খুলে দেওয়া হলো। জেলের বন্দিরা দলে দলে বেরিয়ে এসেছিলেন। সরদার ফজলুল করিমও জেলে বন্দি ছিলেন। তিনি জেল থেকে বেরিয়ে আসার পথে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি তখন বাংলা একাডেমীতে কাজ করতেন। পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। রিকশায় একটা ট্রাঙ্ক নিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৭ ডিসেম্বরে শহীদ মিনারের সেই সভার কথাই বেশি মনে পড়ে। বিকেলে অনুষ্ঠান ছিল। সুফিয়া কামাল এলেন। সবার চোখে পানি। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হলো। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। ১৭ তারিখের পর একটা খাতা খোলা হলো থানায়, অনেক মানুষ পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। থানায় গিয়ে তারা ডায়েরি করলেন। খাতা মুহূর্তে ভরে উঠেছিল। সে খাতা এখন কোথায় হারিয়েছে কে জানে!

Saturday, December 4, 2010

ট্রেন ছিল জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত :হারুন হাবীব


হারুন হাবীবের তোলা ছবি, ১১ সেক্টরে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কর্নেল তাহের
মাহবুব মোর্শেদ
৯ মাসে অনেক চেষ্টার পরও মুক্তিযোদ্ধারা কাবু করতে পারেননি কামালপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। অবশেষে ৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ তৎপরতায় মুক্ত হয় কামালপুর। দ্রুততম সময়ে শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর ট্রেনে ঢাকা আসেন হারুন হাবীব। ঢাকা ফেরার সেই ট্রেন ছিল 'জয় বাংলা' স্লোগানে মুখরিত। পথে পথে পুঁতে রাখা মাইনের ভয়ে ট্রেন চলেছে ধীরে ধীরে। ট্রেনে ঢাকা আসতে লেগেছে ৪-৫ ঘণ্টা। বিজয়ের আনন্দে মুখরিত হলেও সে সময় ঢাকাকে মনে হচ্ছিল আতঙ্কিত এক শহর। এ সময়ের মধ্যে মুজিবনগর সরকার কলকাতা থেকে ধীরে ধীরে ঢাকায় চলে আসছে। কামালপুর বিজয় ও মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বের নানা ঘটনার কথা জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবাদদাতা ও ফটোগ্রাফার হারুন হাবীব।
..............................................
লেখক ও সাংবাদিক হারুন হাবীবের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একজন গেরিলা হিসেবে যোগ দেন ১১ নম্বর সেক্টরে। কাজ করেন যুদ্ধকালীন সংবাদপত্র 'জয়বাংলা' ও 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে'র যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের বিরল অনেক মুহূর্তের ছবি তুলেছেন তিনি। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বরের কামালপুর জয়ের কথা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের আখ্যান। তার সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব মোর্শেদ


সমকাল : ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আপনি কোথায় ছিলেন?
হারুন হাবীব : আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ১১ নম্বর সেক্টর টাঙ্গাইলসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা (বর্তমানে শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ) এবং গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের একটা বড় অংশ নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আমি ওই সেক্টরের প্রধান সদর দফতর মহেন্দ্রগঞ্জে ছিলাম।
সমকাল : ডিসেম্বরের প্রথমদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যুদ্ধকৌশলে কী কী পরিবর্তন এলো?
হারুন হাবীব : ২৫ মার্চ থেকে যুদ্ধ শুরু হলেও ডিসেম্বরের প্রথম থেকে যুদ্ধের কৌশলে তাৎপর্যমণ্ডিত একটি পরিবর্তন আসে। এর একটি মূল কারণ হলো, পাকিস্তান যখন পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতকে আক্রমণ করে বসে তখন ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ৩ ডিসেম্বর এ যুদ্ধ শুরু হয়। সেদিন থেকেই ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। যৌথ সামরিক কমান্ড গঠিত হওয়ার পর লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা এই বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন যুদ্ধের কৌশলে প্রকৃতিগত একটি পরিবর্তন আসে। গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেই সময় আমি সীমান্ত অঞ্চলে ছিলাম। তখন আমি দেখেছি, শত শত ভারতীয় সৈন্য সীমান্ত পার হয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত পাকিস্তানি স্থাপনাগুলো বিনষ্ট করতে শুরু করে। আমরা দ্রুতগতিতে লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকি।
সমকাল : আপনাদের সেক্টর কবে যৌথ কমান্ডের অধীনে আসে?
হারুন হাবীব : শুধু আমাদের সেক্টরই নয়, যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী একই কমান্ডের অধীনে আসে। কাজেই বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কমান্ডের সুযোগ তখন ছিল না। পুরো বাংলাদেশের সব কমান্ডারই যে যেখানে ছিল, যৌথ বাহিনী গঠিত হওয়ার পর সবাই যৌথ বাহিনীর কমান্ডের অধীনে আসে। আর সব কমান্ডারের প্রধান ছিলেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।
সমকাল : ৩ ডিসেম্বরের পর আপনারা কোনদিকে অগ্রসর হতে থাকলেন?
হারুন হাবীব : অন্যান্য এলাকার কথা আমি অতটা বলতে পারব না। আমি আমাদের সেক্টরের কথা বলতে পারি। কামালপুর রণাঙ্গন (বর্তমানে এটি জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত) ছিল মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল। এ রণাঙ্গনে শত শত মুক্তিবাহিনী, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছে। নয় মাসের পুরো সময়ই এ রণাঙ্গনে যুদ্ধ হয়েছে। ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল তাহের পা হারিয়েছিলেন এ কামালপুর রণাঙ্গনে। দিনটি ছিল ১৪ নভেম্বর। আমরা কখনও পাকিস্তানের দুর্ভেদ্য এ ঘাঁটি দখল করতে পারিনি। কিন্তু যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এলো তখন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে গেল। আমাদের মধ্যেও নতুন আশার আলো ফুটে উঠল। কারণ গেরিলা যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে পেরেছি ঠিকই কিন্তু সম্মুখ সমরে সব জায়গায় তাদের পর্যুদস্ত করতে পারিনি। তাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র ছিল আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। ভারতীয় বাহিনী আসার ফলে তারা পিছিয়ে গেল। কর্নেল তাহের আহত হওয়ার পর আমাদের সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন ক্যাপ্টেন আজিজ। ৪ ডিসেম্বর সকালে ঠিক করা হলো যেভাবেই হোক আজ কামালপুর আক্রমণ এবং দখল নেওয়া হবে। সেদিন ব্রাহ্মণপাড়ায় শত শত মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনীর সদস্য এসে জমা হয়েছিল। ভারতীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হলো কে সারেন্ডার লেটার নিয়ে কামালপুরে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে যাবে? আমাদের এলাকার একটি ছেলে বসির আহমদ (পরে সে বিডিআরে যোগ দেয় এবং বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করে) রাজি হলো। রাজি হওয়াটা ওই সময় কিন্তু সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কারণ রাজি হওয়ার অর্থই হচ্ছে মৃত্যুকে অবধারিতভাবে মেনে নেওয়া। যাত্রাপথে চারদিকে পেতে রাখা মাইনে কিংবা পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে যে কোনো মুহূর্তেই তার মৃত্যু ঘটতে পারে। মৃত্যুকে অবধারিতভাবে মেনে নিয়েই বসির সারেন্ডার লেটার নিয়ে গেল। তখন আমাদের খুব খারাপ লাগছিল। আমাদের ক্যাম্পটা ছিল ভারতীয় সীমান্তের সনি্নকটে। ফলে সব কিছু দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। আমরা ভাবছিলাম, একটু পরেই বসির হয়তো মৃত্যুবরণ করবে। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে যায় কিন্তু বসির আর ফিরে আসে না। তারপর আনিসুল হক সঞ্জু নামে একটি ছেলে একইভাবে আরেকটি সারেন্ডার লেটার নিয়ে গেল। ভারতীয় এক কর্নেলের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তোমরা আত্মসমর্পণ না করলে আমরা এয়ার স্ট্রাইক করব। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে তারা আত্মসমর্পণ করল না। তখন দেখা গেল মিত্রবাহিনীর অনেক বিমান এসে কামালপুরের ওপর বোমাবর্ষণ করে চলে গেল। এতে করে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে গেল। এরপর আনিসুল হক সঞ্জু আরেকটি সারেন্ডার লেটার নিয়ে গেল। তার বেশ কিছুক্ষণ পর (সম্ভবত) ক্যাপ্টেন আসলামের নেতৃত্বে পাকিস্তান নিয়মিত বাহিনীর সৈন্য এবং রাজাকারসহ মোট ১৭০ জন সারিবদ্ধ হয়ে হাত উঁচু করে বেরিয়ে এলো। তাদের আত্মসমর্পণের দৃশ্যটি আমার স্মৃতিতে এখন ভাস্বর হয়ে রয়েছে।
সমকাল : কামালপুর মুক্ত হওয়ার পর কী দেখলেন?
হারুন হাবীব : পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের পর তাদের দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ ছুটে এলো। আমরা কামালপুর গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাম। দেখি ডজন ডজন মেয়েকে তারা ঘরের মধ্যে ধরে রেখেছে। বহু বাঙালিকেও তারা বেঁধে রেখেছে ঘরের মধ্যে। আমরা তাদের সবাইকে ছেড়ে দিলাম। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো আমরা উদ্ধার করলাম। তারপর মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী মিলে বকশীগঞ্জের দিকে এলাম। বকশীগঞ্জে এসে দেখি চারদিকে পোড়া বাড়িঘর। মানুষজন ভীত-সন্ত্রস্ত। তারপরও মানুষ জয় বাংলা বলে চিৎকার করছে। তাদের মধ্যে ফুটে উঠেছে আশার আলো। ৬ তারিখ আমরা চলে এলাম শেরপুরে। শেরপুর তখন ছিল হিন্দুপ্রধান অঞ্চল। সেখানে এসে দেখি হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তা অবর্ণনীয়। এ অত্যাচার করেছিল মূলত রাজাকার-আলবদররাই। আমরা চারদিকে মার্চ করে পুরো শহর দখল করে ফেললাম। এরপর অগ্রসর হলাম জামালপুরের দিকে। কারণ জামালপুরে পাকিস্তানি সৈন্যরা তখনও রয়ে গিয়েছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের একপাশে শেরপুর এবং অপর পাশে জামালপুর শহর। নদীর ওপার থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের ওপর শেলিং করছিল। শেলিং করতে করতে তারা চুপি চুপি পালিয়ে যাচ্ছিল ঢাকার দিকে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল তাদের পক্ষে আর সেখানে থাকা সম্ভব নয়। ৬-১০ তারিখ পর্যন্ত আমরা ব্রহ্মপুত্রের চরেই থাকলাম। ১০ তারিখ আমরা ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা এবং শেরপুর মুক্ত করলাম।
সমকাল : ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করলেন কখন?
হারুন হাবীব : আমি ঢাকায় ১৬ ডিসেম্বর কিংবা তার আগে আসতে পারিনি। ঢাকায় আসি ১৬ ডিসেম্বরের পর। কারণ ময়মনসিংহে বড় একটা অ্যাকসিডেন্টের শিকার হই। মোটরসাইকেলসহ ট্রাকের নিচে পড়ে যাই। আমার সঙ্গে ছিল সঞ্জু। দুর্ঘটনায় সে এবং আমি গুরুতর আহত হই। ২০ তারিখ পর্যন্ত আমি ময়মনসিংহ হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই রেডিওতে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমপর্ণের খবর শুনেছিলাম।
সমকাল : আপনি ঢাকায় ফিরলেন কবে?
হারুন হাবীব : আমি ঢাকায় ফিরেছি ডিসেম্বরের ২১/২২ তারিখে। ট্রেনযোগে। ট্রেন চলছিল খুব আস্তে আস্তে। কারণ পুঁতে রাখা মাইনের ভয় ছিল তখন। ট্রেনে ঢাকায় আসতে তখন ৪-৫ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ট্রেনে আসার দৃশ্যটাও ছিল অভূতপূর্ব। টিকিট করার কোনো ব্যাপার কিংবা সুযোগ তখন ছিল না। ট্রেনে ছিল মুক্তিযোদ্ধা, ভারতীয় সৈন্য এবং বাস্তুহারা লোকজন। মুক্তিযোদ্ধারা যে যেখানে পারছে ট্রেনে উঠছে, আবার নামছে। জয় বাংলা স্লোগানে গোটা ট্রেন ছিল মুখরিত।
সমকাল : ঢাকায় এসে কী দেখলেন?
হারুন হাবীব : ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখার সুযোগ আমার হয়নি। যুদ্ধে যাওয়ার আগে আমি থাকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ১০৭ নং কক্ষে। গিয়ে দেখি কেউ নেই। সব রুম তালাবদ্ধ। পুরান ঢাকায় নীলাম্বর সাহা রোডে আমার দূরসম্পর্কের এক চাচাতো বোনের বাড়ি ছিল। সেখানে গেলাম। অন্য আত্মীয়-স্বজনদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে আমার বন্ধুবান্ধবদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। ১৬ তারিখ আত্মসমর্পণের পর ঢাকা শহর আনন্দে মুখরিত হলেও সেই সময় ঢাকা শহরকে মনে হচ্ছিল আতঙ্কিত একটা শহর। এ সময়ের মধ্যে মুজিবনগর সরকার কলকাতা থেকে আস্তে আস্তে ঢাকায় চলে আসছে।
সমকাল : দূরে যুদ্ধরত সেক্টরগুলোর ঢাকা শহরের ফেরার ব্যাপারটা কেমন ছিল? ১১ নম্বর সেক্টর ঢাকা শহরে কি আদৌ ফিরেছিল নাকি ময়মনসিংহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল?
হারুন হাবীব : ১১ নম্বর সেক্টর টাঙ্গাইল পর্যন্ত এসেছিল। যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পর পুরো যুদ্ধের কৌশলগত দায়িত্ব ছিল ভারতীয়দের ওপর। ১১ নম্বর সেক্টর ছিল মূলত একটি গেরিলা সেক্টর। প্রায় ২০-২২ হাজার লোক ছিল এ সেক্টরের সদস্য। তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রাম-গঞ্জের মানুষ। ইপিআর সদস্যরাও সংখ্যায় ছিল অনেক বেশি। অন্য সেক্টরগুলোর অবস্থা এ রকম ছিল না। ঢাকায় প্রবেশ করেছিল ৩ নম্বর সেক্টর_ 'এস' ফোর্স। এটা ছিল একটি রেগুলার ফোর্স। মুক্তিযুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি হচ্ছে_ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈনিক যারা বিদ্রোহ করে চলে এসেছিল তাদের সংখ্যা সব মিলিয়ে ৮-৯ হাজারের বেশি নয়। মুক্তিযুদ্ধের মূল ফাইটিং ফোর্স ছিল সাধারণ জনগণ। তারা মূলত ছাত্র, গ্রামের কৃষক এবং তরুণ। তবে আমাদের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। কারণ তাদের নেতৃত্বেই তো সবাই সংগঠিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষকে ট্রেনিং দিয়েছিল তারাই। আর ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তারা মূল ব্যাপারটা কিন্তু ধারণ করেছিল। এ প্রশংসা তাদের দিতেই হবে। কারণ অস্ত্র প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তারা যাবতীয় সহযোগিতা করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ১৭ থেকে ১৮ হাজার সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছে। ভাবতে ভালো লাগে মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর ত্রিপুরায় মুক্তিযুদ্ধের মনুমেন্ট হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য গর্বের ব্যাপার। ত্রিপুরার লোকসংখ্যা তখন ছিল ১৫ লাখ। আর তখন ত্রিপুরায় আমাদের শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে মনুমেন্ট নির্মিত হলো ত্রিপুরায়। অথচ ভারতের ১৭-১৮ হাজার সৈন্য আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দান করলেও আমরা তাদের জন্য আজও কোনো মনুমেন্ট তৈরি করতে পারলাম না।

Friday, December 3, 2010

মোনায়েম খানের রক্ষীরা আতশবাজির মতো গুলি ফুটিয়েছিল : মোজাম্মেল হক, বীরপ্রতীক


মোনায়েমের রক্ষীরা আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ করেছিল :মোজাম্মেল হক
মাহবুব মোর্শেদ
১৯৭১-এর ১৩ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক। কর্মচারীদের সহায়তায় বনানীর বাড়িতে ঢুকে গুলি করেছিলেন গভর্নরকে। এই অপারেশনে মৃত্যু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকের অন্যতম সমর্থক মোনায়েম খানের। অপারেশনের পর তার নিরাপত্তারক্ষী বেলুচ রেজিমেন্টের সদস্যরা আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ করেছিল। সেদিনের সেই বীরত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছেন মোজাম্মেল হক। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সেই অভিযান, ঢাকার অভ্যন্তরে গেরিলা তৎপরতা ও বিজয়ের কথা জানিয়েছেন তিনি।
..................................................................................
মোজাম্মেল হক, বীরপ্রতীক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের নিকটবর্তী ভাটারায়। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন স্টাফ ওয়েলফেয়ার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। কম বয়স সত্ত্বেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করেছেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে। 'ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ' নামে একটি গেরিলা গ্রুপের সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকায় পরিচালিত বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। ১৩ অক্টোবর এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা-পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সে অভিযান, গেরিলা যুদ্ধ ও ডিসেম্বরের ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ

সমকাল :মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সফল অপারেশনের কারণে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন আপনি। ১৩ অক্টোবর এসে এমন একটি দুঃসাহসী পদক্ষেপ কেন নিয়েছিলেন?
মোজাম্মেল : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে অপারেশনটি পরিচালিত হয়েছিল অক্টোবর মাসে। শুধু সম্মুখ সমরে নয়, মনস্তাত্তি্বক যুদ্ধেও যে পাক হায়েনারা পরাজিত হয়েছে_ এটি সারা পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এ অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল। আমার আক্রমণে মোনায়েম খানের মৃত্যুর পর সারা পৃথিবীর কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তানিদের পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা 'ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ' পাকিস্তানি মিলিটারির অ্যামবুশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যখন আবার মেলাঘরে ফেরত যাই তখন আমাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হায়দার সামরিক কায়দায় আমাদের বললেন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ যেহেতু অ্যামবুশে পড়েছে, সেহেতু তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। তাই তাদের দ্বারা গেরিলা অপারেশন অথবা সম্মুুখসমর সম্ভব নয়। তাদের দিয়ে আর্মস-অ্যামুনেশন বহন করা ছাড়া আর কোনো কাজ করানো যাবে না। এ রকম একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে দারুণ হতাশার সৃষ্টি করে। আমরা মনে খুব কষ্ট পাই। ট্রেনিং শেষে প্রায় প্রতিদিন আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতাম ওনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। একদিন উনি ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, প্রত্যেক দিন তোমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? বললাম, স্যার আমাদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠান। তিনি বললেন, তোদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠিয়ে কী হবে? তোরা তো মানসিকভাবে পরাস্ত। আমরা বললাম, না স্যার আমরা মানসিকভাবে পরাস্ত হইনি। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বল কাকে মারতে পারবি? নানা কথার পর আমি বললাম, স্যার আপনিই বলেন কাকে মারব? তিনি বললেন, মোনায়েম খানকে মারতে পারবি? তিনি তার প্রশ্ন শেষ করার আগেই আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মোনায়েম খানকে মারতে পারলে কী দেবেন? তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, ঠিক আছে তাহলে আমি আজই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপকে পাঠিয়ে দেব। বনানী কবরস্থানে মোনায়েম খানের স্ত্রীর কবর অবস্থিত। সেখানেই গরু চরানোর সময় তার গরুর রাখাল শাহজাহানের ও কেয়ারটেকার মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিকল্পনা হয়। তার সাহায্যেই আমরা মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করি।
সমকাল : কখন অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন?
মোজাম্মেল হক : সন্ধ্যার সময়। সন্ধ্যায় যখন শাহজাহান গরু নিয়ে বাসায় ফেরে তখন আমরা তার সঙ্গে মোনায়েম খানের বাড়িতে ঢুকে কলাবাগানে লুকিয়ে থাকি। বাড়ির ভেতর ঢুকে সে মোনায়েম খানের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। তখন মোখলেছ এবং শাহজাহানকে আমরা সরে যেতে বলি। ওরা সরে গেলে আমরা অপারেশন পরিচালনার জন্য সামনের দিকে মার্চ করি। মোনায়েম খান তখন ড্রইংরুমে ছিল। ড্রইংরুম খোলা ছিল। রুমের ভেতর পশ্চিম দিকে মুখ করে সোফায় বসা ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন এবং তার জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল আর মাঝখানে মোনায়েম খান। সে সময় ইন্ডিয়ান স্টেনগানে আমরা ফায়ার ওপেন করি। তখন অস্ত্র আমাদের সঙ্গে বিট্রে করে। এসএমজি থেকে একটা বুলেট বের হওয়ার পর ফেঁসে যায়। চেম্বারে গিয়ে দ্বিতীয় বুলেট আটকে যায়, বুলেট আর বের হয়নি। পরে জানতে পারি, সেই একটি গুলিতেই মোনায়েম খান প্রাণ হারান। তারপর আমরা ৩৬ হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করি। সেটিও বার্স্ট হয়নি। আমরা দৌড়ে তার বাড়ির দেয়াল টপকে বনানী কবরস্থানে চলে যাই। সেখানে দেয়াল টপকানোর সময় আমার পকেটে থাকা হ্যান্ড গ্রেনেডটা পড়ে যায়। আমরা বনানী লেকের দিকে চলে যাই। মোনায়েম খানের বাড়িতে বেলুচ রেজিমেন্টের যে এক প্লাটুন পুলিশ ছিল, তারা সবাই চোখ বুজে শুয়ে ওপরের দিকে আড়াল দিয়ে সিগারেট টানছিল। আমরা চলে যাওয়ার পর তারা আকাশের দিকে ফায়ারিং শুরু করে অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে। তাদের ফায়ারিংয়ে নিউ ইয়ার উৎসবের আতশবাজির মতো আলোকিত হয়ে গিয়েছিল ঢাকার আকাশ। চারদিকে যেমন ছিল গুলির শব্দ, তেমনি আকাশে ছিল আলোর ঝলকানি। রেললাইনে, মোনায়েম খানের বাড়ির পশ্চিম পাশের ময়মনসিংহ রোডে এবং গুলশানেও গুলির শব্দ শোনা গেছে।
সমকাল : অপারেশনের পর কোথায় গেলেন?
মোজাম্মেল হক : অপারেশন শেষ করে আসার সময় আমার ভাতিজা ইস্রাফিল খন্দকারের (এখন উপ-সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ) দোকানের পাশে এসে দরজা নক করে আমি পানি পান করতে চাইলে তিনি আমাকে পানি পান করতে দেন। এরপর এয়ার ফোর্সের সার্জেন্ট আমার জ্যাঠাতো ভাইয়ের কাছে স্টেন দেওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম মোনায়েম খানের সেই দু'জন কর্মচারী মোখলেছুর ও শাহজাহান, আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীক, আমার বাবা, মা সবাই আমার চারপাশে বসা। তারা আমাকে রূপগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বললেও আমি যেতে রাজি হলাম না। আমি বাড়িতেই থাকতে চাইলাম। বাংলা ঘরে আমি শুয়ে ছিলাম। সকালবেলা আমার দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কে? আমার জ্যাঠা মালেক মাস্টারের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, রাতে আকাম করে এসে এখনও ঘরে শুয়ে আছ? আমি বললাম, কেন কী হয়েছে? তিনি বললেন, মোনায়েম খান মারা গেছে। মিলিটারি এসে এখন আমাদের বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দেবে। মোনায়েম খানের মৃত্যুর কথা আমি জ্যাঠার কাছ থেকেই প্রথম শুনতে পাই।
সমকাল : তখন আপনিই যে অপারেশনের মূল নায়ক, সেটি জানাজানি হয়েছিল?
মোজাম্মেল হক : তখন এটা বাইরের কেউ জানত না। যুদ্ধের পর পুরানা পল্টনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গড়ে ওঠে। সেখানে মেজর হায়দার আমাদের একশ' টাকা সম্মানী হিসেবে দেন। সে অনুষ্ঠানে বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়। তিনি আমাকে জানান, পুরস্কারের তালিকায় আমার নাম আছে। পরে পত্রিকায় দেখলাম বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকায় আমার নাম আছে। এরপর বিষয়টি মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তখন থেকেই মানুষ ঘটনাটি জানতে পায়।
সমকাল : ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছিল কখন?
মোজাম্মেল হক : প্রত্যেকটা সেক্টরেই এরিয়াভিত্তিক একেকটি গেরিলা গ্রুপ অপারেশনে পাঠানো হতো। আমাদের পাঠানো হয়েছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ নাম দিয়ে। গ্রুপের সদস্যরা ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা। আমাদের গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৩ জন। আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন এমএ লতিফ। আমাদের অপারেশন করতে হতো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, বনানী ও গুলশানে। মেজর হায়দারের নেতৃত্বে ২ নং সেক্টরের আমাদেরটি ছিল ৭ নং গ্রুপ। জুন-জুলাইয়ের দিকে গ্রুপটি গঠন করা হয়।
সমকাল : ঢাকার কাছাকাছি প্রথম আপনারা আসেন কবে?
মোজাম্মেল হক : জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমরা প্রথম ঢাকায় ঢুকি। আমাদের ট্রেনিং হয়েছিল ভারতে। জুনে আমি ঢাকায় আসি। সরাসরি অস্ত্র ট্রেনিংয়ের আগে ইঞ্জিনিয়ার সিরাজের নেতৃত্বে ঢাকায় একটি গ্রেনেড অপারেশনের গ্রুপ পাঠানো হয়েছিল। সেই অপারেশনে আমি গুলশান অ্যাম্বাসিতে গ্রেনেড চার্জ করি। গ্রেনেড চার্জ করার পর আমাকে প্রশিক্ষণ শিবির মেলাঘরে নিয়ে যায়।
সমকাল : জুনে আপনারা রূপগঞ্জে এলেন। তখন ঢাকায় অপারেশনগুলো কীভাবে করতেন?
মোজাম্মেল হক : প্রতিনিয়তই আমরা ঢাকায় আসা-যাওয়া করতাম। এর মধ্যেই আমাদের অপারেশনগুলো হতো। আমাদের নিজস্ব নৌকা ছিল। বর্ষার সময় আমরা নৌকায় আসা-যাওয়া করতাম। রূপগঞ্জ তখন অনেকটাই মুক্ত এলাকা। সেখানে আমরা অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতাম। রূপগঞ্জ থেকে আমরা শহর এড়িয়ে আমাদের গ্রাম ভাটারা আসতাম, সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্ট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢুকে রেকি করতাম বা অপারেশনগুলো পরিচালনা করতাম।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবর যখন আপনি শুনলেন তখন আপনি কোথায়?
মোজাম্মেল হক : ১৫ তারিখ রাতে আমি ঘোড়াশাল কালীগঞ্জে ছিলাম। কালীগঞ্জে মামার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি রূপগঞ্জ থেকে হেঁটে আসি। ১৫ তারিখ রাতেই শোনা যাচ্ছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। ১৬ তারিখ বিকেলবেলা শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে মামার সঙ্গে আমি গল্প করছিলাম। এমন সময়ই আমি পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পাই।
সমকাল : আত্মসমর্পণের খবরটা আপনারা পেলেন কীভাবে?
মোজাম্মেল হক : হেলিকপ্টারে ছাড়া লিফলেটের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর জানতে পারি। সেই সন্ধ্যা রাতেই মামাদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে আমি ঢাকার দিকে রওনা হই। ১৭ তারিখ সকাল ৭-৮টার দিকে আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করি।
সমকাল : ঢাকায় আসার পথে মানুষের কী প্রতিক্রিয়া দেখেছিলেন?
মোজাম্মেল হক : আসার সময় দেখলাম সব মানুষ আনন্দে আত্মহারা। আনন্দ উদযাপন করতে গিয়েই অনেক মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইনে আহত হয়েছে।
সমকাল : ১৭ তারিখ সকালে ক্যান্টনমেন্টে এসে আপনি কী দেখলেন?
মোজাম্মেল হক : আমি ক্যান্টনমেন্টে এসে দেখি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অস্ত্র পড়ে আছে। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করি। চার-পাঁচটি গরুর গাড়ি ভর্তি অস্ত্র আমি আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। পরবর্তী সময়ে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমাদানের দিন দুই ট্রাক অস্ত্র আমি জমা দেই।
সমকাল : ঢাকা শহরে ঢুকে প্রথম আপনি কী দেখলেন?
মোজাম্মেল হক : শহরের সব মানুষের চোখ-মুখে ছিল মুক্তির আনন্দ। মানুষের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে।