Sunday, November 14, 2010

মানুষকে ইতিহাস বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে চাই না : অরুন্ধতী রায়


অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি কাশ্মীরের শ্রীনগরে আয়োজিত এক সেমিনারে বলেছেন, 'কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়।' এ নিয়ে ভারতে তীব্র বিতর্ক উঠেছে। এ বিতর্কের রেশ ধরে তেহেলকা পত্রিকার পক্ষ থেকে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোমা চৌধুরী। সাক্ষাৎকারটি সমকালের পাঠকদের জন্য অনূদিত হলো


প্রশ্ন : আপনি দিলি্ল ও কাশ্মীরে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র আপনার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনার কথা ভাবছে। রাষ্ট্রদ্রোহ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী? আপনি কি নিজেকে রাষ্ট্রদোহী হিসেবে দেখেন? আপনি যে দিলি্ল ও কাশ্মীরে বললেন 'আজাদিই একমাত্র সমাধান'_ তার পেছনে কারণ কী?
উত্তর : রাষ্ট্রদ্রোহ একটি প্রাচীন ও বাতিল ধারণা, 'টাইমস নাউ' নামে একটি চ্যানেল আমাদের জন্য এটি পুনরাবিষ্কার করেছে। মনে হচ্ছে, চ্যানেলটি উন্মত্তভাবে আমাকে পেড়ে ফেলতে এবং জনতার রুদ্ররোষের শিকার বানাতে চায়। আমি কে এইখানে? একটা টিভি চ্যানেলের জন্য ছোট টার্গেট। এরকম পরিস্থিতিতে একজন লেখককে বিনা বিচারে বলি দেওয়া খুব কঠিন কিছু নয়, আমার মনে হয় তারা সেটাই করতে চায়। আক্ষরিকভাবেই এটি আমাকে উত্ত্যক্ত করছে। আমি এতে মনোবৈকল্যের দেখা পাচ্ছি। আমি যদি ভারত সরকারে থাকতাম তবে একধাপ পিছিয়ে সাম্প্রতিক সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন তুলতাম, কীভাবে একটি টিভি চ্যানেল পোকায় খাওয়া, বাতিল ধারণাগুলো সামনে এনে উন্মত্ততায় বাতাস দিচ্ছে এবং আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। 'কাশ্মীর ইস্যু'কে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেওয়ার নানা চেষ্টা হয়েছে অতীতে আর ভারত সরকারও একে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
এর পেছনে একটা কারণ হলো, আজমির বিস্ফোরণের দায় থেকে শীর্ষ আরএসএস নেতা ইন্দ্রেশ কুমারকে রেহাই দিতে বিজেপি মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা মানুষের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে চায়। যারা খবর তৈরি করার জন্য মরিয়া সেসব মিডিয়ার জন্য এটা ছিল মোক্ষম সুযোগ। আর এরই নেতৃত্ব দিয়েছে টাইমস নাউ। আমার কখনও মনে হয়নি আমি রাষ্ট্রদ্রোহী। 'আজাদিই একমাত্র সমাধান' শিরোনামে আয়োজিত হলেও দিলি্লর সেমিনারে আমি বক্তব্য দিতে রাজি হয়েছিলাম। আমার মতে, যারা প্ররোচিত হতে চায় তাদের প্ররোচিত করার মতো শিরোনাম ছিল সেমিনারটির। কাশ্মীরে গত অর্ধশতাব্দী ধরে যা হচ্ছে তার বাস্তবতায় এই সেমিনার খুব বড় কিছু বলে আমার সত্যিই মনে হয়নি।
শ্রীনগরের সেমিনারের বিষয় ছিল 'কোন পথে কাশ্মীর : আজাদি না গোলামি'। এটা কাশ্মীরের তরুণদের জন্য আয়োজিত। তাদের মধ্যে এই তর্ককে জোরদার করার উদ্দেশ্যে যে, তারা আজাদি বলতে কী বোঝে আর আজাদির কাছ থেকে কী চায়। অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার কোনো ধ্বংসাত্মক আহ্বান নয় এটি, বরং উল্টোটাই। এটি ভাবনাচিন্তার, তর্ককে গভীরে নিয়ে যাওয়ার এবং অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার একটি আয়োজন ছিল।
প্রশ্ন : আপনি সবসময়ই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী। আপনি কেন সৈয়দ আলি শাহ গিলানি এবং বারাবারা রাওয়ের মতো লোকের সঙ্গে একই প্লাটফর্মে, একই দলে গেলেন। তারা তো খুবই গোঁড়া এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করেন। যদি আপনি নাগরিক সমাজের কোনো মঞ্চ থেকে কথা বলতেন তবে হয়তো একজন লেখক বা চিন্তক হিসেবে আপনার বক্তব্য ভিন্নভাবে গৃহীত হতো।
উত্তর : এটা নাগরিক সমাজের প্লাটফর্মই ছিল! এটি এমনসব মানুষের প্লাটফর্ম যাদের কোনো কার্যালয় নেই, তাদের ভিন্নমতেরও নানা মাত্রা আছে। বারাবারা রাও ও গিলানির আদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন বটে। এটাই বলে দেয়, এই প্লাটফর্ম নানা মতের মানুষের, যদিও তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যও আছে। আমি আমার কথা বলেছি। যেভাবে তারা বলেছেন। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে বলিনি আমি হুরিয়াত (গিলানি) বা সিপিআই (মাওবাদী) হয়ে গেলাম। আমি তাই বলেছি, যা আমি ভাবি।
প্রশ্ন : স্পষ্টভাবেই গিলানি শুধু আজাদির পক্ষে বা ভারতবিরোধী নন, কথাবার্তায়ও শরিয়াপন্থি, জামাতপন্থি। কাশ্মীরী নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও তার ভূমিকা ধোঁয়াশাপূর্ণ। আপনি যদি কাশ্মীর প্রসঙ্গে আপনার মতামত ব্যক্ত করবেনই তবে তাদের সঙ্গে জড়ো হয়ে সেটি করলেন কেন? আপনি ভারত রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে তার সমালোচনা করলেন না কেন?
উত্তর : অনেক কাশ্মীরী গিলানির মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন না এবং ভারত রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি না হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে শ্রদ্ধাও করেন। আমার কথা হলো, আমি তার অনেক কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। এ নিয়ে আমি লিখেছি। কথা বলার সময় বিষয়গুলো স্পষ্টও করেছি। আমি বাস করি এমন একটি রাষ্ট্রের প্রধান যদি তিনি হতেন আর তিনি যদি তার মত আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন, তবে আমার সাধ্যমতো সব উপায়ে আমি সেগুলো প্রতিরোধ করতাম।
কিন্তু ঘটনা হলো, তারা কাশ্মীরে আছেন। তাকে ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করা এবং উভয়কে সমানভাবে সমালোচনা করার যুক্তি হাস্যকর। এমনকি ভারত সরকার, এর সর্বদলীয় প্রতিনিধি সভা এবং নতুন 'মধ্যস্থতাকারীরা' পর্যন্ত জানেন কাশ্মীরে যা ঘটছে তাতে গিলানির বৃহৎ অংশীদারিত্ব আছে। এটাও সত্যি যে, তিনি কাশ্মীরী নেতৃত্বের সঙ্গে গৃহবিবাদে লিপ্ত। নব্বইয়ের দশকে সেখানে গোষ্ঠীগত হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোতে গিলানিকে জড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিরোধ আন্দোলনে অন্তর্কলহ নতুন কিছু নয়। এগুলো রাষ্ট্র সমর্থিত হত্যাকাণ্ডের সমান নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও ব্ল্যাক কনসাসনেসের মধ্যে ভয়ঙ্কর লড়াই হয়েছিল। এতে স্টিভ বিকোসহ হাজারো মানুষ খুন হয়েছিলেন। এখন আপনি কি বলবেন, নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে একই মঞ্চে বসা অপরাধ?
সেমিনারে কথা বলে, লিখে, তিনি যা বলছেন তাকে প্রশ্ন করে গিলানি পরিবর্তনের সপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। তিনি এখন যা বলছেন আর কয়েক বছর আগে যা বলেছেন তার মধ্যে তফাত আকাশ-পাতাল। আমি আপনার এই প্রশ্নে অবাক হচ্ছি। যখন রতন টাটা ও মুকেশ আম্বানি নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে প্রকাশ্যে গুজরাট গরিমা পুরস্কার নিলেন এবং তাকে আলিঙ্গন করলেন তখন ক'জন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে? সেটা তো কোনো সেমিনার ছিল না, ছিল কি? টাটা-আম্বানিরা নরেন্দ্র মোদিকে প্রশ্ন করেননি, নিজেদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেননি, মোদির সভাপতিত্বে যে গণহত্যা হয়েছিল তার সমালোচনা করেননি... তারা তাকে সমর্থন করেছেন। তারা বলেছিলেন, মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। সেটা সঠিক অবস্থান, তাই না?
প্রশ্ন : বারাবারা রাওয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। তারা সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছেন, ভারত রাষ্ট্র এখন যেখানে দাঁড়িয়ে তার সমালোচনা করছেন। এই অবস্থান সম্ভবত আপনার সঙ্গে যায় না। মাওবাদী আদর্শে পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় উপায় অস্ত্র হাতে নেওয়া। আপনার কোনো লেখায় আপনি একে সমর্থন করেননি। কাশ্মীরের এমন একটি উচ্ছল সময়ে কেন আপনি বারাবারা রাও ও গিলানির সঙ্গে একই মঞ্চ শেয়ার করলেন?
উত্তর : আমি মাওবাদীদের নিয়ে বিশাল একটি প্রবন্ধে আমার মত জানিয়েছি, এখানে সেই মতকে একবাক্যে সংক্ষেপ করতে চাচ্ছি না। সব বিষয়ে একমত না হলেও আমি বারাবারা রাওকে প্রশংসা করি। কিন্তু আমি এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মাওবাদীদের নিয়ে এবং কাশ্মীরে সংঘটিত ঘটনাবলি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করি। কারণ এখন মিডিয়ার বড় একটি অংশ রক্তচোষা প্রচারযন্ত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, চেষ্টা করছে সবার মাথা থেকে শেষ বুদ্ধিবৃত্তিক ঘিলুটুকু বের করে নিতে। এটা তত্ত্বের বিষয় নয়, এটা মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও আত্মবোধের বিষয়। আগের কোনো সময়ই এটি এতটা সংকটাপন্ন ছিল না।
প্রশ্ন : আপনি কেন এমন একজন মানুষকে সমর্থন করছেন, যিনি কাশ্মীরকে ভারত থেকে আলাদা করে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে চান?
উত্তর : যাকে আমি সমর্থন করছি বলে মনে হচ্ছে সেই লোকটি কে? গিলানি? আপনারা কি সিরিয়াসলি এই প্রশ্ন করছেন? আমি ভারত থেকে আলগা করে নিয়ে কাশ্মীরকে পাকিস্তানে জুড়ে দেওয়ার চিন্তা সমর্থন করেছি কোথায়, সেটি কি আপনারা আমাকে দেখাতে পারেন? গিলানি কি কাশ্মীরে একমাত্র লোক, যিনি কাশ্মীরের আজাদি চান? আমি কাশ্মীরের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করি। এটা গিলানিকে সমর্থন করা থেকে ভিন্ন ব্যাপার।
প্রশ্ন : 'কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। এটা ঐতিহাসিক সত্য।' এই মন্তব্য থেকেই মূলত তর্ক উঠেছে। কেন এ কথা বললেন?
উত্তর : ইতিহাস তো সর্বজনবিদিত। আমি মানুষকে ইতিহাস বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে চাই না। কিন্তু কাশ্মীরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি কি এর অস্পষ্ট ইতিহাসের কারণে তৈরি হয়নি? ভারতীয় সরকার সেখানে ৭ লাখ সৈন্য কেন রেখেছে? মধ্যস্থতাকারীদের ভাষায়, 'তারা কি সেখানে আজাদির রোডম্যাপ তৈরি করছে?' নাকি এলাকাটাকে 'বিবাদপূর্ণ' হিসেবে আখ্যায়িত করছে? আমরা যখন কাশ্মীরের রাস্তার বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করি তখন কেন চোখ ছোট করে ফেলি?

ভাষান্তর : মাহবুব মোর্শেদ

Saturday, November 13, 2010

কাশ্মীর :: আজাদি, অরুন্ধতী রায় ও সৈয়দ আলী শাহ গিলানি


কাশ্মীর আবার তর্কের কেন্দ্রে। বর্ণনায় একটু ভুল হলো, তর্কের কেন্দ্রে এবার শুধু কাশ্মীর নয়, অরুন্ধতী রায়ও। ১৯৪৭ থেকে কাশ্মীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, যুদ্ধ-বিবাদ সবই চলছে সমানে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার অন্যতম অমীমাংসিত ইস্যু এটি। তারা কাশ্মীরের দুটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, নিজেদের মতো করে কাশ্মীর নিয়ে মত ব্যক্ত করে। দুটি দেশের মিডিয়া, মধ্যবিত্ত সমাজের বড় অংশ, রাজনীতিক ও ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো কাশ্মীর প্রসঙ্গে চলতি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তৃপ্ত। ফলে, ভারতীয় ও পাকিস্তানি এ দুই উচ্চকণ্ঠ মতকে ছাপিয়ে সাধারণ কাশ্মীরিদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়নি অনেক দিন। কিন্তু সম্প্রতি কাশ্মীরিদের কিছু কিছু কথা কানে আসছে। তারা বলছেন, কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার সেখানকার জনগণের। প্রশ্ন তুলছেন, ভারত বা পাকিস্তানের শাসকরা কেন তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে? যুদ্ধের বদলে জনমতের ভিত্তিতে কেন কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারিত হবে না? কাশ্মীরিদের কণ্ঠস্বর যখন মৃদুস্বরে ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন ভেতরে-বাইরে পরিস্থিতির মৌলিক কিছু পরিবর্তনও ঘটছিল। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সে সময় পাকিস্তানের ঘরের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। একদা \'জিহাদ\' ও \'জঙ্গিবাদের\' প্রশ্রয়দাতা হিসেবে অভিযুক্ত দেশটি স্বয়ং ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে জঙ্গিবাদ দমনে ব্যস্ত। তার মনোযোগ আর কাশ্মীরে কেন্দ্রীভূত নয়, আফগান সীমান্তের দিকে, নিজের সীমান্ত প্রদেশে। নানা সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তানের মনোযোগ সরে গেলে ক্রমে কাশ্মীরের নিজস্ব কণ্ঠস্বর শক্তি পেতে থাকে। আত্মঘাতী হামলা, প্রশিক্ষিত জঙ্গি ও জিহাদের স্বপ্নে বিভোর মোল্লাদের বদলে রাস্তায় নামতে থাকে সাধারণ মানুষ। বন্দুক-বোমার বদলে তরুণরা হাতে তুলে নেয় ইট-পাটকেল। নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয় সেখানে। এই তরুণদের ওপর থেকে জঙ্গিবাদের ছায়া অনেকটাই অপসৃত। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এরাই নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে। গণতান্ত্রিক ভারত নতুন সংকটের মুখে পড়ে। ২০০৮ সালে কাশ্মীরী তরুণরা যে বিশাল প্রতিবাদ সংগঠিত করেছিল তা বিস্মিত করে দেয় অনেককে। ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করেন। অরুন্ধতী রায় বলেন, কাশ্মীর থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। বছর দুয়েক আগে দেওয়া এই বক্তব্য অনেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। শুধু সৈন্য প্রত্যাহারের দাবিই নয়, সেখানকার নাগরিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ করছিলেন তিনি। কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতিও ছিল তার পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে। আর এ কথা অরুন্ধতীর শত্রুও স্বীকার করেন যে, এসব ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্বচ্ছ, স্পষ্ট ও স্বাধীন_ কারও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তিনি কথা বলেন না। অরুন্ধতী ১৯৯৭ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ পুরস্কার তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল বিশ্বের। তাকে নিয়ে সাহিত্যজগতে বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তিনি সাহিত্য নয়, সক্রিয়তা দিয়ে নিজের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। অর্জন করেছেন অ্যাক্টিভিস্ট পরিচয়।
এই অরুন্ধতী গত ২৪ অক্টোবর কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে বলেন, \'কাশ্মীর কখনই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না।\' আলোচনার বিষয় ছিল_ \'কোন পথে কাশ্মীর : দাসত্ব নাকি আজাদি?\' সভায় কাশ্মীরের চলমান অস্থিরতা বিষয়ে বলতে গিয়ে অরুন্ধতী ঔপনিবেশিক শক্তি হয়ে ওঠার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন ভারতকে। তার এ বক্তব্য ঝড় তোলে। তাৎক্ষণিকভাবে পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি চলতে থাকে। কংগ্রেস ও বিজেপি_ ভারতের দুই প্রধান দল বক্তব্য প্রত্যাহার দাবি করে। বিজেপি দাবি তোলে, অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা করা হোক। মামলার কথা জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছিল। কিন্তু ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে মামলা করার ইচ্ছা ভারত সরকারের নেই। এটি করে ভারতীয় সরকার যথেষ্ট প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত চরম ভিন্নমতও সমালোচনা সহকারে গ্রহণ করতে পারে, এমন একটি ধারণা জনমনে তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা বা গ্রেফতার পরিচালনা করলে তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতেন এবং বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার সমর্থন তার দিকে যেত। মামলা না করায় বিরুদ্ধ-মতের বুদ্ধিজীবী কলামিস্টরা অরুন্ধতীকে ধুয়ে দিতে পারছেন। অবশ্য ভারত সরকারের মধ্যেও একটি অংশ মনে করে, কাশ্মীরকে \'আজাদি\' দেওয়া যায়। হয়তো সেটা সীমিত, কিন্তু তার নাম আজাদিই।
অরুন্ধতীর বক্তব্যের পর সবচেয়ে মজার প্রশ্ন তুলেছেন কাশ্মীরের অ্যাক্টিভিস্ট ড. সাবির চৌধুরী। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, \'পাকিস্তানের মধ্যে কি সত্য কথা বলার মতো একজন অরুন্ধতী তৈরি করা সম্ভব?\' ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেখানে সেনাশাসন চলছে_ সবই হয়তো সত্য। কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের নীতিও তো ভ্রান্ত। সেখানে তারাও সেনাশাসন চালাচ্ছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। কিন্তু পাকিস্তানে কি এমন একজন লেখক, বুদ্ধিজীবী আছেন যিনি পাকিস্তানের কাশ্মীর-নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন? সাবির চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে না-ই বলতে হবে।
পাকিস্তানে হয়তো তেমন বুদ্ধিজীবী থাকতেও পারেন। কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে বলার পর তাকে দেশে থাকতে দেওয়া হবে, গ্রেফতার করা হবে না_ এমন ভাবা কঠিন।
মামলা না হলেও অরুন্ধতীকে অবশ্য নানা সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিজেপির মহিলা সংগঠনের কর্মীরা তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়া তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। অনেকে বলছেন, অরুন্ধতী কাশ্মীর নয়, নিজেকে নিয়ে বিতর্ক চান। তিনি জঙ্গিবাদীদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছেন। তিনি সৈয়দ আলী শাহ গিলানির মতো প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিমদের দলে ভিড়ে গেছেন। শ্রীনগরের সেমিনারে সৈয়দ আলী শাহ গিলানি উপস্থিত ছিলেন, বক্তব্য দিয়েছেন; ছিলেন আয়োজকদের একজন। ধারণা করা হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হতে পারে। তিনি স্বাধীন কাশ্মীর আন্দোলনের নেতা। সম্প্রতি তার একটি সাক্ষাৎকার ছেপেছে ইন্ডিয়া টুডে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার বিষয়ে কী ভাবছেন? তিনি বলেন, \'আমার বিরুদ্ধে ৯০টি এফআইআর আছে। ৯১টা হলে কিছু যায়-আসে না। ২১ অক্টোবর দিলি্লতে আমি যা বলেছি, শ্রীনগরেও সেই একই কথা বলেছি। এটাই কঠিন বাস্তবতা। জম্মু ও কাশ্মীর বিতর্কিত এলাকা। এটি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ অক্টোবর ভারত এটি দখল করে নিয়েছে।\' গিলানি চান স্বাধীন কাশ্মীর হবে আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র। তাকে প্রশ্ন করা হলো, স্বাধীন কাশ্মীরে কি আপনি অরুন্ধতীকে নেবেন? তিনি উত্তর দেন, যদি তিনি চান তবে কেন নেব না? অবুঝ লোকেও বোঝে, সৈয়দ আলী শাহ গিলানি আর অরুন্ধতী রায়ের মতের মধ্যে তফাত বিস্তর। তেহেলকা পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী বলেছেন, তারা যার যার জায়গা থেকে কথা বলেছেন, এখানে দলে ভেড়ার কোনো ব্যাপার নেই।
এখন কেউ যদি বলেন, অরুন্ধতী কাশ্মীরকে স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছেন, সেটি ভুল হবে। তিনি মূলত মানবাধিকার নিয়েই চিন্তিত। আদর্শ মুসলিম রাষ্ট্র অনেক দূরের যুক্তি। সে যুক্তি দিয়ে তর্কে জেতা যায়, কিন্তু এখনকার দগদগে বাস্তবতা তাতে ফিকে হয় না।

মাহবুব মোর্শেদ : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mahbubmorshed@ymail.com

Tuesday, November 9, 2010

ঈদের পর ...

শীত আসি আসি করছে। উত্তর থেকে মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। ধারণা করা হচ্ছে, লোকে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গিয়ে সঙ্গে শীতের শুভেচ্ছা নিয়ে ফিরবে। নাগরিকরা যখন শীতের জন্য প্রস্তুত তখন রাজনীতি উল্টো দিকে পাল তুলে বসে আছে। পুরো গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ শীতঘুমে কাটিয়ে শীতের প্রাক্কালে শীতঘুম ভাঙার আয়োজন করছে বিরোধী দল। তাদের পক্ষ থেকে অকালে জাগরণের এই ইঙ্গিত থেকে কেউ কেউ ধারণা করছেন, ঈদের পর সত্যিই বোধহয় রাজনীতির মাঠ গরম হয়ে উঠবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতির নিজস্ব কিছু ঋতুবৈচিত্র্য আছে। গরমে মানুষ রাস্তায় নামতে পছন্দ করে না। ফলে গরমের দিনে একান্ত জরুরি না হলে আন্দোলন জমানো কঠিন। বর্ষাতেও তথৈবচ। পানি আর কাদা ভেঙে রাস্তায় নামার ধকল কে আর সইবে? তাই বর্ষাও বাদ। থাকে শুধু হেমন্ত আর বসন্ত। এই সময়ে আন্দোলন জমাতে না পারলে আবার অপেক্ষা পরের হেমন্তের জন্য। ইংরেজি হিসাবে নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি বড়জোর মার্চ পর্যন্ত বাঙালির আন্দোলনের মরসুম। শুধু ঋতু কেন, অন্য হিসাবও আছে। যেমন রমজানের আগে কিংবা রমজান মাসে আন্দোলন হবে না। ঈদের আগে নয়। তবে যে কোনো ঈদের পরে হতে পারে। ঈদের ছুটির লাগোয়া কয়টা দিন হরতাল দিলে লোকে এমনকি অভিনন্দনও জানাতে পারে। কিন্তু লোকে যখন পুরো মুডে থাকে, কাজে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে, তখন হরতাল-ধর্মঘট ইদানীং আর পছন্দ করে না। হরতাল-ধর্মঘট তো বটেই ঢাকা শহরে এখন ছোটখাটো মিছিল করারও জো নেই। একেকটা ছোট মিছিলে ঘণ্টা তিন-চারেকের জ্যাম পড়ে যায়। ফলে পথচারীরা যদি ঘুণাক্ষরে জানতে পারেন কার মিছিল তবে তার জনপ্রিয়তা বাসে বসিয়েই কমিয়ে দেন। সমাবেশ হলে তো কথাই নেই। সরকারি-বেসরকারি যে নেতাই হোক, সমাবেশ করলে ওইদিন তার জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায়। ফলে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের জন্যই সহজ কর্মসূচি হলো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন। আর তাতেও যদি বাধা আসে তবে টিভিতে ক্যামেরা আন্দোলনই একমাত্র উপায়। তাই ভাবছি, ঈদের পর আন্দোলনের কথা যে বলা হচ্ছে সেটা হবে কী করে? তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া হলো, আন্দোলন হবে। মিছিল-সমাবেশ-হরতালে মুখর হয়ে উঠবে রাজধানীর পথঘাট। বিরোধীদের মাঠ থেকে হটাতে পুলিশ নামবে, পুলিশ না পারলে রাজনৈতিক কর্মীরা নেমে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু লোকে সেই আন্দোলনে-সংঘর্ষে খুশি হবে তো? লোকে বলে, আমাদের ভোজ্য তালিকার শীর্ষে নাকি লাউ। লাউ খেতে খেতে ক্লান্ত হলে বিকল্প ব্যবস্থা কদু। আর কদু খেতে ভালো না লাগলে লাউ। আমরা কখনও কদুর ওপর রাগ করে লাউ খাই, অথবা লাউয়ের ওপর রাগ করে কদু খাই। কখনও মনে হয় লাউ ভালো, কখনও কদু। অবশ্য সরকারের শেষ দিক হলে কথা ছিল। পাঁচ বছর লাউ খেয়ে ক্লান্ত হলে লোকে বলত, এবার কদু আনো। ফলে কদু আনার ছলে শেষ দিকে কিছু আন্দোলন রেওয়াজমতো জমতেও পারত। তাই বলে এখনই? ঈদের পরেই? অবশ্য দুর্জনরা বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থাকলে অমন করে করেই সময় কাটায়। সংসদে যাওয়ার নামগন্ধ নেই। মানুষের দাবি-দাওয়া নিয়ে চিন্তা নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। আবার একটা বোঝাপড়ার বোধ আছে। সরকার যখন ক্ষমতায় আছে তখন পাঁচ বছর তো ক্ষমতায় থাকবেই। ফলে সময় কাটানোর একটা উপায় দরকার। সেটা কী হতে পারে। নিজেদের জানানও দিতে হবে, পাঁচটা বছর কাটাতেও হবে। ফলে একেকটা লক্ষ্য তৈরি করার উদ্যোগ। তারই অংশ ঈদের পর আন্দোলন, রোজার পর কঠোর কর্মসূচি, শীতের পর দেশব্যাপী কর্মসূচি, গ্রীষ্মের পর সরকার পতন। রাজনীতিতে সময় এইভাবেই কাটে। ফলে চিন্তার কিছু নেই। ঈদের পর কিছু হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু সত্যিই যদি বিরোধী দল রাজনীতির ময়দানে উষ্ণ হাওয়ার ব্যবস্থা করতে চায়। আগের মতো সংঘর্ষ-সংঘাতে ফিরিয়া যাইতে চায় আর যদি সরকার পক্ষ তাতে তাল দিয়ে গরম বাড়িয়ে তোলে, তবে জনগণের কপালে দুঃখ আছে। শহরে তাৎক্ষণিক বিপত্তির কথা ভুলে গেলেও সুদূরপ্রসারী দুঃখের কথা তো ভুললে চলবে না।

Wednesday, October 27, 2010

পৃথিবীর একমাত্র সত্যি শহর_ ঢাকা :: শংকর


বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক শংকর সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) আমন্ত্রণে। এবারই প্রথম বাংলাদেশে এলেন শংকর। পুরো নাম মণিশংকর মুখার্জি হলেও কয়েক প্রজন্মের বাঙালি পাঠকের কাছে তিনি প্রিয় লেখক শংকর নামে পরিচিত। ১৯৩৩ সালে যশোরের বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ভাগ্যসন্ধানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই হাওড়ায় চলে আসেন। সেখানেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এবং সাহিত্যসাধনার শুরু। জীবনের শুরুতে টাইপিস্ট, ক্লার্কসহ বিভিন্ন কাজ করেছেন। শংকরের বিখ্যাত উপন্যাস 'চৌরঙ্গী' নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত সিনেমা। সত্যজিৎ রায় তারই কাহিনী অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন 'জনঅরণ্য' ও 'সীমাবদ্ধ'র মতো চলচ্চিত্র। ইংরেজি ভাষায় তার বিখ্যাত বইগুলো অনুবাদ হতে শুরু করেছে সম্প্রতি। ২০ অক্টোবর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইইউবির স্থায়ী ক্যাম্পাসে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর শংকর কথা বলেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ, একরামুল হক শামীমও শেরিফ আল সায়ার।


সমকাল : এবারই প্রথম বাংলাদেশে এলেন?
শংকর : বাংলাদেশে এর আগে কখনও সাহিত্যিক হিসেবে আসিনি। পাঠকের সঙ্গে মিলতে এই প্রথম আমার বাংলাদেশে আসা।
সমকাল : আপনার জন্ম তো বাংলাদেশের যশোরে?
শংকর : না। বাংলাদেশে না। বনগ্রামে। বনগ্রাম তখন যশোরে ছিল। পরে পার্টিশনের সময় বনগাঁ আলাদা হয়ে গেছে।
সমকাল : তার মানে দেশভাগের পর এবারই লেখক হিসেবে প্রথম এলেন?
শংকর : দেশভাগের আগেও আসিনি।
সমকাল : কেন বাংলাদেশে এলেন না?
শংকর : যখন হিসাব করলাম তখন দেখলাম যে কলকাতার বাইরে বাঙালি পাঠকদের সন্ধানে আমার প্রথম দিনই গিয়ে উপস্থিত হওয়া উচিত ছিল অর্থাৎ সেই ১৯৫৫ সালেই। সেখানে পেঁৗছাতে আমার জীবনের ৫৫টি বছর কেটে গেল। কেন এই কাণ্ড হয়েছে আমি বলতে পারব না। এর কারণ আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্তু ঘটে গেছে। যখন এখান থেকে টেলিফোনে নিমন্ত্রণ পেলাম, তখন আমি ভাবলাম, এটা কী হলো? 'বনলতা সেন' কবিতায় যেমন জিজ্ঞেস করা হয়েছে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন?' সে কথাটিই মনে হলো তৎক্ষণাৎ। এক-একটা লোভ থাকে জীবনে; সেই লোভটাই ধরা দিল সামনে। প্রথম জীবনে বাবা আমাকে রেগে গিয়ে অকালপকস্ফ বলতেন। অকালপকেস্ফর ফল হলো_ আঠারো-উনিশ বছর বয়সে লিখে ফেললাম। কিন্তু তারপরই বোধহয় ওপরওয়ালা প্রতিশোধ নিলেন। দেখলাম জীবনের অনেক জিনিসপত্র দেরিতেই ঘটে চলেছে আমার ক্ষেত্রে। ৫৫ বছর আগে কী লিখেছি, সেটা হঠাৎ দিলি্ল-ইংল্যান্ড বিভিন্ন স্থান ঘুরে হঠাৎ ইংরেজি মাধ্যমে আবার আমাকে এমনসব জায়গায় এনে পেঁৗছে দিল যেখানে আমার বহুদিন আগেই উপস্থিত হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক, সেটা অন্য কথা।
সমকাল : এখানকার নিমন্ত্রণও তো ইংরেজি অনুবাদের সূত্রেই?
শংকর : শুনলাম এখানে আমাকে যারা ডেকেছেন, তারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে উৎসাহিত হয়ে আমাকে ডেকেছেন অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার পাঠকদের প্রতিও আমার একটা কর্তব্য ঠেকে গিয়েছে। আজ সকালে আমি ভাবলাম_ ঢাকায় এসেছি, দুটো কথা বাংলায় বলব না, এটা কী করে হয়! সে জন্যই ওদের অনুমতি চাইলাম। ওরা সানন্দেই অনুমতি দিলেন। আমার জীবনের প্রথম পর্ব অর্থাৎ প্রথম বইটার কথা কিছু ওদের বলেছি। দ্বিতীয় পর্বটার ব্যাপারে ভেবেছিলাম, যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমের আয়োজন; কয়েকটা কথা ইংরেজিতেই বলি। ইংরেজিতে বলার অসুবিধা অনেক। একবার ভাবতে হয় কী বলব, তারপর আবার ভাবতে হয় কেমন করে বলব। এটা শুধু ভাষার ব্যাপারে লজ্জা পাওয়া নয়। আমার এক বন্ধু সিলেটে আছেন। তিনি বললেন, তোমাদের তো খুব সুবিধে, যেখানে বক্তৃতা করতে যাও কী বলবে একটু ভেবে নিলে এবং বক্তৃতা করলে। আমি সিলেটি, আমাকে তো প্রথমে ঠিক করতে হয় কী বলব, তারপর সেটাকে বাংলায় ট্রান্সলেট করতে হয়। আমি বানিয়ে কিছু বলছি না। এখানে একটা জিনিস দেখে ভালো লাগল যে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি চর্চায় একটা প্রাণের স্পর্শ দেখতে পেলাম। আমার মনে হলো, এটা ভীষণ দরকার। ইংরেজি ছাড়া আমাদের চলবে না। ইংরেজিকে রেখেই আমাদের নিজস্ব সৃষ্টির আনন্দে মত্ত হতে হবে। এবং এটাও শেষ জীবনে এসে বুঝলাম যে, ইংরেজির মাধ্যমে না হলে বিশ্বের অন্যত্র পেঁৗছানো বড় কঠিন। এই চেষ্টা কীভাবে শুরু হয়েছিল? ঠিক একশ' বছর আগে। এই ১৯১০-১১ সালেই রবীন্দ্রনাথ তার ইংরেজি বই ছাপার জন্য কী করেছিলেন সেটা অনেকেই জানেন।
সমকাল : ঢাকায় এসে কেমন লাগছে?
শংকর : চমৎকার অনুভূতি হচ্ছে। এখানকার মানুষের আবেগ আমাকে স্পর্শ করেছে। ঢাকার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে আমার জন্য আনন্দের এবং সমীহের। আমি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি। আমি মনে করি, যে লেখকরা জীবিত অবস্থাতেই তরুণ পাঠকদের কাছ থেকে স্বীকৃতি ও সম্মান পান তারা ভাগ্যবান।
সমকাল : কয়েকটি প্রজন্ম আপনার মুগ্ধ পাঠক। আপনার নিবিষ্ট পাঠকের তালিকায় পঞ্চাশ-ষাট দশকের মানুষ যেমন আছেন, তেমনি আছেন তরুণতর প্রজন্মের মানুষও। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কীভাবে পেঁৗছালেন?
শংকর : জানি না ভাই। দেখলাম, দেখে আনন্দ হলো এটা বলতে পারি। কোনো প্লান করে, পরিকল্পনামাফিক কিছু করিনি। হবে, এটাও ভাবিনি। পেলাম, এটাই জীবনের সার্থকতা।
সমকাল : আপনি যখন লিখতে শুরু করেন তখন বাংলা বই ও বাঙালি পাঠকের অবস্থা কেমন ছিল?
শংকর : আমার মনে হয় না কিছু বদলেছে। এসব তো শেয়ারমার্কেট নয় যে আজ একরকম, কাল একরকম। একটা ধারাবাহিকতা আছে। একটা নিবিষ্ট পাঠকগোষ্ঠী আছে, যারা বাংলা বই পড়তে পছন্দ করে। আর সংখ্যার দিক থেকে যদি বলেন আমরা যত মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলি তাতে আমাদের দাপট তো অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল। সেটার কতটুকু আর হয়েছে? ফরাসি দেশে ক'টা লোক থাকে, ইতালি-স্পেনে ক'টা লোক আছে? তাদের ভাষায় ক'টা লোক কথা বলে? সে তুলনায় আমাদের ভাষাভাষী মানুষের যে প্রাচুর্য রয়েছে তা তো আমরা এখনও কাজে লাগাতে পারিনি। ভাবুন, আমাদের ভাষায় ২৫ কোটি মানুষ কথা বলে।
সমকাল : সম্প্রতি আপনার সম্পর্কে ইন্টারনেটে খোঁজ-খবর করতে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে আপনাকে বাজার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলা হচ্ছে।
শংকর : এটা কে বলেছে আমি জানি না। কেন বলেছে তা-ও জানি না। আমি বইয়ের মার্কেটিং করিনি। যে যেটা করে না বা জানে না সে অভিধা দেওয়া আমাদের জাতীয় ধর্ম। এ প্রশ্নটা আমি একজনের কাছে শুনলাম। আমি বললাম, মার্কেটিং তো বিষয় নয়, ভালো লিখতে পারি কি-না সেটাই বিষয়। তখন বলল, এক ব্যাগ শংকর বের করেছিলেন, সেটা তো মার্কেটিং। আমি বললাম, তুমি কি বাংলা বইয়ের খবর রাখো? বলো তো, কোন বাংলা বইটা সবচেয়ে জনপ্রিয় এখন পর্যন্ত? সে বলল, কোনটা? আমি বললাম, 'ঠাকুরমার ঝুলি'। ঠাকুরমার ঝুলিই আমার বেলায় এসে ব্যাগ হয়েছে। এর মধ্যে মার্কেটিংয়ের কী আছে? যদি বলতে বাজে লিখে প্রতারিত করেছে লেখক তবে তা বলো। ইচ্ছা হলে বলো। আমি তো কোনো কিছু দাবি করিনি।
সমকাল : কিন্তু আপনি তো মার্কেটিং নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন।
শংকর : আমি বিশ্বাস করি বাঙালিকে ব্যবসায় আসতে হবে।
সমকাল : আপনি বলছিলেন, বিত্তসাধনার ব্যাপারে।
শংকর : হ্যাঁ, বিত্তসাধনায় আমি বাঙালির অগ্রযাত্রা দেখতে চাই। আর এজন্য লেখকদের কিছু ভূমিকা থাকতে হবে। আমরা তো আর কিছু পারি না, উৎসাহ দিতে পারি।
সমকাল : আপনি বলছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি পিছিয়েছে।
শংকর : শুধু পশ্চিমবঙ্গ কেন, সব জায়গাতেই পিছিয়েছে। বিত্তসাধনায় আমরা পিছিয়ে গিয়েছি।
সমকাল :আপনি বলছেন এতদিন পর এলাম, এতদিন পর পুনরায় আবিষ্কৃত হলাম_ এবারের ভ্রমণ নিয়ে কি লিখবেন?
শংকর : লোভেরও তো একটা শেষ থাকা দরকার। লোকে বলবে, বুড়ো আর কতদিন জ্বালাবে। এতদিন নাকি একজন ভেবেছে যে, বুড়ো মরে গেছে। বিদায় হয়েছে আর কিছু করবে না। কিন্তু বেঁচে আছে শুনে বলছে, ওরে বাবা বেশি কিছু বলা যাবে না, তাহলে আবার কী করবে কে জানে। আবার গ্যাজ গ্যাজ করতে শুরু করবে। সেজন্য মধ্যদিনের পাখি অনেক সময় চায় গান বন্ধ হোক।
সমকাল : আপনি 'চৌরঙ্গী' লিখলেন। তারপর তো নিউমার্কেট হয়েছে। এখন তো শহর কত বদলেছে।
শংকর : বয়স একটু কম থাকলে নিউমার্কেট নিয়ে লেখা যেত, মন্দ হতো না। কারণ একে একটা যুগ বলতে পারেন। এই যে কতদিন ধরে কত মল-টল কী হচ্ছে! তাতে নিউমার্কেট টিকে থাকবে কি-না জানি না। কিন্তু ব্যবসায়ে বাঙালি, বিত্তের সাধনায় বাঙালির শেষ কতগুলো সাধনার চিহ্ন ওখানে থেকে গেছে। বাঙালির তো কিছুই থাকে না। সবই গেছে। আপনাদের এখানে দেখলাম, এখানে যত ভালো ভালো বাড়ি আছে সব নাকি বাঙালির। আমি বললাম, কেন ভাই আমাকে মিথ্যে কথা বলছ। আমাকে বলল_ না, এটা সত্যি। তার মানে পৃথিবীর একমাত্র সত্যি শহর ঢাকা, যেখানে এখনও বাঙালির বাড়িঘর সব কিছু রয়েছে। এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হচ্ছে। আমাদের ওখানে আর সত্য নেই। আপনাদের এখানে এসে ভালো লাগছে। ফিউচার তো জানি না, তবে বর্তমান বলছে এগুলো বাঙালিদের বাড়ি। এটা কত বড় আনন্দের কথা তা আমি আপনাদের বিশ্বাস করাতে পারব না। ভীষণ আনন্দ পেলাম, জানেন? সত্যি, বিত্তসাধনায় বাঙালিকে আবারও জেগে উঠতে হবে।
সমকাল : লেখক হতে গেলে কী লাগে?
শংকর : লিখতে চাইলেই লিখবেন। এর জন্য তো লাইসেন্স লাগে না। মদের দোকান খুলতে গেলে লাইসেন্স লাগে, ড্রাইভিং করতে চাইলে লাইসেন্স লাগে। লেখক হতে গেলে কোনো অ্যাপ্লিকেশনও করতে হয় না।
সমকাল : আপনি কীভাবে লিখতে শুরু করলেন?
শংকর : সেটা পাকেচক্রে ঘটেছে। আমাদের পরিবার খুব সংগ্রামী ছিল। আমার বাবা যশোরের বনগাঁ থেকে কলকাতার কাছে হাওড়ায় মাইগ্রেট করেছিলেন। আমার বাবা অসুখে ভুগে মারা গিয়েছিলেন তিন সন্তান রেখে। আমি আমার বাবার দ্বিতীয় বিবাহের দ্বিতীয় সন্তান। আমার তেরো বছর বয়সে বাবা মারা যান। আমার মা ইন্স্যুরেন্স পলিসির ওপর ভর করে সংসার চালাতেন। আমার বয়স যখন ১৬ তখন মা আমাকে বলেছিলেন, আমাকে আয় করতে হবে। তখন আমার দেখা হলো নোয়েল ফ্রেড্রিক বারওয়েলের সঙ্গে। তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং ব্রিটিশ বারের সদস্য। তার দফতরে আমি ক্লার্ক হিসেবে যোগ দিলাম। বারওয়েলের উৎসাহে তার দফতরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আমি লিখলাম আমার প্রথম বই। এভাবেই ৭০ রুপি মাসিকে চাকরি করা একটি বালক লেখক হয়ে গেল। আমার অনুতাপ একটাই, আমার নামের মণিশংকর মুখার্জির প্রথম ও শেষ অংশ কেটে ফেলে শুধু শংকর নামেই বের হলো 'কত অজানারে'। ৫০ বছর পরও বইটির কথা মানুষ মনে রেখেছে, এটা আমার আনন্দ। আরও খুশীর ব্যাপার হলো ঢাকা থেকে ফিরে নভেম্বরেই আমি বইটির ইংরেজি অনুবাদ দেখতে পাব। দেরিতে হলো, তবু ভালো।
১৯৫৪ সালে আমি দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে 'কত অজানারে' লিখতে শুরু করেছিলাম। লেখাটি পাঠকপ্রিয় হয়েছিল এবং সেটাই আমার কাল হলো। দেশ পত্রিকার একজন শ্রদ্ধেয় বড় কর্তা চাইলেন বিনাপয়সায় আমি যেন বইটি একজন প্রকাশককে ছাপতে দিই। আমাকে না জানিয়েই তিনি প্রকাশের ব্যবস্থা করে ফেললেন। দেরি না করে বইপাড়ায় গিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বললেন। আমি ছিলাম গরিব কেরানি। আমি তাকে না বলতে পারিনি।
সমকাল : আপনি শহুরে জীবন নিয়ে লিখেছেন মূলত।
শংকর : একটা শহরকে বুঝতে হলে দেখ, সেখানে মানুষের অবস্থা কী? হাউ দে লিভ, লাভ, লাই এবং ডাই। লাই শোয়া অর্থে, আবার মিথ্যা অর্থেও। এই চারটি ব্যাপার খেয়াল করলে একটি শহর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আমি শহরকেই জানি, শহরেই থেকেছি। সেটাই লিখেছি। যে যা জানে তাকে তো সেটুকুর মধ্যেই থাকতে হবে।
সমকাল : শহুরে মধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে আপনি বাংলা ভাষায় অগ্রগণ্য সাহিত্যিক।
শংকর : আমার বিশেষ কিছু দাবি নেই। আমি সেটা বলব না। পাঠকরা ভালোবেসেছে সেটাই আমার সম্বল। তখন বোদ্ধারা বলত বাজে লেখা। এখন সাহেবরা বলছে, তাই হয়তো তাদের মত বদলেছে। তাদের মনে হচ্ছে, তাহলে বোধহয় কিছু থাকলেও থাকতে পারে এর লেখার মধ্যে।
সমকাল : বাংলা ভাষায় আপনার প্রিয় লেখক কারা ছিলেন?
শংকর : অনেকেই ছিলেন। মৃতদের মধ্যে গুরু শরৎচন্দ্র। আর জীবিতদের মধ্যে যাদের পেয়েছি তাদের মধ্যে বিমল মিত্র আছেন, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন। আলী সাহেব আছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী। এদের সঙ্গে আমার যথেষ্ট দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সমকাল : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
শংকর : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

Tuesday, October 26, 2010

পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছো?

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসটি পড়া থাকুক বা না থাকুক, উপন্যাসের একটি লাইন অনেকেরই জানা। 'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছো?' নবকুমার সহযাত্রীদের রান্নাবান্নার সহযোগিতা করার জন্য বনে গিয়েছিল। তার ফিরে আসার দেরি দেখে সহযাত্রীরা ভেবেছিল, নবকুমারকে বাঘে খেয়েছে। তারা নদীর ধারের নির্জন বনে নবকুমারকে রেখে বাড়ি ফিরেছিল। আর নবকুমার বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে সহসা এ প্রশ্নের মুখে পড়েছিল যে, সে পথ হারিয়েছে কি-না? প্রশ্ন করেছিল কপালকুণ্ডলা, উপন্যাসের নায়িকা। এই প্রশ্নের পর নবকুমারের জীবন ও 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাস উভয়ের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। কিন্তু সে কাহিনীর পিছু ধাওয়া করা এখন আমাদের উদ্দেশ্য নয়। পথিকের পথ হারানোর এই কৌতুক ও শ্লেষপূর্ণ বাক্য কেন আমাদের সমাজে এত জনপ্রিয় হলো সেটাই প্রকারান্তরে আমাদের জিজ্ঞাস্য। বাঙালির সমাজ-ইতিহাস গভীর অভিনিবেশ সহকারে পর্যালোচনা করেন তাদের অনেকেই বলেন, বাঙালি পথহারা। অর্থাৎ যে পথে এই জাতির চলার কথা ছিল সে পথে তারা এগিয়ে যেতে পারেনি। কি রাষ্ট্রে, কি রাজনীতিতে, কি ব্যবসায়, কি শিল্পায়নে, কি সাহিত্যে বাঙালির নাকি প্রভূত উন্নতি করার কথা ছিল। কিন্তু বাঙালি তেমন কিছু করতে পারেনি। আজকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক জাতির বাঙালির চেয়ে কম সম্ভাবনা ও মেধা নিয়ে উন্নতির শিখরে পেঁৗছে গেছে। কিন্তু বাঙালির ভাগ্য যে লাউ সেই কদুই রয়ে গেছে। কারণ, আমরা নাকি পথভ্রষ্ট। ভুল পথে এগোতে গিয়ে সহসা থমকে পেছনে ফিরে কেঁচে গণ্ডূষ করাই নাকি আমাদের রীতি। বাংলাদেশ আকারে ছোট। এখানে শহর হোক কি গ্রাম সেখানে পথ হারিয়ে ফেলা বড় কষ্টকর। নিতান্তই শিশু ও ভুলোমন না হলে বাংলাদেশে কোথাও পথ হারানো কষ্টের কাজ। তারপরও 'পথহারা পথিক' আমাদের প্রিয় শব্দবন্ধ। আমাদের কত কবিতা গানে যে পথ হারানোর কথা আছে সে নিয়ে বিশাল গবেষণা হতে পারে। অনেকের মনে পড়বে কবি রবীন্দ্রনাথের গানের সেই বাণী_ 'আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি/ সন্ধ্যাবেলার চামেলি গো/সকাল বেলার মলি্লকা/আমায় চেন কী?' পথিক নিজেই বলছেন এখানে যে, তিনি পথ হারিয়েছেন। কিন্তু পথ খোঁজার কোনো চেষ্টা নেই, তিনি বরং মলি্লকা-চামেলিরা তাকে চিনতে পারল কি-না এ নিয়েই চিন্তিত। বেশ বোঝা যাচ্ছে, পথ হারানো আমাদের কাছে কতটা প্রার্থিত, কতটা আয়াসসাধ্য এবং কত রোমান্টিক ব্যাপার। কেউ কেউ বলেন, বাঙালির যৌথ অবচেতনার ভেতরই নাকি পথ হারানোর ব্যাপারটি কাজ করে। জাতিগতভাবে পথ হারাবার কোনো সমাধান নেই, ফলে ব্যক্তিগতভাবে পথ হারাতেই আমাদের আনন্দ। আমাদের মহাজনরা যে পথে পথ হারিয়েছেন, সে পথেই পথ হারাতে পেরে আমরাও খুশি। কিন্তু মহাজনরা যদি শুনতেন যে, বাঙালির অন্যতম বৃহত্তম নগরী ঢাকায় পথ নিজেই হারাতে বসেছে, তবে কী ভাবতেন? সোমবারের সমকালে সচিত্র একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, পথিকের পথ দখল হয়ে গেছে। কোথাও গাড়ি পার্কিং, কোথাও হকার, কোথাও নর্দমা, কোথাও ডাস্টবিন। কত কি যে পথিকের পথ দখল করে বসে আছে! এ শহরে কেউ যদি হেঁটে গন্তব্যে পেঁৗছাতে চায় তবে সে কাজ যে কতটা ক্লেশকর হবে তা একবার পথে নামলেই বোঝা যায়। শহরে সত্যি পায়ে চলার পথ নেই। গাড়ি চলার পথ কি আছে? সে প্রশ্নের সুরাহা করতে হলে আরও বড় আলোচনা ফাঁদতে হবে। পত্রিকায় ইদানীং কিছু লেখা চোখে পড়ল, তাতে লেখক বলছেন, ঢাকায় সাইকেল চালাবার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এমন দখল হওয়া রাস্তায় বসে সাইকেল চালানোর চিন্তা_ ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো ঘটনাই বটে। বাংলার পথিক এতদিনে এসে পথ হারাইয়াছে, এই ঢাকা শহরে। আগে পথ ছিল, পথিক পথে দিকদিশা হারাইতো। আমাদের মহাজনরা তাকেই বলতেন পথ হারানো। এখন পথিক সত্যই পথ হারাইয়াছে। কিন্তু মহাজনরা
নাই, এ হারানো সংবাদ নিয়া
কে লিখিবে?

Thursday, October 21, 2010

বিত্ত সাধনায় বাঙালির অগ্রযাত্রা দেখতে চাই :শংকর


বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক শংকর এখন ঢাকায়। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) আমন্ত্রণে ছয় দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল তিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস 'চৌরঙ্গী' রচনার প্রেক্ষাপটসহ লেখালেখি ও জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এবারই প্রথম বাংলাদেশে এলেন শংকর। পুরো নাম মনিশংকর মুখার্জি হলেও কয়েক প্রজন্মের বাঙালি পাঠকের কাছে তিনি প্রিয় লেখক শংকর নামে পরিচিত। সমকালকে জানান, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গেছেন অনেকবার, বিমানবন্দরে নেমেছেন; কিন্তু লেখক হিসেবে বাংলাদেশে আসা এই প্রথম। দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, দেশ পত্রিকায় 'কত অজানারে' প্রকাশ শুরু হওয়ার পর সেই ১৯৫৫ সালেই তার বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আসার কথা ছিল। কিন্তু লেগে গেল আরও ৫৫টি বছর। কারণ হিসেবে দায়ী করলেন ভাগ্যের বিড়ম্বনাকে। জিজ্ঞেস করা হলো, লোকে
আপনাকে বই বিপণনের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করে। আপনি কয়েক প্রজন্মের লাখো পাঠকের কাছে কীভাবে পেঁৗছলেন? তিনি বললেন, পাঠক ভালোবেসে বই পড়েছে। কেন পড়েছে সে কথা কী আমি জানি? যারা বিপণনের পথিকৃৎ বলে তারা হয়তো আমার সাহিত্যের কাটতির দিকে ইঙ্গিত করে। তারা তো আমাকে সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না। এখন ইংরেজরা আমার মূল্যায়ন করছে বলে তাদের আগ্রহও বেড়েছে।
প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভক্ত-পাঠকরা তাকে প্রশ্ন করলে স্বভাবসুলভ শান্তভঙ্গিতে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে তিনি উত্তর দেন। পাঠকদের প্রশ্নের উত্তরে শংকর বলেন, 'বাঙালি সর্বত্রই বিত্তের সাধনায় পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের কথা জানি না, তবে পশ্চিমবঙ্গে তারা পিছিয়ে পড়েছে। আমি বিত্তসাধনায় বাঙালির জয়যাত্রা দেখতে চাই।' তিনি লন্ডন সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, সেখানে গিয়ে তিনি বাংলাদেশিদের পরিচালিত রেস্টুরেন্ট দেখতে গিয়েছিলেন। তার মতে, আজ যে চিকেন টিক্কা মাসালা ইংল্যান্ডের জাতীয় ডিশে পরিণত হয়েছে এটি ইংরেজের ওপর আমাদের মধুর প্রতিশোধ। আর এ প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার শুধু বাঙালির আছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইইউবির স্থায়ী ক্যাম্পাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানের শুরুতেই লেখককে স্বাগত জানান অধ্যাপক রাজিয়া সুলতানা খান। সম্মানসূচক 'উত্তরীয়' পরিয়ে দেন আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক বজলুল মোবিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে দর্শকসারিতে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ফারুক চৌধুরী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ফারুক সোবহান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর প্রমুখ। প্রশ্নোত্তর শেষে যখন অটোগ্রাফ নেওয়ার পালা এলো তখন পিছিয়ে ছিলেন না বিশিষ্ট অতিথিরাও।
১৯৩৩ সালে যশোরের বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ভাগ্যের সন্ধানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর আগেই হাওড়ায় চলে আসেন। সেখানেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এবং সাহিত্য-সাধনার শুরু। জীবনের শুরুতে টাইপিস্ট, ক্লার্কসহ বিভিন্ন কাজ করেছেন। এক ইংরেজের অনুপ্রেরণায় লেখালেখি শুরু করেন। প্রথম বই বের হওয়ার সময় তার বয়স ছিল আঠারো। বয়স কম বলে প্রকাশকের পরামর্শে লোকের সামনে লেখক পরিচয় দিতেন না। প্রকাশক বলেছিলেন, চেহারায় নয়, গল্পের মাধ্যমেই পাঠক তাকে চিনবে।
শংকরের বিখ্যাত উপন্যাস 'চৌরঙ্গী' নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত সিনেমা। সত্যজিৎ রায় তারই কাহিনী অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন 'জন অরণ্য' ও 'সীমাবদ্ধে'র মতো চলচ্চিত্র। ইংরেজি ভাষায় তার বিখ্যাত বইগুলো অনুবাদ হতে শুরু করেছে সম্প্রতি। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের সাহিত্যিক রূপায়ণে তাকে পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেন সমালোচকরা। কেন শহুরে জীবন তার লেখার বিষয় হলো? এ প্রশ্নের উত্তরে শংকর অসঙ্কোচে জানান, আর কিছু যে জানি না। ওই জীবনও যে ভালো করে জানি সেও বলতে পারি না।
স্বভাবে ভীষণ বিনয়ী, মার্জিত ও নিরহঙ্কারী লেখক বললেন, লেখকের মধ্যে আত্মপ্রসাদ সৃষ্টি হলে তার বিষময় ফল তৈরি হয়। লেখক শংকর ২৪ অক্টোবর সকালে ঢাকা ত্যাগ করবেন।

Thursday, September 30, 2010

কেশাকেশি


বাংলা একাডেমীর 'ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে' চুলোচুলি বা চুলাচুলির প্রতিশব্দ কেশাকেশি। পরস্পর চুল টানাটানি করে যে মারামারি তাকে চুলাচুলি বলা হয়। অভিধান ইঙ্গিত দিচ্ছে, 'চুলাচুলি' বললে তাতে চুলের ব্যবহার থাকুক বা না থাকুক শব্দটি দিয়ে ভীষণ ঝগড়া বা কলহ বোঝায়। অভিধান যা-ই ইঙ্গিত দিক চুলোচুলিতে চুলের ব্যবহার না থাকলে তাকে চুলোচুলি বলতে অনেকেরই বাধবে। আর চুলের প্রসঙ্গ এলে এসে যাবে চুলের মালিকদের কথাও। লম্বা চুলের ফ্যাশনেবল তরুণদের দেখা এখন পথে-ঘাটে অনেক মেলে। সে তরুণরা যদি কলহ করতে গিয়ে চুলোচুলি করে তবে নিশ্চয় গণমাধ্যমে সেটি 'চুলোচুলি' হিসেবে খবর হবে কি-না আপাতত এ প্রশ্ন তোলা থাকল। কারণ যারা শিক্ষাঙ্গনে কলহ করে তারা লম্বা চুলো বা টেকো মাথা যাই হোক না কেন ছেলে হলে সংঘর্ষের ধরনই হয় আলাদা। চুল ধরে মারামারি না করে লাঠিসোটা কিরিচ চাপাতি ব্যবহার করতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর প্রস্তুতির সময় পেলে পিস্তল-বন্দুক এসে পড়াটাও অস্বাভাবিক নয়। পিস্তল-বন্দুক এলে দু'চারটি লাশ পড়া, পাঁচ-দশজন আহত হওয়াও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। দোতলা-তিনতলা-চারতলা থেকে ফেলে আহত-নিহত করার নতুন কায়দাও শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে ইডেন কলেজ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা যে রক্তপাতহীন চুলোচুলি করেই ক্ষান্ত হলেন। লাঠিসোটা নিয়ে মাঠে নামলেন না, দু'চার রাউন্ড গুলি ফোটালেন না, কিংবা হলের ছাদ থেকে সহপাঠীদের ফেলে দিলেন না, সেজন্য তাদের ধন্যবাদ দেওয়াই যেতে পারে। কিন্তু আমাদের মিডিয়া বড় বেরসিক। মেয়েরা খুনোখুনি করল না, লাশ ফেলল না তবু হৈচৈটা এমন হলো যেন একেকটা লাশের চেয়ে একেকটা চুলের দাম বেশি! সব পত্রিকা কেমন ফলাও করে ছেপেছে, শহরে-গ্রামে এ নিয়ে রসাল কথাবার্তাও হচ্ছে বেশ। নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে। এখন সরকারি দলের কেউ বিবৃতি দিয়ে মেয়েগুলোকে অনুপ্রবেশকারী শিবির-ছাত্রদল না বললেই হয়। অবশ্য শিবির-ছাত্রদল না হলে প্রধানমন্ত্রীর ছবি এভাবে লুটিয়ে ফেলতে পারে কেউ? চিন্তার বিষয় বটে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের ব্যাপারে অনেক সচেতন। কোথাও ছবি ঠিকমতো টাঙানো না থাকলে মামলা ঠুকে দেন। ক'দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, প্রধানমন্ত্রীর ছবিতে ধুলা জমেছে বলে একটা মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। বেশ, এখন এইভাবে জন্মদিনের দিন প্রকাশ্য দিবালোকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ধুলায় লুটিয়ে চুলোচুলি করার মতো অপরাধে নারী শিক্ষার্থীদের কী শাস্তি হয় সেটি এখন দেখার বিষয়।
ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মানমর্যাদার কথা যদি বিবেচনা করা হয় তবে ঘটনাটি চেপে যাওয়াই উত্তম হবে। কিন্তু ছবি যেভাবে ছাপা হলো তাতে কি চাপা দিলেই চেপে যাওয়া সম্ভব?
তবে উপায় কী? আগে যেমনটি বললাম, সেইভাবে যদি নেতাদের কেউ এসে বলেন, এরা শিবির-ছাত্রদল, প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনকে হেয় করতেই এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে, তবে বড় বাঁচা। উদোর পিণ্ডি বুধো সামলাবে তখন।
আরেক কাজ করা যায়, এ রীতি এখন বেশ কল্কে পেয়েছে। কাউকে সাহস করে বলতে হবে, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। গণমাধ্যম অতিরঞ্জন করেছে। ব্যস, সবাই বিশ্বাস করবে! নয়তো কোনো ফোরামে ছাত্রলীগের মধ্যকার এমন সংঘর্ষের ছবি ছাপাবার দায়ে মিডিয়ার বিচার দাবি করা যায়। ছাত্ররা মারামারি করবে, করুক। ছাত্রীরা চুলোচুলি করবে, করুক। দলীয় নেতাকর্মীরা বিনাপরীক্ষায় চাকরি, বিনাটেন্ডারে কাজ, বিনাআয়াসে কামাই এখন করবে না তো বিএনপি আমলে করবে? অতএব, চলুক না। মিডিয়া শুধু শুধু বাড়াবাড়ি করে। ওরা কি জানে না, বাড়াবাড়ি করলে অন্যেরা
সুযোগ নেয়?