Wednesday, May 5, 2010

সেলিম আল দীনের শাপলা, মহুয়া আর মুনিয়া পাখিগুলো


তলস্তয় নাকি নিজের সম্পর্কে বলতেন, এই যে মানুষগুলো দেখছ এরা আমার। চারপাশের বিল-ঝিল, ক্ষেত-খামার দেখছ, এগুলো আমার। এমনকি জানালার ধারে যে দোয়েল পাখিটিকে দেখছ সেও আমার।
রাশিয়ার তুলা অঞ্চলে ইয়াস্নাইয়া পলিয়ানায় জন্ম হয়েছিল লেভ নিকোলাইয়েভিচ তলস্তয়ের। তিনি ছিলেন সামন্তপ্রভু। জমিদার হিসেবে তার অধিকারে একটি এলাকা ছিল। ভূমিদাস, বিল-ঝিল, ক্ষেত-খামারের অধিকারও নিশ্চয় তারই ছিল। কিন্তু জানালার ধারে বসে থাকা স্বাধীন দোয়েল পাখিটির মালিকানা যখন তিনি দাবি করে বসেন, তখনই থমকে দাঁড়াতে হয়_ ভাবতে হয় এ তো তাহলে শিল্পীর কথা, জমিদারের নয়। যে শিল্পী সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, গল্পকার হিসেবে স্বীকৃত, যিনি মানবজীবনের এমন সব আখ্যান রচনা করেছেন, যার সামনে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে থমকে দাঁড়াতে হয় তার এমন অধিকারবোধে হয়তো ক্ষুণ্ন হবেন না অনেকেই। কিন্তু একালে যদি কেউ মুনিয়া পাখির দখল দাবি করে বসেন? যদি বিলে ফোটা শাপলার স্বত্বাধিকার দাবি করে বসেন? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে সেলিম আল দীনের সঙ্গে কেটেছিল আমাদের অনেক সময়। নাটক ও নাট্যতত্ত্বের শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমরা অন্য বিষয়ে পড়তাম। কিন্তু ক্যাম্পাসে কেউ সাহিত্যচর্চা করলে তিনি সহজে এই অধ্যাপক ও নাট্যকারের ছাত্রত্ব নিতে পারতেন। তার সঙ্গে অবাধ আড্ডা, আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের সুযোগ মিলত।
সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি, এ আড্ডাগুলো স্রেফ আড্ডা ছিল না। সেলিম আল দীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যের বাইরে আরেক সমান্তরাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের পথে-প্রান্তরে। সেখানে তরুণ সাহিত্যিক, শিল্পী, কবিদের শিক্ষক, অগ্রজ হিসেবে তিনি শিক্ষা ও সঙ্গ দিতেন। খুব সচেতনভাবে চলত না এই সমান্তরাল শিক্ষায়তন, অবচেতনে_ সবার জানাশোনার বাইরে এই আড্ডাগুলোতে সমবেত হতেন তরুণ সাহিত্যিক-কবিরা। তারা নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠতেন, আবার সেলিম আল দীনের কাছ থেকেও শিখতেন। শুধু জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী নন, ঢাকার তরুণরাও বঞ্চিত হননি এসব আড্ডা-আলোচনা থেকে।
রবীন্দ্রনাথ, তলস্তয়ের মতো বড় সাহিত্যিকদের সেলিম আল দীন বলতেন, অমরগণ। অমরদের শিল্প ও জীবনাদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। মাঝে মধ্যে বলতেন_ এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ঢাকা থেকে দূরে প্রশান্ত প্রকৃতির এক জনপদে শান্তিনিকেতনের মতো একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্বপ্নের কথা। সেখানে ক্লাস হবে গাছের তলায়, দেশ-বিদেশের সাহিত্যিক, শিল্পীরা পড়াতে আসবেন। লেখকরা লিখবেন, শিল্পীরা আঁকবেন সেখানে বসে। এসব স্বপ্নের কাছে পেঁৗছাবার অনেক আগে ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তার মৃত্যু হলো। মৃত্যুর পর তার সাহিত্য নিয়ে পাঠকমহলে নতুন কৌতূহল জন্মেছে। বাংলা নাটকে তার অবদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মূল্যায়নের এ আয়োজনগুলো চলতে থাকবে এ আশা করা যায়। পাশাপাশি তার শিক্ষকতা জীবন নিয়ে, জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের প্রভাব নিয়েও বিস্তর আলাপ হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগরে মহুয়া ফুল ফোটার উৎসব হলে, সেলিম আল দীনের কথাই সবার আগে মনে পড়ে। কারণ উৎসবটি তিনি চালু করেছিলেন। তিনিই খবর রাখতেন জাহাঙ্গীরনগরে ক'টা মহুয়া গাছ আছে। বসন্তে কোন গাছে ফুল ফুটবে আর কোন গাছের নিচে আলো জ্বালিয়ে ফুল ফোটার উৎসব পালন করা হবে। বর্ষায় শিরীষের গাছে ফুল ফুটলে তিনি আমাদের শিরীষের তলায় নিয়ে গিয়ে ফুলের ঘ্রাণ নিতে বলতেন। কোথাও লেবু ফুল ফুটে তীব্র গন্ধ ছড়ালে তার সান্ধ্যভ্রমণের গতি স্লথ হয়ে আসত। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, বলো, এ কোন ফুলের ঘ্রাণ! ঘাসে ঘাসে পা ফেলে এমন অনেক প্রাকৃতিক সন্ধ্যা-সকাল আমাদের কেটেছে। প্রকৃতিপ্রেমিক ছিলেন খুব। উপভোগকে তিনি বলতেন, আস্বাদন বা সম্ভোগ। চারপাশের সৌন্দর্যকে সম্ভোগ করার এক মানবিক আর্তি ছিল তার মধ্যে। শিল্পীর জন্য এসব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একদিন তিনি হঠাৎ জাহাঙ্গীরনগরের জঙ্গলে বসবাসরত মুনিয়া পাখিগুলোর স্বত্ব দাবি করে বসলে খুব অবাক হলাম। বললেন, আগে জাহাঙ্গীরনগরে কোনো মুনিয়া পাখি ছিল না। তিনি মানিকগঞ্জ থেকে দুই জোড়া মুনিয়া পাখি এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন জঙ্গলে। সেগুলোই এখন জাহাঙ্গীরনগরে বংশবিস্তার করে অনেক পাখিতে পরিণত হয়েছে। আমরা একটু অবিশ্বাসের সঙ্গে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। এক সকালে জাহাঙ্গীরনগরের লেকে অসংখ্য লাল শাপলা ফুটতে দেখে আমরা যখন বিস্মিত তখন তিনি বলেছিলেন, এ শাপলাগুলোও তার। আগে জাহাঙ্গীরনগরের লেকে শাপলা ফুটত না। তিনি চাঁদপুর থেকে শাপলা এনে লেকের পানিতে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেগুলোই এখন লেকে লেকে ছড়িয়ে শত পুষ্প ফোটাচ্ছে। তার দাবি নিয়ে আমরা খুব মজা করতাম। কিন্তু কখনও কোনো বিষণ্ন মুহূর্তে মনে হতো, এমন যার প্রকৃতিপ্রেম তার জন্যই হয়তো শাপলা ফোটে, মহুয়া গন্ধ ছড়ায়, মুনিয়া পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায়। তার জন্যই হয়তো তলস্তয়ের দেশ সাইবেরিয়া থেকে পাখিরা উড়ে এসে জাহাঙ্গীরনগরের লেকে বসে থাকে। সেলিম আল দীনের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করতে গিয়ে শাপলা আর মুনিয়া পাখির জন্য তার দাবির কথা মনে হলো। মনে হলো, তলস্তয়ও একদিন বলেছিলেন, জানালার ধারে বসে থাকা দোয়েল পাখিটি তার।

বিমানবন্দর বিভ্রাট


লালন সাঁইয়ের গোষ্ঠ গানে শ্রীকৃষ্ণ মাকে বলছেন, গোষ্ঠে আর যাব না মা। কারণ কী? দাদা বলরামের সঙ্গে গরুর পাল নিয়ে গোষ্ঠে যায় রাখাল বালকেরা, সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ যান। কিন্তু গোষ্ঠে গেলে দাদা বলরাম তাকে মারে। কৃষ্ণ মায়ের কাছে তাই বিচার দিচ্ছেন, বলাই দাদার প্রাণে দয়া নেই বলে কৃষ্ণ কানাইয়া মার কাছে আবদার করেছেন যে আর গোষ্ঠে যাবেন না। কিছুদিন আগে আমেরিকার এক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা হুজ্জতির শিকার হয়ে বলিউডের নায়ক শাহরুখ খানও বলেছিলেন, আমেরিকায় আর যাবেন না। বিমানবন্দরের রাখালেরা তাকে ধরে জেরা করেছে, আটকে রেখেছে আর কত কি-না হয়েছে। আমজনতার জন্য এ না হয় নিত্যকার ব্যাপার কিন্তু শাহরুখ তা সইবেন কেন? তাই অভিমান করে তিনি বলেছেন, এ রকম হলে আর আমেরিকায় যাবেন না। কিন্তু একালে আমেরিকায় না গেলে কি চলে? আর কারও চলুক না চলুক শাহরুখ খানদের চলবে না তা বলাবাহুল্য। শুধু শাহরুখ নন, তার আগে ভারতের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামকেও আমেরিকার বিমানবন্দরে নানা হুজ্জতি পোহাতে হয়েছিল। ভারতের মতো দেশের রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সেলিব্রেটি হওয়ার পরও কেন এই ভোগান্তি? আমেরিকার নিরাপত্তা কর্মীরা বলবেন, এ তো রুটিনওয়ার্ক। কিন্তু বাঁকাদৃষ্টির লোকেরা বলেন, মুসলিম না হলে এমন হতো না। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য হয়তো কিছু রেয়াত দেন নিরাপত্তা কর্মীরা। কিন্তু কিছু দেশ একেবারে কালো তালিকায়। তাদের নাগরিকরা বিমানবন্দরে কেমন বিপত্তিতে পড়েন তা বর্ণনা করবার বিষয় নয়। সাপে নাকি যাকে দংশায়নি সে সাপের বিষের মর্ম বুঝতে পারে না। কাস্টমসের কাহিনী যাকে ধরেনি তিনিও নাকি কাস্টমসের মর্ম বুঝতে পারবেন না।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বহু সংস্কৃতির দেশ। আফ্রিকান আমেরিকান, এশিয়ান আমেরিকান, লাতিন আমেরিকান কত শত নাম নিয়ে ঘোরাফেরা করেন এসব সংস্কৃতির লোকেরা। নানা মহাদেশ থেকে সমুদ্র, বনপথ পাড়ি দিয়ে তারা স্বপ্নের দেশে পেঁৗছেছেন। এই তো সেদিনও বলা হতো, এ দেশ হলো স্বাধীনতার, ফ্রিডমই এর মূলমন্ত্র। কিন্তু নাইন-ইলেভেন স্বাধীনতার মূলে হানা দিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমেরিকানরা এখন নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতেও রাজি। দুষ্ট লোকেরা বলত, আমেরিকার রাষ্ট্র পরিচালনায় আগে-পরে সবসময়ই বিগ ব্রাদারের বিশাল ভূমিকা। বিগ ব্রাদার জর্জ অরওয়েলের সেই চরিত্র যে নাকি নাগরিকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায়। এ ব্যবস্থা আগে-পরে ছিল আমেরিকায়। কিন্তু নাইন-ইলেভেনজনিত নিরাপত্তাহীনতায় সব নজরদারি, তল্লাশি আর তদারকিকে মার্কিন নাগরিকরা খোলাখুলি মুখ বুজে সয়ে নিয়েছেন। ফ্রিডম জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও জঙ্গিবাদ ঠেকাও এই হয়েছে মূলমন্ত্র। তাতে রাষ্ট্রের সুবিধা হয়েছে। এতসব নজরদারির মধ্যে জঙ্গিবাদ ঠেকানো যাক না যাক, নজরদারির আয়োজন চলছে বেশ। বছরে দু'বছরে হয়তো একজন জঙ্গি আটক হচ্ছে কিন্তু জঙ্গি সন্দেহে সবাইকে তল্লাশি করে ছাড়া হচ্ছে। মুসলিমদের ধরে মুসলিম হওয়ার বেদনাটা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে নাইজেরিয়ার জঙ্গি ওমর ফারুককে নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল। এক ধাক্কায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কঠোরতম অবস্থায় চলে গেল। এ নিয়ে একটি কার্টুন এঁকেছেন ক্লে বেনেট। কার্টুন দেখে ফেলুদার গল্পের কথা মনে পড়ল। সত্যজিৎ রায় বইয়ের নাম দিয়েছিলেন গ্যাংটকে গণ্ডগোল। বিমানবন্দরে তল্লাশি নিয়ে বেনেটের কার্টুন দেখে মনে হলো, বিমানবন্দরে বিভ্রাট নিয়ে কাহিনী লেখার সময় এসে গেছে। এ অবশ্য গোয়েন্দা গল্প হবে না। এ হবে স্বপ্নের দেশের দরজায় অতিথি অভ্যাগতদের নাকাল হওয়ার ট্র্যাজিক কাহিনী।

পদবঞ্চিতদের মানভঞ্জন


খবর পড়ে নিধুবাবুর টপ্পার সেই বিখ্যাত লাইনগুলোর কথাই ঘুরেফিরে মনে আসছে। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে যারা নিধুবাবুর গানটি শুনেছেন, ছাপার অক্ষরে দেখলে তাদের সুরসমেত মনে পড়ার কথা। নিধুবাবু কার উদ্দেশে বলছেন কে জানে! কিন্তু বলছেন, 'অনুগত জনে কেন করো এত প্রবঞ্চনা?/ তুমি মারিলে মারিতে পারো/ রাখিতে কে করে মানা?' টপ্পার খোশমেজাজি তালে গানের যে রস তৈরি হয় তা তো লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু আকেলমন্দ কে লিয়ে ইশারা হি কাফি। বুঝমানের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট। গানটির কথা বিশেষ করে মনে হলো সোমবারের সমকালে ছাপা একটি খবর পড়ে। খবরে প্রকাশ, ১০ জানুয়ারি সকালে আওয়ামী লীগের তিন নেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে দেখা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠান ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের। সেখানে তিন নেতাকে বক্তৃতা দেওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। নেতারা আসেন, বক্তৃতা দেন এবং নেতাকর্মীদের প্রশংসাও কুড়ান। শুধু তিন নেতাই নন, বিএনপির কাউন্সিলে গিয়ে জোটবিরোধী বক্তৃতা দেওয়ায় একটু পিছলে পড়েছিলেন অসীম কুমার উকিল, তিনিও ১০ তারিখের অনুষ্ঠানে সভা পরিচালনার দায়িত্ব পান। বেশ একটা ঐক্য ও সংহতির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে বটে। কিন্তু যারা রাজনীতির উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সমঝদার, তারা ভালো করেই জানেন, রাজনীতিতে মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগ বলে কিছু নেই। ফলে মানভঞ্জনের বিষয়ও নেই। রাজনীতি শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের মতো কাব্য নয়, আবার রোমান্সও নয়। কোমল শিল্পকলায় পারদর্শী কবিমন রাজনীতিতে শিশুমাত্র। বলতে হয়, রাজনীতি কঠোর শিল্পকলা। ওয়ান-ইলেভেনের পর কতকিছুই না ঘটেছিল! সংস্কার সংস্কার রব উঠে মাঠ গরম করে দিয়েছিল। সংস্কার নিয়ে যারা সরব হয়েছিলেন, তাদের গায়ে সংস্কারপন্থির ছাপ পড়েছিল। তখন অনেকে ভেবেছিলেন, সংস্কারের ছাপ যাদের গায়ে পড়ল না তারা বোধহয় রাজনীতি থেকেই নাই হয়ে গেলেন। কিন্তু নজরুল বহু আগে গেয়ে গেছেন, 'চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।' সেদিন যারা ওয়ান-ইলেভেনের রথে শামিল হননি, তারা আজ গণতন্ত্রের রথে সওয়ার হয়েছেন। আর যারা সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, তারা খানিকটা সংস্কার হয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর অনেকে বলেছিলেন, যা হয়ে গেছে তা তো ফেরানো যাবে না। এবার মিলেমিশে দেশগড়ার কাজ চলুক। কিন্তু নেত্রী বলেছেন, ক্ষমা করলেও ভুলে যাবেন না। দেখি কী হয়, দেখি কী হয় করে এক বছর গেল সরকারের। না দলে, না সরকারে কোথাও ভালো জায়গা হলো না সংস্কারপন্থিদের। সবশেষে পত্র-পত্রিকায় মৃদু গুঞ্জন উঠেছিল_ মন্ত্রিসভা বাড়ছে, উনি মন্ত্রী হচ্ছেন, উনি অমুক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর আর ফুরাচ্ছে না। সংস্কারপন্থিদের শনি কাটছে না। মান-অভিমান করে তো আর রাজনীতি হয় না! রাজনীতি ক্ষমতা ও আনুগত্যের কঠোর হিসাবে চলে। ফলে নেতাদের আপাতত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে, অনুশোচনা করে কাটাতে হবে হয়তো আরও কিছুদিন। বলছিলাম নিধুবাবুর টপ্পার কথা। এদেশে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার কথা কে না জানে! শিশুপাঠ্যে ছিল, একে চন্দ্র, দুইয়ে পক্ষ, তিনে নেত্র, চারে বেদ। আমাদের রাজনীতিপাঠ্যে লেখা আছে, একে দেশ, দুইয়ে নেত্রী। এক-এগারোর সামান্য ধাক্কায় অনেকে ব্যাপারটা ভুলতে বসেছিলেন। নির্বাচনের পর বেশ মনে পড়েছে। কিন্তু তখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন যদি নেত্রী খুশি হন, যদি তার মনে ক্ষমা জাগে তো কখনও হয়তো পদবঞ্চিতদের জন্য পদ মিলতে পারে। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের টিভিতে বিজ্ঞাপনের একটি কথা মনে পড়ছে, 'পাহেলে যদি পাতাহি থা, তো এস্তেমাল কিঁউ নেহি কিয়া?' যদি জানাই ছিল তবে আগে ব্যবহার করেননি কেন? জানা না থাকার তো কথা নয়। শেখ হাসিনার মতো নেত্রীকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়_ এ তো জানাই ছিল। তবে আর সংস্কারের কথা উঠিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার বাসনা অল্প হলেও প্রকাশ করেছিলেন কেন?

মোবাইল চালান, গাছ বাঁচান!


ভারতের মোবাইল অপারেটর হলেও 'আইডিয়া সেলুলারে'র সঙ্গে বাংলাদেশে অনেকেই কমবেশি পরিচিত। ঢাকায় ক'দিন আগে যে আইডিয়া কাপ ত্রিদেশীয় ক্রিকেট হলো বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলংকার মধ্যে, সেটির স্পন্সর ছিল আইডিয়া সেলুলার। ভারতের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে আইডিয়ার বিজ্ঞাপনগুলো অভিনবত্বের জন্য বিশেষ আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি 'ওয়াক হোয়েন ইউ টক' স্লোগানটি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। মোবাইল বা সেলফোনে কথা বলার সময় হাঁটুন এই ছিল ওই বিজ্ঞাপনের মর্মবাণী। সুস্বাস্থ্যের জন্য হাঁটতে হবে। কিন্তু হাঁটার সময় কোথায়? তাই ফোনে কথা বলার সময় হাঁটুন, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলুন। আইডিয়ার এই বিজ্ঞাপন ফোনে কথা বলতে অভ্যস্ত মানুষেরা কতটা অনুসরণ করেছিলেন জানা ভার। কিন্তু বিজ্ঞাপনের আইডিয়া হিসেবে যে খুব অভিনব ছিল সেটা সবাই স্বীকার করেছেন। 'ওয়াক হোয়েন ইউ টক'কে টেক্কা দিয়ে আইডিয়া এখন নতুন স্লোগান নিয়ে বাজারে এসেছে। নতুন এই স্লোগানটি হলো_ 'ইউজ মোবাইল, সেভ পেপার।' টিভিতে মোবাইল ব্যবহার করে গাছ বাঁচানোর এই অভিনব বিজ্ঞাপন দেখে বলতে হয়, 'হোয়াট অ্যান আইডিয়া স্যারজি!' বলতে হয়, এভাবে তো ভেবে দেখিনি। বিজ্ঞাপন বিষয়ে একটু খোঁজখবর নিতে আইডিয়ার ওয়েবসাইটে গেলাম। ওয়েবসাইটের ওয়েলকাম পেজ বা শুরুর পাতাতেই ওরা লিখে রেখেছেন, ১০ লাখ না ছাপা কাগজের পাতা ৮৫টি গাছ বাঁচাতে পারে। সবারই জানা, মূলত গাছ থেকেই কাগজ তৈরি হয়। আসবাব তৈরি থেকে নির্মাণযজ্ঞ সর্বত্রই কাঠের ব্যবহার চলে। জ্বালানির কথা তো আসে সবার আগে। গাছ সাবাড় করার বাহানার অভাব নেই। আর এই করতে করতে বিশ্বের বন-জঙ্গল সব ধ্বংস হতে চলল। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ এই বৃক্ষনিধন। এও জানা কথা। কিন্তু মানতে পারছেন ক'জন? কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু জিনিসই গাছ থেকে আসে। যেমন এই কাগজ। সকালবেলা খবরের কাগজ দিয়ে শুরু। অফিসে, বিদ্যালয়ে, আদালতে কত শতভাবে কাগজ ব্যবহার করছি আমরা। কিন্তু সাদা কাগজই হোক আর ম্লান নিউজ পেপারই হোক কাগজের দিকে তাকিয়ে কি একবারের জন্যও মনে হয়, এটি বহুল প্রয়োজনীয় গাছ থেকেই আসে? যে গাছ আমাদের বাতাসের দূষিত কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়, যে গাছ বেঁচে থাকলে আমাদের পরিবেশকে আরেকটু সহনীয় করতে ভূমিকা রাখতে পারত। কেন কাগজ ব্যবহারের সময় গাছের কথা সহজে মনে হয় না কে জানে। কিন্তু আইডিয়ার বিজ্ঞাপন মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার। আইডিয়া বলছে_ যদি পত্রিকা পড়ার কাজ, এমনকি লেখার কাজও মোবাইলে করা সম্ভব হয় তবে আর কাগজ কেন? মোবাইলেই কাগজের বেশিরভাগ কাজটা সেরে ফেলুন। মোবাইল চালান, গাছ বাঁচান। কাগজ তো শুধু মোবাইল ব্যবহার করেই বাঁচানো যায় না। কম্পিউটার ব্যবহার করেও করা যায়। বেশ কিছুদিন আগে, আমাদের বন্ধু একটি ব্লগের উদ্যোক্তা হিসাব দিয়েছিলেন ব্লগে কয়েক লাখ লেখা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে তিনি কত কাগজ বাঁচিয়েছিলেন। শুনে একটু পরিহাসবোধ করেছিলাম। এ হয়তো তার ব্লগের বাজার তৈরি করার আইডিয়া, আইডিয়া হয়তো মোবাইল বিক্রি করার জন্যই গাছ বাঁচানোর কথা চাউর করছে। ব্যবসায়িক এই উদ্দেশ্য সত্ত্বেও কিন্তু বিজ্ঞাপনের মর্মবাণীটা ফুরিয়ে যাচ্ছে না। মোবাইল তো আমাদের জীবনসঙ্গী। কম্পিউটারও। বলা হয়, এই মোবাইল-কম্পিউটার তৈরি করতে গিয়েও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু তাই বলে তো মোবাইল-কম্পিউটার তো আমরা ছাড়তে পারছি না। এখন যদি সেগুলো ব্যবহার করে গাছ বাঁচানো যায় তাহলে সমস্যা কোথায়? আমাদের দেশে হয়তো আইডিয়াটা নতুন মনে হবে। কেউ কেউ কম্পিউটারে অভ্যস্ত হলেও মোবাইলে খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস এখনও জমেনি। কিন্তু পশ্চিমে ইতিমধ্যে ছাপা কাগজের খবরের কাগজের দিন নাকি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। পাঠকরা নিজেদের সুবিধা অনুসারেই ইন্টারনেটে খবরের কাগজ পড়ছেন। দ্রুতলয়ের জীবনে এ হলো রথ দেখা এবং কলা বেচা একই সঙ্গে। খবরও মিলল, গাছও বাঁচল। হোয়াট অ্যান আইডিয়া স্যারজি!

জ্যোতি থেকে মমতায়


২০০০ সালের কথা। জ্যোতি বসু তখন মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিচ্ছেন। দায়িত্ব নিয়েছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ২০০১ সালের নির্বাচন সামনে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, লাল দুর্গে পতন এবার আসন্ন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দায়িত্ব নিয়েছেন বটে, কিন্তু এ ক্ষণস্থায়ী, মন্তব্য করছিলেন কেউ কেউ। পশ্চিমবঙ্গে একটা রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটবার অপেক্ষায় অনেকে। তখন একটা বই বেরিয়েছিল বাংলায়, নাম জ্যোতি থেকে মমতায়। ইংরেজিতে সাবটাইটেল ছিল, ফ্রম এনলাইটমেন্ট টু ইমোশনাল বন্ডেজ। বইয়ের লেখক কলিম খান। পশ্চিমবঙ্গের লেখক। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেন। ভাবিয়ে দেওয়ার মতো নানা প্রবন্ধ লেখেন। তার এই আইডিয়াটা মনে ধরেছিল। পশ্চিমবঙ্গে শাসনভার জ্যোতি থেকে মমতায় যাচ্ছে এমন একটা আভাস নির্বাচনের আগে এভাবে দেওয়াটা অভিনব বটে। জ্যোতি বসু এনলাইটমেন্ট বা আলোকদীপ্তির সন্তান বটে। কলকাতা শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনে উনিশ শতকে যে রেনেসাঁ ঘটেছিল, সেই রেনেসাঁর সন্তান জ্যোতি বসুর প্রজন্ম। সেদিক থেকে তিনি এনলাইটেন বটে, নামেও তাই। পশ্চিমবঙ্গে তার শাসনকাল, বিশেষত বামপন্থি শাসন এক প্রকার সামাজিক-অর্থনৈতিক এনলাইটমেন্ট ঘটিয়েছিল, সেও সত্য। কিন্তু বুদ্ধদেব? ভাবগত অর্থে জ্যোতি যা বুদ্ধও তাই। একদিন এক ক্ষ্যাপাটে জ্ঞানী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলো তো, বুদ্ধ কী? আমি বললাম, বুদ্ধি হতে যদি বুদ্ধ হয় তবে বুদ্ধ ইনটেলেক্ট বা রিজন (জ্ঞান বা যুক্তি) ধারণকারী ব্যক্তি। তিনি বললেন, যার মধ্যে জ্ঞান বা রিজনের বসতি তিনি কে? আমি উত্তর না দিতে পেরে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বললেন, তিনি এনলাইটেন্ড ওয়ান। বুদ্ধ তিনি যিনি জ্যোতির্ময়। তাই ভাবগত অর্থে জ্যোতি ও বুদ্ধ এক ব্যাপার। এনলাইটমেন্ট, রেনেসাঁ, রিজন, ইনটেলেক্টও সমার্থক ধারণা। বাস্তবে জ্যোতি বসুর অনুসারী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অনেকে বলবেন, একটু দুর্বল অনুসারী। কেউ বলবেন, জ্যোতির বদলে শুধু বিষয়-বুদ্ধি।
জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর এই কথাগুলো বিশেষভাবে মনে পড়ল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়। জ্যোতি বসুর শেষ যাত্রায় মমতা যাননি। বাংলাদেশের রাজনীতির যমজ ভাই যেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। এই রেষারেষি, খুনোখুনি দেখে তাই মনে হয়। কিন্তু মমতা কি আসলেই ইমোশনাল বন্ডেজ? নামে মমতা তিনি। কিন্তু জ্যোতি বসুর শেষ যাত্রায় যাওয়ার মতো মায়া-মমতা তার হৃদয়ে জন্মাল না দেখে নামটিকে কেউ কেউ অর্থহীন বলছেন। বলছেন, মমতাহীনা। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নানা নাটক করেছেন। সোনিয়া গান্ধী যখন শোকবার্তায় জ্যোতি বসুকে কমরেড সম্বোধন করলেন, তখন নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেহারা বেশি রেড হয়ে গিয়েছিল। এত কিছুর পরও মমতা শেষ যাত্রায় যাননি।
জ্যোতি থেকে মমতায় কত সুন্দর আইডিয়া। দীপ্তি থেকে অনুভূতি। কিন্তু মায়া-মমতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে। প্রতিদিন খুনোখুনি, সংঘর্ষ। কংগ্রেস-তৃণমূল-সিপিএম লেগে আছে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে। আছে মাওবাদী, আছে স্বায়ত্তশাসিত নানা রাজ্যের বাদী। পশ্চিমবঙ্গ অগি্নগর্ভ। জ্যোতিবাবু সরে যাওয়ার পর আলো সরে গিয়ে আগুন লেগেছে। যুক্তি, বুদ্ধি, দীপ্তি কিছুই কাজ করছে না। সামনের নির্বাচনে বামপন্থিদের ভরাডুবি হবে বলে অনেকের ধারণা। কিন্তু তাতে কি সমাধান আসবে? মমতা পশ্চিমবঙ্গে হাল ধরলে আবারও কি স্থিতিশীলতা প্রত্যাবর্তন করবে? উত্তর আপাতত জানা নেই।
কিন্তু একটি বিষয় সবার জানা। পশ্চিমবঙ্গের ভ্রাতৃঘাতী পরিস্থিতিতে মমতার খুব দরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়োজনীয় মমতা দিয়ে শান্তি ফেরাতে পারবেন কি-না কে জানে?

ঢেলে সাজানো


খবরের কাগজের একেবারে নিত্যকার শব্দ 'ঢেলে সাজানো'। আজকের সমকালের একটি সংবাদের শিরোনামে আছে, 'বিএনপিকে ঢেলে সাজাতে নানা পরিকল্পনার কথা জানালেন মির্জা ফখরুল।' ঢেলে সাজানো কী বস্তু বা কেমন আইডিয়া? প্রশ্ন উঠলে বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক অভিধান ঘাঁটতে থাকলাম। 'ঢেলে সাজা' স্থানে বলা হয়েছে 'ঢালা' দেখুন। ঢালিয়া থেকে ঢালা, ঢালা থেকে ঢেলে আসতে পারে বলে অনুমান করি। ঢালা বড় চমৎকার শব্দ। অভিধানে বলা হচ্ছে, এর অর্থ_ এক পাত্র থেকে অন্যপাত্রে পাতিত করা (পানি ঢালা, দুধ ঢালা), ধাতু গলিয়ে নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার জন্য পাতিত করা (ছাঁচে ঢালা), বহুল পরিমাণে নিয়োগ করা বা ছড়িয়ে দেওয়া (ব্যবসায়ে টাকা ঢালা)। শব্দার্থগুলোর দিকে আকুল হয়ে তাকিয়ে একটি জিনিস বেশ বুঝতে পারি, ঢালা ব্যাপারটি বিশেষভাবে তরল পদার্থের সঙ্গে জড়িত। লোহাও ঢালা যায়, তবে ঢালার আগে লোহাকে গলাতে হয়। কিন্তু পানি, চা, দুধের মতো তরল পদার্থই সচরাচর আমরা ঢালি। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য মন ঢালার কথা বলেছিলেন, লিখেছিলেন, 'প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন...।' প্রমোদে মন ঢালা খুব সুখকর ব্যাপার এমনকি কেউ যখন প্রাণ ঢেলে দিয়ে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানান তখনও ঢালার ব্যাপার নিয়ে তেমন চিন্তায় পড়তে হয় না। কিন্তু ঢেলে সাজানোর কথা উঠলে একটু ভাবতে বসতে হয়। ঢালিয়া সাজাইবার উপায় কী? তরল পদার্থকে পাতন করে আরেক পাত্রে নিলে তরল সেই পাত্রের আকার ধারণ করে। এখন প্রশ্ন হলো, তরলকে সাজায় কেমনে? অবশ্য কঠিন হলে কথা নেই। যেমন_ টাকা, টাকা যদি ঢালা যায় তাহলে দল, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকেও ঢেলে সাজানো সম্ভব। কেউ ফোড়ন কেটে বলবেন, তরল টাকা না হলে কেউ কি সাধে টাকা ঢালে নাকি? মন ও প্রাণের মতো বায়বীয়, টাকার মতো কঠিন পদার্থ, পানির মতো তরলের ঢালার গল্প মানলাম। কিন্তু রাজনৈতিক দলের মতো দাহ্য পদার্থ কি ঢেলে সাজানো সম্ভব? গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারের নামে কত কিছুই না ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হয়েছিল। সরকারের দু'বছরে ঢেলে দেওয়ার কাজ বেশ হয়েছিল, যা কিছু ঢালা হয়েছিল তা ঢাল বেয়ে গড়িয়েও পড়ছিল। কিন্তু সাজানোর কাজ তেমন জমেনি। ফলে ঢেলে সাজানো যায়নি শেষ পর্যন্ত। নির্বাচনের মাধ্যমে যে পাত্র থেকে যা ঢালা হয়েছিল, তা সেই পাত্রে ফিরে গিয়েছিল। এখন আবার কেউ কেউ নতুন করে ঢেলে সাজানোর কথা বলছেন। ধারণাটা জটিল হলেও আমাদের সমাজে ঢেলে সাজানোকে মোটামুটি ইতিবাচক ব্যাপার হিসেবেই দেখা হয়। কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজানোর কথা বললে বাহবা পান। কিন্তু কে কবে কী ঢেলে সাজিয়ে সফল হয়েছেন তা বিশেষ গবেষণা করে বের করতে হবে। আর রাজনৈতিক সংগঠনের মতো বস্তু ঢেলে সাজানো বোধহয় সবচেয়ে কঠিন। কারও অভিমানে লাগবে, কারও মানে লাগবে। সংঘর্ষ বাধবে। কোথাও দুর্নীতি বাছতে গাঁ উজাড় হবে। একটা গোলমাল লাগবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। একটু ঢেলে সাজাতে গেলে প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান মিলে টেনে ধরবে। তাই তো, অনেক আশার পরও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঢেলে সাজানো গেল না। রাজনীতি ক্রমে সেই পুরনো ধারাতেই ফিরছে। যেটুকু বাকি আছে, সবাইকে আশাহত করে সেটুকুও ফিরবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবশ্য ঢেলে সাজানো যদি ফাঁকা আওয়াজ হয়, তবে কোনো সমস্যাই নেই। মনে মনে ঢেলে মনে মনে সাজালে, ঢেলে সাজানোর একটা খবর হয় বটে। কেউ তো আর বলবে না যে, কী ঢেলে কী সাজালেন আর কী তাতে চেঞ্জ হলো, একটু দেখান তো দেখি।

বিড়াল-মন্দির


গার্হস্থ্য জীবনের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক নিবিড়। সুদীর্ঘকাল ধরে মানুষের বাসস্থানের পাশে বিড়াল বাস করছে। কিছুটা বন্য, কিছুটা পোষা এ প্রাণী শহরের যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গেও অনায়াসে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। কেউ কেউ বিড়াল বিশেষত কালো বিড়ালকে দেখেন ভয়ের চিহ্ন হিসেবে। কারও কাছে আবার অত্যন্ত প্রিয় প্রাণী। বলা হয়ে থাকে, অত্যন্ত আরামপ্রিয় এই প্রাণীর কাছ থেকে মানুষ শিখতে পারে সুখ কেমন ব্যাপার আর চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কীভাবে সুখে থাকতে হয়। মানুষের কাছের এ প্রাণীটিকে নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। আধুনিক সাহিত্যের প্রত্যেক বড় কবিই বোধহয় বিড়াল নিয়ে এক বা একাধিক কবিতা লিখেছেন। অ্যাডগার অ্যালান পো থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ কেউ বাদ দেননি বিড়ালের প্রসঙ্গ। বিড়াল নিয়ে সাহিত্যকর্ম একজোট করলে তা বিশাল এক বিড়াল-রচনাবলির আকার ধারণ করবে বলেই ধারণা করা যায়। বিড়াল নিয়ে সাহিত্য আছে, বিড়াল নিয়ে রহস্য আছে, আমাদের ঘরের পাশে বিড়ালেরাও আছে বহাল তবিয়তে। কিন্তু কেউ কি বিড়ালের মন্দিরের কথা ভাবতে পেরেছিলেন? আমরা ভাবতে পারি না পারি, খ্রিস্টপূর্ব ২৪৬ থেকে ২১১ অব্দে মিসরের লোকেরা ঠিকই বিড়ালের মন্দিরের কথা ভাবতে পেরেছিল। শুধু ভাবা নয়, বিড়ালের মন্দিরও তৈরি করেছিল। মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়ার আধুনিককালের এক সড়কের নিচে সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে এমন এক বিড়াল-মন্দির। মিসরীয় বিড়াল-দেবী ব্যাসটেটের উদ্দেশে নির্মিত এ বিড়াল-মন্দিরে কম করে ৬০০ বিড়ালমূর্তি পাওয়া গেছে। যারা এই মন্দির আবিষ্কার করেছেন তারা বলছেন, মিসর শাসনকারী গ্রিক সম্রাট তৃতীয় টলেমির স্ত্রী দ্বিতীয় বেরেনিক এই মন্দির তৈরি করিয়েছিলেন। প্রাচীন মিসরে বিড়াল ছিল খুবই আদুরে পোষা প্রাণী। নানা গার্হস্থ্য সামগ্রীতে বিড়ালের ছবি খোদাই করা হতো। প্রত্নতাত্তি্বকরা বলেছেন, গত একশ' বছরে আলেক্সান্দ্রিয়ায় এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বলছে, বিড়াল-দেবী নাকি আনন্দেরও প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতেন প্রাচীন মিসরে। উইকিপিডিয়া বলছে, প্রাচীন মিসরীয় সমাজে বিড়ালের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রাচীন মিসরে এদের ডাকা হতো ম্যাও বলে। শুরুতে বন্য অবস্থাতেই ছিল বিড়ালেরা। বন্য অবস্থাতেই মানুষের নানা উপকার করত। বেজি, ইঁদুর মেরে শস্যক্ষেতের উপকার করত। তাদের উপকারে খুশি হয়ে মানুষ তাদের পুষতে শুরু করে। উচ্চ ও নিম্নভূমির মিসরে একদা নানা প্রাণীর পূজা চালু হয়েছিল। বিড়াল-পূজা ছিল এসবের অন্যতম। বিড়াল-দেবী কালে কালে উর্বরতা ও মাতৃত্বের দেবী হিসেবেও গণ্য হয়েছিলেন। পরিস্থিতি এত দূর গড়িয়েছিল যে, রাজা-ফারাওদের মতো বিড়াল মরলে তাদেরও মমি করে রাখা হতো। সাড়ম্বরে বিড়ালের কবর দেওয়া হতো। এরকম মমি করা মৃত বিড়ালের সন্ধানও মিলেছে। পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়, ইঁদুরের প্রচণ্ড উপদ্রব থাকলে বিড়ালের কদর কতটা বাড়তে পারে তার নমুনা মিলেছে মিসরে। মন্দির তৈরির ভাবনা অভিনব হলেও তখনকার বাস্তবতায় দরকারি ছিল বলে অনুমান করা যায়। বিড়ালের মন্দির তৈরির কথায় যারা চমকে উঠছেন তারা নিশ্চয় অধিবিদ্যার রহস্যময় বিড়ালের বিষয়ে আরও কিছু দার্শনিক ভাবনা ভাবার অবকাশ পাবেন। হাজার বছর ধরে বিড়াল মানুষকে ভাবিয়েছে। এমনকি মানুষের সশ্রদ্ধ পূজাও আদায় করে নিয়েছে। শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো অবহেলিত বিড়াল দেখে কে আর বিড়ালের সেসব উজ্জ্বল দিনের কথা মনে করবে?