Tuesday, May 4, 2010

'নিউজিয়াম'


১ ফেব্রুয়ারি ডেইলি স্টারের একটি ছোট খবরে চোখ আটকে গেল। দিলি্ল শহরে ভারতের প্রথম 'নিউজিয়াম' উদ্বোধন করা হবে। প্রথম দর্শনে নিউজিয়াম শব্দটি দেখে একটু খটকা লাগলেও দ্রুত নিউজ ও মিউজিয়াম শব্দ দুটি জুড়ে গিয়ে একটা অর্থ তৈরি করে ফেলল। সুকুমার রায় একদা ছেলে ভুলানো ছড়ায় হাঁসজারুসহ নানা মিশ্র ধারণা আমদানি করেছিলেন। হাঁস ও সজারুর মিলিত চেহারার অদ্ভুত দর্শন এক প্রাণীর ছবিও আমরা দেখেছি। খুব মজার ধারণা ছিল এই হাঁসজারু। সব বয়সের লোককেই বহুকাল ভাবিয়েছে এমন ধারণা। এখন অবশ্য জিন-প্রযুক্তির এমনই বিকাশ হয়েছে যে, হাঁসজারুকেও সম্ভব মনে করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এমন এক সময়ও নাকি আসতে পারে, যখন গাছ থেকে উড়ে এসে আপেল খাবার টেবিলে বসে পড়বে। জেনেটিক্যালি মোডিফাইড ফুড বা জিএম ফুডের উচ্চ ফলনের কেরামতির সঙ্গে যারা পরিচিত তারা আর এসবে চমৎকৃত হন না। বরং তারা জিন পরিবর্তনের ফলে হাজার বছরের প্রাকৃতিক সম্পদে কী ক্ষতি হচ্ছে, সে নিয়েই বিশেষ চিন্তিত। শুধু জিন-প্রযুক্তিই নয়, আমাদের ভাষা-প্রযুক্তিতেও হাঁসজারু বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। দুটি শব্দ যতই দূরের হোক, তাদের এখন জোড়া লাগাতে সময় লাগে না। যেমন ইনফরমেশন এবং এনটারটেইনমেন্ট_ এ দুটি শব্দ মিলে হয়ে গেল ইনফোটেইনমেন্ট। এ এমন এক তথ্য যা নাকি বিনোদনও দেবে। এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে এন্তার। বাংলাভাষাতেও এমন জোড় শব্দের হাওয়া এসে লেগেছে। তবে সেগুলোর অধিকাংশই এখনও অচ্ছুৎ বলেই গণ্য। ভাষা নিয়ে তর্ক হতেই পারে; কিন্তু নতুন একটা শব্দ যখন অভিনব একটা আইডিয়ার জন্ম দেয় তখন একটু নড়ে না বসলে চলে না। যেমন এই নিউজিয়াম। খবরের জাদুঘর। আর্কাইভ। নিউজ মিউজিয়াম। ভেবেছিলাম, এ বোধহয় ভারতীয়দেরই আবিষ্কার। তারাই প্রথম চালু করতে যাচ্ছে এমন নিউজিয়াম। নেটে একটু সার্চ দিতে আরও নানা নিউজিয়ামের দেখা মিলল। ওয়াশিংটন ডিসির পেনসিলভানিয়া এভিনিউতে বড় এক নিউজিয়াম গড়ে উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, এটি সবচেয়ে মিথষ্ক্রিয়ামূলক নিউজিয়াম। মিথষ্ক্রিয়া বললে ইন্টারঅ্যাকটিভ শব্দটার গুরুত্ব ঠিক বোঝা যায় না। তবে ধারণাটা এমন, অডিও-ভিডিও-প্রিন্ট মিডিয়ার সম্মিলিত এ নিউজিয়াম ব্যবহারকারীদের অনেক কিছু করার থাকে। তাদের অংশগ্রহণে জীবন্ত হয়ে ওঠে নিউজিয়াম। ছবিতে দেখে নিউজিয়াম দেখার লোভ হলো; কিন্তু আমাদের জন্য দিলি্ল অনেক দূর, ওয়াশিংটন তো আরও দূরের ব্যাপার। ফিলিপ এল গ্রাহাম বলেছিলেন, নিউজ ইজ দ্য ফার্স্ট ড্রাফট অব হিস্ট্রি। খবর হলো ইতিহাসের প্রথম খসড়া। এ উপলব্ধি আমাদের গবেষকদের আছে। তাই জাতীয় আর্কাইভ থেকে পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত গবেষকরা ইতিহাসের সন্ধানে ছোটাছুটি করে গলদঘর্ম হন; কিন্তু ইতিহাসের প্রথম খসড়ার কোনো কার্যকর খোঁজ মেলে না। যারা হাতে-কলমে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের খবরের কাগজের সন্ধানে গিয়েছেন তারা আমাদের সংগ্রহের দুরবস্থা দেখে নিশ্চয়ই অবাক হবেন না। কথিত আছে, আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। আমাদের ইতিহাসবোধ প্রখর নয়। যাদের ইতিহাসবোধ প্রখর নয়, তাদের জন্য ইতিহাসের খসড়া তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। হয়তো এ কারণেই কর্তাব্যক্তিরা একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। কিন্তু সময় তো বদলাচ্ছে। মানুষের মধ্যে ইতিহাস চেতনা জাগছে। মানুষ জানতেও চাইছে। তথ্যকে অধিকার হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন প্রজন্মের মানুষের জন্য একটি নিউজিয়াম কী ঢাকায় হতে পারে না? শুরু থেকে ২০১০ পর্যন্ত প্রকাশিত সব সংবাদপত্র যদি একটা জায়গায় পাওয়া যায়, তবে তা কতই না সুখের ব্যাপার হতো। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল নিউজিয়াম গড়ে তোলাও হয়তো কঠিন ব্যাপার নয়। অবশ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সংবাদপত্র একত্র করে নিউজিয়াম গড়তে বড় উদ্যোগ দরকার। আশাটুকু তোলা থাক। আপাতত আমরা ভাবতে থাকি শুধু ওই শব্দটির কথাই। নিউজিয়াম! পাশাপাশি শব্দ দুটি কিন্তু খুব অনায়াসে মানিয়ে গেছে।

মুম্বাই কার?


১৯৯৫ সালে শিবসেনা মহারাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসেই বোম্বের নাম পরিবর্তন করে মুম্বাই রেখেছিল। সে সময় অনেক ভারতীয় শহরের নামই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুম্বাইয়ের নামকরণটা সবার চোখে পড়েছিল বেশি। কারণ এর জৌলুস ও বিশ্বপরিচিতি। আদতে বোম্বে নামটা খারাপ ছিল না। বোম্বে নাম দিয়েছিল পর্তুগিজরা। পর্তুগিজ ভাষায় বুম মানে ভালো, বে মানে উপসাগর। ভালো উপসাগরের তীরবর্তী শহর বোঝাতে পর্তুগিজরা বোম্বে নাম দিয়েছিল। ইংরেজ-পর্তুগিজরা যতই বোম্বে ডাকুক, স্থানীয় মারাঠিরা একে ডাকত মুম্বাই বা মাম্বাই বলেই। মাম্বা বা মহাঅম্বা দেবীর নাম থেকে মুম্বা এসেছে। আর মারাঠি আই শব্দের অর্থ মা। তবে এ শহরের প্রাচীন নাম ছিল কাকামুচি। এখনও নাকি কেউ কেউ মুম্বাইকে কাকামুচি বলে ডাকেন। হিন্দি সিনেমার সূত্রে যে শহরটি আমাদের এত চেনা সে শহরের আদি অধিবাসী মারাঠিরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে বিশেষভাবে গর্বিত ও চিন্তিত। স্থানীয় অধিবাসীরা মনে করেন, হিন্দি সংস্কৃতি তাদের গ্রাস করছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের আন্দোলন নয়, গ্রাসের ভয় থেকে মুম্বাইতে এবং মহারাষ্ট্রে যে রাজনীতি চলছে তা হলো উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে শিবসেনা এবং তাদের নেতা বাল ঠ্যাকারে। পরিস্থিতি এতটাই গড়িয়েছে যে, কিছুদিন আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকায় সোভান সাক্সেনা লিখেছেন, ভারতের উচিত সময় থাকতেই মুম্বাইয়ের মালিকানা দাবি করা। নইলে অতিদ্রুত বিজেপি, আরএসএস আর শিবসেনা মিলে মুম্বাইয়ের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে যাবে। আর তারা কর্তা বনে গেলে মুম্বাইয়ে ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষের, বিশেষ করে উত্তর ভারতীয়দের অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাল ঠ্যাকারে তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে মুম্বাই ফর অনলি মারাঠিজ, মুম্বাই শুধু মারাঠিদের জন্য। বাকিরা? এত ব্যবসা-বাণিজ্য, চলচ্চিত্র রেখে বাকিরা কোথায় যাবে? কেউ বলল, তারা চলে যাবে। কেউ বলল থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে মুকেশ আম্বানি বললেন, মুম্বাই ফর অল, মুম্বাই সবার জন্যই। তখন বাল ঠ্যাকারে বললেন, মানুষের কথা মানতে হবে। মানুষ চায় মুম্বাই শুধু মারাঠিদের হোক। মুকেশ আম্বানির জন্য যেমন রিলায়েন্স, মহারাষ্ট্রের মানুষের জন্য তেমনি মুম্বাই। তর্কে জড়িয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকারও। তিনি একজন গর্বিত মারাঠি হিসেবেই বলেছিলেন, মুম্বাই ভারতের সম্পত্তি, মুম্বাইতে সবার থাকার অধিকার আছে। শচীনের এই কথা শুনে বাল ঠ্যাকারে তাকেও ধমকে দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় এসে পেঁৗছাচ্ছে যে, সহজ সমাধানের রাস্তা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। শুধু উগ্র জাতীয়তাবাদ বললে বোধহয় আর সমাধান হচ্ছে না বিষয়টার। একটি বড় শহর যখন গড়ে ওঠে তখন তার উজ্জ্বলতার নিচে থেকে যায় অনেক অন্ধকার অঞ্চল। বঞ্চিত ভাগ্যহতরা তখন তাদের দুরবস্থার জন্য ওই শহরটিকে দায়ী করতে থাকে। খোদ মুম্বাইতেও তো বস্তি কম নয়। প্রশ্ন হলো, নিজেদের দুর্ভাগ্যের জন্য বঞ্চিতরা শহরের বহিরাগতদের দায়ী করছে কি-না, আর তাদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে শিবসেনা তাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আখের গুছিয়ে তুলছে কি-না। বাল ঠ্যাকারে বলেছেন, মুম্বাইকে যেন বসার ঘর ভাবা না হয়। সবাই মুম্বাইতে আসবে এখানে থুথু মেরে চলে যাবে তা করতে দেওয়া হবে না। তার আরও অভিযোগ যে, মুম্বাই হামলার সময় উত্তর ভারতীয় শাসকরা যথেষ্ট মনোযোগের সঙ্গে বিষয়টির মোকাবেলা করেনি। অতএব, তারা বাইরের লোকদের প্রতিরোধ করবেন। শিবসেনা এখন যেনতেন কারণেই বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। শাহরুখ থেকে সালমান সবাইকে শাসিয়ে চলেছে। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে রাহুল গান্ধী বলেছেন, মুম্বাইতে সবার থাকার অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। কোনো ভারতীয়র ওপর আঘাত এলে জবাব দেওয়া হবে। পরিস্থিতি মঙ্গলবার পর্যন্ত এমনই ছিল। কিন্তু বুধবার বাল ঠ্যাকারে জবাব দিয়েছেন। ভাষা তার অশ্রাব্য। যুক্তির বালাই নেই। তিনি বলছেন, অনেক বয়স হয়ে যাওয়ার পরও রাহুলের যেহেতু বিয়ে হয়নি আর এর ফলে যেহেতু তার ভেতর হতাশা জেগেছে তাই তিনি এমন যুক্তিহীন কথা বলছেন। তার এই বক্তব্যের পর তার সঙ্গে তর্ক করতে যে কারও বাধো বাধো ঠেকবে। কিন্তু মুম্বাইকে তো রক্ষা করতে হবে? তর্ক করে, গালি খেয়ে সবকিছুর পরও উগ্রপন্থার হাত থেকে মুম্বাইকে রক্ষা করা যাবে কি-না সেটি বড় প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, মানুষের প্রকৃত সমস্যার দিকে তাকানো। কারণ মানুষ পেছন থেকে সরে গেলে উগ্রপন্থা কোনো কাজেই আসে না।

একটি ভাষার মৃত্যু


ভাষার জন্য লড়াইয়ের দীর্ঘ ও রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ সূচিত হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত ফল হিসেবে আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে বাংলাদেশ কায়েম করতে পেরেছি। স্বাভাবিকভাবে ভাষা-প্রশ্নে আমাদের স্পর্শকাতরতা বেশি। আমরা বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি, একে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষা মনে করি। 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি' আমাদের প্রিয় গান। নিজের দেশকে সবাই সকল দেশের সেরা মনে করেন। কিন্তু সেই দিন আর নেই যে, নিজের দেশকে সেরা মেনে চোখ বন্ধ করে সুখে থাকব। বিশ্বের দুয়ার খোলা। আমাদের দেশের চেয়ে সুন্দর না হোক, আমাদের দেশের মতো সুন্দর কত দেশ আছে পৃথিবীতে। তেমনি ভাষাও। বাংলার মতো শ্রুতিমধুর কত ভাষা আছে। আমরা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি বলে পৃথিবীর সব মানুষের ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা থাকা খুব স্বাভাবিক। আমরা রক্ত দিয়ে ভাষার গুরুত্ব অনুভব করেছি, সে কারণেই এ আশাবাদ। কিন্তু কাজে তেমন একটা সচেতনতা দেখা যায় না। আমাদের দেশে সব মানুষের ভাষা বাংলা নয়, অন্য ভাষার বহু মানুষ এ দেশে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠীগুলো তো আছেই, সমতলেও আছে ভিন্ন ভাষার কত মানুষ। কিন্তু ভাষার জন্য রক্ত দিলেও এ ভাষাভাষী মানুষের ভাষার বিকাশে আমাদের অবদান সামান্য। বলতে হয়, আমাদের আধিপত্য ও অবহেলার কারণে বাংলাদেশের আদিবাসী-অভিবাসী নানা ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে। একটি ভাষার টিকে থাকার গুরুত্ব কী? এটি বোধহয় ২০ কোটি মানুষের একটি ভাষার মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। যেমন বোঝা কঠিন, কীভাবে একটি ভাষায় কথা বলা শেষ মানুষটির মৃত্যু ভাষাপ্রেমিক মানুষকে কতটা কষ্ট দিতে পারে সেটি। এমনই এক ঘটনা ঘটে গেল সম্প্রতি। বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ আন্দামানে বো ভাষাভাষী শেষ মানুষ বোয়া সর ৮৫ বছর বয়সে মারা গেলেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বো ভাষাটির বিলুপ্তি ঘটল। বো ভাষা পুরোপুরি বোঝার মতো, সে ভাষায় কথা বলা ও গান করার মতো কোনো লোক আর রইল না। বো ভাষা পৃথিবীর প্রাচীন ভাষাগুলোর একটি। মানুষ যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসতি গাড়ছিল, তখনকার সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল এ ভাষার। ফলে ভাষাটির প্রতি নৃতাত্তি্বক, ভাষাতাত্তি্বক, ইতিহাসবিদ, মনোবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী সবার নজর ছিল। বলা হচ্ছে, বোয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। আন্দামানের আদিবাসীরা বহু ঝড়ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে টিকে ছিলেন। সুনামি তো সাম্প্রতিক ঘটনা। এর আগে তাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে ব্রিটিশ বসতি স্থাপনকারীদের; মিশনারিদের হাত থেকে ধর্মরক্ষা করতে হয়েছে। এমনকি ডকুমেন্টারি পরিচালকদের হাত থেকে বাঁচার জন্য জঙ্গলে পালিয়ে থাকতে হয় তাদের। সঙ্গে আছে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অত্যাচার। নানা রোগব্যাধি তো আছেই। এত কিছুর পরও বোয়া যে বেঁচেছিলেন, এটাই এক বিস্ময়। এখন তার মৃত্যুর পর সবাই বলছেন, ঘটনাটা দুঃখজনক। এমন ঘটনা যেন না ঘটে, তার জন্য সচেতন হতে হবে। প্রশ্ন হলো, মৃত্যুকে রোধ করার ক্ষমতা তো মানুষের নেই। কিন্তু মানুষ চাইলে ভাষা বাঁচাতে পারে। ভাষা শিখতে পারে। ভাষার ডকুমেন্টেশন করতে পারে। সেটুকু হলেও কিছু সংযোগ থেকে যায়। অবশ্য এ সামান্য ঘটনায় তেমন কিছু হয় না। কারণ একটি জনগোষ্ঠী চার হাজার বছর আগের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী একটি শব্দ যখন বলে আর যখন সেটি আমরা কাগজে তুলে নিই, তখন অর্থের তারতম্য ঘটবেই। এ জন্য নৃবিজ্ঞানীরা বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগোষ্ঠীগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার দিকে গুরুত্ব দেন। ভাষাভাষী মানুষকে বাঁচাতে পারলে তাদের ভাষাকেও বাঁচানো সম্ভব। মানুষ হারিয়ে যাওয়ায় আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। অনেক ভাষা, অনেক সংস্কৃতি, অনেক গান, অনেক কবিতা আর কখনও ফিরে আসবে না। এসব হারিয়ে যাওয়া ভাষার কান্না কি আমরা বুঝতে পারব? হয়তো পারব। কারণ আমরা ভাষাকে ভালোবেসে যুদ্ধ করেছি। শুধু বাংলা নয়, পৃথিবীর সব ভাষা, বিশেষত হারিয়ে যেতে থাকা ভাষাগুলোর প্রতি আমাদের মমত্ব যদি কাজে পরিণত হয়, তবে তা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ জন্য আন্দামানে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের দেশেই যে আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলো আছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলেই চলবে।

এমপিদের বই পড়ার অভ্যাস


অনেকেরই মনে থাকার কথা সৈয়দ মুজতবা আলী কী লিখেছিলেন বই পড়া প্রসঙ্গে। বাজারে গিয়ে স্বামী বই কিনতে উদ্যত হলে স্ত্রী বলেছিলেন, বই? সেও তো ঘরে একখানা আছে। অর্থাৎ নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস দূরের কথা, নিদেনপক্ষে আসবাব হিসেবে ঘরে একখানা বই থাকাই যথেষ্ট। এ শুধু পরিহাসের কথা, নাকি সত্য সত্যই কেউ মনে করেন এমন, এ নিশ্চয়ই গবেষণার বিষয়। তবে আমেরিকার এক কাগজে একটা কৌতুক পড়েছিলাম জর্জ বুশের পাঠাভ্যাস প্রসঙ্গে। জর্জ বুশের হোয়াইট হাউস ত্যাগের সময় তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রাক এলো। প্রেসিডেন্টদের অনেক বই থাকে। ফলে বড় ট্রাকই বরাদ্দ। কিন্তু মাল পরিবহনের লোকজন বুশের স্টাডিতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। পুরো স্টাডিজুড়ে পড়ে আছে শুধু দু'খানা বই। একটা স্পোর্টস ম্যাগাজিন আর এক কপি হাসলার। এও নিশ্চয়ই কৌতুক শুধু, সত্য নয়। তবে রাজনীতিকদের বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে বিস্তর বাঁকা কথা চালু আছে। এমনকি তারা যখন বই লেখেন তখনও বেশ কথা হয়। সম্প্রতি সারাহ পলিনকে নিয়ে কথা হচ্ছে। বিল ও হিলারি ক্লিনটন এবং ওবামার কথা বোধহয় ভিন্ন। তারা লিখে বেস্টসেলার তালিকায় নাম উঠিয়েছেন। তাদের বই নিয়ে কথা হয়েছে। অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তারা। পৃথিবীতে এমন অনেক রাজনীতিক আছেন যাদের প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তারা লিখলে মানুষ পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। তারা যে পড়েন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতা যে জাতিতে জন্মেছেন তারা নিশ্চয়ই ভাগ্যবান। কিন্তু সাধারণভাবে রাষ্ট্রনায়কদের কাছে প্রজ্ঞা ও দার্শনিকতা প্রত্যাশা করা হয়। প্লেটো বলেছিলেন, তার আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান হবেন একজন দার্শনিক রাজা। বলেছিলেন, দার্শনিকদেরই রাজা হতে হবে কিংবা রাজাকে দার্শনিক হয়ে উঠতে হবে। ভারতবর্ষেও রাজর্ষি নামে এক ধারণা ছিল। যিনি রাজা হবেন তিনি আবার ঋষিও। এ ধারণাগুলোকে ইউটোপীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। কারণ, অশোক, আকবরের উদাহরণ তো আমাদের ইতিহাসেই আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের এখনকার রাজনীতিকদের পরিস্থিতি কী? জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, বিদ্যায় তাদের দৌড় কেমন? এসব প্রশ্ন উঠলে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেবেন। কারও কাছে এও মনে হতে পারে, রাজনীতিকের সঙ্গে পাঠাভ্যাসের সম্পর্ক কী? এসব প্রশ্নের সুরাহা হলেও অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না যে, আমাদের সংসদ ভবনে একটি লাইব্রেরি আছে, আর সেখান থেকে গুটিকয় এমপি পড়াশোনা করেন। এমনকি তারা বই ফেরত না দিতে পেরে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের নোটিশও খেয়েছেন। গতকালের পত্রিকায় এমন খবর পড়ে দুঃখের বদলে সুখই হলো। বলতে ইচ্ছা করছিল, পড়ূয়া যে সামান্য ক'জন এমপি আছেন তাদের নোটিশ নয়, ধন্যবাদ দিন। বই নিশ্চয় ফেরত নেবেন, কিন্তু ধন্যবাদ দিয়ে নিন। কারণ এই যুগে এমন এমপি খুঁজে পাওয়া ভার। মাঝে মধ্যেই পত্রিকায় দেখি এমপিরা লাইব্রেরিতে যান না। এমনকি লাইব্রেরি থেকে কীভাবে বই ওঠাতে হয় জানেন না। কবে শুনব, লাইব্রেরি কোথায় তা-ই জানেন না অনেকে। কিন্তু আমাদের সংসদের লাইব্রেরি দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি বলে কথিত আছে। ইতিহাসের এক বাঁক ফেরার মুহূর্তে ১৯৭১ সালের মার্চের আগে এ লাইব্রেরিতে প্রচুর বই এসেছিল পাকিস্তান থেকে। সে বইগুলো থেকে গিয়েছিল। কিন্তু বইগুলো পতিত রইল, কেউ আবাদ করল না। এমপিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তারা অপরিহার্য সংসদ অধিবেশনেই নাকি যেতে পারেন না। সচিবালয়, নির্বাচনী এলাকা, তদবির এসব তো আছে। এর মধ্যে আবার বই পড়ার আবদার? সবাই নিশ্চয়ই পড়বেন না। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো পড়তে হবে। নইলে সংসদীয় আইন-কানুন, আলাপ-আলোচনা থেকে তো জ্ঞান-বিদ্যার ব্যাপার উঠেই যাবে। তেমন দিন না আসুক। আসুন, বই পড়ার প্রতি আগ্রহীদের প্রতি আমরা বিশেষ দৃষ্টি দেই। তাদের জন্য বই পড়া ভাতা চালু করি। এখন যদিও দশ-বিশজন পড়ূয়া এমপির নাম জানা যাচ্ছে, আগামীতে হয়তো এ সংখ্যা দু'তিন জনে নেমে আসবে। কিন্তু তাদের রক্ষা করতে হবে। তারা বইখেলাপি হোন, নোটিশ পান সমস্যা নেই। কিন্তু একজন দার্শনিক রাজা হয়তো ওই দু'একজনের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে।

দেখে যেন মনে হয় বোমা উহারে


তিলকে তাল বানানোর অভ্যাস আমাদের আছে। কিন্তু রাজনীতিতে বোধহয় দুটিই ঘটে। তিলকে যেমন চোখের নিমেষে তাল বানানো হয়, তালকেও তিল বা তিসিতে পরিণত করা সামান্য আয়াসেরই ব্যাপার। তালকে তিল আর তিলকে তাল বানাতে বানাতে আমাদের রাজনীতি ক্রমশ তিলোত্তমা বা তালোত্তমা হয়ে উঠছে। কোনো ত্রিকালদর্শী হয়তো এমন কাণ্ডে তালকানা হবেন না। বলবেন, এ তো রাজনীতির চিরাচরিত নিয়মই। কিন্তু আমজনতা দিশাহীন হয়ে যেতে পারে সহজেই। সোমবার বিরোধীদলীয় নেত্রীর গুলশান অফিসের সামনে থেকে বোমার মতোন দুটি জিনিস উদ্ধার করেছে পুলিশ। বোমা তো বোমাই। বোমাসদৃশ বা বোমার মতোন আবার কী জিনিস? নাশকতা ঘটানোর উদ্দেশ্যে কেউ হয়তো বোমা ফেলে গিয়ে থাকবে। কিন্তু পুলিশ বলছে, এ তো ককটেল মাত্র। ক্ষতি করার তেমন ক্ষমতা নেই এ বোমার। নেহাতই ছোট বোমা। কিন্তু বিএনপি কি আর বিরোধী দলে থেকে পুলিশের বাণী শুনবে? তারা বলছে, এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। এ ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত আরও কত কি। বিরোধীদলীয় নেত্রীর অফিসের সামনে পড়ে থাকা ককটেল রাজনীতির গুণে বোমা হয়ে যেতে পারে। আর পত্রিকার কল্যাণে তা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিতও হতে পারে। অন্যদিকে ভাবুন শেরপুরে পাওয়া গ্রেনেডের কথা। পত্রিকায় এমনভাবে ছাপা হবে, আর এমনভাবে আলোচনা হবে এ নিয়ে যে, বিধ্বংসী গ্রেনেড নয়, এ নেহাতই দু'চারটি ককটেল। এই হলো আমাদের পরিস্থিতি। কখনও বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাড়ি হয়ে পড়ে রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনা, কখনও কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হয়ে পড়ে সরকারের প্রধান এজেন্ডা। রাজনীতির লীলা বোঝা বড় ভার! বোমা নিয়ে বিশেষ এক ধরনের রাজনীতিও আছে। কোথাও হয়তো বোমা পোঁতা হলো, কোথাও বোমা ফেলে রাখা হলো। সেদিকে মিডিয়ার প্রচার চলে গেল। সবাই বোমা নিয়ে ভেবে ভেবে মাথা ভার করে ফেলল। কেউ বলল, নাশকতার আশঙ্কা; কেউ বলল, হত্যার রাজনীতি; কেউ বলল, বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র। কিন্তু কাজের কথা অল্প লোকেই বলেন। যারা বলেন তারা জিজ্ঞেস করেন, এ বোমা কোথা হতে এলো? কোনো ক্লু না পেয়ে খোদ বোমাকে জিজ্ঞেস করেন বিশেষজ্ঞরা, বোমা তখন নিজেই ভাবতে থাকে, কোথা হতে এলেম আমি? কেউ বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ করতে হবে। কেউ বলেন, সন্ত্রাসী, বোমাবাজরা কারও বন্ধু নয়, সকলের শত্রু। তবু কি বন্ধ হয় রাজনীতি। আমাদের দেশে তো এই সেদিনও কত গ্রেনেড ফুটল। কত লোকের প্রাণহানি হলো। বোমা যতক্ষণ না ফোটে ততক্ষণই এ নিয়ে রাজনীতি চলে। কিন্তু যখন ফোটে তখন তো সবাইকে নির্বাক করে দিয়ে যায়। এ তো ক'দিন আগে ভারতের পুনেতে বোমা বিস্ফোরণ হলো। ভারতীয় পত্রিকায় দেখলাম, পুলিশ বলেছে, কোথাও বোমার মতোন জিনিস দেখলে নাড়াচাড়া করবেন না। পুলিশ ডাকবেন। পুলিশ এসে দেখবে বোমা না অন্য কিছু। ফলে বোমা নিয়ে না খেলাই ভালো। বিশ্বে প্রতিদিনই কত বোমা ফুটছে, কত নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এসব কথা মনে করে, ককটেলগুলোকে বোমা করে তোলার চেষ্টা আপাতত ক্ষান্ত থাকুক। আমাদের সবার পরিচিত একটা গল্প আছে। এক রাখাল বালক ছিল। বাঘ বাঘ করে চিৎকার করত। শেষে একদিন সত্যি বাঘ এলো। কিন্তু সেদিন আর কেউ রাখালের কথা বিশ্বাস করল না। গল্পটি পুরো বললাম না। গল্প সবার জানা, মোরালও। একদা আমাদের এখানেও নেতা-নেত্রীরা বোমা বোমা বলে চিৎকার করতেন। শেষে দেখা গেল একদিন সত্যি বোমা ফুটল। সেদিন তো কতজনের কথাই বলা হলো। কত গবেষণা চলল। অবশেষে অনেক কষ্টে আমরা বোমার ভয় থেকে বের হয়েছি। আবার তাহারে কেন ডাকো? আমরা আর বোমার ভীতিকর জগতে ফিরতে চাই না। বোমাকে চিরবিদায় জানাতে চাই। আর এজন্য রাজনীতির লাঠালাঠি, বকাবকি, ব্লেমগেমের মধ্যে কিছুতেই যেন বোমা চলে না আসে সেই আমাদের প্রার্থনা।

Monday, May 3, 2010

নূহের নৌকা


ইসলাম ধর্মে হজরত নূহ (আঃ)-এর আমলের মহাপ্লাবনের উল্লেখ আছে। উল্লেখ আছে, তার সেই বৃহৎ নৌকার কথাও। লোকমুখে ওই নৌকা নূহের কিস্তি বলেও পরিচিত। বাইবেলেও আছে নূহের নৌকার কথা। হিন্দু শাস্ত্রেও নানা সূত্রে মহাপ্লাবনের উল্লেখ আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে মহাপ্লাবনের উল্লেখ আছে। মনুকে মহাপ্লাবনের কথা জানানো হয়েছিল আর তাকে এ প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন মৎস্য অবতার। পৃথিবীর বহু ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ ও লোককথায় মহাপ্লাবন ও নূহের কিস্তির অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয়, এমন একটি মহাপ্লাবন ঘটেছিল। কিন্তু সত্যিই এটি ঘটেছিল নাকি ধর্মগ্রন্থে প্রতীকীভাবে মহাপ্লাবনের উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্তর মাথা ঘামিয়েছেন, এমনকি নূহের নৌকার সন্ধানে নানা স্থানে প্রত্নতাত্তি্বক অনুসন্ধানও চালিয়েছেন। এবার প্রত্নতাত্তি্বকদের একটি দল বলছেন তারা তুরস্কে আরারাত পর্বতে নূহের নৌকার সন্ধান পেয়েছেন, জানাচ্ছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থের বহু উল্লেখের সূত্র ধরে মহাপ্লাবন নিয়ে গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা মোটামুটি একমত, একটি বড় প্লাবন ঘটেছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণার সঙ্গে ধর্মগ্রন্থের বর্ণনার সম্পূর্ণ মিল নেই, কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান অনেক অজানা বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ৯ হাজার ৪শ' বছর আগে এক উষ্ণায়নের কালে ভূমধ্যসাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে গিয়েছিল বলে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সাধারণ একটি মত চালু আছে। এর আগে কৃষ্ণসাগর সুপেয় পানির জলাধার ছিল। কিন্তু এই প্লাবনের ফলে কৃষ্ণসাগরে লবণাক্ত পানি ঢুকে যায়। প্রচলিত একটি মত বলছে, এ সময় কৃষ্ণসাগরের পানি ১৯৫ ফুট পর্যন্ত উঠেছিল। এতে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতি ডুবে যাওয়ার কথা। পরবর্তীকালে ভূতাত্তি্বকরা অবশ্য পানির উচ্চতা বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছেন পানির উচ্চতা ১৫-৩০ ফুট পর্যন্ত উঠেছিল। পানির উচ্চতা নিয়ে যেমন তর্ক আছে, তেমনি তর্ক আছে প্লাবনের সময়কাল নিয়েও। আবার এসব তর্ক-বিতর্কের দিকে মানুষের নজর ফিরেছে তুরস্কের খবরে। ইভানজেলিকাল ক্রিশ্চিয়ান প্রত্নতাত্তি্বকদের একটি দল বলছেন, তারা বরফ ও আগ্নেয়গিরির ধ্বংসাবশেষের নিচে নূহের নৌকা খুঁজে পেয়েছেন। এর আগে ২০০৬ সালে খবর বেরিয়েছিল ইরানে এমন একটি নৌকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। সেবার ইরানের এলবুর্জ পর্বতমালার সুলেইমান পর্বতে নৌকা আকৃতির একটি পাথরের স্থাপনা পাওয়া গিয়েছিল। পাথর হলেও দেখতে তা ছিল একেবারে কাঠের মতো। বলা হয়েছিল, এটি অশ্মীভূত কাঠ। আবার অনেকে মনে করেন, প্লাবনের পর নৌকাটি পানিতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এবারের অনুসন্ধানকারীরা বলছেন, তারা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত না হলেও ৯৯.৯৯ শতাংশ নিশ্চিত, এটিই নূহের নৌকা। তারা বলছেন, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তারা সমুদ্রপৃষ্ঠের ১৩ হাজার ফুট ওপরে আরারাত পর্বতের চূড়ার কাছে চাপা পড়া সাতটি কাঠের কম্পার্টমেন্ট পেয়েছেন। ২০০৯ সালে প্রত্নতাত্তি্বক উপাদানগুলো ফিল্মে ধারণ করা হয়েছে। ওই প্রত্নস্থানের কাঠের রেডিও কার্বন ডেটিংও করা হয়েছে। এই ডেটিংয়ে কাঠের বয়স বেরিয়ে এসেছে ৪ হাজার ৮শ' বছর। জীববিজ্ঞানী টড উড বলছেন, সময়টা একটু কম হয়ে গেল। তিনি নিজেও বিশ্বাসী একজন বিজ্ঞানী। তবু সময় নিয়ে তার দ্বিধা। কেউ কেউ বলছেন, নূহের নৌকা তুরস্কেই পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু অন্য পাহাড়ে। ফলে, আরারাত পর্বতের নৌকা অনেকের বিস্ময় জাগিয়েছে। তুরস্কের সরকার চিন্তা করছে, নূহের এই নৌকাকে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেজন্য এখনও বেশ পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ পণ্ডিতরা এখনও নানা মতে, নানা পথে বিভক্ত। বোঝা যাচ্ছে, পণ্ডিত মহলে এ নিয়ে বেশ তর্ক হবে।

Sunday, May 2, 2010

সমুদ্রশাসন


নদীশাসনের কথা অহরহ শোনা যায়। কখনও সেচের জন্য, কখনও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নদী শাসন করেছি আমরা। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং চীন নদীশাসনে রীতিমতো ওস্তাদ। তাদের বিদ্যুৎ যেমন দরকার তেমনি দরকার পানিও। এসব নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। বলা হয়ে থাকে, নদী শাসন করে জলাধার বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করার ধারণাগুলো এখন বড়মাত্রায় চীন ও ভারতেই প্রচলিত। পরিবেশের ওপর এর সার্বিক নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় ইউরোপ-আমেরিকায় নদীশাসনের উদ্যোগগুলো বন্ধ হতে চলেছে। নতুন উদ্যোগের কথা শোনা যায় কম, বরং বেশি শোনা যায় পুরনো জলাধার বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত ও বন্ধ হওয়ার খবর। নদীশাসন দেখে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু সমুদ্রের বেলায় অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। কী ভারতে কী বাংলাদেশে কেউ সমুদ্রশাসনের কথা ভাবতে পারেন না। অথচ এই ভারতের রাজা রামচন্দ্র একদা বানরদের সহায়তায় সমুদ্রে বিশাল সেতু নির্মাণ করে লঙ্কায় পাড়ি দিয়েছিলেন। সমুদ্রশাসনের এই ইতিহাস হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সেতুরও ইতিহাস। কিন্তু আধুনিককালে ভারতীয়রা সমুদ্রশাসনের কথা ভাবতে পারে না। মাঝে মধ্যে ভারতের কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যায় বটে, কিন্তু উদ্যোগগুলো আর সামনে এগোয় না। বাংলাদেশে আমরা সমুদ্রের ইচ্ছার সামনে নতজানু। সমুদ্র, এই সেদিন বাংলাদেশের দ্বীপ তালপট্টি খেয়ে নিল। আমরা চুপ করে বসে থাকলাম। বললাম শুধু, ভাসা তালপট্টি আমাদের, ডোবা তালপট্টিও আমাদের। উত্তর মেরুর বরফ গলবে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। বাংলাদেশ কি ডুববে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, একবার ডুববে। দক্ষিণাঞ্চলের বহু মানুষ পরিবেশ-শরণার্থী হয়ে পড়বে। আরেকবার বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডুববে না। নতুন ভূমি মিলবে বরং। দেশের আকার বাড়বে। বিজ্ঞানীদের গবেষণার অলৌকিক পেন্ডুলামে এখন বাংলাদেশের ডোবা-ভাসার আশঙ্কা ও আশা দুলছে এদিক-ওদিক। কিছুই করার নেই আমাদের। হয়তো ডোবা ও ভাসার যে কোনো একটি হলে তবেই আমরা বুঝব, আসলে কী ঘটল। এসবই মনে পড়ল, দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্রশাসনের এক সংবাদ পড়ে। অবশ্য সংবাদ না বলে একে এক গল্প বলতে হয়। এখন পর্যন্ত সায়িমানজিয়াম সমুদ্র দেয়ালই মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় বাঁধ। পীত সাগর বা হলুদ সমুদ্রের বুকে ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বাঁধ দিয়ে কোরীয়রা সমুদ্রের ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে বেঁধে ফেলেছে। সমুদ্র বেঁধে দেশের আকৃতি একটু বাড়িয়ে নিল কোরীয়রা। এখন তারা এই স্থানে চাষবাস, কারখানা ও পর্যটনের বিকাশ ঘটাবে। এমনকি মিঠাপানির উৎসও নাকি হবে এই জায়গা। দক্ষিণ কোরিয়া বলছে, তাদের পশ্চিম উপকূলের শিল্প এলাকার দরজা হবে এই দেয়াল প্রকল্প। এর সঙ্গে যুক্ত হবে চার নদী প্রকল্প। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, সামান্য নদীশাসন নিয়ে আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সীমা থাকে না যেখানে, সেখানে বিশাল সমুদ্রকে বেঁধে ফেললে কি পরিবেশবাদীরা চুপ করে থাকে? না। এর দেয়ালের বিরুদ্ধেও তুমুল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
সুপ্রিম কোর্ট দুই দফা এর নির্মাণ কাজ বন্ধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত ২৭ এপ্রিল এর উদ্বোধন হলো। এমন সমুদ্রশাসনে কোরিয়ানরা প্রথম নয়, হয়তো শেষও নয়। সায়িমানজিয়াম সমুদ্র দেয়াল নেদারল্যান্ডসের অফসলুটডিক দেয়ালের চেয়ে মাত্র ৫০০ মিটার লম্বা। সমুদ্র দেয়ালের আরও উদাহরণ আছে। কিন্তু সমুদ্র শহর? কৃত্রিম এক সমুদ্র শহর হতে যাচ্ছে আরব আমিরাতে। প্রকল্পটির নাম পৃথিবী। পৃথিবীর ভূভাগের ম্যাপ অনুসরণ করে তৈরি করা এ প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে চলেছে। খণ্ড খণ্ড দ্বীপ নিয়ে তৈরি এ পৃথিবী সমুদ্রশাসনের অনেক বড় প্রকল্প। যখন প্রকল্পটি শেষ হবে, তখন নাকি ৩২১ মিলিয়ন কিউবিক মিটার বালু আর ৩১ মিলিয়ন টন পাথর জমা হবে দ্বীপগুলোতে। বিশ্বমন্দার কবলে পড়ে, পৃথিবী প্রকল্পের কাজ আপাতত ধীরে চলছে। কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে তা এক বিস্ময় তৈরি করবে নিশ্চিত। কিন্তু আপাতত সবচেয়ে বড় দেয়াল তৈরির জন্য কোরিয়ানদের বাহবা দিতে হবে।